#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৮+৯+১০
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
___________________
বইখাতা সব গুছিয়ে খুব ধীরেসুস্থেই ড্রয়িংরুমের দিকে এগুলো প্রাপ্তি। অথচ আদনানকে দেখার আকুতি, বুকের ভেতর বয়ে চলা ঝড় সবকিছুই হচ্ছে প্রচণ্ড গতিতে। তবুও সে নিজেকে বাইরে থেকে সহজ এবং সাবলীল দেখাচ্ছে অথবা নিজেকে খুব স্বাভাবিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।
প্রাপ্তি দূর থেকেই দেখতে পেল আদনান আর শান্ত হেসে হেসে কথা বলছে। অচেনা কেউ দুজনকে এখন দেখলে ভেবেই বসবে যে, দুই বন্ধু গল্প করছে; যাদের বন্ধুত্বও আবার ভীষণ গাঢ়। সুমনা বেগম ট্রে হাতে নিয়ে কিচেন থেকে বের হচ্ছিলেন। প্রাপ্তিকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
'এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?'
তার কণ্ঠস্বরকে উদ্দেশ্য করেই আদনান এবং শান্ত দুজনেই প্রাপ্তির দিকে ফিরে তাকায়। প্রাপ্তিও একবার সেদিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিল।
'এটা নিয়ে যা।' প্রাপ্তির হাতে খাবারের ট্রে ধরিয়ে দিয়ে সুমনা বেগম ফের রান্নাঘরে চলে গেলেন।
প্রাপ্তির হাত অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছিল। এমনকি সামনে আগাতে গিয়ে খেয়াল হলো তার পা-ও কাঁপছে। অথচ এমনটা কেন হচ্ছে সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না। সামনে গিয়ে সে চায়ের কাপ আগে শান্তর দিকে এগিয়ে দেয়। শান্ত কাপটি হাতে নিয়ে বলল,
'আপনার হাত কাঁপছে কেন?'
প্রাপ্তি অস্বস্তিতে একটু হাসার চেষ্টা করল। শান্ত মৃদুভাবে প্রাপ্তির হাত ধরে পাশে বসাল। ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞেস করল,
'অসুস্থ আপনি? চোখ-মুখ এমন কেন? মনে হচ্ছে শরীর দুর্বল।'
'না, না ঠিক আছি আমি।' বলে অন্য চায়ের কাপটি তুলতে যাওয়ার আগেই আদনান বলল,
'তুই বোস। আমি নিয়ে নিচ্ছি।'
প্রাপ্তি কিছুটা স্থির হয়ে বসে রইল। অনেকটা কাঠের পুতুলের মতোই বলা চলে। সে না তাকিয়েও স্পষ্ট বুঝতে পারছিল চার জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ তাকেই জরিপ করছে।
সে অস্বস্তিকর মুহূর্ত এড়াতে দুজনের উদ্দেশ্যেই বলল,'চা তো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।'
দুজনে এবার চায়ের কাপে চুমুক দেয়। আদনান ওদেরকে স্পেস দিয়ে চায়ের কাপ নিয়েই রান্নাঘরে সুমনা বেগমের কাছে চলে যায়। শান্ত তখন বলে,
'আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত?'
'আমি? কই না তো!'
'তাহলে এমন লাগছে কেন? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া'ও বোধ হয় করছেন না।'
'না আসলে সামনে পরীক্ষা তো তাই আরকি...'
'পরীক্ষা তো কী হয়েছে? খাওয়া-দাওয়া সব বাদ দিয়ে শুধু টেনশন করলেই হবে? প্লিজ প্রাপ্তি! নিজের যত্ন নেবেন।'
প্রাপ্তি তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। প্রত্যুত্তরে শান্তও মৃদু হাসে। সে পাশ থেকে একটা প্যাকেট নিয়ে বলে,
'এটা আপনার জন্য।'
'কী আছে এখানে?' প্যাকেট হাতে নিয়ে জানতে চাইল প্রাপ্তি।
'শাড়ি।'
'হঠাৎ শাড়ি কেন?'
'মনে হলো শাড়িটিতে আপনাকে অনেক মানাবে। আপনার পছন্দ না হলে পরার দরকার নেই।'
প্রাপ্তি শাড়িটা না দেখেই শান্তর মন রক্ষার্থে বলল,'অবশ্যই পছন্দ হবে। আর শাড়িটা আমি পরবও।'
শান্ত হেসে বলল,'মাই প্লেজার।'
এরপর সে হাত ঘড়িতে সময় দেখে বলল,'এখন আমায় যেতে হবে। একটা কাজ আছে।'
'খেয়ে যাবেন না?'
'উঁহু! অন্য একদিন।'
শান্ত সুমনা বেগমের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার আগে আদনানকেও বলে যায় যোগাযোগ রাখার জন্য। প্রাপ্তি রুমে চলে যাওয়ার সময় আদনান পেছন থেকে ডেকে বলে,
'এটা নিবি না?'
প্রাপ্তি পিছু ফিরে তাকায়। আদনানের হাতে শাড়ির প্যাকেট। সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার এগিয়ে আসে। আদনান ততক্ষণে প্যাকেট খুলে শাড়িটা বের করে উচ্ছ্বাসিতকণ্ঠে বলে,'ওয়াও!'
প্রাপ্তি নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আদনান ফের বলল,'শাড়িটা ভীষণ সুন্দর হয়েছে রে প্রাপ্তি। তোকে দারুণ মানাবে।'
প্রাপ্তি কোনো প্রকার বাক্য বিনিময় না করেই নিজের রুমে ফিরে আসে। আদনানও যায় যায় পিছু পিছু।
'এভাবে চলে আসলি কেন?' জানতে চাইল আদনান।
প্রাপ্তি কিছু না বলেই খাটের ওপর থেকে বইগুলো নিয়ে স্টাডি টেবিলে রাখছিল। উত্তর না পেয়ে প্রাপ্তিকে টেনে আয়নার সামনে দাঁড় করায় আদনান। বিরক্তিতে প্রাপ্তি সরে যেতে চাইলে আদনান পেছন থেকে শাড়িটি প্রাপ্তির মাথায় দিয়ে মুখটা আয়নার দিকে ধরে বলে,
'দেখ-ই না একবার, সত্যিই তোকে কত সুন্দর লাগছে শাড়িটিতে।'
আয়নার দিকে তাকাতেই বিরক্তিতে কুঁচকে থাকা চোখ-মুখ স্বাভাবিক হয় তার। মাথার ওপর থাকা সোনালী পাড়ের আকাশী শাড়িটি তার নজর কাড়েনি। তার দৃষ্টি তো আটকে আছে আদনানের হাস্যোজ্জ্বল মুখটির দিকে। সে বুকের ভেতর প্রচণ্ড চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে। কোনো কিছু না ভেবেই বলে ফেলে,
'ভালেবাসি! ভালোবাসি আদনান।'
আদনানের হাসি হাসি মুখটা নিভে যায় যেন। শাড়িটি রেখে সরে দাঁড়ায়। প্রাপ্তি মাথা নত করে চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছে। পরক্ষণেই আদনান হাসতে হাসতে বলে,
'বাপরে! শান্ত ভাইয়াকে এখনই এত ভালোবাসিস?'
প্রাপ্তি চোখ তুলে তাকায় আদনানের দিকে। কিন্তু অবাক হয় না। সে তো আদনানকে চেনে। তার এই স্বভাবও সে জানে। তাই শাড়িটি বিছানার ওপর রেখে আবারও বইগুলো হাতে নেয়। আদনান বলে,
'তুই আমাকে এমন ইগনোর করছিস কেন?'
'ইগনোর কেন করব?'
'অবশ্যই ইগনোর করতেছিস।'
'তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি তোমায় ইগনোর করছি?'
'তোর ব্যবহারে।'
'ওহ আচ্ছা।'
'কী আশ্চর্য! কথা বলার ধরণও কেমন পাল্টে গেছে তোর।'
প্রাপ্তি এবার আদনানের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলে,'তাই? জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটাকেই পাল্টে যখন অন্য একজনের হতে হচ্ছে, তখন কথা আর এমন কী?'
আদনান বুঝতে না পেরে বলল,'মানে? কী বললি কিছুই বুঝলাম না।'
'কিছু বলিনি। এঙ্গেজমেন্টের অনুষ্ঠানে আসোনি কেন?'
'ওহ তুই এজন্য রেগে আছিস? কাজের খুব প্রেশার ছিল রে।'
'এখন হঠাৎ এলে কেন?'
'একটা চাকরীর ইন্টার্ভিউ দিতে। চাকরীটা যদি হয়ে যায় তাহলে ঢাকাতেই চলে আসব।'
'তাহলে তোমার পড়াশোনা?'
'পরীক্ষার সময় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসব। ফ্রেন্ডের বাসায়ও থাকতে পারব ঐ কয়েকটা দিন। ওটা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।'
'ভালো।'
.
.
