#অনিন্দিতা
#ফৌজিয়া_কবির
#পর্ব_০২
রাত বাজে ১০ টা অথচ আনিস সেই যে গেল আর আসলো না। খাদিজা বেগম ভেবেছিলেন আনিস হয়তো আসবে ডালিয়াকে আর ওর মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যাবে।
তার ছেলে এতোটা নিষ্ঠুর হয়ে গেল? নিজের ঔরসজাত সন্তানের চেহারা পর্যন্ত দেখলো না। অথচ এই ডালিয়াকে যখন নিয়ে এসেছিল তখন তিনি মেনে নেননি, তিনি বলেছিলেন ডালিয়াকে যেভাবে এনেছে সেভাবেই যেন ফিরিয়ে দিয়ে আসে, সেদিন আনিস খাদিজার পা ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল। ডালিয়াকে ছাড়া নাকি সে বাঁচবে না। খাদিজা বেগম সেদিন ছেলের কান্নায় গলে গিয়ে ডালিয়াকে মেনে নিয়েছিল, কিন্তু ডালিয়ার প্রতি আনিসের অগাধ ভালোবাসা, যত্ন খাদিজা বেগমের মনে হিংসার বীজ বুনে দেয়। আনিসের বাবা মারা যাওয়ার পর খাদিজা আনিসকে মানুষ করেছেন। কতো কষ্টে মানুষ করেছেন তা শুধু মাএ তিনিই জানেন, তাই এই ছেলে অন্য কাউকে বেশি ভালোবাসতে পারে এই বিষয়টা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। আনিসের যখন চাকরি হলো তখন সে দিনের বেশিরভাগ সময় অফিসেই থাকতো, যখন বাড়িতে আসতো তখন মায়ের থেকে ডালিয়ার নামে নালিশ শুনতো,
সারাদিন কাজের চাপ আর বাড়ি এসে এসব মায়ের বকবকানি আনিসের ভালো লাগতো না তাই সে ডালিয়ার উপর সব রাগ উগরাতো।
খাদিজা বেগম তখন খুশি হতেন। আনিস বাড়ি না থাকলে ডালিয়াকে দিয়ে সব কাজ করাতেন , আর আনিস বাড়ি আসলে তিনি সব কাজ করার নাটক করতো। এতে আনিস গিয়ে ডালিয়াকে বকাঝকা করতো, ডালিয়া থাকতে তার বৃদ্ধ মাকে কেন কাজ করতে হচ্ছে ।
এতো কিছুর পরও ডালিয়া শাশুড়ীকে অবমাননা করেনি।
খাদিজা এসব ভাবছিল আর একটু একটু করে অনুতাপ জন্মাচ্ছিল তার মনে। ছেলের এতোটা নিষ্ঠুর হওয়ার পিছনে তিনিই প্রত্যক্ষ দোষী। তবে খাদিজার মনে ডালিয়ার জন্য মায়া জন্মাচ্ছিল বললে ভূল হবে, তার যতো মায়া অনিন্দিতাকে ঘিরে। অনিন্দিতা তার রক্ত।
খাদিজা মনে করেন আনিস যদি নিজের বাচ্চার এই চাঁদবদন মুখখানা দেখে তাহলে তার হৃদয়ের পাথর গলে পানি হয়ে যাবে।
খাদিজা বেগমের ভাবনার মধ্যেই ডক্টর নাসিমার সাথে একজন মহিলা আসে কেবিনে, মহিলাটিকে তিনি চিনেন না।
ডালিয়া ও তার মেয়ে দুজনেই ঘুমোচ্ছে।
মহিলাটি গিয়ে ডালিয়ার পাশে বসে ওর মাথায় হাত রাখেন, ডালিয়া চোখ খুলে ও হয়তো ঘুমোয়নি চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। চোখের সামনে নিজের বড় বোনকে দেখে ডালিয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। অস্ফুটস্বরে বলে "আপা! তারপর উঠে বসতে চায়, আলিয়া ইশারায় বুঝায় উঠতে হবে না। এতোদিন পর নিজের আদরের বোনকে দেখতে পেয়ে আলিয়ারও চোখের কার্নিশে পানি জমে,বৃদ্ধা আঙুলি দিয়ে তা মুছে নেয়।
আলিয়া ডালিয়ার মেয়েকে কোলে নিলে বাচ্চাটি নরেচরে উঠে, আলিয়া ভাবে ঘুম ভাঙার কারনে এই বুজি বাচ্চাটা ঠোঁট ভেঙে কান্না করে দিবে , কিন্তু না, বাচ্চা মেয়েটি চোখ খোলে আলিয়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসি দেয়। খাদিজা বেগম বলে
" কি পাকনা মাইয়া দেখছো। একদিনের বাইচ্চা কি সুন্দর
আসি (হাসি) দেয়। "
কেবিনে উপস্থিত সবাই হাসে।
আলিয়া বলে
" চাঁদের টুকরো মেয়ে হয়েছে তোর ডালি, তোকেও ডিঙিয়ে গেছে , মাশাল্লাহ "
ডালিয়া অল্প হাসে।
খাদিজা বেগম বলেন
" আমি ওর নাম রাখছি ' অনিন্দিতা ' "
আলিয়া একটু অবাক হয়ে তাকায়।
খাদিজা হেসে বলে
" ভাবতাছো আমি অশিক্ষিত অশুদ্ধ ভাষায় কথা কই অতো সুন্দর নাম কেমনে রাখলাম?
