আমার_মেয়ে
Khadija_Akter
পর্ব:০২+০৩+০৪
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেও আমি যখন শ্বশুরবাড়িতে যেতে চাচ্ছিলাম না।তখন একদিন না জানিয়ে শাশুড়ী নিজেই আমার বাবার বাড়িতে এসে উপস্থিত হোন।
ঠিক সেদিনই ঘটলো আসল বিপত্তিটা।
সেদিন উনি একনজর আমাকে দেখেই বুঝে নিয়েছিলেন যে আমি প্রেগন্যান্ট।
শাশুড়ীর এমন আচমকা আগমন আর উনার চোখের কড়া দৃষ্টির সামনে আমি একদম মিহিয়ে গেছিলাম ভয়ে।
সেদিন একটা কথা না বলেও আমাদের বাড়ির উঠান থেকে হনহন করে আবার ফিরতি পথ ধরেছিলেন আমার শাশুড়ী । আমি পিছন থেকে অনেক ডাকলাম,একটাবার ঘরে এসে বসার জন্য।আমার কথা শোনার জন্য।কিন্তু উনি ফিরেও তাকালেন না একবারও।
আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম তুলকালাম কান্ড একটা ঘটতে চলেছে এবার।
আমার মাও সেই থেকে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে যাচ্ছিলেন।না জানি তার মেয়ের কপালে কি অপেক্ষা করছে।
------------------
বিকালেই হন্তদন্ত হয়ে রাশেল আসলো আমাকে নিতে। বাহিরে দাঁড়িয়ে থেকেই হাঁকডাক দিল,
"রাকা,রেডী হও।তোমাকে নিতে এসেছি।তোমার তো পরীক্ষা শেষ। মা বলেছে আর এই বাড়িতে থাকা যাবে না।"
আমি কোনো দ্বিরুক্তি না করে ব্যাগটা হাতে বেরিয়ে এসেছিলাম ঘর থেকে।হয়তো আমি রাশেলের আসার অপেক্ষাই করছিলাম!
রাশেলের ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম,আমার গোবেচার স্বামী এখনো কিছুই জানে না।
শ্বশুর বাড়িতে উপস্থিত হওয়া মাত্রই হয়তো সবার সম্মুখেই শাশুড়ী তার রোষানলে পুড়াবে আমায়।
আসার সময় আমার মায়ের মুখে ফুটে উঠা চিন্তার রেখা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমি।
মা আমাকে ডেকে একপাশে নিয়ে গিয়ে চুপিচুপি বলে দিলেন,"শাশুড়ী যেইভাবে কয় হুনিস মা,হুদাই সংসারে হাঙ্গামা বাঁধাইস না।যেমনেই হোক স্বামীর সংসার কামড়ে ধইরা পইরা থাকবি।"
আমি কিছুই বলিনি শুধু অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিলাম মায়ের দিকে।
শ্বশুর বাড়িতে যাওয়া পথে ভ্যানে বসে নীরবে দুইদিকের ধানি জমিগুলোর দিকে চেয়ে থেকে আমি শুধু চিন্তা করছিলাম একটু পর ঠিক কি হতে যাচ্ছে আমার সাথে।
নীরবতা ভেঙে দিয়ে রাশেল বেশ শঙ্কিত গলাত জিজ্ঞেস করেছিল,
--কোনো ক্যাঁচাল লাগাওনি তো আবার মা'র সাথে?
--কেন কিছু বলেছে তোমাকে?
--না।কোথায় যেনো গিয়েছিল মা, এসে শুধু বললো আজকের মধ্যেই তোমাকে গিয়ে নিয়ে আসতে।
--ওহ্
--হঠাৎ করে তোমাকে এভাবে আনতে পাঠালো কেনো বুঝলাম না।সকালেও তো বলে রাখেনি কিছু ।
--ওহ্
--বললে না তো?মায়ের সাথে কিছু হয়নি তো ফোনে?
--উনি এসেছিলেন দুপুরে আমাদের বাড়িতে।
--কি বলো!এই কথা তো আমাকে আগে বলো নাই।
তারপর?
--অপেক্ষা করো নিজেই সব জানতে পারবে।
রাশেল সাথে সাথেই চুপ হয়ে গেল আর কিছু বললো না।কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর আবার কিছুটা চিন্তিত সুরে বললো,
--তোমার শরীর ঠিক আছে রাকা?কেমন কেমন দেখাচ্ছে তোমায়?
আমি দূরের ধানক্ষেতগুলোর দিকে প্রসারিত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থেকেই অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলাম,
--আমি ঠিক আছি।
--সত্যি বলছো?
-হু
এরপর দুজনের মাঝেই নেমে এসেছিল পুরোপুরি নীরবতা।পুরো রাস্তায় আর কেউ কারোর সাথে কথা হয়নি।
রাশেলকে কিছু না বললেও তার মুখ দেখে বেশ বুঝতে পারছিলাম আসন্ন কোনো ক্যাচালের আশঙ্কায় ওর মুখ শুকিয়ে গেছে একদম।
--------------------------
পাশাপাশি গ্রামে শ্বশুর বাড়ি ও বাপের বাড়ি হওয়ায় খুব বেশি সময় লাগে না যাতায়াতে।সন্ধ্যার একটু পৌঁছে যাই শ্বশুর বাড়ি।
বাড়িতে পা রেখে বারান্দায় কেবল ব্যাগটা রেখে দাঁড়িয়েছি। তখনই আমার শাশুড়ী মা তার ঘরের দরজা খুলে উঠানে এসে দাঁড়ালেন।আবছা অন্ধকার আমার ছায়ামূর্তির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বেশ রুঢ় কন্ঠে দাঁড়িয়ে হুকুম দিলেন,
--ছোড বউমা,এইখানে আসো।
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম।আমার পা যেনো চলছিল না।রাশেল আমার দিকে কিছুটা সরে এসে একটু চাপা কণ্ঠে বললো,"কি হলো,দাঁড়িয়ে রইলে যে।মা ডাকছেন তো।"
তবুও আমি চুপ করে দাঁড়িয়েই রইলাম।
--কি হইলো আমার কথা কি কানে যায় না?এইখানে ঠিক আমার সামনে আইসা দাঁড়াইতে কইছি।
ভরসন্ধ্যায় শাশুড়ী মায়ের এমন বাজখাঁই গলার কথা শুনে আমার জা'য়েরাও যার যার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।তাদের পিছু পিছু আমার ভাসুরগন ও তাদের ছেলেপিলেরাও সব উঠানে এসে জড়ো হলো।সবার মুখেই একটা অজানা কৌতুহল।
সবার মধ্যমনি হয়ে আমি ও আমার শাশুড়ী উঠানে দাঁড়িয়ে আছি।বাকী সবাই আমাদের ঘিরে রেখেছে চারদিক থকে।
রাশেলের দিকে চেয়ে দেখলাম,ও হতভম্ব হয়ে ঢোক গিলছে আর একবার শাশুড়ীর দিকে তো আরেকবার আমার দিকে তাকাচ্ছে।
সকলের চাপা গুঞ্জন এড়িয়ে শাশুড়ীর বজ্র কন্ঠ আবার শোনা গেল,
--কয়মাস চলে?
--জ্বী আম্মা ৮ মাস।
--সন্তানটা কি?
আমি কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলাম।
--কি হইলো কও না ক্যান!সন্তানটা কি?ছেলে নাকি অলক্ষ্মী মাইয়?
