#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_২+৩+৪+৫
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
___________________
রায়হান তার রাশভারী কণ্ঠে বলে উঠল,'পথ আটকালে কেন?'
আদনান হাসল। ভদ্রতাসূচক হাসি। সে বলল,'এখন তো প্রাপ্তির রুমে যাওয়া যাবে না।'
'কারণটা কী জানতে পারি?'
'ও এখন ঘুমাচ্ছে।'
'সমস্যা নেই। আর্জেন্ট দরকার আমার।'
'বললাম তো যাওয়া যাবে না এখন। তাছাড়া বাইরের মানুষ অসময়ে ওর রুমে এলাউ না।'
রায়হানের রাগ হলো ভীষণ। অপমানে শরীর রি রি করে উঠল। চোয়াল শক্ত করে ক্ষিপ্র কণ্ঠে বলল,'তাই নাকি? তাহলে তুমি কে? তুমিও তো বাইরের মানুষ।'
'আমি বাইরের মানুষ?'
'তা নয়তো কী? ওর ফ্যামিলি মেম্বার তো নও।'
'তা নই। কিন্তু ছোটো থেকেই আমরা একে অপরকে চিনি, জানি। আমাদের আগে থেকেই আমাদের পরিবার পরিচিত। এসব জানো নিশ্চয়ই?'
'আমি সবই জানি। প্রাপ্তির সাথে যে তুমি আমাকে সহ্য করতে পারো না এটাও জানি।'
'এটা তোমার ভুল ধারণা। তোমাকে অসহ্য করার মতো কোনো কারণ নেই।'
'এত কথা বলার সময় নেই। প্রাপ্তির সঙ্গে আমার কথা আছে জরুরী। সরে দাঁড়াও।'
'বললাম তো পরে আসো।'
দুজনের চাপা তর্ক-বিতর্ক ঘর থেকেও টের পায় প্রাপ্তি। বাইরে এসে দুজনকে একসাথে দেখে; বিশেষ করে রায়হানকে এখানে দেখে সে চমকে যায়। অস্ফুটস্বরে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে,
'তুমি এখানে।'
'কথা আছে তোমার সাথে।' গম্ভীরকণ্ঠে বলল রায়হান।
প্রাপ্তি আড়দৃষ্টিতে একবার আদনানের দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টি নত। প্রাপ্তি ধীরকণ্ঠে বলল,'ঠিক আছে। ছাদে চলো।'
প্রাপ্তির পিছু পিছু রায়হানও ছাদে যায়। যাওয়ার পূর্বে আদনানের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাতেও ভুলে না।
.
ছাদের কার্ণিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাপ্তি। তার থেকে কিছুটা দূরে রায়হান দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলছে না দেখে প্রাপ্তি নিজেই জিজ্ঞেস করে,
'এই সময়ে কেন এসেছেন? গায়ে হলুদ তো রাতে হবে।'
'এসেছিলাম স্যরি বলতে। কিন্তু এসে যা দেখলাম, এরপর তো আর স্যরি বলার কোনো মানেই হয় না। এখন তো মনে হচ্ছে, যা বলেছিলাম রেস্টুরেন্টে একদম ঠিকই বলেছিলাম।'
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় প্রাপ্তির। তবুও সে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে,
'রেস্টুরেন্টে এসব আজেবাজে কথা বলা কম হয়ে গেছিল? এজন্য বাড়ি বয়ে এসেছ এসব বলতে?'
'আমার একটা কথাও মিথ্যে নয়।'
'সমস্যা কী তোমার? কী চাও তুমি?'
'আমার সমস্যা ঐ আদনানকে নিয়েই। কী সম্পর্ক তোমার ওর সাথে? এত কীসের অধিকার রয়েছে ওর তোমার প্রতি? ও যখন মন চায় তখনই তোমার রুমে যেতে পারবে আর আমার বেলায় পারমিশন লাগবে? তারচেয়েও বড়ো কথা, ও কে আমায় তোমার রুমে ঢুকতে বারণ করার?'
'একটা সাধারণ বিষয়কে এভাবে জটিল কেন করছ? কী হয়েছে সেটা তো বলবে।'
'তুমি আদনানকে আমাদের সম্পর্কের কথা কেন বলোনি?'
'রায়হান, আমি কাউকেই এখনো আমাদের সম্পর্কের কথা বলিনি। আমার দিক থেকে শুধু সেতু আপুই জানে। বাড়ির অন্যরা জানলে সমস্যা হয়ে যাবে।'
'অন্যদের জানানোর প্রয়োজন নেই। তুমি শুধু আদনানকে জানাও। ও না তোমার বন্ধু? নিশ্চয়ই তোমার ক্ষতি চাইবে না। বিষয়টাও হাইড রাখবে।'
'আদনান আমার বন্ধু ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের মাঝে অনেকটা ডিসট্যান্ট আছে এখন। তাছাড়া কথা নেই বার্তা নেই হুট করে আমি কীভাবে বলি এসব? সেতু আপুর বিয়ে উপলক্ষে দু'দিন ধরে বাড়ি এসেছে। তেমন করে আমাদের কথাও হয়নি।'
'বাহানা তাই না? বাহানা দেখাও তুমি আমাকে।'
প্রাপ্তি বিরক্তিসূচক শব্দ করে বলে,'ওকে। ওকে ফাইন। আমি আদনানকে আমাদের সম্পর্কের কথা জানাব। হয়েছে? খুশি?'
'কবে জানাবে?'
'আপুর বিয়েটা হয়ে যাক?'
রায়হান কিছুক্ষণ ভেবে বলল,'ঠিক আছে।'
এরপর একটুখানি হেসে প্রাপ্তির কাছে এগিয়ে গেল। হাত ধরে বলল,'স্যরি বাবু। তোমাকে হার্ট করার জন্য সত্যিই স্যরি।'
'ইট'স ওকে।'
রায়হান চুমু খাওয়ার জন্য এগিয়ে যেতেই প্রাপ্তি দু'কদম পিছিয়ে যায়। ভ্রুঁ কু্চকে বলে,'বাড়ি ভর্তি মেহমান। কে কখন ছাদে এসে পড়ে বলা যায় না।'
'একটা চুমু খেতে দশ ঘণ্টা লাগে না।'
'প্লিজ রায়হান!'
'প্লিজ প্রাপ্তি! জাস্ট ওয়ান কিস প্লিজ!'
'নো।'
'সবসময় তুমি এমন করো। কী সমস্যা একটা চুমু খেলে? আমি কি তোমার দূরের কেউ। তোমারই তো বয়ফ্রেন্ড।'
'বয়ফ্রেন্ড হলেই যখন, তখন চুমু খেতে হবে? আমার এসব ভালো লাগে না রায়হান। সো প্লিজ!'
রায়হান রেগে যায় এবার। ধমক দিয়ে বলে,'কবেই বা তোমার এসব ভালো লাগে? আমার কোনো কিছুই তো তোমার ভালো লাগে না।'
'আবার শুরু করলে!'
'কী শুরু করেছি আমি? কিছুই করিনি। তুমি করো। সবসময় নাটক করো আমার সাথে।'
'তোমার যদি মনে হয় নাটক করি, তাহলে তা-ই করি। তাছাড়া এমন কেন করো তুমি? বিয়ের পর এসব করা যায় না?'
'একটা চুমু খাওয়ার জন্য এখন বিয়ে করতে হবে? তাহলে প্রেম কেন করো?'
'তো তুমি কেন প্রেম করছ? এসব চাহিদার জন্য?'
'প্রাপ্তি!' ধমকে উঠল রায়হান।
প্রাপ্তি চাপাস্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,'একদম ধমকাবে না আমাকে। আমি পাগল হয়ে তোমার পিছু পিছু রিলেশন করার জন্য ঘুরিনি।'
'সুযোগের সদ্ব্যবহার করছ? আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা তো আমার দুর্বলতা। আর এজন্যই তুমি যা ইচ্ছে করতে পারছ। যা খুশি বলতে পারছ। আমারই উচিত হয়নি তোমায় এত ভালোবাসা। কত বেটার বেটার, স্মার্ট, সুন্দরীরা মেয়েরা আমার জন্য পাগল। আর সেখানে আমি... মেজাজই খারাপ হয়ে যাচ্ছে এখন। আনস্মার্ট কোথাকার!'
রায়হান রাগ দেখিয়ে ছাদ থেকে নেমে যায়। প্রাপ্তি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। এই ট'ক্সি'স রিলেশনশিপটা এগিয়ে নিতে নিতে সে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। মাত্র তিন মাসের রিলেশনশিপ দুজনের। এখনই এই অবস্থা। বিয়ের পর না জানি কী হবে!
_____________
আসাদ রহমান অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছেন মাত্র। অফিস বাড়ির কাছে হওয়াতে লাঞ্চ সে বাসায় এসেই করে। রেহেনা রহমান ভাত বেড়ে দিয়ে পাশে বসে আছেন। ভাতের লোকমা মুখে তুলে আসাদ রহমান বললেন,
'আদনান কোথায়? দেখছি না যে।'
'ঐ বাড়িতে গেছে।' জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বললেন রেহেনা বেগম।
আসাদ রহমান একটু রাগীস্বরেই বললেন,'সেতু ওর কী হয়? ওর বিয়ের জন্য চট্টগ্রাম থেকে আসতে হলো? পড়াশোনা সব লাটে উঠিয়ে তবেই ছাড়বে দেখছি!'
'এক সপ্তাহের ছুটি নিয়েই তো এসেছে। এই ক'দিনে পড়াশোনার খুব বেশি সমস্যা তো আর হবে না।'
'মেনে নিলাম। কিন্তু চাকরী? কাজের সমস্যা হচ্ছে না? এমন করলে চাকরী থাকবে?'
'তুমি এত উত্তেজিত কেন হচ্ছ? ঐ বাড়ির কাউকেই তুমি কেন সহ্য করতে পারো না, আমি বুঝি না।'
'স্ট্যাটাস বলতেও তো একটা কথা আছে রেহেনা। তোমার বান্ধবী বলে এত মেলামেশা করা লাগবে ও বাড়ির লোকের সাথে?'
'তুমি চুপচাপ খেয়ে ওঠো। খাওয়ার সময় এত কথা বলতে নেই।'
'কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না বললেই পারো। তবে যাই করো না কেন, ভেবে-চিন্তে। লিমিট রেখে।'
'বাদ দেবে এসব কথা? আজকে ফিরবে কখন?'
'প্রতিদিন যেই সময়ে ফিরি।'
'ওরা দাওয়াত করেছে, যাবে না?'
'সময় নেই আমার। তোমার ছেলে তো দাওয়াত খাবে বলে কাজকর্ম সব ফেলে রেখে চলে এসেছে। এখন শুধু তুমিই বাকি। তোমরা মা-ছেলে গেলেই হবে।'
রেহেনা বেগম আর কথা বাড়ান না। তার স্বামীকে সে ভালো করেই চেনে। সারাটা জীবন শুধু টাকা টাকা করেই গেছে। টাকা, সম্পত্তি, স্ট্যাটাস এসবই সব তার কাছে। আন্তরিকতার মানসিকতা একদম নেই লোকটার মাঝে। এজন্য মাঝে মাঝে রেহেনা বেগমের ভীষণ আফসোস হয় নিজের জন্য। শুধু মাত্র তার স্বামীর কারণে কত জায়গায় তাকে অপদস্থ হতে হয়েছে! কলেজের লাইফ থেকে প্রাপ্তির মায়ের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। সেই থেকে দুজনে বেষ্টফ্রেন্ড। কতশত স্বপ্ন, ইচ্ছে ছিল দুজনের। ভার্সিটি লাইফ শেষ করে বিয়েটা একসাথে করলেও বাদবাকি কোনো স্বপ্নই পূরণ হয়নি। স্বামীর মর্জিমতো চলতে গিয়ে অনেক ইচ্ছে তাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে। প্রাপ্তির মা সুমনা বেগমের ইচ্ছের জন্যই পাশাপাশি বাড়ি করা সম্ভব হয়েছে। আসাদ রহমান এই বাড়িটা করার পরই প্রাপ্তির বাবা ফিরোজ ইসলাম স্ত্রীর আবদারে এখানে দুই তলার একটা ফ্ল্যাট তৈরি করেন। নিচ তলায় অবশ্য সুমনা বেগমের ভাই তার পরিবারসহ থাকে। সেই সুবাদেই সেতুর বিয়েতেও আদনান এবং রেহেনা বেগম এত আনন্দিত।
আসাদ রহমান খেয়ে চলে যাওয়ার পর হাতের কাজকর্ম সেরে রেহেনা বেগম ওই বাড়িতে চলে যান। হাতে হাতে কাজ করেন তিনিও। সন্ধ্যায় গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়। আদনান ও তার বন্ধুরা মিলেই অনুষ্ঠান একদম শুরুতেই মাতিয়ে তোলে। সেতু সেজেগুজে স্টেজে বসে আছে। পাশে তার বন্ধু-বান্ধবও রয়েছে। সেতু অবশ্য রায়হানের আসার অপেক্ষা করছিল। প্রাপ্তির মুখেই সে রায়হানের আচরণ সম্পর্কে শুনেছে। তার আদরের বোনের সাথে এহেন আচরণ তার একদম সহ্য হয়নি। তাই তার বিশেষ দিনেও সে অধির আগ্রহে রায়হানের জন্য বসে আছে, এর একটা বিহিত করবে বলে। অপেক্ষার প্রহর শেষ করে রায়হান এলো হাসিমুখে। সেতু উঠে গিয়ে রায়হানকে টেনে এক সাইডে নিয়ে গেল।
'আরে, আরে করছিস কী? পালাবি নাকি আমায় নিয়ে?' মজা করে বলল রায়হান।
সেতু দাঁতে দাঁত পিষে বলল,'প্রাপ্তিকে কী বলেছিস তুই?'
