#মায়ার_সংসার
#পর্বঃ২+৩+৪
#লেখিকাঃরেজওয়ানা_আসিফা
নিজেদের জামা কাপড় বাদে আর কিছু ব্যাগে নিলাম না। বাড়ির সবাই বের হয়ে আমাদের দরজায় দারিয়ে আছে। আমার বড়ো জা বলে উঠলো,
- বাড়ির কাজের ভয়ে এখন চলে জাচ্ছে। এইসব চালাকি কেউ কী বোঝেনা নাকি?
সুমন হুংকার ছেড়ে বললো,
-চুপ........ অনেক হয়েছে। আমার বউকে আরেকটা কথা কেউ বললে তার গায়ে হাত তুলতেও আমি পিছ পা হবোনা। এতোদিন সব সহ্য করেছি আর না।
ওর এমন ব্যবহারে আমিও খুব অবাক হলাম।
আমার শাশুড়ি চেচিয়ে বললো,
-বউ তোরে কালা জাদু করছে। নাইলে তুই তো এমন ছিলিনা। তোর সাহস বাইরা গেছে তুই বড়ো বউর লগে এমনে কথা বললি। তুই জানোস আকবর(আমার বড়ো ভাসুর)
শুনলে তোরে আস্তা রাখবোনা।
সুমন আমার শাশুড়ির কাছে গিয়ে বললো,
-বড়ো বউ তাই তোমার দরদ হচ্ছে নাকি তার স্বামী বেশি টাকা দেয় সংসারে এইজন্য দরদ হচ্ছে?
আমার শাশুড়ি থেমে থেমে বললো,
-না.... বউ ভাবির লগে কেউ এমনে কথা কয়, আর টাকা তো ও বেশিই দেয় আর সংসারে যে টাকা বেশি দেয় তার লগে বেয়াদবি করতে নাই।
-তোমারে ধন্যবাদ এই কারনে যে তুমি সত্যি কথা টা বলছো।(সুমন)
আমাদের সব গোছানো শেষ। আমি বোরকা পরে নিলাম। সুমনের কোলে আমার মেয়ে আর হাতে কাপড়ের ব্যাগ। তার পিছে পিছেই আমি বের হলাম।
আমার শাশুড়ি সদর দরজায় দপাস করে বসে কপালে হাত দিয়ে চেচাতে লাগলো আর বললো,
-এই পিচা*শি আমার পোলারে খাইলো, আমার এতো সাদাসিধা পোলা এই কাম জীবনেও করতে পারবো না। এই অপ*য়া আমার পোলার মাথাটা খা*ইছে। আল্লাহ গো তুমি এর বিচার করো। বাড়ির কাজ করতে হইবো তাই আমার পোলাডারে আমার থেকে আলাদা করলো।
সুমন মেয়েকে কাধ থেকে নামাতে নামাতে বললো,
-মা তুমি আমারে যা বলার বলো মায়ারে কিছু বলবা না। ওর মতো মেয়ে দেখে এই বাড়ির বুয়া বানাইয়া খাটাইয়া গেলা। অন্য কেউ হলে লা*থি মেরে চলে জেতো। এতো বড়ো বাড়ির মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের সব কাজ করেছে বুয়ার মতো। তারপরও আমি তোমাদের কিচ্ছু বলিনি। ওতো পরের মেয়ে কিন্তু আমার মেয়ে? আমার মেয়ে তো তোমাদের র*ক্ত, ও তো তোমাদের নাতি। আমার মেয়েটা কি দোষ করছে? আমার মেয়েটা কী এমন খায়, এক টুকরা মাংস তার কপালে জুটলো না? তুমি তো পারতা একটা টুকরা মাংস ওরে দিতে তোমার উপর তো কেউ কথা বলতে পারতোনা।
আমার শশুর চিল্লাতে চিল্লাতে বললো,
- সন্তানের প্রতি এতো মায়া যে মা কে কথা শোনাও তুমি? মনে হচ্ছে তোমাদের চার ভাইরে আমরা পালতে আনছিলাম। আমাদের সন্তান নাই। মায়া নাই।