--আমি জানি না আম্মা। আল্ট্রা করাইনি।
--তুমি না জাইনলেও কিন্তু আমি খুব ভালা কইরাই জানি।
কি ভাবছিলা গো তুমি,ছোড বউমা?দুই দিনের মাইয়া মনে করছো শাশুড়ীর চোখ ফাঁকি দিয়া একটা অলক্ষ্মী জন্ম দিয়া ফালাইবা?এত্তো সহজ না হোসনে আরার চোখকে ফাঁকি দেওয়া বুজলা?২ পাতা কিতাব পইড়াই ময় মুরব্বীগো ফাঁকি দিয়া ফরফর ফরফর কইরা উইড়া বেড়াইতে চাও তাই না?
ডানা আমি কাইট্টা রাখতে জানি কইলাম।
--আম্মা,আপনি এগুলো কি বলছেন?আমি কি এমন করেছি?
--ওমাগো রাশেল দেখছোসনি তোর বউয়ে আস্পর্ধা! আমার মুখের উপর জানতে চায় আমি এইগুলা কি কইতাছি!
যাও যাও তুমি এহন যাও।মাইয়াছেলে পেটে লইয়া বড় করতাছো আমাগো না জানাইয়া।ভুল তো করছোই আবার বড় গলায় কথাও কও।নির্লজ্জ মাইয়া কাহাকার।
তয় ভুল তুমি কইরা ফালাইছো তো এইটা শুধরানোর ব্যবস্থা আমি নিজেই করতাছি।
আমি কোনো কথা না বলে সবাইকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে এসে দরজা আটকে দিলাম।আসার সময় শুনতে পেলাম,শাশুড়ী সবাইকে যার যার ঘরে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছে আর রাশেলকে তার ঘরে গিয়ে কথা শুনে আসতে বললো।
তারপর থেকেই রাশেল আমাকে বারবার চাপ দিচ্ছে বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার জন্য।আর আজ টিকতে না পেরে অবশেষে ক্লিনিক থেকে পালিয়ে আবার চলে আসলাম বাবার বাড়িতে।
কিন্তু আমার পোড়া কপাল!
এখানে আসা অব্দি থেকে মা'র গঞ্জনা লাঞ্চনা শুনেই যেতে হচ্ছে, "কত কইরা কইলাম কোনরকম ঝামেলা বাঁধাইস না, শাশুড়ী যা কয় মাইনা যাইস।কিন্তু কে শোনবে কার কথা!এতোদিন তো তোর জামাই খরচ চালাইছে তাই বইল্লাই তো ভালা-মন্দ খাইয়া পইরা চলতে পারছোস এই বাড়িত্তে।।এখন যে পলাইয়া আইছস,দিব জামাই এহন একটা পইসাও?তোর বাপের কি মুরোদ আছে বাড়তি একজনরে খাওয়ান পিন্দনের!চিন্তাভাবনা না কইরা কি কামডাই না করলিরে তুই মা।দিছস তো শাশুড়ীরে অখুশি কইরা।কি হইবো এহন সামনে তোর আমি তো কিছুই বুঝবার পারতাছি না..........।"
-----------------
রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়লাম।মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলাম,যে যাই বলুক না কেনো এই সন্তানকে আমি জন্ম দিবই।তিলতিল করে বড় করে তুলে এখন আমি কিছুতেই ওকে হারাতে পারবো না।
ভাগ্যের কথা চিন্তা করে দু'চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যাচ্ছে আমার।সারারাত এক ফোটাও ঘুম হলো না।এপাশ-ওপাশ করেই কাটিয়ে দিলাম।
ভোররাতের দিকে সাইলেন্ট করে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি রাশেলের ২৩টা মিসডকল! লাস্ট মিসডকল ৪মিনিট আগের,আমি ফোনটা বন্ধ করে দিয়ে আবার জায়গা মতো রেখে বাহিরে এসে দাঁড়ালাম।
রাতের আঁধার কেটে গিয়ে সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে কেবলমাত্র।
আমি আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে জীবনের হিশাব-নিকাশ মিলাতে শুরু করে দিলাম।
এই তিন বছরের সংসারে কি পেলাম আমি?সবার জন্য এতো করেও আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি একা,একদম একা।আমার পেটের নিষ্পাপ শিশুটার কারণেই আমি এখন সবার শত্রু হয়ে গেছি!
এমনকি রাশেলকেও পেলাম না জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তটাতে পাশে!যখন কিনা ওকেই আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
রাশেল আমার ভালোবাসার মানুষ।ভার্সিটিতে পড়াকালীন রাশেলের সাথে আমার পরিচয় হয়।আমি তখন অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্রী আর সে ছিল সেই ভার্সিটির একজন অস্থায়ী সহকারী কেরানী।
প্রথমে চেনাজানা তারপর বন্ধুত্ব আর একসময় সেই বন্ধুত্বই রুপ নিয়েছিল প্রেমের সম্পর্কে।
রাশেলের সাথে ২ বছর সম্পর্কের পর আমরা নিজেরাই বিয়ে করে ফেলি।পারিবারিকভাবে জানিয়ে বিয়ে করতে গেলে রাশেলের মা কখনোই মানতেন না আমাদের বিয়েটা।কারণ আমার বাবা-মা গরীব,তাদের মেয়েকে সাজিয়ে শ্বশুর বাড়ি তুলে দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই তাদের একদমই।
এদিকে যৌতুকের প্রতি মায়ের আকাঙ্খাটা রাশেলও বুঝতো খুব ভালো করেই।সে অত্যন্ত যৌতুকের জন্য রাকাকে হারাতে চায়নি।
তাই একদিন হুট করেই আমাকে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়েটা করে ফেলে।তারপর আমাকে নিয়ে সোজা ওর বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়।
বিয়ে করে বাড়িতে আনার আগে আমাকে রাশেল শুধু একটা কথাই বলেছিল,"আমার মা হয়তো আমাদের এই ব্যাপারটাতে কষ্ট পেয়ে এখন অনেক কিছুই বলবে।তুমি কিন্তু কোনো কিছুই মনে নিও না।
আর কখনো আমার মায়ের অবাধ্য হয়ো না।আমি আমার মাকে খুবই ভালোবাসি।তাই আমার মা'র সাথে কখনো কেউ বেয়াদবি করলে সেটা কিন্তু আমি মেনে নিব না।বুঝলে?
প্রতুত্তরে আমি শুধু ঘাড় কাত করে রাশেলের কথায় সম্মতি দিয়েছিলাম।
আমাদের দেখে তো আমার শাশুড়ীর মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়া বাকী ছিল।
একে তো রাশেলের বউ বাপের বাড়ি থেকে কিছু নিয়া আসে নাই উপরন্তু সে শিক্ষিতা।তার পড়াশোনার আরও বাকী,পড়াশোনার খরচও কিনা তার ছেলেকেই চালাতে হবে এখন!
