#আপন_বচন (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
সেদিনের পর হ'তে নিতুর ঘরে আলাদা সম্মান। তার শাশুড়ী কোন কাজ করতে দেয় না। সব কাজ তিনি এবং জা ভাগ করে করেন। অথচ এতদিন এত নিখুঁতভাবে কাজ করার পরও খুঁত বের করতো। আজ বসিয়ে রাখছে। তবে এত আদর যত্নের মাঝে শাশুড়ী এবং জায়ের ইনিয়ে বিনিয়ে বেতনের টাকাটা তাদের হাতে তুলে দিতে বলতে ভুল হয় না। নিতুও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে,“আমাদের আপনারা ছাড়া কে আছে? বেতনের পুরো টাকাটা এই সংসারেই খরচ হবে। তাছাড়া যেখানেই পোস্টিং হোক, খুব দ্রুত আমি আমাদের গ্রামে চলে আসবো।”
এটা শুনে তারা বেশ খুশি হয়। সরকারি চাকরি৷ চারটে খানি কথা নয়। সারাজীবন নিতুকে নিজের হাতের ইশারায় নাচাতে পারলে বিলকিস বেগমের ভাগ্যই বদলে যাবে। তাছাড়া দেবরের অল্প বেতনে সংসার তেমন ভালো চলে না।
নিতুর দেবরটাও ভালো ছিলো। তবে একার টাকায় সংসার চালাতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যায়। তাছাড়া সারাদিন বউয়ের কাছে ভাবীর বদনাম শুনতে শুনতে তারও মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো, নিতু বাড়ির বোঝা। তার বোঝা। তাই নিতু তার দেবরকে খুব একটা দোষ দেয় না। এদিকে ঘরের কাজ দু'জনে ভাগ করে করতে গিয়ে হিমসিম খায় বিলকিস বেগম এবং নিতুর জা মারিয়া। এখন ক্লান্ত শরীরে জা বলে,“এত কাজ। বাবা আর পারি না।”
অথচ এই সব কাজ একা হাতে সামলাতো নিতু। দিনশেষে শুনতে হতো,“কি করো তুমি? বসে বসে খাও শুধু। এটা ছাড়া কোন কাজে লাগো আমাদের? ঐ তো দুটো বাসন ধুয়ে ভাতটা রাধো।”
এখন এটা এত কাজ হয়ে গেলো। নিতু ঘরের চাকরানি থেকে রাজরানি হয়ে গেলো। নিতু একা একা খুব হাসে। এভাবেই মাস খানেক কেটে যায়। নিতুর পোস্টিং হয়ে যায়। ঝালকাঠি জেলার মাঝে একটি প্রাইমারি স্কুলে তার চাকরি হয়। যার দূরত্ব তার শ্বশুড়বাড়ি থেকে খুব একটা বেশি নয়। এই তো দেড় ঘন্টার পথ। এটা হয়তো প্রতিদিন পাড়ি দেওয়া খুব একটা কষ্টকর নয়। সেটা ভেবে বিলকিস বেগম খুশি হয়। খুশিমনে বলে,“তুমি তবে এখান দিয়া যাওয়া আসা কইরো বউ। এখানেই থাকো। ঘরের বউ ঘরে থাইকা কাজ করবো।”
নিতু জবাবে কিছু বলে না। সে জবাবটা দেয় কাজে যোগ দেওয়ার দশদিন পর। দশদিন সে বাড়ি দিয়ে গিয়েছিলো। এবার সে ব্যাগ পত্র গুছিয়ে ফেলে। এটা দেখে বিলকিস বেগম এবং মারিয়া অবাক হয়। অবাক গলায় জানতে চায়,“কই যাও?”
“আমি স্কুলের পাশে থাকার জায়গা খুঁজে নিয়েছি। এখন থেকে সেখানেই থাকবো।”
নিতুর মুখে এই কথা শোনার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলো না। বিলকিস বেগম বলেই ফেলে,“এইখান দিয়াই তো যাওয়া যায়। তোমারে দিয়া তো ঘরের কিছুও করানো হয় না। তাইলে যাওয়া আসায় এত কষ্ট কিসের? এইটা মেলা কষ্টের?”
“না মা।
এখান দিয়ে যাওয়া বেশিও কষ্টের নয়। হ্যাঁ জার্নিতে একটু সমস্যা হয়। তবে ততটা নয়। চাইলেই মানিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু আমি মানিয়ে নিতে চাই না মা।”
“মানে?”
মারিয়া অবাক হয়ে জানতে চায়। নিতু স্বাভাবিক গলায় বলে,“আমি এখন স্বাবলম্বী তাই কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে চাই। তাছাড়া আপনারাই তো বলেন, যে মেয়ের স্বামী থাকে না তার স্বামীর ঘরে কোন অধিকার নাই। সেখানের পড়ে থাকা লজ্জার। আমি সেই লজ্জা কাটিয়ে উঠেছি। তাই নিজের পথ নিজেই বেছে নিচ্ছি। সারাজীবন তো আর অন্যের বোঝা হওয়া যায় না।”
এসব শুনে বিলকিস বেগম এবং মারিয়ার মাথায় বজ্রপাত হয় যেন। এতদিন তারা কার জন্য এতকিছুর করলো? কিসের জন্য? সব মাটি। বিলকিস বেগম যথেষ্ট ধৈর্য ধরে বলে,“সেসব তো পুরান কথা। তোমারে তো এইখানে এখন যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়। আমরা তো মেলা আদর করি। অতীতে ভুল করছি, তার জন্য মাফ চাইলাম তো। তুমিও তো মাফ কইরা দিছো। এখন এই কথা কও কেন?”
