তোকে_ঘিরে_সন্ধ্যাতারা 

জান্নাত

৩.


জেসিকা বাইরে থেকে উঁকি দিলো। দেখলো তৌসিফ বেডের উপর ল্যাপটপে কাজ করছে। সে হাসিমুখে বলল,

_ ভেতরে আসবো ভাইয়া?'


তৌসিফ মাথা তুললো। একবার জেসিকার দিকে চেয়ে আবার কাজে মনোযোগ দিলো সে।

_ কোনো দরকারি কথা থাকলে আয়।' 


জেসিকা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,

_ কেন? ন‌ইলে কি আমি তোমার ঘরে আসতে পারবো না?'


তৌসিফ গম্ভীর কন্ঠে বলল,

_ না!' 


একটু ভড়কে গেলো জেসিকা। আবার সামলে নিয়ে বলল,

_ এতো দিন পর তোমার সাথে দেখা হলো! কোথায় জিজ্ঞেস করবে কেমন আছি, কি করছি তা না করে বলছো আমি যেন তোমার রুমে না আসি? এটা কেমন কথা শুনি!' 


তৌসিফ কোনো জবাব দিলো না। কাজ ও থামালো না। জেসিকা তার পাশে গিয়ে বসলো। জেসিকা বসতেই চোখ গরম করে চাইলো তৌসিফ।

_ গায়ে পড়া স্বভাবটা এখন‌ও গেলো না তোর!'


তৌসিফের কথার মানে বুঝলো না জেসিকা । ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো তার মুখ পানে। 

_ মানে?'


_ সরে বস!' 


জেসিকা উঠে দাঁড়ালো। তৌসিফের কথাগুলো তার ইগোতে লাগলো। সে মুখ ভার করে বলল,

_ এমন করছো কেন ভাইয়া?' 


তৌসিফ তার দিকে চেয়ে রুক্ষ স্বরে জবাব দিলো,

_ তোরা দুই বোন ই একরকম। ঠকবাজ! আমার চোখের সামনে আসিস না। ন‌ইলে কখন উল্টো পাল্টা কিছু বলে দেবো তার ঠিক নেই। এখন যা এখান থেকে!'


তৌসিফের কথা শুনে জেসিকার রাগ হলো। তেজ দেখিয়ে বেরিয়ে আসার সময় সন্ধ্যার ঘরের সামনে এসে থমকে গেলো। তাদের কথা কানে যেতেই সন্ধ্যার রুমে ঢুকলো সে।


_ কারণ যেগুলো আমার প্রাপ্য, সেগুলো তোর সন্ধ্যা আপু পেয়েছিলো। তাই তো নিজের জিনিসগুলো আবার নিজের করে নিয়েছি।'


জেসিকার কথা শুনে সন্ধ্যা আর রমনা চেয়ে পড়লো তার দিকে। জেসিকা সন্ধ্যার ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে বলল,

_ বা বাহ্! রুমের কি অবস্থা হয়েছে শেখ বাড়ির রাজকন্যার! সবার চোখের মণি! যে একটা জামা দ্বিতীয়বার কখনোও পরেনি! তার আজ কি অবস্থা!' 


বলেই মুখ টিপে হাসতে লাগলো সে। সন্ধ্যা বুঝলো, জেসিকা তাকে খোঁচা দিচ্ছে। তবুও সে কোনো প্রতি উত্তর করলো না। রমনা সহ্য না করতে পেরে বলল,

_ এই তুমি একদম আমার আপুকে খোঁচা দিয়ে কথা বলবে না। এমন কেন গো তুমি? আমি সোহান ভাইয়ার কাছে শুনেছি, তুমি আগেও এমন বদমাইশ ছিলে। এখন‌ও আছো। আপু তো তোমার আপন বোন হয়! তবুও তুমি আপুর সাথে এমন করো কেন?' 


সন্ধ্যা রমনা কে ইশারায় চুপ করতে বলল। জেসিকা তার দিকে কটমট করে চেয়ে বলল,

_ খুব তো কথা শিখেছো দেখছি। তা সন্ধ্যা, এটা কি তোর চ্যালা নাকি! বেশ বেশ! এখন‌ও এ বাড়িতে তোর হয়ে কথা বলার কেউ আছে? আমি তো ভেবেছিলাম যে আকাম টা করেছিস তারপর তোর মুখ ও কেউ দেখবে না!' 


_ তুমি খুব ভালো করেই জানো আপু সেদিনের ঘটনা টায় আমার কোনো দোষ ছিলো না! জানো না তুমি?' 


_ হ্যাঁ তো! সেটা আমি জানি! অন্য কেউ তো জানে না!' 


বলেই হো হো করে হেসে উঠলো জেসিকা। হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। রমনা সন্ধ্যা কে জিজ্ঞেস করলো,

_ কি হয়েছে আপু? তুমি কি করেছিলে?' 


সন্ধ্যা চোখের পানি মুছে নিলো। হাসি মুখে বলল,

_ কিছুনা। ছোট্ট একটা ভুল করেছিলাম। যার শাস্তি পাচ্ছি এখন‌ও। তুই যা, ন‌ইলে ছোট মা তোকে দেখতে পেলে আবার বকাবকি করবে। যা!' 