প্রাপ্তির কথা শুনে হাসি মিলিয়ে যায় রায়হানের। সেও গম্ভীর হয়ে বলে,'আদনানের সাথে ও'কে আমার একদম সহ্য হয় না দোস্ত। তাছাড়া প্রাপ্তি একটু বেশিই ক্ষ্যাত! এই যুগেও এসে কেউ এমন করে? একটু জড়িয়ে ধরতে চাইলে, চুমু খেতে চাইলেও তার আপত্তি। ভালো লাগে না। মানে এসব কী? রিলেশন করলে কি এসব হয় না?'
'এখন সবার রুচি বা ইচ্ছে তো এক রকম নয় রায়হান। প্রাপ্তি একটু অন্য মাইন্ডের মেয়ে। এটা কিন্তু তুই আগে থেকেই জানতি। জানতি না?'
'জানতাম।'
'তাহলে সব জেনেও এখন তুই ওর সাথে এমন আচরণ কেন করছিস? ও'কে আজেবাজে কথা বলার কোনো রাইট নেই তোর। বয়ফ্রেন্ড হয়েছিস বলে কি যা খুশি তাই বলবি?'
'তুই এত হাইপার হচ্ছিস কেন দোস্ত?'
'আলবৎ হব। আফটারঅল, তোদের সম্পর্কটা তো আমার মাধ্যমেই হয়েছে। তুই যদি ওর সাথে যা তা আচরণ করিস আমি ছোটো হয়ে যাব না ওর কাছে? আমি ও'কে বুঝিয়েছিলাম বলেই তো ও তোর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে।'
'আচ্ছা আমি স্যরি। ভুল হয়ে গেছে আমার।'
'আমাকে কেন স্যরি বলছিস? প্রাপ্তি আসলে ও'কে সুন্দর করে স্যরি বলবি।'
'ওকে, ওকে। কোথায় এখন প্রাপ্তি?'
সেতু আশেপাশে তাকিয়ে বলল,'জানিনা তো! পার্লার থেকে এসে আর দেখিনি।'
.
.
আদনান ব্যস্ত পায়ে সুমনা বেগমের কাছে যায়। সুমনা বেগমও তখন ভীষণ ব্যস্ত। আদনান এসেছে প্রাপ্তির খোঁজ করতে। সুমনা বেগম জানেন না জানালেন। এত বেশি ব্যস্ত সব নিয়ে যে, ছেলে-মেয়ে কে কোথায় আছে সেই খবরও তার কাছে নেই।
আদনান প্রাপ্তির রুমে গিয়েছিল। সেখানে অন্যান্য মেহমানরা রয়েছে। ছাদেও প্রাপ্তিকে পাওয়া যায়নি। অবশেষে পাওয়া গেছে সেতুর রুমে। শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে। আদনান কোমরে দু'হাত রেখে বলে,
'ওরে নবাব নন্দিনী! সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে শুয়ে আছিস যে এখানে? চল, চল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে।'
প্রাপ্তি উঠল না। শুয়েই রইল। বলল,'ভীষণ মাথা ব্যথা করছে। যেতে পারব না।'
'ফাউল কথা বলবি না প্রাপ্তি। সেতুর গায়ে হলুদ আর তুই যাবি না?'
'বললাম তো মাথা ব্যথা করছে।'
'ওষুধ খেয়েছিস?'
'না।'
'ওষুধ না খেলে মাথা ব্যথা সারবে কী করে? তুই শুয়ে থাক। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।'
প্রাপ্তির কিছু বলার পূর্বেই আদনান চলে যায়। মিনিট দুয়েক পরেই প্রাপ্তিকে খুঁজতে খুঁজতে এই রুমে রায়হানও চলে আসে। পাশে বসে বলে,
'শুয়ে আছ কেন? যাবে না?'
'মাথা ব্যথা।'
'কিছু হবে না, তুমি চলো।'
'অনেক বেশিই মাথা ব্যথা রায়হান।'
'আমার ওপর রাগ করে আছো তাই না? এজন্যই যাবে না? আচ্ছা আমি স্যরি। এই দেখো, কান ধরেছি। আর কখনো তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করব না।'
প্রাপ্তি দায়সারাভাবে বলল,'ইট'স অল রাইট।'
'তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।' বলে প্রাপ্তিকে জড়িয়ে ধরে রায়হান। শাড়ি পরায় পেটের কিছুটা অংশ উন্মুক্ত ছিল। রায়হান সেই উন্মুক্ত জায়গাটুকু ছুঁতেই লাফিয়ে ওঠে প্রাপ্তি। সটান থা'প্পড় বসায় রায়হানের গালে। মৃদু চিৎকার করে বলে,
'চলে যাও এখান থেকে।'
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে প্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। রাগে তার মাথায় আগুন জ্বলছে। সে প্রাপ্তির দু'গাল চেপে ধরে বলে,'টাচ করলেই তোমার যত সমস্যা হয়ে যায় তাই না? তখন আর আমাকে ভালো লাগে না।'
'আমার ব্যথা লাগছে রায়হান।'
মাথা ব্যথায় এমনিতেই কাহিল ছিল প্রাপ্তি। এখন আবার রায়হানের শারীরিক, মানসিক দু'আচরণই তাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে।
রায়হান আরো শক্ত করে গাল চেপে ধরে বলল,'লাগুক। আদর করতে যখন দিবাই না; তখন ব্যথাই নাও।'
'রায়হান! প্লিজ যাও। দেখে এসে যাবে।'
রায়হান ঝাড়া দিয়ে প্রাপ্তির গাল ছেড়ে দেয়। যাওয়ার পূর্বে বলে যায়,'তোমার মতো গার্লফ্রেন্ড আমার প্রয়োজন নেই। চাইলে হাজারটা গার্লফ্রেন্ড আমি এমনিতেই বানাতে পারি।'
প্রাপ্তি কাঁদে। মাথার যন্ত্রণাটা এবার যেন আরো বেশি বাড়ছে। অসহ্য লাগছে এখন সবকিছু তার। আদনান ওষুধ আর পানির বোতল নিয়ে এসেছে। সেগুলো টেবিলের ওপর রেখে বলল,'খেয়ে একটু রেস্ট কর।মাথা ব্যথা কমে যাবে। এরপর অনুষ্ঠানে আসিস।'
চলে যাওয়ার সময় প্রাপ্তির ফোঁপানোর শব্দ কানে আসে। দাঁড়িয়ে পড়ে সে। ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে যায়। হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছিল প্রাপ্তি। আদনান ওর মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল,
'প্রাপ্তি? এই প্রাপ্তি কাঁদছিস কেন তুই? মাথা ব্যথা বেশি হচ্ছে?'
প্রাপ্তি নিরবে শুধু কাঁদছিলই। আদনান এবার জোরপূর্বক প্রাপ্তির মুখটা ওপরে তুলে ধরে। লাল হয়ে যাওয়া গাল দেখে চমকে যায়। আঙুলের দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে গালে। নখের দাগও রয়েছে। আদনানের রাগে হুঁশ হারানোর উপক্রম প্রাপ্তির এই অবস্থা দেখে।
সে দাঁতমুখ খিঁচে বলে,'আমি যাওয়ার পর রুমে কে এসেছিল প্রাপ্তি? আর কী হয়েছিল?'
প্রাপ্তি কথা বলতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে তার হেঁচকি উঠে গেছে। আচমকাই সে মুখভর্তি বমি করা শুরু করে। রাগ হারিয়ে আদনান এবার প্রাপ্তিকে নিয়ে অস্থির হয়ে পড়ে।
চলবে...
#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৩
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
মাথায় হাত রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আদনান। তার চোখে-মুখে ক্রোধ ও চিন্তা উভয়ই আছে। সুমনা বেগম নারিকেল তেল আর পানি মিশিয়ে প্রাপ্তির মাথার স্ক্যাল্পে আলতো করে ঘষে দিচ্ছেন। মেয়ের হঠাৎ এমন অসুস্থতায় তিনি নিজেও কিছুটা চিন্তিত। আদনানের কাছেই খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন তিনি। ঘরদোর পরিষ্কার করে এখন প্রাপ্তির মাথার কাছেই বসে আছে।
'তুই এখনো এখানে বসে আছিস কেন? বাইরে যা। সবার সাথে সময় কাটা।' প্রাপ্তির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন সুমনা বেগম।
আদনান চোখ-মুখ শক্ত করে বলল,'ভালো লাগছে না।'
'তোর কী হয়েছে?'
'কিছু হয়নি।' বলে উঠে দাঁড়ায় আদনান। একটাবার শুধু প্রাপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে বাইরে চলে যায়।
প্রাপ্তি বিহীন সেতুর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সেতু বেশ কয়েকবার সবার কাছে প্রাপ্তির খোঁজ করেছিল। আদনান জানিয়েছে, সিম্পল মাথা-ব্যথা তাই আসেনি। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে প্রাপ্তির কাছে আসার পর বিষয়টা মোটেও সেতুর কাছে সিম্পল মনে হয়নি। একদিনেই যেন প্রাপ্তির সে কি বিধ্বস্ত অবস্থা! নিজে ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও সে অনেকক্ষণ যাবৎ রাত জেগে প্রাপ্তির কাছে বসে থাকে। একটা সময় প্রাপ্তির পাশেই ঘুমিয়ে পড়ে।
.
রাত আনুমানিক আড়াইটা কি তিনটা বাজে। ছাদে একা একা পায়চারি করছে আদনান। সেই যে রাত একটায় কারেন্ট চলে গেছে, এখনো আসেনি। গরমে রুমে টেকা যাচ্ছিল না তাই ছাদে চলে এসেছে। আকাশও যেন গুমোট মেরে আছে। চাঁদ নেই, তারা নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। কেমন যেন নিস্তব্ধ পরিবেশ!
হাঁটতে হাঁটতেই সে প্রাপ্তির কথা ভাবে। ছোটো থেকেই দুজনের দা-কুমড়ার সম্পর্ক ছিল। একজন আরেকজনের সাথে কখনোই মিলতো না। রেহেনা বেগম কিংবা সুমনা বেগম যদি কখনো একজনকে রেখে অন্যজনকে আদর করত তাহলে সেদিন বাসায় ভাঙচুর থেকে শুরু করে ভূমিকম্প পর্যন্ত হয়ে যেত। বয়সের পার্থক্যও কখনো ওদের মস্তিষ্কে হানা দিতে পারেনি। কতবার পরীক্ষার সময় প্রাপ্তি দোয়া করেছিল, আদনান যেন এক্সিডেন্ট করে। পরীক্ষা যেন না দিতে পারে। এর একটা কারণও অবশ্য আছে। প্রাপ্তির সঙ্গে আদনানের যখনই ঝগড়া হতো আদনান একটা কথাই বলত,
'বেশি বকবক করবি না। একদম মাথায় তুলে আছাড় মারব। আমি তোর চেয়ে বড়ো জানিস না?'
