#টিট_ফর_ট্যাট|০২|

#ইশরাত_জাহান(রাতপাখি)

🦋

বাসায় এসে টিয়া কিছুক্ষণ ধরে চোখের উপর হাত রেখে ইজি চেয়ারে বসে চিন্তাধারায় মন রাখলো।একেকটা প্ল্যান সাজালো আবারও সেটা বদলালো।কারণ কিছু সময় শাস্তি দিতে গেলেও তাতে ব্যাঘাত ঘটবে।মুদ্রার যেমন দুইপিঠ একটা সম্পর্কের মাঝে স্বামী স্ত্রীর ঠিক তেমন দুটো অবদান রাখে।একটু ভেবে ফোনে নোট করতে বসলো।ফাহিম তাকে কি কি দিতে খুশি রাখছে আর সে ফাহিমকে কি কি দিয়ে।আজকের হিসাব টিয়া করতো না যদি এটা বিচ্ছেদে পরিণত না হতো।একটা নারীকে চোখ কান খোলা রেখেই জীবনের লম্বা রাস্তাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়।ফাহিমের মত স্বামী কপালে জুটলে নারীর জীবন হয়ে যায় মরুভূমির মত জলশূন্য।শুকনো এলাকায় গাছবিহীন পরিবেশ।টিয়া নোট করার মাঝে চোখ মুছেছে অজস্রবার।নিয়তি কি এটাই ছিল?মানতে যে খুব কষ্ট।স্বামী কেন এমন হয়?কেন সে নিজ বউকে নিয়ে খুশি না?স্বামীর দিক বুঝতে পারছে না এর মধ্যে আবার নিজেরই বেস্ট ফ্রেন্ড।কিভাবে নারী হয়ে নারীর সংসার চুরমার করে?এই নারীদের মন এমন কেন?এরা কি নিজেদের জন্য একটা সংসার গড়ে সুখে জীবন পার করার সিদ্ধান্ত নিতে জানেনা?কেন তাদের অন্যের স্বামীর দিকেই চোখ রাখতে হবে?পৃথিবীতে তো ছেলেদের অভাব নেই।তবুও কেন অন্যের স্বামীর প্রতি টান?ভাবতে গিয়ে ওই দুটো মানব মানবীর উপর ঘৃণায় মাথা চাড়া দিচ্ছে।গলা শুকিয়ে আসছে।চোখের পানি বাড়তে থাকে।দুজনকে খুন করার মত ইচ্ছাশক্তি জাগ্রত হয়।অনেক ভেবে কিছু একটা খুঁজে পেলো।ডায়াল করলো বাবার কাছে।তারিফ হাসান ধরলেন,"কেমন আছিস মা?"


"একটু আগেও ভালো ছিলাম বাবা।এখন ভালো নেই।"


বাবার বুকটা ধক করে উঠল মেয়ের এমন কথা শুনে।যাকে ভালোবাসে তার সাথেই তো বিয়ে দেওয়া।তাও কেন ভালো নেই মেয়ে?


"কি হয়েছে তোর?"


"বাবা ফাহিম আমাকে...


থেমে গেলো টিয়া।আটকে আসছে গলা। তারিফ হাসান আবারও জিজ্ঞাসা করলেন,"কি হলো?"


"ঠকিয়েছে বাবা।ও একটা নোংরা লোক।ভালোবাসার অভিনয় করে আমার সাথে।একই ছাদের নিচে একসাথে ঘর বেঁধে তার মন মানে না।এখন অন্য নারীর সাথেও সম্পর্ক।"


বলতে গিয়ে যে কতবার টিয়ার গলা আটকে আসলো এটা ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে বুঝতে পারে তারিফ হাসান।মেয়ের কষ্ট সহ্য করা বড় দায়।ছোট থেকে বড় করা মেয়ে তার।আদরে আদরে রেখেছে।চোখের পানি ফেলার সুযোগ দেয়নি কখনও।আজকে মেয়ে কান্না করছে।তাও কিনা যাকে বিশ্বাস করে মেয়েকে বিদায় দিলো।বাবারা তো তার হাতেই মেয়েকে তুলে দেয় যার হাতটা মেয়ের জন্য বিশ্বস্ত দেখে।তাও কিনা বুঝতে বা মানুষ চিনতে অসুবিধা হলো!


"তুই শান্ত হ মা।আমি আসছি তোর কাছে।ওই জানোয়ারকে আমি শায়েস্তা করবো।জেলের ভাত খাওয়াবো।আমার মেয়েকে ঠকায়।"


টিয়া বাঁধা দিয়ে বলে,"না বাবা এমন করো না।"


ভ্রু কুঁচকে রাগ দেখিয়ে তারিফ হাসান বলেন,"বাংলা সিনেমার হিরোইন হতে চাইছো?স্বামী অত্যাচারী হলেও সহ্য করে সংসার করবে এমন?"


"মোটেই না।বরং আমি ওদেরকে শাস্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিবো ওরা ঠিক কি করেছে আমার সাথে।"


"কিছু ভেবে রেখেছো?"


