#আমি_তোর_একটা_কিছু_হই - ২
মূর্তজা খাবার নিয়ে এসেছে। গরম সাদা ভাত দেখেই বিপাশার মনে হলো খিদে পেয়েছিল। এমন না ওদেশে ভাত খাওয়া হয় না। বিপাশার মা প্রতিদিনই ভাত
রাঁধেন। তবে প্রায় একদিন সারাদিন ভাত জোটেনি। প্লেনে মাটন বিরিয়ানি সার্ভ করেছিল। শাকাহারী হওয়ার প্রচেষ্টাস্বরূপ বিপাশা খায়নি সেটা।
মূর্তজা মনে রেখেছে কথাটা। বিভিন্ন ভর্তা, ডাল আর মুরগি এনেছে। খাবার বাড়তে বাড়তে বিপাশা বলল,
—- “তুমি আর খাবার এনো না। আমি হোটেলে থাকলে রুমেই খাবার আনিয়ে নেবো।”
—- “মা পাঠিয়েছে।”
—- “ওহ!”
বিপাশা আর কথা বলল না। ওর বিব্রতবোধ হচ্ছে। দেশে এসে খালামণির সাথে দেখা না করাটা খারাপ দেখাবে। ও বলল,
—- ‘'খালামণিকে বোলো, আমি একবার যাব দেখা করতে।”
একটা কাগজের ঠোঙায় বেশ কয়েকটা কাচামরিচ। সতেজ, লকলকে। দাঁতের মাথা দিয়ে টুক করে ভেঙে চিবিয়ে ফেলল ও। বলল,
—- “খালামণি কিছু ভোলেনি দেখছি!”
মূর্তজা হাসল,
—- “তোর মতো ঝালখোর আরেকটা কে কবে দেখেছে যে ভুলবে!”
—- “মরিচ খালামণি দেয়নি, তুমি কিনে এনেছ?”
মূর্তজা উত্তর দিলো না। মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওর ফোন ভাইব্রেট করছে। বিপাশাকে বলল,
—- “তুই খা। আমি ফোন এটেন্ড করি। জরুরি।”
মেহনাজ ফোন করেছিল। কল কেটে গেছে। হোটেল লবিতে এসে মূর্তজা কলব্যাক করল। মেহনাজ জানতে চাইল,
—- “সবকিছু ঠিক আছে?”
—- “আছে।”
—- “বিপাশা কোনো ঝামেলা করবে না?”
—- “না। করবে কেন? আমি তো বলেছি মেহু, আমাদের মধ্যে কোনো ইমোশনাল বন্ডিং নেই। বিপাশা একা ঘুমাতে পারে না। ওর মনে হতো ওর খাটের নিচে কেউ আছে। খুব ভয় পেত। ও কিছুতেই আমাকে অন্য রুমে যেতে দিলো না। বলল, সারা রাত জেগে কাটাবে। আমি ওকে সঙ্গ দিতে ওর সাথে লুডু খেলছিলাম। তারপরের ইনসিডেন্ট একজাক্ট আমার মনে নেই। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু রিমেম্বার! আমি আর বিপাশা ছাড়া তৃতীয় তুমি সেই রাতের কথাটা জানো। আমরা দুজনেই এডোলেসেন্সে ছিলাম। সকালে দুজনেই ভীষণ গিল্ট ফিল করছিলাম। বিয়ে না করে হাগ করা, কিস করা গুণাহ এটাই বুঝতাম। আমাদের ইন্টিমেসিটা তার চাইতেও আরেকটু বেশি কিছু ছিল। তখন অত কিছু বুঝতাম না। বিপাশার অল্প বয়স ছিল, ভাবত একটা ছেলে আর মেয়ে জড়িয়ে ধরলেই সেটা সেক্স, আর তাতে বাচ্চা পেটে এসে যায়৷ ওর ভয় আমার মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছিল। আমার বয়সে আমি নারী-পুরুষ জৈবিক সম্পর্কের পদ্ধতি ও ফলাফল জানতাম কিন্তু এক্সাক্ট ওই টাইমে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলাম। মাথা কাজ করছিল না। আর বিপাশা এমন ঘাবড়ে গিয়েছিল, বিয়ে ছাড়া আর কোনো সমাধান খুঁজে সামনে দেখছিলাম না। তাই বিয়ে করে ফেলেছিলাম। এর বাইরে কিছু না। তুমি আমার জীবনসঙ্গী হতে চলেছ। এই ফ্যাক্টগুলো তোমার জানবার অধিকার আছে, আমি লয়্যাল থাকতে চাই তোমার কাছে। তুমি এই বিষয়টাকে ড্রাগ কোরো না প্লিজ! বাসায় জানাজানি হলে আমি আর বিপাশা দুজনেই খুব লজ্জায় পড়ে যাব!”
