#মায়ার_সংসার
#পর্বঃ৯+১০+১১+ শেষ পর্ব
#রেজওয়ানা_আসিফা
অফিসের পার্টি রুমের কাজ চলছে। সেখানের সব কাজ দেখাচ্ছে সুমন। নিচ থেকে বসের ডাক পরতেই সুমন নিচে গিয়ে দেখলো বসের পাশেই মায়া।
সুমনের বস বলে উঠলো,
-বাসা থেকে রাগ করে বের হয়েছো কেনো? মেয়েটা কখন থেকে খাবার নিয়ে এসে বসে আছে। তোমার আন্টি হলে তো আমার আরো তার রাগ ভাঙ্গাতে হতো। এমন বউ পেয়েছো ভাগ্যের ব্যপার।
সুমন মায়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
-তুমি এখানে?
মায়া নিচের দিকে তাকিয়ে বললো,
-খেয়ে বের হওনি তো।
সুমন কিছু বলার আগেই মায়ার হাত থেকে খাবারের ব্যাগ টা নিয়ে সুমনের বস সুমনের কাছে নিয়ে বললো,
-যাও আগে খেয়ে আসো।
মায়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
-তুমি বসো মা। খেয়ে আসলে ওকে নিয়ে বাসায় যেয়ো। আর কালকে অফিসে পার্টি আছে। তোমাদের সহপরিবারে এখানে দেখতে চাই আমি।
মায়া মুচকি হেসে ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসলো।
সুমন খাওয়া শেষ করে সব কাজ শেষ করে মায়াকে নিয়ে বের হলো।
বের হয়ে একটা মার্কেটে গিয়ে মায়ার জন্য কিছু জামা কাপড় আর মৌর জন্য কিছু জামাকাপড় কিনলো। কারোরি তেমন ভালো কাপড় নেই। যদি বাধ্যতামূলক এখানে আসা লাগে তাই মূলত কাপড় গুলো কেনা। বিল পে করার সময় দেখলো তার সেঝো ভাবি একটা লোক কে নিয়ে মার্কেটে ঢুকছে।
সুমন দৌড়ে তার সামনে যেতেই সে ভুত দেখার মতো চমকে গেলো। পাশে থাকা লোকটা তাকিয়ে দেখছে।
সুমন বলে উঠলো,
-সেঝো ভাবি! এই লোকটা কে?
সে ঝাড়ি মেরে বললো,
-তোমাকে কেনো বলবো? আর জিগ্যেস করছো যখন তখন বলছি, ভাই হয় আমার। আর আমার কথা বাদ দাও। ভালোই তো বাড়ি থেকে বের হয়ে তো ভালোই বউ নিয়ে ফুর্তি করছো।
সুমন উচ্চ স্বরে ধমদ দিয়ে বললো,
-ভাবী! মুখ সামলে কথা বলো। স্বামী বউ নিয়ে ঘুরতে আসলে সেটাকে ফুর্তি বলেনা। ফুর্তি তো করছে এই লোকটা তোমাকে নিয়ে। আর তুমি তোমার স্বামীকে ঠকিয়ে অন্য কারো সাথে বাইরে বাইরে ঘুরছো। আর কী তোমাদের বাড়ি থেকে চলে এসেছি। হ্যাঁ ভালো করেছি। বিশ্বাস করো সৃষ্টিকর্তা অনেক ভালো রেখেছে। তোমরা এইসব করে বেরাচ্ছো এইসব পাপের শাস্তি তো আর না পাবে না। এক সংসারে এই শাস্তির কিছু অংশ আমাদের উপরও পরতো এখন আর পরবেনা।
লোকটা পাশে দারিয়ে সব দেখছে। সুমন লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-নিজের ঘরে কী বউ নাই? আরেকজনের বউ নিয়ে ঘুরছেন?