মা-বাবা'ও সবসময় বলত,'আদনান তোমার বয়সে বড়ো। মারামারি, ঝগড়া এসব কেন করো? তুই করেও বলবে না।'
প্রাপ্তির ভীষণ রাগ হতো। বয়সে বড়ো বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে নাকি। তাই সে খুব করে চাইত আদনানের এক্সিডেন্ট হোক, পরীক্ষা দিতে না পারুক। ক্লাস গ্যাপ যাক ইত্যাদি ইত্যাদি। বদদোয়া হোক বা যেটাই হোক, একদিন সত্যি সত্যিই আদনান রাস্তায় বাইকের সাথে এক্সিডেন্ট করল। বাম পা এবং ডান হাতে বেশ আঘাত পেয়েছে। তখন তার জে.এস.সি পরীক্ষার মাত্র দেড় মাস বাকি ছিল। ঐ অবস্থায় পরীক্ষা দেওয়াটা সম্ভব ছিল না বলে, পরীক্ষা দিতে পারেনি। যার ফলস্বরূপ আদনানের এক বছর নষ্ট হয়। প্রাপ্তি কেন জানি আদনান এক্সিডেন্ট করার পর খুশি হতে পারেনি। বরং সে লুকিয়ে লুকিয়ে খুব কান্না করেছিল। আদনান যখন এস.এস.সি পরীক্ষা দেবে তখন একদিন মুখ ফসকে প্রাপ্তি বলে ফেলেছিল,
'আমায় কখনো রাগাবি না। এমন বদদোয়া দেবো, দেখবি সত্যি সত্যি আবার এক্সিডেন্ট করবি।'
আদনান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,'মানে কী?'
প্রাপ্তি তখন সব খুলে বলে। আদনান হতবাক। শত্রুও তো মনে হয় না এমন কামনা করে কখনো! সে ক্রুব্ধ হয়ে বলল,'তুই তো আচ্ছা অ'স'ভ্য মেয়ে! এসব বদদোয়া করতি? আর শোন, তোর বদদোয়া-টদদোয়া কিছু লাগেনি। এটা আমার ভাগ্যেই ছিল।'
প্রাপ্তি ভেংচি কাটে। আদনান বলে,'ভেংচি কাটিস আর যাই করিস এত খুশি হওয়ারও কিছু নেই। আমি এখনো তোর থেকে বয়সে বড়ো এবং ক্লাসেও এগিয়ে আছি ভুলে যাস না।'
দুজনের এত ঝগড়া আর মারামারি কমে এলো আদনান যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে চট্টগ্রাম চলে গিয়েছিল। তখন থেকে আদনানের প্রতি প্রাপ্তি অন্যরকম টান অনুভব করত। আদনান অবশ্য এসব কিছু ভাবে না। উলটো তার মাঝে দাম্ভিকতা এসে ভর করেছিল। ছুটিতে যেই বার ঢাকায় এলো তখন প্রাপ্তিকে কাঠকাঠ গলায় বলেছিল,
'আমাকে খবরদার তুই করে বলবি না। তুমি করে বলবি।'
তখন থেকেই পরিবর্তন আসে একটু একটু করে। ভুলক্রমে প্রাপ্তি কখনো কখনো তুই-ও বলে ফেলে। তবে এখন আর আগের মতো ঝগড়াঝাঁটি নেই। বাড়িতে ফিরলে আদনান প্রায়ই প্রাপ্তির পেছনে লেগে থাকে। ঝগড়া করার চেষ্টা করে। তবে প্রাপ্তি এখন আর আগের মতো ঝগড়ুটে নেই। সে এখন চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের হয়ে গেছে। তবে কখনো বাড়াবাড়ি মাত্রায় রেগে গেলে তখন ও'কে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে আদনান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ফাইনালে ইয়ারে পড়াশোনার পাশাপাশি একটা কোম্পানিতে জবও করে। প্রাপ্তি ঢাকাতেই ন্যাশনালে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে।
অতীতের স্মৃৃতিচারণ করতে করতে আদনান আনমনে কিছুটা হাসে। ছোটোবেলার দুষ্টুমির কথাগুলো মনে পড়ে যায়। সে এগিয়ে যায় প্রাপ্তিদের বাড়ির ছাদের দিকে। দুটো বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় মাঝখানে গ্যাপ একদম কম। চাইলেই এই ছাদ থেকে ঐ ছাদে যাওয়া যায়। সে রেলিঙের কাছাকাছি যাওয়ার পর নারী অবয়ব দেখতে পায় অন্ধকারে। ভ্রুঁ কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে,
'কে ওখানে?'
কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আদনান ফের আবারও ডাকে। এবারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। এবার সে নিজেই ছাদ টপকে প্রাপ্তিদের ছাদে যায়। একটু একটু করে এগিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে,
'লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ...ঐটা কে রে!'
তবুও কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আদনান এবার জোরেশোরেই বলল,'ঐ কে? কথা বলে না কেন?'
'আদনান, আমি!' বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে বলল প্রাপ্তি।
'ওহ তুই। আমি ভাবলাম কোন ভূত-পেত্নী।'
প্রাপ্তি কিছুই বলে না। আদনান ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলে,'তুই এত রাতে ছাদে কী করিস?'
'হাওয়া খাই।'
'এত খাস তাও তো মোটা হস না।'
'তোমার মতো বেলুন হব নাকি?'
'আমি বেলুন? তোর চোখ গেছে। আমি একদম ফিট আছি বুঝছিস।'
প্রাপ্তি নিরুত্তর। আদনান বলল,'মাথা-ব্যথা কমেছে?'
'হু।'
'এত রাতে একা একা ছাদে এসেছিস, ভয় লাগে না?'
'না।'
অন্ধকারেই আদনান কিছুক্ষণ প্রাপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,'তখন আমি ওষুধ আনতে যাওয়ার পর রুমে কে এসেছিল?'
প্রাপ্তি শক্ত গলায় বলল,'কেউ না।'
'মিথ্যে কথা বলবি না। কে এসেছিল বল?'
'বললাম তো কেউ না।'
'তোর গালে আমি স্পষ্ট আঘাতের দাগ দেখেছি। রায়হান এসেছিল?'
'না।'
'আবারও তুই মিথ্যে কথা বলছিস। কথা লুকাতে শিখে গেছিস খুব তাই না?'
'আমি কিছুই লুকাচ্ছি না।'
'রায়হানের সাথে সম্পর্ক কতদিনের তোর?'
প্রাপ্তি চমকে তাকায়। অন্ধকারে দুজনেরই দৃষ্টি সয়ে এসেছে। তাই প্রাপ্তির চমকে যাওয়াটাও আদনানের দৃষ্টিগোচর হয়। এদিকে সে নিজেও প্রাপ্তির চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রাপ্তি আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
'কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি।' বলল আদনান।
প্রাপ্তি ক্ষীণস্বরে বলল,'তিন মাসের।'
'আমি যদি ভুল না হই, তাহলে তোর গালে ভালোবাসার চিহ্ন নয় বরং আঘাতের চিহ্ন ছিল। রিলেশন করবি ভালো কথা। মানুষ চিনে করবি না? যার তার সাথে রিলেশন করলেই হবে?'
'আগে থেকেই মানুষ চিনব কী করে? সেতু আপুর ক্লাসমেট বন্ধু হয় রায়হান। আপুও তো কত কত ভালো ভালো কথা বলেছে। রায়হান অনেক পাগলামি করেছিল। অনেক কান্নাকাটিও করেছিল। আর...আর..'
'আর কী?'
'আর তোমার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়েই আমি ওর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছি।'
'আমার যন্ত্রণায়?'
'হ্যাঁ। সারাক্ষণ তোমার হূরের গল্প শুনতে শুনতে আমি অতিষ্ঠ। আমরা যে এত বছরের বন্ধু কখনো আমায় একটু সেভাবে মূল্যায়ন করেছ? দেখা হলে, কথা হলেই কীভাবে ঝগড়া করা যায়,কীভাবে পেছনে লাগা যায় সর্বদা সেই মতলবে থাকো। সঙ্গে বকাঝকা, ঝাড়ি তো ফ্রি আছেই। মাঝে মাঝে শুধু আমি এটাই ভাবি, শুধুমাত্র মারটাই বা কেন বাকি রেখেছ।'
'আমি কাপুরুষ নই প্রাপ্তি। মেয়েদের গায়ে হাত তোলা আমার পছন্দ না। আর এইযে রায়হানের সাথে তোর সম্পর্ক এটা কিন্তু ভালোবাসা না। রায়হানের পাগলামি, কান্নাকাটি এসব দেখে তোর মনে ওর জন্য একটা সিমপ্যাথি কাজ করেছে। আবার আমার ওপর নাকি রাগ, জেদ করেও তুই সম্পর্কে জড়িয়েছিস। তাহলে এসবের মধ্যে ভালোবাসাটা কোথায়?'
প্রাপ্তি নিশ্চুপ। আদনান বলল,'রাগ, জেদ, অভিমান, মায়া এসব ভালোবাসার অংশ; কিন্তু ভালোবাসা নয়। শুধু শুধু এরকম ট'ক্সি'স একটা রিলেশনশিপে থেকে নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না। আমি বলছি না যে, ব্রেকাপ করে ফেল। একটু সময় নে। ভাব। ওর সাথে খোলামেলা কথা বল। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে সরাসরি কথা বলাটা অনেক বেশি জরুরী। মনে মনে কথা জমিয়ে রাখলে একটা সময়ে মানুষ ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে। আর তখনই একটা সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে।'
'ব্রেকাপ হয়ে গেছে আমাদের। ও নিজেই করেছে।'
আদনানের কিছু বলার ভাষা নেই আর। প্রাপ্তিকে এসব ব্যাপারে এখন কিছু জিজ্ঞেস করা মানেই অযথা খুঁচিয়ে কষ্ট দেওয়া হবে। তাই সে একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঘাড় এদিক-সেদিক বাঁকিয়ে বলল,
'ঘরে যা।'
'পরে।'
'এখনই যাবি। রাত কয়টা বাজে খেয়াল আছে কোনো? অযথা কোনো তর্ক শুনতে চাচ্ছি না আমি। যা ভেতরে।'
প্রাপ্তি বিরক্ত হয়ে হনহন করে নেমে যায় ছাদ থেকে। আদনান কিছুক্ষণ সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে নিজেদের ছাদে চলে যায়।
__________
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান মিস করায় প্রাপ্তির নিজেরও ভীষণ রকম মন খারাপ ছিল। তবে আজ সকাল থেকে সে বেশ সুস্থ অনুভব করছে। যদিও কদাচিৎ মাথা-ব্যথাও ক্ষণে ক্ষণে অনুভব করছে বটে; তবে সেভাবে পাত্তা দিচ্ছে না। বিয়ের অনুষ্ঠানও যদি মিস করে তাহলে আফসোসে আফসোসেই তার বাকিটা জীবন পার হবে।
সেতুর সাথে পার্লারে গেছে প্রাপ্তি। সঙ্গে আরো কয়েকজন কাজিন আর সেতুর কাছের দুজন বান্ধবীও এসেছে। সেতুর বিয়ে উপলক্ষে প্রাপ্তি লাল-খয়েরী রঙের একটা লেহেঙ্গা নিয়েছে। লেহেঙ্গার ওপর স্টোনের কাজ করা। মামা যখন নিজে পছন্দ করে প্রাপ্তিকে লেহেঙ্গাটি কিনে দিয়েছে, তখন তার সে কি খুশি!
আদনানের পার্লারে আসার কথা ছিল ওদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কাজে আটকে যাওয়ায় সে আসতে পারেনি। মামা এসেছে। অযথা একটু মনও খারাপ হলো প্রাপ্তির। মন খারাপের রেশ কেটেছে বাড়িতে গিয়ে। আদনানকে দেখার পর তার কী যে ভালো লাগছে! যতই ঝগড়া করুক, অহংকার দেখাক না কেন ছেলেটার মনটা ভীষণ ভালো। নিঃসন্দেহে ওর হূরপরী একজন ভাগ্যবতী নারী।
প্রাপ্তির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ও আদনান ও'কে খেয়াল করল না যেন। অথচ দুজনেরই চোখাচোখি হয়েছে। আদনান অফ হোয়াইট রঙের একটা পাঞ্জাবি পরেছে। শ্যামবর্ণের হওয়ায় পাঞ্জাবিটিও ভীষণ ফুটে উঠেছে শরীরে। ক্যামেরাম্যান সবার একসাথে গ্রুপ ফটো তুলে দিচ্ছিল। সেতুর সিঙ্গেল ছবি তোলার সময় আদনান প্রাপ্তির কাছে আসে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,
'একটু এদিকে আয় তো। কথা আছে।'
আদনানের পিছু পিছু যায় প্রাপ্তি। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আদনান বলে,'তোকে একটা কথা বলার আছে। তোর মামা সব কাজ দিয়েছে আমার ওপর চাপিয়ে। এখন গাধার খাটনি খাটতে হচ্ছে আমার।'
প্রাপ্তি মুখ ভার করে বলল,'এতই যখন অসুবিধা মামাকে তখন না করতে পারলে না?'
