Khadija_Akter
পর্ব_০৫+০৬+০৭
বোতলে কইরা পানি নেওয়ার লাইগা কলপাড়ে যাইতেই,কলপাড়ের পেঁয়ারা গাছটায় শাকিলার ঝুলন্ত লাশটি সবার প্রথমে আমিই দেখি!
তারপর আর কি,আমার চিৎকার শুনে সবাই কলপাড়ে ছুটে আসে।একে একে সবাইই দেখতে পায় শাকিলার লাশ।
গতকাল সমাজের নির্মম উপহাস,পরিহাসের স্বীকার হয়ে আজ আবার মেয়ের মৃতদেহ দেখতে হচ্ছে!সবার মাঝে যেটুকু প্রাণ ছিল, সেটুকুও শেষ হয়ে গেল।
আমার শাশুড়ী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।শ্বশুর মশাইকে দেখে তো মনে হচ্ছিল আশেপাশে কি ঘটছে না ঘটছে তিনি তার কিছুই বুঝতে পারতাছেন না।আসলে তিনি তখন মানসিক ভাবে একদমই স্বাভাবিক ছিলেন না।
একদিকে সকাল হবার আগেই গ্রাম ছাড়তে হবে,অন্যদিকে নিজেদের একমাত্র বোনের মৃত্যুর শোক পালন করবে নাকি মৃতদেহের কি ব্যবস্থা করবো সেইটা ভাবতে ভাবতেই তোমার বড় ভাসুর আর আমিও দিশাহারা হইয়া যাই।
আর তখন আমার দেবররা তো সব ছোড ছোড,অরা আর কি করবো।
সকাল হইতেই এই ব্যাপারটা জানাজানি হইয়া যাইব যে শাকিলা আত্মহত্যা করছে।তহন তো গ্রামবাসী আরও বেশি কইরা ঝাপাইয়া পড়বো আমাগো নিন্দা করার জন্যি।পুলিশি ঝামেলাও হইয়া যাইতে পারে।
সেদিন সেই ভোর রাত্রিরে আমার শাশুড়ী কঠিন,খুব কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিছিল।
শাকিলার মৃতদেহ না দেখার ভান কইরা,রাতের আঁধারেই ঐ বাড়ি ছাইড়া চইলা আসি আমরা চিরতরে!
আম্মা আমাগো সংসারের প্রত্যেকটা মানুষের মাঝে ঘোষণা কইরা দিছিল,ঐদিনের পর থেইকা কেউ যেনো শাকিলার নামটা মুখে উচ্চারণও না করে।কেউ যদি আর শাকিলার কথা জিকির করছে তাইলে আম্মা নিজ হাতে তারে কোতল করবো।বার বার বইলা দিছে আমগো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে এই কলঙ্কের কথা কখনো না জানে।
আমরাও নিজেদের আত্মগ্লানি ভুলে থাকবার লাইগা শাকিলা নামের ইতিহাসটাকে নিজেগো মধ্যেই দাফন কইরা দিছিলাম।
এই আইজকা তুমিই প্রথম জানলা।আমাগো কোনো পোলাপাইন বা আমার অন্য কোনো জা'য়েরা কিন্তু এই ব্যাপারে এখনো কিছুই জানে না।
এই যে এই ভিটামাটি যেইটাতে এহন আমরা আছি?এইটা ছিল আমাগো শাশুড়ীর দূর সম্পর্কের একটা মামার পৈতৃক সম্পত্তি।এইখানেই আমাগো শাশুড়ী মা তার ৫ ছেলে,বউ আর স্বামীকে নিয়া উঠছিল ২১ বছর আগে।
সেইসময় আম্মার অই মামা আছিলেন শয্যাশায়ী। তাকে দেখাশোনা করার জন্য তহন কেউই ছিলো না।উনার মা মরা বড়লোক ছেলেপিলেরা সব বিলেতে চইলা গেছিল আধমরা বাপটাকে রাইখা।
আমাগো তহন দরকার আছিল একটা আশ্রয় আর সেই নানার তহন দরকার আছিল সেবা করার মানুষ, কথা কওয়ার জন্যি মানুষ।তাই এই বাড়িত্তেই উইঠা যাই।
৩/৪ বছর রোগেশোকে ভুগে সেই নানা মারা যান।আর যাওয়ার আগে তার সহায় সম্পত্তি পোলাগো নামে না কইরা,আমার শাশুড়ীর নামে দিয়া যান।
নানার বড়লোক বিলেতি পোলারাও আর এইটা নিয়া ক্যাচাল করে নাই কখনো।বৃদ্ধকালে বাপের দায়ভার এড়াইতে পারছিল ঐটাই ঢেঢ় আছিল তাদের কাছে।
নানাশ্বশুর মইরা যাওয়া কয়েকদিন পরেই আমার শ্বশুরও মইরা যায়।
তয় একটা কথা জানো রাকা,শ্বশুর মইরা যাওয়াতে কিন্তু আমরা সবাই খুশিই হইছিলাম।
তুমি কি কখনো শুনছো কোন স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যু কামনা করে?আমার শাশুড়ী কিন্তু এইটাই করছিল।প্রতি ওয়াক্ত নামাজ শেষে তিনি আল্লাহর কাছে চাইতেন যেন আল্লাহ তার স্বামীকে এই দুনিয়া থেকে মুক্তি দেন।
কারণ মানুষটার কষ্ট চোখে দেখবার মতোন ছিল না।
শাকিলার সেই ঘটনা আব্বার মস্তিষ্কে যেই প্রভাব ফেলাইছিল,সেইটা থেইকা তিনি আর বার হইতে পারেন নাই এই জীবনে।দিনদিন তার অবস্থা অনেক খারাপ হইতাছিল।ঠিক মতো খাইতেন না,গোসল করতেন না।শরীরে নানান রকম রোগ বাসা বাঁধতাছিল।
মাঝেমাঝে নিশুত রাইতে শাকিলা শাকিলা করতে করতে ঘর থেইকা বাহির হইয়া যাইতেন।
জীবনের শেষ সময়গুলাতে উনারে তো শিকল দিয়া বাইন্ধা ঘরে বন্দী কইরা রাখতে হইছিল।সবাই বুঝছিলেন,একমাত্র মৃত্যুই আব্বাকে দুনিয়ার এই আজাব থেইকা মুক্তি দিবার পারবো।
আহ্ রে জীবন!
সেই যে সে থেইকা আমাগো শাশুড়ী একটু একটু, একটু একটু কইরা এই সংসারটা গইড়া তুলছে।অহন আমরা এই এলাকার সবচেয়ে অবস্থাসম্পন্ন কৃষক ঘরের বউ।
আমার শাশুড়ী বেশ শক্ত মনের মানুষ হইলেও,শাকিলার ব্যাপারটা শাশুড়ী আম্মাকেও মানুসিক রোগী বানাইয়া দিছে এহন।
উনি মনে করেন কন্যা সন্তান মানেই পাপ,কলঙ্ক।
উনি যেই পাপের বোঝা মাথা নিয়া ঘুরতাছে,উনার সরল সোজা স্বামী যেই পাপের বোঝা সইতে না পাইরা পাগল হইয়া এক সময় মারা গেল,উনি চান না উনার কোনো পোলার লগে বা পোলার বউয়ের লগে এই ঘটনা কখনো ঘটুক।
তাই উনি আমাদের মেয়ে বাচ্চা নিবার দেয় না আমি জানি এইটা ঠিক না।
কিন্তু সব কিছু তো আমার চোখের সামনেই ঘটছে রে রাকা,তাই চাইলেও শাশুড়ীর লগে কড়া কইরা কোনো কথা কইবার পারি না।
প্রায় প্রায় রাত্তিরে আমি আম্মার ঘর থেইকা কান্নার আওয়াজ পাই। হয়তো শাকিলার কথা মনে কইরাই কান্দে নয়তো তার মৃত স্বামীর কথা।
অপরাধবোধ আমারও কম না রাকা।শাকিলার সেই মৃতদেহ অমনি করে রেখে আসা,কোনো ব্যবস্থা করতে না পারা,সেই লাশটা শিয়ালে নিল নাকি কুত্তায়,শকুনে খাইলো সেই খবর না রাখার গ্লানি আমাদের সংসারের প্রত্যেকটি মানুষের বিবেককে কুঁইড়া কুঁইড়া খায় এখনো।কিন্তু আমরা তো নিরুপায় ছিলাম রে রাকা........!"
