#দাদীমা (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
একদিন যে দাদীমাকে পৃথিবীর সব সুখ দিতে চেয়েছিলাম, এখন তাকেই সবচেয়ে বেশি দুঃখ দিলাম। হয়তো আমার কাছে এমন কিছু দাদীমা আশা করেনি। তবে দাদীমা ভুলে গিয়েছিলো, এই দুনিয়ায় ভালোর কোন কদর নেই। ভালোদের আশা পূরণ হয় না। তাদের সঙ্গে সবসময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই ঘটে।
ঘটনার শুরু আমার বিয়ের পর থেকে। চাকরি পেয়ে দাদীকে ভাড়া বাসায় নিয়ে আসার মাস তিনের মাঝে বিয়ে করি। অনার্স জীবনে একজন প্রেমিকা হয়েছিলো। মন তো। এতযুগ মনের আবেগ প্রকাশ পায়নি। তবে নোটস আদান প্রদানের মাধ্যমে তার সঙ্গে খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যেটা পরবর্তীতে ভালোবাসায় রূপ নেয়। তার নাম রিমি। রিমির বাবা, মা আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলো না। আমার যে বাবা, মা নেই। এখন ভালো চাকরি করি তবে আগে তো কিছু ছিলো না। দাদীমা লোকের বাড়ি কাজ করতো। এসব নানা প্রসঙ্গ তুলে বিয়েটা দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে।
তবে বিয়েটা হয়েই যায়। রিমি আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। তার জেদের কাছে প্রথমে তার মা হার মানে। মায়ের মাধ্যমেই বাবাকে বোঝানো হয়। অতঃপর দু’জনের বিয়ে হয়। শুরু হয় নতুন জীবন, নতুন অঙ্গিকার, নতুন অধ্যায়। আমার দাদীমা আমার বউকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলো। রিমিকে দেখে দাদীমার মুখ দিয়ে উচ্চারিত প্রথম শব্দ ছিলো,“মাশা আল্লাহ।”
তার সেই শব্দটা, তার সেই কন্ঠে অন্যরকম খুশি ছিলো। কিন্তু সে কি ঘুনাক্ষরেও টের পেয়েছিলো, তার এই খুশি বেশিক্ষণ টিকবে না। টেকেনি। মাত্র চার মাস। বিয়ের প্রথম দুই মাসেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে রিমি গর্ভবতী হয়ে যায়। আমরা এখন বাচ্চা না চাইলেও অখুশি হইনি। না আমাদের দাদীমা অখুশি হয়েছে। সে তো আমাদের আরও বাচ্চা নিয়ে ভালো পরামর্শ দিতো। তো চার মাস আমাদের ঘরে রিমি এবং দাদীমার সম্পর্কটা সুন্দর ছিলো। তারপর হঠাৎ করেই রিমি দাদীমার নামে অভিযোগ করতে শুরু করে।
সত্যি বলতে দাদীমার বয়স হয়েছে। এখন আর কাজ করার সক্ষমতা নেই। রিমির প্রধান অভিযোগ হলো এটা সে একা হাতে সব সামলায়। একা এত কাজ করা যায়? প্রথম দিকে এসব কথায় আমি গুরুত্ব দিতাম না। আমি ব্যস্ত মানুষ। দিনে বাড়ি থাকি না। আমার পক্ষে সাহায্য করা সম্ভব নয়। দাদীমা বয়স্ক মানুষ। এভাবে বুঝ দিতাম। তবে একদিন রিমি একটা বড় কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। বড়ই বলা যায়। সেদিনও সে একই অভিযোগ দিচ্ছিলো, তার শরীর ভালো না। একা হাতে ঘরের কাজ করতে পারছে না। দাদীমা সারাদিন শুয়ে বসে কাটায়। জবাবে আমি খুবই শান্ত গলায় বলছিলাম,“দাদীমার বয়স হয়েছে। কাজ করার বয়সে করেছে, এখন পারছে না।”
এর জবাবে রিমি খুবই কটাক্ষ করে বলেছিলো,“বয়স হয়েছে কাজের বেলায় খাবার খাওয়ার বেলায় তো বয়স হয়নি। তখন তো সবই গিলে। পারলে তো একটা আস্ত মানুষ গিলে ফেলে।”
“রিমি!”