আদনান চাকরীর ইন্টার্ভিউ দিয়ে পরের দিনই আবার চট্টগ্রাম ফিরে গিয়েছে। তার পাঁচদিন পর-ই শান্ত কানাডায় ব্যাক করেছে। সেদিন এয়ারপোর্টে যাওয়ার কথা থাকলেও অসুস্থতার জন্য প্রাপ্তি যেতে পারেনি। শান্ত অবশ্য কানাডায় পৌঁছিয়ে প্রাপ্তিকে ইনফর্ম করেছে। দেশে থাকাকালীন সময়ে শান্ত যতটা ফ্রি ছিল, কানাডায় যাওয়ার পর তার ব্যস্ততা দ্বিগুণ বেড়েছে। যেহেতু বিয়ের জন্য দু'মাস পর আবার তাকে বাংলাদেশে আসতে হবে তাই এখন কাজের প্রেশারও বেশি। তিনবেলা নিয়ম করে কথা বলার সুযোগ না হলেও প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিয়ম মেনেই প্রাপ্তিকে কল করে সে। নিয়মের ব্যাঘাত ঘটে প্রাপ্তির বেলাতে এসে। মাঝে মাঝে সে এড়িয়ে যায়। কথা বলতে ইচ্ছে করে না। প্রচণ্ড অনিহা নিয়ে কথাও চালিয়ে যাওয়া যায় না। অথচ কিছুদিন পর থেকে এই মানুষটার সাথেই তাকে সারাজীবনের জন্য থাকতে হবে। তাই প্রাপ্তিও চেষ্টা করছে শত কষ্টের পরও মানিয়ে নিতে।
আদনানের ঐ চাকরীটা হয়নি। তবে এর মাঝেও এসে সে আরো কয়েকটা চাকরীর ইন্টার্ভিউ দিয়ে গেছে। বন্ধুদের অন্যান্য চাকরীর জন্য খোঁজ-খবরও রাখতে বলে গেছে। প্রাপ্তি নিজেও পড়াশোনা নিয়ে নিজেকে বিজি রাখার চেষ্টা করছে। একটু দম নিতে, ফ্রেশ মুডে থাকার জন্য তৃধা, অঙ্কিতা আর সে মিলে গ্রুপ স্টাডি করছে। কখনো নিজের বাসায় আবার কখনো দুই বান্ধবীর বাসায়। আজ তৃধার বাসায় গিয়েছিল গ্রুপ স্টাডি করার জন্য। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সে বাড়িতে ফিরে আসে।
বাড়ি ফিরে ফিরোজ ইসলামকে বাসায় দেখে একটু অবাক-ই হয়। কেননা তার বাবা ভীষণ ব্যস্ত মানুষ এবং পরিশ্রমী। ছোটোবেলা থেকেই পরিশ্রম করে আসছে লোকটি। এখনো ক্ষান্ত হয়নি। চাকরীর পাশাপাশি একটা ব্যবসাও করে সে। তার অদম্য পরিশ্রমের ফলেই প্রাপ্তি এবং সবাই আরাম-আয়েশে জীবন-যাপন করতে পারছে। সুমনা বেগম শিক্ষিত মেয়ে। প্রাপ্তি হওয়ার আগ অব্দি একটা স্কুলে চাকরী করলেও, প্রাপ্তি পেটে আসার পর ফিরোজ ইসলাম আর তাকে কাজ করতে দেননি। সুমনা বেগমের হাত ধরে অনুরোধ করে নরমস্বরে বলেছিলেন,
'সুমনা, তোমার শখ ও স্বপ্নকে আমি সম্মান করি। সবসময়ই আমি তোমার পাশে ছিলাম। এখনো আছি আর ভবিষ্যতেও থাকব। কিন্তু তোমার কাছে আমার একান্তই অনুরোধ, তুমি এখন আর বাইরে কোনো কাজ কোরো না। আমাদের সন্তানকে সময় দাও। ফ্রি সময় কাটাও প্লিজ!'
সুমনা বেগম রাজি হয়েছিলেন। প্রাপ্তি হওয়ার পরও ফিরোজ ইসলাম তাকে কাজ করতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ তিনি চাননি তার সন্তান বাবা-মা উভয়েরই অনুপস্থিতিতে বড়ো হোক। যেহেতু ফিরোজ ইসলাম কাজের জন্য সবসময় বাইরেই থাকেন, সেহেতু প্রাপ্তিকে সার্বক্ষণিক সময় দেওয়ার জন্য সুমনার প্রাপ্তির কাছে থাকা উচিত। সুমনা বেগমও কোনো প্রকার জেদ করেনি। তিনি মন প্রাণ সবকিছু স্বামী-সংসার আর সন্তানের জন্যই উজাড় করে দিয়েছেন। এসব কথা প্রাপ্তি তার মায়ের থেকেই শুনেছিল। আগে প্রায়-ই পুরনো কথা উঠলে সুমনা বেগম তার সুখকর অতীতের ঘটনাগুলো মেয়েকে শোনাতেন।
প্রাপ্তি তার বাবার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল,'আব্বু? কী হয়েছে?'
এতক্ষণ চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে ছিলেন তিনি। প্রাপ্তির উপস্থিতি টের পেয়ে বললেন,'কিছু না তো! কখন এলি মা?'
'মাত্র-ই। বলো কী হয়েছে? তোমাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন?'
'তেমন কিছু না। শরীরটা একটু খারাপ লাগছে।'
'লাগবে-ই তো। নিজের শরীরের তো কখনো একটু যত্ন নাও না।'
সুমনা বেগম শরবতের গ্লাস এনে ফিরোজ ইসলামের হাতে তুলে দেন। অভিযোগেরসুরে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলেন,
'তুই-ই বল কিছু। আমার কথা তো তিনি কখনো দামও দেন না।'
'আহা! মেয়ের সামনে কী ছেলেমানুষি শুরু করলে?' গ্লাসের শরবতটুকু এক চুমুকে শেষ করে বললেন ফিরোজ ইসলাম।
এরপর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,'তোর পরীক্ষা কবে থেকে রে মা?'
'সামনের সপ্তাহ্ থেকে।'
'মন দিয়ে পড়। ভালো করে পরীক্ষা দিবি কেমন। যা গিয়ে এখন একটু রেস্ট কর।'
প্রাপ্তি আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ নিজের রুমে চলে যায়। একটুখানি রেস্ট নিয়ে সন্ধ্যার নাস্তা করে আবার পড়তে বসে। পরেরদিন থেকে-ই তার মনে হতে থাকে বাড়ির হাওয়া একটু যেন কেমন পাল্টিয়েছে। বাবার সঙ্গে সঙ্গে মাকেও কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছে। সে মাকে বারংবার জিজ্ঞেস করে, খুঁচিয়েও কোনো কথা পেট থেকে বের করতে পারেনি। সতর্কতার সাথে সুমনা বেগম প্রাপ্তির প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গিয়ে বলতেন,
'তুই অযথা চিন্তা করছিস। কিছু-ই হয়নি। তুই গিয়ে পড়তে বোস।'
প্রাপ্তির বুঝতে কষ্ট হতো না যে, বাবা-মা তার থেকে কিছু লুকাচ্ছে। কিন্তু কী লুকাচ্ছে সে এটা-ই বুঝতে পারছে না। উপায়ন্তরহীন হয়ে সে মামা-মামির কাছে যায়। তবে তাদের থেকেও সে আশাজনক কিছু জানতে পারেনি। এদিকে তার পরীক্ষাও শুরু হয়ে যায়। আপাতত সে বহিরাগত সব চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে পরীক্ষায় ফোকাস করার চেষ্টা করে। কয়েকটা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর-ই সে হাওয়া বদলের আভাস একটু একটু করে পেতে শুরু করে। প্রায়-ই বাড়িতে লোকজন আসছে। সে রুম থেকে ফিসফিসানি কথা শুনতে পায়। এদের মধ্যে সে কাউকে কাউকে চেনে। আবার কেউ কেউ অচেনা। ঘন ঘন এই লোকগুলো কেন আসছে বাড়িতে সে কিছুতে-ই বুঝতে পারছে না।
আজ বাড়িতে যে-ই মধ্য বয়স্ক লোকটা এসেছে তাকে প্রাপ্তি চেনে। বেশ চেঁচামেচির শব্দ শুনে-ই সে পড়ার টেবিল ছেড়ে দৌঁড়ে ড্রয়িংরুমে যায়। এই লোকটার সাথে তার বাবার খুব সদ্ভাব ছিল। প্রাপ্তি তাকে মামা বলে ডাকে। এই লোক এমন উঁচু গলায় বাবার সাথে কেন কথা বলছে তাহলে? প্রাপ্তিকে দেখা মাত্র-ই সুমনা বেগম কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভেতরে যেতে বলেন। প্রাপ্তি তবুও সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। বাধ্য হয়ে সুমনা বেগন প্রাপ্তির হাত ধরে টেনে রুমে এনে দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয়। সম্পূর্ণ ঘটনা প্রাপ্তির কাছে ভীষণ অদ্ভূত মনে হচ্ছে। সবাই মিলে তার থেকে কী লুকানোর চেষ্টা করছে? বাবার সাথে করা খারাপ আচরণগুলো বারবার মনে হতে থাকে তার। কান্না পাচ্ছে ভীষণ। সে কিছুতে-ই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না। এখনো তার দুটো পরীক্ষা বাকি আছে।
