#টিট_ফর_ট্যাট|০৪+ শেষ পর্ব ]

#ইশরাত_জাহান(রাতপাখি)

🦋

আনিকার এখন হাতে মেহেদি দেওয়া হচ্ছে।সামনেই বসে আছে টিয়া,তনয়া,রিমি আরো কিছু বান্ধবী।আনিকার নানি ঘুমিয়েছে।রাত জাগেন না তিনি। টিয়া নিজের মত হাতে মেহেদী দিচ্ছে।রিমি এসে টিয়ার কাঁধে হাত রেখে বলে,"তুই তো অনেক লাকি রে।ফাহিম ভাইয়া কত যত্ন নেয় তোর।তোকে দিয়ে গেলো আবার নিয়েও যাবে বললো।"


টিয়া ম্লান হেসে বলে,"সেদিন পানশীতে গিয়েছিলাম মনে আছে?ফুয়াদ ভাইকে ইংক্রেজ করতে।ওইদিন বাসায় ফিরে দেখি ফাহিমের কি দুশ্চিন্তা।মনে হচ্ছে আমাকে ছাড়া সে মারাই যাবে এমন।"


আনিকার চোখের দিকে চোখ রেখে বলে টিয়া।আনিকার মুখভঙ্গি স্বাভাবিক।সে হেসে হেসে মেহেদী দিচ্ছে হাতে।তনয়া ফোন টিপছিল।ফোনটা বন্ধ করে বলে,"আজকাল স্বামীরা যা হয়েছে না!ঘরে বউ রেখে বাইরে মেয়ে নিয়ে ঘোরে।ফাহিম ভাই যেমন তোকে নিয়ে সেনসিটিভ আমি তো বলব তুই ভাগ্যবতী।তোর মত রূপবতী পেয়ে সেও ভাগ্যবান।"


"স্বামীদের চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে নেই। পরে ওরা ওই বন্ধ চোখের আড়ালে কাণ্ড ঘটিয়ে বসে।"


রিমির কথা শুনে হেসে দেয় তনয়া।বাকিরাও হাসে। টিয়া ফিচেল হেসে বলে,"এমন স্বামীকে তো জুতা দিয়ে পেটানো উচিত।যে স্বামী ঘরের বউ রেখে রাস্তার মেয়েদের সাথে মেলামেশা করে।"


ফাহিম হাসিমুখে এসেছিল টিয়াকে নিতে।দরজার কাছে দাঁড়াতেই টিয়ার এমন কথা শুনে থমকে গেলো। টিয়া আবারও বলে,"আমি বুঝিনা বিহাবিত পুরুষদের প্রতি কেন এত টান রাস্তার মেয়েদের।ওরা কেন নিজেদের পতিতার দিকে টেনে নেয়?"


আনিকার হাত কেঁপে ওঠে।মেহেদী দেওয়া মেয়েটি বলে,"হাত নারাবেন না।মেহেদী নষ্ট হবে।"


আনিকার স্বাভাবিক হলো। টিয়া দেখে আবারও রিমির দিকে ফিরে বলে,"সেদিন গার্লস গ্রুপে একটা পোস্ট দেখলাম।মেয়েটার স্বামী নাকি বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে ছিঃ!আবার এমনও হয় দুলাভাই হয়ে শালির সাথে!অনেক সময় তো ভাবী দেবর!এরা সম্পর্ক কোথায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।"


রিমি নাক সিটকে বলে,"ওই যে বললি পতিতা।আসলে আজকাল পতিতা শুধু পতিতালয়ে না পতিতা থাকে ঘরে ঘরে।ওসব মা*রাই পারে সংসার ভাংতে।স্বামী নামক যে পুরুষগুলো ওই মা*গুলোর কাছে যায় ওদেরকে ধরে গাছের সাথে বেঁধে ঝাটা দিয়ে পিটানো দরকার।ভিডিও করে সোসিয়াল মিডিয়াতে পাবলিক করা উচিত।বে"শ্যা"দের সাথে যদি এতই মজা লাগে ঘুরতে ঘরে বউ কেন রাখে ওরা?"


টিয়া এবার রিমির হাত ধরে শান্তনা দিয়ে বলে,"এত হাইপার হচ্ছিস কেন দোস্ত?"


