#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৬+৭
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
আদনান চট্টগ্রাম চলে গেছে আজ তিনদিন। এই তিনদিনে প্রাপ্তি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আদনান চলে গেছে ঠিক এজন্য নয় বরঞ্চ রায়হানের মানসিক অত্যাচারে। বাড়ি থেকে বের হলেই ওর সঙ্গে দেখা হচ্ছে। হুটহাট কোত্থেকে চলে আসে কে জানে! প্রাপ্তির মনে হয় সর্বদাই বোধ হয় ওর ওপর নজর রাখার জন্য লোকজন ঠিক করে রেখেছে রায়হান। বিরক্ত হয়ে ভার্সিটিতে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে প্রাপ্তি। তখন থেকে আবার শুরু হয়েছে ফোনের ওপর জুলুম। একের পর নতুন নাম্বার থেকে ফোন দিচ্ছে আর প্রাপ্তি ব্লক করে রাখছে। বিরক্ত হয়ে সিমও খুলে ফেলল। রায়হান তাতেও সন্তুষ্ট হলো না। এবার সে হোয়াটসএপে ঐসব নাম্বার থেকে কল, ম্যাসেজ করতে থাকে, ফেসবুকে কমেন্ট করে, ম্যাসেজ করে। প্রাপ্তি আর এসব নিতে পারছিল না। সে হোয়াটসএপ আনইন্সটল করে ফেসবুক আইডিও ডিএক্টিভেট করে রাখে। কেউ ওর সাথে যোগাযোগই করতে পারবে না। ভাগ্যিস বাড়িতে ওয়াইফাই আছে। তাই বোরিংনেস কাটাতে সে ইউটিউবে গিয়ে গান, মুভি, ভিডিয়ো দেখতে থাকে। তবে কোনো কিছুতেই স্বস্তি পায় না। এভাবে কতদিনই বা সে ঘরবন্দি হয়ে থাকবে? কতদিন সে সবার সাথে যোগাযোগ অফ রাখবে?
রায়হানের এমন পাগলামি দেখে খারাপও লাগে। আবার সে এটাও বুঝতে পারে যে, এই পাগলামিগুলো ভালোবাসা নয়। রায়হানের মনের ভেতর চেপে থাকা রাগ ও জেদ। সত্যিকার অর্থে সে প্রাপ্তিকে ভালোবাসে না এটা প্রাপ্তি ওর চোখ দেখেই বুঝেছে। এছাড়া রায়হানের হাভভাব কিংবা কথাবার্তায়, আচরণে কোত্থাও ভালোবাসার আভাস অনুভব করেনি। বিষয়টা সে ওর বাবা-মাকেও জানিয়েছে। দ্বিতীয় একটা সুযোগ চাওয়া ব্যতীত অন্য কোনো রকম হ্যা'রা'জ করে না বলে তারা ভেবেছিল হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই তো ঠিক হয়নি। তাই প্রাপ্তির বাবা বলেছেন, রায়হান যদি ফের বিরক্ত করে তাহলে তারা পুলিশের কাছে যাবে। প্রাপ্তি এসব পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে চাইছিল না। এলাকায় তাদের একটা সম্মান রয়েছে। মানুষজন কীভাবে তিল থেকে তাল বানিয়ে ফেলবে এটা সকলের ধারণারও বাইরে। প্রাপ্তির সাথে সুমনা বেগমও একমত পোষণ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় কোনো রাস্তাও তো নেই রায়হানকে সরানোর। তাই প্রাপ্তি ভাবে এবার সে নিজে রায়হানের সাথে কথা বলবে এবং সুন্দর করে বোঝাবে।
পূণরায় ফোনে সিম তুলে রায়হানকে ফোন করে। নিজে থেকেই দেখা করতে বলে। বিকেল চারটা নাগাদ ভার্সিটির সামনে থাকা রেস্টুরেন্টে দুজনে দেখা করে। প্রাপ্তি যাওয়ার আগেই রায়হান অপেক্ষা করছিল। প্রাপ্তি নিঃশব্দে গিয়ে রায়হানের সামনের চেয়ারে বসে।
'কেমন আছো?' জিজ্ঞেস করে রায়হান।
'ভালো আর থাকতে দিচ্ছ কোথায়?'
রায়হান বাঁকা হাসে। চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বসে বলে,'ব্যাক করতে বাধ্য হলে তাহলে?'
'তোমায় কে বলল আমি ব্যাক করতে এসেছি? আমি সবকিছু মিটমাট করতে এসেছি।'
রায়হানের কপালে ভাঁজ পড়ে। হাসার চেষ্টা করে বলে,'মানে?'