“আমি মাফ করেছি।
তবে ভুলে যাইনি মা। আমি কিছুই ভুলিনি। ভোলা সম্ভব নয়। আপনি আমাকে তাড়ানোর জন্য সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দাগ দিয়েছেন চরিত্রে। এসব ভোলা যায় না। তাছাড়া আমার রাফসান তো ফিরে আসবে না আর। তাই এখানে আমার না থাকাই ভালো। হ্যাঁ আগে আমার কোন যাওয়ার জায়গা ছিলো না। সেজন্য সব কষ্ট সহ্য করে এখানে পড়ে ছিলাম। এখন তো আমার নিজের দায়িত্ব নেওয়ার মতো সক্ষমতা রয়েছে। তো এখন….।”
নিতুকে আর কিছু বলতে না দিয়ে বিলকিস বেগম বলে,“তুই বাসা ভাড়া যাচ্ছিস নাকি লাঙের কাছে? এতদিন এই আশায় ছিলি? আমাদের সঙ্গে যদি এতই দুষমনি তবে এতদিন বইসা বইসা খাইলি কেমনে? কিভাবে পারলি? এখন আমাদের কথা শুনাইয়া দোষ দিয়া যাও। তো….।”
এবার নিতু বিলকিস বেগমকে থামিয়ে দেয়। অতঃপর বলে,“এই তো নিজের আসল রূপে চলে আসলেন মা। আপনি এটাই। এতদিন কষ্ট করে অভিনয় করলেন। আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে ভুল করিনি। আমার চাকরি কথা শুনেই লোভে পড়ে আমাকে মাথায় তুলছেন দেখেই সব বুঝছিলাম। কিন্তু কিছু বলিনি। কারণ ঐ সময়ে যে থাকার জায়গা ছিলো না। তাছাড়া ভাবলাম, এতদিন তো কম নাচান নাই আমাকে। এবার নাহয় আপনাদের অভিনয়ের ভালো রূপটার ফয়দা নেই আমি। এটা তো খুব একটা খারাপ হবে না। তাই নিলাম। দেখুন এতদিন ভালো মানুষ হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করতে কত কি না করলেন? আর আমার একটা সিদ্ধান্তে সব অভিনয় শেষ। ফিরে এলেন নিজের রূপে।”
“স্বার্থপর। বেঈমান। আমাদের খেয়ে আমাদের পড়ে আমাদের সঙ্গে বেঈমানি করছে। বেয়া….।”
মারিয়াকে থামিয়ে দিয়ে নিতু উচ্চশব্দে বলে,“বেঈমান নই। আমি তোমাদের সঙ্গে কোন বেঈমানি করিনি। যদি করেও থাকি। তবে তোমরা এটা ডিজার্ভ করো। আর হ্যাঁ আমি স্বার্থপর। আজ আমি স্বার্থপর, কারণ আমি নিজের কথা ভেবেছি। আমি আমার চারপাশে থাকা মানুষ নামক অমানুষদের কথা না ভেবে নিজের কথা ভেবেছি। বেশ করেছি।”
এবার নিতু খুব রাগান্বিত হয়ে যায়। সে একে একে তার সঙ্গে হওয়া অন্যায় তুলে ধরে। এই ঘরে রাফসানের স্ত্রী হওয়ার সুবাদে তার অধিকার থাকার পরও তার সঙ্গে কত খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে। দিনের পর দিন তার লাঙ রয়েছে, এই সেই অপবাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতি মূহুর্তে তাকে অনুভব করানো হয়েছে সে এই বাড়ির বোঝা। এই ঘরে গত কয়েক মাস ধরে সে দু'বেলা ভাত চোখের পানি ছাড়া খায়নি। যখনই খেতে বসেছে তখনই শুনতে হয়েছে,“জামাই তো খাইছে এখন অন্যের ঘরের অন্ন ধ্বংস করছে।”
শুধু তাই। সপ্তাহে সবসময় নাহলেও দুই তিনদিন মাছ রান্না হতো। মাসে একবার মাংস। অথচ নিতু সবসময় ভাত খেয়েছে ডাল বা লবন পানি দিয়ে। শাক সবজিও তাকে দেওয়া হতো না। মাঝে মাঝে দয়া হলে দিতো। এত কষ্ট সহ্য করার পরও সে বোঝা ছিলো। আর আজ যখন সে জব পেয়েছে তখন সে সবার আপন হয়ে গেছে। নিজের মানুষ হয়ে গিয়েছে। কাছের মানুষ। এটা তো নিতু মানবে না। এখন সে এসব মানবে না। তাই নিজেরটা ভাবছে। নিজেরটাই করছে। তারা যে স্বপ্ন দেখেছে, নিতু মাস শেষে পুরো বেতন তাদের দিয়ে দিবে। তাদের পরিবার স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে। সেটা হওয়ার নয়। হবে না। কারণ তারা রাফসানের বউ হিসাবে তাকে নূন্যতম সম্মান দেয়নি। শুধু তাই নয়, রাফসানের মৃ ত্যুর পর তার মালিক তাদের বেশ কিছু টাকা অবধি দিয়েছে। সেই টাকায় কেনা একটা মাছের টুকরো তার কপালে জোটেনি। অথচ সবসময় শুনতে হয়েছে সে অন্যের পয়সা খাচ্ছে। ধ্বংস করছে তাদের। তাদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত নষ্ট হচ্ছে। আরও কত কি?