"হ্যাঁ।প্রমাণ জোগাড় করেছি কিন্তু ওদের শুধু জেলের ভাত খাওয়ালে আমার শান্তি নেই।ওদেরকে আমি টিট ফর ট্যাট দিবো।"


"আমি তোমার পাশে আছি।কখন কি করা লাগবে জানিয়ে দিও।"


"হুম।"


ফোন রাখলো টিয়া।আয়নার সামনে তাকিয়ে নিজেকে দেখে চোখের পানি মুছে নেয়।আলমারি থেকে দামী শাড়ি বের করে নিজেকে দেখছে।আয়নায় নিজেকে দেখে বলে,"সুখ যখন আমাকে তোমরা দিবে না সুখে থাকতে তো আমিও তোমাদের দিবো না।"


ফাহিমের ছবির দিকে চোখ রেখে বলে,"বড্ড জ্বালা হয় যখন নিজের স্বামীকে অন্য নারীর সাথে দেখা যায়।মন তো চায় করে দেই খুন কিন্তু খুন করলেই কি এই কর্মের ফল পাবে? উহু।তোমাদের মত মানুষকে সমাজের সামনে চুনকালি মাখিয়ে তারপর শেষ করে দিতে হবে।"


শাড়ি পরে নিজেকে পরিপাটি করলো টিয়া।চোখে টানা কালো কাজল দিয়ে ঠোঁটে নুড কালারের লিপস্টিক।এটাই আজকাল চলে মেয়ের সাজের সৌন্দর্য হিসেবে।হাতে হ্যান্ডবাগ নিয়ে ফোনে লোকেশন ট্রাক করে বের হলো।নিজস্ব গাড়ির কাছে আসতেই ড্রাইভার বলে,"গাড়িতে যাবেন আপা?"


"হ্যাঁ কিন্তু আপনাকে যেতে হবেনা।আমি ড্রাইভ করবো।"


"স্যার নেই আপনি একটা গাড়ি চালাবেন?"


"আপনার স্যার থাকলে কি করতো?"


ড্রাইভার মাথা চুলকিয়ে কিছু ভেবে বলে,"আপনাকে দেখে রাখতো।আজকাল ছিনতাইকারী অনেক।রাস্তাঘাট ভালো না।মেয়েদের জন্য বাবা বা স্বামী থাকলেই সুবিধা।স্বামীরা সুরক্ষা দিতে জানে।"


টিয়া হাসলো।হাসিটা কেমন যেনো টিটকিরি ইঙ্গিত দিলো।"যেখানে স্বামীর ঠিক ঠিকানা নেই সেখানে আমার সুরক্ষা!"


"কিছু বললেন ম্যাম?"


"কিছু না।আমি নিজের ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে মেটাতে জানি।অসুবিধা হবেনা আমার।"


বলেই হাত বাড়ালো টিয়া।ড্রাইভার চাবি দিতেই নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে।সামনে চোখ রেখে বলে,"ফিরতে রাত হবে আমার।তোমার স্যার আসলে তাকে জানাবে আমি আজ মুক্ত আকাশে উড়ন্ত পাখির মতো ছুটতে বেড়িয়েছি।"


"আচ্ছা।"


ভয়তে বলল ড্রাইভার।এটাই তো স্বাভাবিক।একা মেয়ে এতদিন রিক্সায় করে এই কাছাকাছি কোথাও যেতো।গাড়ি নিতো তখন যখন সে দূরে কোথাও যাবে।সঙ্গে তো কেউ না কেউ থাকে।আজ একা যাচ্ছে।ফাহিম হয়তো আজকে জ্যান্ত পুতে রাখবে।টিয়া পাত্তা না দিয়ে চলে গেলো নিজ কার্য পূরণ করতে।


পানশীতে এসে গাড়ি থামালো টিয়া।গাড়ির জানালা দিয়ে পানশীর দিকে চোখ রাখতেই দেখতে পেলো লেকের কাছেই টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে ফুয়াদ।টিয়া গাড়ি থেকে নেমে সোজা চলে গেলো ফুয়াদের দিকে।সামনের চেয়ারে বসে বলে,"আরে হবু জিজু আপনি এখানে?"


ফুয়াদ সামনে চোখ রেখে টিয়াকে দেখে অবাক।ধানমন্ডি থেকে এখানে!আজকাল যে জ্যাম তাতে তো কষ্ট হবার কথা।একা একা আছে দেখতে পাচ্ছে ফুয়াদ।অবাকের সাথেই বলে,"আপনি?"


"একা একা প্রকৃতি উপভোগ করতে চাই।এখানে এসে আপনাকে দেখে তো আমি অবাক।"


ডাহা মিথ্যা বলে টিয়া।সে তো জেনেবুঝে এসেছে এখানে।রাস্তায় জ্যাম এতই ছিলো যে আদা ঘণ্টার রাস্তা এক ঘন্টা লেগেছে।ক্লান্ত বেশ।তাই বলে,"আমার জন্য লেমন মিন্ট আনেবন?নাকি আপনার আমার সাথে বসতে অসুবিধা আছে?যদি থাকে তাহলে আমি উঠছি।"


কৌশল অবলম্বন করলো টিয়া।জাতে ফুয়াদ ইগনোর করতে না পারে।টিয়ার টার্গেট এখন ফুয়াদ।এই ছেলেকেও যে ঠকানো হচ্ছে।টিয়া আগে থেকেই ফুয়াদের ব্যাপারে ভেবে রেখেছে।এই ছেলে যে পরিমাণে সহজসরল তাতে টিয়া যদি বলে সব কিছু লাভ হবেনা।বরং দেখা যাবে আনিকাকে ছেড়ে দিয়ে বোকার মত করে নিজের জীবন অন্যভাবে সাজাবে।এতে তো টিয়ার কোন লাভ হবেনা।কেন সে ছেড়ে দিবে ওই দুজনকে এত সহজে? ফুয়াদকে জানাবে কিন্তু দেরিতে।ভরা জনসম্মুখে।যেনো ওই দুটো পাপী বুঝতে পারে তারা কি করেছে এই দুজনের সাথে।


চলবে...?
 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url