"পরকীয়া নামটাতেও ঘৃণা লাগে আমার।ওরা কি একবারও ভাবেনা ওরা ঠিক কি করছে?যখনই শুনি ওরা পরকীয়া করে মন তো চায় ওদের মুখে থু মেরে আসি।"


"সুযোগ পেলে একদিন নাহয় মেরেই দিবি।"


তনয়া বলে ওঠে,"আমি তো সুযোগ পেলে মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে নাকে খড় দেওয়াবো আর ওই নরপিচাশ পুরুষটার গেলে জুতা দিয়ে মারবো।"


"সত্যিই পারবি তো?"


"একদম পারবো।তারা যদি পরকীয়া করতে পারে আমি কেন ওদেরকে শাস্তি দিতে পারব না?জানোয়ারের দল দুটোকেই মেরে ফেলতে হবে।এমনিতেও ইসলাম তো বলেই পরকীয়াকারীদের ধরে বেঁধে পাথর নিক্ষেপ করো।ঠিক ততক্ষণ যতক্ষণ না তারা মারা যায়।"


কেঁপে ওঠে আনিকা।শুকনো ঢোক গিলে বলে,"তোরা আমার মেহেদী অনুষ্ঠানে কি এক পরকীয়া নিয়ে পরলি?"


তিনজনেই স্বাভাবিক হলো।রিমি বলে ওঠে,"সরি সরি দোস্ত বেশি হাইপার হয়ে গেছি।জানিসই তো আপুর মৃত্যুর পর আমি পরকীয়া শব্দটা কতটা ঘৃণা করি।ওই লোকটা আপুর সাথে এমন না করলে আপু দুশ্চিন্তায় রোগ বাদিয়ে মারা যেতো না।ওই সময়ের পর থেকে ঘৃণা লাগে এগুলো।"


টিয়া শান্তনা দিয়ে বলে,"ব্যাপার না।মাঝে মাঝে কিছু রাগ উপড়ে ফেলা লাগে।এখন এই বিষয় বাদ যাক।কাল সকালে এসে কিন্তু হলুদের অনুষ্ঠান সারতে হবে।বিকালেই তো বিয়ে।"


সবাই আবারও আনন্দে মশগুল।ফাহিম এসে টিয়াকে ডাক দেয়। টিয়া পিছন ফিরে বলে,"এত তাড়াতাড়ি এলে?"


"সকালে আবার আসবে তো।"


টিয়া এবার বন্ধুমহলের দিকে ফিরে বলে,"দেখ কত চিন্তা।"


সবাই হাসলো শুধু।আনিকা রেগে ফেঁটে যাচ্ছে যেনো। টিয়া উঠে চলে যেতে নিয়ে আবারও পিছনে ঘুরে আনিকার কাছে এসে মেহেদী দেওয়া আপুকে বলে,"বরের নাম ফুয়াদ।আপনি পুরো নামটাই লিখবেন।ছোট করে এফ লিখবেন না।"


আনিকার চোখের দিকে চোখ রেখে বলে,"আসি দোস্ত।"


আনিকাও সহানুভূতি দেখিয়ে বলে,"আচ্ছা দোস্ত সময় মত আসবি কিন্তু।"


চলে গেলো টিয়া।গাড়িতে উঠে জানালার দিকে চোখ রাখলো।ফাহিম বলে ওঠে,"মন খারাপ?"


"বান্ধবীর বিয়েতে সবাই আছে।শুধু আমাকেই যেতে হচ্ছে।ভালো লাগে নাকি?"


"মন খারাপ করোনা জান।তুমি তো জানোই তোমার বুকে মাথা না গুজলে আমার ঘুম আসেনা।"


টিয়া ফাহিমের দিকে চোখ রেখে হালকা হাসলো।ফাহিম ড্রাইভে মন দেয়।


বাসায় এসে টিয়া জুয়েলারি খুলে ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিলে ফাহিম টিয়ার হাত ধরে নিজের কাছে আনে।রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করে ফাহিম।টিয়ার মুখে যেই চুম্বন দিতে নিবে টিয়া সরে যায়।বলে,"ক্লান্ত লাগছে খুব।এখন একটু ঘুমাতে চাই।"


টিয়া দ্রুত ওয়াশরুমে চলে যায়।ফাহিম বিড়বিড় করে বলে,"দিনদিন আমার থেকে শুধু দূরেই যাচ্ছো।"


