#কলঙ্কিনী (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
এই কথা প্রতিবেশীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না। আমার শাশুড়ী জনে জনে পুরো এলাকায় বলতে লাগলেন। সরাসরি চরিত্রে দোষ দেওয়া নয়। এভাবে বলতেন, যে আমি ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলতাম। ঘনিষ্ঠ কিছু দেখেছে, সেটা নিয়ে রাতুলের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে আমার ঝগড়া হচ্ছে। তার মাঝে আমি গর্ভবতী, তাই তার ছেলের সন্দেহ হচ্ছে। এসব কথা শুনে আমি একদম হতবাক হয়ে যাই। সপ্তাহ খানেকের মাঝে বুঝতে পারি, এসব তাদের পূর্ব পরিকল্পনা। গ্রামে আমি কলঙ্কিনী হিসাবে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছি। আমাকে হাতেনাতে ধরার পরও আমার স্বামী ক্ষমা করেছে। সে এতটা ভালো মানুষ। অবশ্য কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেছে, সত্যি রাতুল ভালো মানুষ। আর তালি কি এক হাতে বাজে? তার মাঝে শাশুড়ী তার বিধবা অসহায় বউকে ঘর ছাড়া করতে চান না। তাই রাতুলের সঙ্গে বিয়ের কথা তোলেন। এলাকার গন্য মান্য ব্যক্তির কাছে পরামর্শ নেন। হাদিস কালাম শুরু করে দেন। এখানে পারিবারিক ভাবে সুষ্ঠু এক বিয়ের কথা ওঠে। যার মাঝে চাপা পড়ে যায় দেবর ভাবীর নোংরামি।
এটাই তাদের পরিকল্পনা ছিলো। রাতুলের কথা সে দুই বউ রাখতে পারবে। তাছাড়া আমি তাকে ঠকিয়েছি। বাচ্চাটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সেজন্য আমাকে ঘরে রাখাটাই বেশি। এই অবস্থায় আমার উপর ঘৃণা থেকে অন্যত্র মুখ না দিয়ে, বিয়ে করে এখানেই থাকুক। বিধবা বউটারও একটা গতি হোক। এভাবেই ঘটনা প্রচার হয়। যার ফলে অনেকেই এটা ভালো সিদ্ধান্ত বলে জানান।
আমি এসব ঘটনায় পুরোপুরি ভেঙে পড়ি। আমি অনেকবার চেষ্টা করছিলাম সবার কাছে যেতে। এসব মিথ্যা, আমার নামে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে জানাতে। কিন্তু লাভ হয়নি। আমি পারিনি। আমাকে সবাই ঘরবন্দী করে রাখে। সবার নজরে। রাতুল তো হুমকি দিয়ে বলেই দিয়েছে,“যদি ঘরের বাইরে যাস বা কারো সঙ্গে কথা বলিস তবে তোর জায়গা এই বাড়ির বাহিরে হবে মনে রাখিস।”
আমার পরিবারকে এনেও বিচার দেওয়া হলো। আমার নামে একের পর এক অপবাদ দিলো। তো এমন অবস্থায় আমার বাবা, মায়ের কাছে জানতে চায় আমাকে তারা নিয়ে যাবে কি-না। বাবা, মা রাজি হয় না। তারাই অভাবে দিন কাটায়। সেখানে আমি বাড়তি ঝামেলা। এখানে যে আমাকে নিয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে তা বুঝেও তারা চুপ থাকে। শুধু তাই নয় আমার নিজের মা আমাকে বোঝাতে আসে,“যা হয়েছে মেনে নে। জামাই বলেছে সে দু'ই বউয়ের দায়িত্ব পালণ করবে। তাই বিয়েটা মেনে নে। ঝামেলা করিস না। তুই ঝামেলা না করলে আর এসব ছড়াবে না।”
“যা ছড়ানোর তা তো ছড়িয়ে ফেলেছে মা।
আর সত্যি সব মেনে নেওয়া যায় মা? এসব মানা যায়?”