যতটা সম্ভব পুরো কাহিনী বলে ভাবী হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।আমার চোখ দিয়েও টপটপ করে পানি পড়ছিল।
খুবই মর্মান্তিক ঘটনা।আমার শাশুড়ী তাহলে কতটা কষ্ট তার বুকে ধামাচাপা দিয়ে আছেন!অথচ কাউকে একটুও বুঝতে দেননি।
----------------------
গভীর রাত,
শুয়ে আছি কিন্তু চোখে একফোঁটাও ঘুম নেই।শাকিলা আপার কথাই বারবার মনে পড়ছিল।কতই বা বয়স ছিল তখন!না বুঝে করে ফেলা একটা ভুলের কারনে না জানি সমাজের কতটা অপমান তাকে সহ্য করতে হয়েছে!বাবা-মায়ের আদরের দুলালীয়া না জানি মনে কত্ত অভিমান নিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে!
আচ্ছা সমাজ শুধু মেয়েদের দোষই কেন দেখে!সমাজ কি পারলো না সেই ছেলেটিকেও খুঁজে এনে শাস্তি দিতে?সেও তো সমান অপরাধীই ছিল।তাহলে শাস্তি শুধু মেয়ে পাবে কেন?কারন সে 'মেয়ে' বলেই?
কিংবা সমাজ তো এই সমস্যার অন্য সমাধানও করতে পারতো।ছেলেটিকে খুঁজে এনে বিয়েও দিয়ে দিতে পারতো তাদের।তাহলে তো ঝরে যেত না দু'টি প্রাণ।
আহ্,কি কঠিন ছিল তখন সমাজব্যবস্থা!
তখনকার সমাজের কথাই বা বলছি কি,এখনকার সমাজের মানুষের ধ্যানধারণাই কি খুব বেশি পাল্টেছে?
এখনকার সমাজ ব্যবস্থা তো আরও খারাপ। বিপদে পড়লে মানুষকে ধিক্কার দিতে জানে,অপমান লাঞ্চনা করতে জানে এই সমাজ;আবার সেই মানুষটিই যখন তাদের দেওয়া অপবাদের বোঝা নিতে না পেরে আত্মহত্যা করে বসে।তখন ঠিক এই সমাজই আবার সেই মৃত মানুষটির জন্য সহানুভূতি,সহমর্মিতা দেখাতে আসে।বাহ্!
তবে একটা ব্যাপার তো পরিষ্কার হয়ে গেলাম,আমার শাশুড়ী ঠিক কি কারণে মেয়ে সন্তান চান না।
আমি ভাবলাম আমি যদি উনাকে ভালো করে বুঝাতে পারি যে, একজন খারাপ হলেই যে সবাই খারাপ হবে এমন তো কথা নাই।
ভালো করে শিক্ষা দিলে,চোখে চোখে রাখলে,ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা তৈরি করে দিলে নিশ্চয়ই সব মেয়েই শাকিলার মতো ভুল করবে না।
কিন্তু তা না করে মেয়ে জন্ম দেওয়াই যদি বন্ধ করে দেন এটা কেমন হলো!উনি যেটা করছেন সেটা তো আসলে ভুল,অন্যায়,এটা উচিত না।শাশুড়ী নিশ্চয়ই আমার কথা মানবেন।
আমার অবুঝ মনে আর তর সইলো না।একটুও দেরী না করে তখনই ঘুমন্ত রাশেলের পাশ ঘেষে চুপিসারে নেমে চলে গেলাম শাশুড়ীর ঘরের দিকে।
দুইবার টোকা পড়তেই শাশুড়ী দরজা খুলে দিলেন;হয়তো উনি জেগেই ছিলেন।আমাকে দেখে উনি কিছুটা অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন,মুখে কিছু বললেন না।
আমি ঘরে ঢুকেই কোনোরকম ভনিতা না করে নরম গলায় আম্মাকে বুঝাতে শুরু করে দিলাম,
--দেখেন আম্মা,মেয়ে সন্তান কিন্তু অভিশাপ না কোনোভাবেই।কন্যা সন্তান আল্লাহর নেয়ামত।আল্লাহ যদি নিজে আমাদের এই নেয়ামত দিতে চান আর আমরা যদি নিতে অস্বীকার করি সেটা কত বড় পাপ হবে বলেন তো।আম্মা দূর্ঘটনা তো ঘটেই যায় কোনো না কোনোভাবে।এখন আমরা যদি একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে...
কথার মাঝপথে আমাকে থামিয়ে দিয়ে শাশুড়ী গলায় বেশ বিরক্তি নিয়ে বললেন,
--এতো রাত্তিরে তুমি আইছো আমারে ওয়াজ শুনাইতে?তুমি কইতে কি চাও, সেইডা সোজাসুজি কইয়া বিদেয় হও এহন বউমা।আমি ঘুমামু।
আমি বেশ কাতর গলায় ফস করে বলে বসলাম,
--আম্মা আমি শাকিলা আপার ব্যাপারে সব জানি।কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে সবাই যে শাকিলা আপার মতো...
--কিহ্,কি কইলা তুমি?শাকিলা?শাকিলার ব্যাপারে তুমি জানো?কি জানো হা, কি জানো?কার এত্তো সাহস আমার বাড়িত্তে থাইক্কা আমার বংশের কলঙ্ক ছড়ায়।আজ আমি দেইখা ছাড়মু।এই মাইয়া এই,কার কাছ থেইকা শুনছো এইসব কথা কও,এক্ষুনি নাম কও....।
এতো রাতে শাশুড়ীর এমন হাঁকডাকে পাশের ঘরে থাকা বড় ভাসুর ও বড় জা দৌঁড়ে এলেন।রাশেলও ঘুম ভেঙে দৌঁড়ে চলে এলো মা'র কাছে।
মেঝো ভাসুর হয়তো বাহিরে বেরিয়েছিল কোনো কারণে, মায়ের ঘরে আলো দেখে আবার সোরগোল শুনে সেও দ্রুত চলে আসলো এই ঘরে।
সবাই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে এখানে ঘটছেটা কি!
রাগের চোটে আমার শাশুড়ীর মুখ দিয়ে কথার সাথে সাথে ফেনাও বেরিয়ে আসছে,যার কারণে তিনি এক নিঃশ্বাসে কিসব বলে যাচ্ছেন কোনো কথাই বুঝা যাচ্ছে না।
তবে কোনো না কোনো কান্ড ঘটিয়ে আমিই যে শাশুড়ীকে রাগিয়ে দিয়েছি এটা এই ঘরে সদ্য আসা ৪টি প্রাণীই বেশ বুঝতে পারছিল।
তারা একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে, আমার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে আবার মা'র দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছেন তাদের মা এক নাগাড়ে কি বলে যাচ্ছেন।
এদিকে আমি ভয়ে ঘরের এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছি।শাশুড়ীর রাগ আমি নিত্যদিনই দেখি, এটা কোনো ব্যাপার না।কিন্তু আমার জীবনে এই প্রথমবারই শাশুড়ীকে এতো পরিমান রাগতে দেখছি আমি।
যদিও বড় জা আমাকে প্রথমেই নিষেধ করে দিয়েছিল,শাকিলা আপার ব্যাপারে কারো সাথে কোনো কথা না বলতে।
কিন্তু আমি ভেবেছিলাম,আমি যদি শাশুড়ীকে ঠিকভাবে বুঝাতে পারি তাহলে কাজ হয়ে যাবে।কিন্তু আমার চিন্তা ভাবনার হিতে বিপরীত করে উনি যে এভাবে রেগে যাবে একদম বুঝতে পারিনি।আসলে আমি হয়তো একটু বেশিই আবেগপ্রবণ হয়ে গেছিলাম।
এতোক্ষণে আমার শাশুড়ী কিছুটা স্পষ্টভাবে কথা বলতে সক্ষম হলেন।বড় বউ আর ছেলেদের উদ্দেশ্য করে এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছেন,
--ক ক,তোরা কে শাকিলার সম্পর্কে এই পাকনা মাইয়াডারে কইছোস।ক কার এত্তো সাহস,কে আমার মুখে কালি মাখবার চাস।এক্ষুনি ক...
শাশুড়ীর মুখ থেকে শাকিলা আপার কথা শোনামাত্র দেখলাম আমার স্বামী,জা ও ২ ভাসুর সবাই একদম পাথরের মতো জমে গেলেন।তাদের মুখ শুকিয়ে গিয়ে চোয়াল ঝুলে পড়লো।
তারমানে আমি ছাড়া এখানকার প্রত্যেকেই শাকিলা আপার কথা উঠলে মায়ের এই ভয়াবহতার কথা জানেন!
