পর্ব ০৩+০৪
The Story Haven
পুলিশ অফিসার যখন বললেন যে এই পাচার চক্রে আমাদের গ্রামেরই একজন মানুষ জড়িত, তখন আমার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।
আমি জানি না কেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল সামনে খুব খারাপ একটা সত্য অপেক্ষা করছে।
আমি সাব-ইন্সপেক্টর মাহবুবের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“কে সে?”
ঘরের ভেতর তখন অদ্ভুত নীরবতা।
নাজমা মাথা নিচু করে বসে আছে। তার চোখে তখনও পানি।
মাহবুব সাহেব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। যেন তিনি কথাটা বলার আগে একটু ভাবছেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“লোকটার নাম… করিম উদ্দিন।”
আমার বুকটা যেন ধক করে উঠল।
“করিম চাচা?”
আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই কথাটা বের হয়ে গেল।
এই মানুষটাকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। আমাদের বাড়ির পাশের বাড়িতেই তার বসবাস। ছোটবেলা থেকে তিনি আমাকে নিজের ছেলের মতোই দেখেছেন।
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম,
“এটা অসম্ভব… করিম চাচা এমন কিছু করতে পারেন না।”
মাহবুব সাহেব শান্ত গলায় বললেন,
“আমরা এখনো তদন্ত করছি। কিন্তু কিছু তথ্য পেয়েছি, যেগুলো খুব সন্দেহজনক।”
আমি অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
নাজমা তখন ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি… আমি ওই মানুষটাকে একবার দেখেছিলাম।”
আমি দ্রুত তার দিকে তাকালাম।
“কোথায়?”
নাজমা একটু সময় নিল। যেন স্মৃতিগুলো জড়ো করছে।
তারপর বলল,
“যে বাড়িতে আমাকে রাখা হয়েছিল… একদিন রাতে সে সেখানে এসেছিল।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তুমি নিশ্চিত?”
নাজমা ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ… আমি তাকে চিনতে পেরেছিলাম।”
আমার মাথা যেন ঘুরে উঠল।
করিম চাচা!
এই মানুষটাই তো সেদিন আমাকে প্রথম বলেছিল যে নাজমা নাকি রাকিবের সাথে পালিয়ে গেছে।
আমি তখন ভাবতে শুরু করলাম।
সেদিন দুপুরে যখন আমি বাড়ি ফিরেছিলাম, তখন তিনিই প্রথম এই কথাটা বলেছিলেন।
তখন তো গ্রামের অন্য কেউ কিছুই জানত না।
তাহলে তিনি এত দ্রুত কিভাবে জানলেন?
আমার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে একটা ভয়ংকর সন্দেহ জন্ম নিতে লাগল।
আমি দাঁত চেপে বললাম,
“তিনি কি… রাকিবের সাথে জড়িত?”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“আমরা ধারণা করছি, রাকিব শুধু একজন মধ্যস্থতাকারী। সে মেয়েদের ফাঁদে ফেলে শহরে নিয়ে আসে।”
আমি রাগে কাঁপতে লাগলাম।
“আর করিম চাচা?”
পুলিশ অফিসার বললেন,
“আমাদের সন্দেহ, গ্রামের কিছু মানুষের তথ্য তিনি পাচারকারীদের কাছে দিতেন।”
আমার চোখের সামনে তখন অনেক পুরোনো ঘটনা ভেসে উঠতে লাগল।
করিম চাচা প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন।
নাজমার সাথে গল্প করতেন।
কখনো কখনো বলতেন,
“মেয়ে মানুষ একা ঘরে থাকে, সাবধানে থাকতে হয়।”
আমি তখন এসব কথা খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—তিনি হয়তো সবকিছু খেয়াল করতেন।
নাজমা তখন হঠাৎ বলল,
“সেদিন রাতে আমি একটা কথা শুনেছিলাম।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“কি কথা?”
সে ধীরে বলল,
“রাকিব আর ওই বাড়ির মালিক কথা বলছিল।”
“কি বলছিল?”
নাজমা চোখ বন্ধ করে বলল,
“রাকিব বলছিল—এই মেয়েটাকে গ্রামের করিম চাচা নিজেই ঠিক করে দিয়েছে।”
আমার বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
“আমি এখনই তার কাছে যাব!”