লোকটা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সুমন তাকে থামিয়ে বললো,
-যানি এখন সিনেমার মতো ডায়লোগ দিয়ে বলবেন,
-এটা আমার বোন।
কিন্তু কী ভাই বলেন তো, এটা সিনেমা না। আপনি নায়ক না আর আমি বলদ ভিলেন না তাই এইসব ডায়লোগ মারার চেষ্টা করবেননা। বয়স হয়েছে। ভালো হন।
কথা গুলো শুনে লোকটা চুপ হয়ে গেলো। সুমন তার সেঝো ভাবির দিকে তাকিয়ে বললো,
আমার বোবা ভাইয়াকে কীভাবে ঠকাচ্ছো ছিঃ
-ইসসসস! ভাইয়ের জন্য কী দরদ! শোনো আমি দেখে তোমার এই বোবা ভাইকে বিয়ে করেছি অন্য কেউ হলে কখনো করতোনা। এখন সামনে থেকে সরো পাবলিক প্লেসে নিজের ইজ্জত খাইয়োনা।
মায়া সব দেখছিলো। বেশি বারাবারি হওয়ার আগেই সে সুমনের কাছে গিয়ে বললো,
-এসব সস্তা মনমানসিকতার লোকের সাথে কথা বলো না। বিল মিটিয়ে চলো।
মায়া সুমন কে সেখান থেকে নিয়ে আসলো। সুমন রিকশায় রাগে ঘামছে। মায়া সুমনকে শান্তনা দিয়ে বললো,
-বাদ দাও না। তুমিই তো বললে ওই বাড়ির প্রতি যাতে আর মায়া না দেখাই এখন তুমি এমন করছো কেনো?
সুমন মায়ার দিকে তাকিয়ে রেগে বললো,
- আমি মায়া দেখাচ্ছি না। আমার রাগ হচ্ছে। কতো বড়ো নি*র্লজ্জ। নিজের ছোট দেবরের সামনে পর*কিয়া করছে আবার বড়ো মুখ করে কথা বলছে। এদের জন্য তো খারাপ লাগে না। খারাপ লাগে সেঝো ভাইর জন্য।
সুমন রেগে আবার বললো,
-তার জন্যও কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। সেও কম করেনি। সবার পাপের শাস্তি সবাই পাচ্ছে।
বাসায় এসে মৌকে জামা কাপড় দেখাতেই সে খুশিতে একটা একটা করে পরে দেখছে। মেয়ের এইরকম খুশি দেখে সুমনের রাগ এমনেই চলে যায়।
বিকেলে ছাদে সুমন আর রিফাত বসে আছে। আয়শা চা নিয়ে আসলো। আয়শা এখানে বসতে চাইলে রিফাত উঠিয়ে দেয় মূলত তারা মায়াকে সারপ্রাইজ দেওয়ার বিষয় টা নিয়ে আলোচনা করছিলো। তাই আয়শাকে জানাতে চাচ্ছে না। আয়শাও রেগে বললো,
- সমস্যা নেই আমাকে বসতে দিলেনা তো। নিচে গিয়ে বলবো সুমন ভাইয়ের অফিসের কোন মেয়ের সাথে কিছু চলছে। আর সেই কথা রিফাতের সাথে শেয়ার করছে। আমি লুকিয়ে আরো শুনেছি মেয়েটা নাকি সেই সুন্দর।
সুমন লাফ দিয়ে উঠে বললো,
-বোন তুই আমার মায়ের পেটের আপন বোন। এই সুন্দর সংসারে তুই আগুন লাগাস না।
আয়শা হেসে বললো,
-এইতো এইবার ঠিক আছে এখন বলেন, কী বলছিলেন দুই জনে।
রিফাত এনিয়ে বিনিয়ে বললো,
-কোথায় কি বলছিলাম। তুমি বেশি শুনো সব সময়।
-আমি তোমাকে কিছু জিগ্যেস করেছি? আমার সাথে সুমন ভাইর ডিল হইছে তুমি এতো কথা বলো কেনো?
সুমন বলতে লাগলো,
- আসলে তোমার ভাবিরে সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করছিলাম।
-কেমন সারপ্রাইজ?
তোমার ভাবিরে তার বাবার বাড়ি নিয়ে যাবো।
-ওমা! কবে? সে যানে?
রিফাত রেগে বললো,
-দেখছিস! ওর মতো বলদ গাধা আর একটাও নেই। যদি সে জানতোই তাহলে কী সারপ্রাইজ হতো?