'মানে খুব সহজ। তোমার এইসব পেইন আর নেওয়া যাচ্ছে না। আমি বিরক্ত। তোমার প্রতি যেই অনুভূতি আমার ছিল সেটা আর নেই সেদিনের পর থেকে। কেন বুঝতে চাইছ না এই বিষয়টা? ভালোবাসি না আর আমি তোমাকে।'
রায়হান ক্রুর হেসে বলে,'তোমায় কে বলল ভালোবাসার জন্য আমি তোমাকে ফিরে পেতে চাইছি?'
প্রাপ্তি অপ্রস্তুত হয়ে বলে,'মানে?'
'তার আগে এটা বলো তো, আমার চোখে কি তুমি তোমার জন্য ভালোবাসা দেখতে পাও?'
'না।'
'জানি। কারণ আমি যে তোমায় ভালোবাসিই না! যদি ভালোবাসতাম তুমি বুঝতে পারতে। তখন আর আমার থেকে দূরে থাকতে পারতে না। তুমি সব বোঝো বলেই নিজেকে স্ট্রং করে রাখতে পারছ। কিন্তু আমার যে তোমাকে চাই-ই। তোমাকে পাওয়ার জন্য কী না করেছি? বিয়ের প্রস্তাব পর্যন্ত নিয়ে গেলাম সেখানেও আদনান বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। এখন আর কোনো ঝামেলা আমি চাচ্ছি না প্রাপ্তি। তুমি যদি বলো বিয়ে করবে তাহলে আমি তাতেও রাজি। যদি বলো বিয়ে করবে না, তাতেও সমস্যা নেই। কিন্তু কথা একটাই তোমাকে আমার চাই; সেটা এক রাতের জন্য হলেও!'
প্রাপ্তি স্তব্ধ হয়ে রায়হানের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক সেকেণ্ড বাদে সজোরে থা'প্পড় বসায় রায়হানের গালে। রেস্টুরেন্টের উপস্থিত সবাই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রাপ্তির চোখে পানি টলমল করছে অপমানে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
'ভেবেছিলাম অল্পকিছু মনুষ্যত্ব হলেও তোমার মাঝে আছে। কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি বিকৃতি মস্তিষ্কের মানুষ। তোমার কি ধারণা তুমি ঠান্ডা মাথায় থ্রেড দিলেই আমি ভয় পেয়ে যাব? রাজি হয়ে যাব? ভেবেছিলাম তোমায় বুঝিয়ে বললে তুমি বুঝবে। কিন্তু এখন দেখছি তুমি শোধরানোর মতো ছেলে নও। এবার সত্যিই আমি পুলিশের সাহায্য নেব।'
প্রাপ্তি বেরিয়ে যায় রেস্টুরেন্ট থেকে। বাড়িতে না গিয়ে সোজা ফিরোজ ইসলামের অফিসে যায়। পথেই সে বাবাকে ফোন করে রাখে। ওখান থেকে বাবা-মেয়ে থানায় যায়। একটা মানুষকে বারবার সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়। এটাও এক ধরণের অন্যায়।
ফিরোজ ইসলাম আর সুমনা বেগম চিন্তায় পড়ে যান। কতদিন এভাবে তারা প্রাপ্তিকে সামলে রাখবে? খারাপ মানুষেরা কতভাবেই তো ক্ষতি করতে পারে। কাছের আত্মীয়-স্বজনরা বুদ্ধি দেয় প্রাপ্তিকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রথম প্রথম একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলেও পরে তারাও এই সিদ্ধান্তে অটল হয়। ভালো একটা ছেলে খুঁজতে থাকে সবাই প্রাপ্তির অজান্তেই।
থানায় যাওয়ার পর থেকে রায়হান আর ফোন দেয়নি। বাড়ি থেকে বের না হওয়ায় দেখাও হয়নি। প্রাপ্তির মাঝে মাঝেই ইচ্ছে হয় আদনানের সাথে একটু কথা বলার। কিন্তু আদনান তো আদনানই। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ সে। ও চলে যাওয়ার পর যে এতকিছু হয়ে গেল তবুও একটাবার ফোন দিয়ে প্রাপ্তির সাথে কোনো কথা বলেনি। সুমনা বেগম আর ফিরোজ ইসলামের সাথেই ফোনে যা আলাপ করার করেছে। প্রাপ্তিকে একটু ফোন দিলে কী-ই বা এমন হয়?
.
সন্ধ্যায় রুমে বসে ড্রয়িং করছিল প্রাপ্তি। তার আর্ট করার হাত বেশ ভালো। তাই মাঝে মাঝেই সে রং, তুলি, পেপার, পেনসিল এসব নিয়ে বসে। মন খারাপ হলেও আর্ট করতে বসে। এতে সুবিধা এইযে, যতক্ষণ আর্ট করে ততক্ষণ মন আর অন্য কোথাও যায় না।
সুমনা বেগম মেরুন রঙের একটা শাড়ি এনে বললেন,'কী করছিস? আর্ট করছিস? পরে করিস। উঠে আয় এখন।'
প্রাপ্তি সোজা হয়ে বলল,'কেন? শাড়ি এনেছ কেন? কোথাও যাবে নাকি?'