সেদিন আমি একটু ধমক দিয়েই কথাটা বলি। কারণ আমাদের পাশের ঘরেই দাদীমা থাকে। তার কানে সব কথাই গিয়েছে। রিমি এত জোরে বলেছে যে না যাওয়ার নয়। যে দাদীমা আমায় তার সবটা দিয়ে বড় করেছে, তাকে এখন তার নাতির ঘরে খেতে গিয়ে খোটা শুনতে হচ্ছে। এটা তার জন্য অনেক বড় লজ্জার, অপমানের। সেদিন আমি রাগ দেখিয়েই রিমিকে শান্ত করি।রাতে দাদীমাকে গিয়ে বুঝাই। রিমির কথায় কষ্ট না পেতে। তবে আমাকে বেশি কিছু বোঝাতে হয় না। বরং আমার চমৎকার দাদীমা আমাকে উল্টো বোঝায়, বাচ্চা পেটে আসলে মেয়েদের অনেক পরিবর্তন আসে। অকারণে মেজাজ খারাপ হয়। রিমির দোষ নেই। আমি যাতে রিমিকে না বকি। এই সময়ে আমার রিমির সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা উচিত। আমার স্বামী হিসাবে রিমিকে সাহায্য করা উচিত। তার মনে এই বিশ্বাসটা জন্মানো উচিত যে তার পাশে আমি সবসময় আছি এবং থাকবো।
দাদীমার কথায় আমি খুব খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। দাদীমাই পরামর্শ দিয়েছিলো, আমার এখন একটা কাজের লোক রাখা দরকার। যেহেতু দাদীমা বেশি কিছু পারছে না, রিমিরও কষ্ট হয়। স্বামী হিসাবে এটা আমার নিজ থেকে দেখার কথা। সেখানে দাদীমা বলে দিচ্ছে, আমার তো লজ্জায় ম রা উচিত। মজার ছলে এভাবেই পঁচায় দাদীমা। আমি সত্যি লজ্জা পাই। তারপরই ঘরের অর্ধেক কাজের জন্য একজনকে রেখে দেই। সেটা করতে গিয়ে আরও ঝামেলা বেঁধে যায়। আমার দাদীর কথায় আমি কাজের লোক রেখেছি, রিমির কষ্ট দেখে নয়। এসব কথা নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া করে। আমি বুঝতে পারছিলাম না রিমির সমস্যা। তবে আমার দাদীমা বুঝছিলেন। হয়তো তিনি মেয়ে বলেই মেয়েদের সমস্যা বুঝেছেন। একদিন আমাকে একা ডেকে বুঝিয়ে বলেন, সবকিছুতে রিমিকে প্রধান্য দিতে। আমার স্ত্রীকে সবকিছুতে আমার প্রথমে রাখা উচিত। সেই সঙ্গে তার বয়স হয়েছে, এখন বাচ্চাদের খাবার খাওয়ার বয়স৷ এসব আলাদা না নিয়ে আসলেও হবে। এরকম আরও অনেক কথা বলে। আমার দাদীমা কিন্তু তার বলা একটা শব্দে রিমির কোন দোষ বলেনি। না কোন সমস্যা। শুধু এই ঝগড়া অশান্তির সমাধান দিয়েছেন। যেখান দিয়ে আমি বুঝে যাই সব। আসলে আমার তো কেউ ছিলো না।
আমার মা সেই যে বিয়ে করে গেলো আর কখনো আমার খোঁজ নেইনি। সেই ছোটবেলায় মায়ের জন্য কষ্ট পেতাম। এক ঈদে মাকে দেখার অনেক আবদার করছিলাম। আমার দাদীমা আমায় নিয়ে সেবার মামা বাড়ি যায়। আমার আবদার রাখতে অনুরোধ করে মামাদের। যাতে আমাকে মায়ের মুখটা একবার দেখতে দেয়। তারা আমার করুণ মুখ দেখে মায়াও করছিলো। মাকে ফোন দিয়েছিলো। কিন্তু আমার মা সেদিন এক বাক্যে বলেছিলো সে আমার সঙ্গে দেখা করতে চায় না। আমার