আমি কিন্তু অশিক্ষিত না। আনিসের বাপে আছিলো মাস্টার, আমারে কি হেয় অশিক্ষিত রাখবো ? এইচএসসি পরীক্ষা দিছি আমি। শুদ্ধ ভাষাও পারি, কিন্তু নিজের মায়ের ভাষার প্রতি আমার একটা টান, তাই এই অশুদ্ধ ভাষায় এই কথা কই। "
আলিয়া হেসে বলে
" আপনি যোগ্য নামটাই রেখেছেন। সত্যি বলতে আমার মাথায়ও এমন নাম-ই ঘুরপাক খাচ্ছিল। "
খাদিজা বেগম হেসে বলে
" তুমি কি বউ এর বইন লাগো "
" জি "
" তো তুমি ওর খুঁজ পাইলা কেমনে?
আসলে তোমরা তো কেউ আর হের লগে যোগাযোগ করো না এর লাইগা কইতাছি। "
নাসিমা বলে
" আমি বলেছি। ডালিয়ার বোন আলিয়া আমার ভাইয়ের বউ, ডালিয়াকে আমি চিনি, আর তাই অপারেশনের আগে আমি টাকা চাইনি, টাকার জন্য ডালিয়াকে কষ্ট করতে দেইনি। আর হ্যাঁ অপারেশনের জন্য আমার যেই ফিস সেটা আমি নিচ্ছি না। "
খাদিজা বেগম মনে মনে একটু শান্তি পান, যাই হোক কিছু টাকা বাঁচবে।
ডালিয়ার শরীর ব্যাথা করছে এতক্ষণ আ্যনাস্তাসিয়া দেয়ার কারনে ব্যাথা করেনি।কিন্তু শরীরের ব্যাথার থেকে মনের ব্যাথাটা বেশি। পরশু ডালিয়াকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। তবে হসপিটালের বিল পরিশোধ করে। টাকার কথা মনে পরলে ডালিয়ার মুখ কালো হয়ে যায়, নিশ্চয়ই অনেক টাকা হয়েছে। আনিস বলেছে এক টাকাও গুনতে পারবে না, সত্যি তো আনিস এতো টাকা কোথায় পাবে, বিল পরিশোধ না করতে পারলে কি হবে, ভেবে পায় না ডালিয়া, ও এখন নিজেকে দোষারোপ করছে, সিজার করবে এই কথা ওরা ভাবেইনি তাহলে টাকা জমানো যেত,ডালিয়াই যদি আরেকটু সতর্ক হতো তাহলে এই অবস্থা হতো না ।
নাসিমা ডালিয়াকে পাতলা খিছুড়ি খেতে বলেছে। আলিয়া ডালিয়াকে খিছুড়ি খাইয়ে দিচ্ছে আর নাসিমা অনিন্দিতাকে কোলে নিয়ে গল্প করছে, অনিন্দিতা হা করে তাকিয়ে আছে নাসিমার মুখের দিকে, কখনো হাসি দিচ্ছে। এর আগে একদিনের বাচ্চাকে এতো হাসতে দেখেনি নাসিমা।
আলিয়া নিজের সাথে অনেক ফলমূল নিয়ে এসছে, বাচ্চার জন্য কাপড় নিয়ে এসেছে। ডালিয়ার জন্য কাপড় নিয়ে এসেছে।
খাদিজা বেগম এগুলো নির্লজ্জের মতো ঘেটে দেখছিল, উনার জন্য কিছু আছে কিনা । আলিয়া উনার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে উনি কেবলা হাসি দিয়ে বলে
" দেখতাছিলাম, তেমার পছন্দ ভালা, মন কতো বড়, এতো কিছু আনছো । "
" তেমন কিছু আনতে পারিনি। আপনি কিছু খেয়েছেন? "
আলিয়ার জিজ্ঞেস করায় খাদিজা বেগমের মনে পড়লো উনি সেই সকালে খেয়েছিল, পরে আর খাওয়া হয়নি।
খাদিজার চুপ থাকা দেখে আলিয়া বুঝতে পারে উনি খায়নি কিছু, তাই দুটো আপেল আর কয়টা আঙুর ধরিয়ে দেয় খাদিজা বেগমের হাতে। খাদিজা বেগম এগুলো ধুয়ে খেয়ে নেয়। মনে মনে ভাবে ডালিয়ার মতো ডালিয়ার বোনটাও ভালো।
রাতে আলিয়া হসপিটালেই থেকে যায়।
