#প্রিয়_প্রতিশোধ
ঊর্মি প্রেমা( সাজিয়ানা মুনির)
৩
(কার্টেসী ছাড়া কপি নিষেধ )
বাতাসে গুন গুন। শহুরে পরিবেশ থেকে খানিক দূর, সবুজের নীড়ে, নদীর তীরে। ছায়া আবছায়ায় ঘেরা, ছোট বাংলো বাড়িটার বেড রুমে ঘনঘন নিশ্বাসের আওয়াজ ভাসছে, পিনপতন নীরবতায় সেই আওয়াজ যেন ঝুংকার তুলছে বারবার!
মিতালিকে চটাক করে বুক থেকে সরিয়ে উঠে বসল অর্ধনগ্ন ইসহাক। চোখেমুখে প্রচণ্ড বিতৃষ্ণার ছাপ। বলিষ্ঠ ধবধবে চওড়া বুকটা কাঁপছে, ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। বিছানা ছেড়ে, ইসহাকের পাশে বসল মিতালি। চোখেমুখে প্রচণ্ড তৃষ্ণা তার। কোন এক অপ্রাপ্তির যন্ত্রণায় ছটফট করছে সে। মিতালি পেছন থেকে আদুরে হাতে বাহুডোরে আবদ্ধ করতে চাইল ইসহাকে। তড়াক এক ঝারি মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো ইসহাক। ক্রোধান্বিত চোখ জোড়া হতে যেন আগুনের ফুল্কি ঝরছে, কাঠকাঠ কন্ঠে ক্রুদ্ধতার ঝাঁঝ,
' জোরাজোরি করোনা, বিরক্ত লাগছে আমার!'
মিতালি ভয়ে হাত গুটিয়ে নিলো। ইসহাকের এমন প্রত্যাখ্যানে কষ্ট পেল না। ইসহাকের এমন কঠিন ব্যবহারে অবস্তু সে। বেশ বুঝতে পারছে আজ ইসহাকের মেজাজ প্রচণ্ড গরম। বাড়াবাড়ি করতে গেলে হিতের বিপরিত কিছু ঘটতে পারে। বছর দুএক হলো ইসহাকের সাথে তার পরিচয়। খুব একটা গভীর সম্পর্ক না তাদের। মিতালি ইসহাকের বেড পার্টনার, এই যা! এমন না মিতালি দরিদ্র ঘরের মেয়ে টাকার জন্য এসব করছে, বেশ ধনী পরিবারের মেয়ে সে। দু' দুটো কম্পানি তাদের। দেখতে আহামরি না হলেও মোটামুটি সুন্দরী। শুধু একটা জিনিসেই তার দুর্বলতা, ইসহাক! ইসহাকে ভালোবাসে সে, উহু ইসহাক তাকে ভালোবাসে না। তার দিক থেকেই এই দুর্বলতা। কয়েক পলক নিমিষ দৃষ্টিতে ইসহাকের দিকে চেয়ে তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ল মিতালি । গায়ে লং কটি জড়িয়ে বিছানা ছেড়ে ছোট টেবিলের দিকে পা বাড়াল! ইসাকের জন্য ড্রিংক'স রেডি করে বিছানায় ফিরে আসলো আবার, আবেদনময়ী ভঙ্গিতে বসল। ইসহাক বালিশে হেলান দিয়ে বসে, কোন এক গভীর ভাবনায় ডুবে আছে সে।আনমনা হাতে মিতালি থেকে গ্লাসটা নিয়ে নিলো। ফোঁসফোঁস করতে করেতে গম্ভীর আওয়াজে বলল,
' এই প্রথম কোন নারীর চোখে আমার জন্য প্রেম নেই, ভয় নেই। আছে শুধু তিরস্কার, বয়স নিয়ে সীমাহীন দ্বিধাদ্বন্দ্ব!
আচ্ছা, মিতালি! বুড়ো হয়ে গেছি আমি? আমায় খুব বেশি বয়স্ক দেখায় কি?'
মিতালি অবাক হলো ইসহাকের প্রশ্নে, সেই সাথে প্রচণ্ড কৌতূহল জাগল ইসহাককে তিরস্কৃতকারী নারীকে জানার। এমন সুদর্শন পুরুষেও কেউ তিরস্কার করতে পারে? এত সাহস তার বুকে? বুক কাঁপে না তার?