-হ্যা তাই তো।
-শোনো আয়শা তুমি মায়াকে কিছু বলোনা। কালকে অফিসে একটা পার্টি আছে তার পরের দিন আমরা সবাই সেখানে যাবো।
-ওকে ওকে। চিন্তা নেই কিছু বলবোনা আমি।
সকাল সকাল মায়া মৌ কে রেডী করে নিজে রেডী হচ্ছে। সুমন বাইরে রিকশা নিয়ে দারিয়ে আছে। মায়া মৌ আসলে সুমন দুই জনকে নিয়ে সোজা অফিসে যায়। অনেক আয়োজন করা হয়েছে। সব দিকে অনেক বড়ো বড়ো লোক। মায়া মৌ আর সুমন এক পাশে দারিয়ে আছে। সুমনের সব এসে অনেক ক্ষন কথা বললো সবার সামনে।
ডিনার শেষে সুমনের বস তার মেয়ে নায়না আর পাশে একটা ছেলেকে দার করালো। মায়া ছেলেটাকে দেখে অবাক হয়ে বললো,
-বড়ো...... বড়ো ভাই এখানে কী করছো।
সুমন সামনে দারিয়ে থাকা সবার দিকে দৃষ্টি রেখে বললো,
-হ্যা কথা বলো না। এই দিন টার জন্য ই তো অপেক্ষা করছিলাম। আমার আগে থেকেই সন্দেহ হচ্ছিলো।
মায়াও সব চুপ করে দারিয়ে দেখছে। সুমনের বস আবার বলতে শুরু করলো,
-আপনাদের সবাইকে একটা খুশির খবর দিতে চাই আজকে এই সুন্দর দিনে। আপনাদের সবার প্রিয় আমার মেয়ে নায়নার সাথে আকবরের বিয়ের তারিখ ঘোষনা করবো এই আজকে।
কথাটা শুনেই আকবরের মুখটা কালো হয়ে গেলো। মায়া অবাকের চরম সিমানায় পৌছে মুখে হাত দিয়ে দারিয়ে আছে। সুমন হা করে তাকিয়ে আছে। নায়না লজ্জায় মুখ নিচু করে দারিয়ে আছে। আকবর সুমনের বসের কানে কানে কি যেনো বলে নায়নাকে নিয়ে একটু আলাদা কথা বলার জন্য আড়ালে গেলো। সুমনও তাদের পিছে পিছে গেলো। আড়ালে দাড়িয়ে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করছে।
আকবর নায়নাকে বলছে,
-তোমার বাবা কী পাগল হয়ে গেছে? এখন বিয়ে ! আমি কী একবারও বলেছি এখন বিয়ে করবো?
-বলোনি কি হয়েছে।বিয়ে করে রাখলে সমস্যা কোথায়? আর তোমার পরিবার নাহয় পরে জানবে। এতে এতো রিয়েক্ট করার কী আছে?
-তুমি বুঝবে না আমি এখন বিয়ে করতে পারবো না। আজকে আসি। আংকেলকে বলো আমার জরুরি ফোন এসেছিলো তাই চলে গেছি।
কথাটা শেষ করেই সে চলে গেলো। নায়না পিছন থেকে অনেক ডাকলো কিন্তু আকবর সারা দিলোনা। সুমন দারিয়ে দারিয়ে সব দেখলো।
চলবে..................
#মায়ার_সংসার
#পর্বঃ১০
#রেজওয়ানা_আসিফা
সুমন মায়ার কাছে আসতেই মায়া আতঙ্ক নিয়ে বললো,
-সুমন এখানে এইসব হচ্ছে কী? দুনিয়া কী নরক করে ছারবে এরা?
সুমন ভাবলেহীন চোখে অন্য দিক তাকিয়ে বললো,
-এখানে আসার পর বড়ো ভাইকে অনেক বার দেখেছি সন্দেহ হয়েছে এইবার বুঝলাম আসল কাহিনি।
মায়া কথা বলতে পারছেনা এইসব দেখে। একে সবাই কতো সন্মান করে আর উনি এইসব করে বেরাচ্ছে বাইরে। ভাবতেই অবাক লাগে। মায়া আর মৌ কে সুমন বাসাত পাঠিয়ে দিয়ে নায়নার কেবিনের দিকে গেলো।
নায়না চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। চেহারায় চিন্তা আর কষ্টের ছাপ। সুমন সোজা ভিতরে ঢুকলো। অনুমতি নিলোনা আর আজ। সুমনকে দেখে নায়না হাসার চেষ্টা করে বললো,
-কিছু বলবেন ভাই?