সুমনা বেগম সন্ধ্যায় যখন প্রাপ্তিকে নাস্তা দিতে আসেন, তখন প্রাপ্তি দেখতে পায় তার চোখ-মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। প্রাপ্তি মায়ের হাত চেপে ধরে। প্রচণ্ড জেদ ধরে সত্যিটা জানার জন্য। বরাবরের মতো এবারও সুমনা বেগম প্রাপ্তিকে এড়িয়ে যায়। এসব ট্রমা আর প্রাপ্তি নিতে পারছিল না। চিন্তায় চিন্তায় ভেতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। কোনো রকমভাবে নেক্সট পরীক্ষাটা দেয়। তবে এই পরীক্ষাটি তার গত হওয়া পরীক্ষাগুলো থেকে অনেক খারাপ হয়েছে।
একবার মনে হয়েছে আদনান কিংবা শান্তর কাছে জানতে চাইবে, ওরা কিছু জানে কিনা। পরক্ষণে-ই মনে হলো কী হয়েছে অথবা কী হচ্ছে এসব বাড়িতে থেকেও প্রাপ্তি জানতে পারছে না। আর ওরা এতদূর থেকে কী করে জানবে? রুমানা বেগমের থেকেও প্রাপ্তি কিছু-ই জানতে পারেনি। ভালোবাসার ডিপ্রেশন পেরিয়ে এবার যেন পারিবারিক ডিপ্রেশন তাকে পেয়ে বসল। বাবা-মায়ের লুকিয়ে কান্না করা, কষ্ট পাওয়া এগুলো প্রাপ্তি সহ্য করতে পারে না। তারও যে ভীষণ কষ্ট হয়। এমন কী হয়ে গেছে হঠাৎ করে? কেন বাবা-মা তাকে কিছু-ই বলছে না? লাস্ট পরীক্ষা দিয়ে নানান রকম চিন্তা-ভাবনা করতে করতে সে তৃধা আর অঙ্কিতার সাথে বাড়ি ফিরছিল। বাড়ির সামনে বাজারে রিকশা থেকে নেমে বেশ জটলা দেখতে পায়। দূর থেকে সে ফিরোজ ইসলামকেও দেখতে পায়। একজন লোক অকথ্য ভাষায় কথা শোনাচ্ছে ফিরোজ ইসলামকে। আর তিনি মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। প্রাপ্তি দৌঁড়ে গিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ-ই সে কান্না করে ফেলে। ভিড়ের মধ্যে এখানে মেয়েকে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েন ফিরোজ ইসলাম। তৃধা আর অঙ্কিতাকেও সেখানে দেখে তিনি ওদেরকে বলেন প্রাপ্তিকে এখান থেকে নিয়ে যেতে। কিন্তু প্রাপ্তি তো কিছুতে-ই এখান থেকে যাবে না তার বাবাকে রেখে। উপস্থিত কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে অকথ্য ভাষায় কথা বলা লোকটির উদ্দেশ্যে বলেন,
'আচ্ছা এখন যাও। এইসব বিষয়ে পরে কথা বইলো। মাইয়াটা কাঁদতেছে।'
লোকটি থামল তো ঠিক-ই কিন্তু যাওয়ার আগে ফিরোজ ইসলামকে টাকার জন্য শাসিয়েও গেল। প্রাপ্তি তখনো কাঁদছিল। এত মানুষের সামনে অপমানিত হয়ে ফিরোজ ইসলামের চোখেও পানি টলমল করছিল। যারা আগে তাকে সালাম দিয়ে কথা বলত, তারা-ই এখন তার দুঃসময়ে যা তা বলে যাচ্ছে। সময় কত কিছু-ই না বদলে দেয়।
প্রাপ্তির বাবার শো-রুমে টিভি, ফ্রিজ এসবের বিজনেস ছিল। এতদিন সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও হঠাৎ করে-ই সে লসের মুখে পড়তে থাকে। ধার-দেনা করা শুরু করে তখন। এতে লাভ হওয়ার বদলে লস হয়ে যায় দ্বিগুণ। শো-রুমের দোকান বন্ধ হয়ে যায়। চারদিকে শুধু ঋণ। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ঋণ রয়েছে মানুষজনের কাছে। নির্দিষ্ট একটা সময়ও সে চেয়ে নিয়েছিল। তবে এতগুলো টাকা সে জমাতে পারেনি আর শোধও করতে পারেনি। ব্যাংকে ছয় লক্ষ টাকা আছে; যেগুলো সে প্রাপ্তির বিয়ের জন্য তুলে রেখেছে। এদিকে প্রাপ্তির পরীক্ষা বলে কেউ-ই প্রাপ্তিকে এসব ঘটনা জানতে দেয়নি। এদিকে পাওনাদাররা টাকা না পেয়ে ফিরোজ ইসলামের ওপর চওড়া হয়ে উঠেছে। প্রত্যহ তারা বাড়িতে, রাস্তাঘাটে ফিরোজ ইসলামকে কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। ঋণ শোধ করার জন্য এতগুলো টাকা কে-ই বা তাকে দেবে? সবশেষে জানা গেল এই ঘটনা প্রাপ্তি আর পাত্রপক্ষ ব্যতীত সবাই জানত। আসাদ রহমান কিংবা আদনানের কাছেও এত টাকা নেই যে তারা কেউ সাহায্য করবে। ব্যক্তিগতভাবে আসাদ রহমান এমনিতে-ই প্রাপ্তির পরিবারকে পছন্দ করে না। তাই যতটুকু সাহায্য করা যায় ততটুকুও করতে নারাজ সে। গোপনে রুমানা বেগম তার কাছে জমানো পঞ্চাশ হাজারের মতো টাকা সুমনা বেগমের হাতে তুলে দিয়েছেন। আদনানও নিজের জমানো নব্বই হাজারের মতো টাকা পাঠিয়েছে। তবে এসব টাকা ঋণের তুলনায় কিছু-ই না। কথা তো আর লুকিয়ে থাকে না। ছেলের পরিবারের কানেও কথাগুলো চলে যায়। শান্ত সব জেনে দেড় লক্ষর মতো টাকা পাঠাতে চায়। তবে ফিরোজ রহমান শান্তর টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান। বিষয়টা খুবই খারাপ দেখায়। শান্ত আশ্বস্ত করে বলে, পরবর্তীতে সব ঠিকঠাক হলে টাকাগুলো তাকে ফিরিয়ে দিলে-ই হবে। এভাবে সে কিছু টাকা জমাতে সক্ষম হলেও এখনো অনেক টাকা বাকি। কী করবে না করবে কিছু-ই বুঝতে পারছিলেন না। সেই সময়ে প্রাপ্তি এবং সুমনা বেগম বাড়িটা বিক্রি করে দিতে বলেন। হাতে যেই টাকাগুলো আছে আর বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করা হয়ে যাবে। একবার ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার কথা ভাবলেও মা-মেয়ে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। যেহেতু মাথার ওপর একটা ছাদ এখনো রয়েছে তাই অন্যত্র নতুন করে ঋণী হওয়ার দরকার নেই। ফিরোজ ইসলাম প্রথমদিকে বাড়ি বিক্রি করতে নারাজ হলেও এক পর্যায়ে পরিস্থিতি, প্রাপ্তি ও সুমনার কথায় রাজি হয়ে যায়।
বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করলেও এদিকে তাদের জন্য নতুন কিছু যে অপেক্ষা করছিল সেটা এই পরিবার আন্দাজও করতে পারেনি। প্রাপ্তিরা এখন একটা ভাড়া বাসায় থাকে। সকলের থেকে অনেকটা-ই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে তারা। একদিন ছেলের বাড়ি থেকে ফোন আসে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, এই বিয়ে হবে না। নিজেদের একটা বাসস্থান নেই এমন ভাসমান পরিবারের মেয়েকে তারা ছেলের বউ করতে পারবে না। কেননা শান্তদের স্ট্যাটাস আর প্রাপ্তিদের স্ট্যাটাস এখন আর এক নয়। এই কথা শুনে ফিরোজ ইসলাম আর সুমনা বেগমের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তারা শান্তর বাড়িতে গিয়ে ওর বাবা-মায়ের কাছে অনেক অনুরোধ করে বিয়েটা যাতে তারা না ভেঙে দেয়। কিন্তু তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল। তারা অন্যত্র মেয়ে দেখছে এবং সেখানে-ই শান্তর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। এই প্রস্তাবে শান্তরও কোনো দ্বিমত নেই। অসহায় হয়ে শূন্য হাতে বাড়িতে ফেরে ফিরোজ ইসলাম আর সুমনা বেগম। মেয়ের বিয়ে ভাঙার কারণ হিসেবে বারবার নিজেকে দোষী বলতে থাকেন ফিরোজ ইসলাম। সে কোনোভাবে-ই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলেন না। এলাকায় এবার আরো একটা বদনাম রটে গেল। মেয়ের বদনাম যে বাবা হয়ে সহ্য করা যায় না! প্রাপ্তি চুপচাপ ছিল এতদিন। সে এবার বাবা-মায়ের রুমে যায়। বাবার হাত ধরে শান্তকণ্ঠে বলে,
'কাঁদো কেন তুমি?'