'আরে না! কিছু মেহমান আসবে।'
'তো শাড়ি কেন?'
'তোকে দেখতে আসবে।'
প্রাপ্তি চোখ দুটো কপালে তুলে বলে,'এসবের মানে কী? তোমরা সত্যি সত্যি আমাকে বিয়ে দিতে চাইছ?'
'অসুবিধা কী? আর কেন চাচ্ছি তুই নিজেও সেটা ভালো করে জানিস।'
'রায়হান তো এখন আর আমাকে বিরক্ত করে না, মা।'
'এখন করে না মানে যে পরেও করবে না তার গ্যারান্টি কী? বিপদ কখনো বলে-কয়ে আসে না প্রাপ্তি।'
'মা প্লিজ! তাই বলে বিয়েই একমাত্র সমাধান নয় নিশ্চয়ই?'
'তোর কথা পরে শুনব। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। তোর বাবা উনাদের এগিয়ে আনতে গেছে।'
এখন তর্ক করলে যে ঝামেলা বাড়বে প্রাপ্তি সেটা ভালো করেই জানে। তবে যা-ই হয়ে যাক না কেন, সে বিয়ে করতে চায় না এখন-ই। তার ইনটেনশন অন্যকিছু। জীবনে ভালো কিছু করার পাশাপাশি একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যি হচ্ছে সে আদনানকে ভালোবাসে। এতদিন এটা সে বুঝত আর আজ সেটা আরো বেশি উপলব্ধি করতে পারছে। যতবার সে কল্পনা করছে অন্য কারো সাথে তার বিয়ে হয়ে যাবে, ততবার তার বুক কেঁপে ওঠে। অসহ্য যন্ত্রণা হয়। সে আদনানকে ছাড়া অন্য কাউকে কী করে বিয়ে করবে?
প্রাপ্তিকে সাজিয়ে-গুজিয়ে ছেলেপক্ষের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। বেশ কয়েকজন-ই এসেছে। শুধু ছেলে বাদে। সবাই বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করে প্রাপ্তিকে। ভদ্রতা হোক বা সৌজন্যের খাতিরে হোক; প্রাপ্তি সব প্রশ্নের উত্তর দেয় ঠিকঠাক। সবার-ই প্রাপ্তিকে পছন্দ হয়। যাওয়ার আগে তারা স্পষ্টভাবে-ই বলে যায়, প্রাপ্তিকে তাদের পছন্দ হয়েছে এবং তারা ওদেরকেও বাড়িতে দাওয়াত করে ছেলে দেখার জন্য।
.
.
রুমে এসে শাড়ি-চুড়ি সব খুলে নরমাল ড্রেস পরে শুয়ে ছিল প্রাপ্তি। সুমনা বেগম খুশি খুশি মনে রুমে আসেন। তার হাতে কয়েকটা ছবি। প্রাপ্তি শোয়া থেকে উঠে বসে। সুমনা বেগম প্রাপ্তির চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বলেন,
'আমার সোনার টুকরা মেয়ে! সবার পছন্দ হয়েছে তোকে।'
প্রাপ্তি মলিন মুখে দৃষ্টি নত করে বসে আছে। তিনি ছবিগুলো প্রাপ্তির হাতে দিয়ে বললেন,'ছেলের ছবি। দেখ, সুন্দর আছে।'
তিনি চলে যাওয়ার পর অনিচ্ছায় ছবিটিতে একবার চোখ বুলাল প্রাপ্তি। হ্যাঁ, ছেলেটি আসলে-ই সুন্দর। কিন্তু সৌন্দর্যে কী আসে যায়? সে তো ভালোবাসে আদনানকে। আচ্ছা আদনান কি জানে প্রাপ্তির যে বিয়ের কথাবার্তা চলছে? সে বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করে আদনানকে কল করে। কিন্তু নাম্বার বন্ধ। সারা রাতেও আদনানের নাম্বার আর খোলা পাওয়া যায়নি। পরেরদিন সকালে নাম্বার তো খোলা পাওয়া গেছে, কিন্তু কথা হয়নি। প্রাপ্তির কথা শোনার আগেই আদনান বলেছে,
'অফিসে আছি প্রাপ্তি। ভীষণ ব্যস্ত এখন। একটা প্রজেক্ট নিয়ে খুব সমস্যায়ও আছি। চাকরীটা নাও থাকতে পারে বুঝলি! একটু দোয়া করিস প্লিজ।'
প্রাপ্তির উলটো মন খারাপ হয়ে গেল আদনানের কথা শুনে। নিজের মন খারাপের কথাটি আর বলা হয়ে উঠল না। শুধু ছোটো করে বলল,'আচ্ছা।'
ভার্সিটিতে গিয়ে তৃধা আর অঙ্কিতাকেও বিয়ের কথা শেয়ার করল প্রাপ্তি। সব শুনে ওরা দুজনও বলে,
'বিয়েটা করে ফেললেই তো ভালো হয় প্রাপ্তি। যা শুনলাম ছেলের অবস্থা তো ভালোই। বিয়ের পরও পড়াশোনা করা যায়। তাহলে আর সমস্যা কী বল?'