-আকবর ভাইর সাথে কতোদিন আপনার সম্পর্ক?
নায়না একটু বিচলিত হলো। সুমনের কথায় তার মনে হচ্ছে সুমন আকবর কে খুব ভালো করে চেনে। তারপরও নায়না জিগ্যেস করলো,
-কেনো বলেন তো, আপনি কালও জিগ্যেস করেছেন সে কেনো আসে। আপনি কী তাকে চিনেন?
সুমন চেয়ার টেনে বসে বললো,
-সে আমার বড়ো ভাই। এবং সে বিবাহিত তার একটা ছেলেও আছে।
সুমনের কথা শুনে নায়না স্তব্ধ হয়ে গেলো। হা করে তাকিয়ে আছে সুমনের দিকে। তার মাথা ঘুরছে। সে কথা বলতে পারছেনা। সুমন এক গ্লাস পানি নায়নার দিকে এগিয়ে দিলো। নায়না সম্পূর্ণ পানিটা শেষ করলো। তার হয়তো এই পানিটা এখন খুব দরকার ছিলো। কারণ তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো।
সুমন গ্লাস টা রাখতে রাখতে বললো,
-কীভাবে তার সাথে সম্পর্কে জড়ালেন?
নায়না চোখ মুছতে মুছতে বললো,
-ওর কম্পানির বস বাবার খুব ভালো বন্ধু এবং আমাদের বিজনেস তাদের সাথে শেয়ারে। আর এই কম্পানি টা আমার তাই এখানে সব সময় আমিই বেশি থাকি। এই যাওয়া আসাতেই পরিচয়। ওর ব্যবহার আচার আচরণ খুব ভালো লাগে আস্তে আস্তে সম্পর্কে জড়াই। ওর পরিবারে কেকে আছে জিগ্যেস করতেই বললো চার ভাই আর বাবা মা আর ভাবিরা। ও কখনো বলেনি ও বড়ো। আমাকে বলেছে ও সবার ছোট। এই পযর্ন্ত আমার তিনটা ফ্ল্যাট ওর নামে দিয়েছি আমি। ওর নামে একটা ব্যাংক একাউন্টও করে দিয়েছি।
সব কিছু বলতে বলতে আবার নায়না কান্না করে দিলো।
সুমন বাড়ির সব ঘটনা খুলে বললো নায়নাকে। নায়না রাগে লাল হয়ে গেছে। চোখ মুছতে মুছতে বললো,
-আমাকে এভাবে ঠকালো! আমি যেমন অনেক কিছু দিয়েছি তেমন কেড়েও নিতে পারবো। সুমন ভাই আপনার কাছে আমার একটা রিকুয়েস্ট আপনি ওকে বলবেন না যে আমি সব জেনে গেছি। হয়তো ও আপনার ভাই। আপনার ওর জন্য মায়া হবে ওকে কোনো শাস্তি দিলে। কিন্তু আমার কথা ভাবেন! আমার সাথে ও যা করেছে এটা যদি আপনার কোনো বোন থাকতো আর তার সাথে কেউ করতো আপনি কী করতেন?
সুমন নায়নাকে ভযসা দিয়ে বললো।
-আপনি চিন্তা করবেন না, আমি তাকে কিচ্ছু বলবোনা। প্রতিটা অমানুষের শাস্তি পাওয়া দরকার। আর এদের শাস্তি দিতে অবশ্যই সাহায্য করবো। হোক সে ভাই আর অন্য কেউ।
বাসায় ফিরে মায়া সব বললো আয়শা কে। সব শুনে আয়শা বললো,
-কি সাংঘাতিক ব্যপার। সুমন ভাই এখন কোথায়?
-আমাকে বললো, চলে আসতে একটু পর চলে আসবে।
মায়া হঠাৎ খেয়াল করলো আয়শার দিকে। সে কাপড় গোছাচ্ছে।
মায়া আয়শার দিকে খেয়াল করে বললো,
-কোথাও যাবে গো? কাপড় ভাজ করছো যে?