ভোর হলে নামাজ পরে উঠে বাহিরে একটু হাটতে বের হয়, খাদিজা বেগম নামাজ পরে নাতনি কোলে নিয়ে হাঁটছেন। একজন পুরুষ গটগট পায়ে এগিয়ে আসছে ওদের কেবিনের দিকেই, লাইটের আলোর কাছে আসতেই লোকটির চেহারা স্পষ্ট হয়, এটা আনিস,ডালিয়ার সাথে প্রেমের সম্পর্ক থাকাকালীন আলিয়া আনিসকে একবার দেখেছিল চেহারা আন্দাজ করে চিনে ফেলেছে।
আনিস আলিয়াকে উপেক্ষা করে সোজা কেবিনে ঢুকে পরে। খাদিজা বেগম আনিসকে দেখে খুশি হয়ে, অনিন্দিতাকে আনিসের কোলে দিতে যায়। আনিস হাত দিয়ে ইশারা করে বুঝায় ও কোলে নিবে না, তারপর মেয়ের মুখ দেখে কি যেন মনে করে দু'হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে
" দাও! ওকে আমার কোলে দাও "
খাদিজা খুশিখুশি মনে অনিন্দিতাকে আনিসের কোলে দেয়। আনিস বাচ্চাকাচ্চা কোনো দিনও কোলে নেয়নি তাই কিভাবে রাখতে হয় তা সে জানে না।ঘুমন্ত অবস্থায় অনিন্দিতা আনিসের কোলে গিয়েই জেগে উঠে ঠোঁট ভেঙে কান্না করে দেয়। আনিস কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
বাচ্চার কান্না শুনে ডালিয়া চোখ মেলে তাকায়। অনিন্দিতাকে আনিসের কোলে দেখে ডালিয়ার চোখ বেয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পরে।
ডালিয়াকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আনিস অনিন্দিতাকে খাদিজা বেগমের কোলে দিয়ে দেয়,তারপর গলা ঝেরে ডালিয়ার উদ্দেশ্যে বলে
"হসপিটালের বিল পরিশোধ করার জন্য টাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আজকেই তোমাকে আর তোমার মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে
যাবো। "
খাদিজা আমতা আমতা করে বলে
" ডাক্তার বলেছে আগামীকাল যেতে। "
" ডাক্তার বললেই সব শুনতে হবে? হসপিটালের একদিনের খরচ জানো তুমি? এই টাকাগুলোই কত কষ্টে ম্যানেজ করেছি। এখন আর একটাকাও ম্যানেজ করার সাধ্য নেই আমার। আমি লাখ টাকার জব করিনা সামান্য বেতনের ছোটখাটো একটা চাকরি করি। "
" অথচ ভাগিয়ে আনলে বড়লোকের আদুরে মেয়েকে। "
পিছন থেকে আলিয়া এই কথাটি বলে। আনিস পিছনে ফিরে, বলে।
" বড় লোকের মেয়ে ইচ্ছে করেই আমার সাথে এসেছে,আমি জোর করে আনিনি। "
" ইচ্ছে করে এসেছে বলেই কি ও এতো সস্তা? "
ডালিয়া বোনকে থামিয়ে দেয়।
আলিয়া জানায় হসপিটালের পেমেন্ট ও করে দিবে, ডালিয়া যেনো আগামীকালই বাড়ি ফিরে।
আনিস আলিয়ার কথার প্রতিউত্তরে জানায়
" আমি গরীব হতে পারি তবে ভিখারি নই যে কারো দান করা টাকা নিবো। "
আনিসের কথায় ডালিয়া আহত হয়। বোনের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে।
চলবে?
পরের পর্বগুলা এখানেই দেওয়া হবে।
( আপনার অনুভূতি একটা ছোট কমেন্ট করে জানিয়ে যাবেন।
ধন্যবাদ)
হ্যাপী রিডিং