ফিরোজ ইসলামের কান্না বাড়ে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। ক্রন্দনরতস্বরে বলেন,
'মা রে, আমি যদি একবারও জানতাম বাড়ি বিক্রির জন্য তোর বিয়েটা ভেঙে যাবে তাহলে জীবন থাকতে বাড়িটা বিক্রি করতাম না।'
প্রাপ্তি শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে,'তুমি কেঁদো না বাবা। যা হয় ভালোর জন্য-ই হয়।'
প্রাপ্তি, মামা-মামি সবাই তাদেরকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করে। পরের দিন-ই প্রাপ্তি ব্যাংক থেকে দেড় লাখ টাকা তুলে শান্তকে পাঠিয়ে দেয়। সাথে ফোনে একটা টেক্সট করে,
'দুঃসময়ে সাহায্য করার জন্য, পাশে দাঁড়ানোর জন্য ধন্যবাদ। আপনার টাকাগুলো পাঠিয়ে দিয়েছি। চেক করে দেখবেন।'
এর থেকে একটা বেশিও কথা সে লিখেনি। এমনকি বিয়ের প্রসঙ্গেও সে কোনো কথা বলেনি। কিছু জিজ্ঞেসও করেনি।
এলাকার অনেকের অনেক ধরণের কথা শুনেও প্রাপ্তি কোনো কিছুতে কান দেয় না। শহরে অবশ্য বিয়ে ভাঙা নিয়ে তেমন মুখরোচক গল্প হয় না। প্রাপ্তির দাদা-দাদি জীবিত নেই। তাদের আর্থিক অবস্থাও স্বচ্ছল ছিল না। যেটুকু সম্পত্তি ছিল দাদা-দাদির মৃত্যুর পর তিন ভাইয়েরা মিলে ভাগ করে নিয়েছে। ফিরোজ ইসলাম নিজের ভাগের জমিটুকু বিক্রি করে টাকা নিয়ে এসেছিল। এরপর একটু একটু করে টাকা জমিয়ে-ই সে এই বাড়িটা করেছিল। কত স্মৃতি আর কত হাড়-ভাঙা পরিশ্রমের ফল ছিল ঐ বাড়িটা তা ফিরোজ ইসলামের চেয়ে ভালো অন্য কেউ জানে না। চাচারা বিয়ে ভাঙার খবরটি শুনেছেন। তবে খুব একটা মাথা ঘামায়নি। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য, ঐ দুঃসময়ে তারা একটা কানাকড়ি দিয়েও সাহায্য করেনি। এমনও নয় যে, তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বরং ফিরোজ ইসলামের চেয়ে তার বাকি দুই ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা অনেক বেশি-ই ভালো। চাইলে-ই হয়তো তারা সাহায্য করতে পারত। কিন্তু করেনি। এসব ভাবলে-ই বুকচিরে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
প্রাপ্তি নিজের খরচ চালানোর জন্য বাবার অগোচরে কয়েকটা টিউশনি করাচ্ছে। বাবা জানলে কখনো-ই করতে দেবে না। টিউশনিগুলো বাড়িতে গিয়ে পড়াতে হয়। একেকটা বাড়িও অন্য বাড়ি থেকে দূরে। রিকশা করে না গিয়ে বেশির ভাগ সময় সে পায়ে হেঁটে-ই যায়। মেয়ের এমন কষ্টের কথা জানতে পারলে ফিরোজ ইসলাম সহ্য করতে পারবেন না। প্রাপ্তি তার বাবা-মাকে বোঝায়, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তাদের সুসময় আবারও ফিরে আসবে।
__________
মাসের শেষের দিকে আদনান একেবারে ঢাকায় চলে আসে। এখন থেকে সে এখানে-ই চাকরী করবে। প্রাপ্তির বিয়ে ভাঙার খবর, বাড়ি বিক্রির খবর সব-ই সে শুনেছিল। সব জেনেও সে আসতে পারেনি। ইচ্ছে করে-ই আসেনি। এমন খারাপ সময়ে যে সে ওদের জন্য কিছু-ই করতে পারবে না। সামনে থেকে ঐ অসহায় মুখগুলোও সে দেখতে পারত না। বাড়িতে ফিরে প্রাপ্তিদের বাড়ির দিকে তাকাতে-ই বুকটায় কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। বাড়ির রং পাল্টানো হয়েছে। এছাড়া বাকি সব কিছু-ই আগের মতো রয়েছে। সব ঠিক আছে, শুধু প্রাপ্তিরা আর নেই।
দুপুরের দিকে রুমানা বেগমের থেকে প্রাপ্তিদের ভাড়া বাড়ির ঠিকানা নিয়ে বের হয়। বড্ড খারাপ লাগছিল তার। কোন মুখে সে প্রাপ্তির সামনে দাঁড়াবে? প্রাপ্তি কি তাকে ঘৃণা করে? করার-ই কথা! খারাপ সময়ে যারা পাশে থাকে না, তারা আবার কীসের বন্ধু!
বাড়িতে গিয়ে শুধু সুমনা বেগমকে পাওয়া গেল। বাসাটা মোটামুটি ধরণের বলা যায়। আদনানকে দেখে সুমনা বেগম ভীষণ খুশি হয়। ও'কে বসতে দিয়ে তিনি চা-বিস্কুট নিয়ে আসেন। কথায় কথায় সেই অতীতের প্রসঙ্গ আসে। সন্তর্পণে চোখের পানি মোছেন তিনি। ঋণ শোধ করেও প্রাপ্তির বিয়ের জন্য কিছু টাকা ব্যাংকে রেখে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে কাছের যারা টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল তাদের টাকা শোধ করে দিয়েছে। এমনকি আদনানের দেওয়া নব্বই হাজার টাকাও প্রাপ্তি রুমানা বেগমের হাতে দিয়ে এসেছে। এখন অল্প কিছু টাকা বেঁচে আছে। বেশি খরচা সংসারে করা হচ্ছে না। টাকা জমাতে হবে। অনেক টাকার প্রয়োজন। ফের বাড়ি করতে হবে। এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে আদনান সুমনা বেগমের কথা শুনছিল। তার মনটা উশখুশ করছিল প্রাপ্তিকে দেখার জন্য। না পেরে সে বলে-ই বসল,
'প্রাপ্তি কোথায় আন্টি?'
তিনি আরও একবার শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছে বললেন,'টিউশনি করাতে গেছে।'
'ও টিউশনি করায়?'
'হ্যাঁ। এই অবস্থা দেখে এখন কয়েকটা টিউশনি নিয়েছে। ভীষণ কষ্ট হয়ে যায় মেয়েটার। তবুও করছে যাতে নিজের খরচটা অন্তত চালাতে পারে। তোর আঙ্কেল এসব জানে না।'
'কখন আসবে প্রাপ্তি?'
'ওর আসতে আসতে সন্ধ্যা হবে। তোর কি তাড়া আছে আজ? না থাকলে থেকে যা। আমি রান্নাবান্না করি। রাতে একদম খেয়ে তারপর যাস।'
'আচ্ছা।'
'দুপুরে খেয়েছিলি?'
'হ্যাঁ। তোমার ভাই-ভাবি তারা কোথায় থাকে এখন?'
'ওরা পাশের বাড়িতে থাকে। তুই টিভি দেখ।'
কিছুক্ষণ টিভি দেখে, কিছুক্ষণ ফোন চেপে সময় পার করে আদনান। সন্ধ্যার আযানের সময় প্রাপ্তি আসে। দরজায় নক করার শব্দ শুনে আদনান নিজে গিয়ে-ই দরজা খুলে দেয়। সে অবাক হয় প্রাপ্তির রোদে পোড়া ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মুখটা দেখে। আদনানকে এখানে দেখে প্রাপ্তিও চমকে যায়। বিস্মিতকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
'তুমি! কখন এলে?'
আদনান কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। সে তৎক্ষণাৎ কিছু-ই বলতে পারছিল না। ক্লান্ত প্রাপ্তির ফ্রেশ হওয়াটা জরুরী ছিল। গোসল না করলে এখন একদম স্বস্তি পাবে না। ঘামে শরীর চিটচিট করছিল। সে আদনানকে বলল,
'তুমি একটু বসো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।'
আদনান তখনও কিছু বলল না। তার মনে হচ্ছে, হঠাৎ করে-ই প্রাপ্তি যেন অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে। পরিস্থিতি মানুষকে এভাবেও বদলে দেয়?
চলবে...