সেই থেকে অনেক ঝড়ঝাপটার আর চরাই উৎরাই পেরিয়ে পরে স্থায়ী হতে পেরেছিলাম ঐ সংসারে।রাশেলের হাতে পায়ে ধরে পড়াশোনাটাও চালিয়ে নিচ্ছিলাম।
রাশেলের অন্যান্য ভাইদের মতো রাশেল একদম গন্ডমূর্খ ছিল না,সে অত্যন্ত বুঝতো পড়াশোনার মর্মটা।
তাই অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে মাকে রাজী করিয়ে তবেই সে বউয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতো।
অবশেষে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে যখন শ্বশুর বাড়ির লোকেদের একটা অপছন্দের জিনিস থেকে নিজেকে মুক্ত করলাম।আর ঠিক তখনই আমার সন্তান নিয়ে আরেকট বড় ঝঞ্জাট শুরু হয়ে গেল আমার সংসারে।
---------------
চারদিকে বেশ আলো ফুটে গেছে।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তখনকার মতো স্মৃতির ডায়েরীর পাতা উল্টিয়ে রেখে পুকুরপারে চলে গেলাম মুখহাত ধুতে।
ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি রান্নাঘরের পাশে মোড়া পেতে রাশেল বসে আছে।
পাশেই আমার মা আমার বোরকাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমার অপেক্ষায়।
মা হয়তো আমাকে এক্ষুনি রাশেলের সাথে পাঠিয়ে দিয়ে বিদায় করতে পারলে বাঁচেন।
সকাল সকাল রাশেলকে দেখে আমার মেজাজটা চড়ে গেল।মায়ের "না,না" বোধক চোখের ভাষাকে উপেক্ষা করে আমি অগ্নিশর্মা হয়ে সামনে গিয়ে বললাম,
--কেন এসেছো এখন?কি চাও?আমি আমার বাচ্চাকে হত্যা করতে দিব না তোমাদের, এটাই শেষ কথা।শুনছো তুমি?
রাশেল মায়ের সামনে আমার এহেন ব্যবহারে একটু অপ্রস্তুত হয়ে উঠে দাঁড়ালো।নিরীহ কন্ঠে বললো,
--মা বলেছেন তোমায় সাথে নিয়ে যেনো তবেই যাই।
--যাব না আমি তোমার সাথে।
আর তোমার মাকে স্পষ্ট করে বলে দিও,উনি যতই চেষ্টা করেন না কেনো উনার উদ্দেশ্য সফল হবেন না।
--মা বলেছেন তুমি যদি না যাও আমার সাথে,তাহলে মা অন্য ব্যবস্থা নিবেন!
--কি কি কি ব্যবস্থা নিবে তোমার মা?বলো?
#চলবে
#আমার_মেয়ে
#Khadija_Akter
#পর্ব_০৩
--মা বলেছেন তুমি যদি না যাও আমার সাথে তাহলে মা অন্য ব্যবস্থা নিবেন!
--কি কি কি ব্যবস্থা নিবে তোমার মা?বলো?
রাশেল কিছুক্ষন চুপ করে থেকে একবার আড়চোখে আমার মায়ের দিকে তাকালো।তারপর মিনমিনে কন্ঠে বললো,
--তা তো আমি জানি না।কিন্তু ভালো কোনো ব্যবস্থা যে নিবেন না সেটা তো তুমিও জানো রাকা।
--উনার যা করার উনি করুক।আমি যাচ্ছি না তোমার সাথে আর ঐ বাড়িতে।
তুমি নাস্তা করেছো?না করে থাকলে নাস্তা করে বাড়ি চলে যাও।
--প্লিজ রাকা,কেনো শুধু শুধু সংসারে অশান্তি করতে চাইছো বলোতো?মা যেহেতু চাইছে না আমাদের এই বাচ্চাটা,তাহলে আমরা মা'র কথা মেনে নিলেই তো সব ঝামেলা মিটে যায় রাকা!
--বাচ্চাটা কি আপনার মায়ের?আমার বাচ্চা আমি সিদ্ধান্ত নিব যে আমি ওকে জন্ম দিব নাকি মেরে ফেলবো।বড়জোর বাচ্চার বাবা হিসেবে আপনি আমার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারেব।কিন্তু আপনার মা কে আমাদের সন্তানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বলুন?
বিয়ের পর আজ পর্যন্ত উনার কোন কথা মেনে চলিনি আমি?আমি কখন ঘুমাবো,কখন উঠবো,কখন খাবো,কখন কাজ করবো,কখন পড়তে বসবো,কখন আপনার সাথে সময় কাটাবো এমনকি কখন আপনার সাথে শুবো সেটা পর্যন্তও পারে না আপনার মা ডিসাইড করে দেয়।কিন্তু আর কত?
একটা প্রাণ হত্যার হুকুম দিবে আর আমি সেটাও চুপচাপ পালন করবো?
আর আপনি?আপনার কি নিজস্ব মতামত বলতে কিছুই নেই?আপনার মা যা বলবে তাই?
আপনাকেও না আমার একদম সহ্য হচ্ছে না এই মুহুর্তে। যান এক্ষুনি বেরিয়ে যান আমাদের বাড়ি থেকে।
চেঁচিয়ে একটানা কথাগুলো বলতে বলতে একসময় কান্নায় আমার গলা জড়িয়ে আসে।মুখে আঁচল টেনে এক দৌঁড়ে ঘরে ঢুকে যাই।
রাশেল আমার যাওয়ার পানে চেয়ে থেকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর কাউকে কিছু না বলেই চুপচাপ উঠে চলে যায়।
রাশেল যেতে না যেতেই মা'র অগ্নিমূর্তির সামনাসামনি হতে হলো,
"ওরে পোড়ামুখী জামাইটাকে এইভাবে ফিরায় দিলি ক্যান,কিসের এমন দেমাগ তোর।তোর বাপের কি গোলা ভরা ধান আছে যে সেই জোরে তুই তোর জামাই - শাশুড়ীর লগে এম্নে কথা কস!একে তো শাশুড়ীরে ফাঁকি দিয়া পলাইয়া আইসা একটা ভুল করছোস,কপালডা ভালা বইলাই সকাল সকাল জামাই নিবার আইছিলো।আর তুই কিনা তাচ্ছিল্য কইরা জামাইডারও খেদায় দিলি?
জামাইর সংসার করতে হইলে মাইয়া মাইনসের অনেক কিছু মুখ বুইজ্জা সইবার লাগে।এমন গলা উঁচাইয়া কথা কইবার হয় না।
আসুক আজ তোর বাপ ক্ষেত থেইক্কা, তোর কীর্তিকলাপ সব কইতাছি।
আরে জামাই যদি এহন রাগ হইয়া তোরে তালাক দিয়া দেয় তাইলে তুই তহন কার ঘাড়ে বইয়া খাবি ক?পেডের মধ্যে তো আরেকটারে বড় করতাছোস।ঐডার দায়িত্ব নিব কেডায়?
তোর ছোড ২টা বইন যে বিয়ার লাক হইছে সেই খেয়াল কি আছে তোর?
