#টিট_ফর_ট্যাট|০৩|

#ইশরাত_জাহান(রাতপাখি)

🦋

টিয়ার জন্য লেমনেড অর্ডার করে আবার নিজ স্থানে বসে ফুয়াদ।লোকটা দেখতে একদমই সুদর্শন না।মাথায় চুল আছে কিন্ত না থাকার মত। গোল ফ্রেমের চশমা।যার নেই কোনো স্টাইল।মোটাসোটা আছে লোকটা।গ্রাজুয়েট করে চাকরি পেয়েছে।এটার জন্যই আনিকার পরিবার বিয়ে দিতে রাজি।এটা ভাবলে একদমই ভুল হবে।ফুয়াদ লোকটা যথেষ্ঠ ভালো মনের।এমন তো কথা নেই যে পৃথিবীর সব পুরুষকে বডি বিল্ডার হ্যান্ডসাম হতে হবে।কেন আল্লাহর সৃষ্টিকে অবহেলা করতে হবে?এই ফুয়াদ একদিন মাটির নিচে চাপা থাকবে।পৃথিবীর কৃতকর্মের হিসাব দিবে আল্লাহর কাছে।ঠিক তেমনি ফাহিমও।তাকেও যেতে হবে।হিসাব দিতে হবে কর্মের।কর্মফল ভোগ করতে হবে।এমন করে সবাইকে।অথচ পৃথিবীতে আমরা মানুষ বিচার করি রূপ আর খুব প্রয়োজনীয় হিসেবে অর্থ সম্পদ দিয়ে।কেউ খুববেশি একটা মন দেখে না।দেখেছিলো তো।টিয়া দেখেছিলো।ফাহিম যখন টিয়ার পিছনে লাগে টিয়া তো পাত্তা দিতো না।টিয়া চাইতো এসব সুদর্শন যুবক না তার চাই ভালো মনের একজনকে।যে তাকে তার বাবার মতোই রাজকন্যা করে রাখবে।কেন জানেনা টিয়া এক সময় ফাহিমের মাঝে এমন এক পুরুষকে দেখলো যাকে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখতো।এমন পুরুষ যে পরিবর্তন হয়ে যাবে এটা অকল্পনীয়।সেই সাথে আনিকা। আহা কি সুন্দর গা ঘেষে দোস্ত বলে আহ্লাদী কথা।টিয়া ছাড়া যেনো কিছুই বুঝতে পারেনা।এখন তারা দুজনেই টিয়ার জীবনকে শেষ করতে চাইলো।লেমনেড আসার পর টেবিলের উপর একটা শব্দ হয়।টেবিলের উপর গ্লাস রাখতেই শব্দটা হওয়া আর কি।টিয়া আর ফুয়াদ দুজন দুজনের দিকে চোখ রাখলো।দুজনে যেনো অন্য ভাবনায় ছিলো।এখন ভাবনার ছেদ পড়ে।দুজনেই মুচকি হেসে চোখ সরিয়ে নেয়। টিয়া লেমনেড নিয়ে ফুয়াদের উদ্দেশ্য করে বলে,"আনিকাকে আপনি খুব ভালোবাসেন।তাই না ভাইয়া?


ফুয়াদ মৃদু হেসে মাথা নিচু করে। নীরবে জানিয়ে দিলো হ্যাঁ ভালোবাসে সে।আনিকা লেমনেড নিয়ে হতাশ হওয়ার নিশ্বাস নেয়।


"কবে বিয়ে করছেন আপনারা?"


"পরশু।"


"কার্ড দিলেন না যে।আমি কি ইনভাইটেড না?"


"এমা এমনটা একদমই না।আসলে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করবো না তাই।"


"আনিকার তো স্বপ্ন অনুষ্ঠান করে বিয়ে করা।ঠিক যেভাবে আমি করেছিলাম।"


ফুয়াদ মুখটা এমন করলো যেন তার মনটা খারাপ।আসলেই তো তাই।এত টাকার মালিক সে না যে অনুষ্ঠান করবে।ফুয়াদের চাহনি দেখে টিয়া বলে,"আহামরি অনুষ্ঠান না হোক।ছোটখাটো একটা পার্টি আমরা ফেন্ডজোন মিলে রাখতেই পারি।অল্প কয়েকজন বান্ধবী মিলে নিজেদের মত কনের অনুষ্ঠান এই যেমন ব্রাইড শাওয়ার,মেহেদী,হলুদ এগুলো।ঘরোয়াভাবে করলাম নাহয়। আপনার আপত্তি আছে?"