মায়ার কথা শুনতেই আয়শার মনে পরলো, সুমন যাওয়ার সময় বলে ছিলো জামা কাপড় গুছিয়ে রাখতে। কাল তারা বের হলে খুব সকালে। এখন সে কী বলবে মায়াকে।
-না, কোথায় যাবো। কাপড় গুলো ভাজ করে রেখে দিবো।
-ওহ্। আচ্ছা তুমি থাকো আমি ফ্রেশ হয়ে মৌকে খাবার দেই।
সুমন বাসায় ফিরে সব বললো মায়াকে। মায়া সব শুনে বললো,
-এইসব যানানো দরকার না? তাদের এতো ভালো ছেলে কী করেছে!
- কিচ্ছু বলবেনা তারা। তাদের তুমি চেনো না। বলবে, ও তো এইসব টাকার জন্য করেছে সত্যি সত্যি তো আর বিয়ে করে আসে নি। উল্টো আমাদের আরো দোষ দিবে আর বলবে,
-সংসার থেকে বিদায় হয়েও এখন আবার গুটি নারছি। তার চেয়ে ভালো তারা তাদের মতো থাকুক।
-হ্যা ঠিক বলেছো। এদের মধ্যে আর জরানোর দরকার নেই। সবাই সবার পাপের শাস্তি পাবে।
রাতে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়ার পর সুমন মায়াকে ব্যাগ গোছাতে বললেই সে খুব অবাক হয়।
-কেনো ব্যাগ গোছাবো কেনো?
-কারন আছে। কালকেই দেখতে পারবে।
-না আগে বলো তারপর ভেবে দেখবো। তোমার কথা আর শুনছিনা আমি।
-আরে সারপ্রাইজ আছে। ব্যাগ গোছাও। আয়শাও তো গুছিয়েছে।
-আয়শা তো কিছু বললো না আমায়।
-আমি বারন করেছি। তুমি জামা কাপড় প্যাক করো।
শীত ঋতু চলে আসায় বাইরে হালকা ঠান্ডা পরেছে। সকাল৫ টা বাজে মায়াকে দেকে তুলেছে সুমন। মায়া উঠে রিতীমতো আবাক। আয়শা রিফাত সুমন সবাই উঠে গেছে। আয়শা চা ও বানিয়েছে সবার জন্য। আর সবাই নতুন জামা পড়া। মায়া সুমনকে বারান্দায় নিয়ে বললো,
-কি হচ্ছে সুমন? হঠাৎ কোথায় যাবো সবাই?
-ফ্রেশ হয়ে রেডী হও তারপর দেখবে কোথায় জাচ্ছি।
মায়া সুমন কে কিছু বলতে যাবে আর সুমন বললো,
-উফফ মায়া আর ঘাটিয়ো না তো যাও তৈরি হও।
মায়া আর কিছু বললো না সে বুঝতে পেরেছে সুমন বলবে না তাকে।
সবাই তৈরি হয়ে নিচে নামলো। মায়া গাড়ি থেকে এবার বেশ অবাক হলো। সব সময় রিকশায় চলাফেরা করে তারা। বেশি দূরে গেলে বাসে যাওয়া আসা করা হয়। গাড়ি তো ভাড়া করার কথা না।
মায়া আয়শার কানের কাছে গিয়ে ফিশ ফিশ করে বললো
-কোন দেশে জাচ্ছি আমরা? গাড়া ভাড়া করে নিয়ে এসেছে।
-চাদের দেশে হয়তো।
মায়া বিরক্ত হয়ে আর কথা বললো না।
সবাই গাড়িতে উঠে পরলো। মায়া মনে মনে বললো,
-খালি একটু রাস্তা টা ধরতে পারি যে কোথায় জাচ্ছি তারপর এদের সব গুলারে একসাথে কাপড় কাচার মতো ধুবো।
সাত ঘন্টা জার্নির পর গাড়ি মায়ার বাবার বাড়ির এলাকায় ঢুকেছে। মায়ার এবার বুঝতে বাকি নেই সে কোথায়। সুমন তাকে কোথায় এনেছে। আর কেনো কেউ তাকে কিচ্ছু বলেনি। মায়া হা করে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখে পানি টলমল করছে। বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামতেই সুমন মৌকে কোলে নিয়ে আগে নামলো। রিফাত নেমে চার দিকে দেখছে। আয়শা মায়াকে ধরে নামালো। মায়াকে দেখেই বাড়ির দারোয়ান চিৎকার করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলো।