#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৯
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
____________________
প্রাপ্তি গোসল সেরে শুয়ে পড়েছে। তার একদম মনেই নেই যে, আদনান এসেছে। ড্রয়িংরুমে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও প্রাপ্তির দেখা না মেলায় সুমনা বেগম এবার নিজেই মেয়েকে ডাকতে আসেন। আর এসে দেখতে পান, এর মধ্যেই প্রাপ্তি ঘুমিয়ে পড়েছে। ভেজা চুল থেকে পানি পড়ে বালিশ, বিছানা ভিজে যাচ্ছে। মেয়েকে ডাকতে গিয়েও তিনি থেমে যান। ক্লান্ত, মলিন মুখটা দেখে আর ডাকতে ইচ্ছে হলো না। তিনি আলগোছে প্রাপ্তির মাথাটা নিজের কোলের ওপর নিয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে দিচ্ছিলেন। সুমনা বেগমেরও সাড়া না পেয়ে আদনান এবার নিজেই আসে প্রাপ্তির রুমে।
সুমনা বেগম দরজার দিকে তাকিয়ে আদনানকে ইশারায় বললেন,'ঘুমিয়ে পড়েছে।'
আদনান স্মিত হেসে তার মতো করেই ইশারায় বলল এবং ঠোঁট নাড়াল,'সমস্যা নেই।'
এরপর ধীরপায়ে এসে প্রাপ্তির পাশে খাটের ওপর বসল। রুমের দেয়ালে পেইন্টিং করা। এগুলো প্রাপ্তিই করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার আগের রুমটার মতো সাজানোর আপ্রাণ চেষ্টা সে করেছে। তবুও যেন একটু ফাঁকফোকর রয়েই গেছে। এই বাড়ির দেয়ালের কোথাও কোথাও রং উঠে গেছে। দেয়ালের গায়েও কালসিটে দাগ রয়েছে। এই খুঁতগুলোই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এটা প্রাপ্তির আগের রুম নয়। হতেই পারে না।
সুমনা বেগম প্রাপ্তির মাথাটা আবার বালিশে রেখে আদনানকে নিচুস্বরে জিজ্ঞেস করেন,'কী দেখছিস?'
আদনান উত্তরে কিছু-ই বলতে পারল না। শুধু ভেতর থেকে দীর্ঘকায় দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সুমনা বেগম তবুও উত্তরের প্রতিক্ষায় আদনানের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
এক প্রকার দায় সারতে-ই আদনান বাধ্য হয়ে দু'দিকে মাথা নেড়ে বলল,'কিছু না।'
প্রাপ্তির রুম থেকে বের হওয়ার পর আদনান নিজের রুমে চলে এসেছে। সুমনা বেগম অনেকবার করে রাতের খাবার খেয়ে আসতে বলেছিলেন। আদনান শোনেনি। প্রাপ্তিকে দেখার আগ পর্যন্ত সেও ঠিক করেছিল, রাতের খাবার খেয়েই আসবে। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। বুকের কোথায় যেন একটা চাপা আর্তনাদ বারবার জেগে ওঠে। অস্বস্তি, অস্থিরতায় দম আটকে আসে। কেন এমন হয় আদনান জানে না। আবার হয়তো জানে, কিন্তু কাউকে সেটা জানতে দিতে চায় না।
বাড়িতে ফিরে রুমানা বেগমের সাথে দেখা হয়ে যায় আদনানের। ছেলের চিন্তিত মলিন মুখ দেখে তিনি জানতে চান,
'কী হয়েছে?'
'কিছু না।' বলে আদনান নিজের রুমে চলে যায়। তার কারো সাথে এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে। প্রাপ্তিকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে।
.
.
পরেরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আদনান প্রাপ্তির বাসায় আসে। সারা রাত তার ভালো করে ঘুম হয়নি। যার দরুণ চোখ দুটো জ্বলছে এখন। আজকে তার অফিসের প্রথম দিন। তাই যেতেই হবে। যাওয়ার পথে কী মনে করে যেন এই বাসায় চলে এসেছে। আসার পর থেকে তার নিজের কাছেই কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু করে। অথচ আগের বাড়িতে থাকতে হুটহাট কারণ ছাড়া-ই চলে যেত। তখন তো কোনো রকম অস্বস্তি লাগত না। তবে আজ কেন?
যাক, সেসব প্রশ্নের উত্তর মেলার আগে-ই দরজা খুলে দিলেন ফিরোজ ইসলাম। আদনানকে দেখে আপ্লুত হয়ে বলেন,
'আরে তুই! ভেতরে আয়।'
আদনান আগে ভেতরে ঢুকল। বাড়ির সবাই তখন নাস্তা করতে বসেছে। পেছন থেকে ফিরোজ ইসলাম বললেন,
'কাল নাকি এসেছিলি তুই। আমার সাথে দেখা না করে চলে গেলি কেন?'
আদনান সোফায় বসতে চাইছিল। ফিরোজ ইসলাম ঠেলে চোখের ইশারায় ডাইনিং চেয়ারে বসতে বললেন। আদনানও তাই করল। একটা চেয়ার টেনে প্রাপ্তির পাশে বসল সে। গ্লাস থেকে পানি পান করে ফিরোজ ইসলামের উদ্দেশ্যে বলল,
'হঠাৎ একটা কাজ পড়ে গেছিল।'
'ওহ। এখানে-ই চাকরী নিয়েছিস শুনলাম।'
'হ্যাঁ, অফিসে-ই যাচ্ছি এখন।'
'বেশ। নে নাস্তা কর।'
'না, না। সকালে মা জোর করে খাইয়ে দিয়েছে।'
'এখন অল্প একটু খেলে কিছু হবে না।' বলে আদনানকে প্লেটে দুটো পরোটা, অর্ধেক ডিম ভাজি আর আলু ভাজি তুলে দিলেন সুমনা বেগম।
বাধ্য হয়ে আদনানকে খাওয়া শুরু করতে হয়। খেতে খেতে-ই আদনান ফিরোজ ইসলাম আর সুমনা বেগমের সাথে টুকটাক কথা বলে। প্রাপ্তি পুরোটা সময় নিরব ভূমিকা-ই পালন করে। খাওয়া শেষ করে প্রাপ্তি সবার আগে। সে ঘরে গিয়ে তার ব্যাগ এনে বাবা-মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বের হওয়ার মুহূর্তে আদনান পেছন থেকে বলে,
'দাঁড়া প্রাপ্তি। আমার অফিস তোর ভার্সিটির ওখানে-ই। দুজনে একসাথে যাই।'
প্রাপ্তি বাবার দিকে তাকিয়ে বাধ্য হয়ে-ই দাঁড়াল। আদনান হাত ধুয়ে তার ব্যাগ নিয়ে উঠে আসে। যাওয়ার পূর্বে দুজনের থেকে বিদায়ও নিয়ে নেয়। বাড়ির বাইরে গিয়ে আদনান রিকশা নিতে চাইলে প্রাপ্তি বলে,
'আমি রিকশায় যাব না। তোমার যদি দেরি হয়ে যায়, তাহলে তুমি রিকশায় করে চলে যাও।'
আদনান একটু থমকায়। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,'কোনো সমস্যা?'
'কোনো সমস্যা নেই। হাঁটতে ভালো লাগে।'
আদনান হাত ঘড়িতে সময় দেখে বলল,'ঠিক আছে। আমারও সমস্যা নেই।'
দুজনে পাশাপাশি চুপচাপ হাঁটছিল। এক সময়ে প্রাপ্তি নিজে থেকে-ই বলে,'কাল চলে গেছিলে কেন?'
'তুই ঘুমিয়ে পড়েছিলি তাই।'
'আর একটু বসলেই পারতে। রাতে তো খাওয়ার সময় উঠেছিলাম।'
'তাতে কী! এখন তো দেখা হলো।'
'হুম।'
আবারও কিছুক্ষণ পিনপতন নিরবতা। গাড়ির, রিকশার হর্ণ আর পথচারী কিছু ব্যক্তির কথার শব্দ ব্যতীত ওদের কোনো আলাপ নেই। আদনান কিছুটা সময় নিয়ে বলে,
'তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস প্রাপ্তি?'
'কী জন্য রেগে থাকব?'
'তোদের ওমন একটা খারাপ সময়ে আমি পাশে এসে থাকতে পারিনি।'
প্রাপ্তি শব্দ করে হেসে ওঠে। আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে,'তুমি ঐ সময়ে এসে-ই বা কী করতে? ঐ সময়টাতে আমাদের মেন্টালি সাপোর্ট নয় ফিনানসিয়াল হেল্প দরকার ছিল। আর তোমার দিক থেকে যতটা সম্ভব ততটা হেল্প করেও ছিলে। তাহলে রাগ করার কথা আসছে কোত্থেকে?'
'তুই টাকাগুলো মায়ের কাছে ফেরত দিয়ে এসেছিস!'
'হ্যাঁ। তোমার টাকা একেবারে কেন নেব? এখন আর কারো কাছে-ই আমরা ঋণী নই। আমরা এখন মুক্ত, স্বাধীন। যতটুকু অর্থ ও স্বার্থ আছে ততটুকুর মধ্যেই নিজেদের চাহিদা মেটাই।'
'তুই অনেক বড়ো হয়ে গেছিস প্রাপ্তি।'
প্রাপ্তি রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,'হয়তো!'
মাঝরাস্তায় এসে প্রাপ্তি দাঁড়িয়ে যায়। আদনান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
'দাঁড়ালি কেন?'