মিতালি ভীষণ নম্র স্বরে তাচ্ছল্য ভাষায় উত্তর দিলো,
' মোটেও তোমার বয়স বাড়েনি, এখনো তোমার সামনে পঁচিশের যুবক হার মানবে। হয়তো সেই নারী অন্ধ, নয়তো তার রুচি ভীষণরকম বাজে। তা নয়তো এত সুদর্শন পুরুষকেও কেউ দৃষ্টিগোচর করে?'
মিতালির উত্তরে সন্তুষ্ট হলো না ইসহাক। এখানো আরহার প্রত্যাখ্যান, বয়সের সুক্ষ্ম খোটা মাথায় চুবছে তার। মেজাজ প্রচণ্ডরকম খারাপ। সবকিছুতে যেন তিক্ততার আবাস। না, কাউকে ভালো লাগছে। কারো সঙ্গ সহ্য হচ্ছে না! একদম! সবকিছু অসহ্য লাগছে! গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে কঠিন মুখ করে মিতালির উদ্দেশ্যে বলল ইসহাক,
' আজ এখানেই সব শেষ! এরপর আর কোনদিন ডাকবে না আমায়। না আমার নাম্বারে ফোন করবে।'
এতটুকু বলে মিতালিকে প্রত্যুত্তরের সুযোগ না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ইসহাক। অশ্রুভারাক্রান্ত আঁখি নিয়ে বিছানায় থম মেরে বসে রইল মিতালি।
.
বাড়ির সদর দরজায় পা রাখতেই পোড়া গন্ধ নাকে বাজলো। ভ্রুদ্বয় কুঁচকে নিলো ইসহাক। চারিদিকে সর্তক দৃষ্টিতে চোখ বুলাল। রান্নাঘরের দিক থেকে ঘন ধোঁয়া আসছে। কিছু একটা ভেবে, ভ্রুদ্বয় সটান হলো। আঁতকে উঠল ইসহাক। দ্রুত পায়ে সেদিকে অগ্রসর হলো। ধোঁয়ায় রান্নাঘর অন্ধকার, কিছু দেখা যাচ্ছে না, ঠিকঠাক। সবটাই অস্পষ্ট! ভেতরে প্রবেশ করতে গেলে পায়ের সাথে কিছু বাজলো। ঝনঝন শব্দ হলো। ইসহাক সাবধানী পায়ে ভিতরে ঢুকল। ধোঁয়ার আঁধার হতে খুকখুক কাঁশির আওয়াজ ভেসে এলো। আতংকিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল ইসহাক,
' আরহা! আপনি কি এখানে? সাড়া দিন প্লিজ!'
আঁধার থেকে মিয়িয়ে আওয়াজ ভেসে এলো,
' যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি আমি, আমাকে বাঁচান ইসহাক সাহেব!'
অবিলম্বে জানালার দিকে এগিয়ে গেল ইসহাক , রান্নাঘরের সব জানালা খুলে দিলো। এডজাস্ট ফ্যান ছেড়ে দিলো। ধোঁয়া ধীরেধীরে কমছে। চারিদিক সচ্ছল হচ্ছে। ইসহাক অস্থির হয়ে আরহাকে খুঁজতে লাগল। কয়েক কদম বাড়াতেই বড় ফ্রিজের পেছনের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকতে দেখল আরহাকে। থমথমে মুখ, ভয়ের রেশ যেন এখনো কাটেনি তার। চোখ মুখ অসম্ভব লাল হয়ে ফুলে আছে, ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে। ইসহাক স্বস্তির শ্বাস ফেলল। শীঘ্র পায়ে আরহার দিকে এগিয়ে গেল। আরহার গাল ছুঁয়ে তড়বড় করে বলল,
' ঠিক আছেন আপনি?'