কিচ্ছুক্ষনের মধ্যে বাড়ির সবাই বেড়িয়ে এলো। মায়ার মা বাড়ির সদর দরজায় দাড়িয়ে কান্না করছে। মায়ার বাবা মূর্তির মতো দারিয়ে আছে। মায়ার মা একবার তার বাবার দিকে তাকিয়ে দৌড়ে এসে মায়াকে জরিয়ে ধরলো।
মায়া নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলোনা। এতোদিন পর মায়ার ভালোবাসা পেয়ে সে বাচ্চাদের মতো কান্না করে দিলো। মা মেয়ের এমন দৃশ্য দেখে দারিয়ে থাকা সবার চোখে পানি চলে এসেছে।
মায়ার বাবা সুমনের দিক এগিয়ে এসে মৌ কে কোলে নিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বললো,
-সবাই ভেতরে এসো। বাইরে কতোক্ষন দারিয়ে থাকবে।
দারোয়ান সব ব্যাগ ভেতরে নিয়ে আসো।
কান্না করতে করতে মায়ার বেহাল অবস্থা। আয়শা এবং মায়ার মা দুই জন মিলে মায়াকে নিয়ে ভেতরে আসলো।
ভেতরে এসে মায়ার বাবা মেয়ের কাছে গিয়ে মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
-ক্ষমা করে দে মা, আমি যেই ভুল করেছি তা ক্ষমার যোগ্য না তারপরও বাবাকে ক্ষমা করে দে। নিজের ভুল বুঝতে পারার পর অনেক খুজেছি তোকে। কেউ সঠিক ঠিকানা দিতে পারেনি। তোর মা এখনো তোর কথা ভেবে রোজ রাতে কান্না করে। আর ওই সময় টায় নিজেকে কতো বড়ো অপরাধী মনে হয় তা বলে বোঝাতে পারবোনা।
চলবে...........
#মায়ার_সংসার
#পর্বঃ১১ও_সমাপ্ত
#রেজওয়ানা_আসিফা
মায়ার ফিরে আসাতে আশপাশের সবাই এসেছে তাকে দেখতে। মায়ার মা মৌকে কোল থেকে রাখছে না তার উপর মৌ যেই পাকা পাকা কথা বলে ! এর মধ্যে সবাইকে মায়ায় জরিয়ে ফেলেছে। সুমনের বেশ আদর যত্ন করেছে মায়ার বাবা।
মায়ার ভাবি ভাইয়া সবাই খুব ভালোবেসেছে ওদের।
দেখতে দেখতে দুই দিন হয়ে গেছে। এবার যাবার পালা সবার। মৌ এই দুই দিনে সবার প্রিয় হয়ে গেছে সে কোনো মতেই যেতে চাচ্ছে না। মায়ার মা রিতীমতো কান্না করছে। মায়ার বাবা কোনো মতে বুঝিয়ে মৌকে থামিয়েছে। আর মায়াকে কড়া ভাবে বলে দিয়েছে যাতে আবার কিছু দিন পর মৌকে নিয়ে আসে। সবাইকে বিদায় দিয়ে বাড়ির পথে চললো ওরা।
বাসার আসার পথে হঠাৎ গাড়িতে সুমনের ফোন বেজে উঠলো, ফোনের স্কিনে তাকাতেই দেখলো তার বড়ো ভাই আকবরের নাম্বার। ফোন রিসিভ করতেই অপাশ থেকে তার বড়ো ভাবি বললো,
-তুমি কী করছো হ্যাঁ? তোমার বড়ো ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। একটা মেয়ে বাড়িতে পু*লিশ নিয়ে এসেছিলো। এখন তুমিই পারো ওকে ছাড়াতে।
সুমন শান্ত কন্ঠে বললো,
-সবার পাপের সাজা সবাই পায় ভাবি। আমাকে দয়া করেন আমার দ্বারা সম্ভব না। ভালো থাকবেন।
মায়া অনেক বার জিগ্যেস করে সুমনকে। কি হয়েছে কে ফোন করেছে। কিন্তু সুমন কিচ্ছু বলে না।