'আমার একটা কাজ আছে। তুমি অফিসে চলে যাও।'
'এত সকালে তোর আবার কী কাজ?'
'আছে একটা কাজ।'
'প্রাইভেট পড়াতে যাবি?'
'না। তোমায় কে বলল আমি প্রাইভেট পড়াই? মা?'
'হুম। প্রাইভেট না থাকলে কোথায় যাবি সেটা বল?'
'লাইব্রেরিতে। কিছু বই কিনতে হবে।'
'এখন-ই?'
'পরে আমার সময় নেই।'
'কী কী বই আনতে হবে আমায় লিস্ট করে দিস আমি এনে দেবো।'
'কেন?'
'আবার কেন কী? আমি বলেছি তাই।'
প্রাপ্তি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,'ঠিক আছে।'
'এখন রিকশা নিই? তোকে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাব।'
'আমার তো এখন ক্লাস নেই। দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস এখনো শুরু হয়নি।'
'তাহলে তুই এত সকালে বের হয়েছিস কেন?'
'তৃধার বাসায় যাব। ওখানে কিছুক্ষণ থেকে প্রাইভেট পড়াতে যাব।'
আদনান কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,'ঠিক আছে।'
এরপর সে হাত নাড়িয়ে একটা রিকশা থামায়। ইশারায় প্রাপ্তিকে রিকশায় উঠতে বলে। পাশে নিজেও বসে। রিকশা চলতে শুরু করলে প্রাপ্তি বলে,
'তুমি কি এখন তৃধার বাসায় যাবে?'
'হু, তোকে নামিয়ে দিয়ে আসব।'
'এত কষ্ট করার কিন্তু দরকার ছিল না।'
'তোর কাছে এটা কষ্ট মনে হচ্ছে?'
'তা নয়তো কী?'
'আমার তো মনে হচ্ছে না। তোর সঙ্গ ভালো লাগছে তাই যাচ্ছি।'
'কী ব্যাপার বলো তো? মা তোমার ব্রেইন ওয়াশ করেছে নাকি? নিশ্চয়-ই কেঁদে-কেটে তোমার মন গলিয়েছে?'
'মানে?'
'খুব সহজ। একই তো ফ্যামিলি ক্রাইসিস, তার ওপর আমার বিয়েটাও ভেঙে গেল। সব মিলিয়ে তো ভালো একটা প্রেশার যাচ্ছে আমার ওপর। এজন্য আমি হয়তো ডিপ্রেশনে আছি। এমনটা মা ভাবে আরকি! তাই হয়তো, তোমায় বলেছে আমায় একটু সময় দিতে। স্বাভাবিক করতে।'
আদনান রাগীস্বরে মৃদু ধমক দিয়ে বলে,'বাজে কথা বলবি না একদম। তোকে নতুন করে আমি কী স্বাভাবিক করব? তুই আগের চেয়ে অনেক বেশি ম্যাচিউর হয়ে গেছিস। আর আন্টি মোটেও আমাকে এসব কিছু বলেনি। অযথা উল্টা-পাল্টা চিন্তা করবি না আর আমারও মেজাজ খারাপ করবি না।'
'আরে! রেগে যাচ্ছ কেন?'
'তুই কথা-ই বলেছিস রাগ করার মতো।'
'আচ্ছা স্যরি। তোমার হূরপরীর একটা গল্প বলো শুনি। অনেকদিন হয়েছে শোনা হয় না।'
'মুড নেই এখন।'
'নাকি হূরপরী নেই?'
'হূর থাকবে না কেন? ও আমার-ই থাকবে।'
'ওহ আচ্ছা।' স্মিত হাসল প্রাপ্তি।
কয়েক সেকেণ্ড পর আদনান ডাকল,'প্রাপ্তি?'
'হু?'
'রায়হানের সাথে তোর আর কথা হয়?'
'না। পুলিশে কমপ্লেইন করার পর আর বিরক্ত করেনি।'
'আর শান্ত ভাইয়া?'
'তার সাথেও কন্টাক্ট নেই। আর কন্টাক্ট রাখার কোনো কারণও দেখি না।'
'সে কাজটা কি ঠিক করেছে?'
'বেঠিকের তো কিছু দেখি না। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গা থেকে সঠিক থাকতে চাই।'
'একটা সত্যি কথা বলবি?'
'কী?'
'তুই কি মন থেকে এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলি?'
প্রাপ্তি হেসে বলল,'এসব কথা এখন কেন জিজ্ঞেস করছ বলো তো? যখন এই কথাগুলো শোনার প্রতিক্ষায় ছিলাম, তখন তো একবার ভুল করেও জিজ্ঞেস করোনি। জানতে চাওনি, আসলেই আমি এই বিয়েতে খুশি ছিলাম কিনা।'
'এটা কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর ছিল না।'
'মেয়াদবিহীন প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না। এছাড়া মন থেকে রাজি ছিলাম বা মুখ থেকে; বিয়েটা তো আর হয়নি।'
আদনান চুপ হয়ে যায়। প্রাপ্তির সাথে কথা বলতে গেলে এখন প্রতিটা কথায় সে হোঁচট খায়। তার মনে হয়, প্রাপ্তির কথাগুলোতে একটা গোপন আক্রোশ, রাগ, অভিমান মিশে আছে। যেটা প্রাপ্তি সরাসরি কখনো-ই প্রকাশ করে না। আর হয়তো কখনো করবেও না।
তৃধার বাড়ির গলির সামনে রিকশা আসতেই প্রাপ্তি রিকশাওয়ালাকে থামতে বলে। আদনান নেমে রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দেয়। দুজনে গলি দিয়ে দু'মিনিট হাঁটার পর তৃধার বাসায় চলে আসে। প্রাপ্তি জানতে চায়,
'ভেতরে যাবে?'
'না। দেরি হয়ে যাবে তাহলে। তুই ভেতরে যা।'
'ঠিক আছে। সাবধানে যেও তুমি। অফিসে পৌঁছে একটা ফোন দিও।' বলে প্রাপ্তি বাড়ির ভেতর ঢুকতে প্রস্তুত হয়।
আদনান তখন কোনো কিছু না ভেবে-ই প্রাপ্তির হাত ধরে বলে,'দাঁড়া প্রাপ্তি। তোকে কিছু কথা বলার আছে আমার।'
চলবে...
#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_১০
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
আদনানের অচেনা ঐ দৃষ্টিতে আজ তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। চোখ নামিয়ে নিল প্রাপ্তি। আদনান যেভাবে হাত ধরেছিল সেভাবেই ছেড়ে দিয়ে মিহিকণ্ঠে বলল,
'তোকে কথাগুলো অনেকদিন ধরেই বলতে চাচ্ছি।'
'বলো।' না তাকিয়েই উত্তর করল প্রাপ্তি।
আদনান ব্যস্তভাবে হাতের ঘড়িতে সময় দেখে বলল,'এখন নয়। অফিস থেকে এসে বলব।'
প্রাপ্তির মনে উচাটনের ঝড় শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। সে উদ্বিগ্ন এবং সংকোচের সহিত আড়ষ্ট হয়ে ছিল; যার দরুণ তৎক্ষণাৎ জানতে চাওয়ার আগ্রহ আদনানের নিকট প্রকাশ করা হয়ে উঠল না। এর বদলে সে তার স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বলল,
'ঠিক আছে। সাবধানে যেও।'
আদনান চলে যাওয়ার পর প্রাপ্তি বাড়ির ভেতর ঢোকে। সকাল সকাল প্রাপ্তিকে দেখে তৃধা একটু অবাকই হয়। উৎকণ্ঠিত স্বরে জানতে চায়,
'সব ঠিকঠাক?'
প্রাপ্তি বিছানার এক কোণে বসতে বসতে মাথা নাড়িয়ে বলল,'হুম।'
'তুই বোস। আমি চা নিয়ে আসি।'
'অঙ্কিতা আসুক আগে।'
'কখন আসবে?'
'এসে পড়বে।'
'আচ্ছা।' বলে তৃধা প্রাপ্তির পাশে বসল।
প্রাপ্তির মাথায় তখনও চলছিল, আদনান তাকে কী বলতে চায়, কী বলার আছে এসব চিন্তা-ভাবনা। তাই সে তৎক্ষণাৎ তৃধার সাথে কোনো প্রকার গল্প জুড়ে দিতে পারল না। বরঞ্চ প্রতিদিনের তুলনায় আজ তাকে একটু বেশিই চুপচাপ মনে হচ্ছিল। তৃধা সেটা বুঝতে পেরে বলল,
'ব্যাপার কী বল তো? এত কী ভাবছিস?'
প্রাপ্তি বুকশেলফ থেকে একটা বই নিয়ে বলল,'কিছু না তো।'
এরপর সে আনমনে বইয়ের পাতা উলটাতে লাগল। লাইনগুলো সে পড়ে গেলেও মস্তিষ্ক বুঝতে পারছিল না যে, সে আসলে কী পড়ছে। কেননা মস্তিষ্ক তো আর একসাথে দুটি কাজ পরিচালনা করতে পারবে না।
'তুই নিশ্চয়ই এখানে বই পড়তে আসিসনি?' বলে প্রাপ্তির হাত থেকে বইটি টেনে নিয়ে গেল তৃধা।
প্রাপ্তি ভারী তপ্ত দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,'আর ভালো লাগে না রে! বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকালে খুব কষ্ট হয়। সবকিছু কি এভাবে এলোমেলো হওয়ার প্রয়োজন ছিল?'