'এটাই তো আসল সমস্যা। আমি আবার কাউকে কষ্ট দিতে পারি না। আমার মনটা অনেক ফ্রেশ কিনা! তুই মুখ ওরকম বানিয়ে রেখেছিস কেন?'
'কী বলতে চাইছ সেটা বলো।'
'বলছি। এত অস্থির হচ্ছিস কেন?'
'আমি স্থিরই আছি।'
'তুই কি আর রঙ খুঁজে পাসনি?'
'মানে?'
'মানে হচ্ছে বিয়েতে ড্রেস পরার জন্য আর রঙ খুঁজে পাসনি। একই কালার, আবার লেহেঙ্গা। তুই আর সেতু পাশাপাশি দাঁড়ালে মানুষ তো কনফিউজড হয়ে যাবে আসলে বউটা কে। তোর বিয়ে নাকি? তুই এত ভারী ড্রেস কেন পরেছিস?'
মনটাই খারাপ হয়ে গেল প্রাপ্তির। ইচ্ছে করছে আদনানকে দু'চারটে কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু সে এমন কিছু করল না। চুপচাপ স্থান ত্যাগ করে একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে বসে রইল। গালে হাত রেখে মনে মনে ভাবছে, আজকের দিনেও কি এমন বাজে ব্যবহার করা লাগল?
'প্রাপ্তি।'
ভ্রুঁ কুঁচকে পেছনে তাকায় প্রাপ্তি। অপরাধীর মতো মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রায়হান। প্রাপ্তি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে চলে আসার জন্য উঠে দাঁড়ায়। হাত টেনে ধরে রায়হান। আকুতি-মিনতি করে বলে,'প্লিজ! আমার কথাটা শোনো।'
'আমার হাত ছাড়ো। কোনো কথা নেই আমার তোমার সাথে।'
'এরকম কোরো না প্রাপ্তি। আমি দুঃখিত কালকে ওরকম ব্যবহার করার জন্য। এবারের মতো মাফ করে দাও প্লিজ!'
'প্লিজ রায়হান হাত ছাড়ো।'
রায়হান এবার হাত ছেড়ে প্রাপ্তির পা পেঁচিয়ে ধরে বলে,'পা ধরে মাফ চাইছি। এবার তো ক্ষমা করে দাও। একটা সুযোগ দাও। ভুল তো মানুষেরই হয়। ক্ষমা করো প্লিজ!'
প্রাপ্তি আশেপাশে একবার তাকিয়ে চাপাস্বরে বলে,'এসব কী করছ? ছাড়ো। কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?'
'তুমি আমায় ক্ষমা করেছ বলো। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না প্রাপ্তি। কেন বুঝতে চাচ্ছ না?'
প্রাপ্তি লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে বলল,'ওকে। তুমি পা ছাড়ো। আমরা বসে কথা বলি।'
রায়হান পা ছেড়ে দেয়। দুজনে এখন মুখোমুখি বসে আছে। নিজে নিজে মনে কথাগুলো আগে গুছিয়ে নিয়ে প্রাপ্তি বলে,'আমি রিলেশন ঠিক করব। তবে একটা শর্তে।'
'কী শর্ত বলো? তুমি যা বলবে আমি তাই শুনব।'
'আমি যেসব কাজ পছন্দ করি না সেসব একদম আমার সাথে করা যাবে না।'
'আমি রাজি। কোনো আপত্তি নেই আমার। তুমি শুধু আমায় ছেড়ে যেও না।'
রায়হানের কান্নাকাটিতে প্রাপ্তি আবার গলে যায়। দুজনের সম্পর্কটা বলতে গেলে নতুন করেই শুরু হয় আবার। রায়হান এখন আর আগের মতো আচরণ করে না। প্রাপ্তি যা বলে তাই শোনে।
.
.
বিয়ের পর আজ সেতু নাইওর এসেছে। সেজন্য সুমনা বেগম আর মামি মিলে ভালো ভালো খাবার রান্না করেছে। শুক্রবার আজ তাই আসাদ রহমানের অফিস বন্ধ। তিনি বাসায় থাকলে রেহেনা বেগম খুব একটা এই বাড়িতে আসতে পারেন না। তাই রান্না করা খাবারগুলো টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে প্রাপ্তিকে ডাকেন সুমনা বেগম।
প্রাপ্তি তখন রেডি হচ্ছিল রায়হানের সাথে দেখা করতে যাবে তাই। মায়ের ডাকে তাড়াহুড়া করে এসে বলে,'কী হয়েছে?'
'খাবারগুলো ঐ বাড়িতে দিয়ে আয়।'
'আমি কেন? আমি পারব না এখন। বাইরে যাব।'
'যা। যাওয়ার আগে বাটিটা দিয়ে আয়। দশ মাইল দূরে তো আর না বাড়ি।'
আসাদ রহমান বাড়িতে বলে প্রাপ্তি নিজেও ওই বাড়িতে যেতে চায় না। কিন্তু কিছু করার তো নেই এখন। সে একেবারে রেডি হয়েই বের হয়। খাবারগুলো দিয়ে সোজা চলে যাবে। বাড়িতে আর আসবে না।
ও বাড়িতে গিয়ে কলিংবেল বাজানোর পর মেইড এসে দরজা খুলে দেয়। প্রাপ্তি আশা করেছিল রেহেনা বেগম দরজা খুলবে। তাহলে এখান থেকেই খাবারগুলো দিয়ে চলে যাওয়া যেত। কিন্তু তা তো আর হলো না। কী আর করার! সে যা ভাবে সবসময় তার উলটোটাই হয়। গুটি গুটি পায়ে সে ভেতরে যায়। আসাদ রহমানও ড্রয়িংরুমেই ছিলেন। ফোনে সম্ভবত নিউজ দেখছেন।
প্রাপ্তি বিড়বিড় করে বলে,'ফোনেই যখন নিউজ দেখবেন, তাহলে রুমে বসে দেখলেই তো পারতেন।'
প্রাপ্তিকে দেখে আসাদ রহমান গম্ভীর হয়ে বলেন,'কী ব্যাপার?'
প্রাপ্তি হাসার চেষ্টা করে। সালাম দিয়ে বলে,'আন্টি কোথায়?'
তিনি সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,'গোসল করে। হাতে কী?'
'জি, খাবার। মা পাঠিয়েছে।'
'কেন? আমরা কি খেতে পাই না? ওই বাড়ির খাবারের আশায় বসে থাকি?'
মন ছোটো হয়ে যায় প্রাপ্তির। চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। প্রাপ্তি জানে লোকটা এমন, তবুও সে খারাপ ব্যবহার নিতে পারে না। কান্না পেয়ে যায়। কথাবার্তা শুনে আদনান তার রুম থেকে বেরিয়ে আসে। প্রাপ্তির কাঁদোকাঁদো মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাবার ব্যবহারই এর কারণ।
'কখন এসেছিস?' জানতে চাইল আদনান।
প্রাপ্তি কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,'এখনই। এগুলো রাখো। মা পাঠিয়েছে।'
টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল আদনান। প্রাপ্তি চলে যাওয়ার সময় সেও পিছু পিছু যায়। মেইন দরজার কাছে গিয়ে প্রাপ্তির হাত ধরে বলে,'কাঁদছিস তুই!'
'উঁহু!'
'বাবা বকেছে আবার?'
'সে তো সবসময়ই এমন ব্যবহার করে।'
'স্যরি প্রাপ্তি। বাবার হয়ে আমি মাফ চাইছি।'
'তুমি কেন মাফ চাইবে? সবসময় তুমি এমনটাই করো। কখনো তো প্রতিবাদ করো না।'
'আমি তাকে সম্মান করি। তাই মুখের ওপর কখনো কিছু বলি না, তুই তো সেটা ভালো করেই জানিস।'
'এমন বাবার ঘরে যে তোমার মতো ভালো মনের একটা ছেলে কীভাবে হয়েছে একমাত্র আল্লাহ-ই ভালো বলতে পারবে। তুমি রেহেনা আন্টির মতো হয়েছ।' বলে প্রাপ্তি একটু হাসে। ওর সঙ্গে মৃদু হাসে আদনানও।
আদনানের থেকে বিদায় নিয়ে রায়হানের সঙ্গে দেখা করতে যায় প্রাপ্তি। রায়হানের খুব ইচ্ছে হয়েছে আজ দুজনে রিকশায় করে ঘুরবে। ওর ইচ্ছেটাই পূরণ করছে প্রাপ্তি।
রায়হান হঠাৎ বলে ওঠে,'থ্যাঙ্কিউ।'
'থ্যাঙ্কিউ কেন?' অবাক হয়ে জানতে চাইল প্রাপ্তি।
'আমার দুইটা উইশ পূরণ করার জন্য। এক. আমার কথামতো তুমি কালো রঙের থ্রি-পিস পরেছ। আর দুই. আমার সাথে রিকশায় ঘুরছ।'
প্রাপ্তি হাসল কিছুটা।
'প্রাপ্তি।'
'হু?'
'খুব শীঘ্রই আমি বাবা-মাকে তোমার বাসায় পাঠাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তোমাকে খুব ভালোবাসি প্রাপ্তি।'
একটু থেমে সে ফের বলল,'একটা কথা কিন্তু জানো না।'
'কী?'
'আজকে আমার জন্মদিন।'
'হোয়াট! আমায় আগে কেন বলোনি? ধুর! কাজটা মোটেও ঠিক করোনি তুমি।'
'আরে রাগ করছ কেন? আগে বললে গিফ্ট নিয়ে আসতে এইতো?'
'গিফ্ট তো দেওয়াই লাগে তাই না?'
'না। আমার গিফ্ট লাগবে না। আমি তোমার কাছে অন্যকিছু চাই। দেবে?'
'দেওয়ার মতো হলে আর সামর্থ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই দেবো।'
'তোমার পক্ষে অসম্ভব এমন কিছুই চাইব না।'
'আচ্ছা বলো কী চাও?'
রায়হান প্রাপ্তির কোমর জড়িয়ে ধরে কিছুটা কাছে এনে ফিসফিস করে বলে,'তোমাকে আজ সম্পূর্ণভাবে আমার করে চাই। সুন্দর একটা মুহূর্ত তৈরি করতে চাই। যেই মুহূর্তটুকুতে শুধু তুমি আর আমি থাকব। খুব করে কাছে চাই। তোমায় এতটা কাছে চাই, যতটা কাছে থাকলে দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসও এক হয়ে যায়। তুমি বুঝতে পারছ তো প্রাপ্তি আমি কী চাচ্ছি?'
'মামা, রিকশা থামান।' বলল প্রাপ্তি।
রায়হান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,'কী হয়েছে?'
'নামো।' বলে প্রাপ্তি নিজেও রিকশা থেকে নামে। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রায়হানকে বলে,
'ইন্টিমেট হতে চাইছ তাই তো? ওকে, ওয়েট।'
প্রাপ্তি ব্যাগ থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে রায়হানের হাতে দিয়ে বলে,'আমি একচুয়ালি জানিনা রাস্তার মেয়েদের রেট কত। সম্ভবত ২০০/৩০০ তেও পাওয়া যায়। আমি তোমাকে ৫০০ টাকা দিলাম। সুন্দরী দেখে একটা মেয়েকে ভাড়া করে নিজের চাহিদা মিটিয়ে নিও।'
'প্রাপ্তি!' মৃদু চিৎকার করে ওঠে রায়হান।
'আওয়াজ নিচে। একদম আমার সাথে চেঁচিয়ে কথা বলবে না। রাস্তাঘাটে কোনো রকম সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছি না আমি। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো, আমি ভদ্র ফ্যামিলির মেয়ে; কোনো রাস্তার মেয়ে নই যে তোমার সাথে বিছানায় শুয়ে পড়ব। তোমার ইনটেনশন-ই তো শরীর পাওয়া তাই না? তো যাও না, রাস্তায়, পতিতালয়ে। এতে তোমারও চাহিদা মিটবে আর ওদেরও কিছু টাকা ইনকাম হবে। অযথা ভদ্র পরিবারের মেয়েদের পেছনে কেন পড়ে থাকো? আর হ্যাঁ, আজকের পর থেকে খবরদার আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। কোনো ক্যারেক্টারলেস ছেলের সাথে আমি সম্পর্ক রাখব না।'
চলবে...