মাহবুব সাহেব দ্রুত বললেন,
“না, আপনি কোথাও যাবেন না।”
আমি রাগে বললাম,
“কেন?”
তিনি শান্তভাবে বললেন,
“আমরা ইতিমধ্যে তার ওপর নজর রাখছি।”
আমি হতবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
“মানে?”
তিনি বললেন,
“আজ সকালে আমরা খবর পেয়েছি, করিম উদ্দিন হঠাৎ করে গ্রাম ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“তিনি পালিয়ে যাচ্ছে?”
মাহবুব সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
“সম্ভবত।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা দুঃস্বপ্নের ভেতরে আছি।
যে মানুষটাকে আমি এত বছর ধরে সম্মান করেছি…
সে কি সত্যিই এমন ভয়ংকর একটা কাজ করতে পারে?
ঠিক তখনই থানার বাইরে হঠাৎ হৈচৈ শোনা গেল।
কেউ দৌড়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল।
একজন কনস্টেবল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“স্যার… বড় খবর!”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কি হয়েছে?”
কনস্টেবল বলল,
“আমরা করিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়েছিলাম… কিন্তু—”
“কিন্তু কি?”
সে বলল,
“বাড়ির ভেতরে তাকে পাওয়া যায়নি।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“তাহলে?”
কনস্টেবল বলল,
“কিন্তু বাড়ির ভেতরে আমরা একটা জিনিস পেয়েছি… যেটা দেখে মনে হচ্ছে এই চক্রটা আমরা যতটা ভাবছিলাম, তার থেকেও অনেক বড়।”
মাহবুব সাহেব কপাল কুঁচকে বললেন,
“কি পেয়েছ?”
কনস্টেবল ধীরে বলল,
“একটা খাতা… যেখানে গ্রামের অনেক মেয়ের নাম লেখা আছে।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আর সেই তালিকার একেবারে প্রথম নামটা ছিল—
নাজমা আক্তার।
চলবে..?#পালিয়ে_যাওয়া_স্ত্রী
পর্ব ৪
কনস্টেবলের কথাটা শোনার পর ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
একটা খাতা…
আর সেই খাতায় গ্রামের অনেক মেয়ের নাম?
আমার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল এই ঘটনার ভয়ংকর দিকটা আমরা এখনো পুরোটা বুঝতে পারিনি।
সাব-ইন্সপেক্টর মাহবুব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি কনস্টেবলকে বললেন,
“খাতাটা কোথায়?”
কনস্টেবল বলল,
“স্যার, গাড়িতে রাখা আছে।”
“নিয়ে আসো।”
কিছুক্ষণ পর কনস্টেবল একটা পুরোনো নীল রঙের খাতা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
খাতাটা দেখতে একদম সাধারণ। যেন স্কুলের কোনো পুরোনো খাতা।
কিন্তু তার ভেতরে কি লেখা আছে, সেটাই হয়তো অনেক মানুষের জীবনের ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে রেখেছে।
মাহবুব সাহেব ধীরে ধীরে খাতাটা খুললেন।
আমি অজান্তেই সামনে ঝুঁকে গেলাম।
প্রথম পাতায় বড় করে একটা শব্দ লেখা—
“তালিকা”
তার নিচে নামগুলো।
একটার পর একটা।
আমি দ্রুত চোখ বুলাতে লাগলাম।
কিছু নাম আমার খুব পরিচিত।
আমাদের গ্রামেরই কয়েকটা মেয়ের নাম সেখানে লেখা।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি কাঁপিয়ে দিল প্রথম নামটা।
নাজমা আক্তার।
তার পাশেই একটা তারিখ লেখা।
সেদিনের তারিখ।
যেদিন নাজমা হারিয়ে গিয়েছিল।
আমার হাত মুঠো হয়ে গেল।
আমি দাঁত চেপে বললাম,
“এই মানুষটা কতদিন ধরে এসব করছে?”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“খাতাটা দেখে মনে হচ্ছে অন্তত কয়েক বছর।”
আমার শরীর কেঁপে উঠল।
মানে এতদিন ধরে আমাদের গ্রামের মানুষ কিছুই টের পায়নি?