প্রাপ্তি করুণ দৃষ্টিতে তাকায় বান্ধবীদের দিকে। সবাই ওর ভালোটাই দেখছে। কিন্তু কেউ মনের খবরটা জানতে চাইছে না, বুঝতে চাইছে না। সে মুখ ফুটে এই কথাটি বলতেও পারছে না কাউকে। সে না হয় আদনানকে ভালোবাসে। কিন্তু আদনান! আদনানও কি প্রাপ্তিকে ভালোবাসে?
.
প্রাপ্তির সাথে আদনানের কথা হলো রাতে। অনেক ভয়ে ভয়ে আদনানকে ফোন করেছে। ভেবেছে রাগ-টাগ দেখাবে। কিন্তু এমন কিছুই হয়নি। উলটো আদনান বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে-ই জিজ্ঞেস করেছে,
'কী ব্যাপার? কেমন আছিস?'
প্রাপ্তি ছোটো করে বলল,'ভালো। তুমি?'
'আলহামদুলিল্লাহ্।'
'খেয়েছ?'
'হ্যাঁ।'
কথা আগাচ্ছিল না। আদনান বোধ হয় এখনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত। প্রাপ্তি একটুখানি সময় চুপ করে থেকে বলল,
'গতকাল পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল আমায়। রায়হানের জন্য সবাই চাচ্ছে আমায় বিয়ে দিয়ে দিতে।'
আদনান ভাবলেশহীনভাবে বলল,'জানি।'
অবাক হয় প্রাপ্তি। জেনেও এত স্বাভাবিক রিয়াকশন। সে বিস্মিতকণ্ঠে-ই জানতে চাইল,'তুমি জানো?'
'সব-ই জানো। ছেলে এবং ছেলের পরিবার তোকে অনেক পছন্দ করেছে। তোর বাড়ির লোকজনেরও ছেলেকে এবং ওর পরিবারকে ভালো লেগেছে। আজকে ছেলে দেখতে গেছিল তোর বাবা জানিস? কাল-পরশু বিয়ের জন্য ফাইনাল ডেটও ফিক্সড করে ফেলবে। আর তোর জন্য একটা সুখবরও আছে। বিয়ের পর বরের সাথে পার্মানেন্ট কানাডায় থাকবি। আরামে, সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাবি। কী কপাল রে তোর প্রাপ্তি!'
প্রাপ্তি স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আদনানের কথা বলার ভঙ্গিতে-ই বোঝা যাচ্ছে, প্রাপ্তির বিয়ে হবে শুনে সেও খুশি। আদনান একটু আনমনা স্বরে বলল,
'ভাবতেই কেমন অবাক লাগে তাই না? সেই ছোট্ট প্রাপ্তি নাকি এত বড়ো হয়ে গেছে যে, তার এখন বিয়েও হবে।'
প্রাপ্তি ফোনের লাইন কেটে দিলো। আর কিছু বলার নেই তার। আদনান দু'বার কল ব্যাক করা সত্ত্বেও প্রাপ্তি আর ফোন রিসিভ করেনি। দু'চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছে তার। কেন এত কষ্ট হচ্ছে কে জানে! আদনান না ভালোবাসুক তাতে তো সমস্যা নেই। কিন্তু আদনান ব্যতীত অন্য কাউকে সে বিয়ে করবে এটা তো ভাবতেই পারছে না। কল্পনা করাও দুষ্কর।
_____________
ঘুমানোর আগে সুমনা বেগম প্রাপ্তির রুমে একবার আসেন। মন খারাপ করে শুয়ে ছিল প্রাপ্তি। সুমনা বেগম পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন,
'ছেলেকে দেখে এসেছে আজ তোর বাবা। ছেলে ভদ্র, সুন্দর। পরিবারও অনেক ভালো। দুই পরিবারের-ই সম্মতি আছে। ছেলেও তোকে খুব পছন্দ করেছে। রায়হানের সাথে তোর এখন আর সম্পর্ক নেই জানি। কিন্তু তবুও জানতে চাচ্ছি, তুই কি রায়হানকে এখনো ভালোবাসিস কিংবা অন্য কাউকে?'