ফুয়াদ ভাবলো কিছুক্ষণ।টিয়া শান্তনা দিয়ে বলে,"আমরা ফ্রেন্ডস মিলে করবো। মানে আমাদের তরফ থেকে মিনি পার্টি হবে।আনিকার মনটাও ভালো হবে এতে।আমরা সকল ফ্রেন্ডস এটা ওকে সারপ্রাইজ দিতে চাই।প্লীজ ভাইয়া না করবেন না।এটা আমাদের রিকুয়েস্ট।"


ফুয়াদ অবশেষে সম্মতি দিলো।টিয়া খুশি হয়ে ফোন বের করে গ্রুপে ম্যাসেজ দিলো।গ্রুপটিতে আনিকা ব্যতীত সকলেই আছে।সবাই অবশ্য আগে থেকেই প্ল্যান করেছিলো।এই তো সেদিন প্ল্যান করেই নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়েতে ধুমধাম অনুষ্ঠানের একটা লিস্ট করেছিলো।আনিকা ছাড়া সবাই ছিলো সেখানে। এদের লিডার হিসেবে আছে টিয়া।আনিকার সুখের কথা সেও ভাবে।সেদিন ওরা এমাউন্ট ও বাকি সবকিছু ঠিক করে একেকজন একেকজনের বাড়ির দিকে যায়।নিজের বাড়ির দিকে আসতে নিয়েই টিয়া তার জীবনের সবথেকে নিকৃষ্ঠ মুহূর্তের সম্মুখীন হয়।যেখানে টিয়া ব্যাস্ত ছিল আনিকার একটা সংসার গড়ার সূচনায় সারপ্রাইজ দিয়ে খুশী করতে,সেখানে আনিকা কিনা টিয়ার স্বামীকে নিয়ে নোংরা খেলায় মেতে ছিলো।কেউ কি ভাবতে পারে তার জীবনের এই রকম পরিস্থিতি দেখা দিবে?কেউই ভাববে না।তবুও এমন পরিস্থিতি আসে।


"তাহলে তুমি চাইছো আনিকাকে ওর বিয়েতে হেনস্থা করতে?"


ডিভোর্স স্পেশালিস্ট নাজিয়া আনজুমান কথাটি বলতেই টিয়া চোখ তুলে তাকালো।ফুয়াদের ওখান থেকে সোজা এখানেই এসেছে টিয়া।তার কাছেই সবকিছু বলে।ফাহিমের নামে মামলা করেছে।উকিল রেডি রাখবে এখন।যেনো ফাহিম বেশি লাফাতে না পারে।বোয়াল মাছ লাফানোর আগে তার ঘাড়ে বাড়ি মারতে হয়।তবেই সে দুর্বল হবে।টিয়া মৃদু হেসে বলে,"হ্যাঁ।কারণ আমাদের আইন একটু নড়বড়ে।পরকীয়ায় শাস্তি শুধু পুরুষ পায়।মেয়েদের শাস্তিস্বরূপ আইন এখনও বের হয়নি।যদি বের হতো তাহলে এত কাঠখড় পোহাতাম না। সোজা দুটোকে জেলের ভাত খাইয়ে দিতাম।"


"এতটা এগিয়ে যদি আনিকার আসল রূপ প্রকাশ করো তাহলে জনসম্মুখে ফুয়াদের একটা অপমান হবেনা?"


"আপনি উকিল তবুও কেন বাচ্চামো কথা বলছেন বলুন তো?"


"মাঝে মাঝে উকিলও বাচ্চামো করে।কারণ আমরাও তো মানুষ।"


"ফুয়াদ ভাইয়া অপমান হবেনা বরং সে জীবনটাকে বুঝবে। সেই সাথে ফুয়াদ ভাইকে দেখে সব পুরুষ বুঝবে নারীকে পেলে দমে থাকতে নয় কঠিনও হতে হয়।ফুয়াদ ভাইয়া যেভাবে শান্ত স্বভাবের এতটাও শান্ত হওয়াটা জরুরি নয়।আমি জানি আমার আগেই জানিয়ে দেওয়া উচিত।কিন্তু আমি যতটুকু দেখেছি ফুয়াদ ভাই আনিকাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে।সেই বিশ্বাস আমার চারটে কথাতে ভাঙ্গবে না। আর এমনিতেও আমি যদি আগে সব বলে দেই বিয়ে ভেঙ্গে গেলেও সবার মাঝে সন্দেহ সৃষ্টি হবে।এই সন্দেহ থেকে ওরা সতর্ক হবে।তাই এইটুকু পরিস্থিতি ফুয়াদ ভাইয়াকে ফেস করতেই হবে।সেও জীবনকে সাজাতে পারবে তাহলে।বেদনা শুধু নারীর মনে না পুরুষের মনেও হয়।রাতের আধারে কান্না করতে শুধু নারী না পুরুষেরাও পারে।"


