#পালিয়ে_যাওয়া_স্ত্রী 

পর্ব ০৭ (শেষ)

The Story Haven 


নাসিমের নামটা শোনার পর আমার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ চাপা একটা ভয় জমে উঠল।

“দুর্ঘ**টনা…?” আমি ধীরে বললাম।

পুলিশ অফিসার মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ স্যার। অবস্থা খুব খারাপ। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।”

মাহবুব সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“কোন হাসপাতালে?”

“শহরের সদর হাসপাতাল।”

তিনি এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না।

“চলুন। এখনই যেতে হবে।”

আমি কিছু না ভেবেই তার সাথে বের হয়ে পড়লাম। মাথার ভেতর তখন হাজারটা চিন্তা ঘুরছে।

নাসিম… আমার ছোট ভাইয়ের মতো… সে কি সত্যিই এসবের সাথে জড়িত?

আর যদি জড়িত থাকে, তাহলে এখন সে কেন পালাচ্ছিল?

নাকি কেউ তাকে চুপ করিয়ে দিতে চাইছিল?

পুলিশের গাড়ি দ্রুত রাস্তা পেরিয়ে শহরের দিকে ছুটতে লাগল। আমার মনে হচ্ছিল প্রতিটা মিনিট যেন ঘণ্টার মতো লম্বা হয়ে যাচ্ছে।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দেখি জরুরি বিভাগের সামনে ভিড়।

একজন নার্স দ্রুত আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল।

ভেতরে ঢুকেই দেখি একটা বেডে একজন শুয়ে আছে।

মাথায় ব্যান্ডেজ, শরীর জুড়ে আ*ঘাতের চিহ্ন।

আমি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলাম।

আর তারপর আমার বুক কেঁপে উঠল।

সে নাসিম।

তার চোখ বন্ধ। শ্বাস খুব ধীর।

আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

“নাসিম…” আমি আস্তে ডাকলাম।

কোনো সাড়া নেই।

মাহবুব সাহেব ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন,

“তার অবস্থা কেমন?”

ডাক্তার বললেন,

“অবস্থা সংকটজনক। মাথায় গুরুতর আ*ঘাত লেগেছে। তবে জ্ঞান ফিরলে কিছু কথা বলা সম্ভব হতে পারে।”

আমার মনে হচ্ছিল সময় যেন থেমে গেছে।

ঠিক তখনই নাসিমের আঙুলটা একটু নড়ল।

আমি ঝুঁকে পড়লাম।

“নাসিম… আমি ভাইয়া… শুনতে পাচ্ছিস?”

ধীরে ধীরে তার চোখ একটু খুলল।

তার দৃষ্টি ঝাপসা। কিন্তু আমাকে চিনতে পারল।

তার ঠোঁট কাঁপছিল।

আমি বললাম,

“কি হয়েছে? কে এটা করেছে?”

নাসিম খুব কষ্ট করে বলল,

“আমি… পালাচ্ছিলাম…”


“কেন?”

সে কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে বলল,

“ওরা… আমাকে মে**রে ফেলত…”

মাহবুব সাহেব সামনে এগিয়ে এলেন।

“কারা?”

নাসিম চোখ বন্ধ করে আবার খুলল।

তার গলা প্রায় শোনা যাচ্ছে না।

সে বলল,

“চেয়ারম্যান… না… সে একা না…”

ঘরের ভেতর সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছে।

“তাহলে কে?”

নাসিম কষ্টে বলল,

“তার উপরে… আরেকজন আছে…”

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কে সে?”

নাসিম ঠোঁট নড়াল।

কিন্তু শব্দ বের হল না।

আমি তার হাত ধরে বললাম,

“বল… প্লিজ বল…”

সে আবার চেষ্টা করল।

তার চোখে তখন ভয়।

“সে… শহরের…”

হঠাৎ তার শরীর কেঁপে উঠল।

মনিটরের শব্দ বেড়ে গেল।

ডাক্তার দ্রুত এগিয়ে এলেন।

“সবাই বাইরে যান!”

আমাদের জোর করে বাইরে বের করে দেওয়া হল।

আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম।

আমার হাত কাঁপছে।

মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে—

চেয়ারম্যানের উপরে আরও কেউ আছে।

মানে এই চক্রটা আরও বড়।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বাইরে এলেন।

আমরা দৌড়ে তার কাছে গেলাম।

“কেমন আছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“আমরা চেষ্টা করছি… কিন্তু অবস্থা খুবই খারাপ।”

আমার বুক ভারী হয়ে গেল।

ঠিক তখনই মাহবুব সাহেবের ফোন বেজে উঠল।

তিনি ফোন ধরলেন।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর তার মুখের ভাব বদলে গেল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“কি হয়েছে?”

তিনি ধীরে বললেন,

“শহরের ওই বাড়িতে আবার তল্লাশি চালানো হয়েছে।”

“তাতে কি পাওয়া গেছে?”

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—

“একটা রেজিস্টার… যেখানে শুধু নাম না, টাকার হিসাবও লেখা আছে।”


“কার টাকার?”

মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন—

“প্রতিটা মেয়ের পাশে একটা অঙ্ক লেখা… আর কিছু নামের পাশে বড় অঙ্ক।”

আমি কাঁপা গলায় বললাম,

“নাজমার নাম?”

তিনি একটু থেমে বললেন—

“তার নামের পাশে সবচেয়ে বড় অঙ্ক লেখা।”

আমার মাথা নিচু হয়ে গেল।

কেন?

কেন নাজমা?