নিতুর মুখে এত কথা শুনেও তাদের শিক্ষা হয় না। বিলকিস বেগম তো রেগেমেগে নিতুকে অভিশাপ দেয়। সে যদি তার রাফসানের স্মৃতি ভুলে আজ বাড়ি ছাড়ে তবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। তার কপালে সুখ সইবে না। তার ঐ চাকরির দম্ভ থাকবে না। আরও কত কি। নিতু সেসব কথায় গুরুত্ব দেয় না। সে চলে যায়। নিতু স্বার্থপর হয়ে গেছে। হ্যাঁ স্বার্থপর। সে শুধু নিজের কথা ভাবছে। তাই তো সে বের হয়ে আসে। আজ আর কারো কথা শোনে না। তবে মানবিকতার জন্য কিছু টাকা প্রতি মাসে শাশুড়ীকে পাঠাতে চাইছিলো। তার অভিশাপ শুনে সেই সিদ্ধান্ত থেকেও বেরিয়ে আসে। তারা থাকুক তাদের মতো।
_____
দুই বছর কেটে যায়। সেদিন যে নিতু বাড়ি ছাড়ে তারপর আর সে ফেরত যায়নি। কখনো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তবে খোঁজ নিতো। সে চলে আসার পর তারা তার নামে বদনাম দিয়ে দেয়। সে রাফসান থাকা অবস্থায় পরকীয়ায় জড়ায়। তার কাছে গিয়েই উঠেছে। শুধু তাই নয়। তার শাশুড়ী নাকি তাকে পরপুরুষের সঙ্গে হাতেনাতে ধরেছে। এসব শুনে নিতু হাসে। একা একা হাসে। এখন আর এসবে তার কিছু যায় আসে না। তাই যত বদনাম দেওয়ার দিক। তার কয়েক মাস পরই খবর আসে, তার শাশুড়ী এবং জা ভালো নেই। দু’জনের মাঝে তুমুল ঝগড়া হয়৷ সবসময় সব বিষয় নিয়ে। এসবে তার দেবর খুব অতিষ্ঠ। এসব শুনেও নিতু কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সে তার অতীত পিছনে ফেলে এসেছে। এখন সে বর্তমান এবং নিজেকে নিয়ে ভাবতে চায়। তার ভাইও একবার যোগাযোগ করছিলো। তার চাকরি পাওয়ার খবর একটু দেরিতে পায়। পেয়েই খোঁজ নেয়। তবে নিতু সরাসরি তার সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ বলে জানিয়ে দেয়। পরবর্তীতে আর যোগাযোগ করার সুযোগ দেয়নি। এভাবেই দুই বছর কেটে যায়। খুব ভালো কাটে নিতুর। মাঝে মাঝে রাফসানকে খুব মনে পড়তো। তার কবরটা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা খুব। কিন্তু সে গেলেই সবাই ঝামেলা করবে। তাই যাওয়া হয় না। এরই মাঝে স্কুলের বিপত্নীক গনিত স্যার তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সে প্রথমে রাজি হয় না। পুরো বছর খানেক ঘোরায়। তবুও লোকটা তার পিছু ছাড়ে না। লোকটার চোখেমুখে তার প্রতি সম্মান দেখে অবশেষে নিতু রাজি হয়ে যায়। তার মনে হয়, এখন তার এটাই ভাবা উচিত। এভাবে চলতে পারে না। একটা সুন্দর ভবিষ্যত সে পেতেই পারে। তাছাড়া রাফসান তার হৃদয়ে আছে। সারাজীবন থাকবে। তাকে ভালোবাসে সেটা প্রমাণ করতে সারাজীবন তাকে একা থাকতে হবে না। হয়তো রাফসান এটা পছন্দ করবে না। এটা ভেবে মিজানের প্রস্তাবে হ্যাঁ বলে দেয় নিতু। অতঃপর দ্বিতীয়বার সংসার গড়ে ওঠে নিতুর। সে ভালোই রয়েছে। তার ভালো থাকাটা বৃদ্ধি করতে তার সন্তানের আগমন ঘটে। পরিশেষে স্বামী সন্তান নিয়ে ভরা সংসার নিতুর। একটা সুখী সংসার।
(সমাপ্ত)
(অগোছালো হলো?)