কি ভুলটাই না আমি করে ফেলেছি,শাশুড়ীর সাথে শাকিলা আপার ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে এসে।আমার প্রচুর কান্না আসতে লাগলো।
এবার শাশুড়ী আমার দিকে ফিরে বললেন,
--অরা তো কইবো না জানি।এই মাইয়া তুই ক,কে তোর কানে এইসব দিছে।না কইলে এক্ষুনি তো পেডে লাত্থি মাইরা তোর মাইয়া পয়দা করার খায়েশ মিটাই দিব।
এবার আমি দুহাতে পেট ঢেকে সত্যি সত্যি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম।শাশুড়ী যেভাবে ধরেছেন,আমার মুখ থেকে নাম বের না করে ছাড়বেন না।আর নাম না বললে আমার পেটের বাচ্চাটার ক্ষতি করতেও উনি দ্বিধাবোধ করবেন বলে আমার মনে হচ্ছে না।
আমি কাঁদতে কাঁদতেই মুখ তুলে বড় জা'য়ের দিকে তাকালাম।বেচারীর অবস্থা তো আমার চেয়েও খারাপ।দেখে মনে হচ্ছে উনার নামটা নেওয়ার সাথে সাথেই উনি মূর্ছা যাবেন।চোখের ইশারায় উনি উনার নাম না বলার জন্য মিনতি করে যাচ্ছেন আমার কাছে বারবার।
এদিকে শাশুড়ী বারবার তাড়া দিচ্ছেন,কে আমার কাছে শাকিলা আপার ব্যাপারে বলছে নাম বলার জন্য।
আমি চোখটা বন্ধ করে নিয়ে এক মুহূর্ত ভাবলাম।তারপর মুখটা শক্ত করে একজনের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলাম।
শিকারের পরে খাওয়ার লোভে হিংস্র প্রাণীর চোখ যেভাবে চকচক করে উঠে, প্রশ্নের উত্তর পেয়ে আমার শাশুড়ীর চোখও ক্রোধে চকচক করে উঠলো।
তিনি এক লাফে ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে রাখা লাকড়িগুলোর থেকে একটা শক্তপোক্ত কাঠের চ্যালা নিয়ে আসলেন।
কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই রাশেলের উদলা পিঠে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিলেন।
আমি সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে মাথা চেপে ধরে চিৎকার দিয়ে উঠি।
শাশুড়ী রাশেলের পিঠে আরেক ঘা বসাতে যাবেন,তখনি আমার ভাসুরেরা মাকে আটকায়,একজন হাত থেকে লাঠিটা নিয়ে বাহিরে ছুড়ে ফেলে দেয়।
রাশেল মূর্তির ন্যায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে।সেই দৃষ্টিতে কি ছিল! বিস্ময়, ভয়,ক্রোধ,ঘৃণা নাকি বেদনার নীল ছায়া তা আমি বুঝতে ব্যর্থ হলাম।
কঠিন এই আঘাতের পরেও তার মুখে বরাবরের মতো কোনো প্রকার অভিব্যক্তি নেই।
হ্যাঁ জা'কে বাঁচাতে গিয়ে আমি আমার স্বামীর দিকেই আঙুল তুলে দিয়েছিলাম।
আবেগের বশে শাশুড়ীকে বুঝাতে আসা আমার ভুলের ফলভোগ আমার স্বামীই করলো।
কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে রাশেল হঠাৎ মাথা নত করে বাহিরে চলে গেল।ও যখন পিছন ফিরে যাচ্ছিল,লক্ষ্য করলাম ওর পিঠ বেয়ে কেটে যাওয়া তাজা ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছে।দেখে আমার গা টা শিউরে উঠলো।
অমসৃন কাঠের লাকড়ি হওয়ায়,সেটার আঘাতে রাশেলের পিঠের মাঝামাঝি কেটে গিয়ে একদম ছেড়াবেড়া হয়ে গেছে!
এদিকে আমার জা আমাকে ধরে আমার ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন।
শাশুড়ীকে আমার বড় ২ভাসুর মিলে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।
যেতে যেতে উনার গজরানো এখনো বেশ শুনতে পাচ্ছি আমি,
"সবচেয়ে আদর সোহাগ দিয়া আমি তোরেই পালছিলাম,তোরে লেখাপড়া শিখাইয়া শিক্ষিত করছি আমি এই দিন দেখার লাইগা!নিজে নিজে বিয়া কইরা লইয়া আইছোস,মাইনা নিছি।এহন বউয়ের কথায় চইলা তুই মা'র আর নিজের মরা বইনের বদনাম করস বউয়ের কাছে!এত্তো সাহস তোর,বংশের কলঙ্কের কথা জনে জনে বইলা বেড়াস!অরে আমি ভালা ভাবছিলাম,এহন দেহি এই ছোড পোলাডাই সবচেয়ে খারাপ হইছে,মায়ের আদেশ অমান্য করে........"
সারারাত কেটে গেল রাশেল আর ঘরে ফিরলো না।
চোখ বন্ধ করতেই রাশেলের কাটা পিঠটা চোখের সামনে ভেসে আসছে শুধু।আমার কলিজাটা পুড়ে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে।
রাশেল ঘরে না আসাতে একদিক থেকে ভালোই হয়েছে,ওর সামনাসামনি হতে হয়নি আমাকে।
নিজের কাছেই নিজেকে এতো ছোট লাগছে যে,সকালে ওর সামনে আমি কোন মুখে দাঁড়াবো আর কি বলবো সেটা চিন্তা করতে করতেই রাতটা নির্ঘুম কাটিয়ে দিলাম।
মাঝেমাঝে সবচেয়ে কাছের মানুষটার সামনা করাটাই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর মধ্যে একটি হয়ে দাঁড়ায়!
------------------
সকালে দরজা খুলতেই উঠানে একটা দৃশ্য চোখে পড়তেই আমার মনের মেঘ অনেকটাই কেটে গেল।
মিষ্টি রোদে গা এলিয়ে রাশেল একটা পিঁড়িতে বসে আছে,আমার শাশুড়ি ওর পিঠে হলুদ আর কি কি লাগিয়ে দিচ্ছেন আর একটু পর পর আঁচলে নিজের চোখ মুছে চলছেন।
সারাটা দিন চলে গেল,রাশেলের সাথে কথা হলো না।ওর সামনাসামনি হইনি যে তা না।কিন্তু ওকে দেখলেই আমার ভিতরটা কেমন মিহিয়ে যাচ্ছিল।আর রাশেলও নিজ থেকে আমার সাথে কথা বলার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করলো না।
সন্ধ্যায় বাজার থেকে ঘরে ফিরতেই আমি আর থাকতে পারলাম না,রাশেলের হাতটা খপ করে ধরে বললাম,
--প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও।আমি ভয় পেয়ে তোমার নামটা বলে ফেলেছি।আমার জন্যই তো তুমি ঐভাবে মার খেলে।
রাশেল ওর হাতের উপর থেকে আমার হাতটা সরিয়ে নিয়ে অত্যাধিক শীতল কন্ঠে বললো,
--রাকা,আমার এটাতে কোনো কষ্ট নেই যে আমি আমার মায়ের হাতে মার খেয়েছি।আমার কষ্ট এটাই,তুমি শাকিলা আপার কথা তুলে আমার মাকে কষ্ট দিয়েছো।
তোমাকে আমি বলেছিলাম তুমি এই নামটা মুখে নিবে না,কিন্তু তুমি কি করলে?তুমি ঠিক আমার মায়ের সামনে গিয়েই শাকিলা আপার কথা তুললে!
--আমি,আমি না বুঝতে পারিনি ঠিক।আমি তো.....
--শাট আপ রাকা।জাস্ট শাট-আপ!
তোমার কোনো কৈফিয়ত আমি শুনতে চাই না।আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি রাতের ব্যাপারে?