আহ্ কি হইবো গো আমার কপালে,আমি আর পারতাছি না এই জগৎ সংসারে টিকিবার।"
কতগুলো কথা শুনিয়ে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে মা চলে গেলেন।
আমি মাথা নিচু করে চুপ করে বসেই রইলাম।চোখ দিয়ে টপাটপ পানি পড়ছিল।
আসলে মা তো ভুল কিছুই বলেনি।কৃষক বাবার একার রোজগার দিয়ে যেখানে মা,ছোট ২টা বোন আর ছোট্ট ১টা ভাইয়ের পেট চলে সেখানে আমার এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে উড়ে এসে জুরে বসা তো তাদের ক্ষুধার্ত উদরে লাথি দেওয়ার মতনই হয়ে গেল।
গরীবের ঘরের মেয়ে বলেই হয়তো শ্বশুর বাড়ির লাঞ্চনা বঞ্চনা সহ্য করে হলেও শ্বশুর বাড়িতে পরে থাকতে হবে আমাদের।আজকে আমার বাবার যদি অনেক টাকা-পয়সা থাকতো তাহলে তো আমার ভরণপোষণ নিয়ে মাকে এতো চিন্তা করতে হতো না।শ্বশুর বাড়িতে মেয়ের একটু কোনো সমস্যা হলেই নিয়ে আসতো নিজের বাড়িতে।
কিংবা তখন দেখা যেতো আমার শাশুড়ীও হয়তো আমাকে তুলোতুলো করে পালছে।
মা'র একটা কথা আমার খুব করে কানে বাজতে লাগলো সারাক্ষণ।
সত্যিই কি রাশেল আমাকে তালাক দিবে যদি আমি ওর মায়ের কথা না শুনি?রাশেল এটা পারবে আমার সাথে করতে?যদি আসলেই তালাক দেয়, তাহলে আমি কই যাব!কি করবো তখন?
আমি দিকভ্রান্ত হয়ে চিন্তা করতে থাকি,করতেই থাকি।যে চিন্তার কোনো শেষ নেই,কোনো দিককূল নেই।দুচোখ শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার দেখি আমি।
--------------------
২দিন পর আমার শাশুড়ী আর বড় জা এসে হাজির হয় আমাদের বাড়িতে।
তারা আমাকে নিতে এসেছে।
আমি শাশুড়ীর মুখের উপর সোজাসাপ্টা বলে দিলাম,"উনি যেটা চায় সেটা কখনোই হবে না।"
শাশুড়ী মা বললেন,"এটা নিয়ে কথা বলবো কিন্তু এখানে না।আগে বাড়িতে চল।"
আমার বড় জাও অনেক করে বুঝাতে লাগলো,বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য।সেখানে সবাই একসাথে বসে বুঝেশুনে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
ক্লিনিক থেকে পালিয়ে যাওয়ার ৪দিন পর অবশেষে আমি শাশুড়ী ও বড় জা'য়ের সাথে আবার শ্বশুর বাড়িতে ফিরে আসি।
শুধু যে আমার শাশুড়ী ও জা'য়ের মিষ্টি মিষ্টি কথায় মন গলিয়ে তাদের সাথে ফিরে এসেছি তা নয়।
দরজার আড়ালে থাকা আমার মায়ের চোখের ভাষাও পড়ে নিয়েছিলাম আমি।যে চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করা আমার সাধ্যে ছিল না।
স্পষ্ট দেখেছিলাম সেই দুটো চোখ ইশারায় আমাকে বলছিল, "তুই যদি এহন তোর শাশুড়ীর সাথে না যাস আর তাদের ফিরায় দেস,তাইলে আমার চাইতে খারাপ আর কেউ হবে না।"
---------------------
শ্বশুর বাড়িতে আসার পর প্রথম ২দিন সবকিছু স্বাভাবিক ভাবেই চললো।কেউ আমার গর্ভের সন্তানকে নিয়ে কোনো কথাই তুললো না।আশ্চর্যজনকভাবে এই দুইদিন আমার শাশুড়ী তো আমার সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করলোই না বরং আমার ডাকখোঁজ দিয়ে রাখলো।
আমার মনের গোপন কোনো অংশে হয়তো এই আশা বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল,"হয়তো সবাই মেনে নিয়েছে আমার সন্তানকে""
আবার এটাও মনে হচ্ছিল,বড় কোনো ঝড় আসার পূর্বে যেমন সব কিছু থম মেরে থাকে,হয়তো এখন সেটাই চলছে।হয়তো বড় কোনো ঝাপটা আমার সামনে আসতে চলেছে।
হলোও তাই,তৃতীয় দিন সন্ধ্যাবেলাতেই আমাকে শাশুড়ীর একটা বড় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হলো।
সবার সামনে ডেকে নিয়ে শাশুড়ী আমাকে তার পাশে আদর করে বসালেন।তারপর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে হাসি মুখে বললেন,
--ছোড বউমা,আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিছি আমরা আমাগো নাতনীডারে পৃথিবীর আলো দেখামু।যেহেতু হিসাবে এহন জন্মের সময় আইসাই পড়তাছে, এইসময় বাচ্চাডারে মাইরা ফেলা ঠিক হইবো না।
--সত্যি আম্মা!
আমি খুশিতে শাশুড়ী মাকে জড়িয়ে ধরলাম।গত তিন বছরে এই প্রথম হয়তো আমি এতো খুশি হলাম।শাশুড়ীর এই সিদ্ধান্তে উনার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে পানি চলে আসলো।
রাশেলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম,সবার মতো সেও হাসছে কিন্তু কেনো যেনো তার হাসিতে প্রাণ খুঁজে পেলাম না।
হয়তো খুশি অনুভব করার জন্যই শাশুড়ী আমাকে কিছুক্ষণ সময় দিয়েছিলেন,এরপর উনি যা বললেন তাতে আমার মাথায় যেনো বাঁজ পড়লো!
--কিন্তু বাচ্চাটাকে তুমি রাখতে পারবা না।মাইয়াটাকে আমরা একটা নিঃসন্তান দম্পতিকে দিয়া দিমু।উত্তর পারার হাবুল্লার বউ কইছে,মাইয়াডা নিতে অয় রাজী আছে।
আম্মার কথা শুনে আমার কান ঝিমঝিম করে উঠলো।চরম বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে দৃঢ় কন্ঠে বললাম,
--কি বলেন আপনি এগুলো আম্মা!আমার মেয়েকে আমি কেনো অন্যজনকে দিতে যাব!এরকম হয় নাকি?
আমার মেয়ে আমার কাছেই থাকবে।না,আমি কাউকে দিতে পারবো না।
--আরে বউমা,হাবুল্লার বাজা বউডারে তোমার বাচ্চাডা দিয়া দিলে তুমি অনেক সাওয়াব পাইবা।পরের বার যদি পেডে ছেলে বাচ্চা আহে তাহলে তুমি নিজের লাইগা ঐডা রাইখা দিবা,তাইলেই তো হইয়া গেলো
--আম্মা আমি আমার বাচ্চা কাউকে দিব না,এটাই আমার শেষ কথা।আমার পেটের বাচ্চাটা মেয়ে, তা বলেই তো আপনার এতো সমস্যা আম্মা?
আপনি নিজেও তো একজন মেয়ে আম্মা!আপনার কিসের এতো বিদ্বেষ মেয়ে সন্তান জন্মদানে বলবেন একটু?মেয়ে সন্তান কি আল্লাহর সৃষ্টি না?আল্লাহই তো নিজের সিদ্ধান্তে মানুষের গর্ভে ছেলে বা মেয়ে সন্তান দেন।তাহলে আপনি কে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে পায়ে ঠেলার!
ছেলে হলেই রাখবেন আর মেয়ে হলে মেরে ফেলবেন বা বাচ্চা পয়দা করিয়ে তারপর আরেকজন কে দিয়ে দিবেন,এটা কেমন নিয়ম আপনার!