পরদিন হলুদের অনুষ্ঠান হলো আনন্দ হাসি ঠাট্টার সাথে।এখন আনিকাকে বউ সাজানো হচ্ছে।গুটিকয়েক বান্ধবী নিয়ে আয়োজন বলে তারাই নিজ হাতে ঘর সাজিয়েছে।আনিকার নানি আনিকাকে দেখছে মন ভরে।ড্রয়িং রুমে ছেলেরা এখনও এদিক ওদিক সামলাচ্ছে।ছেলেরা বলতে বান্ধবীদের স্বামীরাই। ফাহিম নিজেও আছে তাদের সাথে।দেখে মনে হচ্ছে কত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। সবাই কত সুখী।ফুয়াদ এসেছে দুজন কলিগ নিয়ে।পরিবার বলতে মা।আসেনি সে এখানে।বউমা আসলে তাকে আপ্যায়ন করতে হবে তো।সেই কাজে বাসায় আছে।অসুস্থ মানুষটি ছেলে বউয়ের জন্য টুকটাক কাজ করে যাচ্ছে।


বর এসেছে শুনে সবাই বাইরে আসে।দুষ্টুমি করে সবাই শরবতে ঝাল লবণ মিশিয়ে খাওয়ায়।এটাকে মজাই বলে সবাই।ফুয়াদ মেনে নিলো হাসিমুখে।বরের আসনে বসিয়ে দিতেই তার সামনের দিকে আনিকাকে আনা হয়।দুজনকে সামনা সামনি বসিয়ে বিয়ে দিবে।কাজী এসেছেন মাত্র।একটু কথাবার্তা বলে যেই বিয়ে পড়াতে নিবে টিয়া বলে ওঠে,"আমার একটু কথা ছিলো।"


সবাই ভ্রুকুটি করে তাকালো।টিয়া সবাইকে হাত দিয়ে থামিয়ে বলে,"আসলে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়েতে একটা গিফট দেওয়ার ছিলো।"


রিমি বলে ওঠে,"গিফট পরে দিবি।আগে ওদের বিয়েটা হোক।"


"উহু আগে গিফট দিতে চাই। পরে নাহয় বিয়ের কথা ভাবা যাবে।"


"এটা আবার কেমন কথা?"


"দেখ তো আগে।"


টিয়া এবার একটা বক্স নিয়ে আনিকার সামনে দিয়ে বলে,"তোর জীবনের সবথেকে বড় মূল্যবান গিফট এটা।খুলে দেখ দ্রুত।নাহলে মিস করবি।"


আনিকা হতবম্ব হয়ে টিয়াকে দেখে গিফট বক্স খোলে।দেখেই অবাক হলো সাথে সাথে।হাত থেকে বক্স নিচে পড়তেই কিছু ছবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো সব জায়গায়।আনিকা উঠে দাড়িয়ে তাকালো টিয়ার দিকে।টিয়া মুখে হাসি বজায় রেখে দেখছে আনিকাকে।এই হাসি আনন্দের না।ক্ষোভের হাসি দেখে বোঝা যায়।আনিকাকে অবাক হতে দেখে ছবিগুলো একে একে সবাই উঠিয়ে দেখে।রিমি নাক মুখ কুঁচকে বলে ওঠে,"ছিঃ!"


টিয়া বলে ওঠে,"আমার স্বামীকে নিয়ে বিছানায় কাটাতে তোর বিবেগ কাজ করেনি তাইনা?"


ফাহিম আতকে ওঠে।ছবিগুলো দেখে সেও কেঁপে উঠলো।ফুয়াদ চশমা খুলে পাশে রাখে।সে যেনো বিশ্বাস করতেই পারছে না।মন বলছে মেয়েটা তো নরম মনের।এমন করতেই পারেনা।মস্তিষ্ক বলছে এভাবে ঠকাতে লজ্জা লাগেনি?অন্তত আমাকে না হোক নিজের বান্ধবীকে কিভাবে?


ফাহিম এগিয়ে এসে টিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের হয়ে কিছু বলতে নিবে টিয়া সেই সুযোগ দিলো না।ফাহিমের গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসিয়ে দিলো।টিয়া দূরে সরে গেলো।দরজার কাছে ওর বাবা তারিফ হাসান দাড়িয়ে আছেন। টিয়া গিয়ে বাবাকে বলে,"ডিভোর্স লেটার এসেছে?"