বলিনি তো?আমার মাথা গরম হলে তুমি আমার কে সেটাও ভুলে যাব।তাই ভালো হয় তুমিও চুপ থাকো
রাশেল তার নিজের রাগ আর ধরে রাখতে না পেরে চেচিয়ে উঠলো আমার উপর।তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি চুপচাপ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।সত্যি বলতে রাশেলের মা আমার সাথে যেমনি করুক না কেন,রাশেল অত্যন্ত আমার সাথে এই গলায় আগে কখনো কথা বলেনি।কখনো খারাপ ব্যবহারও করেনি। লজ্জায় আমার ইচ্ছে করছে মাটির নিচে ঢুকে যাই।
রাতে রাশেল অনেক রাত করেই ঘরে আসলো।ঘরের লাইট জ্বালালো না।অন্ধকারেই হাতড়ে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বিছানা করে শুয়ে পড়লো।
আমি জেগে থেকেও ঘুমের ভান করে খাটের উপরে পড়ে রইলাম।
তখনো জানতাম না পরের দিন আমার কপালে কি অপেক্ষা করছে।
--------------------
পরদিন সকাল থেকে দুপুর অব্দিও রাশেলের সাথে আমার কোনো কথা হলো না।প্রিয় মানুষটির সাথে একই ঘরে থাকছি,খাচ্ছি,ঘুমাচ্ছি অথচ কথা বলতে পারছি না।এর চেয়ে কষ্টের হয়তো কিছুই হয়না।
কিছু করতে পারুক বা না পারুক এই একটা লোকের কাছেই আমি আমার সমস্ত অভিযোগগুলো পেশ করতাম।এই বাড়িতে আমার আপন বলতে শুধু সেই ছিল যার কাছে আমার পেটে জমে থাকা সকল কথা শেয়ার করতমা।সে নীরব হয়ে শুনতো শুধু আমার কথা,কখনো বা টুকটাক উত্তর দিত।
এখন তার সাথেও কথা বলা যাচ্ছে না।
কিন্তু আমার সামনে তো আরও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিল তখনো।
দুপরবেলায় খেতে বসে সবার সামনেই আম্মা ঘোষণা দিলেন,
--রাশেল,যত দ্রুত সম্ভব তুই এই মাইয়াকে তালাক দিবি।আমি দেইখা শুইনা ভালা ঘরের মাইয়া আনমু এবার তোর জন্যে।
মায়ের কথা শুনে রাশেল চমকে উঠে মায়ের দিকে তাকায় একবার,পরক্ষণেই আবার আমার দিকে একনজর দেখে মাথা নিচু করে ফেলে।
তারপর সে আগের মতোই নির্লিপ্ত হয়ে ভাতের থালায় ভাত নাড়াচাড়া করতে থাকে।
এদিকে শাশুড়ীর কথা শুনে আমার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে!কি বলছেন এটা আমার শাশুড়ী! শেষমেষ কিনা উনি ঘর ভাঙার কথাই চিন্তা করলেন!
#চলবে#আমার_মেয়ে
#Khadija_Akter
#পর্ব_০৬
এদিকে শাশুড়ীর কথা শুনে আমার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে!কি বলছেন এটা আমার শাশুড়ী! শেষমেষ উনি তালাকের কথা চিন্তা করলেন!
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম,
--আম্মা আপনি এটা কি বললেন?কি দোষ আমার?কি এমন করেছি যে আমাকে তালাকই দিতে হবে।
আমার শাশুড়ী মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললেন,
--ময় মুরব্বীদের কথা যেসব মেয়েছেলে শুনেনা তাদের কপালে এমনই লেখা থাকে।
এহনো সময় আছে আমার কথা মাইনা যাও।বাচ্চাটা পয়দা কইরা হাবুল্লার বউরে দিয়া দেও।তারপর সুখে স্বামী সংসার কইরো।
পরের বার যাতে পোলা হয় তার লাইগা আমি কিছু আমল শিখায় দিমু,অইগুলা করলেই হইবো।
আর যদি কথা না মানো তাইলে তুমি তোমার পথ দেহো,এই বাড়িত্তে কোনো বেদ্দপ মাইয়ার জাইগা নাই।
শাশুড়ী চুপ করতেই পাশ থেকে সেজো জা আমার হাতে শক্ত করে একটা চাপ দেয়।
তারপর কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে থাকে,"বইন আম্মার কথা মাইন্না লও,হুদাই সংসারটা খারাপ কইরো না।সারাডাজীবন তোমার পইড়া রইছে সামনে।মাইয়া মাইনষে ডাইভোর্স নিয়া বাপের বাড়িত্তে পইড়া থাকলে সমাজ সেইডা ভালো চোখে দেহে না।সময় থাকতে নিজের ভালাডা বুইজ্জা নেও।"
আমি এক মুহুর্ত চিন্তা করলাম আমার জা এর কথাগুলো,উনার কথায় যুক্তি আছে।
কিন্তু যখনই আবার আমার গর্ভে বেড়ে উঠা বাচ্চাটার কথা চিন্তা করলাম,;জন্ম দিয়েই ওকে অন্য কারো কোলে দিয়ে দিতে হবে,এটা ভাবতেই আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো কষ্টে।
নাহ্,এই রাজকন্যা পুতুলটা,যার সাথে আমি গত ৮টা মাস কল্পনায় হেসেছি,খেলেছি,কথা বলেছি তাকে ছাড়া থাকা আমার অসম্ভব।
আমি ভাতের থালাটা একটু দূরের ঠেলে দিয়ে উঠে গেলাম।
শাশুড়ীর চোখে চোখ রেখে বললাম,
--আমার বাচ্চা আমারই থাকবে।এতে যদি আপনার ছেলে আমাকে তালাক দেয় তাহলে দিক।
আমার কথা শোনা মাত্রই রাশেল ভীমরি খেল,সাথে সাথে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল।সে হয়তো ভাবতেও পারেনি আমি যে আমার সন্তানের ব্যাপারে এতোটাই অনঢ় যে সন্তানের জন্য তাকেও ছাড়তে পারবো।
শাশুড়ী তেজের সাথে বললেন,
--তইলে রেডী থাইকো,কাইলকেই তালাকের লাইগা যা যা কাগজপত্র লাগবো সব রেডি হইবো।
আমি কোনো জবাব না দিয়ে চলে আসলাম সেখান থেকে।
রাশেলও একটু পর হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে ঢুকলো।সে যে অর্ধেক খাবার ফেলে রেখেই চলে এসেছে হাত ধুয়ে সেটা বেশ বুঝতে পারলাম।
রাশেল পা ঝুলিয়ে চকির উপর বসে বসে শুধু পা নাড়াচ্ছে।
সে যখন খুব অস্থির হয়ে যায় তখনি এই কাজটা করে।ইচ্ছেমতো পা নাড়ায় কিংবা দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে রাখে।
আমি বুঝতে পারছি আমার সিদ্ধান্ত শুনে রাশেল বেশ অস্থির হয়ে গেছে কিন্তু নিজের থেকে আমার সাথে কথা বলতেও নারাজ।তাই রাশেলের পাশে বসে আগে আমিই শুরু করলাম।কন্ঠে একরাশ অভিমান নিয়ে প্রশ্ন করলাম,
--তুমি কি সত্যিই আমাকে তালাক দিবা?
রাশেলে পা নাড়ানোর গতি আরও বেড়ে গেল,তার দৃষ্টি মেঝের দিকে।একটু পর আচমকাই আমার দিকে ঘুরে তাকালো,তার চোখ ছলছল করছে।
রাশেল উঠে আমার আমার সামনে এসে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে আমার কোলে মুখ গুজেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো।
রাশেলের এহেন কান্ডে আমি একদম থতমত খেয়ে গেলাম।
তবে ওর কান্না থামানোর কোনো চেষ্টাই করলাম না আমি।মাঝে মাঝে মানুষকে কাঁদতে দিতে হয়,কাঁদলে বুকে জমে থাকা কষ্ট অনেকটা হালকা হয়।
আমি ওর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম।
একটু পর রাশেল কিছুটা শান্ত হয়ে মুখ তুলে তাকালো আমার দিকে।গায়ের রঙ ফর্সা হওয়াতে অল্প কান্নাতেই ওর চোখ নাক একদম লাল হন হন করছে।
ওর দিকে তাকিয়ে ওর জন্য আমার এতো মায়া লাগলো যে,আরেকটু কাছে এগিয়ে কিছুটা ঝুঁকে রাশেলের মাথাটা আমার বুকের সাথে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রইলাম।
আহ্,প্রিয় মানুষটার সংস্পর্শে এসে এই মুহুর্তে আমি স্বর্গীয় সুখ অনুভব করতে লাগলাম।
এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর রাশেল অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এলো।আমার দুই হাত ওর হাতের মুঠোয় নিয়ে মিনতি করে বললো,
--রাকা,প্লিজ তুমি মা'র কথাটা মেনে নাও।আমাদের মেয়ের তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। আর আমরা ওকে মেরেও ফেলছি না।
হাবুলের বউয়ের কাছে যদি তুমি দাও,তাহলে তো আমাদের চোখের সামনেই তো বড় হবে ও।
তোমার যখন ইচ্ছে তুমি ওকে দেখে আসবে।বাবুকে ভালো ভাবে লালন-পালনের জন্য,এক্সট্রা খরচাও না হয় তুমি মাকে লুকিয়ে দিয়ে আসবা হাবুলের বউয়ের হাতে।দেখবা আমাদের বাচ্চার এতটুকুও অবহেলা হবে না।
তুমি মা'র কথাটা শুধু মেনে নাও একবার রাকা।আমাদের সংসারটা বেঁচে যাবে।
রাশেলের কথা শুনতে শুনতে আমার মনটা বেশ উদাস হয়ে গেল।তবুও মুখে জোর করে হাসি টেনে বললাম,
--ধুরর তুমি এতো চিন্তা করো না,আমরা ঠিক থাকলে সব ঠিক থাকবে।আম্মা বলছে দেখেই কি ডিভোর্স করিয়ে দিবে নাকি বোকা।ঐটা তো আমাকে ভয় দেখানোর জন্য বলছে।
--রাকা,তুমি আমার মাকে চেনো না,উনি যা বলেন তাই করেন।আমার ভয়টা এখানেই রাকা,উনি কোনো আদেশ করলে আমি ফেলতে পারবো না....