বাড়ি ফিরতে বেশি সময় না লাগায় সুমন অফিসের জন্য বেড়িয়ে গেলো। অফিসে যেতেই বসের ডাক পরায় সুমনের আর বুঝতে বাকি রইলো না এতোক্ষনে অফিসে সব জানাজানি হয়ে গেছে। বসের রুমে গিয়ে দারিয়ে আছে সুমন। বস শান্ত কন্ঠে বললো,
-বসো,
সুমন কিছু বলবে তার আগেই সুমনকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
-তোমার উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই। তুমি ভাবছো
আকবর তোমার ভাই তাই হয়তো আমি তোমাকে দোষারোপ করবো। আসলে না। মানবতা সবার মধ্যে না থাকলেও আমার মধ্যে আছে।আমার মধ্যে এইটুকু বুদ্ধি বিবেগ আছে।
বসের কথা গুলো শুনে সুমন স্থির হতে পারলো।
-আমি নায়না ম্যামকে সব বলেছি। আর কী বলবো বলেন।
-আমি সব শুনেছি। আকবর কে নায়না পু*লিশে দিয়েছে তুমি যানো?
-হ্যা। ভাবি ফোন করে বলেছিলো। আর সাহায্যও চেয়েছে। কিন্তু আমি বারন করে দিয়েছি।
-একটা মানুষ কীভাবে পারে এমন জঘন্য ভাবে ঠকাতে?
সুমন চুপ করে আছে। নিজের কাছেই লজ্জা লাগছে তার। আপন ভাইয়ের নামে এমন কথা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। তার উচিৎ হয় নি এসব করা। তাই তাকে তার প্রাপ্য কর্মফল পেতেই হবে। আর কিছুক্ষন টুকটাক কথা বলে বসের রুম থেকে বেড়িয়ে এলো সুমন।
নায়না অফিসে ঢুকে সুমন এসেছে খবর পেয়ে সরাসরি নিজে গেলো সুমনের কেবিনে।
-কী অবস্থা সুমন ভাই?
- এইতো চলে।
-আপনি শুনেছেন কিছু?
সুমন মাথা নিচু করে বললো,
-হ্যা শুনেছি।
-আমার উপর কী আপনার কোনো অভিযোগ আছে?
সুমন থমকে গিয়ে বললো,
-এ কথা মুখে আনাও পাপ। আপনার আর বসের সাথে পরিচয় হয়েছে বলেই তো আজ এখানে।
-আমি সে কথা বলছি না সুমন ভাই।
সুমন আবারও মাথা নিচু করে বসলো।
নায়না বলতে লাগলো,
আপনাকে আগেও বলেছি এখনো আবার বলছি। আপনার বোনের সাথে এমন হলে কী আপনি মানতে পারতেন? আমার সাথে যা হয়েছে আমি তার বিচার করেছি।
- এই বিষয়ে কী আমি কিচ্ছু বলেছি ম্যাম? আমি তো আপনাকে বলেছি আমি আপনাকে সমর্থন করবো। আর করেওছি। ভাবি বলেছিলো কিছু করতে। তাকে না করে দিয়েছি।
-আপনার মতো মানুষের ভাই এমন হয়? আসলেই রক্ত এক হলেও মানুষের মনষ্যত্ব অনেক ভিন্ন হয় তার এক প্রমাণ আপনি আর আপনার পরিবার।
নায়না কথাটা বলে কমল চোখে একবার সুমনের দিকে তাকিয়ে চলে গেলো।
বিকেলে অফিস শেষে বাড়ি ফিরতেই শুনলো এক নতুন কাহিনি। কলিং বেল দিতেই মায়া হন হন করে দরজা খুলে যা বললো তা সুমনের মাথার উপর দিয়ে গেলো।
-সেঝো ভাবি নাকি কালকে ভাইকে ডিভোর্স পেপার দিয়ে চলে গেছিলো আজকে নাকি ভয়াবহ ভাবে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। মাথায় নাকি প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। আর কথা বলতে পারে না। এখন মেডিকেল ভর্তি রয়েছে।
সুমন কোনো কথা না বলে ঘরে চলে গেলো। রিফাত কাছে এসে বললো,
-কী করবি এখন? যাবি না?