আমি অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকাই। মা মাথা নিচু করে নেয়। তার চোখ দিয়ে পানি পড়লো যেন। মা নিজেকে সামলে বলে,“তুই তাদের বিয়েতে বাঁধা দিতে পারিস। এই ভয়েই আগেবাগে তোকে কলঙ্কিনী বানিয়ে ফেললো, যাতে পরে সামাল দেওয়া যায়। এসব না মেনে কি বা করবি? আমাদের অবস্থা তো জানিস। তোকে নিয়ে জায়গা দেবার মতো তো একটা ঘর নাই। সঙ্গে তোর পেটের বাচ্চা। আমাদের সেই সার্মথ্য আছে দুজনের দায়িত্ব নেওয়ার। যদি থাকতো তবে তো মানাতে বলতাম না।”
একটু থেমে মা আবার বলে,“কপালে যা লেখা আছে তাই হবে মা। কেউ তো কপালের লেখা ফেরাতে পারে না।”
আমি কোন কথা বললাম না। শুধু চুপচাপ শুনলাম। আসলে বলার মতো ভাষা বা শক্তি কোনটাই পাচ্ছিলাম না। আমি আমার হৃদয়ের অনুভূতি কাউকে বোঝাতে পারছিলাম না। এটা বোঝানো সম্ভবও নয়। আর হয়তো কেউ আমার হৃদয়ের কথা শোনার মতো নেই। গরিবের কথা কে বা শুনবে?
____
ঘরোয়া ভাবে রাতুল এবং ভাবীর বিয়ে হবে। এসব আলোচনা চলছিলো। তাদের আলোচনার মাঝে আমি নেই। তবে এটা দেখলাম আমার শাশুড়ী মা এক জোড়া কানের দুল, সোনার চেইন আর হাতের বালা বের করে বড় ভাবীকে দিলেন। দেবার সময় বললেন,“তোমাকে তো বিয়ের সময় সব দেওয়া হয়েছিলো। এগুলো রাখছিলাম রাতুলের বউয়ের জন্য। কিন্তু ওর কপালে যে বউ জুটছে। বাবার বাড়ি দিয়ে এক আনা সোনার কিছু দেয়নি। তাই রাগেই দেইনি তাকে। এখন যেহেতু তুমি রাতুলের বউ হচ্ছো, সেহেতু এগুলো তোমার।”
না শাশুড়ী মায়ের কথা শুনে আমি কষ্ট পাইনি। না রাগ হয়েছিলো। এসব জিনিসের প্রতি আমার কোন লোভ নেই। না আকাঙ্খা আছে। আমি যেমন ঘরের মেয়ে তেমনই চাওয়া পাওয়া ছিলো। শুধু স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। দু'বেলা দু'মুঠো খেয়ে পড়ে দিনশেষে স্বামীর বুকে মাথা রেখে শান্তির ঘুম দেবার স্বপ্ন ছিলো। ব্যাস এতটুকুই চাহিদা। কিন্তু সেটাও পূরণ হলো না। সব শেষ।
সামনের শুক্রবার তাদের বিয়ে। এই কথাটা যতবার মনে পড়ছে ততবারই চোখের পানি ফেলছি। বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে অনেকবার মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। আবারও বেহায়ার মতো রাতুলের কাছে গেলাম। তার পা জড়িয়ে বললাম,”আমাকে এমন দমবন্ধকর পরিস্থিতে ফেলো না রাতুল। আমি তোমায় ভীষণ ভালোবাসি। আমি পারছি না এসব সহ্য করতে। দয়া করে এসব বন্ধ করো।”
রাতুল একটা গালি দিয়ে পা ছাড়িয়ে নেয়। আমি অসহায় গলায় বলি,”আচ্ছা সে কি তোমাকে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসে? তার মাঝে কি রয়েছে যা আমার নেই?”