আপনি আমার গুরুজন আপনার সব কথা মেনে চলি আমি ঠিক আছে,তাই বলে অন্যায় কিছু বললে সেটা অবশ্যই মানবো না।
আপনি আমার সওয়াবের কথা বলছেন কি,নিজে যে কত বড় গুনাহর ভাগীদার হচ্ছেন সেই খবর রাখেন?
আমার দৃঢ় সিদ্ধান্ত আর কড়া কথা শুনে আমার শাশুড়ী যেনো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। লাফ দিয়ে উঠে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।তিনি তার ভালোমানুষির মুখোশটা এবার খুলে ফেললেন,যেটা উনি গত ২দিন ধরে পড়ে ছিলেন।রাগে চোখ লাল করে উনি বললেন,
--আমি জানতাম, আমি জানতাম এই বেদ্দপ মেয়েডা আমার কোনো কথাই শুনবো না।উলটা আরও কত্তগুলা কথা শুনাইয়া দিল দেখছোস রাশেল?আমার অন্য কোনো বউ সাহস করবো আমার লগে এম্নে কথা কইবার?আমার পোলারা না টুটি টাইন্না ধইরা ছিড়া ফালাইতো ওই বউয়ের।
এই যে মাইয়া তোর ব্যবস্থা আমি করতাছি।সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বেঁকাও করতে জানেএই হোসনে আরা বেগম।একটা কথা আছে ন, যেমন কুকুর তেমনি মুগুর।এইবার সময় আসছে তোকে মুগুর দেখানোর।
হায়রে এমন দিনও আমার কপালে আছিলো,পোলার সামনে বউ মায়রে অপমান করে আর পোলা আমার খাঁড়ায় খাঁড়ায় দেখে।
কপট কান্নার ভাণ করে আমার শাশুড়ী সেখানেই মুখে হাত দিয়ে বসে পড়লেন।তার অন্যান্য ছেলেরা ও বউরা শশব্যস্ত হয়ে গেল শাশুড়ীকে সামলাতে।
আমি শাশুড়ীর কথার প্রতুত্তরে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম তার আগেই রাশেলের রাশভারি কন্ঠ আমাকে থামিয়ে দিল,
--চুপ একদম চুপ।বড়দের মুখে মুখে কথা বলার স্পর্ধা দেখাবা না।আসো,আসো আমার সাথে।
--হাত ছাড়ো।আমাকে বলতে দাও। কিছু কথা উনাকে শোনানো খুব প্রয়োজন।তোমরা সব ভাইয়েরা তো নিজেদের বিচারবুদ্ধি সব খেয়ে ফেলছো।তোমার ভাবীরাও ঠিক সেইরকম,দশ ঘায়েও তাদের মুখে এক রা আসবে না।কিন্তু আমি কেন চুপ থাকবো?আমার বিবেকবোধ তোমাদের মতো অত ভোঁতা না.....
আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রাশেল হাত ধরে একপ্রকার টেনেই সবার সামনে থেকে বের করে নিয়ে আসলো।
ঘরে এসে রাশেল দরজা আটকে দিল ভিতর থেকে।তারপর আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে চুপ করে বসে রইলো চকির উপর।
প্রত্যেকবার শাশুড়ীর সাথে আমার কথা কাটাকাটির পর রাশেল ঠিক এটাই করে।
সবার সামনে থেকে আমাকে নিয়ে এসে ঘরের দরজা আটকে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে আর আমাকেও সামনে বসিয়ে রাখে।
মাঝে মাঝে বেচারার উপর খুব মায়া হতো আমার।সে পারে না তার মায়ের মুখের উপর দুটো কথা বলতে,আবার কোনো এক কারণে সে আমাকেও কিছু বলতে পারে না।অসহায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যায় শুধু।
আজ আর তার জন্য আমার বিন্দুমাত্রও সহানুভূতি জাগলো না।আমাকে ঐভাবে থামিয়ে দিয়ে,কথা বলতে না দিয়ে টেনে নিয়ে আসার কারণে আমার মনে থাকা সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো রাশেলের উপরে।
মনের যত রাগ আছে সব ইচ্ছে মতো ঝাড়লাম সব তার উপরে।এমনকি তাকে কাপুরুষ,পুরষত্বহীন বলতেও বাদ রাখলাম না।
আমার এতোগুলো বকাঝকা আর কড়া কড়া কথার পরিপ্রেক্ষিতে রাশেল নির্লিপ্ত জবাব ছিল,
"যত ইচ্ছে আমাকে ঝাড়ো,কিন্তু প্লিজ মা'র মুখের উপর কিছু বলতে যেও না।"
আমি বুঝে গেছিলাম,রাশেলকে কথা শুনানো একদমই বেকার।
------------------------
রাতে না খেয়ে শুয়েই রইলাম।আজ একটাবারও আমাকে কেউ ডাকতে এলো না খাওয়ার জন্য।
একটুপর রাশেলও খেয়েদেয়ে পাশে এসে শুয়ে পড়লো।
রাত কত হবে এখন,১২টা কি ১টা!
গ্রামাঞ্চলে এটাই অনেক রাত।মনে অশান্তি আর পেটে ক্ষুধা থাকার কারণে একদম ঘুম আসছিল না।
ঘাড় ফিরিয়ে রাশেলকে দেখলাম,দু'হাত বুকের উপর ভাঁজ করে রেখে এক পা অন্য পায়ের উপর তুলে সোজা হয়ে শুয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছে।রাশেলের এই ঘুমের স্টাইলটা আমার কাছে বহুল পরিচিত।বিয়ের পর থেকেই তাকে এভাবে ঘুমাতে দেখে আসছি।
অনেক চেষ্টা করেও দুচোখের পাতা এক করতে পারছিলাম না যখন,তখন বৃথা ঘুমের চেষ্টা বাদ দিলাম।
প্রচন্ড গরম লাগছে।
যতই দিন যাচ্ছে শরীরটা কেমন বেড়েই চলেছে,কিন্তু গায়ের জামা তো সেই আগের মাপেই আছে।বাচ্চা পেটে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো জামা বানানো হয় নাই আমার।অন্য সবার মতো আমার পেট অত বেশি বড় হয়নি,এটাই যা রক্ষা।কষ্ট করে হলেও টেনেটুনে আগের জামাগুলো পরা যাচ্ছে এখন।
গরম সহ্য করতে না পেরে হাসফাস করতে করতে হাত বাড়িয়ে মাথার কাছের ছোট্ট জানালাটা খুলে দিলাম।
জানালা খুলে দিয়ে যেই না এপাশ হয়ে শুয়েছি রাতের নীরবতাকে ভেঙে দিয়ে রাশেল শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
--এই সময়েও এমন টাইট টাইট জামা পড়ো কেন?পুরান জামা দিয়ে আর কতদিন চলবে?কাল দক্ষিণকান্দির রেশমীর মা'র কাছে গিয়ে নতুন ২টা জামা বানাতে দিয়ে আসবা।
আমি কিছুটা বিব্রত হলাম।প্রথমত রাশেল এতোক্ষণ জেগে ছিল অথচ আমি একটুও বুঝতে পারিনি।দ্বিতীয়ত্ব আমি যখন আমাদের বাড়িতে ছিলাম,রাশেল তখন আমার খাওয়ার খরচ বাদ দিয়েও এক্সট্রা করে দুইবার টাকা দিয়েছিল নতুন জামা বানানোর জন্য।
আমি জামা না বানিয়ে সেই টাকা সংসারে কাজে লাগানোর জন্য আমার মায়ের হাতে দিয়ে দিছিলাম।
তখন মনে হয়েছিল পুরুষ মানুষ এতোটা খেয়াল করবে না,নতুন কাপড় বানালাম কি না বানালাম।
কিন্তু রাশেল যে আমার জামাকাপড়ের দিকে লক্ষ্য দিবে সেটা আমার একদমই মনে হয়নি।
যাইহোক,অস্বস্তি কাটিয়ে উঠে আমি স্বাভাবিক কন্ঠেই জবাব দিলাম,
--নতুন জামা বানানোর টাকা কে দিবে?