#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৪
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
____________________
আকাশের রঙ আজ অদ্ভূত রকমের। কোথাও আকাশী রঙ তো আবার কোথাও সাদা মেঘের ভেলা। রোদের তাপ নেই একদম। মৃদু বাতাসে মনটা সতেজ লাগছে। আর নিজেকেও প্রাপ্তির আজ অনেক হালকা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো বন্দি পাখি লোহার খাঁচা থেকে মুক্তি পেয়েছে। অবশ্য প্রাপ্তির বিষয়টাকেও এভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায়। এরকম বি'ষা'ক্ত সম্পর্ক আর খাঁচার মধ্যে তফাৎ-ই বা কী? রাযহানকে তার উপযুক্ত জবাবগুলো দিতে পেরে আরও বেশি স্বস্তিবোধ করছে সে। ওখান থেকে ফিরে এসে একা একাই সে কিছুক্ষণ ঘুরেছে। ফুসকা খেয়েছে, হাওয়াই মিঠাই খেয়েছে। ফুল বিক্রেতা পথশিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছে। সব মিলিয়ে দারুণ একটা সময় কাটিয়েছে আজ সে। যেখানে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম ছিল না। কোনো চাহিদা ছিল না। একা একাও ভালো থাকা যায়। একাই নিজে নিজেকে সময় দেওয়া যায়। শুধু এইটুকু বিশ্বাস রাখা উচিত, আমি নিজেকে ভালো রাখতে পারব।
বাড়ির পথে আদনানের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সে হাত নাড়িয়ে রিকশাটি থামিয়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। রিকশাওয়ালার উদ্দেশ্যে বলে,
'মামা, চলেন।'
প্রাপ্তি কিছুই বলল না। অন্য কোনো সময় হলে রাগ করত। বকত। না হলে গাল ফুলিয়ে বসে থাকত। কিন্তু আজ সে এসবের কিছুই করেনি। বরং হাসছে। আদনান একটু অবাকই হলো। জিজ্ঞেস করল,
'অযথা হাসছিস কেন?'
'এমনিই।'
'এমনি কারণ ছাড়া কেউ হাসে? ভূতে আছড় করেছে?'
'ধুর! সবসময়ই শুধু ফালতু কথা বলো। কোথায় গিয়েছিলে?'
'মোড়ে গেছিলাম আড্ডা দিতে।'
'চট্টগ্রাম কবে ফিরে যাচ্ছ?'
'তোর এত তাড়া কীসের?'
'আমার আবার কীসের তাড়া?'
'কথায় তো মনে হচ্ছে, আমি গেলে তুই বেঁচে যাস।'
'তুমি থাকলেই আমার কী, আর না থাকলেই বা আমার কী? আমি তো তোমার হূরপরীর কথা ভেবেই বললাম।'
'ওর কথা কী ভাবলি?'
'বেচারি একা চট্টগ্রামে তোমার অপেক্ষায় আছে। খারাপ লাগছে না?'
'তোকে কে বলল আমার হূর চট্টগ্রাম থাকে?'
প্রাপ্তি ভ্রুঁ কুঁচকাল,'তাহলে কোথায় থাকে?'
'আমার সাথেই থাকে। ওর কথা বাদ দে। তুই কোথা থেকে এলি?'
'ঘুরতে গেছিলাম।'
'রায়হানের সাথে?'
'প্রথমে ওর সাথেই গেছিলাম। পরে একাই ঘুরেছি।'
'কেন?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল আদনান।
প্রাপ্তি কোনো কিছু না লুকিয়েই সবটা আদনানকে বলে দেয়। আদনান দাঁত-মুখে খিঁচে বলে,'শালা জা'নো'য়া'র! জবাব তো একদম উচিত জবাব-ই দিয়েছিস। কিন্তু সাথে দু/চারটা কষে থা'প্প'ড় বসালি না কেন?'
'দাঁতে যাকে মারা যায় তাকে হাতে মারার কী দরকার বলো?'
'নেক্সট টাইম বে'য়া'দ'বটার কথায় আবার গলে যাস না প্রাপ্তি।'
'পাগল নাকি? এরপর আর যদি যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তখন সত্যিই মার খাবে।'
আদনান হাসছে দেখে প্রাপ্তি জিজ্ঞেস করে,'হাসছ কেন?'
'তোর রাগ আর সাহস দেখে। আমি তো তোকে সেই বাচ্চা-ই ভাবতাম। এখন দেখছি, নাহ্! তুই অনেক বড়ো হয়ে গেছিস।'
প্রাপ্তি কিছু বলল না। আদনান নিজেই বলল,'চা খাবি?'
'বাড়িতেই তো এসে পড়লাম।'
'সমস্যা নেই। রিকশা ঘুরিয়ে টং দোকানে যাই চল।'
প্রাপ্তি কয়েক সেকেন্ড ভেবে রাজি হয়ে যায়। রিকশা আবার উলটো পথে চলা শুরু করে।
.
ঘুরেফিরে রাতে বাড়ি ফেরার পরে সর্বপ্রথম সেতুর সঙ্গে প্রাপ্তির দেখা হয়। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছিল এতক্ষণ যাবৎ ওর জন্যই অপেক্ষা করছে। প্রাপ্তিকে দেখা মাত্রই চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে গেল রুমে। এতক্ষণ বাইরে থেকে প্রাপ্তি ক্লান্ত ছিল। তাই সে ক্লান্তস্বরেই বলল,
'কী হয়েছে? এভাবে নিয়ে এলে কেন?'
'রায়হানের সাথে তোর কী হয়েছে?'
রায়হানের নাম শোনামাত্রই প্রাপ্তির চোখ-মুখের ভাব পাল্টে যায়। ক্লান্তি সরে গিয়ে কাঠিন্য ভর করে। ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে কাঠকাঠ কণ্ঠে বলে,
'হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?'
'তুই নাকি ওর সাথে ব্রেকাপ করেছিস? নাম্বারও ব্ল্যাকলিস্টে ফেলেছিস?'
প্রাপ্তির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সে রাগে গমগম করে উঠে বলল,'ব্রেকাপ করেছি, ব্লক করেছি এসব তো ঠিকই বলেছে। কেন করেছি তা বলেনি কেন?'
'এত রেগে যাচ্ছিস কেন? আমায় বলবি তো ক্লিয়ার করে কী হয়েছে।'
'তোমার ফ্রেন্ড একটা খারাপ লোক। সে ইন্টিমেট হতে চেয়েছিল আমার সাথে।'
সেতু অবাক হয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। প্রাপ্তি রেগেই বলল,'আর কখনো ওর কথা আমাকে বলবে না। ওর নামটাও সহ্য হয় না এখন আর আমার।'
সেতু কিছুক্ষণ ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,'ঠিক আছে। তুই ফ্রেশ হয়ে নে।'
রাতে আর প্রাপ্তি ডিনার করেনি। ফ্রেশ হয়ে ওমনি শুয়ে পড়েছে। আননোন নাম্বার থেকে কল আসায় তার তন্দ্রা ভাবটুকু কেটে যায়। কল রিসিভ করতেই রায়হানের কণ্ঠ শুনতে পায়। আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি। সাথে সাথে নাম্বার ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দিয়েছে। এভাবে কতগুলো নাম্বার থেকে যে ট্রাই করেছে তার বোধ হয় হিসাবও নেই। বিরক্ত হয়ে ফোনই অফ করে রেখেছে প্রাপ্তি।
.
ভার্সিটিতে যাবে বলে পরেরদিন সকাল সকালই ঘুম থেকে উঠে যায়। শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে তৃধা আর অঙ্কিতাকে দেখতে পায়। একটু অবাকই হয় আজ দুটোকে এখানে দেখে।
তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করে,'আজ কী মনে করে বাড়িতে এলি?'
'তোর বাড়িতে আসার আগে এপপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখতে হবে নাকি?' ভেংচি কেটে জিজ্ঞেস করে তৃধা।
প্রাপ্তি মুখ টিপে হাসে। 'কোনো কারণ ছাড়া তোরা বাড়িতে আসিসনি। ঝটপট বলে ফেল এখন উদ্দেশ্য কী?'
অঙ্কিতা বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভাবলেশহীনভাবে বলল,'তোর বয়ফ্রেন্ড গতকাল রাতে ফোন করেছিল।'
'বয়ফ্রেন্ড মানে? রায়হান?'
তৃধা বলল,'এমনভাবে বলছিস মনে হচ্ছে রায়হান ভাইয়া ছাড়াও তোর আরো পাঁচ, ছয়টা বয়ফ্রেন্ড আছে।'
তোয়ালে রেখে মুখে ফেস-পাউডার মাখতে মাখতে প্রাপ্তি উত্তর দিলো,'ওর সাথে এখন আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই।'
ভূত দেখার মতো চমকে যায় অঙ্কিতা আর তৃধা। কত বাঁধা-বিপত্তি, কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই না রায়হান প্রাপ্তির মন পেয়েছিল। এ কথা তো বন্ধুমহলের সকলেই জানে। সেখানে ব্রেকাপ হয়েছে শুনে বিস্ময়েরও যে অন্ত থাকবে না এটাই তো স্বাভাবিক।
বিস্মিতকণ্ঠেই অঙ্কিতা বলল,'সেকি! কিন্তু কেন?'
প্রাপ্তি সব ঘটনা খুলে বলল দুই বান্ধবীকে। তৃধা রেগেমেগে বলল,'এভাবে ছেড়ে দিয়েছিস কেন শা'লাকে? দুইটা দুইটা করে মোট চারটা থা'প্পড় ঐ অ'স'ভ্যটাকে দেওয়া উচিত ছিল।'
'ওর সামনে আর দাঁড়িয়েই থাকতে পারছিলাম না তৃধু। ঘেন্না লাগছিল ভীষণ।'
'ব্যাটা ই'ত'র তো আমাকে এসব কিছুই বলেনি। ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে বলছে, তোর সাথে ঝগড়া হয়েছে। তাই নাকি কথা বলিস না, ব্লক করে রেখেছি। আমি আর তৃধা যেন তোকে বোঝাই। হাতে-পায়ে ধরাটা খালি বাকি ছিল রে ভাই! সকালেই যেন তোর কাছে আসি হ্যানত্যান।' এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল অঙ্কিতা।
প্রাপ্তি বিরক্ত হয়ে বলল,'বাদ দে এখন ওর কথা। আর কখনো ফোন বা ম্যাসেজ দিলে ব্লক দিয়ে দিস।'
তৃধা বলল,'ব্লক তো দেবোই। তার আগে ডিটারজেন্ট দিয়ে ওয়াশ করবো ই'ত'রটাকে।'
'ঠিক আছে। এসব পরে হবে। আমি কিন্তু খেয়ে আসিনি। নাস্তা এখানেই করব।' বলল অঙ্কিতা।
'তোরা ডাইনিং-এ গিয়ে বোস। আমি আসছি।'
অঙ্কিতা আর তৃধা প্রাপ্তির রুম থেকে বের হতেই ড্রয়িংরুমে আদনানের সাথে দেখা হয়ে যায়। আদনানের চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ রেগে আছে। কিন্তু ওদেরকে দেখেই আবার হাসল। হাসতে হাসতেই বলল,
'আরে আরে সকাল হতে না হতেই সুন্দরীদের সঙ্গে দেখা। কেমন আছো তোমরা?'
অঙ্কিতা আর তৃধাও হাসল। বলল,'ভালো আছি ভাইয়া। আপনি ভালো আছেন?'
'আর ভালো থাকা! ঐ পেত্নীটা কোথায়? ফোন অফ কেন ওর?'
'জানিনা তো! ঘরেই আছে এখন।'
'বের হবে না?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে ও নিজেই আসুক। আমি ততক্ষণে তোমাদের সাথে গল্প করি। খেয়ে এসেছ নাকি খাবে?'
'খাইনি।' বলল তৃধা।
'গুড। আমিও খাইনি। চলো একসাথে খাওয়া যাক।'
ডাইনিংরুমে তিনজনে একসাথে বসে। আদনান সুমনা বেগমকে ডেকে নাস্তা দিতে বলে। বাড়ির আর সবাই এখনো ঘুমে। প্রাপ্তির বাবা তো আরো আগেই অফিসে চলে গেছে। সুমনা বেগম ওদেরকে নাস্তা দিয়ে পাশেই বসলেন।
আদনান খাওয়ার পূর্বে জিজ্ঞেস করল,'তুমি খেয়েছ আন্টি?'