সন্ধ্যা একপ্রকার জোর করে বের করে দিলো রমনাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সন্ধ্যা। আপনমনে বলে উঠলো,

_ আমি ভুল করেছিলাম তৌসিফ ভাই! বিশ্বাস করে ভুল করেছিলাম। তবে যে অন্যায়ের শাস্তি আপনি আমায় দিচ্ছেন, সেটা যে আমি করিনি! আমি কখনোই ঠকায়নি আপনাকে। কিন্তু আপনি! বিশ্বাস করলেন না আমাকে। যাকে ভালোবাসেন তার উপর বিশ্বাস রাখতে পারলেন না! চলে গেলেন আমায় একা ফেলে। আজ এতো বছর পর ফিরেও সেই আগের মতোই অবিশ্বাস, ঘৃণা আপনার চোখে! কেন তৌসিফ ভাই, কেন?' 


******


মানিক শেখ এ বাড়ির বড় কর্তা। কেয়া বেগমের স্বামী, বাড়ির বড় ছেলে। ছোট ছেলে মুরাদ শেখ। মানিক শেখের এক ছেলে, তৌসিফ শেখ! মুরাদ শেখের দুই ছেলে, এক মেয়ে। সোহান, জারিফ আর রমনা। সন্ধ্যা আর জেসিকা রায়হান, অর্থাৎ শেখ বাড়ির মেজো ছেলের দুই মেয়ে। রায়হান আর তার স্ত্রী ৮ বছর আগে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মা*রা গেছে। মানিক শেখের মা , বাবা, রহমান শেখ আর রাবেয়া বেগম এখন‌ও বেঁচে আছেন। তারা যদিও ছেলেদের সাথে থাকেন না।


রাতে খাবার টেবিলে.....


মানিক শেখ টেবিলে বসেই চারিদিকে নজর বোলালেন! নিজের স্ত্রীকে ডেকে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

_ কেয়া! সন্ধ্যা কোথায়? ওকে এখানে দেখছি না তো!' 


কেয়া বেগম আমতা আমতা করে বললেন,

_ তোমরা খেয়ে নাও না! ও আমাদের সাথে খেয়ে নেবে!'


_ কেন? টেবিলে জায়গা কম পড়েছে? ডাকো ওকে।' 


_ আহা! তুমি তো জানোই! ও আসলে তৌসিফ উঠে চলে যাবে। শেষমেশ আর খাওয়াই হবে না আমার ছেলেটার।' 


_ তাহলে খাবে না। তুমি ওকে ডেকে নিয়ে এসো যাও।' 


কেয়া বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না। তৌসিফ ও কোনো কথা বললো না। তবে সন্ধ্যা আসার সাথে সাথে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লো সে। কেয়া বেগম ছুটলেন ছেলেকে সামলাতে।

_ এমন করিস না বাবা। খাবার ছেড়ে উঠতে নেই।' 


তৌসিফ মায়ের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

_ আমার খিদে ম*রে গেছে। ছাড়ো আমার হাত।' 


মানিক শেখ ধমকে উঠলেন ছেলেকে।

_ তৌসিফ! কি হচ্ছে এটা। চুপচাপ বসে খাওয়া শেষ করো। খাবার ফেলে উঠবে না।' 


তৌসিফ ও সমান জেদ নিয়ে বলে উঠলো,

_ এটা তোমার এই মেয়েটাকে এখানে আনার আগে মনে রাখা উচিত ছিলো বাবা।' 


_ তৌসিফ!' 


তৌসিফ বেরিয়ে যেতে নিলে সন্ধ্যা মানিক শেখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

_ থাক বড় বাবা। আমি পরে খেয়ে নেবো। তোমরা খাও! আমি এখানে থাকলে হয়তো জায়গা টা দূষিত হয়ে যাবে। কি দরকার বলোতো।' 


বলে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না সেখানে। ছুটে চলে এলো নিজের ঘরে। তৌসিফ কয়েক মুহূর্ত তার যাওয়ার পানে স্থির হয়ে চেয়ে রইলো। মনে মনে বলল সে নিজেকে,

_ কেনো করেছিলি এমন! সেদিন ওমন না করলে তো আজ আমাদের জীবন টা অন্যরকম হতো সন্ধ্যা! কেনো ঠকিয়েছিলি আমায়।' 


পাশ থেকে কেয়া বেগম বলে উঠলেন,

_ বস বাবা! খেয়ে নে।' 


তৌসিফ বসলো। কিন্তু মানিক শেখ বসলেন না। তিনি তার প্লেট নিয়ে উঠে পড়লেন। কেয়া বেগম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,

_ ও কি! তুমি আবার কোথায় যাচ্ছো?' 


_ সেটা দিয়ে তোমার কি কাজ। তুমি নিজের কাজ করো।' 


বলেই বেরিয়ে গেলেন খাবার টেবিলে ছেড়ে। কেয়া বেগম বিড়বিড় করে বকতে লাগলেন সন্ধ্যা কে,

_ এই একটা মেয়ে আমার পুরো সংসার টা তছনছ করে দিয়েছে। অপয়া একটা।' 


এসব কিছু দেখে একজন বেশ মজাই পেলো। জেসিকা মিটিমিটি হাসছে। কেউ খেয়াল ও করছে না তাকে। 

_ এই তো সবে শুরু সন্ধ্যা। আগে যা হয়েছে সেটাও অনেক কম হয়ে গেছে তোর জন্য। তুই এর থেকেও বেশি ডিজার্ভ করিস। এখন আমি এসে গেছি! দেখ ই না, আর কি কি হয় তোর সাথে!'


চলবে......!


এই ওয়েবসাইটেই দেবো পরের পর্ব 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url