--তোমার জামাই কি বেকার?
--আমাকে নতুন জামা বানিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমার শাশুড়ীর কাছ থেকে যদি জামাই পারমিশন নিতে ব্যর্থ হয় তবে?শাশুড়ী পারমিশন না দিলে তো বেচারী বউয়ের সেই পুরান জামা দিয়েই চালিয়ে নিতে হবে।
আমার সুক্ষ্ম এই খোঁচাটা রাশেলের গায়ে লাগলো কিনা বোঝা গেল না।কারণ রাশেল কখনোই কোনো কিছুতে রিয়েক্ট করে না।তাই ওর মনের ভাব বা অনুভূতি অন্যের পক্ষে জানা বেশ দুষ্কর।
আমি হাজার ঝগড়া করলেও,হাজারটা খোঁচা মারলেও সে চুপ করেই থাকে।তার এই স্বভাবের কারণে মাঝে মাঝে আমার খুব রাগও হয়।আবার মাঝে মাঝে ভাবি এই রোবটটার সঙ্গে আমার প্রেমটাই বা হলো কি ভাবে!
রাশেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে টপিক চেঞ্জ করে অপেক্ষাকৃত শান্ত গলায় বললো,
--ঘুমাচ্ছো না কেন?
--ঘুম আসছে না।
--ভাতের সাথে রাগ করে লাভ কি?
--এই কথা আসছে কেন?
--তোমার পেটে এখন খুব ক্ষুধা তাই তুমি ঘুমাতে পারছো না,আমি জানি।
আমি কিছু বললাম না,চুপ করে রইলাম।আমার আসলে কিছু বলারও নেই।আসলেই ক্ষুধায় পেট চো চো করছে।
আমার নীরবতা দেখে রাশেলই আবার কথা বললো,
--টিনের কৌটায় বিস্কুট আছে।৩/৪ দিন আগে কিনে রেখেছিলাম।রাতে আমার খুব ক্ষুধা লাগে আজকাল তাই।
তুমি খাবে?
--দাও
রাশেল উঠে টিনের কৌটাটা আমার হাতে দিল।আমি অন্ধকারে বসে থেকে বুভুক্ষের মতো বিস্কুট খেতে শুরু করে দিলাম।আর সে টেবিলের উপরে থাকা খালি জগটা হাতে নিয়ে কলপাড়ে চলে গেল পানি আনতে।
---------------------
খুব সকালেই ঘুম ভেঙে গেল আমার।পাশে চেয়ে দেখি রাশেলও সজাগ;উপরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কি যেনো ভাবছে আপন মনে।
আমি আলগোছে তার হাতটা নিয়ে আমার পেটের উপর রেখে বললাম,
--সত্যি করে বলো তো রাশেল, এই বাচ্চার জন্য কি তোমার আদৌও কোনো অনুভূতিই নেই?তুমি আসলেই চাও এই বাচ্চা আমাদের না হোক?
আমার স্পর্শে রাশেলের চিন্তায় ছেদ পড়ে গেছে আগেই, এবার আমার প্রশ্নে সে যেনো অনেকটাই চমকে উঠলো।
তার মুখের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে মনে হচ্ছে,আমি তাকে এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কোনো প্রশ্ন করে ফেলেছি!
আমি রাশেলের মুখের পানে চেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি তার উত্তর শোনার..।
#চলবে#আমার_মেয়ে
#Khadija_Akter
#পর্ব_০৪
রাশেলের মুখের ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে মনে হচ্ছে,আমি তাকে এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কোনো প্রশ্ন করে ফেলেছি!
আমি রাশেলের মুখের পানে চেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি তার উত্তর শোনার জন্য..।
--আসলে মা চাইছে না আমাদের বাচ্চাটা।
--আম্মা চাইছে না সেটা তো আমিও জানি।আমি তো তোমার মতামত জানতে চেয়েছি রাশেল?তোমার নিজস্ব রায় কি এই বাচ্চার ব্যাপারে?
--.................
রাশেল অন্যদিক চেয়ে চুপ করে রইলো।আমি বেশ জোরেসোরে ঝাঁকি দিলাম তার হাতটা ধরে।
--কি হলো চুপ কেন?বলো?
--আম্মা যা বলবে আমারও সেটাই মতামত।
রাগে আমি এবার ওর হাতটা ছেড়ে দিলাম।শরীরটা জ্বলছে খুব।এতোবড় একজন লোক,বিয়ে করে ফেলেছে,২দিন পর বাচ্চার বাবা হবে সে কেনো এখনো মায়ের এমন ন্যাওটা হয়ে থাকবে। মাভক্তিরও তো একটা লিমিট থাকা দরকার।আমি দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললাম,
--তাই বলে মা অন্যায় কিছু করতে বললে তুমিও তাতে সায় দিবে!মানে তোমরা ভাইয়েরা ভাইয়েরা এমন কেনো বলোতো?কেউ কোনো উচিত কথা বলতে পারো না কেন?
তোমার ভাইদের কথা নাহয় বাদই দিলাম,তারা পড়ালেখা করার সুযোগ পায়নি সারাজীবন ক্ষেত খামার নিয়েই পড়ে ছিল।তাই ,ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা হয়তো একটু কমই তাদের।
কিন্তু তুমি?তুমি তো যথেষ্ট শিক্ষিত,বুঝদার,ভালো ব্যাবসাও করো।ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিচার করার ক্ষমতা আল্লাহ তোমায় দিয়েছে।
এখন তোমার আর তোমার ভাইদের মধ্যে তো কোনো তফাৎ রইলো না দেখছি।মুখ ফুটে একটা কথাও বলতে পারো না মায়ের সামনে,তোমাদের যত পুরুষত্ব সব স্ত্রীর সামনেই তাইনা?
--চুপ একদম চুপ।
আমার মা আমাদের ৫ ভাইকে খুব কষ্টে বড় করেছেন খেয়ে না খেয়ে।একা হাতে এতগুলো সন্তানকে মানুষ করার কষ্ট তুমি কি বুঝবা?বাবা থেকেও না থাকার মতো ছিলেন তখন।আর জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তো বাবাও একদম বাচ্চার চেয়েও অবুঝের মতো হয়ে গিয়েছিলেন।
মা'র উপরে ছিল একদিকে মানসিক অন্যদিকে সামাজিক চাপ। তার উপর ছিল আর্থিক দুরাবস্থা।
আমি তখন খুব বড় না হলেও এতোটাও ছোট ছিলাম না যে মায়ের কষ্ট ভুলে যাব।সে কি দিন গেছে আমাদের কি বলবো আর তোমাকে রাকা!
শাকিলা আপার মৃত্যুর পর মানসিক ভারসাম্যহীন স্বামী,৫ সন্তান ও ১ বউ নিয়ে আমার মা তখন কিভাবে কত কষ্ট কতে দিন গুজরান করেছিল তা আমার এখানে স্পষ্ট মনে আছে।
--ওয়েট,ওয়েট কার মৃত্যুর পর বললে?শাকিলা আপা?