—- “আমি কেন কাউকে বলতে যাব? তবে মনে রেখো, বিয়ে কিংবা ডিভোর্স যেটাই হোক না কেন, হয়েছে এবং হচ্ছে। এটা আমি মেনে নিচ্ছি। ইন এক্সচেঞ্জ আই ওয়ান্ট সেইম পোরশন অফ রেসপেক্ট! যাকগে, তুমি ডিস্টার্বড আছ মনে হচ্ছে। খুব দ্রুত এটা মিটে যাক। আমি একটা হাসিখুশি ওয়েডিং চাই, বুঝলেন মিস্টার?”
মূর্তজা হাসলো,
—- “থ্যাঙ্কিউ, মেহু! তোমার সাথে কথা বললে মাথাটা হালকা হয়ে যায়। নিজেকে চাপমুক্ত মনে হয়। সবসময়ই এমনই থেকো, প্লিজ!”
ফোন রাখতেই মেহনাজ আবার ফোন করল,
—- “আমার কি বিপাশার সাথে একবার দেখা করা উচিত? ওর কি কোনো কষ্ট হচ্ছে? কারো চোখের জলের বিনিময়ে সুখ কেনা যায় না!”
—- “বিপাশা কেন কষ্ট পাবে? তোমাকে তো সবই বললাম। প্রায় দশ বছর পরে কথা বলেছি আমরা। আমিই ওকে কল দিয়েছিলাম। ও তো আমাকে শুরুতে চিনতেই পারেনি। বিয়েটা অলমোস্ট ভুলে গিয়েছিল। মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথা বলাতেই দেশে ছুটে এসেছে। ও নিজেও পরিত্রাণ চায়৷ আমার সাথে খুব ন্যাচারাল ব্যবহার করেছে।”
—- “তবুও। মেয়েরা এত সহজে কিছু ভুলে যায় না। ওর এই ভুলে যাওয়াটা আমাকে আরও বেশি অপরাধী করে দিচ্ছে। প্লিজ একবার দেখা করাও?”
—- “ওকে ইয়োর হাইনেস৷ আমি ওকে বলব, ও যদি রাজি থাকে, আসবে। আমি কিন্তু জোরাজোরি করতে পারব না!”
ফোন রেখে মূর্তজার গ্লানিবোধ হতে লাগল। ও বিপাশার সাথে রাতে থাকছে এই কথাটা মেহনাজকে বলা হয়নি। চেপে যেতে হয়েছে। কী বলত ও? যেখানে অন্য যেকোনো মেয়ের সাথে এক ঘরে রাত কাটানোটা পুরুষের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ সেখানে বিপাশার সাথে ওর একটা কাগজের সম্পর্ক আছে। মেহনাজ যদি জানতে চাইত, ‘'কী প্রয়োজন?’’ মূর্তজা কী উত্তর দিতো? কী প্রয়োজন মূর্তজার?
রুমে ফিরে এসে দেখল বিপাশার খাওয়া হয়ে গেছে। ও মূর্তজাকে অফার করল,
—- ‘'চা খাবে? তুমি তো বেশ কয়েকবার চা খেতে।”
—- “খাওয়া যায়৷ চা আরও বেড়েছে। তোর মনে আছে?”
বিপাশা হাসলো,
—- “মনে থাকবে না? চায়ের জন্য অনেক জ্বালাতন করতে তুমি আমাকে। আমি পড়তাম বা ঘুমাতাম, তোমার জন্য চা করে দিতেই হতো! এইজন্য তোমাকে অসহ্য লাগত আমার। তোমার ফোনে রিং হচ্ছে। কল রিসিভ করো। রুমে বসেই কথা বলতে পারো। আমি ডিস্টার্বড হব না। আর চাইলে ব্যালকনিতে যেতে পারো। ঢাকা শহরের খুব সুন্দর একটা সিনিক ভিউ পাওয়া যাবে ওখান থেকে। এত সুন্দর হয়ে গেছে এখন। আগে পচা ছিল। এখন সুন্দর সুন্দর দোকান হয়েছে নাকি। আমি অনেকগুলো শাড়ি কিনব। বেনারসি পল্লী কি এখান থেকে খুব দূর হবে?”