প্রাপ্তির চোখের কোণা বেয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে। চোখের দৃশ্যপটে আদনানের মুখটি ভেসে ওঠে। গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,'না।'
'যাক, আলহামদুলিল্লাহ্। বিয়েতে অমত আছে?'
'না।'
'আলহামদুলিল্লাহ্, আলহামদুলিল্লাহ্, আলহামদুলিল্লাহ্।' বলে তিনি প্রাপ্তির মাথায় চুমু খেয়ে বললেন,
'ছেলে তোকে ফোন দিবে আজ। কথা বলিস। আর তোরা কাল সময়-সুযোগ বুঝে দেখা করে নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিস।'
প্রাপ্তি আর কিছুই বলল না। সুমনা বেগম যাওয়ার আগে রুমের লাইট নিভিয়ে দিয়ে যায়। অন্ধকার রুমে হুহু করে কেঁদে ওঠে প্রাপ্তি।
#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৭
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
_______
সারারাত কান্নাকাটি করে করে চোখ-মুখ ফুলে গেছে। মাথাও প্রচণ্ড ব্যথা করছে। ঘুম হয়নি তাই চোখেও অসহ্য রকম যন্ত্রণা হচ্ছে। রাতে বেশ কয়েকবার আননোন নাম্বার থেকে ফোন এসেছিল। নাম্বারটি অপরিচিত হলেও প্রাপ্তি বুঝতে পেরেছিল সেই ছেলেটাই ফোন করেছে যার সাথে তার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। ভোর ছ'টা নাগাদ ক্লান্ত হয়ে চোখে ঘুম ঘুম ভাব চলে এসেছিল। নয়টায় এসে সুমনা বেগম ঘুম থেকে জাগিয়ে রেডি হতে বলে দিয়েছেন। আর একটা নাম্বারও দিয়ে গেছেন। প্রাপ্তি জানতে চেয়েছিল,
'এটা কার নাম্বার?'
সুমনা বেগম চলে যাওয়ার আগে মুচকি হেসে বলেছেন,'শান্তর। তোকে ফোন করে কোথায় দেখা করবি জায়গা ঠিক করে নিতে বলেছে। আর তোর চোখ-মুখের কেন এই অবস্থা হয়েছে? সারা রাত কি ঘুমাসনি?'
প্রাপ্তির কান্না উপচে আসতে চাইছে। সে কোনো রকম নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,'ঠাণ্ডা লেগেছে হুট করে। তুমি নাস্তা রেডি করো।'
তিনি চলে যাওয়ার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শব্দ করে কেঁদে ওঠে প্রাপ্তি। পরক্ষণেই মুখের ওপর হাত চেপে ধরে। কী অসহ্য যন্ত্রণা বুকের ভেতর প্রলয়ঙ্করী ঝড় তুলছে প্রাপ্তি কাউকে সেটা বোঝাতে পারবে না। নিজেকে সামলে নেয়। এভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে পানি দিয়ে আবার ফিরে আসে। লং সাদা টপস্ এর সাথে হালকা নীল রঙের একটা জিন্স পরেছে সে। গলায় প্রিন্টের কালারিং স্কার্ফ। চুলগুলো উঁচু করে ঝুটি করে নিয়েছে। হাত ঘড়ি পরতে পরতে ড্রেসিংটেবিলের ওপর থেকে কাগজটি তুলে নেয়। শান্তর সাথে কথা বলে জেনে নেয় কোন কফিশপে যাবে।
সময়ের একটু আগেই সে বাড়ি থেকে বের হয়। বিধ্বস্ত, ভাঙা মন নিয়ে সে পথ চলতে শুরু করে। কফিশপে গিয়ে দেখতে পায় শান্ত আগে থেকেই অপেক্ষা করছে। প্রাপ্তি কফিশপে ঢোকা মাত্রই শান্ত হাত উঁচু করে ইশারা করে। প্রাপ্তি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়।
দুজনে চুপচাপ মুখোমুখি বসে আছে। কেউই কোনো কথা বলছে না। নিরবতা কাটাতে শান্ত নিজে থেকেই বলল,
'আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?'
প্রাপ্তি মুখ তুলে তাকাল। স্মিত হেসে বলল,'না।'
'কিছু অর্ডার করুন।' মেন্যু কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলল শান্ত।
'এখানে চা আর কফি ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না।'
শান্ত একটু যেন আপসেট হলো। সেভাবেই বলল,'ওহ! তাহলে অন্য কোথাও দেখা করলেন না কেন? প্রথমবার মিট করছি আমরা। শুধু চা, কফি খাওয়াব?'