রাকা প্লিজ তুমি মা'র কথাটা মেনে নাও না।
আমি এবার বেশ বিরক্তও হলাম আবার একই সাথে নিজেকে খুব অসহায়ও লাগতে লাগলো।আর কত বুঝাবো আমি এদের,আর কত!
--রাশেল,তুমি তো বাবা কিংবা তোমার মা তো দাদী তাই হয়তো এই বাচ্চার প্রতি টানটা তোমাদের মধ্যে অতটা নাই যতটা আমার মধ্যে আছে।
আমি তো মা,ওকে আমি প্রতিটা দিন প্রতিটা মুহুর্তে আমার নিজের মধ্যে অনুভব করেছি,এখনো করি।ওর তিলে তিলে বেড়ে উঠা ,ওর নড়াচড়া, ওর অস্তিত্ব আমি অনুভব করি।
আমি কি করে পারি আমার শরীরের মধ্যে বেড়ে উঠা এই ছোট্ট দেহটাকে নিজের থেকে আলাদা রাখতে বলো?
দু'চোখ ভর্তি অভিমান নিয়ে রাশেল আমার থেকে সরে গিয়ে উঠে দাঁড়ালো। দেখতে দেখতে ওর অভিমান ক্রমশ রাগে পরিণত হচ্ছে।একসময় তারস্বরে চেচিয়ে উঠলো,
--তাহলে তুমি শুনবা না?শোনবা না আমার কথা?তোমার কথাই কথা,তোমার জেদই জেদ?
তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে রাজী আছো তাইনা?
আচ্ছা,আচ্ছা ঠিক আছে তবে তাই হবে।তাই হবে...
বলতে বলতে ঘর ছেড়ে বের হয়ে যায় রাশেল।আমি রাশেলের যাওয়ার পানে চেয়ে চুপ করে বসেই রইলাম।আমার পিছুটান আমার সন্তান,রাশেলের পিছুটান রাশেলের মা।
আর এই বিপরীত পিছুটানই আমাদের আলাদা করে দিচ্ছে!
--------------------------
মনের কোণে কোথাও একটা আশা ছিল,হয়তো শাশুড়ী আমার ঘরটা ভাঙবেন না।
কিন্তু সেই আশার প্রদীপও দপ করে নিভে গেল রাতের বেলায় শুয়ে শুয়ে যখন শাশুড়ী মাকে উঠানে দাঁড়িয়ে ফোনে জোরে জোরে উকিল সাহেবের সাথে কথা বলতে শুনছিলাম।।শাশুড়ী উকিলকে কালই একবার চক্কর লাগাতে বলছে আমাদের বাড়িতে!
মেঝেতেই রাশেল শুয়ে আছে,সেও নিশ্চয়ই শুনছে মায়ের এসব কথা!কিন্তু তার কোনো প্রকার ভাবাবেগে প্রকাশ পেলো না।
আমার হাতে এখন ২টা পথ খোলা,
১.আমাকে আমার সন্তানের খাতিরে এই সংসার ত্যাগ করতে হবে।
২.আমার শাশুড়ীর কথা মেনে নিয়ে এই সংসারের মায়ায় পড়ে আমার সন্তানকে ত্যাগ করতে হবে।
আমি চাইলেই আমার সংসার বাঁচাতে পারি।কিন্তু এভাবে আর কতদিন?শাশুড়ীর এই অন্যায় আর কতকাল কে সহ্য করবে?একে একে আমার ৪জন জা'ই মুখ বুঝে সহ্য করে গেছে,আমিও কি তাই করবো?
পরের বার যে আমার গর্ভে ছেলেই আসবে এমনও তো গ্যারান্টি নেই।কেন আমি আমার শাশুড়ীর এই অন্ধ গোঁড়ামি কে প্রশয় দিব!
নাহ্,আমি হার মানবো না।যা হবার হোক,আমার মনে আরও বেশি করে জেদ চেপে বসলো....।
চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি।হঠাৎ আমার মাথায় একটা একটা চিন্তা খেলে গেল।
একটু পরেই খুশিতে মনটা ভরে উঠলো।যাক আপাততঃ আমি মনে হয় তালাকটা আটকাতে পারবো।
-----------------------
পরদিন সকাল হতেই রাশেল নাস্তা না করেই দোকানে চলে গেল।আমি বেশ বুঝতে পারি,আমার মুখোমুখি খুব একটা হতে চায়না বলেই রাশেল আজকাল বেশিরভাগ সময় দোকানেই কাটিয়ে দেয়।
এদিকে আমি উঠে স্বাভাবিক ভাবে ঘরের দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে লাগলাম।
আমার জা'য়েরা আমার দিকে একটু পরপর আড়চোখে তাকাচ্ছে আর যে যার মতো কাজ করছে।
তাদের মুখভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলাম,তারা হয়তো আশা করেনি যে মেয়ের কপালে দুইদিন পরেই তালাকনামার কাগজ ছুড়ে মারা হবে,সেই মেয়ে শোক পালন করা বাদ দিয়ে সকাল সকাল সংসারে নিত্যদিনের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে যাবে।যাইহোক,আমি এদিক সেদিক মনোযোগ না দিয়ে ভাবলেশহীনভাবে রুটি বেলে যাচ্ছিলাম।
একটু পরেই রান্নাঘরে আসলেন আমার শাশুড়ী। রান্নাঘরে আমাকে দেখে যেনো তিনিও একটু থমকে গেলেন।নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
--এই মাইয়া,তুমি এহানে কি করো?যাও ঘরে যাইয়া নিজের মালছাপানা গুছাও।একটু পরে উকিল আইবো তোমার ভাগ্যের চাক্কা বদলাইতে।
শাশুড়ীর কথা শুনে আমি হাত ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালাম।তারপর স্থির চোখে শাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে বেশ শান্ত গলায় বললাম,
--ঠিক আছে আম্মা।আমি মালছাপানা নিয়ে রেডি হচ্ছি।আপনিও নগদ বিশ লাখ নিয়ে রেডি থাকেন।
ঐ যে মোহরানার টাকা আর কি....!
--কত্ত?কত বললা তুমি ছোড বউমা!
শাশুড়ীর চোখ যেনো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
আমি আবারও রিপিট করে উনাকে টাকার অঙ্কটা শুনিয়ে দিলাম।
উনি উত্তেজিত হয়ে,কোমরে গুজা ফোনটা বের করে রাশেলকে কল দিয়ে দ্রুত বাড়িতে আসতে বললেন।
আমার শাশুড়ীর ধারণা আমি মিথ্যা বলছি,তাই নিজের ছেলের কাছ থেকেই উনি নিজ কানে শুনে নিতে চান।
আসলে আমরা যখন কোর্ট ম্যারেজ করি,তখন রাশেলই বুদ্ধি করে বিশ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে।ওর চিন্তা ছিল,যদি মা আমাদের বিয়েটা না মেনে নেন,যদি আলাদা করার কথা চিন্তাও করেন তাহলে যেনো অত্যন্ত টাকার জন্য হলেও তিনি সম্পর্কটা মেনে নেন।
আমরা বিয়ে করে আসার পর,কিছুদিন আমাদের উপর বেশ ঝড়-ঝাপটা গেলেও আমাদেরকে আলাদা করার কথা শাশুড়ী তুলেনি।তাই কাবিনের টাকার পরিমাণও তখন তুলে ধরার প্রয়োজন হয়নি।
কে জানতো রাশেলের সেই বুদ্ধিটাই আজ তিন বছর পর এসে কাজে লেগে যাবে!