মাথা তুলল আরহা। অশ্রুভারাক্রান্ত দৃষ্টি তার, মুখে উত্তর দিলো না। শুধু উপর নিচ মাথা নাড়াল। শরীর তখনো ঠকঠক কাঁপছে। ইসহাক শান্ত কন্ঠে বলল,
' উঠুন আরহা, ভিতরে চলুন'
আরহা্র পা জোড়া ভয়ে নড়বড় করছে। ফ্রিজের পিঠে ভর দিয়ে উঠতে চাইল সে। পারল না। ধপাস করে বসে পড়ল আবার, ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল, মিনমিন করে বলল,
'প্রচণ্ড ব্যথা করছে, ঘর অবধি যেতে পারব না আমি।'
ইসহাক ছোট শ্বাস ফেলল। আরহার কিছু বুঝে উঠার আগে চট করে কোলে তুলে নিলো। ড্রইং রুমের দিকে অগ্রসর হলো। গতরাতের আরহার সেই কপালের ঘাঁ আবারো জেগেছে, ব্যান্ডেজের উপর ছুপছুপ রক্তের দাগ। হাতের পিঠে জায়গা জায়গায় তেলের ছিটা পরে কালো ছাপ হয়ে আছে। আরহাকে সোফায় বসিয়ে তড়িঘড়ি করে ফাস্টএইড বক্স খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ইসহাক। আরহা তখনো ফুঁপাচ্ছে, হৃদপিন্ড প্রচণ্ড বেগে দৌড়চ্ছে! শরীরের রক্তবিন্দু শীতল। ভয়ে চোখমুখ ফ্যাকাসে! ইসহাক ফাস্টএইড বক্স খুঁজে আরহার মুখোমুখি বসল। কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল আরহার অশ্রুসিক্ত ঘন পল্লব আঁখি জোড়ায়। পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে ব্যান্ডেজে মন দিলো ইসহাক।
ইসহাক আরহা কাছাকাছি। এই প্রথমবার বাবা ভাইজান ছাড়া অন্যকোন পুরুষের এতটা কাছাকাছি আরহা। নাকে তীব্র এক ঘ্রাণ বাজছে। কিসের ঘ্রাণ তা ঠিক ধরতে পারল না সে। শরীর থরথর কাঁপছে তার। ভীষণরকম নার্ভাসনেস কাজ করছে। মন কেমন জানো ছটপট করছে। চোখ তুলে একবার দেখবে কি? আড়চোখে এদিকওদিক তাকিয়ে ভেবে যাচ্ছে আরহা। আচমকা তার কি জানো হলো। চট করে ইসহাকের দিকে চোখ তুলে চাইল। থমকে গেল সে। চোখের মণি নড়ছে না আর। স্থির হয়ে রইল। এই প্রথমবার ইসহাকের দিকে ঠিকঠাক পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সে। নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, চোয়াল উঁচু, চৌকা মুখ, গভীর চোখ। তীরের মত ধারাল নাক। বেশ চওড়া বিদেশীদের মত গায়ের রঙ। গালের হাড় উঁচু, মুখের গড়ন অনেকটা পাহাড়িদের মত। চেহারায় কেমন জানো ভিনদেশী ভিনদেশী একটা ভাব আছে। চোখের মণি ডার্ক ব্রাউন, তেমন চুলের রঙটাও। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা। বয়স একত্রিশ ছুঁই ছুঁই কিন্তু বোঝার কায়দা নেই। এখনো সেই চব্বিশ পঁচিশ বছরের যুবকদের মতই শক্তপোক্ত বলিষ্ঠ। আচ্ছা, উনার জন্ম কি ভিনদেশে! বিয়ের আগে দুবার মাত্র দেখেছে। কথা হয়নি কখনো, চোখাচোখি হয়েছে ওই যা! এত সুদর্শন পুরুষ নিশ্চয়ই অনেক প্রেমিকা আছে তার! জরুরী না, যা দেখতে সুন্দর তার ভিতরটাও সুন্দর হবে। চকচক করলেই যে সোনা হতে হবে এমন তো নয়! আনমনা হয়ে ভাবল আরহা। ইসহাকের সাথে নজর মিলতেই, দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। ইসহাক গম্ভীর আওয়াজ করে বলল,
' এসব কি করে হলো?'
আরহার অক্রূর স্বীকারোক্তি,
' আমি রান্না পারিনা'
ইসহাক চোখ তুলে এক পলক তাকাল, তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে হাতের ঘাঁয়ে মলম লাগাতে লাগাতে বলল,
' আপনার মনে হচ্ছে না, কথাটা আপনার আরো আগে জানানো উচিত ছিল'
মলমের জ্বালা পোড়ায় চাপা আর্তনাদ করে উঠল আরহা। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে নিলো । ধীর কন্ঠে বলল,
' চেয়েছিলাম সুযোগ মিলেনি, তার আগেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন আপনি।'
ইসহাক কথা বাড়াল না। অমনি আরহার পেট মোচড় দিয়ে উঠল। চোঁচোঁ শব্দ হচ্ছে পেট থেকে। ইসহাক তা শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকাল আরহার দিকে, লজ্জায় মিলিয়ে গেল আরহা। মিনমিন করে বলল,
' সকাল থেকে কিছু পেটে পড়েনি, তাই...'