'আমি এত সকালে খাই নাকি? দশটার পরে খাব।' হাই তুলতে তুলতে বললেন তিনি।
'তাহলে অযথা এখানে কেন বসে আছো? বারবার হাই তুলছ, মানে এখনো তোমার ঘুম হয়নি।' এরপর সে হাত ঘড়িতে সময় দেখে ফের বলল,
'সাড়ে আটটা বাজে মাত্র। যাও গিয়ে ঘুমাও।'
'আরে তোদের কিছু লাগলে এগিয়ে দেবে কে?'
'আমরাই নিতে পারব। তুমি গিয়ে রেস্ট করো তো যাও।'
সুমনা বেগম হেসে বললেন,'পাগল ছেলে!'
তিনি চলে যাওয়ার পর আদনান ফিসফিস করে বলে,'কেন পাঠিয়ে দিয়েছি জানো?'
অঙ্কিতা বিরসমুখে বলল,'ফ্লার্ট যে করবেন না এতটুকু শিওর! কেন পাঠালেন তা জানিনা।'
'তা ঠিক আছে। কিন্তু তোমার মুখ বেলুনের মতো চুপসে আছে কেন?'
অঙ্কিতা অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে আদনানকে সে ভীষণ পছন্দ করে। কিন্তু ভাগ্য এতই করুণ যে, পছন্দ করার কথাটিও সে কখনো আদনানকে জানাতে পারবে না। বলবেই বা কী করে? ধর্ম যে আলাদা! এছাড়া আদনান কখনোই ওদেরকে সেভাবে ট্রিট করেনি। সেখানে সে যদি পছন্দের কথা বলে তাহলে ঠাস করে থা'প্পড় দিতেও দু'বার ভাববে না।
গোপনে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অঙ্কিতা বলল,'আপনি বুঝবেন না আদনান ভাই।'
'আচ্ছা বাদ দাও। আমরা টপিকে আসি।'
এর মাঝে প্রাপ্তিও রেডি হয়ে চলে বসে। চেয়ার টেনে বসতে বসতে আদনানের উদ্দেশ্যে বলে,'আজ সকাল সকাল এই বাড়িতে? তোমাকেও ফোন করেছিল নাকি?'
আদনান ভ্রুঁ কুঁচকে জানতে চাইল,'আমায় ফোন করবে মানে? কে ফোন করবে?'
'রায়হান। তৃধা আর অঙ্কিতাকে ফোন করেছিল বলেই তো আজ সকাল সকাল বাড়িতে চলে এসেছে। তুমিও এসেছ দেখছি। তাই জিজ্ঞেস করলাম।'
'মাথা খারাপ! ও আমাকে ফোন দিলে হাত-পা ভেঙে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে আসব।'
ওরা তিনজনে আসল। পরোটার টুকরা মুখে তুলে আদনান বলল,'এজন্যই কি রাতে ফোন অফ ছিল তোর?'
'হুম।'
'যাক,বেঁচে গেলি। আমি এসেছিলাম তোকে দুইটা চ'ট'কা'না দিতে।'
'আজব! কেন?'
'জরুরী কাজে ফোন দিয়েছিলাম রাতে অনেকবার। ফোন অফ ছিল, তাই মেজাজও খারাপ হয়ে গেছিল।'
'আজাইরা রাগ শুধু।'
'তুই চুপ থাক। আমি তৃধা আর অঙ্কিতাকে একটা গল্প শোনাব।'
তৃধা, অঙ্কিতা দুজনই দুজনের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে সমস্বরে বলে উঠল,'গল্প?'
'হ্যাঁ। হূরপরীর গল্প। আমার একটা হূরপরী আছে।'
প্রাপ্তি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল,'আমি যাচ্ছি। তোদের যদি ওর গল্প শুনতে মনে চায় তাহলে শুনতে পারিস।'
'আরে! আমরা পরে একা যাব নাকি?'
প্রাপ্তি উত্তর না দিয়েই হাঁটা শুরু করে। এই হূরপরীর গল্প শুনতে শুনতে বিরক্ত সে। বাধ্য হয়ে তৃধা আর অঙ্কিতাও উঠে পড়ে। যাওয়ার আগে বলে যায়, অন্যদিন এসে হূরপরীর গল্পটা শুনে যাবে। আদনান তখন কিছু না বললেও ওরা চলে যাওয়ার পর মুচকি মুচকি হাসে।
সে আরামসে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখে। আপাতত তার কোনো কাজ নেই। এগারোটা নাগাদ বের হয়ে বন্ধুদের সাথে বাইরে আড্ডা দিতে যাবে। সুমনা বেগম ঘুম থেকে উঠে আদনানকে ড্রয়িংরুমেই পায়।
'আয় নাস্তা করে যা।' বললেন তিনি।
'উঁহু! পেট ভরে খেয়েছি। আর জায়গা নেই। তুমি খাও।'
'তোর মা একা একা বাড়িতে কী করে?'
'আব্বু অফিসে যায়নি আজ। তাই আসতে পারেনি।'
'ওহহ।'
তিনি প্লেটে পরোটা, ডিম ভাজা আর আলু ভাজি নিয়ে এসে আদনানের পাশে বসলেন। হাসতে হাসতে বলেন,
'টম এন্ড জেরী দেখতেছিস!'
'হুম। ভালো লাগে। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে যায়। আমি আর প্রাপ্তি তো আগে এরকমই ছিলাম।'
সুমনা বেগম কিছু বলার পূর্বেই বাড়ির কলিংবেল বেজে ওঠে। আদনান নিজেই উঠে যায় দরজা খুলতে এবং রীতিমতো সে অবাকও হয়। দরজা খুলে রায়হান ও মধ্য বয়স্ক দম্পতিকে দেখতে পায়। রায়হান বেশ ভদ্রভাবেই জিজ্ঞেস করে,
'বাড়িতে কেউ নেই?'
আদনান কোনো উত্তর না দিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। রায়হান এসেছে ওর বাবা-মাকে নিয়ে। ওরা ভেতরে ঢোকার পর আদনান দরজা লাগিয়ে দিয়ে পিছু পিছু আসে। সুমনা বেগম রায়হানকে দেখে উঠে আসেন। হাসিমুখেই বলেন,
'আরে বাবা তুমি! এসো এসো, বসো।'
'ব্যস্ত হবেন না আন্টি। আপনি খাওয়া শেষ করুন।' বলল রায়হান।
'তোমরা আগে বসো তো।'
সবাই বসার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,'উনারা কারা? তোমার বাবা-মা?'
'জি, আন্টি।'
'একটু বসো। আমি আসছি।'
সুমনা বেগমের সঙ্গে সঙ্গে আদনানও কিচেনে চলে যায়। রায়হানকে একদম সহ্য হচ্ছে না তার। ড্রয়িংরুম ফাঁকা হতেই রায়হান ওর বাবা-মাকে ফিসফিস করে বলে,
'যেভাবেই হোক বিয়েতে ওদের রাজি করাবে প্লিজ! আমার প্রাপ্তিকে লাগবেই।'
চলবে...
#আমার_একলা_আকাশ
#পর্ব_৫
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
সুমনা বেগম চা-নাস্তা এনে সামনে রেখে নিজেও অপজিট সোফায় বসলেন। তার ঠিক পেছনে ক্রুব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদনান।
'নিন, নাস্তা করুন।' সবার উদ্দেশ্যেই বললেন সুমনা বেগম।
রায়হানের বাবা বললেন,'নাস্তা তো করবই। এরপর থেকে তো সম্পর্ক আরো গভীর হবে আমাদের দুই পরিবারের।'
'ঠিক বুঝলাম না ভাই।' বললেন সুমনা বেগম।
রায়হানের মা এবার হেসে বললেন,'বুঝেননি বোন? আপনার মেয়েকে আমার ছেলের বউ করে নিতে এসেছি।'
সুমনা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। স্বল্প সময়ের জন্য কথা বলার ভাষাও যেন তার লোপ পেয়েছিল। তিনি কিছু বলার পূর্বেই রায়হানের মা বললেন,
'তাছাড়া ছেলে-মেয়ে দুজনই যখন দুজনকে পছন্দ করে আর ভালোবাসে তখন শুভ কাজে দেরি করে লাভ কী বলেন?'
এই পর্যায়ে আদনান আর কিছুতেই চুপ করে থাকতে পারল না। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। কাঠকাঠ গলায় সে উত্তর দেয়,
'আপনার একটু ভুল হচ্ছে আন্টি।সম্পর্ক ছিল। এখন আর নেই।'
রায়হানের বাবা-মায়ের দুজনেরই হাসি হাসি মুখটা অন্ধকার হয়ে আসে।
'এই ছেলে কে?' গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন রায়হানের বাবা।
সুমনা বেগম পড়েছেন মাঝ সমুদ্রে। মনে হচ্ছে সবটাই কী রকম মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। রায়হানের সাথে প্রাপ্তির সম্পর্ক আছে, অথচ তিনি জানেন না! এমনকি টেরও পায়নি। এদিকে আদনানের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে ও সবটা জানত। জানুক, সেখানে কোনো সমস্যা নেই। ঘরে মেয়ে থাকলে বিয়ের প্রস্তাব আসবেই; মেয়ের কোনো সম্পর্ক থাকলেও আসবে, না থাকলেও আসবে। তবে মাঝখানে আদনানের হুট করে বলা কথাটি সুমনা বেগমের মনঃপুত হলো না ঠিক। না জানি, সামনের মানুষগুলো কী না কী ভেবে বসে আছে।
সুমনা বেগম একটু হাসার চেষ্টা করলেন। সহজ-স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,'আমার ভাগিনা।'
রায়হান তখন আদনানের কথার উত্তর দিতে গিয়ে একটু হেসেই বলল,'জি, একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে আমাদের মধ্যে। সব সম্পর্কেই তো ভুল বুঝাবুঝি, ঝগড়া হয়। তাই বলে কি সম্পর্ক শেষ? প্রাপ্তি আমার ওপর অনেক রেগে আছে জানি। তাই আমি চাচ্ছি রিলেশনের ইতি ঘটুক বিয়ের মাধ্যমে।'
হুট করে এমন সিচুয়েশনে পড়ায় সুমনা বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। রায়হানের সাথে প্রাপ্তির সম্পর্ক ছিল এটা যদি একবার ওর বাবার কানে যায় তাহলে কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটে যাবে। মানুষটা এমনিতে ভীষণ ভালো। একমাত্র সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে হওয়ায় প্রাপ্তিকে তিনি মাথায় তুলে রাখেন। প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই ভালোবাসেন। সম্পূর্ণ স্বাধীনতা তিনি মেয়েকে দিয়েছেন। তার মানে তো এই নয় যে, প্রাপ্তির রিলেশন তিনি মেনে নেবেন। তিনি সর্বদাই প্রেম-ভালোবাসার বিরুদ্ধে। কস্মিনকালেও সে প্রেমকে পছন্দ করেন না। সমর্থন করেন না। সেখানে প্রাপ্তি এমন একটা কাজ কী করে করল!
'আপনি কিছু বলছেন না কেন আন্টি? প্রাপ্তিকে আমায় দেবেন না?' সুমনা বেগমের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রায়হান।
আদনান ক্ষিপ্রকণ্ঠে বলে উঠল,'কখনোই না। প্রাপ্তি তোমার মতো চরিত্রহীন কোনো ছেলেকে বিয়ে করবে না।'
এরপর সে রায়হানের বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,'আঙ্কেল, আন্টি মাফ করবেন। চা, নাস্তা খেয়ে অন্যান্য কথা থাকলে বলতে পারেন। নতুবা আসতে পারেন আপনারা। অপরাধ নেবেন না দয়া করে।'
রায়হানের মা রাগান্বিত স্বরে বলেন,'তুমি কে আমার ছেলের চরিত্র নিয়ে কথা বলার?'
'আমি কেউ না। তবে যেটা সত্যি সেটাই বলেছি।'
সুমনা বেগম আদনানকে ধমক দিয়ে বললেন,'আহ্! আদনান, তুই কী শুরু করেছিস এসব?'