দাদীকে তো ঐ বজ্জাত মহিলা আমার সংসার ভাঙার জন্য বাচ্চাকে হাতিয়ার করছে, সেই সঙ্গে আরও বাজে কথা শোনায় দাদীমাকে। দাদীমা সেদিন সব হজম করছিলো। এতকিছুর পরও দাদীমা তার পুরোটা জীবন আমাকে দিয়েছে। আর সেই আমির কাছে তার মূল্য অনেক বেশি থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক তাই না? তো আমার দাদীর বিস্কিট চানাচুর চিপস অনেক পছন্দের। যদিও আমার কথা ভেবে সব শখ আহ্লাদ বাদ দিয়েছে। কিন্তু আমি জানি এসব তার পছন্দের। কারণ যখন ছোট ছিলাম তখন আমাকে যখন এসব কিনে দিতো তখন আমি আমার দাদীর মুখটা দেখতাম। আমি তাকে নিয়ে সাধতাম কিন্তু সে নিতো না। সে বলতো তার এসব পছন্দ না। তার ঐ পছন্দ না কথাটার মাঝে চাপা পড়া তার পছন্দ শব্দটা আমি বুঝে নিয়েছিলাম। আমাদের যে আমি ছাড়া কেউ নেই। তো তাই এখন সার্মথ্য থাকায় রিমি এবং দাদীমা উভয়ের জন্যই আলাদা সব নিয়ে আসি। রিমির জন্য একটা শাড়ী কিনলে দাদীমার জন্যও কিনি। আমার দাদীমাকে দেওয়া এই গুরুত্বটা হয়তো রিমির পছন্দ নয়। সে হয়তো আমার থেকে আলাদা প্রায়োরিটি চায়। সত্যি বলতে আমি কিন্তু আলাদা প্রায়োরিটি দেই। তার পছন্দ যা তাই তো তার জন্য করার চেষ্টা করে। সঙ্গে দাদীমার পছন্দটাও দেখি। এখানে স্বামী এবং নাতি দুটোই হওয়ার চেষ্টা করি। এটা কি দোষের? না তো। তবে রিমি এসব মেনে নিতে পারে না। কেন পারে না জানি না?
এসব দাদীমা বোঝার পর থেকে সে নিজেই সবসময় নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইতো। তার সব পছন্দ বদলে ফেলে। আমি তার জন্য আলাদা কিছু করতে চাইলে সে বারণ করতো। শুধু তাই নয়, এরপর থেকে কখনো কোন খাবারের আবদারও করেনি। দাদীমার এভাবে গুটিয়ে নেওয়ার পর রিমিও শান্ত হয়। ঝগড়া কম করে। দেখতে দেখতে আমাদের বাচ্চাটা হয়ে যায়। বাচ্চা হওয়ার পর রিমি আবার ঝগড়া করতে শুরু করে। বাচ্চাটা মূলত কান্না করে প্রচুর। সন্ধ্যার দিকে ঘুমায়, রাতে জেগে থাকে। সারারাত বাচ্চাকে নিয়ে ভোগ পোহাতে হয় রিমিকে। সঙ্গে ঘরের টুকটাক কাজ তো আছেই। এসব নিয়ে মেজাজ খারাপ। যদিও দাদীমা তার দিক দিয়ে বাচ্চাকে যতটা সম্ভব রাখার চেষ্টা করে। তবে এতে রিমির হয় না। সে এখন সবসময় আফসোস করে কেন আমি অনাথ হলাম? তার ঘরে বুড়ো দাদী শাশুড়ী না থেকে একটা শাশুড়ী থাকলে অন্তত বাচ্চাটার খেয়াল তো রাখতো। আরও অনেক কথা। সেবার ঈদে দাদীমাকে একটা দামী শাড়ী উপহার দেওয়া নিয়েও রিমির সমস্যা হয়। এত দাম দিয়ে ওমন বুড়ো মানুষকে শাড়ী দেওয়ার কি আছে? এসব পড়ার বয়স আছে তার? তার কাছে মনে হয় এটা টাকা অপচয়। অথচ তাকে এবং আমার সন্তানকেও আমি দামী জামাকাপড়ই দিয়েছি। আমি জানি না, কিসের জন্য বা কোন কারণে রিমি দাদীমাকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা শুরু করেছে। তবে ভেবেছে যে তা সঠিক। তাই তো সব বিষয়ে দাদীমার ভুল খুঁজে পায়। সত্যি বলতে আমার দাদীমা বাস্তবেই চমৎকার এক মানুষ ছিলেন। সে মনের ভুলেও কখনো আমার স্ত্রীর নামে বাজে কথা বলতেন না। বরং সবসময় আমাকে আমার বউ সম্পর্কে ভালো কথা বলতেন। প্রশংসা করতেন। আমি আমার দাদীমার এই ভালো গুনটা রিমিকে সবসময় বলতাম। দাদীমার গুরুত্ব আমার জীবনে কতটা তা বলতাম। এসব আমি রিমি যাতে দাদীমাকে ভালোবাসে তাই বলতাম। কিন্তু হতো উল্টো। বরং দাদীমার এত প্রশংসা আমার মুখ দিয়ে শুনে রিমির মনে হতো আমি আমার দাদীমাকে তাদের চেয়ে বেশি ভালোবাসি। তাদের এই দাদীমার জন্য দূরছাই করবো। মনের মধ্যে এসব কিভাবে জন্ম নিলো জানি না। তবে এসবই ছিলো। কিন্তু আমি সত্যি বলতে রিমি এবং আমার ছেলেকেও খুব ভালোবাসতাম৷ সে যাক গে। এভাবে বছর খানে গেলো। এরই মাঝে দাদীমা অসুস্থ হয়ে পড়েন। হঠাৎ স্টোক করে বসেন। যার ফলে বিছানায় পড়ে যায়। তখন অসুস্থ দাদীমার সেবা কাজের মেয়েটার ভাগে পড়ে। দু’টো কাজের মেয়ে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। সেজন্য রিমিকে ঘরের বাকি কাজ করতে হয়। বাচ্চার বয়স বছর পার করেছে। সে এখন আরও বেশি জ্বালায়। বাচ্চা সামলে ঘরের কাজ করতে রিমির কষ্ট হয়। হ্যাঁ আমিও জানি। তবে এখানে দাদীমার দোষটা কোথায়? রিমি দাদীমার দোষ খুঁজে পায়। তার মনে হয় দাদীমা না থাকলে সে এখন বাবার বাড়ি গিয়ে ছয় মাস থাকতে পারতো। সেখানে তার মা ভাবী বাচ্চার দেখাশোনা করতো তার আড়াম হতো। আমিও সেখানে রাতে যেতাম। এখন তো সে গেলেও আমি দাদীমার জন্য যাবো না। তাই সব সমস্যা দাদীমা। রোজই আমার দাদীমাকে নিয়ে অভিযোগ দিতো। আজ এই অভিযোগ, কাল ঐ অভিযোগ। দাদীমা কিন্তু দিক হারায়নি। সে কিন্তু সব বুঝতো। ততদিনে মোটামুটি সুস্থ হয়েছেন। তাই রিমির সব অভিযোগই বুঝতো। একদিন হয়েছে কি, আমি একটা বড় ইলিশ নিয়ে আসি বাজার থেকে। সেটা থেকে বড় দুই পিচ দাদীমাকে দিতে বলছিলাম। রিমি আমার কথা শুনে তখন কিছুই বলেনি। আমি ভেবেছিলাম সে মেনে নিয়েছে। কিন্তু না নেয়নি। সেদিন বাসায় দুপুরের দিকেই এসে পড়ে। শরীরটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। তাই তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে আসি। এসে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আদর করে দাদীমার ঘরে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি দাদীমাকে শুধু সবজি দিয়ে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে কাজের মেয়ে। এটা দেখে আমি অবাক সঙ্গে রাগান্বিত হই। রিমিকে ডেকে বকা দিলে