কথা শেষ করার,আগে উঠে দাঁড়াল ইসহাক। শার্টের হাতা ভাজ করতে করতে এলোমেলো অগোছালো রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
' অপেক্ষা করুন খাবার আনছি'
আরহা কিঞ্চিত বিস্মিত হলো, অবাক স্বরে বলল,
' কে রান্না করবে? আপনি! রান্নাও জানেন নাকি!'
প্রত্যুত্তর করল না ইসহাক।
.
গভীর রাত। নিস্তেজ চারিদিক। থমথমে অন্ধকার। বাগানের গাছপালা হতে অজানা পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ। আউট হাউজের দিকে পা বাড়াল ইসহাক। ইসহাক দরজার সামনে দাঁড়াতেই তালা খুলে দিলো মালেক মিয়া। গম্ভীর আওয়াজে প্রশ্ন করল ইসহাক,
' খাবার খেয়েছে সে?'
' না সাহেব, মেডাম খায় নাই'
মালেক মিয়ার নতজানু উত্তর। ছোট নিশ্বাস ছাড়ল ইসহাক। অন্ধকার আউট হাউজে প্রবেশ করল। ঘরটার ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিকষ আঁধারে কোনকিছু চোখ পড়ছে না তার। ফোনের আলো জ্বালিয়ে সুইচ বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেল। আলো জ্বালাতেই, পুরো ঘর উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দৃষ্টি ঘুরাতেই ঘরের এক কোণে নজর আটকাল। হাঁটুতে মুখ গুজে বেনারসি পরে কেউ একজন বসে আছে। নোংরা শরীর এলোমেলো অগোছালো কেশ। হাত খানিক ছিঁড়ে রক্ত ঝরছে। এগিয়ে গেল ইসহাক। মেয়েটা বিরবির করে কি জানো বলছে। স্পষ্ট কানে এলো না তার। মেয়েটার সামনে বসে পড়ল সে। আলতো করে মাথায় হাত রাখল ধীর কন্ঠে ডাকল,
' এনা!'
কেঁপে উঠল এনা। মাথা উঠিয়ে চিৎকার করতে করতে বলল,
' কে কে! কে তুমি।'
ইসহাক এনাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল,
' এনা। আমি ইসহাক! তোমার ইসহাক'
এনা একটু শান্ত হলো। মাথা তুলে ইসহাকের দিকে পিটপিট দৃষ্টিতে চেয়ে, কিছু মনে করার চেষ্টা করল। কিছু একটা ভেবে ছিটকে সরে গেল এনা। ঘরের এক কোণায় বসে জড়সড় হয়ে থরথর কাঁপতে লাগল। হাউমাউ কান্নার আওয়াজ। আধোআধো বুলিতে বলল,
' যা..যাও, তুমি চলে যাও। যাও!'
ইসহাকের ব্যথাতুর দৃষ্টি এনার দিকে স্থির। চট করে এনার কাছে চলে গেল। বুকে জড়িয়ে নিলো এনাকে।চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
' তোমার যন্ত্রণার হাজার গুণ ফিরিয়ে দিবো তাদের।'
হঠাৎ ইসহাকের চোখ ক্রোধে জ্বলে উঠল। শরীর থরথর কাঁপছে। মাথায় খুনের নেশা চেপেছে তার। এনাকে ছেড়ে রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। দোতালায় নিজের ঘরে পৌঁছে কাবার্ড থেকে পশু জবাই করার বড় ধারাল দাঁ' টা বের করল। হন্তদন্ত হয়ে আরহার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ইসহাকের চোখে ভয়ংকর হিংস্রতা! মুখে অদ্ভুত এক পাগলামো ভাব। কোন এক অসুর যেন ভর করেছে ঘাড়ে। আজই আরহার ঘাড় থেকে ধর আলাদা করবে। ইসহাক আরহাকে চিরনিদ্রায় শুয়িয়ে দিবে আজ!
চলবে.........সম্পুর্ণ গল্পের লিংক 👇
https://www.facebook.com/share/p/18EyZGKUn2/
ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন।