বিপাশা আগের মতোই আছে। এক প্রসঙ্গে কথা শুরু করে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায় দ্রুত। কী নিয়ে কথা শুরু করেছিল সেটা আর মনে থাকে না বক্তা, শ্রোতা কারোরই!
মূর্তজা ফোন হাতে নিলো। সাইলেন্ট মুডে আছে। ডিসপ্লে লাইটের জ্বলে ওঠাটা খেয়াল করেছে বিপাশা। কল না, মেহনাজ মেসেজ করেছে। শুভরাত্রি লিখেছে। একটা পাউট করা বাচ্চার মুখের ছবি দিয়েছে সাথে।
বিপাশা বলল,
—- “বউয়ের মেসেজ?”
মূর্তজা চট করে তাকাল। টেকনিক্যালি মূর্তজার বউ শব্দটা এখনো বিপাশার সাথেই যায়।
ও বলল,
—- “তুই ঘুমিয়ে পড়, আমি কথা বলে আসি!”
—- “বাতি জ্বললে তোমার সমস্যা হবে?”
—- “কেন? তুই এখনো ভয় পাস?”
বিপাশা উত্তর করল না।
ডিসেম্বরের শেষে তাপমাত্রা একুশ বাইশ। রুম হিটার সুবিধা আছে এই কামরাতে। কিন্তু বিপাশা রুমের টেম্পারেচার আরও খানিকটা কমিয়ে দিয়ে কম্বলের তলায় চলে গেল। রুম সার্ভিস থেকে এক্সট্রা আরেকটা কম্বল আনিয়ে নিয়েছে। সেটা মূর্তজার সোফার কোণায় রাখা। ঠান্ডায় কষ্ট পাবে না ও।
বিপাশা কম্বলমোড়া দিয়ে মোবাইল স্ক্রোল করতে লাগল।
ও ভেবেছিল আজ রাতে ঘুম আসবে না ওর। একটা বিনাসম্পর্কের পুরুষ মানুষ ঘরে থাকলে কোনো মেয়ের ঘুম আসে না। কিন্তু বিপাশা এক ঘুমে রাত পার করে দিলো৷ ঘুম ভাঙল সকাল দশটায়। ও আঁতকে উঠে কম্বল ছুড়ে দিলো। মূর্তজা ভলিউম কমিয়ে টিভি দেখছে। ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া অ্যাশেজ সিরিজের রিপিট টেলিকাস্ট।
বিপাশা রেগে গিয়ে বলল,
—- আমার ঘুম ভাঙালে না কেন?
মূর্তজা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল,
—- “শুধু পানিতে চুবানোটা বাকি রেখেছি!”
—- “উকিলের চেম্বারে এখন যাওয়া যাবে?”
—- “হ্যাঁ। মানুষের তো আর কাজ নেই। সবাই অন্য কাজ ছেড়ে বসে থাকবে, তোর কবে সময় হবে, কখন তোর সময় হবে?”
—- “তাহলে?”
—- “আর কী? কাল পরশু শুক্র, শনি। আবার রবিবার ডেট নিতে হবে।”
—- “আরো তিন দিন বাড়তি এখানে থাকতে হবে?”
—- “কেন তুই কি অচেনা অজানা পরের দেশে আছিস? নিজের দেশ…!”
বিপাশা মুখ বেজার করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। মূর্তজার ভাবগতিক সুবিধার না৷ ও আসলে কী চাইছে?
বিপাশার পেটের ভেতর অনেকগুলো রঙিন প্রজাপতি গুঁতোগুঁতি করল!
সকালের খাবার খেতে খেতে মূর্তজা বলল,
—- “মেহু একবার তোর সাথে দেখা করতে চাচ্ছে। সময় বাড়ল যখন, সময় করে একবার মিট করবি? আজ দুপুরে হতে পারে!”
—- “মেহু কে?”
—- “মেহনাজকে ছোটো করে মেহু ডাকি!”
—- “ওহ! যাওয়া যায়!”
বিপাশা সম্মত হয়ে গেল।
উড়তে থাকা প্রজাপতিগুলো ফ্যাকাশে রঙ নিয়ে পটপট করে মাটিতে নেমে এলো!
চলবে…
আফসানা আশা