“হ্যাঁ তোরচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
তোর মতো ন্যাকী কান্না কাঁদে না। সে সবসময় হাসিখুশি থাকে। আমি এমন মেয়েই পছন্দ করি।”
আমি রাতুলের কথায় পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেলাম। এক আকাশ সমান দুঃখ দিয়ে বলছে কাঁদতে মানা। কাঁদলে তার ভালো লাগে না। পছন্দ নয় এমন কাঁদুনি মেয়ে। অথচ সব চোখের পানি তার নামেই বিসর্জন হয়। এতকিছুর পরও আমি তাকে বারবার অনুরোধ করছিলাম এসব না করতে। এই বিয়েটা ভেঙে দিতে। কিন্তু রাজি হয়নি।
আমি ভাবীর কাছেও গেলাম। ভাবী কথা শুনলো না। শাশুড়ী মায়ের পা ধরলাম। ননদকে বললাম। না কেউ আমার কথা শোনেনি। সবার এক কথা, তোমাকে অবহেলা করা হবে না। দু’বেলা দু’মুঠো ভাত দেওয়া হবে। খেয়েপড়ে বেশ থাকবে। রাতুলের যোগ্যতা রয়েছে দুই বউয়ের ভরনপোষণের দায়িত্ব নেওয়া। আমি হতাশ হয়ে গেলাম। আচ্ছা বিয়ের হয়ে আসা মানেই কি একটা বউ শুধু ভাত কাপড় চায়? এটাই তার চাহিদা? সবার নাহলেও আমার বোধহয়। আমাদের মতো গরিবের পেটে ভাত পড়াই বড় ব্যাপার। সেটাই ধরে নিয়েছে সবাই। সেটাই মেনে নিয়েছে। আমিও তাই মেনে নিলাম। তবে এবার আর মানুষ হয়ে মানলাম না। অমানুষ হয়ে মানলাম। হ্যাঁ পরিবেশেষে এসব সহ্য করতে না পেরে আমি আমার মধ্যে থাকা অমানুষটাকে জাগিয়ে তুললাম। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই তো ভালো খারাপ দু’টো দিকই থাকে। আমি এবার আমার সেই খারাপ সত্ত্বাকে জাগ্রত করলাম।
বৃহস্পতিবারের রাত,
সব খাবার গরম করে সবাইকে খেতে ডাকলাম। কেউ এত তাড়াতাড়ি খেতে চাচ্ছিলো না। আগামীকাল যে বিয়ে। এটা নিয়ে সবাই খুশি। না বাড়িতে তেমন কোন আত্মীয় নেই। শুধু ননদ রয়েছে। ননদের দু’টো বাচ্চা। তারাই এসেছে। আর কেউ না। কাউকে বলা হয়নি। শুধু ভাবীর পরিবারকে শুক্রবার দুপুরে আসতে বলা হয়েছে। আর আছর বাদ বিয়ে হবে তখন দুই একজন লোক। এছাড়া কোন লোক না। ঐ যে বললাম ঘরোয়াভাবে বিয়ে হবে। তবে বিয়ে হচ্ছে তো। এটা নিয়ে তো অনেক আলোচনা। সেই আলোচনার জন্যই এত তাড়াতাড়ি খেতে চায়নি। আমি খাবার গরম করায় বাধ্য হয়ে আসলো। হয়তো বা আমার সঙ্গে আজ তর্ক করে কোন ঝামেলা বাঁধাতে চায়নি তাই রাগ না দেখিয়ে বাধ্য হয়ে এসেছে। হবে হয়তো। তবে খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই ঘুমাতে চলে যায়। আর আলোচনা করে। কারণ তাদের সবার ঘুম পেয়েছে।