-আছে তো সন্তানের প্রতি মায়া তোমাদেরও আছে। কিন্তু যেই সন্তানের টাকা বেশি ওই সন্তানের প্রতি মায়া বেশি। ৭ হাজার টাকায় আলাদা খেয়ে আমি দেখাইবো আমার বউ বাচ্চাও মাছ মাংস খেতে পারে এই টাকার মধ্যেই। যা তোমাদের সংসারে হতোনা।
তারা কথা কাটাকাটি করছে। পাশ থেকে আমি শুনলাম আমার বড়ো জা এবং মেঝো জার কথা। তারা আমার শশুরের কানের কাছে গিয়ে বলছিলো,
-আব্বা বাইর করে দেন। সম্পত্তির কোনো ভাগ দিবেন না এটাও বলে দেন।
তাদের কথা মতোই আমার শশুর সুমনকে বললো,
-তাহলে তুমি এই কথা শুনে রাখো, আমার ছেলে ওই টাকা ওয়ালা তিনটাই। ছোট ছেলে বলতে কেউ নাই। আমার সব সম্পত্তিও তিন ভাগি হবে। এখন আমার বাড়ি থেকে বের হও।
সুমন একটু জোরে জোরেই হেসে বললো,
তোমার এই পাপের আর অনাচারের সম্পত্তির দরকার নেই আমার।
আমি খেয়াল করলাম সুমনের চোখে পানি। পানিটা আড়াল করে সবাইকে ভালো থেকে বলে আমার হাতটা ধরে বেড়িয়ে আসলো বাড়ি থেকে।
গলি দিয়ে হেটে বড়ো রাস্তায় উঠছি। কেউ কোনো কথা বলছে না। আমিই জিগ্যেস করলাম,
-কোথায় জাচ্ছি। আর দোকান তো এই বাজারে দূরে গিয়ে খাবো কী?
-বেশি কথা বলোনা। আমি আছি তো এই হাত ধরে যখন বেরিয়ে এসেছি। তখন খাবারের চিন্তা তোমাকে করতে হবেনা।
একটা রিকশা দিয়ে অনেক টা দূর এসে সুমন রিকশাটা থামাতে বললো।
রিকশা থেকে নেমে সুমন ভাড়া মিটিয়ে একটা গলি দিয়ে ঢুকলো। মায়া তার পিছে পিছে হাটছে। একটা বাড়ি ঢুকে তিন তলায় উঠে সুমন কলিং বেল দিতেই রিফাত দরজা খুললো। রিফাত কে দেখে মায়া খুবি অবাক। রিফাত সুমনের বন্ধু ও দেশের বাইরে থাকে। দেশে আসলো কবে।
পাশ থেকে একটা মেয়ে মুচকি হেসে সালাম দিয়ে আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে নরক কন্ঠে বললো,
-ভাইয়া আসেন ভাবিরে নিয়ে ঘরে আসেন।
আমি চুপচাপ ফ্ল্যাটটাতে ঢুকলাম। বাবার বাড়ির কথা মনে পরলো হঠাৎ। এমন রাজপ্রাসাদেই ছিলাম। বাবার একটা মিত্র মেয়ে ছিলাম আদরের। কখনো কষ্ট কী বুঝতে দেইনি। কিছু চাইতে দেরী হতো কিছু সেটা আসতে দেরী হতোনা। হুমন আমার বাবার অনেক বিশ্বস্ত কর্মচারি ছিলো। বাড়িতে আসা যাওয়া হতো এর মধ্যে কখন দুই জনের দুই জনকে ভালো লাগে বুঝতে পিরিনি। পরে আমার বিয়ে ঠিক হলে বাবাকে সব জানাই কিন্তু সে রাজি ছিলোনা। তাই পালিয়ে বিয়ে করে এই বাড়ি উঠি। প্রথমে বড়ো লোকের মেয়ে তাই খুব আদর যত্ন করতো আমার শাশুড়ি পরে যখন বাবা আমার সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দেয় তখন থেকেই বাড়ির সব কাজ আমাকে দিয়ে করায়।
আমার ধ্যান ভেঙে রিফাত ভাই ডাক দিলো,
-ভাবি, আমার বউ আয়শা।
তার কথা শুনে অবাকও হলাম খুশিও হলাম।
-কী বলেন ভাই বিয়ে কবে করলেন? জানালেন না বোনরে?