তারিফ হাসান ডিভোর্স লেটার দিয়ে বলেন,"কালকেই এসেছিল।তুমি এখানে আনতে বললে তাই আমি এখন আনলাম।"


টিয়া ডিভোর্স লেটার হাতে নিয়ে ফাহিমের দিকে তাকায়।ফাহিম ডিভোর্সের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লো।টিয়া সবার দিকে তাকিয়ে বলে,"আমি কাগজে সই করবো।কিন্তু তার আগে রিমি তুই নাকি কি করবি বললি?ওগুলো কর।আমিও দেখি পরকীয়ার শাস্তি কেমন হয়।মনকে শান্তি দিতে চাই ওদের শাস্তি দেখে।"


রিমি এসে দাঁড়ালো আনিকার সামনে।তনয়া এসে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে দেখে আনিকাকে।তনয়া প্রথমে বলে,"আমি কখনও ভাবিনি তুই এমন জঘন্য কাজ করবি।"


বলেই আনিকার বধূসাজের খোপাটা নিজের হাতের মুঠে নিয়ে বলে,"বান্ধবী নামের কলঙ্ক তুই।এতই যখন নোংরা খেলা খেলতে ভালো লাগে তাহলে পতিতালয়ের খাতায় নিজের নাম দিয়ে রাখতি।কেন তোরা সংসার ভাঙতে গেলি?"


রিমি এবার থু মেরে দিল আনিকার মুখে।ছবিগুলো দেখিয়ে বলে,"এই দৃশ্য যে তোকে নিয়ে দেখবো এটা কখনও ভাবিনি আমি।"


হাত উঁচিয়েও থামালো।হাত নোংরা করবে না সে।পায়ের জুতা খুলে কয়েকটা চড় বসিয়ে দিলো আনিকার গালে।এক কোণায় মুখে কাপড় দিয়ে কান্না করছে আনিকার নানি।তার নাতির কর্মের ফল এগুলো।


ফুয়াদের চোখের কোণা লাল হয়ে এসেছে।পুরুষ মানুষ কান্না করবে না।লজ্জায় দুজন কলিগের দিকে তাকালো।তারপর মাথা নত রেখে দাড়িয়ে রইলো। টিয়া বলে ওঠে,"আমি ওদেরকে অনেক আগেই ধরেছি।স্পাই লাগিয়েছি আরো প্রমাণের জন্য।তাই এতদিন চুপ ছিলাম।এখন স্ট্রং প্রমাণ পেলাম।দুঃখিত ফুয়াদ ভাইয়া।আমি চাইতেও আপনাকে বিনা প্রমাণে কিছু বলতে পারিনি।হ্যাঁ আমি প্রথমদিনের কিছু ছবি তুলেছিলাম কিন্তু ওগুলো কেন জানি স্বাভাবিক ছবি লাগলো। মানে কথা ঘোরানোর মত ছিলো।ওরা চাইলেই কথা ঘুরাতে পারতো।তাই আমি ওদেরকে সেই সুযোগ দেইনি।আমি ফাহিমকে তালাক দিবো।সেই সাথে আইনি শাস্তি।আপনি নাহয় আনিকাকে দেখলেন।"


ফুয়াদ সব শুনে কিছু না বলেই চলে যায়।বুঝিয়ে দিলো বিয়েটা হবেনা।আনিকা ধপাশ করে বসে পড়ে মেঝেতে।ফাহিমকে দেখছে এখন সবাই।রিমি আর তনয়ার স্বামী এসে ফাহিমের পাশে দাঁড়ালো।দুজনেই তাদের বউদের ইঙ্গিত বুঝে ফাহিমের হাতদুটো ধরে নেয়।ফাহিম ছাড়ানোর চেষ্টা করে।রিমি এসে জুতাটা দিয়ে ফাহিমের গালে আঘাত করতে লাগলো। টিয়া দেখছে শুধু।চোখ দিয়ে পানি পড়ছে টিয়ার।এই দিনটাও দেখা লাগবে।একদিকে কষ্ট লাগলেও একদিকে শান্তি পাচ্ছে।অবশেষে ডিভোর্স পেপার নিয়ে ফাহিমের সামনে দাড়িয়ে বলে,"সই করো।"


ফাহিম কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে,"আমাকে ক্ষমা করে দিলে হয়না?"