শাশুড়ী মায়ের ঘুমের সমস্যা ছিলো। ঘুম হতো না। তাই ডাক্তার তাকে সবসময় ঘুমের ঔষধ সাজেস্ট করতো। রোজ একটা করে খেতো। তবে রাতুল খুব ভালো ছেলে। তাই সবসময় বেশি বেশি নিয়ে আসতো। মায়ের জন্য এটা করাই যায়। তাই তো একসাথে দশ পাতার একটা বক্স নিয়ে আসতো। প্রতি পাতায় দশটা করে ট্যাবলেট থাকতো। দেখলাম সব শেষ হয়নি। চার পাতা রয়ে গেছে। পুরো চার পাতাই খাবারে দিয়ে দিলাম। এত বেশি দেওয়া ঘুম তো আসবেই। বাচ্চারা অবশ্য খাবার খাওয়ার আগেই ঘুমিয়েছে। তাদের ঘুমের ঔষধ খাওয়ানোর পরিকল্পনা আমার ছিলোও না। সে যাক, সবাই ঘুমিয়ে যায়।
তখন রাত দেড়টা হবে। আমি রিমি এবং ননদের বাচ্চা দু'টোকে কোলে করে বাহিরে নিয়ে আসলাম। তাদের বাহিরে উঠানে শুইয়ে দিলাম। অতঃপর ঘরের মধ্য থেকে ভাবীর সমস্ত গহনা, ননদের গহনা, বিয়েতে খরচ করার জন্য রাতুলের রাখা লাখ খানেক টাকা নিয়ে বাহিরে আসলাম। আসার আগে অবশ্য পুরো ঘরে ক্যারোসিন ছিটিয়ে দিয়েছি। অতঃপর সব শেষ। নিস্তব্ধ রাতে ঘুমন্ত এলাকা বাসীর অগোচরে একটা বাড়ি পুড়ে শেষ হয়ে গেলো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো বাড়িটা। বাড়ির ভেতরে চার চারটা মানুষ ঘুমের মধ্যেই জ্বলে পুড়ে শেষ। একজনের অবশ্য ঘুম ভাঙছিলো, তবে কাউকে ডাকার মতো অবস্থায় ছিলো না। বড্ড পাওয়ার যে ঔষধে। এভাবেই জ্বলেপুড়ে শেষ হলো রাতুল, তার মা, তার ভাবী, তার বোন। তাদের সেই পোড়া দেহের উপরে আমি আমার কলঙ্কের গল্প লিখেছি। না মিথ্যে নয়। সত্যিকারের গল্প। চরিত্রহীনা বলে যে মিথ্যে কলঙ্কের দাগ লাগানো হয়েছিলো শরীরে, আমি আমার সেই শরীরে কলঙ্কের দাগ লাগিয়েছি। মিথ্যে দাগ নিয়ে কেনই বা পুড়বো? তারচেয়ে কিছুটা সত্যি হোক। খবরের পাতাও আমার নাম আসুক। সবাই জানুক এক গৃহবধূ চার চারটা খু ন করে পালিয়ে গিয়েছে। তার শরীরে খু নি নামক দাগটা লেগেছে। অন্তত চরিত্রের দাগের চেয়ে তো এটা ভালো। হয়তো এই দাগটা চরিত্রের দাগটা সবার স্মৃতি থেকে মুছে দিবে। আমার বাচ্চার বাপ কে এই প্রশ্নটা আসার আগে তাদের মাথায় আসবে আমি চারটা খু ন করা এক আসামি। এই দাগটা তো খারাপ নয়। যাক সেসব, পাপ করলে তার শা স্তি পেতে হয়। তবে আমার খারাপ সত্তা সেসবের ভয় না পেয়েই অজানার উদ্দেশ্য এগিয়ে চলে। হাতে তো কিছু টাকা, গহনা রয়েছে। ধরা না পড়া অবধি আমি আর আমার পেটেরটা চালিয়ে নিবো কিছুদিন। এই ভাবনা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। অচেনা অজানার উদ্দেশ্য। ওদিকে অবশ্য এতক্ষণে আগুনের খবর সবাই পেয়েছে। আগুন বন্ধ করার ব্যবস্থাও করেছে। রিমি এবং ননদের বাচ্চা দু’টো বড্ড কাঁদছে। আমি সেসব ভাবার মুডে নেই। আমি তো শুধু আমার কথা ভাবছি। আমার বাচ্চার কথা ভাবছি। আমরা দু’জনেই তো এখন হাসছি। এ এক অন্যরকম আনন্দের হাসি। হয়তো শয় তানী হাসি। তবে তৃপ্তির।
(সমাপ্ত)
(কেমন হলো)