'এটাই এনাফ।' বলে প্রাপ্তি ওয়েটারকে ডেকে দু'কাপ কফি অর্ডার করে।
শান্ত কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তাকিয়ে থাকে। প্রাপ্তি নিজেও স্বস্তি পাচ্ছিল না। গতকাল এতগুলো ফোন করার পরও কেন সে ফোন রিসিভ করেনি জানতে চাইলে কী বলবে?
'স্যরি।'
ভাবনায় পানি ঢেলে প্রাপ্তি অবাক হয়ে তাকায় শান্তর দিকে। এক হিসেবে স্যরি তো তার বলার কথা। তাহলে শান্ত কেন বলছে? প্রাপ্তির প্রশ্ন করতে হলো না। শান্ত নিজে থেকেই বলল,
'গতকাল আমার ফোন করার কথা ছিল। কিন্তু আপনার নাম্বারটা আমি ভুল তুলেছিলাম। মানে সব ঠিকঠাক ছিল। শুধু একটা ডিজিট কম তুলেছিলাম। বিষয়টা খেয়াল করেছি রাতে আপনাকে কল করতে গিয়ে। আব্বুর কাছে যে চাইব তাও পারিনি। লজ্জা লাগছিল আরকি!'
প্রাপ্তি এখনো বিস্ময় নিয়েই তাকিয়ে রয়েছে। শান্ত যদি কল না করে তাহলে এতগুলো কল আর কে করবে? তাও আবার আননোন নাম্বার থেকে। রায়হান না তো? আবারও কি বিরক্ত করা শুরু করেছে? নাকি অন্য কেউ! প্রশ্নে প্রশ্নে তার মাথাই খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। শান্তর সামনেও স্বাভাবিক থাকতে পারছিল না। এর মাঝেই কফি এসে পড়ে। শান্ত নিজেও চুপচাপ আর শান্ত স্বভাবের। প্রাপ্তির মতোই চুপচাপ থাকার ভূমিকা পালন করছে। কথা একদমই আগাচ্ছিল না। অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে বসে থাকা প্রাপ্তি বলল,
'তারপর?'
'আমার সম্পর্কে কিছু জানার আছে?'
'আমি আসলে তেমন কিছুই জানি না। তো, আপনি চাইলে বলতে পারেন।'
'নাম তো নিশ্চয়ই জানেন। শান্ত। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। ছোটো একটা বোন আছে। গত বছর বিয়ে হয়েছে ওর। বর্তমানে আমি কানাডায় জব করি। পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই জব করে সেটেলড্ হয়ে গেছি। ছুটিতে এসেছিলাম বাংলাদেশে। বাবা-মা চেপে ধরেছে এবার বিয়ে করতেই হবে। আমিও ভাবলাম, বয়স তো আর কম হয়নি। এবার বিয়েটা করাই উচিত।'
এতগুলো কথার পিঠেও প্রাপ্তি কিছুই বলতে পারল না। শান্ত একটু ইতস্তত করেই বলল,'একটা রিলেশনও ছিল আমার। কিন্তু মেয়েটার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়। তখন আমি অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়তাম।'
'আপনাকে কেন বিয়ে করেনি?'
শান্ত হাসার চেষ্টা করে বলল,'জানিনা! অনেকবার কারণ জানতে চেয়েছিলাম। বলেনি।'
'ওহ।'
'কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতাম।'
'জি।'
'আপনার অন্য কোথাও সম্পর্ক আছে? পরিবারের চাপে বিয়ে করছেন না তো?'
'ছিল। এখন আর নেই।'
'ফাইন।'
শান্তর বলার মতো কিছু ছিল না। এদিকে প্রাপ্তি অস্থির হয়ে আছে কতক্ষণে বাড়িতে যাবে। ঐ নাম্বারটা সে যার ভাবছে তার নয়তো? এটাই জানতে হবে আগে।
কফি শেষ দুজনের। শান্ত টেবিলের ওপর দু'হাত রেখে বলল,'দেখুন, একটা কথা আমি আপনাকেই সরাসরি বলতে চাই। ছবি দেখেই আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। সামনা-সামনি দেখে ভালোলাগা আরো বেড়েছে। সো, আমার কোনো সমস্যা নেই বিয়েতে। ভয় নেই, আপনাকেও এখনই কিছু বলতে হবে না। আমাকে দেখে পছন্দ হয়েছে কিনা, অথবা আমায় নিয়ে কোনো সমস্যা আছে কিনা এসব বাড়িতে গিয়ে বললেই হবে।'
প্রত্যুত্তরে প্রাপ্তি মৃদু হাসল শুধু। শান্ত বাইকে করে বাড়ি অব্দি এগিয়ে দিতে চেয়েছিল। প্রাপ্তি রাজি হয়নি আর শান্তও জোর করেনি। প্রাপ্তির ইচ্ছেকেই সম্মান জানিয়েছে। প্রাপ্তির যাওয়ার জন্য একটা রিকশা ঠিক করে দিয়েছে শুধু।
_____________
হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ফিরে বিছানায় বসে ফোনের নাম্বারটি ভালো করে দেখে প্রাপ্তি। গতকাল রাতে ফোন আসা নাম্বারটির সাথে কাগজের নাম্বারটির মিল নেই। তাহলে রাতে কে ফোন করেছিল? আদনান নয়তো? সে কৌতুলহল-বশত রাতের নাম্বারটিতে কল করে। তিনবার রিং হওয়ার পর ফোন রিসিভ করে ওপাশ থেকে বলে,
'হ্যালো।'
প্রাপ্তির বুক কেঁপে ওঠে আদনানের কণ্ঠ শুনে। সে ঠিক শুনছে তো? নাকি কোনো ঘোরের মধ্যে আছে। ওপাশ থেকে একই কণ্ঠ ভেসে এলো,
'হ্যালো? প্রাপ্তি?'