-আমি বিদেশে থাকতেই ওরে ভালোবাসতাম। ইমু প্রেম ভাবী। ওর বিয়ার কথা চলতাছিলো। বাড়িতে জানাইলাম তারা বলে দুই বছর হইছে বিদেশ গেলি। কিছু একটা কর তারপর বিয়া। বাড়ির ঘর দোয়ারের কিজ শেষ হোক তারপর।
আমার মাথা নাই ঠিক। ভালোবাসা উড়ে যায়। আর তারা কয় বাড়ির কাজ শেষ হোক। তাদের কোনো কথা না শুনে দেশে আইসা বিয়ে করে বউরে নিয়া বাড়ি উঠি তাদের অবাক করে দিমু তাই। কিন্তু ভাবী কি আর কমু। তাদের অবাক করতে গিয়ে নিজে অবাক হই। দেখি ছোট ভাই কেবল ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পরে সে এক মেয়ে বিয়ে করে নিয়ে আসছে আরো পাচ মাস আগে আমারে বলে নাই। আমার টাকা দিয়ে অনুষ্ঠান করছে আর আমার ভালোবাসার মানুষটারে বিয়ে করার কথা বলছি তারা বলে বাড়ির ঘরের কাজ শেষ হলে করতে। তাদের সাথে জোরে কথা বলতেই তারা অনুতপ্ত না হলে আরো চওড়া হয়ে কথা বলে। কপাল ভালো ছিলো এই ফ্ল্যাট টা আয়শারে উপহার দেওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করে টাকা জমাই কিনছিলাম। রাগ হয়ে এই বাসায়ই নতুন সংসার শুরু করি।
চলবে................
#মায়ার_সংসার
#পর্বঃ৩
#রেজওয়ানা_আসিফা
রিফাত একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,
-আসলে ভাবি পরিবারের বেশি টাকা দেওয়া আর কম টাকা দেওয়া কোনো বিষয় না বিষয় হচ্ছে বাবা মার সন্তানের প্রতি মনের টান। সন্তানের প্রতি যদি মন থেকে মায়া ভালোবাসা না থাকে তাহলে টাকার বিষয় টা কিছুই না। সবাই বলে পৃথিবীতে বাবা মার থেকে কেউ আপন হয় না। বিশেষ করে মার থেকে বেশি কেউ ভালোবাসে না। কিন্তু আমার মা! যখন আমি সারাদিন বিদেশে কাজ করে রাতে একটু সময় পেতাম তখন মাকে ফোন দিতাম। আমার মা ফোন ধরে কী বলতো জানেন? বলতো,-হ্যারে তোর বুদ্ধিসুদ্ধি কি তালগাছে উঠছে? তোর বিদেশের মতো তো এখানে রাত ৯ টার পর সবাই আড্ডা দেয় না যে অনেক রাত করে ঘুমাবে। তোদের ওখানে তো এখন সন্ধ্যা কিন্তু আমরা তো খুব সকালে উঠবো নামজ পরতে হবে। এখন কোন বুদ্ধিতে তুই ফোন দিলি? বিদেশ গেছিস টাকা কামাস নামাজ তো পানিতে ভাসাই দিছিস সেটা না হয় বাদি দিলাম।
তার এতো কথা শোনার পর আমি শুধু একটা কথাই বলতাম,
-মনে পরছিলো তোমাকে মা, আর বিরক্ত করবোনা, তুমি ঘুমাও।
এর পর আমার চোখের পানি টা আর কেউ দেখতো না। আমি তো টাকা দিতাম। আর মানলাম ছোট ভাই বাড়ির ছোট ছেলে তাই আদরের। সুমন টাকা দেয়নি কিন্তু সে তো বাড়ির ছোট ছেলে আদরের তার সাথে কেন এমন হলো?