'আন্টি তুমি জানো না এই ছেলের উদ্দেশ্য কত্ত খারাপ! আমি বলতে পারছি না তোমায়।'
'বলতে পারছ না বললে তো হবে না। বলতেই হবে। আমার ছেলেকে ব্লেইম দেওয়ার সাহস হয় কী করে।' বললেন রায়হানের বাবা।
রায়হান বিষয়টাকে ধামাচাপা বা আটকানোর চেষ্টা করেও পারল না। ওর বাবা-মা দুজনেই ক্ষেপে গেছেন। বাবা চেঁচিয়ে চেঁচিয়েই বললেন,
'এখানে যেচে অপমানিত হতে আসিনি আমরা। বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলাম। আমাদের বংশ, টাকা-পয়সা কীসের কমতি আছে? কিচ্ছুর নেই। আমার ছেলে দেখতে, শুনতে মাশ-আল্লাহ্। শিক্ষিত। এমন ছেলের জন্য, এমন পরিবারের ছেলের জন্য কি মেয়ের অভাব পড়েছে বলে ধারণা? বরঞ্চ আপনাদের মেয়ের চেয়েও বেটার বেটার মেয়ে রয়েছে। সবকিছু ছেড়েছুড়ে শুধুমাত্র ছেলের পছন্দ বলে এই বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। সেখানে আপনার ভাগিনা, না কে সে আমাদের এভাবে অপমান করছে!'
আদনান বেশ শান্ত হয়েই বলল,'সত্যি কথা সবসময় একটু তেতোই হয় আঙ্কেল। তাছাড়া আমি যথেষ্ট ভদ্রভাবে, সুন্দর করে কথা বলেছি। তবুও আপনি যখন এতগুলো কথা বললেন। বংশের, টাকার, ছেলের এত গুনগান গাইলেন তখন সত্যিটা না হয় আমি বলেই দেই। আপনার সব কথাই ঠিক মেনে নিলাম। আপনার ছেলে সুন্দর, শিক্ষিত এগুলোও ঠিক আছে। সমস্যাটা হচ্ছে গিয়ে আপনার ছেলের চরিত্রে। টাকা না থাকলেও ডাল-ভাত খেয়ে সুখে থাকা যায়। কিন্তু চরিত্র খারাপ হলে ইহকাল, পরকাল দুটোই জাহান্নাম হয়ে যায়। আপনার ছেলের চরিত্র এতই ভালো যে, যাকে সে ভালোবাসি বলে দাবি করছে, যাকে সে বিয়ে করবে বলে এই বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে এসেছে...সেই তাকেই আপনার ছেলে তার জন্মদিন উপলক্ষে একদিনের জন্য চেয়েছে। যেমন-তেমনভাবে চায়নি। ফিজিক্যালি ইন্টিমেট হতে চেয়েছে। এটাকে আপনি ভালোবাসা বলবেন? একটা মেয়ে একটা ছেলেকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসলে কী চায় জানেন? সম্মান আর শ্রদ্ধা। কিন্তু আফসোস! প্রাপ্তি এমন এক ছেলেকে ভালোবাসলো যে সম্মান তো দেবে দূরের কথা; উলটো বিয়ের আগেই ইন্টিমেট হতে চেয়েছে।
আপনাদের সামনে আমার মুখে এসব কথা হয়তো শুনতে বড্ড তিতকুটে লাগছে। কিন্তু আ'ম স্যরি টু সে, আপনাদের এবং প্রাপ্তির পরিবারের জানা উচিত কেমন ছেলে এসেছে প্রাপ্তিকে বিয়ে করতে।'
কথাগুলো শুনে রায়হানের বাবা-মা দুজনেই বিস্মিত হয়ে রায়হানের দিকে তাকায়। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রেখেছে রায়হান। সুমনা বেগম স্তব্ধ। বাসার কলিংবেলের শব্দ সকলেই একটু নড়েচড়ে বসে। আদনান গিয়ে দরজা খুলে দেয়। সেতু এসেছে। আদনানের রাগান্বিত চোখ-মুখ দেখে জিজ্ঞেস করে,
'কী হয়েছে? রেগে আছো কেন?'
আদনান কোনো উত্তর না দিয়ে ভেতরে চলে আসে। সেতুও পিছু পিছু আসে। আর এসে উপস্থিত রায়হান ও ওর বাবা-মাকে দেখে বেশ অবাকই হয়। অস্ফুটস্বরে রায়হানের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে,
'তুই এই বাড়িতে!'
'রায়হান আর প্রাপ্তির যে সম্পর্ক ছিল এটা জানতিস তুই?' প্রশ্নটি করে থমথমে দৃষ্টিতে সেতুর দিকে তাকিয়ে রইলেন সুমনা বেগম।
সেতু থতমত খেয়ে একবার সুমনার দিকে, আরেকবার আদনানের দিকে তাকায়। রায়হানের বাবা-মা উঠে পড়ে তখন। কোনো কিছু না বলেই দুজনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। রায়হানও বিনাবাক্যে উঠে পড়ে। আদনান ওর সঙ্গে যায়। বাড়ির বাইরে গিয়ে হাত টেনে ধরে মুখোমুখি দাঁড়ায়। শার্টের কলার ঠিক করে দিতে দিতে বলে,
'মানুষের খারাপ হওয়ারও একটা লিমিট থাকে। কিন্তু তুমি লিমিটলেস! উদ্দেশ্য সফল হয়নি বলে ডিরেক্ট বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছ? কারণ তুমি তো ভালো করেই জানো, ঐ ঘটনার পর প্রাপ্তি আর কখনোই তোমার কাছে ফিরে যাবে না। ওর দেওয়া জবাবগুলোও নিশ্চয়ই তোমার ইগোতে লেগেছে? আর তাই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য হোক কিংবা রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য হোক; গুটি হিসেবে বিয়ে নামক সম্পর্কটাকে বেছে নিয়েছ। আমি কি ঠিক বলছি?'
আদনানের হাত সরিয়ে দিয়ে রায়হান বলল,'সবকিছুতে তুমি কেন বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছ বলো তো? ভালোবাসো তুমি প্রাপ্তিকে?'
আদনান বাঁকা হাসে। বলে,'তুমি এবং তোমার উদ্দেশ্য সৎ হলে কখনোই আমি বাঁধা হয়ে দাঁড়াতাম না। কোনো অসৎ দৃষ্টি আমি প্রাপ্তির ওপর পড়তে দেবো না। আর হ্যাঁ, ভুলেও আর কোনো নতুন বুদ্ধি আঁটতে যেও না প্রাপ্তিকে পাওয়ার জন্য। তাহলে কিন্তু ফল সত্যিই ভালো হবে না। সেদিন প্রাপ্তি তোমাকে সুযোগ দিয়েছিল আর আজ আমি দিচ্ছি। আমি আবার অতটাও ভালো মানুষ নই। নেহাৎ-ই বাড়ি বয়ে এসেছ, সঙ্গে আবার তোমার বাবা-মা'ও আছে। মূলত প্রাপ্তির কোনো বদনাম না হোক এজন্যই আজ সুস্থভাবে যেতে দিচ্ছি। পরের বার একই ভুল করলে নিজ দায়িত্বে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে আসব।'
'কাজটা ভালো করলে না। তোমার ধারণাও নেই আমি প্রাপ্তির সাথে ঠিক কী কী করতে পারি।'
'এক্সাক্টলি! তাই তো আমিও বলি, প্রাপ্তির সাথে খারাপ কিছু করার পূর্বে নিজের বোনের কথাটাও মাথায় রেখো কেমন। আগেই বলেছি, আমি মানুষটা খুব একটা ভালো নই। এখন আসতে পারো।' বলে আদনান ভেতরে গিয়ে দরজাটা শব্দ করে লাগিয়ে দেয়।
ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখে সেতু সুমনা বেগমের পায়ের কাছে বসে কান্নাকাটি করছে। সুমনা বেগমের চোখেও পানি। আদনান কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বলল,
'কান্নাকাটি কোরো না আন্টি। ভালোবাসা কখন কার প্রতি হয়ে যায় কেউ কি এটা বলতে পারে?'
'তাই বলে তোরা সব জেনেও এভাবে লুকালি আমার থেকে? ও না হয় ভয়ে বলেনি। কিন্তু তোরা কেন আমাকে জানাসনি? আজ যদি প্রাপ্তি এই সম্পর্কে অনেক বেশি সিরিয়াস থাকত তাহলে কী হতো? তাহলে তো সেদিন ঠিকই রায়হানের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যেত।'
'হয়নি তো! আল্লাহ্ বাঁচিয়েছে না? আল্লাহ্ ওর সাথে ছিল। মানুষ ভুল করে। প্রাপ্তিও ভুল মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ভুল করে ফেলেছে। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও। আর প্লিজ, ও বাড়িতে আসার পর ওর সাথে কোনো রকম রাগারাগি কোরো না।'
.
.
দুপুরে বাড়ি ফেরার পথে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা ধরেছে প্রাপ্তির। আজ রোদের এত বেশি উত্তাপ যে, মনে হচ্ছে মাথা ফেটেই যাবে। তৃধা আর অঙ্কিতা প্রাপ্তিকে নিয়ে গাছের ছায়ায় বসে। টং দোকান থেকে তিনজনে তিন কাপ চা পান করে। প্রাপ্তির কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে একটু ঘুমাতে পারলে ভালো লাগবে। কিন্তু এখনো বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনেকটা পথ বাকি। অঙ্কিতা প্রাপ্তির কাঁধে হাত রেখে বলল,
'খুব বেশি খারাপ লাগছে দোস্ত?'
প্রাপ্তি দু'হাতে মাথা ধরে বসে আছে। তৃধা গিয়ে এক বোতল ঠান্ডা পানি কিনে আনে। প্রাপ্তির মাথাটা নিচু করে মাথায় পানি ঠেলে দেয়। ওড়না দিয়ে চুলগুলো দুজনে মুছেও দেয়।
'এখন কি একটু ভালো লাগছে দোস্ত?' জিজ্ঞেস করল তৃধা।
প্রাপ্তির একটুও ভালো লাগছে না। ক্রমশ শরীর যেন দুর্বল হয়ে আসছে। গায়ের তাপমাত্রাও বাড়ছে। মনে হচ্ছে শরীর থেকে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। জ্বর আসবে কিনা কে জানে! কিন্তু প্রাপ্তি আর তৃধার এত আন্তরিকতা দেখে সত্যিটা বলতে খারাপ লাগল প্রাপ্তির। তাই সে মিথ্যে করেই বলল,
'হ্যাঁ, একটু ভালো লাগছে এখন।'
অঙ্কিতা জানতে চাইল,'আদনান ভাইয়াকে একটা ফোন করব?'
প্রাপ্তি বলল,'আরে না! একটা রিকশা ঠিক কর। একাই যেতে পারব।'
'কত যে একা যেতে পারবি তা তো বুঝতেই পারছি। দাঁড়া রিকশা নিয়ে আসি। আমরাই তোকে দিয়ে আসছি।' বলল তৃধা।
অঙ্কিতা আর তৃধাই প্রাপ্তিকে বাড়িতে দিয়ে যায়। সুমনা বেগম প্রচণ্ড রেগে ছিলেন। কিন্তু প্রাপ্তির বেহাল অবস্থা দেখে রাগ উধাও হয়ে যায়। উলটো আরো বেশি অস্থির হয়ে যান তিনি। প্রাপ্তিকে ধরে রুমে নিয়ে যায়। মাথা ব্যথার ওষুধ খাইয়ে মাথায় পানি দিয়ে দেয়। সঙ্গে বারবার করে বলছেন,
'রাতে ঠিকমতো ঘুমাবি না। ফেসবুক চালাবি, মুভি দেখবি তোর মাথা-ব্যথা হবে না তো কার মাথা-ব্যথা হবে? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করিস না। আর দুইদিন পরপর শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তোকে নিয়ে আমি পড়েছি যন্ত্রণায়।'
অঙ্কিতা করুণস্বরে বলল,'থাক আন্টি আর বকা দিয়েন না।'
'বকা দিয়েই আর কী হবে মা? আমার কোনো কথা কি ও শোনে? যাই হোক, তোমরা ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি খেতে দিচ্ছি।'
'না, না আন্টি। আমরা বাড়িতে গিয়েই খাব।'
'এখান থেকে খেয়ে আবার বাড়িতে গিয়ে খেও। সমস্যা নেই। ফ্রেশ হও দ্রুত।'
এরপর তিনি সেতুকে প্রাপ্তির কাছে বসিয়ে কিচেনে যায় খাবার সাজাতে। অঙ্কিতা আর তৃধাকে না খেয়ে যে যেতে দিবে না এটা একদম পরিষ্কার। তাই ওরা-ও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। সেতু একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। সকালের ঘটনাটি এখনই প্রাপ্তিকে বলবে নাকি পরে বলবে! অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল, পরেই বলবে। সে প্রাপ্তির মাথায় সুন্দর করে হাত বু্লিয়ে দিচ্ছে।
________
সাঁঝের বেলায় জানালার ধারে বসে উপন্যাসের একটা বই ঘাটছিল আদনান। তার ধৈর্য বরাবরই কম। সম্পূর্ণ বই পড়ার ধৈর্য নেই বলে এই লাইন, সেই লাইন, একটা বাদ দিয়ে অন্যটা এভাবে পড়ে। কখনো কখনো বইয়ের সম্পূর্ণ সারমর্ম বুঝতে পারে তো, কখনো আবার কিছুই বোঝে না। এসব নিয়ে অবশ্য তার কোনো মাথা ব্যথাও নেই। তার যা স্বভাব, সে তো তা-ই করবে।
রুমানা বেগম রুমে আসেন তখন। চাপাস্বরে ছেলের উদ্দেশ্যে বলেন,'প্রাপ্তিদের বাড়িতে কী করেছিস আজ?'