প্রাপ্তি কান থেকে ফোনটি সরিয়ে নাম্বারটি আবার দেখে। ওপাশ থেকে আবারও ভেসে আসে,
'কথা বলছিস না কেন? শুনতে পাচ্ছিস?'
প্রাপ্তি ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,'হু।' অজান্তেই মনে আশার আলো দেখতে পায়। আদনান ফোন করেছিল গতকাল! কিন্তু কেন? কেন সে অন্য নাম্বার থেকে এতবার তাকে ফোন করেছিল? তবে কি আদনানও? উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপা শুরু হয়ে গেছে প্রাপ্তির।
আদনান বলল,'রাতে এতবার ফোন দিলাম ধরিসনি কেন?'
'এই নাম্বার কার?'
'আমারই। ঐ সিমে টাকা নাই। তাই এই নাম্বার থেকে কল করেছিলাম।'
প্রাপ্তি নিশ্চুপ। কাঙ্ক্ষিত কথাগুলো শোনার জন্য অপেক্ষা করছে সে।
আদনান বলল,'কেন রিসিভ করিসনি?'
প্রাপ্তি সত্যি কথাটাই বলে দিল,'আমি ভেবেছিলাম ঐ ছেলে ফোন করেছিল।'
'কার কথা বলছিস? শান্ত ভাইয়া?'
'হুম।'
'তার ফোন করার কথা ছিল নাকি? আচ্ছা যদি সে-ই ফোন করত? কেন ধরিসনি?'
'কথা বলতে ইচ্ছে করেনি। তুমি কেন এতবার ফোন করেছিলে?'
'তুই ওভাবে ফোন রেখে দিলি তাই! এসব বাদ দে। যার সাথে বিয়ের কথা প্রায় ঠিক, তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না?'
প্রাপ্তি হতাশ হয়ে বলে,'তুমি এমনিই ফোন করেছিলে?'
'তোকে ফোন করতে এখন কারণও লাগবে? ওহহো! তোর তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ক'দিন পর তুই অন্য কারও বউ হয়ে যাবি। তোকে তো আর এমনি এমনি কারণ ছাড়া ফোন করা যাবে না।'
'আদনান!' ফুঁপিয়ে ডাকে প্রাপ্তি।
আদনান কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে সিরিয়াস হয়ে বলে,'প্রাপ্তি! কী হয়েছে? কাঁদছিস তুই?'
প্রাপ্তির কান্নার গতি বাড়ে। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে সে। ওপাশ থেকে আদনান বলে,
'কেন কাঁদছিস তুই? একটা সত্যি কথা বলবি?'
প্রাপ্তি তখনও কাঁদছিল। আদনান বলে,'তুই কি এখনো রায়হানকে ভালোবাসিস?'
কান্না থেমে যায় প্রাপ্তির। স্তব্ধ হয়ে যায় সে আদনানের কথা শুনে। প্রাপ্তির কান্না করার কারণ সে এটা ধরে নিল? অন্য কিছু আর তার মাথায় এলো না?
সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,'না।'
এরপর ফোন রেখে চোখের পানি মুছে নিল। প্রচণ্ড অভিমান এসে বুকে ভর করেছে। এতদিন আদনানের হাভভাব, কথা বলার ভঙ্গিতে মনে হতো সে আসলে যেই হূরপরীর কথা বলে, সেটা প্রাপ্তি নিজেই। বুঝতে অনেকটা দেরি হলেও যে পরে সে সত্যিটা ধরতে পেরেছিল এটা ভেবেই সে আনন্দিত ছিল। কিন্তু না! সে তো ভুল। সে আদনানের হূর নয়। তার হূর অন্য কেউ। সে কেউ নয় আদনানের। কেউ না! অভিমানি প্রাপ্তি তৎক্ষণাৎ বাবা-মায়ের রুমে গিয়ে বলে,
'উনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। এই বিয়েতে আমি রাজি।'
.