এই প্রশ্নটা আবার আমার ভেতর জেগে উঠল।

ঠিক তখনই মাহবুব সাহেব আরেকটা কথা বললেন—

“আর সেই রেজিস্টারের শেষ পাতায় একটা নাম লেখা আছে…”

আমি তাকালাম।

“কোন নাম?”

তিনি ধীরে বললেন—

“যে নামটা শুনলে হয়তো পুরো গল্পটাই বদলে যাবে।”


“কে?”

মাহবুব সাহেব বললেন—

“একজন প্রভাবশালী শহরের ব্যবসায়ী… যাকে সবাই সম্মান করে।”

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।


হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারছিলাম—এই গল্পটা এখন শুধু আমার বা নাজমার না।

এটা একটা বড় অন্ধকারের গল্প।

যেখানে মানুষের মুখে ভালোবাসা, সম্মান, ধর্ম, সমাজ—সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে ছিল ভয়ংকর একটা চক্র।

আমি ধীরে মাহবুব সাহেবকে বললাম,

“ওই ব্যবসায়ীর নামটা বলুন।”

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

“নামটা এখনই বলা ঠিক হবে না। কারণ আমরা নিশ্চিত হতে চাই।”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,

“এতকিছু জানার পরও আপনি অপেক্ষা করবেন?”

তিনি শান্তভাবে বললেন,

“কারণ এই লোকটা খুব বড়। প্রমাণ ছাড়া কিছু করলে পুরো কেসটাই ভে*ঙে পড়বে।”

আমি চুপ হয়ে গেলাম।

ঠিক তখনই হাসপাতালের দরজা খুলে একজন নার্স বের হল।

“রোগীর জ্ঞান ফিরেছে।”


আমি দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

নাসিম তখন দুর্বল চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

“নাসিম… এবার সব বল।”

সে কষ্ট করে শ্বাস নিতে নিতে বলল,

“সময়… কম…”

মাহবুব সাহেব সামনে এগিয়ে এলেন।

“যা জানো, সব বলো।”

নাসিম চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড শ্বাস নিল।

তারপর ধীরে বলল,

“চেয়ারম্যান… শুধু লোক জোগাড় করত… আসল কাজ করত শহরের লোকটা…”

আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম।

“কে সে?”

নাসিম কাঁপা গলায় বলল—

“রাশেদ মালিক…”

ঘরের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা।

নামটা আমি আগে শুনেছি।

শহরের বড় ব্যবসায়ী। দান-খয়রাত করে, এতিমখানায় সাহায্য দেয়—এমনই তার পরিচয়।

আমি ফিসফিস করে বললাম,

“সে কেন এসব করবে?”

নাসিম ধীরে বলল,

“টাকা… আর ক্ষমতা…”

তার চোখে তখন ভয়।

“যারা তার বিরুদ্ধে যায়… তারা বাঁচে না…”

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

মাহবুব সাহেব দ্রুত বললেন,

“আর কি জানো?”

নাসিম শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে বলল,

“ওই বাড়িতে… একটা গোপন রুম আছে… সেখানে সব প্রমাণ…”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তার শরীর আবার কেঁপে উঠল।

ডাক্তাররা দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল।

আমাদের আবার বাইরে বের করে দেওয়া হল।

আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম।

মাথার ভেতর শুধু একটা নাম ঘুরছে—

রাশেদ মালিক।

সেদিন রাতেই পুলিশ আবার অভিযান চালায়।

শহরের সেই বাড়িতে।

নাসিম যে গোপন রুমের কথা বলেছিল, সেটা সত্যিই পাওয়া যায়।

সেখানে লুকানো ছিল—

ভিডিও রেকর্ড

টাকার হিসাব

আর অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ

সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করল।

পরদিন সকালে খবর ছড়িয়ে পড়ল—

চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

করিম চাচা, রাকিব—সবাই পুলিশের হেফাজতে।

আর শহরের সেই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী রাশেদ মালিক—

সে পালানোর চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দর থেকেই তাকে আটক করা হয়।

কয়েকদিন পর আমি আবার থানায় গেলাম।

নাজমা তখন শান্ত হয়ে বসে ছিল।

তার চোখে এখনো কষ্ট আছে… কিন্তু আগের মতো ভয় নেই।

আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তারপর ধীরে বললাম,

“চল… বাড়ি যাই।”

নাজমা আমার দিকে তাকাল।

তার চোখে পানি চলে এল।

“তুমি… আমাকে নিয়ে যাবে?”

আমি গভীর একটা শ্বাস নিলাম।

“তুমি যদি ফিরে আসতে চাও… তাহলে হ্যাঁ।”

নাজমা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।

“আমি ইচ্ছে করে যাইনি…”

আমি ধীরে বললাম,

“আমি এখন জানি।”

কিছু সত্যি জানতে সময় লাগে।

আর কিছু মানুষকে বুঝতে আরও বেশি সময় লাগে।

গ্রামে ফেরার পথে আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।

সবকিছু আগের মতোই আছে।

রাস্তা… গাছ… মানুষ…

কিন্তু আমার চোখে সবকিছু বদলে গেছে।

কারণ আমি জানি—

অন্ধকার সবসময় দূরে থাকে না।

অনেক সময় সেটা আমাদের একেবারে কাছেই লুকিয়ে থাকে।

আর আমরা বুঝতেই পারি না।


সমাপ্ত 


গল্পটি কেমন লাগলো জানাবেন প্লিজ। আর কি ধরনের গল্প পড়তে চান কমেন্টে জানিয়ে যাবেন।
 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url