টাকা কিছুই না। যদি মন থেকে ভালোবাসা মায়া মমতা না থাকে।
আমি রিফাতের কথা শুনছিলাম। তবে পাচ বছরে আমি এই টুকু বুঝেছি যে টাকার মূল্য ঠিক কতোটা তাই তার কথা গুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিলো না আমার কাছে। কারণ প্রথম যেই দিন ওই বাড়ি গেছিলাম তখন শাশুড়ি মায়ের এতো আদর,যা দের ছোট বোনের মতো ভালোবাসা সবটাই আমার বাবার টাকার লো*ভে ছিলো। নাহলে কেনো বাবা আমাকে মেনে না নেওয়ার পরেই এমন অত্যা*চার শুরু হলো!
সুমন আয়শার সাথে তার মেয়েকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলো। আমাদের দুই জনকে অনেকক্ষন কথা বলতে দেখে কাছে এসে জিগ্যেস করলো,
-এতো কী কথা হচ্ছে,
রিফাত হেসে বললো
-এই আর কী ভাবিরে বল বলছিলাম। তোরা থাক। আমি পুচকিটার সাথে আলাপ হয়ে আসি।
আমি সুমন কে পাশে নিয়ে বললাম
-এখন কোথায় থাকবো? কী করবো? এভাবে চলে আসা ঠিক হয় নি। আমাদের আয় রোজগার কম ওই টুকু কথা হজম করে চললেই হতো। এতো রাগ দেখানো উচিৎ হয় নি। আর একটু কাজ করে খেলে হাত পা তো ক্ষয় হয়ে যায়না। আমি তো কখনো তোমার কাছে নালিশ করিনাই যে, আমার কাজ করতে ভালো লাগে না আমি এই কাজ করতে পারবো না। তাহলে এমন কেনো করলে? এখন বাসা ভাড়া করে থাকতে হলেও কতো টাকা লাগবে, তোমার হিসাব আছে? তোমার বন্ধুর বাড়ি তো আজীবন থাকতে পারবো না আমরা। ওদের নতুন সংসার এখানে আসার পর রিফাত ভাইর কথা গুলো শুনে নিজেরি খারাপ লাগছে।
সুমন বিরক্ত হয়ে বললো,
-এতো কথা বলতে পারো তুমি? আমাকে তো কথাই বলতে দিচ্ছো না।
-কী বলবে তুমি। তোমার জন্য তো এবার রাস্তায় থাকতে হবে। যাও এক মুঠ খেতে পারতাম সেটাও কপালে থাকবে না বোধহয়
-আমি একবার বলেছি তো আমি থাকতে কিছু হবেনা।
আর এখন থেকে আমরা এখানেই থাকবো।
সুমনের কথা শুনে মায়া আকাশ থেকে পড়লো। দাত চিবিয়ে আস্তে আস্তে বশলো,
-আস্তে কথা বলো, এ কথা যেনো ওরা না শুনে। মাথা ঠিক আছে তোমার, ওদের নতুন সংসার সেখানে এসে আমরা বিরক্ত করবো?