সুমন কম্ভির কন্ঠে উত্তর দিলো,
-যাবো তো। বিকেলে, রুগী দেখতে।
রিফাত আর কথা বাড়ালো না।
মায়া সুমনকে খাবার দিতে দিতে বললো,
-তোমার অফিসের ওই ম্যাডাম নাকি বড়ো ভাইকে পু*লিশে দিছে? তুমি এর মধ্যে কিছু করলে না? আর ভাবি নাকি তোমাকে ফোন করে কান্নাকাটি করেছে তুমি নাকি বলেছো তুমি কিছু করতে পারবে না।
সুমন কিছুটা বিরক্তী নিয়ে বললো,
-সকাল থেকে এক কথা বলে বলে হাপিয়ে গেছি তোমাকে আর বলতে পারবো না।
-আমার প্রতিই তো তোমার সব বিরক্ত।
-ও বাড়ি থেকে আমরা চলে এসেছি এখন তারা কেনো ফোন করে?
মায়া খাবার ফ্রিজে রাখতে রাখতে বললো,
-জানিনা তুমি গিয়ে জিগ্যেস করো এখন।
বিকেলে সবাই মিলে সেঝো ভাবিকে দেখতে গেলো। আসার সময় দেখা হলো সেঝো ভাইয়ের সাথে। সে বোঝালেন এই বউ সে আর কখনো গ্রহন করবেনা। কালো ভালো কিন্তু চরিত্রহীন ভালো না।
সুমন কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে আসলো।
কেটে গলো একটা বছর।__________________
সেইদিনের পর থেকে সংসার এলোমেলো। আকবরকে এখনো জেল থেকে বের করা যায়নি। সুমনের সেঝো ভাইও একটু অন্য রকম হয়ে গেছে চাকরিটা আর নেই। সারাদিন বাড়ি বসে থাকে। ওদিকে সংসার খরচ দেওয়ার মতোও কেউ নেই। সুমন গিয়ে তার বাবা মা কে বলে এসেছে,
-তোমরা আমার প্রতি অবিচার করলেও আমি করবো না। তোমাদের সব খরচ আমি মাস শেষে দিয়ে যাবো।
সুমনের বাবা একবার বলেছিলো বউ নিয়ে বাড়ি ফিরতে। কিন্তু তার কথা সুমন তাচ্ছিল্যের হাসিতে উড়িয়েছে।
মায়া আর আয়শারা একসাথেই থাকে। রিফাত বিদেশের মাটিতে পারি দিয়েছে আবার। আয়শার কিছু দিন পর বেবী হবে।
মায়া সব সময় এখনো ভাবে একটা সপ্নের সংসারের কথা। যা সে বিয়ের আগে কল্পনায় গুছিয়েছিলো। আর বিয়ের পর ওই বাড়ি গিয়ে দেখেছিলো। কিন্তু সবার হিংসা আর বিষাদের কারণে তার সংসার গড়া হলো না আর। #মায়ার_সংসার মায়ার কল্পনাতেই আবধ্য রইলো।
সমাপ্ত
ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। শেষের পর্বে আসলে কি লিখলাম নিজেও জানিনা। চারদিন পর গল্প দেওয়ায় আপনাদের যেসব মন্তব্য আমি দেখলাম। একজন ছোট খুদে লেখিকা হিসেবে আমার আর কিছু বলার নেই। হতে পারতো সৃষ্টিকর্তা না করুক আমি চলে যেতাম না ফেরার দেশে। তখন কী গল্প গল্প করে আমাকে গালা*গাল করতেন? যারা গালা*গাল করলেন তাদের কিছু বলার নেই। ভালো থাকবেন সবাই সুস্থ থাকবেন। আবার আসবো পরবর্তী গল্প নিয়ে। @সবাই
