#আমি_তোর_একটা_কিছু_হই - ৩


বিপাশা একটু উশখুশ করে বলল,

—- “বসে বসে কী করব আর? বাড়িটা দেখে আসি?”


—- “যাবি? চল?”


—- “তুমি যাবে আমার সাথে?”


—- “কেন? যাওয়া যাবে না?”


—- “না। সেটা না। আমি একাই যেতে পারব।” 


মূর্তজা একটু দ্বিধা করল। উশখুশ করে বলল,


—- ‘আজকে মেহুর সাথেই দেখা কর। তোর কী শপিংটপিং আছে। মেয়েরা তো ভালো বোঝে কেনাকাটা। মেহু আসুক। তোকে হেল্প করল। তোর সাথে কথা বলে ওরও একটু হেল্প হোক। বাড়িতে কাল গেলি?’’


বিপাশা দাঁতে আঙুল কাটল। মাথা নেড়ে বলল,


—- ‘'হুম এটাও ভালো আইডিয়া। লাগেজ গুছিয়ে রাখতে পারলে, পেপারওয়ার্কটা হয়ে গেলেই মুক্তি!’


‘'মুক্তি’’ শব্দটা বিপাশার নিজের কানেই বাজল বিশ্রী হয়ে। ও প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য প্রশ্ন করল,


—- ‘'আমাকে শাড়ি কিনে হেল্প করলে মেহনাজের কী হেল্প হবে?’’ 


মূর্তজা এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। 


বিপাশা একগাদা শাড়ি কিনল৷ বিছানার চাদর কিনল। ঘর সাজানোর জিনিস কিনল। মেহনাজ খুব আন্তরিক হয়ে বিপাশাকে সাহায্য করল কেনাকাটা করাতে। দামাদামি করে দিলো। বিপাশা হাসতে হাসতে বলল,


—- ‘'থ্যাঙ্কিউ মেহু, বারগেইনিং করাটাও একটা মেজর স্কিল। অনেকদিনের প্র‍্যাকটিস না থাকাতে আমি ভুলতেই বসেছিলাম সব। তুমি না থাকলে আজকে মারামারি লেগে যেত আমার আর দোকানীর মধ্যে!’’


—- ‘'কী যে বলো না তুমি! তুমিও ভালোই দামাদামি করতে পারো। আসলে, দেশের বাজারে কোনো কিছুর দামই আর রিজনেবল না। যার কাছ থেকে যেমন পারে তেমনি দাম রাখে।”


—- ‘'সবকিছুরই দাম বেড়েছে, এটা আমার মাথায় থাকছে না একচুয়ালি। আমার কাছে সবকিছুই পাঁচ বছর আগের অবস্থানে স্টিল হয়ে আছে!’’


—- ‘'সবকিছুই?”


বিপাশার হাতের পপসিকেলে দাঁত বসাতে বসাতে বলল,


—- “হুম! এই যে দেখো, পপসিকেলকে আগে বলতাম ললি আইসক্রিম। দাম ছিল আট টাকা। এখন এটা পনের টাকা হয়েছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে দাম বাড়বেই। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, এহ বাবা কত দাম! দেশে থাকলে এমনটা হতো না। তোমাদের মতো অভ্যাস হয়ে যেত!”


মেহনাজ হাসল বিপাশার দিকে তাকিয়ে। মনে হলো বুকের উপর থেকে পাথর নেমে গেল। ওর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্নের সহজ উত্তর দিয়েছে বিপাশা। মেহনাজ যতই খুঁচিয়ে বের করতে চাক না কেন, বিপাশার মনে কোথাও মূর্তজা নেই। 


মূর্তজা জানতে চাইল,


—- ‘'তোমাদের কি ক্ষুধা লাগে নাই! আমার পেট চোঁ চোঁ করছে!’’


বিপাশা উত্তর দিলো,


—- ‘'আর ঠিক তিনটে শাড়ি কিনব। এক দোকান থেকেই নিয়ে ফেলব। যা চোখে আটকাবে, সেটাই নিয়ে ফেলব, প্রমিজ!”


—- “লাঞ্চ করে কিনবি!”


রেস্টুরেন্টে খাবার অর্ডার করে মেহনাজ ফেসবুকে ডুব দিলো। বিপাশার আইডি খুঁজে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল।


খানিকক্ষণ অনুসন্ধান করে বিস্মিত গলায় বলল,


—- ‘'আরে, তোমার সাথে তো আমার মিউচুয়াল আছে একজন। কে এটা? মূর্তজা?’’


মূর্তজা তটস্থ হলো। মাথা নেড়ে বলল,


—- ‘'আমি বিপাশার লিস্টে নেই!’’


—- ‘’মেরাজুল ইসলাম সুপন। কে এটা? আমার লিস্টে আছে, কিন্তু পারসোনালি এই লোককে আমি চিনি না। তুমি চেনো বিপাশা?’’


বিপাশা মাথা নাড়ল,


—- ‘'দেশে আমাদের নেইবর ছিল। একই পাড়ায় বাড়ি। একটা বাড়ি উল্টোদিকে। তখন তেমন একটা কথা হয়নি কোনোদিন। পরে ফেসবুকে হাই হ্যালো করতে করতে অনেক কথা-বার্তা হয়েছে। স্টেটসে গিয়েছিল লাস্ট সামারে। আমরা দেখা করেছিলাম! ফিল গুড ধরনের ছেলে! কোয়াইট ইম্প্রেসিভ!’’


