#প্রিয়_প্রতিশোধ 


ঊর্মি প্রেমা( সাজিয়ানা মুনির)



(কার্টেসী ছাড়া কপি নিষেধ )


গভীর রাত। চারিদিক নিকষ আঁধারে বিলীন। ক্রোধান্বিত মুখশ্রী নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরল ইসহাক ইব্রাহিম। রক্তিম আঁখিজোড়া হতে যেন আগুন ঝরছে তার। ফোঁসফোঁস তপ্ত নিশ্বাসে নাকের পাঠা ফুলছে বারবার । মালিকের এমন ক্রোধিত মুখশ্রী দেখে চুপসে গেল মালেক মিয়া। মাথা নত করে জড়সড় ভাবে পিছিয়ে গেলেন তিনি, দরজার পাশটায় পিঠ ঠেকিয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে রইল। ইসহাকের দৃঢ় দৃষ্টি পালঙ্কে নেতিয়ে পড়া ঘুমন্ত আরহার দিকে। মুহূর্তেই সকল ক্রোধ মিলিয়ে গেল, দৃষ্টি নরম হয়ে এলো তার!

দৃষ্টি আরহার পানে রেখে, গম্ভীর আওয়াজে আওড়ালেন তিনি,


' ডক্টর এসেছিল?'


মালেক মিয়া থতমত আওয়াজে উত্তর দিলেন,


' জি সাহেব, ডাক্টারনি আফা আইছিল, ব্যান্ডেজ কইরা ঔষধ দিয়া গেছে। কইছে রেস্ট নিলে ঠিকঠাক মত ঔষধি খাইলে তাড়াতাড়ি সাইরা উঠব নতুন বউ।'


' এসব কি করে হলো? ও ওই ঘর থেকে কি করে বের হলো! বাহিরের কারো সাহায্য ছাড়া তো বের হওয়া অসম্ভব।'


মালেক মিয়া ভয়ে কাঁপতে লাগল। গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসছে তার। ভয়ে থতমত করতে করতে উত্তর দিলো,


' জানিনা সাহেব, আমি বাজারে দারু গিলতে গেছিলাম ফিরা হুনি বাড়ি থাইকা চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ! তড়িঘড়ি কইরা আইয়া দেহি মেডাম নতুন বউয়ের উপর হামলা করছে। নতুন বউ মাটিতে পইরা রইছে।'


' আজ থেকে ঐ ছাইপাঁশ গিলা বন্ধ তোমার, টুয়েন্টি ফোর আওয়ার'স গেটে দাঁড়িয়ে পাহারা দিবে! প্রত্যেক সেকেন্ডের খবর চাই আমার! আউট হাউজের পাহারা আরো কড়া করো, সিসি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়াও।'


ক্রোধিত স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন ইসহাক ইব্রাহিম। মালেক মিয়া আমতা আমতা করে বললেন,


' সাহেব! মেডাম কি এহন থাইকা ওই ঘরেই থাকব। নতুন বউ যদি মেডামের কথা জাইন্না যায়!'


বাঁকা দৃষ্টিতে মালেক মিয়ার দিকে তাকাল ইসহাক। গম্ভীর আওয়াজে বললেন,


' কে বলবে? তুমি?'


ভড়কে উঠল মালেক মিয়া। তড়িঘড়ি করে ভীতু কন্ঠে উত্তর দিলো,


' না, না সাহেব। আমি আফনের গোলাম, নুন খাইছি আফনার! আফনের লগে বিশ্বাসঘাতকতা করার আগে যেন মরণ হয় আমার, মরণ! '


উত্তর দিলো না ইসহাক। হাতের ইশারায় মালেক মিয়াকে চলে যেতে বলল। মালেক মিয়া সালাম জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মালেক মিয়া যেতেই, বিছানার পাশে মাঝারি আকারের ডিভানটায় ধপ করে বসলো ইসহাক। তার প্রগাঢ় দৃষ্টি আরহার ব্যথাতুর মুখখানায়!