সে কান্না করে। তখন রিমি উল্টো অভিযোগ করে দাদীমার খুধা বেশ বেড়ে গিয়েছে। সে পুরো ইলিশটার অর্ধেকটা মাছ খেয়ে ফেলেছে। এই নিয়ে তিনবার ভাত খাচ্ছে। যদিও এ কথা নতুন নয়। কয়েকদিন ধরেই দাদীমার এসব খাওয়ার কথা শুনি। তাই সত্যিই ভাবছিলাম। তো সেদিন রিমি খুব কষ্ট পায়। সে তখনই রাগ করে বাবার বাড়ি চলে যায়। আর হ্যাঁ তার কথার সাক্ষী কিন্তু কাজের মেয়ে দেয়। যে সত্যি রিমি দাদীমাকে মাছ ভাত দিয়েছে। সেদিন বিকালে রিমি বাবার বাড়ি যায়। দুপুরে রাগ করে ভাতও খায়নি। আমি মানানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু মানেনি। চলে যায়। সেবার গিয়ে চারদিন থাকে। চারদিনের দিন আমি নিয়ে আসতে গেলেও আসে না। উল্টো নানা অভিযোগ দেয় আমার দাদীমার নামে। দাদীমার জন্য আমি তার সঙ্গে সবসময় খারাপ করি এমন অনেক কথা। সেদিন মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। শুধু মন নয়। মাথাটাও। কারণ রিমি আমার সন্তানের সঙ্গে অবধি দেখা করতে দেয়নি। আমি নাকি আমার দাদীমার নাতি। কারো বাবা হওয়ার যোগ্য নই। তাই দেখা করতে দেয়নি। সেই সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে, যেদিন আমার দাদীমাকে বাদ দিয়ে আমি তাদের গুরুত্ব দিতে পারবো সেদিন যেন যাই। তখন তারা আসবে। সেদিন রাগে দুঃখে আমি আমার জীবনের মস্তবড় ভুলটা করে ফেলি। দাদীর ঘরে এসে তাকে কথা শোনাই। অসুস্থ মানুষটাকে অনেক কথা শোনাই। মানুষটা আধো আধো কথা বলতে পারতো। কিন্তু তখন কিছুই বলেনি। শুধু চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়লো যেন। আমি সেটা দেখেও দেখিনি। নিজের ঘরে এসে খুব কাঁদি। রিমিকে খুব ভালোবাসি, দাদীমাকেও। আমি তো সবাইকে নিয়েই আমার একটা পরিবার চাইছিলাম। কিন্তু হচ্ছে না। আমি সবদিক সামলাতে না পেরে ভেঙে পড়ি। দাদীমাকে ওত কথা শোনানোর জন্যও ভেঙে পড়ি।
তবে আমার কাঁদার বাকি ছিলো। সকালে যখন কাজের মেয়ের চিৎকার শুনলাম তখনই মনে হলো দেহ থেকে আত্মাটা বের হয়ে গেলো যেন। সেদিন আমি ভেতর থেকে একদম ম রে গেলাম। কারণ আমার দাদীমা সেদিন চলে যায়। তার শেষ সময়ে আমি তার পাশেও থাকতে পারিনি। এক ফোঁটা পানি তার মুখে দিতে পারিনি। আমার কথার আঘাত সহ্য করতে না পেরেই বোধহয় দাদীমা ঘুমের মধ্যে স্টোক করেন। আর এবার সে চলেই যায়। সেদিন আমি কত কান্না করলাম, দাদীমার পা জড়িয়ে কত মাফ চাইলাম। কিন্তু দাদীমা চোখ মেলে তাকায়নি। আমাকে মাফও করেনি। আমার তখন মনে পড়ে যায়, আমি রাতে দাদীমাকে বলেছি আমার শান্তি চাই। তোমার জন্যই শান্তিটা পাচ্ছি না। রোজ বাড়ি এসে দাদীমার নামে অভিযোগ শুনতে শুনতে আমি শেষ হয়ে গিয়েছিলাম। তাই তো তার ভালো মানুষির