শাকিলা আপাটা কে?আর কিভাবে মারা গেছে?আগে তো কারো মুখ থেকে এই নাম শুনিনি।
রাশেল আনমনে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল,কথার মাঝখানে আমি কথা বলে উঠায় সে যেন এতোক্ষণে বাস্তবে ফিরে এলো।সচকিত হয়ে বললো,
--না,না কেউ না।এমনি মুখ ফসকে চলে এসেছে।
সাবধান এই নাম যেনো তুমি অন্য কারো সামনে উচ্চারণ করো না আবার।
আমার সামনে থাকলে রাশেলকে আরও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো।তাই হয়তো সে তড়িঘড়ি করে উঠে বাহিরে চলে গেল।
শাকিলা আপা কে?আমি উনার ব্যাপারে জানি না কেন!
আর রাশেল এই ব্যাপারে কিছু বলতেও বা চাইলো না কেনো?সে অন্য কাউকে এই ব্যাপারে বলতেও নিষেধ করলো!লুকানোর কি আছে এখানে?
মানুষ মাত্রই কৌতূহলী।
আমার কৌতূহলও উত্তরোত্তর বেড়েই চললো শাকিলা আপা সম্পর্কে জানার।
আর কৌতূহল দমন করতে না পেরে দুপুরের দিকে সেজো জা'কে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,'কে এই শাকিলা আপা।"
সেজো জা'য়ের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো,সেও কিছুই জানে না।আমার মুখ থেকেই প্রথম শুনলো এই নাম।
আমি সাময়িক সময়ের জন্য কিছুটা হতাশ হলেও পরক্ষণেই চিন্তা করলাম,আমার বড় জা তো এই সংসারে সবার প্রথমে পদার্পণ করেছেন।যদি কিছু বলতে পারেন তবে শুধু সেই বলতে পারবেন।
------------------------------
দুপুরে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সবাই যখন খেতে বসেছি,খাওয়ার সময়েও শাশুড়ী সেই একই কথা তুললেন আবার,
--ছোড বউমা,তোমার সিদ্ধান্ত কি তাহলে?
--কোন ব্যাপারে আম্মা?
--ন্যাকামি করো না।কোন ব্যাপারে বলছি তা তুমি বেশ ভালা কইরাই জানো।
--আম্মা,এক কথা আর কতবার বলবো?আমি তো আমার মতামত জানিয়েই দিয়েছি।না আমি আমার এই অনাগত বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি করতে দিব কাউকে আর না আমি বাচ্চাটাকে জন্ম দিয়ে তারপর অন্য কারো হাতে তুলে দিব।
--আমি জানতাম,জানতাম যে এই মাইয়াডা চ্যাটাং চ্যাটাং মুখের উপরে উত্তর দিয়া দিব।আমি আর কারো লাইগা ভাবতে যামু না।সামনে আমি যা করমু তা শুধু চাইয়া চাইয়া দেখবি তুই মাইয়া।বহুত চেষ্টা করছি তোরে কথা শোনানোর কিন্তু তুই তো ২পাতা বই পইড়া সাপের পা দেইখা ফেলছোস।আমার কোনো কথাই শুনতাছোস না।তাইলে আমারও আর কিছু করার রইলো না।তোর কপালে দুর্দিন আসতাছে ছোড বউ এই বইলা রাখলাম।
শাশুড়ী আর ছোট বউমার কথোপকথনের দমকে দো-চালা খাবারের ঘরে সবারআঝে তখন পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছে।কারো মুখে কোনো টু শব্দটি পর্যন্ত নেই।যে যার মতো করে চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল।
--------------------------
বিকালে বড় জা'কে কাজের ছলে সবার কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে আনলাম।
তারপর কোনোরকম ভনিতা না করে জিজ্ঞেস করলাম শাকিলা আপার ব্যাপারে,উনি কে;আর আমাদের ফ্যামিলির সাথে কি সম্পর্ক?
বড় জা আমার মুখ থেকে শাকিলা নামটা শুনে বেশ আঁতকে উঠলো।নিজেই নিজের ঠোঁটে আঙুল চেঁপে ধরে ইশারায় আমাকে চুপ করতে বললেন।তারপর আমার হাত ধরে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে।
তারপর দরজাটায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে শঙ্কিত হয়ে প্রশ্ন করলেন,
--শাকিলার নাম কার কাছ থেইকা শুনছো গো রাকা?আইচ্ছা বাদ দেও,যার কাছ থেইকাই শুইনা থাকো,ভুইলা যাও।আমার কাছে কইছো তো কইছো তয় সাবধান দ্বিতীয় বার আর এই নাম লইয়ো না এই বাড়িত্তে।
--কিন্তু কেন ভাবী?আপনার দেবরও কিছু বলতে চাইলো না।আপনিও এরকম করছেন।কিছু তো একটা আছেই রহস্য।প্লিজ ভাবী পুরোটা না বললেও একটু তো বলেন।
অনেক না, না করার পর ভাবী একসময় রাজী হলেন বলতে কিন্তু শর্ত দিয়ে দিলেন,আজকের পর আর যেনো এই কথা না উঠাই কখনো।আমি রাজী হলাম।বড় ভাবী ফিসফিস করে বলতে শুরু করলেন,
--"আমাগো শাশুড়ীর কেনো মেয়ে বাচ্চাগো প্রতি এতো আক্রোশ জানোনি?তুমি ভাইবো না শুধু তোমার মেয়ে বাচ্চা নিয়াই আমাগো শাশুড়ীর এতো সমিস্যা।
মেয়ে সন্তান পেডে আসছিল বইলা আমার নিজেরও কিন্তু দুই দুইবার পেট ফালাইছে আমার শাশুড়ী নিজে।মেজো,সেজোরও বাচ্চা নষ্ট করাইছে কয়েকবার।
শুনো তাইলে এর আসল কাহিনী। শাকিলা ছিল আমার শাশুড়ীর একমাত্র মাইয়া।
তোমার বড় ভাসুরের জন্মের ৫ বছর পর শাকিলার জন্ম হয়।শাকিলা পরে পরপর ৪টা ছেলে সন্তান হয় উনার।একমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে স্বাভাবিক কারনেই আমার শ্বশুর-শাশুড়ী শাকিলাকে অনেক ভালোবাসতো।বিশেষ করে আমার শ্বশুরের চোখের মনি ছিল এই শাকিলা।
সেইসময় তাদের অবস্থা এহনকার মতো এতো ভালা ছিল না।খেয়ে পইরা কোনো রকমে দিন কাটতো বলা চলে।
আজ থেইকা ২১ বছর আগে,
যে বছর আমারে বিয়া কইরা এই সংসারে আনলো তোমার বড় ভাসুর,সেই বছর শাকিলা সবে ১৪তে পা রাখছে।ভালো-মন্দ বুঝবার বয়স তখনও অর হয় নাই।
ঠিক এই বয়সটাতেই শাকিলা একটা ভুল কইরা বসলো।
সে কি করলো জানো?