অনবরত ফোন বাজছে। ফোনের উচ্চ আওয়াজে ঘোর কাটল ইসহাকের। প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ফোন রিসিভ করে কানে ধরল। অপর পাশ থেকে সুমধুর উৎকণ্ঠা মেয়েলী আওয়াজ ভেসে এলো,


' আমি তোমার অপেক্ষায় আছি, তোমার বিরহে ক্ষণে ক্ষণে মরছি, সেই মধুরাতের ঘোর আজও কাটেনি আমার। আজ রাতেও কি তুমি আসবেন না? আজও কি বিরহবেদনায় ছটফট করতে হবে আমার!'


ইসহাক ঘুমন্ত আরহার মুখপানে দৃষ্টি রেখেই প্রশান্ত স্বরে বলল,


' একরাতের দাসী তুই! সেই রাতের সাথে সম্পর্কটাও সেখানেই শেষ। দ্বিতীয়বার এই নাম্বারে ফোন করলে জানে মেরে ফেলব।'


 


.

প্রভাত বেলা। চারিদিক উজ্জ্বল আলোয় চিকচিক করছে। দক্ষিণের বিশালাকার জানালা। তার উপর ভারী পর্দা, সেই পর্দা ভেদ করে অঁজিষ্ণুর নরম আলো আরহার উজ্জ্বল মুখখানা ছুঁইছে। নেতিয়ে পড়া হরিণী আঁখিদ্বয় কুঁচকে এলো। মসৃণ ঠোঁট জোড়ায় বিরক্তির ভাজ পড়ল একটু! বিদেশিনীদের মত আহামরি ধবধবে চামড়া না হলেও, বেশ উজ্জ্বল চওড়া রঙ আরহার। মায়া মায়া নিষ্পাপ মুখ। কোমর ছাড়িয়ে অবিন্যস্ত লতানো কেশ তার, চোখ ধাঁধান অনিন্দ্যসুন্দরী! বুকের আঁচলটা খানিক নিচে পড়ে আছে, গলায় ডানপাশে কলার বোনের ঠিক নিচ বরাবর কালো তিলটা দেখা যাচ্ছে, টকটকে বেনারসির পাড়টা হাঁটু অবধি উঠে। চকচকে সুন্দর পা জোড়া স্পষ্ট দৃশ্যমান। ইসহাক ইব্রাহিমের নিমগ্ন দৃষ্টি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আরহাকে। কেঁশে উঠল ইসহাক। নি: শ্বাসের গতি বাড়ল তার, বুক চিড়ে এক অস্থির শ্বাস বেরিয়ে এলো। এত মেয়ের শরীর নিয়ে খেলেছে সে। এত মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছে, নিদ্রাহীন শতশত রাত কাটিয়েছে, আজ অবধি তার এমন অস্বস্তি অনুভূতি হয়নি কখনো! কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটাকে অবিন্যস্ত এলোমেলো দেখে এমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে কেন তার! ভাবল ইসহাক! দ্রুত নজর সরিয়ে নিলো। দৃষ্টি ঝুকে গেল আপনা- আপনি!


সূরের প্রতাপ ধীরেধীরে বাড়ছে, উজ্জ্বল তপ্ত আলোয় ঘুম কাটল আরহার। আড়মোড়া ভেঙ্গে আধোআধো চোখ খুলল। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। পাশ ফিরতেই অসহ্য ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। আচমকা রাতের কথা মনে করে, এক ঝটকায় চিৎকার করে উঠে বসল। থর‍থর করে কাঁপছে আরহা, শ্বাস কষ্ট হচ্ছে, প্রচণ্ড! মাথা অসহ্য যন্ত্রণা, যেন কেউ টেনেটুনে মাথার সব তার ছিঁড়ছে। ডর ভয়ে দিশেহারা হয়ে সামনের মানুষটার বুকে হুড়মুড় করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শক্তপোক্ত ভাবে চেপে ধরল, হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আরহা। অনবরত কাঁপছে। ভয়ে থরথর করতে করতে বলল সে,


' ভূ..ভূত! ওই ভূত আমাকে মেরে ফেলবে! একদম মেরে ফেলবে। বাঁচান আমাকে!'