বিনিময় আমিও তাকে আঘাতই দিলাম। দাদীমার মৃ ত্যুর কথা শুনে রিমি এবং তার পরিবারও এলো। তবে তাদের দেখার সময় আমার ছিলো না। আমি অনেকটা ভেঙে পড়েছি। তবে ভাঙার মাঝে লক্ষ্য করেছি, বাড়ির কাজের মেয়েটা অনেক কেঁদেছে। তার আমার দাদীমার জন্য এত অল্প দিনে মায়া জন্মে গেলো? অথচ রিমির হলো না। একটু মায়া করে হলেও মানুষটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলো না। তবে কাজের মেয়ের ওমন কাঁদার অন্য কারণ ছিলো। দাদীমার চলে যাওয়ার এক মাস পর জানতে পারি। কাজের মেয়ে তার অনুশোচনা থেকে সব বলে দেয়। আমার দাদীমা বিছানায় পড়ার পর থেকে রিমি তার সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছে। কখনো কোন ভালো খাবার খেতেও দেয়নি। সেদিনও ইলিশ মাছটা দেয়নি। শুধু তাই নয় আমাকে মিথ্যে বলেছে সেটা যাতে ধরা না পড়ে সেজন্য সেদিন রিমি নিজে ভাত খায়নি বলে অর্ধেকের মতো মাছ বিড়ালকে দিয়ে দেয়। এটা শোনার পর আমার ভেতরটা কেমন হয়ে গিয়েছিলো সেটা আমিই জানি। আমার দাদীমার কপালে মাছ জোটেনি অথচ বিড়ালের কপালে জুটেছে? এতটাই মূল্যহীন ছিলো আমার দাদীমা? অথচ তার কাছে আমি সব ছিলাম। আমার ভাগ্যটা যাতে বদলায় যাতে আমাকে দিন মজুরি করে এদিক সেদিক কাজ খুঁজে কোনরকম চলতে না হয় তাই সে নিজের সব বিসর্জন দিয়ে আমাকে পড়ালেখা করিয়েছে। কিন্তু মানুষ বানাতে পারলো না। হ্যাঁ আমিই মানুষ হইনি। নয়তো রিমির তো সব দোষ নয়। আমার দাদীমা আমার সংসারে কেমন রয়েছে সেটার খোঁজ তো আমার রাখার কথা ছিলো। কিন্তু আমি রাখিনি। আমি আমার দাদীমার কথা শুনে স্ত্রীর হক পালণে তার জন্য অনেককিছু করলেও, তার প্রতি বিশেষ নজর দিলেও দাদীমার দিকে দিতে পারিনি৷ আর শেষ সময়ে তো কথার আঘাতে মে রেই দিলাম। পরিশেষে ভালো মানুষদের ভাগ্যটা এমনই হয়। তাই হয়তো আমি মানুষ হতে পারিনি। তবে হ্যাঁ সেদিনের পর রিমির সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা আর বলতে পারিনি। ভেতর থেকে শেষ হয়ে গিয়েছিলাম। রিমি হয়তো বুঝছিলো৷ তাই তো সবসময় মাফ চাইতো। কিন্তু এখন মাফ চেয়ে কি লাভ? ঐ মানুষটা তো নেই। ঐ মানুষটা তো তার সারাজীবনের ত্যাগের বিনিময়ে দুঃখই পেলো। সুখটা তো পেলো না। এখন মাফ চেয়ে কি বা হবে? তবে হ্যাঁ আমার দাদীমা থাকলে মাফ করে দিতো। কারণ তিনি আমার দেখা সেরা মানুষ ছিলেন। যে কখনো কারো প্রতি রাগ জমিয়ে রাখতেন না। আর আমরা তো তার আপন মানুষ। তাই তো তার ভালো মানুষির সুযোগটাই নিলাম। কিছু দিতে পারলাম না তাকে। তার সারাজীবনটা নিয়ে নিলাম। বিনিময়ে শূন্য হাতেই তাকে পাঠিয়ে দিলাম। শূন্য হাতে।
(সমাপ্ত)
(কেমন হয়েছে? হয়তো সেভাবে গুছিয়ে লিখতে পারিনি বা বোঝাতে পারিনি।)