তৃধা এগিয়ে গিয়ে প্রাপ্তির পাশে বসল। কাঁধে হাত রেখে বলল,'এসব নিয়ে ভাবিস না। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। আমরা কেউই তো চাইলেও সেসব ঠিক করতে পারব না। বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে হবে। আবারও তোদের সুন্দর একটা বাড়ি হবে দেখিস।'
প্রাপ্তি কিছু বলল না। শুধু তৃধার হাতটি শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বসে রইল।
.
.
কোনোভাবেই অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না আদনান। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। কিন্তু কাজ এখনো কিছুই হয়নি। তার মনের অন্তঃকোণে বারবার যেন প্রাপ্তির মুখ, তার সঙ্গ-ই উঁকিঝুঁকি মারছিল। সে কিছুতেই পারছিল না প্রাপ্তিকে সরিয়ে কাজে মনোনিবেশ করতে। ক্ষুধাও যেন ম'রে গেছে। খাওয়ার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। এভাবে আর চলে না। চলতেও দেওয়া যাবে না। তাহলে হয়তো সময়ের সাথে সাথে সেও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে তো চায় তার অনুভূতি হোক অনিঃশেষ।
সে কোনোভাবে পাঁচটা পর্যন্ত ডিউটি শেষ করে বাড়িতে ফেরে। একটুখানি রেস্ট নিয়ে গোসল করে ছয়টার দিকে বের হয়। প্রাপ্তির বাড়ির সামনে থেকে প্রাপ্তিকে নিয়ে হাঁটতে থাকে। আজ আদনান সন্ধ্যায় তাকে কী বলবে এই চিন্তাতে প্রাপ্তিও সারাক্ষণ বিভোর ছিল। ঠিকমতো বাচ্চাদের পড়াতেও পারেনি। এই সময়ে তার আরেকটা টিউশনি ছিল। ওদিকে মন পড়ে ছিল আদনানের কাছে। কী করে এখান থেকে ছুটি নেবে ভেবেই পাচ্ছিল না। অবশ্য তার কিছু বলা লাগেনি। বাচ্চার মা নাস্তা দিতে এসে প্রাপ্তির ক্লান্ত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করেছিল,
'কী হয়েছে প্রাপ্তি? অসুস্থ তুমি?'
প্রাপ্তি আমতা আমতা করে সংকোচের সহিত বলেছে,'শরীরটা ভালো লাগছে না।'
তিনি প্রাপ্তির কপালে, গলায় হাত রেখে বললেন,'শরীর তো বেশ গরম! আজ আসতে গেলে কেন? যাই হোক, নাস্তা খেয়ে বাসায় চলে যাও। রেস্ট করো গিয়ে। আজ আর পড়াতে হবে না।'
তিনি ফিরে যাওয়ার পর প্রাপ্তি নিজের কপালে হাত রাখে। আসলেই তার শরীরের তাপমাত্রা অনেক। নিজে থেকে একটু টেরও পায়নি! নাস্তা বলতে সে শুধু একটু চা-ই পান করেছে। তারপর বাসায় এসে ঝটপট গোসল করে নিয়েছে। তখন ইচ্ছে করছিল একটু ঘুমিয়ে নিতে। ইচ্ছেটাকে দমন করেছে প্রাপ্তি। আজও সে আদনানের প্রতি তার অনুভূতিকে সবকিছুর ঊর্ধে রেখেছে। আদনানের প্রতি জমে থাকা রাগ, অভিমান, ক্লেশসমূহ সকলকিছু আজ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে। শুধু রয়ে গেছে অনুভূতিটুকু।
আদনানের শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে প্রাপ্তি বলে,'তোমার মুখটা এমন শুকিয়ে গেছে কেন? খাওনি কিছু?'
আদনান লুকাল না কিছু। মাথা নত করে হাঁটতে হাঁটতেই বলল,'না।'
'সেকি! কেন?' ঘোলাটে দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রাপ্তি।
রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলো ব্যতীত তেমন কোনো আলো নেই। এটুকু আলোতেও আদনানের মনে হলো প্রাপ্তির চোখে-মুখে ভীষণ বেদনার ছাপ। সে ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল,
'চল কোথাও বসি।'
প্রাপ্তি নিরবে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। দুজনে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে। খাবার অর্ডার দিয়েও কেউ কোনো কথা বলল না। প্রাপ্তির ঘোলাটে ক্লান্ত চোখ জোড়ার দিকে দৃকপাত করে আদনান বলল,
'তুই অসুস্থ?'
'না, আমি ঠিক আছি।'
আদনান আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলতে পারল না। তবে তার মন বারবার বলছিল, প্রাপ্তি ঠিক নেই। ওয়েটার খাবার দিয়ে যাওয়ার পরও দুজনের কেউই তেমন কিছুই খেতে পারেনি। প্রাপ্তির কাছে সব খাবারের স্বাদ তিতকুটে লাগছিল। জ্বরটা রাতে বেশ বাড়বে বোঝা যাচ্ছে। খাবারের বিল মিটিয়ে ওরা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়। প্রাপ্তির হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠছিল অল্পতেই। মুখটুক ঘেমে গেছে। এবার আর মনের কোনো বাধা মানল না আদনান। প্রাপ্তির কপালে হাত রেখে আ'ত'ঙ্কিত হয়ে বলল,
'তোর যে জ্বর শরীরে!'
প্রাপ্তি হাসার চেষ্টা করে বলল,'তাই নাকি? বুঝতে পারিনি আমি।'
আদনান কয়েক সেকেণ্ড, শুধুমাত্র কয়েক সেকেণ্ড কেমন একটা মনকাড়া দৃষ্টিতে প্রাপ্তির চোখের দিকে তাকাল। এরপর রাস্তা পার হয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে জ্বরের ওষুধ নিলো। প্রাপ্তি স্বগতোক্তি করে বলল,
'শুধু শুধু বাড়াবাড়ি এসব!'
আদনান কোনো প্রত্যুত্তর করল না। পাশের দোকানে গিয়ে প্রাপ্তিকে বেঞ্চে বসিয়ে পানির বোতল কিনল। ওষুধ হাতে দিয়ে বলল,
'চুপচাপ পানি দিয়ে গিলে ফেল।'
প্রাপ্তি ভ্রুঁ কুঞ্চন করে বলল,'জ্বরের ওষুধ? মাথা ব্যথা জ্বরের চেয়েও বেশি।'
'এটা মাথা ব্যথার ওষুধ হিসেবেও কাজ করবে। খেয়ে ফেল।'
মুখে পানি নিয়ে ওষুধ গিলে ফেলে প্রাপ্তি। আদনানের হাতে পানির বোতল দিয়ে দেয়।
'তুই একটু বোস। আমি একটা সিএনজি নিয়ে আসি।' বলল আদনান।
সে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই প্রাপ্তি হাত ধরে বলে,'সিএনজি কেন? আমরা কোথায় যাব?'
'বাসায়।'
ঘোর প্রতিবাদের কণ্ঠে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে প্রাপ্তি। 'নাহ্! বাসায় যাব কেন? তুমি না আমায় কী বলবে বলেছিলে?'
'বলার জন্য অনেক সময় আছে। আগে তোর সুস্থতা।'
প্রাপ্তি আরেকটু শক্ত করে হাত চেপে ধরে বলল,'এত কনফিডেন্স নিয়ে কী করে বলছ, এখনো অনেক সময় আছে? মানুষের তো নিঃশ্বাসেরই বিশ্বাস নেই। এমন হতে পারে আমি, তুমি এখনই ম'রে গেলাম। তখন?'
আদনান কড়া একটা ধমক দিতে গিয়েও থমকে যায়। মলিন, বিমর্ষ মুখটার দিকে তাকিয়ে তার বুক হুহু করে ওঠে। মন নরম হয়ে যায়। সে পারে না তখন আর কঠিন হতে। প্রাপ্তি বায়না করে বলে,
'এখন বাসায় যাব না প্লিজ! জ্বরের মেডিসিন তো নিয়েছি। কমে যাবে। তাহলে বাড়িতে ফিরে কী লাভ হবে বলো? এছাড়া এমনভাবে এই দিনটি তো আর ফিরে না-ও আসতে পারে আদনান।'
'তুই এভাবে কেন কথা বলছিস?' ভীত শোনাল আদনানের কণ্ঠস্বর।
প্রাপ্তি হেসে ওঠে। ঠোঁট চেপে হেসে বলে,'ভয় পাচ্ছ কেন তুমি? আমি কি ম'রার কথা বললাম নাকি? আমি বলতে চেয়েছি, কাল থেকে তো প্রাইভেট পড়িয়ে আর সময় পাব না এভাবে বের হওয়ার। এছাড়া সবসময় তো তোমারও আর সময় হবে না।'
'তোর জন্য আমি সময় বের করে নেবো।'
'আচ্ছা তুমি না হয় নিও। কিন্তু আমার তো এমন সময় সর্বদা হবে না। টিউশনি করিয়ে বাড়িতে ফিরেই আমি ঘুমে কাদা হয়ে যাই।'
'কী চাইছিস তুই বল তো?'