এতটুকু বলে, শব্দ করে আবারো কেঁদে উঠল আরহা। শরীর তখনো থরথর কাঁপছে। ইসহাক শক্ত হয়ে বসে আছে। ধরল না আরহাকে! বেশ শান্ত আওয়াজে বললেন,


' শান্ত হোন আরহা! এখানে আমি ছাড়া অন্যকেউ নেই। কোন ভূত নেই।'


' রাতে ঐ মেয়েটা! ভয়ংকর মেয়েটা'


'গতরাতে ঐ মেয়েটা চোর ছিল!'


অকস্মাৎ, কান্না থামাল আরহার। ইসহাকে ছেড়ে মাথা তুলে অবাক কন্ঠে বলল,


' চোর? ওইটা চোর ছিল! কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখলাম ওইটা বিদঘুটে চেহারার একটা মেয়ে।'


' বিদঘুটে মেয়েরা কি চোর হয়না?'


' আপনার নাম শুনে ভয় পেয়ে গেল কেন?'


' এই বাড়ির মালিক আমি, আমার নাম শুনে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক নয়কি?'


'আমাকে আক্রমণ করল যে?'


' ভয় পেয়ে গেছিল, পালাতে হয়তো!'


ইসহাকের যুক্তির পিঠে প্রশ্ন খুঁজে পেলনা আরহা। পিটপিট দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকল শুধু। সত্যি- ই তো, ওই মেয়েটা চোরও তো হতে পারে! উনার যুক্তি অসংগত নয়! আনমনা হয়ে ভাবল আরহা। 

ইসহাকের নিগূঢ় দৃষ্টি তখনো আরহার দিকে। ইসহাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজের দিকে চোখ বুলাল, আঁতকে উঠল সে। বুকের আঁচল বিছানায় পড়ে, শাড়িরজমিন হাঁটু অবধি উঠে। নিজেকে এমন বিশ্রী ভাবে এলোমেলো অবস্থায় দেখে লজ্জায় চোখমুখ কুঁচকে এলো আরহার! থতমত খেয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে বিছানা হতে আঁচল তুলে পেছন দিক থেকে টেনে সমস্ত শরীর ডেকে নিলো। শাড়িরজমিন নামিয়ে নিলো! লজ্জাকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে মিনমিন আওয়াজে বলল,


' সরি! আমার জন্য আপনাকে খামাখা কষ্ট করতে হলো, কাজ রেখে ফিরে আসতে হলো বাড়িতে!'               


ইসহাকের কুঁচকান ভ্রু দ্বয় সটান হলো। আরহার মুখপানে চোখ রেখে স্পষ্ট স্বরে বললেন,


' আরহা! আপনি সত্যি- ই কি এতটা ভালো নাকি নাটক করছেন ভালো হবার!'


আরহা বোধহয় ইসহাক ইব্রাহিমের কথাটা ঠিকঠাক বুঝল না, মাথা তুলে চোখ কুঁচকে গাঢ় দৃষ্টিতে তার দিকে চাইল। ইসহাক সহজ করে বললেন,


' বিয়ের রাতে বাসর ঘরে আপনার বর আপনাকে একা বাড়িতে ফেলে বেরিয়ে গেল। আপনার কোন অভিযোগ নেই? আপনার মত সতের বছরের বাচ্চা থেকে এতটা ম্যাচিউরিটি আশা করিনি! ইম্প্রেসিভ! '


আরহা সামান্য হাসল, বলল,


' আপনি কতটা ভালো বলছেন জানা নেই আমার! কিন্তু আপনি যতটা খারাপ ভাবছেন ততটাও খারাপ নই আমি। ছোট শহরের হলেও, ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে আমি। কাজের ব্যস্ততা আমার জানা আছে। বড় ভাইজান আমার থেকে বিশ বছরের বড়! যবে থেকে বুঝ হয়েছে সবসময় বাবা ভাইজানকে কাজে ডুবে থাকতে দেখেছি! তাই এসব ব্যাপারে অভিযোগ হয়না আমার। তাছাড়া আপনার থেকে কোন প্রকার এক্সপেকটেশন রাখছিনা। এই বিয়ে মেনে নেওয়ার মত বিন্দুমাত্র কারণ নেই আপনার। আপনি আমাদের জন্য যা যা করেছেন তাই অনেক! এই বিয়েটা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা মাত্র! বয়স থেকে শুরু করে কোন কিছুর খাপ খায় না আমাদের। যদি সেদিন বিয়ের আগে ঐ অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটত, তাহলে আজ হয়তো আমি অন্যকোথাও থাকতাম.... এই অবধি আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন, আমি চিরকৃতজ্ঞ আপনার!'