এতো সুন্দর ফ্ল্যাট করেছে বউয়ের জন্য। আমাদের জন্য না। এইসব কথা ভুলেও মুখ থেকে বের করোনা।
মায়ার কথা গুলো পিছন থেকে সব শুনেছে রিফাত আর তার স্ত্রী আয়শা। মায়া যখন সুমন কে ধমকাচ্ছিলো ঠিক তখনই রিফাত বললো,
-আপনি আমার বন্ধুরে একদম বকবেন না ভাবি। আমিই ওরে বলছি এখানে থাকার জন্য।
-না না ভাই সে কী করে হয়? আপনাদের নতুন সংসারে আমি বাধা হতে চাইনা।
-বাধার ব্যপার কোথায় আসলো। নিজের বাবা মাও যখন দুই নাম্বারি করেছে আমার সাথে, তখন এই বন্ধুই মানষিক সাহস দেয় আমারে।সেই বন্ধু বিপদে পরে থাকবে আর আমি শান্তিতে ঘুমাবো?
-শোনেন ভাবি আমি ওই বাড়ির সব ঘটনা শুনেছি। সুমন আমাকে সব বলার পর আমিই বলি আপনাকে এখানে নিয়ে আসতে। অনেক আগে থেকেই এ নিয়ে ওকে জোরাজোরি করেছি কিন্তু ও শোনেনি। কালকের কথা শোনার পর আমি আর ঠিক থাকতে পারছিলাম না তাই ওকে আরো বেশি জোরাজোরি কির তার পর ও রাজি হয় আর আমার ভরসাতেই ও আপনাকে আনছে। ছোট থেকে দুই জন একসাথে বড়ো হইছি আর ওর পরিবারের এই অবস্থা এটা কীভাবে মানবো বলেন। আর এতো বড়ো বাসা আমি তো আর এখানে থাকতে পারবোনা না।
আমাকে আবার চলে যেতেই হবে। তখন তো আয়শা একা থাকবে। আপনি না হয় তার একটু সংঙ্গ দিলেন।
আপন ভাই ব্রাদার বাবা মার ভালোবাসা থেকে তো দুই বন্ধু বঞ্চিত হইছি। এখন নাহয় একটা পরিবার হয়ে থাকলাম তাতে সমস্যা কোথায়। মানুষ দুনিয়ায় আসে কিছু দিনের জন্য। আর এই অল্প কিছু দিনের প্রতিটা সময়ই যদি কষ্টে কাটায় এটা আসলে তার জীবনের অনেক বড়ো আফসোস। তাই একসাথে সুন্দর সু সম্পর্কে যেই কয়দিন বেচে আছি ডাল ভাত খেয়েও মিলেমিশে থাকা ভালো।
সত্যি বলতে রিফাত ভাইর কথা গুলো শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এই কথা গুলো যদি আমার বাবা মা আর আমার শশুর শাশুড়ি অনুভব করতো তাহলে তারা কেউই আমাদের দূরে সরিয়ে দিতে পারতোনা। আসলেই, মানুষ কয়টা দিন বাচে? তার মধ্যে এতো অবহেলা পেলে তো জীবনটাই বৃথা।
রিফাত মজা করে বললো,
- এতো ভাবার দরকার নেই। আর এই অকাজের ঢেকিটাকে একটু মজার মজার রান্না শিখাই দিয়েন তাতেই হবে।
- কিন্তু ভাই সবসতো বুঝলাম। থাকার তো কোনো সমস্যা ছিলোনা। সমস্যা হলো একটা কাজের। সুমন ওই বাজারে গিয়ে দোকান খুলে বসলে প্রতিদিন ওদের সাথে দেখা হবে। ওদের সাথে দেখা হলেই ওরা কিছু না কিছু বলবে ওকে শুনিয়ে। বাবা মা ছেড়ে চলে আসা টা যে কতো কষ্টের সেটা আমি বুঝি। ওই জায়গায় গেলে বাবা মার সাথে দেখা হলে ওর তো কষ্ট হবে। আমি এখন থেকে চাকরি খুজবো। কিন্তু এই কয়দিন তো ওই খানে যেতেই হবে। হাত পুরো ফাকা। খাবো কী বলেন?
সুমন নিচের দিকে তাকিয়ে বললো,
-ওখানে যেতে হবে না আর, তোমার মনে আছে মায়া আমি কাল বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে গেছিলাম। তার কারণ টা জানো?