মেহনাজ কৌতুহলী হলো,


—- ‘'অনলি ইম্প্রেসিভ? অর মোর দ্যান দ্যাট?’’


বিপাশা হেসে ফেলল,


—- ‘'একোয়ান্টেড বলতে পারো! মোস্টলি ফ্রেন্ড!’’


—- ‘'ভিনদেশে গিয়ে দেখাও করেছে তোমার সাথে। তারপরও যাস্ট ফ্রেন্ড বলতে চাও? তোমার সব ছবিতে যত কাব্যিক কমেন্ট, আমি তো যাস্ট ফ্রেন্ড বলতে পারছি না। নো, নো বিপাশা এডমিট ইট!’


মূর্তজা চোখ ছোটো করে বিপাশার কাছে জানতে চাইল,


—- ‘'অনিল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তিস যখন, তোদের সাথে একই ব্যাচে সুপন পড়ত না? কী একটা ঝামেলা হয়েছিল না তখন?’


বিপাশা হাসতে হাসতে হাত নেড়ে নেড়ে বলল,


—- ‘'আমাকে লাভলেটার দিয়েছিল৷ সে অনেক আগের কথা জানো, মেহু? তখন কলেজে পড়ি। কেমিস্ট্রি কোচিং করান অনিল স্যার… 


মূর্তজা গলা খাদে নামিয়ে পরিস্কার করে বলল,


—- ‘'তুই মেহনাজ বলেই ডাক, প্লিজ। মেহু বলে শুধু আমি ডাকি ওকে! অন্য কেউ ওই নামটা নিলে আমার ভালো লাগে না!’ 


বিপাশা স্তব্ধ হয়ে গেল। মূর্তজা এভাবে মুখের উপর অপমানে বিঁধতে পারে, সেটা ও ভাবতে পারেনি। বিদেশ বিঁভুই চড়িয়ে বেড়ালেও, চামড়ার নিচের ধুকপুকানি হৃদয়টা নিতান্তই রক্তমাংসের আর আপাদমস্তক ভেতো ওটা। এই সামান্য অপমানও খুব বাজেভাবে বিঁধল ওকে। ওর চোখে জল চলে এলো। নিজেকে লুকাতে ও স্যুপের বাটির দিকে আরও খানিকটা ঝুঁকে গেল। 


বেশি আন্তরিকতা দেখাতে যাওয়াটা উচিত হয়নি। এখনকার মানুষ মানবীয় গুণাবলীকে দুর্বলতা মনে করে নেয়৷ তারপর যেমন ইচ্ছে পিষতে পছন্দ করে। 


মেহনাজও বিব্রতবোধ করল। মূর্তজার হাতে চাপ দিয়ে বুঝিয়ে দিলো সেটা। 


বিপাশাকে বলল,


—- ‘'এই বিপাশা, তুমি আবার সিরিয়াসলি নিও না যেন। তুমি তো ওকে আমার চেয়ে ভালো চিনবে। ও তো এমনই। ম্যানারলেস!’


বিপাশা হাসি টেনে নিলো মুখে, 


—- ‘'আরে, কী যে বলো না! মূর্তজা ভাই তার ওয়াইফকে আলাদা কোনো নামে আদরের নামে ডাকতেই পারে৷ ওই জায়গায় আমি থাকলেও একই রকম রিএক্ট করতাম। ওটা নিয়ে আমি ভাবছি না। আমি ভাবছিলাম, আসলেই আমার এডমিট করা উচিত৷ তোমাদের কাছেও৷ আর সুপনকেও। আই থিংক আই লাইক হিম। আমার সেটা কনফেস করা উচিত। দেশে এসেছি, ওকে বলা হয়নি। বলে ফেলি? কিন্তু কীভাবে বলব? মেহনাজ, বুদ্ধি দাও না আমাকে?”


মেহনাজও ছেলেমানুষী বুদ্ধিতে ছটফট করে উঠল,


—- ‘'কল দাও? বলো আসতে। বেশি দূর তো না। আমার মনে হচ্ছে, জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে যেখানেই থাকুক না কেন, তুমি কল দিলেই সে ছুটে আসবে!’’


বিপাশার গাল লাল হয়ে গেল,


—- ‘'কল করতে লজ্জা করছে! মেসেজ ড্রপ করি?”


—- ‘'ইস, এমন লজ্জাবতী হলে চলে নাকি? ইফ ইউ আর ইন দ্য গেম, প্লে ইট!’’


বিপাশার তবুও লজ্জা লাগল। ও গাল লাল করে মেসেঞ্জারে লিখল, “হাই, আই জাস্ট ওয়ান্টেড টু লেট ইউ নো, আই এম ইন বাংলাদেশ রাইট নাউ! ইফ ইউ ওয়ান্ট উই ক্যান মিট!”


সুপন এক সেকেন্ড দেরি করল না। মেসেজের রিপ্লাইতে লিখল, “ইউ আর মেকিং মাই হার্ট রেস! কল দিই?”


উত্তরে বিপাশাই মেসেঞ্জারে অডিও কল দিলো। 


চলবে…

আফসানা আশা 


সব পর্বের লিংক 👇

https://www.facebook.com/share/p/176ecLP7wy/


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url