'আমি এখন বাড়িতে যেতে চাচ্ছি না।'
আদনান প্রলম্বিত শ্বাস নিয়ে বলল,'তাহলে কোথায় যাবি?'
'উমম! নিরিবিলি কোথাও? লেকের পাড়ে?'
একটুখানি সময় মৌন থেকে আদনান বলল,'ঠিক আছে। চল।'
প্রাপ্তি হাত ছাড়েনি তখনও। সামনে থেকে একটা রিকশা নিয়ে দুজনে লেকের পাড়ে যায়। ওদের মতো আরও কতশত মানুষ রয়েছে এখানে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। প্রাপ্তি কিছুটা উল্লাসিত হয়ে বলে,
'ওয়েদার সুন্দর না?'
'হুম।' ছোটো করে বলল আদনান।
রিকশা থেকে নেমে দুজনে চুপচাপ হাঁটছে। 'ফুচকা খাবি?' জিজ্ঞেস করে আদনান। প্রাপ্তি দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে বারণ করে।
কিছুদূর হেঁটে প্রাপ্তি ক্লান্তস্বরে বলে,'চলো একটু বসি।'
ফাঁকা স্থানে দুজনে পাশাপাশি বসে। সামনেই লেকের পানিতে অর্ধবৃত্ত চাঁদের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। পানিতে কী রকম একটা কলকল শব্দ হচ্ছে। মৌনতা কাটিয়ে প্রাপ্তি বলে ওঠে,
'বলবে না?'
অন্যমনস্ক আদনান জানতে চায়,'কী?'
'কী আবার? কিছু বলতে চেয়েছিলে আমায় তুমি।'
'জ্বর কমেছে?'
'কথা ঘুরাচ্ছ কেন?'
'বলব। এত অস্থির হচ্ছিস কেন?'
প্রাপ্তি দমে যায়। পাছে আবার অতিরিক্ত আশা করে পূণরায় তার মন ভাঙে! কিয়ৎক্ষণ সময় নিয়ে আদনান বলে,
'হূরপরীর কথা মনে আছে?'
বুকে ধ্বক করে শব্দ হলো প্রাপ্তির। একটা সময়ে সে মনে করতো সে-ই বোধ হয় আদনানের হূরপরী। কিন্তু যখন তার বিয়ে ঠিক হলো এবং ভাবলেশহীন আদনানকে সে নতুন করে পর্যবেক্ষণ করতে শিখল, তখনই সে বুঝে গেছিল সে আসলে কতটা ভুল ছিল! সে নয় বরং অন্য কোনো ভাগ্যবতী মেয়ে আদনানের হূরপরী। এতদিন বাদে অতীত মনে পড়ে এবং পূণরায় যখন সে বুঝতে পারল আদতেও আদনানের হূরপরী সে নয়, তখন তার বক্ষপিঞ্জরে পুরনো দগদগে ঘা পূণরায় উজ্জীবিত হয়ে উঠল। তার মনে হতে লাগল, তখন বাড়িতে ফিরে যাওয়াটাই বোধ হয় ভালো ছিল। বারবার সে নিজেই নিজের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে গেলেও বাহির থেকে নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
'হুম। কেমন আছে সে?'
আদনান বিষাদিতস্বরে বলল,'আমি আসলে জানিনা সে কেমন আছে!'
'জানো না মানে? কথা হয় না?'
'কথা হয়। দেখাও হয়। আজকাল আমি তাকে বুঝতে পারি না। কেবলই সে একটু একটু করে যেন দূরে সরে যাচ্ছে। আবার কখনো মনে হয়, সে আসলে কাছেই আছে। কিন্তু শক্ত খোলস দ্বারা নিজেকে সে আবৃত করে রাখে।'
প্রাপ্তি কথাগুলো ভেতর থেকে অনুধাবন করতে পারছে না। তার হৃদয়ের গহীনে তখন পুরনো ক্ষত বুদবুদ শব্দ করছিল। তাই সে চুপ করে রইল। আদনান বলল,
'আমি কী করব বলতে পারিস?'
প্রশ্ন এবার প্রাপ্তির দিকে আসা সত্ত্বেও সে কিছুই বলতে পারল না। যখন দেখল আদনান তার প্রত্যুত্তের প্রতিক্ষায় নিজেও কিছু বলছে না তখন সে কিছু বলবার চেষ্টা করে মুখ খুলল,
'এই ব্যাপারে তুমি সরাসরি তার সাথে কথা বলো। কেন এমন করছে, কেন সে নিজেকে তোমার থেকে দূরে সরাচ্ছে এসব প্রশ্ন তাকে করো। সে-ই ভালো এবং সত্য উত্তর তোমাকে দিতে পারবে।'
ঝড়ের গতিতে আদনান প্রাপ্তির দিকে ঘুরে বসল। প্রাপ্তির দু'হাত ধরে বলল,
'তাহলে আমায় এবার বল, কেন তুই নিজেকে এভাবে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিস? কেন প্রাচীরঘেরা করে রাখছিস নিজেকে?'
বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল প্রাপ্তি। আদনান তাকে এসব প্রশ্ন করছে? কেন? তাহলে কি অতীতে করা প্রাপ্তির ধারণাই সত্য ছিল? অন্য কোনো নারী নয়, বরং প্রাপ্তিই তার রূপকথার হূরপরী? যদি তা-ই হয়, তাহলে তখন কেন জানায়নি? কেন প্রাপ্তির বিয়ের সময়ও সে নিশ্চুপ ছিল? একটা চাপা অভিমান যেন একটু একটু করে প্রাপ্তিকে আবারও পেঁচিয়ে ধরছিল। সে থমথমে অভিমানি কণ্ঠে সুধাল,
'এসব আমায় কেন জিজ্ঞেস করছ?'
'তুই বুঝতে পারছিস না?'
প্রাপ্তি ক্ষীণস্বরে বলল,'না।'
'কারণ তুই-ই আমার হূর প্রাপ্তি!'
স্পষ্ট ও প্রকাশ্য বাক্য কর্ণকুহর অব্দি প্রবেশ করা মাত্র চমকে আদনানের দিকে তাকায় প্রাপ্তি। কেন যেন চোখ দুটো ছলছল করছে। এখানেও কি চোখদুটো বেঈমানী করবে? আদনান মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
'হ্যাঁ, প্রাপ্তি! তুই।'
মনের ভেতর অভিমান তরতর করে বাড়তে থাকে। পুরনো ঘা যেন এখন আরো বেশি দগদগে হয়ে উঠেছে। সে শ্লেষেরসুরে বলে,
'তাই বুঝি? তাহলে সেদিন তুমি কোথায় ছিলে, যেদিন আমার বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক হয়েছিল। সেদিন কেন তুমি চুপ করে ছিলে?'
'প্রাপ্তি আমাকে না বলা তোর কথাগুলো, আমার প্রতি তোর অনুভূতি সবটাই আমি বুঝতাম। আমার ওপর অভিমানে, রাগে তুই যখন রায়হানের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলি আমি সহ্য করতে পারিনি। আবার মুখ ফুটে তোকে এসব বলতেও পারিনি। নিরবে সরে এসেছিলাম এটা ভেবে যে, তুই হয়তো রায়হানকে সত্যিই ভালোবাসিস। এই ধারণা যখন মিথ্যা প্রমাণিত হলো তখন ঠিক কতটা খুশি হয়েছিলাম তোকে বলে বোঝানোর ভাষা আমার নেই। ওরকম একটা ঝামেলা মেটার সাথে সাথে নিজের অনুভূতি জানানোও সম্ভব ছিল না। তোকে একটু সময় দিচ্ছিলাম। এর মাঝেই শুনি আঙ্কেল, আন্টি তোর বিয়ে ঠিক করেছে। তারা এমনভাবে নিজেদের খুশি প্রকাশ করেছিল যে, আমার নিজের অনুভূতির কথা বলার সাহস আর হয়নি। তাই নানানভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতাম। তোর সামনে নিজের ব্যস্ততাকে আরো বেশি করে তুলে ধরতাম। মূলত তোর বিয়ে ঠিক হওয়ার পরই তোর প্রতি আমার অনুভূতির পারদ আরো বেশি বেড়েছে। আর এরপর তো! এতসব হয়ে যাওয়ার পর আমার অনুভূতি তোর সামনে কী করে ব্যক্ত করব আমি সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি প্রেম, রিলেশন এসবে বিশ্বাসী নই। আমি তোকে সারাজীবনের জন্য হালালভাবে চাই। আমি পরিবারকে জানিয়ে তোকে বিয়ে করতে চাই।
প্রাপ্তি, আমি তোকে ভালোবাসি।'
চলবে...
[