চলবে...................
অনেকে বলতেছেন ভারতীয় বাংলা সিনেমা। আমারি ভুল ছিলো আগে বলা উচিৎ ছিলো এটা একজনের জীবনের বাস্তব কাহিনি। আমি লেখার মধ্যে আরো একটূ সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। এমন এমনও কাহিনি আছে যা যেকোনো সিনেমার সাথে অনেক ভালো ভাবে মিলে যায়। তাই ওখান থেকে ক*পি করা হইছে এমন তো না। যাইহোক অনেক গুলো ভালো মতামতের মধ্যে দুই একটা খারাপ মতামত থাকবেই ওই দুই একটা পিছে ফেলে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সবাই গঠনমূলক কমেন্ট করবেন আর কোথাও বানান ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন।
#মায়ার_সংসার
#পর্বঃ৪
#রেজওয়ানা_আসিফা
সুমন মিষ্টির কথা বলতেই মায়ার মনে পরলো কালকের কথা।
ভাবতে ভাবতে বললো,
-হ্যা..... মনে পরেছে। কিন্তু ওই মিষ্টি কীসের ছিলো? তুমি বাড়ি আসার আগে তো কিছু জানতে না আর জানলেও ওই বাড়িতে ওই সময় মিষ্টি আনার প্রশ্নই উঠে না।
-হ্যা। ওই মিষ্টি নিয়েছিলাম কারণ আমি নতুন একটা চাকরি পাই।
নতুন চাকরির কথা শুনে মায়ার চোখ জল জল করে উঠলো। চোখের কোনে পানিও এসেছে।
-কীভাবে পেলে? কোথায় পেলে কিসের কাজ? বলোনা।
-আগে শান্ত হও তারপর বলছি।
-আমি শান্তই আছি। তুমি বলোতো।
-কীভাবে পেলাম সেটা পরে বলি। আগে তোমার একটা বিচার আছে।
-কী বিচার?
-আমার মেয়েটা এক টুকরো মাংস ভাগে পেতোনা সেই কথা তুমি আমাকে জানালে না? কীভাবে পারলা? টেবিলে সবাই মাংস খায়। আর আমার মেয়ের প্লেটে এক টুকরো মুরগির গিলা পরে ছিলো। এইজন্য আমি বাড়ি থেকে বের হলে তুমি ওকে খাবার দিতে?
আমি চুপ করে আছি। কী জবাব দিবো? ছোট থেকেই ঝগড়া ঝাটি একদম পছন্দ না আমার। পছন্দ না বলতে এসবে ভয় পাই আমি। কখনো কেউ একটু জোরে কথা বললেও কেদেঁ দিতাম। এইজন্য কখনো কারো সাথে লাগতাম না। আমার মা সব সময় আমার কাছে কাছে থাকতো। বড়ো বাড়ির মেয়ে ছিলাম খুবি আদরের কষ্ট কী চোখে দেখিনাই। কখনো কারো সাথে ঝগড়া করার প্রয়োজনও হয় নি। তাই টেবিলে সবাই খেতে বসলে আমি মেয়েকে পরে খেতে দিতাম। ও মাংস চাইবে, মাছ চাইবে। ওর বাবা দেখলে কষ্ট পাবে ঝগড়া হবে। ওই প্রেশার টা আবার আমার আর আমার মেয়ের উপর পরতো এইজন্য কখনো ওকে বলিনি কিচ্ছু।
-তুমি কোনো কথা বলছো না কেনো মায়া?
-সে পুরানো কথা বাদ দাও না। বলোনা কী চাকরি হয়েছে? আর কোথায়?