প্রাপ্তির সম্মতি মুহূর্তেই যেন পুরো বাড়িতে বিয়ের আমেজ নিয়ে এসেছে। ফিরোজ ইসলাম, সুমনা বেগম সবাইকে ফোন দিয়ে এখনই এই সুখবরটি জানিয়ে দিচ্ছে। শান্তর পরিবার রাতে আসবে বিয়ের পাকা কথা বলতে। এই ব্যাপারে প্রাপ্তির কোনো মতামত আছে কিনা জানতে চাইলে প্রাপ্তি জানায়, দু'মাস পর তার অনার্স প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা। তাই পরীক্ষা শেষেই সে বিয়েটা করতে চায়। দুই পরিবারের কেউই কোনো আপত্তি করেনি। কথা হয়, বিয়ে দু'মাস পরে হলেও এঙ্গেজমেন্ট এখনই হবে। এঙ্গেজমেন্ট শেষে শান্ত ফের কানাডা চলে যাবে। প্রাপ্তির পরীক্ষা শেষ হলে ওখান থেকেই বিয়ের শপিং করে নিয়ে আসবে।
এঙ্গেজমেন্টের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে একদম ঘরোয়াভাবে। মেহমান বলতে কাছের আত্মীয়-স্বজনরা এসেছে শুধু। আদনান কাজের প্রেশারে আছে তাই আসতে পারেনি। প্রাপ্তি মনে মনে এটাই চেয়েছিল। কে জানে, আদনান এলে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারত কিনা! বেশ সুষ্ঠুভাবেই এঙ্গেজমেন্ট সম্পন্ন হয়। মেহমান সব চলে যাওয়ার পর প্রাপ্তি ঘরে গিয়ে দরজা লক করে দেয়। এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা কান্নাগুলো আর আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। সে কোনোভাবেই আদনানকে মন থেকে সরাতে পারছে না। কীভাবেই বা সরাবে? হুট করে মানুষ ভালোবাসতে পারলেও, হুট করে যে ভুলে যাওয়া যায় না। আর এই অনুভূতি, নিয়মটা বড্ড বাজে। বড্ড! কেন মানুষ তার নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না? এই অবাধ্য মনটা বারবার তার মালকিনের অবাধ্য হয়ে অন্যের জন্য কাঁদবে কেন? এত এত কেন-র কোনো উত্তর প্রাপ্তির কাছে নেই। সে যে বড্ড অসহায়, নিঃসঙ্গ।
এঙ্গেজমেন্টের পর থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে শান্ত ফোন দিত প্রাপ্তিকে। কথা খুব বেশি এগোতো না। কারণ বেশিরভাগ সময়ই কথা বলার অভাবে প্রাপ্তি চুপ করে থাকত। কী বলবে খুঁজেই পেত না। শান্ত অবশ্য বিরক্ত হতো না। সেও নরমাল কথাবার্তা বলে ফোন রেখে দিত। পাশাপাশি প্রাপ্তি এবার পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেবে বলে মন স্থির করল। সারাক্ষণ আদনানের বিরহে পুড়লে পরীক্ষা তো আর ভালো হবে না। রেজাল্ট ভালো না হলে দেখা যাবে, ঐ মানুষটাই সবচেয়ে বেশি কথা শোনাবে। পড়তে বসেও প্রাপ্তি খেয়াল করে তার মন পড়ার মধ্যে নেই। কিছুক্ষণ পরপর সে ভারী নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। পরক্ষণেই আবার সে নিজেকে মানিয়ে নেয়। এতটা অস্থির হয়ে পড়লে তো সমস্যা। বই বুকে জড়িয়েই সে শুয়ে পড়ে। সুমনা বেগম তখন রুমে প্রবেশ করে বলেন,
'কীরে শুয়ে আছিস যে? শরীর খারাপ?'
প্রাপ্তি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,'না, ঠিক আছি। বলো।'
'চোখ-মুখের কী অবস্থা! যা মুখটা ধুয়ে নে। একটু ভালো করে থাকতে পারিস না এখন? শান্ত এসেছে। তাড়াতাড়ি আয়।'
প্রাপ্তি নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। সুমনা বেগম যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন। ফের পিছু তাকিয়ে বললেন,
'ওহ আদনানও এসেছে। শান্তর সাথে গল্প করছে বসে। তুই আয় তাড়াতাড়ি।'
আদনান এসেছে শুনে বুক কেঁপে ওঠে প্রাপ্তির।
চলবে...
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ।
আমার জন্য সবাই একটু দোয়া করবেন। সবাইকে অগ্রিম ঈদ মোবারক।]
চলবে...
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ।]