"না হয়না।কারণ কি জানো?কারণ আমি তোমার সাথে থাকলে এই দৃশ্যগুলো সবসময় মনে রাখবো।তোমার কাছে যেতে আমার ঘৃণা লাগবে।আমার অসস্তি লাগে।মনে হয় তোমাকে শেষ করে দেই।নিজেকে শেষ করে দেই।তোমরা পরকীয়া করলেও যন্ত্রণা আমাদের মত ঘরোয়া বউদের।এটা একবারও বোঝো তোমরা?যখন বুঝতেই পারোনা তখন বাদ দরকার নেই সংসার করা।আমি বিচ্ছেদ চাই এই নষ্টামি জগৎ থেকে।"


ফাহিম আরো মিনতি করে কিন্তু ফল শূন্য। টিয়া তালাক দিবেই।তাই তালাক হলো ফাহিমের সাথে।সই করতে বাধ্য হলো ফাহিম।কিছু পুলিশ এসে নিয়ে গেলো ফাহিমকে।


আদালতে এসে ফাহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলো সবাই।ফাহিমের বাবা মাও এসেছেন।তারা ক্ষমা চাইলো টিয়ার কাছে।সবশেষে ফাহিমকে শাস্তি হিসেবে পাঁচ বছরের হাজত বাসের জন্য অনুমতি দেওয়া হলো।ফাহিম চলে যেতেই টিয়া বাইরে এসে একটি বেঞ্চে বসে।কান্না করে দেয় গলা ফাটিয়ে।টিয়ার কাঁধে হাতের স্পর্শ পাওয়া যায়।টিয়া মাথা উঁচিয়ে দেখে নাজিয়া আনজুমান।টিয়া ওনাকে জড়িয়ে কান্না করে দেয়।কিছুক্ষণ ওনার বুকে মুখ গুঁজে কান্না করে।নাজিয়া আনজুমান টিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,"তোমাকে দেখে আমি খুব খুশি।তোমার মধ্যে যে প্রতিভা দেখেছি এটা আমার মধ্যে ছিল না।থাকলে আমি ওদেরকে শাস্তি দিয়ে একটু শান্তি পেতাম।"


টিয়া উঠে বসে বলে,"আপনি এখানে এসেছেন কেন?"


"তোমাকে দেখতে।তোমার চোখে আমি আমার জন্যেও কান্না দেখেছি।কারণ আমরা একই পথের সঙ্গী যে।তুমি আমার কষ্ট বুঝেছো।আমিও সেই কষ্ট বুঝে চলে আসলাম।এভাবে ভেঙ্গে পরোনা।নিজেকে সামলাও।প্রতিষ্ঠিত হও আর আশা কমিয়ে দেও নিজেদের সাথে মিশে থাকা ব্যক্তিদের থেকে।"


টিয়া মাথা উপর নিচ করে হ্যাঁ জানালো।তারিফ হাসান উকিলের সাথে কথা বলা শেষ করে এগিয়ে আসলো টিয়ার কাছে।নাজিয়া আনজুমানের পিছনে দাঁড়িয়ে টিয়ার উদ্দেশ্যে বলেন,"বাসায় চলো।তোমার মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।"


পরিচিত কন্ঠ শুনতে পেয়ে নাজিয়া আনজুমান পিছনে ফিরলেন।তারিফ হাসানকে দেখে অবাক হলেন।তারিফ হাসান যেই দেখতে পেলেন নাজিয়া আনজুমানের মুখশ্রী তিনি যেনো থমকে গেলেন।টিয়া এগিয়ে এসে বলে,"চলো বাবা।"


নাজিয়া আনজুমানের দিকে ফিরে বলে,"আসি আন্টি।"


নাজিয়া আনজুমান থমকে গেলেন।টিয়া ওর বাবার হাত ধরে হাঁটতে নেয়।কিছুদূর যেতেই তারিফ হাসান পিছন ঘুরে তাকান।নাজিয়া আনজুমান হাসলেন।ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলেন। তারিফ হাসানের কানে ভেসে আসলো সেই পুরোনো কথা,"কর্ম কিন্তু ফিরেও আসে তারিফ।আজ তুমি আমার সাথে যা করলে এটা তোমার জীবনেও কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসবে।দেখে নিও তুমি।অনুতপ্ত হলেনা তো।জীবনে যতদূর এগোবে ততদূর শিক্ষা তোমার পিছনে ছুটবে।"


নাজিয়া আনজুমানের হাসি দেখে চোখ স্থির করে চেয়ে রইলেন তারিফ হাসান। টিয়া সামনে হাঁটার জন্য উদ্যত হতে নিলে বাবাকে থেমে যেতে দেখলো।চোখটা স্থির নাজিয়া আনজুমানের দিকে।টিয়ার সন্দেহ বাড়লো।টিয়ার মনে পড়ে ওর দাদাবাড়ি সিলেট কিন্তু কখনও যেতে পারেনা।কারণ সেই বাড়ি নাকি নেই। তারিফ হাসান এড়িয়ে যান এটুকু বলে। টিয়া দুজনের দিকে তাকালো বারবার।টিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।শিওর হতে প্রশ্ন করে,"নারীটি তোমার প্রথম স্ত্রী?"