বিশ লাখ টাকা দেবার মতো সামর্থ্য আমার শাশুড়ীর এখনো হয়নি,তা আমি জোর দিয়ে বলবো না।
কিন্তু এইটুকু শিউর ছিলাম,আমাকে তার ছেলের থেকে আলাদা করতে অত্যন্ত তিনি এতোগুলা টাকা কিছুতেই খরচা করবেন না।
আল্লাহর রহমতে উনার তো নাতির কোনো অভাব নাই,ত আমার একার জন্য ওদের হক উনি নষ্ট করবেন না যে সেটা জানা ছিল।
আর এতোগুলো টাকা খরচের যন্ত্রণা আমাকে সহ্য করার যন্ত্রণার চেয়ে অনেক অনেক বেশিই হবে উনার কাছে।
সব শুনে চিন্তাভাবনা করে তালাকের ব্যাপারটা তখনকার মতো মাটিচাপা দিয়ে দিলেন শাশুড়ী। উকিলকে ফোন করে আসতে নিষেধ করলেন।বললেন,"বোঝাপড়া হয়ে গেছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। "
-----------------------
আমার যেনো দুঃখের দিনগুলো শেষই হচ্ছিল না।একের পর এক অঘটন ঘটেই যাচ্ছে আমার সাথে।একটা শেষ হতেই অন্যটা শুরু,
পরদিন দুপুরবেলায় গোসল করে পুকুর থেকে আসার সময় ঘাটেই বেকাঁয়দায় পা পিছলে পড়ে গেলাম।
কোনো রকমে গাছের একটা শিকড় দুহাতে আঁকড়ে ধরে রইলাম।কোনোভাবে আমার হাতটা যদি ছুটে যায় তো নিচেই আছে শ্যাওলা মাখা চোখা চোখা ইট, পাথর, গাছের গুঁড়ি;সেগুলো উপর দিয়ে স্লিপ করতে করতে পুকুরে পড়বো!
বারবার উঠতে চেয়েও পারছিলাম না,পা ফসকে যাচ্ছিল।
আমি চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম সবাইকে।কিন্তু একটা মানুষও এলো না।
পুকুরটা ভিতর বাড়ী থেকে একটু দূরেই,কিন্তু এতো জোরে চিৎকার করে ডাকছিলাম যে শুনতে না পাওয়ারও কথা না।বিশেষ করে আমার শাশুড়ীর ঘরটা সবচেয়ে প্রথমে,উনার নিশ্চয়ই শুনতে পাওয়ার কথা আমার চিৎকার।কিন্তু আফসোস, কেউই আসলো না আমাকে বাঁচাতে।
।
এদিকে পেটের মধ্যে চাপ পড়ায় প্রচন্ড ব্যাথাও লাগছিল।গাছের শিকড় ধরে রাখতে রাখতে আমার হাত ব্যাথায় অবশ হয়ে কাঁপতে শুরু করলো।
যেকোনো সময়েই হাতটা ছুটে যেতে পারে।ভয়ে আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম,"আল্লাহ,আমার সন্তানটার যেনো কিছু না হয়!"
আর পারলাম না,একসময় হাতটা ছুটেই গেল আমার।আর সাথে সাথেই অনুভব করলাম একটা পুরুষালি হাত আমার ছুটে যাওয়া হাতটাকে তৎপরতা সাথে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে।তারপর টেনে উপরে তুলে আনলো।
আমি বুকভরে বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে তাকালাম।
#চলবে#আমার_মেয়ে
#Khadija_Akter
#পর্ব_০৭
আর পারলাম না,একসময় হাতটা ছুটে গেল। আর সাথে সাথেই একটা পুরুষালি হাত আমার ছুটে যাওয়া হাতটাকে তৎপরতা সাথে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে টেনে উপরে তুলে আনলো।আমি ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে তাকালাম।
রাশেল!রাশেল এই পথ দিয়েই দোকান থেকে বাড়িতে ফিরছিল দুপুরের ভাত খেতে।হঠাৎই আওয়াজ শুনতে পেয়ে এইদিকটায় এসে আমাকে এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি ধরে উঠায়।
চোখ খুলতেই দেখলাম,রাশেল ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে।চোখে চোখ রেখেই গলার স্বর যথেষ্ট কঠিন করে বললো,
--সাবধানে চলাফেরা করতে পারো না?কে বলেছে এই ভরদুপুরে তোমাকে এখানে আসতে?গোসল করতে পুকুরেই আসতে হবে কেন?যদি কিছু একটা হয়ে যেত....!
কোথাও লেগেছে?ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে?
আমি এতোক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছি কিছুটা।তবে এখনো হাত-পা কাঁপছে অনেকটা।রাশেল দুইহাত দিয়ে শক্ত করে আমার বাহু ধরে রেখেছে।আমি ওর হাত ছাড়াতে চেষ্টা করতেই ও আরও শক্ত করে চাপ দিয়ে ধরলো।
--উফফ,ছাড়ো তো।
আর আমি ঠিক আছি এখন কিন্তু তুমি আরেকটু দেরী করে এলেই কি যে হতো......!
তবে আমার বা আমার বাচ্চার কিছু হলে তাতে তোমার কি?তুমি তো আরও খুশি।তুমি তো আমাকে ডিভোর্স দিয়ে নতুন বউ ঘরে আনার জন্য তৈরি।
--চুপ,একদম চুপ।
রাশেল আমাকে আচমকা কোলে তোলে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো।
--আরেহ্ আরে করছো কি!নামাও রাশেল,সবাই দেখবে তো।
রাশেলের মধ্যে কোনোরকম ভাবান্তর দেখা গেল না।
আমাকে কোলে নিয়েই ঢুকে গেল ভিতর বাড়িতে....
আমার শাশুড়ী উঠানে দাঁড়িয়ে মুরগীকে খাবার দিচ্ছিলেন।কারো আসার শব্দে পিছন ফিরে তাকিয়েই রাশেলে কোলে আমাকে দেখে যেনো ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন।
তিনি হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি উনার আর আমার সম্পর্কের এই টানাপোড়েন এর মাঝে উনার ছেলে উনারই সামনে আমার প্রতি এমন দরদ দেখাচ্ছে।
তবে মনের ভাব মুখে প্রকাশ করলেন না তিনি।কিছুটা চিন্তিত হওয়ার ভাণ করে প্রশ্ন করলেন,
--কিরে,ছোড বউমার কি হইছে?
--কি আর হবে,অসাবধান থাকলে যা হয় আর কি।পড়ে গেছিল পা পিছলে..!
রাশেল আমাকে ঘরে এনে শুইয়ে দিতেই আমি ওর হাতটা ধরে বললাম,
--রাশেল,আম্মা কিন্তু উঠানেই ছিল।আমি কত করে জোরে জোরে ডেকেছি কিন্তু একজনও আসলো না।আম্মার তো শোনার কথা ছিল...
--বলতে কি চাও তুমি,সোজা বললেই তো পারো?
তুমি বলতে চাইছো,তোমার ডাক শুনেও মা যায়নি তোমাকে ধরতে?এটাই বলতে চাও?
--ঠিক এরকম বুঝাতে চাইছি না রাশেল।কিন্তু...
--তো কিরকম?শুনো,আমার মা'র আর তোমার সম্পর্ক প্রথম থেকেই ভালো না তা আমি জানি।কিন্তু তাই বলে,যখন যা খুশি নিজের মনগড়া কথা বানায় বলতে হবে না।
তুমি যেমন বেকায়দায় পড়তে যাচ্ছিলে,ঐভাবে পড়লে তোমার বাচ্চা তো কি তোমার জীবনও রিস্কে পড়ে যেত।আর তুমি বলতে চাইছো মা সব দেখেও ইচ্ছে করেই তোমাকে বাঁচাতে আসেনি?
আমার মাকে ভালো না লাগলে তুমি দূরে থাকো,কিন্তু প্লিজ উল্টাপাল্টা বলে আমার কান ভারী করতে এসো না।এতে তোমার প্রতি আমার যে সম্মানবোধ আছে,ঐটাও চলে যাবে।
রাশেল দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
ধুর আমারই উচিত হয়নি এইসময় এই কথা বলা।একে তো ও মায়ের প্রতি অনেক দূর্বল আবার হচ্ছে মাত্রই বাহিরে থেকে এসেছে।
ধ্যাৎ দিলাম তো রাগিয়ে....।
রাশেল ভাত না খেয়েই চলে গেল আবার দোকানে।রাশেল চলে যেতেই বড় জা তড়িঘড়ি করে আমার ঘরে ঢুকলেন। এসে জিজ্ঞেস করলেন,
--কি হয়েছে?রাশেল গলা শুনলাম মনে হলো?না খেয়েই চলে গেল নাকি?