নাজমা তখন হঠাৎ ধীরে বলল,
“স্যার… আমি আরেকটা কথা মনে করতে পারছি।”
আমরা সবাই তার দিকে তাকালাম।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কি কথা?”
নাজমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“যেদিন করিম চাচা ওই বাড়িতে এসেছিল… সেদিন তারা একটা কথাও বলছিল।”
আমি তাড়াতাড়ি বললাম,
“কি কথা?”
নাজমা কাঁপা গলায় বলল,
“রাকিব তাকে বলছিল—‘চাচা, গ্রামের লোকজন যদি কিছু বুঝে ফেলে?’”
আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম।
নাজমা বলল,
“তখন করিম চাচা হাসছিল।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“তারপর?”
নাজমা বলল,
“তিনি বলেছিলেন—‘চিন্তা করিস না। ওদের মাথায় আমি এমন গল্প ঢুকিয়ে দিয়েছি, কেউ সত্যি খুঁজতেও যাবে না।’”
আমার মাথায় যেন বজ্রপাত হল।
হঠাৎ সবকিছু পরিষ্কার হতে লাগল।
সেদিন করিম চাচাই তো প্রথম বলেছিল—নাজমা নাকি রাকিবের সাথে পালিয়েছে।
তারপর পুরো গ্রাম সেই কথাটাই বিশ্বাস করেছিল।
কেউ আর খোঁজও নেয়নি।
কারণ সবাই ধরে নিয়েছিল—এটা প্রেমের ঘটনা।
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“মানে… সবটাই আগে থেকে পরিকল্পনা করা ছিল।”
মাহবুব সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ। যদি কেউ মনে করে মেয়ে প্রেম করে পালিয়েছে, তাহলে কেউ তাকে খুঁজতে যায় না।”
আমার বুকের ভেতর তখন রাগে আগুন জ্বলছে।
আমি বললাম,
“তাকে ধরতেই হবে।”
ঠিক তখনই থানার ফোনটা বেজে উঠল।
একজন পুলিশ ফোনটা ধরে কয়েক সেকেন্ড কথা বলল।
তারপর সে দ্রুত মাহবুব সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যার… খবর এসেছে।”
“কি খবর?”
“আমাদের টিম করিম উদ্দিনকে খুঁজে পেয়েছে।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কোথায়?”
পুলিশ বলল,
“বাসস্ট্যান্ডে।”
মাহবুব সাহেব দ্রুত বললেন,
“ধরতে পেরেছে?”
পুলিশ মাথা নাড়ল।
“না স্যার… সে পালিয়ে গেছে।”
আমার মনে হল মাটিটা যেন পায়ের নিচ থেকে সরে গেল।
“পালিয়ে গেছে?”
পুলিশ বলল,
“হ্যাঁ। কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাওয়া গেছে।”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কি?”
পুলিশ ধীরে বলল,
“সে তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় একটা ব্যাগ ফেলে গেছে।”
“ব্যাগে কি ছিল?”
পুলিশ বলল,
“অনেকগুলো মোবাইল ফোন… আর কিছু কাগজপত্র।”
ঘরের ভেতর সবাই চুপ হয়ে গেল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কাগজে কি লেখা?”
পুলিশ একটু থেমে বলল,
“কিছু নাম আর ফোন নম্বর… কিন্তু একটা নাম দেখে আমরা সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি।”
আমার বুক আবার ধক করে উঠল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কোন নাম?”
পুলিশ ধীরে বলল,
“একজন স্থানীয় প্রভাবশালী মানুষের নাম।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কে?”
পুলিশ অফিসার ধীরে উত্তর দিল—
“আপনার গ্রামের চেয়ারম্যান।”
ঘরের ভেতর যেন আবার ঝড় বয়ে গেল।
কারণ এখন বোঝা যাচ্ছে…
এই অন্ধকার চক্রটা শুধু একজন মানুষের কাজ না।
এর পেছনে হয়তো আরও বড় মানুষ জড়িত।
আর এই গল্প এখনো শেষ হয়নি।
চলবে..?