উত্তরবঙ্গ থেইকা পাশের এলাকায় কাজ করতে আসা একজন রাজমিস্ত্রী পোলার লগে প্রেম-পিরিতী কইরা পেড বাঁধায় ফেললো।এই খবর আমরা কেউই জানতাম না।এদিকে বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ করার পর ঐ রাজমিস্ত্রী পোলা শাকিলাকে কিছু না জানাইয়াই চইল্লা গেছিল।ঐ পোলার ঠিকানাওম,পরিচয় কিছুই জানতো না আমাগো শাকিলা।
একদিকে ঐ ছেলের চলে যাওয়া অন্যদিকে নিজের শরীরে কেমন কেমন পরিবর্তনে,শাকিলা প্রথমে অনেক ভয় পাইয়া মনমরা হইয়া গেছিল।
কিছুদিন পরে ঘনঘন বমি আর শাকিলার শরীরের কিছু পরিবর্তন দেইখা আমার শাশুড়ীর মনে কিছু সন্দেহ হয়।পরে আমার শাশুড়ী ওরে একলা ডাইকা নিয়া জিজ্ঞাসা করতেই,শাকিলা ঝরঝর কইরা কানতে কানতে সব বইলা দেয়।
এটা ব্যাপার নিয়া তখন আমাগো পরিবারে অনেক অনেক হাঙ্গামা হয়।
যাইহোক,নিজেগো মাইয়া ভুল যেহেতু কইরাই ফেলাইছে, মাইরা তো আর ফেলা যাইবো না।সবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,তাড়াতাড়ি এই বাচ্চা নষ্ট করতে হইবো,পাড়াপ্রতিবেশি টের পাওয়ার আগেই।
আর কাজটা যত আগে করা সম্ভব ততই ভালা।মান-সম্মানের ব্যাপার বইলা কথা।
আর সেই সময়ে মেয়েগো ইজ্জতের উপরে সামান্য দাগ লাগলেই,সেইটা নিয়া বিরাট কেলেঙ্কারি শুরু হইয়া যাইতো এলাকায়।সেই পরিবারকে একঘরেও করে দেওয়া হতো কখনো কখনো।
যাইহোক শাকিলা কোনোভাবে জানতে পাইরা গেছিল যে আমরা ওর পেটের বাচ্চাটারে মাইরা ফেলবার চিন্তা-ভাবনা করতাছি।
তারপর সেইদিনই সন্ধ্যাবেলায় অয় সরাসরি আমার শাশুড়ীর কাছে গিয়া কইলো,অয় বাচ্চাটা রাখতে চায়,নষ্ট করতে চায়না।
আমার শাশুড়ী সেদিন শাকিলাকে প্রচন্ড মারধোর করেন আর বলেন,"একে তো একটা কলঙ্ক পেটের মধ্যে লইয়া ঘুরতাছোস আবার কিনা এই পাপকে জন্মও দিতে চাইতাছোস!"আরও অনেক গালিগালাজ করলো আমাত শাশুড়ী শাকিলাকে।
সেদিন রাইতেই শাকিলা ঘর থেকে রাগ করে বেরিয়ে যায়।গিয়ে প্রতিবেশী এক ঘরে আশ্রয় নেয়।সেখানে এক প্রতিবেশীর কাছে এই নির্বোধ মেয়েটি কথায় কথায় সমস্ত ঘটনা খুলে বলে দেয়।এটাও বলে,সে বাচ্চাটি নষ্ট করতে চায় না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
শাকিলার করা প্রথম ভুলটা আমরা হয়তো ধামাচাপা দিয়া দিতে পারতাম যেমনেই হোক।কিন্তু ও দ্বিতীয় যে ভুলটা করলো সেইটার জন্য চরম দুর্দিন চইলা আসলো আমাগো কপালে।
রাইতের মধ্যে আশেপাশে দশগ্রামে রটে যায় অমুক এলাকার অমুকের আবিয়াইত্তা মাইয়া আকাম কইরা পেট বাঁধাই ফেলছে!
সকাল হইতেই ঝাঁকে ঝাঁকে লোক আমাগো উঠানে আইসা হাজির হইতে লাগলো আমাগো মুখের উপরে থুতু ছিটানোর লাইগা।কেউ কেউ লাঠিসোটা নিয়া আইসা ঘরদোর ভাইঙ্গা ফেলতে চাইতাছে এইরকম অবস্থা।
সেদিন বিকালবেলাই শালিস বসলো গ্রামে,এই ঘটনার মীমাংসার লাইগা।হাজার হাজার মানুষ আসলো তামাশা দেখার লাইগা।
আগেই তো তোমারে কইলাম সেইসময় এইসব বিষয় নিয়া খুব কড়াকড়ি আইন ছিল সমাজে।এইরকম ঘটনা ঘটলে সমাজ থেইকা বিতাড়িত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকতো না।
যাইহোক, সমাজের সবাই শলাপরামর্শ কইরা সিদ্ধান্ত নিল পরের দিন সূর্য উঠার আগেই যেনো আমাদের পরিবারকে এই গ্রাম তো কি আশেপাশের দশ-বিশ গ্রামের ত্রীসিমানায়ও যেনো দেখা না যায়।
আর শাকিলার এই অপরাধের জন্য শাকিলাকে একটা মোটা আমগাছের লগে বাইন্ধা ১০ঘা লাগানো হইলো।
শাকিলার মতো কলঙ্কিনি মাইয়া জন্ম দেবার অপরাধে আমার শ্বশুরকে মাথা ন্যাড়া করে মাথায় আলকাতরা আর মুখে কালি লাগিয়ে সারা গ্রাম ঘুরানো হলো।
সারাজীবন যে মানুষটা সম্মানের সাথে আয়-রোজগার করে সমাজে বাস করে গেল,সেই মানুষটাকেই একসময় এমন অপমানের মুখোমুখি হতে হবে তা হয়তো আমার শ্বশুর স্বপ্নেও ভাবেননি।
তিনি শোকে-দুঃখে,অপমানে একদম পাথর হয়ে গেলেন সেদিন থেকেই।
যদি এইটুকুতেই ঘটনা থেমে যেতো তবুও নাহয় হতো।তারপর তো ঘটলো আরেক কাহিনি ।
নিজের ভুলের জন্য নিজের বাবাকে,পরিবারকে এতো অকথ্য ভাষার গালিগালাজ, এতো অপমান,এতো অপদস্ত হতে দেখে শাকিলা সেই গ্লানি আর নিতে পারলো না।
সেই রাতেই অয় উঠানের কোনে বড় পেঁয়ারা গাছটার সাথে গলায় ফাঁস দেয়!
যা যা নেওয়ার মতো ছিল সব নিয়ে,ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে ফজরের আযানের পরপরই আমরা সবাই বেরিয়ে আসি যার যার ঘর থেকে।কই যাব,কই থাকবো, কি খাবো কিছুই জানি না তখন।শুধু এইটুক জানতাম,এইখানে আর আমাগো জায়গা নাই।আমাগো দেশান্তরি হইতে হইবো।
সবাই যার যার মতো বস্তা-বোচকা লইয়া বাহির হইয়া আসলেও শাকিলা আসলো না।আমার শাশুড়ী গজগজ করতে করতে শাকিলা ঘরের দিকে চলে গেল ওরে আনতে।আর এইদিকে আমি বোতলে কইরা পানি নেওয়ার লাইগা কলপাড়ে গেলাম।
কলপাড়ের পেঁয়ারা গাছটায় শাকিলার ঝুলন্ত লাশটি সবার প্রথমে আমিই দেখি!
চলবে