আরহার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে, শান্ত কন্ঠে বললেন ইসহাক,

' আমার বয়স আপনার এক্সের বয়সের সমান হলে বুঝি বিয়েটা মেনে নিতেন আপনি?'


দ্বিধান্বিত আরহা, চুপ করে রইল। চিন্তিত মুখ, কি উত্তর দিবে খুঁজে পেল না। সে কখন বলল, সে বিয়েটা মানবে না। উনার দিকটা ভেবেই তো কথাগুলো বলল। আরহার ভাবনা ছেদ হলো ইসহাকের গম্ভীর ঝাঁঝাল আওয়াজে,


' আপনার কথার টোনে বুঝা যাচ্ছে বেশ সুস্থ আপনি। টনটনে আওয়াজ! রান্না করতে অসুবিধা হবে না নিশ্চয়ই! সকালের নাস্তার সময় গড়িয়ে গেছে, দুপুরের খাবারের সময় হচ্ছে! আমি একটু বের হচ্ছি, দুপুর অবধি ফিরে আসবো। এসে যেন খাবার রেডি দেখি!'


হকচকিয়ে উঠল আরহা। হতভম্ব হয়ে পিটপিট দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল। অসহ্য যন্ত্রণায় মাথা তুলে বসতে পারছেনা সে। গায়ে গরম গরম ভাব, জ্বর আসবে বুঝি! এই অসুস্থ শরীর নিয়ে সে রান্না করবে? তার কপালের এত বড় ক্ষতটা কি উনার চোখে পড়ছে না? 

 ছোট থেকে আজ অবধি কখনো রান্না ঘরের চৌকাঠ মাড়ায়নি। বাবার বাড়িতে পদেপদে কাজের লোকের অভাব নেই। তার হালকা কাঁশিতে পুরো বাড়ির লোক তার সেবায় জড় হতো। বাপ ভাইদের চোখের মণি, প্রচণ্ড আহ্লাদে বড় হয়েছে। আর সে আরহা কিনা এত অসুস্থতা নিয়ে রান্না করবে? এমন অদ্ভুত কেন লোকটা! মনে কি সামান্যতম মানবতা নেই! এইতো খানিক আগেই ভালো ব্যবহার করল, এখন হুট করে রেগে গেল কেন? চোখমুখ কালো করে ভাবল আরহা।


' আপনি আমাকে বলছেন ইসহাক সাহেব?'


' এই ঘরে আমি, আপনি ছাড়াতো তৃতীয় কাউকে দেখছি না'


তপ্ত মন খারাপের নিশ্বাস ছাড়ল আরহা। ক্ষিপ্ত পা চালিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ইসহাক। হন্তদন্ত হয়ে সিড়ি বেয়ে নামল। ফোন বের করে একটা নাম্বারে ফোন করল। রাগী উৎকণ্ঠা কন্ঠে বলল,


' তৈরি থাকো, আমি আসছি!'


অপর পাশে থেকে মেয়েলী উৎফুল্ল আওয়াজ ভেসে এলো। খুশিতে গদগদ করতে করতে বলল মেয়েটা,


' তুমি সত্যি আসছ ইসহাক! আসছ তুমি! সত্যিই কি তোমার পদধূলি আমার চৌকাঠ মাড়াবে আবার!'


উত্তর দিলো না ইসহাক। ফোন কেটে গাড়ি চড়ে বসল! 


চলবে......


ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন। 


[ আজকাল খুব একটা চাপ নিতে পারিনা, সামান্য ব্যস্ত। এই গল্পটা আমি সময় নিয়ে লিখতে চাইছি। তড়িঘড়ি করে প্লট নষ্ট করতে চাইছিনা তাই একদিন পর পর পোস্ট করব। আশাকরি সবাই বুঝবেন]

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url