তারিফ হাসান আনমনে বলে দিলেন,"সেই সাথে তোমার মাও সে।"


টিয়া হাত ছেড়ে দিলো।আশ্চর্য হয়ে বলে,"মানে?"


"তাকে ঠকিয়ে তার বান্ধবীকে বিয়ে করি আমি।তুমি হবার পর আমি কেন জানিনা তোমাকে হারাতে চাইনি।সন্তানকে বাবা আগলে নিতে চায়।তাই আমি সেদিন তোমার মাকে জানাই তুমি মারা গেছো।এটা শোনার পরই অনেক তদন্ত হয়।আমার টাকা দিয়ে নার্সের মুখ বন্ধ রাখি।এরপর আমাদের তালাক হয়।তোমার মা আজও জানতে পারেনি তার একটি মেয়ে সন্তান আছে।দুর্ভাগ্যবশত তোমার যে পালিত মা মানে তোমার ওই মায়ের বান্ধবী সেও মাতৃত্ব হবার ক্ষমতা হারিয়েছে।আসলেই কর্মফল ফেরত আসে।"


"তোমরা এত নোংরা!"


আর বলতে পারলো না টিয়া।বিষয়টা যখন বাবার দিক থেকে তখন মুখ বন্ধ হয়ে যায় আপনাআপনি।তারিফ হাসান বলেন,"তোমাকে কখনও জানতে দিতে চাইনি।আজ জানালাম কারণ আমি হেরে গেছি জীবনের নোংরা খেলায়।যেই নোংরা খেলা আমি খেলেছি সেই খেলা আজ আমার মেয়ের দিকে আল্লাহ ফেরত দিলো। যাকে বলে টিট ফর ট্যাট।ভাগ্য আমাকে টিট ফর ট্যাট শিখিয়ে দিলো।"


টিয়া আর কিছু শুনতে চাইলো না।বাবাকে ছেড়ে দিয়ে ঘৃণাভরা দৃষ্টি নিয়ে বলে,"ঘৃণা করি তোমাকে আমি।আজ থেকে আমি আমার মায়ের কাছেই থাকব।তোমার মত নরপিচাশ বাবার কাছে না।তুমি শ্রেষ্ঠ বাবা হয়েছিলে কিন্তু সন্তানের মায়ের জন্য শ্রেষ্ঠ নও তুমি।কোনোদিন তোমার এই মুখ আমাকে দেখাবে না বাবা।কোনোদিনই না।"


বাবাকে ছেড়ে টিয়া দৌড়ে চলে গেলো মায়ের কাছে।নাজিয়া আনজুমানকে জড়িয়ে ধরে বলে,"তুমিই আমার মা।আমি এতদিন ভুল মানুষকে মা বলেছি।"


বলেই হাউমাউ করে কান্না করে টিয়া।নাজিয়া আনজুমান অবাক হয়ে বলেন,"আমি তোমার মা?"


"হ্যাঁ হ্যাঁ তুমিই আমার মা।সেদিন আমি মারা যাইনি।তোমাকে মিথ্যা বলেছে ওই লোকটা।বলেছে তোমার সন্তান মারা গেছে।সেই সন্তান তো আমি।"


নাজিয়া আনজুমান মেয়েকে দেখছেন।মেয়ের মুখে হাত দিয়ে আদর করতে থাকেন। টিয়া বলে ওঠে,"আমিও তোমার সাথে সিলেট যাবো।নিবে তো আমাকে তোমার সাথে?আমি ওই নোংরা লোকটার সাথে থাকব না।"


নাজিয়া আনজুমান একবার চোখ রাখলেন তারিফ হাসানের দিকে।ঘৃণা দৃষ্টিতে দেখে বলেন,"নিবো আমার সাথে তোমাকে। আজ থেকে তুমি আমার সাথেই থাকবে।


তারিফ হাসান নিজেও কান্না করছেন।আজ তার ভাগ্য এমনভাবে খেললো যে তার মেয়েও তাকে ঘৃণা করছে।এটাই তো তার প্রাপ্য।সন্তানের দৃষ্টিতে ঘৃণিত বাবা।মায়ের উপর করা অন্যায়ের শাস্তি এটা।যাকে বলে টিট ফর ট্যাট।


সমাপ্ত~
 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url