-শোনো মায়া কথা ঘুরাইয়োনা। তুমি আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে যেই কষ্ট দিছো তা বলার মতোনা।
-আচ্ছা মাফ করো। তোমার মেয়েকে আর কষ্ট দিবোনা।
-এবার বলো কী চাকরি হয়েছে
-তোমার মনে আছে? একবার বলেছিলাম একজন অনেক বড়লোক কাস্টমার এসেছিলো। তার স্ত্রীর দাতে সমস্যা হইছিলো তাকে নিয়ে।আমি চিকিৎসা দেওয়ার পর তার স্ত্রী সুস্থ হয়। তারপর আমাকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিলো খুশি হয়ে। তোমার মনে আছে?
-হ্যা মনে আছে। ওই টাকা দিয়ে মেয়ের জন্য দুধ এনেছিলে। তা নিয়ে মা কতো ঝামেলা করেছিলো। ভুলবো কীভাবে। আমার মেয়ের কপালে সেই দুধ টুকুও জুটতে দেয়নি।।
- তারপর আবার একবার দোকানে আসে। আমার সব কথা জিগ্যেস করে। আমিও পরিস্থিতি খুলে বলি। বলার পর বলে,
-আমাকে আগে বলবে তো?
আমি বললাম,
আপনার ঠিকানা তো নেই আমার কাছে।
একটা কার্ড দিয়ে বললো,
-কালকে তোমার সি ভি নিয়ে এখানে এসো।
-তোমাকে না বলেই আমি ওইদিন ওখানে গিয়েছিলাম। প্রায় এক সপ্তাহ আগের কথা এটা। ওখানে যাওয়ার পর ম্যানেজারের চাকরি টা আমাকে দেয়। বেতন ধরে ৩০ হাজার টাকা।
-কিন্ত এক বারে দেখাতেই এতো টাকা বেতন ধরে ম্যানেজার পদের চাকরি, ব্যপার টা সুবিধার লাগছে না আমার। এই অফিস কোথায়?
-একদিনের না। ওনার স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় ওনি খুব ভয় পেয়ে ছিলেন। ৮ বছরের প্রেমে বিয়ে হয়। নিজের প্রিয়তমা কে খুব ভালোবাসে। আমার চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার কারণে খুবই খুশি হয়। এর পর থেকে মাঝে মাঝেই এখানে আসতো। গল্প করতো। তারপর ওইদিন আমার কথাও জিগ্যেস করলো। এর পরেই সব হলো।
-কিন্ত এই কথা যদি বাড়ির লোক জানে তাহলে কী বলবে জানো? বলবে এই চাকরি হয়েছে। সংসারে টাকা দিতে হবে তাই চলে এসেছি।
-বললে বলুক যা বলার বলুক। বিশ্বাস করো মায়া ওই বাড়ির প্রতি একটু মায়া নেই আর আমার। বাবা মার প্রতি সন্তানের যেই ভালোবাসা থাকে ওই ভালোবাসা যে নেই আমার মধ্যে।
ওই চাকরির জন্যই মিষ্টি নিয়ে গেছিলাম কাল। কিন্তু যখন মা তোমার কথা বললো খুব খুশি লাগছিলো। পরে যখন খাওয়াবো কী পরাবো কী বলে অনেক খোটা দিচ্ছিলো খুব কষ্ট হচ্ছিলো। ওইদিনি মনে মনে বলি চলে যাবো এই বাড়ি থেকে। সকালে যখন মেয়ের সাথে বড়ো ভাবীর ওই রকম ব্যবহার দেখছিলাম তখন নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না। দোকানে গিয়েও মেয়ের সেই কথাটা কানে বাজছিলো "আমাকে মাংস দেও মা" তাই বাধ্য হয়ে বিকেলেই চলে আসলাম বাসায়।
-যা হয় ভালোর জন্য হয়। সৃষ্টিকর্তা সব কিছু ভালোর জন্যই করে। (পেছন থেকে বললো রিফাত)
-এখন চল খেয়ে নিবি। আয়শা যা রান্না করে তা খাওয়ার উপযোগী হয় না। বাইরে থেকে তাই খাবার এনেছি। মৌ(মায়ার মেয়ে) খেয়ে ঘুমিয়েছে।
-এ মা এতো কথা বলতে বলতে আমার মেয়ের কথা ভুলেই গেছি।
-আমি মৌকে ঘুম পারিয়ে দিয়েছি ভাবি। আপনারা এখন খেয়ে নিন।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সুমন একবার দোকানের দিকে গেলো সেখানে যেতেই তাদের বাড়ির খুব কাছের একজনের সাথে দেখা কথা হলো। কথায় কথায় সে বললো,
-সুমন ভাই আপনি নাকি ভাবি আর মৌরে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন?