"আমি তোমার পয়েন্ট বুঝতে পারছি।সব শুনে তোমার ডিভোর্স দেওয়াতে আমি সমর্থন করি।তোমার ইনফরমেশন আর ফাহিমের ইনফরমেশন দেও।আমি পেপার রেডি করে দিচ্ছি।"


"কতদিন সময় লাগবে?"


"একটু কমই সময় লাগবে কারণ আমাকে পাঁচদিন পরেই সিলেট যেতে হবে।"


"ঘুরতে?"


"উহু,ওখানেই সেটেল হতে।ঢাকা শহরে আমি এসেছি সাতাশ বছর হবে।এর আগে ওখানেই আমার সংসার ছিল।"


"এখন নেই।"


"না।"


"কি হয়েছে?"


"কোনো এক না দুজন প্রতারকের পাল্লায় পড়ে আমারও ডিভোর্স হয়।ঠিক তোমার মতই।স্বামী আর নিজের প্রিয় বান্ধবী।আমার অবশ্য একটু তফাৎ ছিলো।আমি আমার সেই বান্ধবীকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলাম কয়েকদিনের জন্য।সে যে উপকারের প্রতিদান এটা দিবে বুঝতে পারিনি।"


"ওকালতি?"


"আমি ওকালতি নিয়েই পড়তাম।পড়ার মাঝে আমি মা হবার খবর পাই।সেও খুশি ছিলো।বান্ধবী তো নাচতে নাচতে আমার স্বামীকে আকর্ষিত করে নিলো।ডেলিভারির দিন জানতে পারলাম আমার সন্তান মারা গেছে।কারণ আমি অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিতে পারিনি।এরপর তালাক দিয়ে চলে আসি।"


"শাস্তি দেননি তাদের?"


"দেওয়া হয়নি।মানসিক অবস্থা খারাপ ছিল।কি করবো না করবো মাথায় কাজ করতো না।বাবা অনেক কষ্টে সামলায় আমাকে।ওনাকে তালাক দেওয়ার পর দুইমাস আমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম।চোখের সামনে দুজনের বিভৎস দৃশ্য ফুটে উঠতো।মাঝরাতে মোটা পেটটা নিয়ে যখন পাশের ঘরে যাই সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারিনি।"


"আপনি সশরীরে ওদেরকে দেখেছিলেন।ভাগ্য ভালো আমি শুধু বাইরে থেকে দেখেছি।"


"আমি ওদের কখনও ক্ষমা করতে পারব না।"


"ক্ষমা করাও উচিত না।ওদেরকে শাস্তি দেওয়ার কথা কি পরে ভাবেননি?"


"ভেবেছিলাম আমি কিন্তু দেরি করি।ওই যে বললাম অনেক ভেঙ্গে পড়ি।স্বামী ও প্রিয় বান্ধবীর নোংরামি।বাচ্চা মারা যাওয়া।তাকে একবার ছুঁয়ে আদর করতে পারলাম না।আমার শাশুরি আমার পক্ষে ছিলেন।তিনি তার ছেলেকে ত্যাগ করে সমস্ত সম্পত্তি আমার নামে করে দেন।আমি নেইনি বরং সেখানে আশ্রম করেছি।আশ্রমের সবাই আমাকে খুব মিস করে।ওদেরকে দেখতেই যাবো সেই সাথে সেখানে থাকবো ভাবছি।এখানে নিজেকে একা লাগে খুব।আর একা জীবন কাটাতে পারিনা।এবার একটু সঙ্গী প্রয়োজন।উহু জীবন সঙ্গী না পথে দেখা হবার সাথে মুখে হাসি রেখে গল্প করার জন্য।"


"আপনি এরপর বিয়ে করেননি?"


"না,কোনোদিন পারবো না তাই মুভ অন করিনি।"


টিয়ার চোখ বেয়ে পানি পড়লো।মানুষটা কতটা স্ট্রং হয়েছে বুঝতে পারলো এখন।


চলবে...?

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url