আদনান ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,'কই? কিছু না তো!'
'তোর বাবা তাহলে এত রেগে আছে কেন তোর ওপর?'
'আমি কী জানি?'
'ডাকছে তোকে। শুনে আয়।'
বই রেখে আদনান রুমানা বেগমের সঙ্গে রুম থেকে বের হয়। আসাদ রহমান চা পান করছিলেন তখন। আদনানকে দেখেই খিটখিটে মেজাজে বললেন,
'এসেছ। বসো, বসো।'
আদনান একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বাবার মুখোমুখি বসল। চায়ের কাপ রেখে আসাদ রহমান ছেলের উদ্দেশ্যে কর্কশকণ্ঠে বলেন,
'তোমার সমস্যা কী আদনান? তুমি সেতুর বিয়ে উপলক্ষে এসেছ আমি কিছু বলিনি। কিন্তু এসে উলটা-পালটা ঝামেলায় নিজেকে কেন জড়াচ্ছ?'
আদনান কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল,'আমি কী করেছি আব্বু?'
'কী করেছ জানো না? প্রাপ্তির জন্য নাকি বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল আজ। তুমি সেখানে অযথা কেন তর্ক করতে গিয়েছ?'
'আব্বু সেখানে আমার কথা বলাটা জরুরী ছিল।'
'কোনো জরুরী কিছু ছিল না। ওদের মেয়ে ওরা বুঝবে। তোমার এত মাথা-ব্যথা কীসের? মা-ছেলের জান বের হয়ে যায় ঐ পরিবারের জন্য।'
আদনান কিংবা রুমানা বেগম কেউই কিছু বললেন না। আসাদ রহমানও ক্ষণকাল নিশ্চুপ থেকে বললেন,'তুমি চট্টগ্রাম যাচ্ছ কবে?'
'আগামীকাল।'
'খুব ভালো। দয়া করে নিজের ভালো বুঝতে শেখো। অন্যের ঝামেলা নিজের কাঁধে এনো না।' বলে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
'তুমি এসব জানলে কী করে?'
আসাদ রহমান বাইয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন। আদনানের প্রশ্ন শুনে দাঁড়িয়ে পড়েন। পিছু ফিরে তাকিয়ে বলেন,
'মনে করো বাতাসেই সব কথা আমার কানে আসে। তোমাকে যা বলেছি, সেসব মাথায় রেখো।'
তিনি চলে যাওয়ার পর রুমানা বেগম আদনানকে চেপে ধরে সবকিছু জানতে চায়। মায়ের কাছে সবটা ক্লিয়ার করে আদনান। প্রাপ্তি যে রিলেশন করত এটা বিশ্বাস করতে রুমানা বেগমেরও একটু কষ্ট হয়েছে বটে! যদিও বড়ো কোনো অন্যায় সে করেনি! আসলে প্রাপ্তির থেকে কেউই এটা আশা করেনি।
আদনানও বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। ঐ বাড়ির খবর নেওয়া হয়নি। দুপুরের দিক দিয়ে বাড়িতে এসে ঘুমিয়েছিল। একটু আগে উঠেছে। যাওয়ার পথে জবা ফুলের গাছের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। এই গাছটা প্রাপ্তি লাগিয়েছিল। দুইটা জবা ফু্ল গাছের চারা সে কিনে এনেছিল।একটা নিজেদের বাড়ির সামনে লাগিয়েছে, আর একটা আদনানদের বাড়ির সামনে লাগিয়ে দিয়েছিল। তবে সমস্যা বেঁধেছিল অন্য জায়গায়। প্রাপ্তির গাছে থোকায়, থোকায় সাদা জবা ফুল ফুটলেও, এতদিনেও আদনানদের গাছে কোনো ফুল ফোটেনি। এটা নিয়েও আদনান প্রাপ্তিকে কত কথা শুনিয়েছে! প্রায়ই সে বলত,
'তুই একটা হিংসুটে প্রাপ্তি। হিংসা করে একটা ব্যাটা জবা ফুল গাছ আমাদের বাড়ির সামনে লাগিয়ে দিয়েছিস। আর নিজেদের বাড়ির সামনে মহিলা জবা ফুল গাছ লাগিয়েছিস। যাতে তোর গাছের ফুল দেখে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাই তাই না?'
প্রথম প্রথম প্রাপ্তি কথাগুলোর প্রতিবাদ করলেও একসময়ে আর কিছুই বলত না। কেননা সে খুব ভালো করেই জানত, যত-ই সে বলুক যে কোন গাছে ফুল হবে আর কোন গাছে ফুল হবে না এটা তো সে জানত না; এসব আদনান কোনোকালেই বিশ্বাস করবে না।
আজ গাছটি দেখে অতীতের কথাগুলো মনে পড়ে যায় আদনানের। আনমনেই সে হেসে ফেলে। হাসির কারণ হচ্ছে এতদিন সে অযথাই প্রাপ্তিকে বকত। কেননা এতদিন বাদে তাদের গাছটিতে একটা টকটকে রক্তজবা ফুল ফুটেছে। পাতার আড়ালে থাকায় এতদিন চোখেই পড়েনি। আজ হঠাৎ করে দৃষ্টিটা একদম গাছের আড়ালে থাকা ফুলটার দিকেই পড়েছে। সে ফুলটা ছিড়ে খুব সন্তর্পণে শার্টের বুকপকেটে রাখল যাতে ফুলটি ছিঁড়ে না যায়।
ঐ বাড়িতে যাওয়ার পর দরজা খুলে দেয় সুমনা বেগম। আদনান ভেতরে যেতে জিজ্ঞেস করে,'প্রাপ্তি কোথায়?'
'ওর রুমে।'
'কালকে চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছি আন্টি তাই দেখা করতে আসলাম।'
'কাল যাবি, আর দেখা করে যাচ্ছিস আজ? কাল কি আসতে বারণ নাকি?'
'তা নয়। অত সকালে তো তোমাদের ঘুম না-ও ভাঙতে পারে তাই আরকি!'
সুমনা বেগম মৃদু হাসলেন। জিজ্ঞেস করলেন,'চা খাবি?'
'হুম! খাওয়া যায়।'
তিনি রান্নাঘরে যাওয়ার সময় আদনান পেছন থেকে বলে,'তুমি প্রাপ্তিকে বকোনি তো?'
সুমনা বেগম পিছু ফিরে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকান। আদনান হাসার চেষ্টা করে বলল,'এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। তুমি যদি না বকে থাকো, তাহলে তোমার হয়ে আমি বকে দেবো।'
হেসে ফেলেন তিনি,'বকিনি। তবে একটু অভিমান করে আছি।'
'তাই নাকি? অভিমান করা ভালো। এতে ভালোবাসা বাড়ে।'
তিনি আর কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না। আদনান প্রাপ্তির রুমের সামনে গিয়ে দরজায় নক করে। প্রাপ্তি ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করে,'কে?'
'আমি।'
'দরজা খোলা আছে।'
আদনান রুমে গিয়ে দেখে প্রাপ্তি আধশোয়া হয়ে ফোন চাপছে। চেয়ার টেনে বসে আদনান বলল,'সারাক্ষণ এত শুয়ে থাকিস কেন?'
'এমনিই। ভালো লাগছে না।'
'ভালো না লাগলে ঘুমাবি। ফোনে এত কী?'
প্রাপ্তি এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে জানতে চাইল বাড়িতে আজ কী হয়েছে। আদনান একটু ঢং করেই বলল,'যা হওয়ার আরকি! তোর সো কল্ড বয়ফ্রেন্ড তোকে বিয়ে করার জন্য ওর বাবা-মাকে নিয়ে এসেছিল। তোকে কে বলল? আন্টি?'
'না। সেতু আপু। আম্মু তো আমার সাথে কথাই বলতেছে না।'
'ঠিকই আছে। আরো কর জেদ করে রিলেশন।'
প্রাপ্তির মুখটা মলিন হয়ে যায়। আদনান তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,'তুই আবার গলে-টলে যাসনি তো?'
'মানে?'
'মানে এইযে তুই সেদিন রায়হানকে এমন জবাব দিলি, সব জায়গা থেকে ব্লকও করলি; তারপরও মাত্র একদিনের ব্যবধানে সকাল হতে না হতেই রায়হান ওর বাবা-মাকে নিয়ে তোর বাসায় উপস্থিত হয়েছে। তোকে বিয়ে করবে। এসব শুনে তুই ইম্প্রেস হোসনি? মনে হচ্ছে না, ইশ! রায়হান তোকে কত ভালোবাসে! মন গলে যায়নি?'
'পাগল নাকি তুমি? এতকিছুর পরও তোমার মনে হয় আমি গলে যাব? অসম্ভব! ওর প্রতি ঘৃণাটাও আমার ঠিকমতো আসে না। কোনো অনুভূতিই কাজ করে না।'
'গুড। এখন থেকে সাবধানে থাকবি। একা একা কোথাও বের হওয়ার দরকার নেই।'
'কেন? ওর ভয়ে?'
'কারও ভয়েই না। নিজের সেইফ্টির জন্য। আন্টির সাথে মান-অভিমান মিটিয়ে নিস। জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বলবি, স্যরি মা। খুব ভালোবাসি তোমায়। দেখবি মোমের মতো কেমন গলে যায়।'
আদনানের কথা বলার ভঙ্গি দেখে প্রাপ্তি হেসে ফেলে। আদনান কপাল কুঁচকে বলে,'এত হাহা হিহি করে হাসছিস কেন? তুই কি ভেবেছিস তোর হাসি খুব সুন্দর? একটুও না। তোর চেয়ে তো আমার হূরপরীর হাসি বেশি সুন্দর।'
প্রাপ্তি দু'হাত জড়ো করে সামনে রেখে বলে,'মাফ করো! জিন্দেগিতে আর তোমার সামনে হাসব না। তবুও তোমার হূরের গুণগান বন্ধ করো।'
'তুই তো খুব হিংসুটে।'
'হ্যাঁ, আমি হিংসুটে। আমি আরো অনেক কিছু। তবুও তোমার হূরের গল্প শুনতে চাই না।'
'আচ্ছা চোখটা বন্ধ কর।'
'কোন দুঃখে?'
'করবি নাকি হূরের গল্প শুনাব?'
'করছি, করছি!'
আদনান মুচকি হেসে বুকপকেট থেকে ফুলটা বের করে প্রাপ্তির কানের পিঠে গুঁজে দেয়। ফোনের ক্যামেরা অন করে একটু দূরত্বে রেখে প্রাপ্তির মুখ বরাবর সামনে ধরে বলে,'এবার তাকা।'
প্রাপ্তি চোখ মেলে তাকায়। ক্যামেরায় দেখতে পায় তার এলোমেলো চুলের পাশে কানে গুঁজে থাকা টকটকে লাল ফুলটি। সে একটু কেমন যেন মায়াভরা দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকায়। আদনান হেসে বলে,
'তুই আমার রক্তজবা।'
চলবে...
বিঃদ্রঃ রায়হান চরিত্রটা আমাদের সমাজে অহরহ রয়েছে। ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে কত মেয়ে যে ভুল করে বসছে। তাই বলব ডিয়ার গার্লস, এই ভুলটা অন্তত কোরো না কখনো। ভালোবাসার মানুষ যদি কখনো ইমোশোনাল ব্ল্যাকমেইলও করে তাহলে প্রাপ্তির মতোই তাকে উচিত জবাবটা দিয়ে দিও।]
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ।]