আমি বড় জা'কে খুলে বললাম সমস্ত ঘটনা।
বড় জা ও বললো,"কাজটা তুমি ঠিক করো নাই রাকা।আসতে না আসতেই নালিশ কইরা ফেলেছো।"
বড় জা আমার ঘর থেকে যাওয়ার আগে বেশ কয়েকবার করে জিজ্ঞেস করলেন,"আমি ঠিক আছি কিনা।"
উনার মুখে কেমন একটা অপরাধী অপরাধী ভাব দেখতে পেলাম আমি।কারণ বুঝলাম না কিছুই,কিন্তু নিশ্চিত করে দিলাম যে আল্লাহর রহমতে ঠিকই আছি।
রাশেল সাধারণত এতো দেরী করে না কখনো,কিন্তু আজ রাতে ফিরতে অনেক সময় লাগাচ্ছে কেন বুঝলাম না।আমি ভেবে রেখেছি,রাশেল আসলে যে করেই হোক ওর মনের ক্ষোভ দূর করবো।যা হওয়ার তো হইছেই,মনে যত রাগ থাকবে সম্পর্কে তত দূরত্ব সৃষ্টি হবে।
অনেক রাত পর্যন্ত রাশেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি খেয়াল নেই।
----------------------------
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি রাশেল নতুন প্যান্ট শার্ট পরে কোথাও যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে।
আমি আশ্চর্য হয়ে ঘুম জড়ানো কন্ঠে প্রশ্ন করলাম,
--কোথাও যাবে নাকি?
রাশেল আমার দিকে না তাকিয়েই নির্লিপ্তভাবে ছোট্ট করে জবাব দিল,
--হুম কাজ আছে।
--ওহ্,রাতে কখন এসেছিলে?অনেক রাত করে ফিরেছো নিশ্চয়ই?
--হুম কাজ ছিল।
--তুমি কি আমার উপর রেগে আছো?
--না তো।
--তাহলে আমার দিকে একবারও তাকাচ্ছো না কেন?পুরাতন হয়ে গেছি নাকি?
রাশেল কোনো জবাব দিল না।আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে, বিছানার কোণা থেকে মানিব্যাগটা পকেটে পুরে দরজার দিকে পা বাড়ালো।
সকাল সকাল মনটাই খারাপ হয়ে গেল।রাশেলও আজকাল আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে চাইছে না!আমি কি এতোই খারাপ!
আবার শুয়ে পড়লাম,একদম উঠতে ইচ্ছে করছে না।
--------------------
বিকালে আমার শাশুড়ী দেখি নতুন কাপড় পড়ে বেশ তৈরি হয়ে কোথাও যাচ্ছেন।সাথে আমার বড় জা'য়ের ছোট ছেলেটাও যাচ্ছে,ওর দুহাত ভর্তি মিষ্টির প্যাকেট ।
শাশুড়ী বাড়ির বাহিরে চলে যেতে আমি সেজো জা'কে জিজ্ঞেস করলাম,
--আম্মা,কোথায় গেল ভাবী?
সেজো জা কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল।আমার দিকে চেয়ে কেমন ইতস্তত করতে লাগলো।
--কি হলো?আম্মা কোথায় যাচ্ছে জানেন না?
--জানি তো।
--তো বলেন না কেন?
--পাশের এলাকাতেই যাইতাছে,রাশেলের বিয়ার পাকা কথা কইতে।সকালে গিয়া মাইয়া পছন্দ কইরা আসছেন।আর এখন গিয়া ডেট ফাইনাল কইরা আসবেন।
কথাগুলো ঝটপট বলে মেঝো জা দ্রুত নিজের ঘরে চলে গিয়ে যেনো পালিয়ে বাঁচলেন।
আর আমি কাঠ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানেই।আমি ভেবেছিলাম তালাক আটকে যাওয়া পর্যন্তই ঘটনার সমাপ্তি হয়তো।
কিন্তু আমার শাশুড়ী তো হার মানার পাত্রী নয়,তালাক দেওয়াতে পারেনি তাতে কি!ছেলের ২য় বিয়ে তো করাতে পারবে।
এক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি পর্যন্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই তাদের!
রাশেল কি জানে এইকথা?
হঠাৎই মনে হলো,সকালেই তো দেখলাম রাশেল বেশ তৈরি হয়েই বেরিয়ে গেল।তারমানে কি রাশেলও গিয়েছিল নিজের বিয়ের পাত্রী দেখতে!
আমি দুচোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম।কান্নাগুলো দলা পাকিয়ে গলার কাছে জড়ো হচ্ছে।হয়তো আমি টাল সামলাতে না পেরে সেখানেই পড়ে যাচ্ছিলাম।বড় জা দেখতে পেয়ে দৌঁড়ে এসে আমাকে ধরে ঘরে এনে শুইয়ে দিলেন।
আমি প্রচুর কান্না করলাম,বড় জা'কে জড়িয়ে ধরে।
তিনি আমাকে অনেকভাবে শান্ত করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু আমার কানে তখন কোনো কথাই ঢুকছিল না।
সারাটা বিকাল কান্না করে করে সন্ধ্যার দিকে একটু তন্দ্রার মতো চলে আসছিল।
শাশুড়ীর উচ্চস্বরের কথাবার্তা শুনে জেগে উঠে বসলাম।জানালাটা অল্প একটু ফাঁক করে উঠানে তাকাতেই দেখলাম,আমার শাশুড়ী পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে খুশিতে বিগলিত কন্ঠে আমার জা'য়েদের সাথে মেয়ে বাড়িতে তাদের কতটা আদর আপ্যায়ন করেছে,তা নিয়ে গল্প করছেন।
আমি জানালাটা লাগিয়ে দিলাম।
আমার আবারও চাপা কষ্টে বুক ঠেলে কান্না পেতে লাগলো।রাশেল কি করে পারলো আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতে,ছিঃ! রাশেলের প্রতি অভিমান জমতে জমতে বুকের ভিতরটা একদম ভারী হয়ে উঠলো,নিঃশ্বাস নিতেও যেনো কষ্ট হচ্ছে।
বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে কাঁদতেই আবার ঘুমিয়ে গেলাম।
খুব বেশি ঘুমিয়েছি বলে মনে হলো না।
ঠাস করে দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।
রাশেল এসেছে ঘর্মাক্ত হয়ে।শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে সে ফ্যানের নিচে এসে বসে।
একটু স্থির হয়ে আমার দিকে তাকাতেই রাশ চমকে উঠলো।
--রাকা!কি হয়েছে তোমার?এ কি অবস্থা করেছো নিজের?কি হইছে বলো?
লাল টকটকে চোখ,ফোলা নাক-মুখ,এলোমেলো চুল,উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টির এই রাকাকে আগে কখনো দেখেনি হয়তো রাশেল।রাশেল সহানুভূতি হাত বাড়িয়ে আমাকে ছুতে আসতেই আমি হিংস্র বাঘিনীর মতো ক্ষ্যাপে উঠলাম।
এক ধাক্কা দিয়ে রাশেল অনেকটা দূরে সরিয়ে দিলাম।রাশেল কোনোরকমে চেয়ারটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলালো।রাশেলের দু'চোখ ভর্তি বিস্ময়!
--রাকা এমন করছো কেন?কি হয়েছে বলবা তো?না বললে আমি কি করে বুঝবো?মা'র সাথে আবার ঝগড়া করছো নিশ্চয়ই?
--চুপ।একদম ন্যাকামি করতে আসবেন না আপনি।সকাল সকাল এমন তৈরি হয়ে কোথায় গেছিলেন হা?ভাবছেন আপনি বলবেন না,তাই আমিও জানতে পারবো না।
লজ্জা করে ন? ভালোবেসে যে মেয়েকে বিয়ে করলেন ৩ বছরেই সেই মানুষটাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে এখন নতুন মেয়ে নিয়ে আসতে?মেয়ের বয়স তো শুনছি মাত্র ১৫! বাহ্, রুচি আপনার এতো নিচে নেমে গেছে।
কিসে কমতি রেখেছিলাম আমি আপনার?দোষ শুধু একটাই, আপনার মায়ের অন্যায় আবদার মেনে নেইনি তাইতো?আপনার মায়ের সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলে তবেই আমি ভালো;নয়তো না!এতোই যদি মায়ের কথায় উঠবস করবেন তাহলে বিয়ে করলেন কেন তখন?কেন?...
হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম,আর কোনো কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে আমার।হাত-পা কাঁপছে থরথর করে রাগে।রাশেল এগিয়ে এলো আমার দিকে,
--শান্ত হও,শান্ত হও প্লিজ রাকা।আমি তোমার কথা কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।বাড়িতে কি নতুন করে কিছু হয়েছে?আমি তো কিছুই জানি না,মাত্রই ফিরলাম ঢাকা থেকে।আর সকালে তো ঢাকা যাওয়ার জন্যই তৈরি হলাম।আজ কি বার বলোতো?আজ তো দোকানের মাল আনতে গিয়েছিলাম ঢাকা।
--মিথ্যা কথা আর বলতে হবে না।সরেন,যান এখান থেকে যান।
একবিন্দুও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলো না রাশেলের কথা আমার।ধাক্কাতে ধাক্কাতে ওকে ঘর থেকে বের করে দরজায় ছিটকিনি দিয়ে দিলাম ভিতর থেকে।তারপর বসে বসে কাঁদতে লাগলাম।
হঠাৎ জানালার দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম,আমার বড় জা আমার ঘরের পূর্ব পাশের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন।আমার চোখে চোখ পড়তেই উনি সরে গেলেন।
তারমানে এতোক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বড় জা আমাদের সব কথা শুনছিলেন।
"অন্যের ঘরের ঝগড়া দেখতে বেশ ভালোই লাগে বোধহয়" চরম মেজাজ নিয়ে আমি উঠে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে, জানালা দিয়ে দেখলাম বড় ভাবী রাশেলকে উঠানে দাঁড় করিয়ে কিছু একটা বলছেন।
রাতে খেতে না যাওয়াতে আমার বড় জা আসলেন আমাকে নিতে।আমি উনার সাথেও উল্টাপাল্টা ব্যবহার করলাম।
আমার মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পেরেই হয়তো উনি আমার কোনো কথা গায়ে মাখলেন না।আমাকে জোর করে উঠিয়ে,মুখ হাত ধোয়ালেন।
তারপর খাওয়ার ঘরে নিয়ে সবার সামনে খেতে বসালেন।
রাশেলও ছিল সেখানে।চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে,আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে শুধু।
খাওয়ার সময় আমার শাশুড়ীই উঠালেন বিয়ের কথা।রাশেলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
--রাশেল তোর জন্যি মাইয়া দেইখা আসলাম আইজ।কি যে সুন্দর একদম পরীর মতোন।মাইয়ার বাপের পইসাও আছে।ঠিকানা কইলে তুই চিনতেও পারোস। ঐ যে ঐ গ্রামের জমির আলির মাইয়াটা।
রাশেল বেশ বিস্ময় নিয়ে মায়ের দিকে তাকি আছে।আমি তার চেয়েও বেশি বিস্ময় নিয়ে রাশেলকে দেখছি।
মানে কি!রাশেল কি তাহলে জানে না বিয়ের কথা!আমি যে ওকে এতোগুলো কথা বলে ফেললাম একটু আগেই.....
আমার চিন্তার মাঝপথেই রাশেল তার মাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
--কি বলছো মা?আমি বিয়ে করবো মানে?বিয়ে করবো কেন?বিয়ে কয়বার করবো।
--তোর কোনো মত আমি শুনবার চাই নাই রাশেল।তোরে কওয়ার দরকার আছিল,তাই কইলাম।বিয়া আগামী পরশুদিন।ঘরোয়া কইরাই বিয়া পড়াইয়া মাইয়া নিয়া আসমু।
--মানে কি মা?তুমি আমাকে না জানিয়েই বিয়ের ডেইট পর্যন্ত ফাইনাল করে আসছো?একবার আমাকে কিছু বলারও প্রয়োজন মনে করো নাই।বিয়ে কি ছেলে খেলা নাকি,যখন-তখন যাকে-তাকে বিয়ে করে ফেলবো।আমি তো আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি!
রাশেলের কথা শুনে আমার শাশুড়ী চিৎকার করে বললেন,
--তোরে জিগাইয়া তোর বিয়া ঠিক করা লাগবো আমার?তোর থেইকা কি আমি কম বুঝি রে?কি পাইছোস তুই এই মাইয়ার মধ্যে। তোরে কি জাদু কইরা রাখছে হা?
পছন্দ কইরা বিয়া কইরা এই মাইয়াডারে তুই আনছোস।কিন্তু এই বেদ্দপ মাইয়াডা আমার কোনো কথা শুনবার চায় না,চ্যাটাং চ্যাটাং মুখের উপরে উত্তর দিয়া দেয়।আমার সংসারের সব সুখ কাইড়া নিছে....
শাশুড়ীর মুখের কথা ছো মেরে একপ্রকার কেঁড়ে নিল রাশেল,
--তোমার সংসারের সব সুখই ও নষ্ট করে দিছে! আর তোমরা কি করছো?তোমরা কোন দিক থেকে ওরে সুখ দিছো সেটা বলবা?
৩টা বছর ধরে এই সংসারে এসে পেয়েছেটা কি এই মেয়েটা?
এই মেয়েটা যতটা পারছে,যেভাবে পারছে সবসময় তোমাদের মন জোগাতে চেষ্টা করে গেছে।বিনিময়ে কি পাইছে ও?তুমি ওরে মন থেকে গ্রহণ করে নিবা তো দূরের কথা,ওর মৃত্যু কামনা করতে পর্যন্ত তোমার বাঁধে না মা!
--এ এ বাজান,তুই এইগুলা কি কইতাছোস?তোর মাথা ঠিক আছে তো?নাকি আউলাই গেছে!আমার সাথে এমনে কথা কইবার সাহস কই পাইছোস।আর আমি কহন তোর বউয়ের মৃত্যু চাইলাম।
--কেনো, কাল যে রাকা পুকুরপাড়ে পড়ে গিয়ে চেচিয়ে তোমাদের ডাকছে,শুনতে পাওনি তুমি?শুনতে পেয়েও গেছিলা একবার ওরে সেইভ করতে?ও যদি সেখান থেকে পিছলে পড়তো ওর কি হাল হতো খুব ভালো করেই জানতা তুমি মা।
--কি কস এইগুলা?কহন ডাকলো আমারে?আমি তো শুনবার পাই নাই।
--মা সব ভালো লাগে,কিন্তু মিথ্যা কথা ভালো লাগে না।মিথ্যা কথা বলে,আমার যে সম্মানবোধটুকু তোমার জন্য আছে,ঐটা কখনো নষ্ট হতে দিও না প্লিজ।
আমি জানি তুমি রাকার ডাক শুনছো।গিয়ে একবার উঁকি দিয়ে রাকার অবস্থাটাও তুমি দেখে আসছো!তবুও তুমি নিজে তো এগিয়ে যাওনি উদ্ধার করতে,উল্টো বড় ভাবীকেও যাইতে বাঁধা দিছো!
মা,আমি তোমার কাছ থেকে এটা একদম আশা করি নাই ।
রাকা আমাকে বলছিল কাল,"রাকার ডাক তুমি শুনতে পাইছো।" কিন্তু আমি রাকাকে উল্টো ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলাম।
কারণ আমার মা'র প্রতি আমার এইটুকু বিশ্বাস ছিল,আর যাই হোক শত্রুও যদি বিপদে পড়ে তাহলেও আমার মা এগিয়ে যাবে বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করতে।আর এটা তো তোমার ছেলের বউ ছিল মা,তোমার ছেলের সন্তানের মা ছিল।
কিন্তু আজ বড় ভাবীর কাছ থেকে ওই কথাটা শুনে বুঝতে পারলাম,আমার মা আর সেই মা নাই।আমার মা কেমন যেনো পরিবর্তন হয়ে গেছে...।
রাশেলের গলা কেঁপে উঠে, সে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কান্না লুকাতে।ঘরের প্রত্যেকটি মানুষ স্তব্ধ হয়ে আছে।আমি নিজেও থ হয়ে গেছি আজ রাশেলের কথা শুনে।এর আগে কখনো দেখিনি এভাবে মুখ ফুটে কথা বলতে ওকে।
এদিকে শাশুড়ী আমার বড় জা'য়ের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছেন যেনো পারলে এখনি চিবিয়ে খান।কিছুক্ষণ নীরব থেকে উনি ক্রোধে ফেটে পড়লেন,
--ফকিন্নির জী,তুই আমার নামে আমার পোলার লগে লাগাস,তোরেও আমি দেইখা ছাড়মু।আগে ছোডটার ব্যবস্থা করি।
শাশুড়ীর আগুন ঝড়ানো দৃষ্টির সামনে আমার বড় জা ভয়ে একদম মিহিয়ে গেল।
উনি তাহলে উঠানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাশেলকে এই ব্যাপারেই বলছিলেন।
আচমকাই আমার শাশুড়ী হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।কাঁদতে কাঁদতে উঠে গিয়ে রাশেলের হাতটা নিজের মাথার উপর রেখে বললেন,
--তোরে আমার কছম দিলাম রাশেল,বিয়াটা তুই করবি।আমি কথা দিয়া ফালাইছি।আর যদি বিয়া না করোস,তাইলে আমার মরা মুখ দেখবি।
#চলবে
(গল্পটা আজকেই শেষ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু সময়ের অভাবে বাকীটা লিখতে পারলাম না। পরের পর্বে শেষ করে দিব ইনশাআল্লাহ।)