-হ্যা ভাই। কী করবো বলো। ওই মেয়েটাও তো একটা মানুষ। দুনিয়ার সব কাজ ওরে দিয়ে করায়। তারপর একটু ভালো মন্দ খাবার মাসেও খেতে পারে না। কীভাবে নিজের স্ত্রীর উপর এতো অনাচার সহ্য করি বলো?
-সে ঠিক আছে কিন্তু ভাবির সাথে তো সব সময়ই এমন করতো যখন থেকে এনেছেন। তবে হঠাৎ নেওয়ার কারণ টা বুঝলাম না।
- কী খাবো কোথায় যাবো। কোথায় থাকবো এই সব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তোমার ভাবির উপর ওরা যেই আনাচার অত্যাচার করেছে। এই শাস্তি যদি সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেয়। আমি তো জ্বলে পুরে ছারক্ষার হয়ে যাবো।
-যা করেছেন ভালোই করেছেন। ওই বাড়িতে তো এখন মহা ঝামেলা শুরু হয়েছে। মা আমাকে আপনাকে আরো আগেই ফোনে জানাতে বলেছিলো, আপনার নাম্বার টা আমি হারাই ফেলছি তাই বলতে পারিনি।
-কী ঝামেলা শুরু হয়েছে?
-বাড়ির কাজ কে করবে এই নিয়ে। বড়ো ভাবি মেঝো ভাবিকে বলে মেঝো ভাবি সেঝো ভাবিকে বলো। সেঝো ভাবি আবার খালাকে বলে। সব কাজ পরে আছে। সবাই বাইরে থেকে খাবার এনে খায়। কারো হাতের নখ নষ্ট হয়ে যাবে। কারো হাত দেখতে খারাপ হয়ে যাবে। কারো স্বামী সংসারে টাকা বেশি দেয় তাই সে কাজ করবেনা। আবার খালার কোমড়ে ব্যাথা।
সব মিলিয়ে সবাই পরেছে বিপদে। আবার সেঝো ভাবিতো বলেই ফেলেছে যে, ছোট ভাবির সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করা ঠিক হয় নি। তাদের জন্য নাকি চলে গেছে ছোট ভাবি।
-বুঝোক এখন। কেউ থাকলে আমরা তার মূল্য দিতে জানিনা। এখন যাতে ঠেলা সামলায়। কি হতো ওর হাতে হাতে একটু সাহায্য করলে। তাহলে তো আর আজ এইদিন দেখতে হতোনা।
-এখন ভাইয়া দোকান কী করবেন?
-এইতো আস্তে আস্তে সব নিয়ে যাবো দুই একদিনের মধ্যে। মাল পত্র গুলোই নিতে একটু কষ্ট হবে। ঔষধ তেমন নেই। কারণ দুই মাস ধরে দোকানে ঔষধ উঠাইনি।
-ঠিক আছে সাহায্যের দরকার হলে বলবেন। আর আপনার নাম্বার টা একটা মেছেজ করে পাঠাই দিয়েন ওইদিকের খবর জানাতে পারবো।
-আসলে ভাই ওই দিকের খবর জানার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। তারপরও নাম্বার পাঠাবোনে আমি। আজকে আসি তাহলে। ভালো থেকো ভাই।
-আপনিও ভালো থাকবেন। মিস করবো সুমন ভাই।
সুমন মুচকি হেসে চলে আসলো।
চলবে...,........................................
