তোকে_ঘিরে_সন্ধ্যাতারা
জান্নাত
২.
_ দিন দিন নির্লজ্জ হয়ে উঠছিস নাকি? কালকে এতো করে বললাম, তবুও সকাল হতে না হতেই লাজ লজ্জা রেখে চলে এসেছিস এখানে?'
তৌসিফের এহেন কথায় বেশ আঘাত পেলো সন্ধ্যা! ভয়ে ভয়ে বলল,
_ আমাকে তো বড় মা....!'
কথা বলার সুযোগ দিলো না। এগিয়ে এসে শক্ত হাতে চেপে ধরলো সন্ধ্যার গাল দুটো। ব্যথায় ছটফট করছে সন্ধ্যা। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো তৌসিফ-
_ নিজের ভুলগুলো অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার স্বভাব টা তোর এখনও গেলো না দেখছি। ১০ বছর আগে আমার সাথে যেটা করেছিলি! ভুলে গেছিস সব?'
ছেড়ে দিতেই হাঁপাতে লাগলো সন্ধ্যা। কাঁটা জায়গাটায় আবার চিনচিন করছে।
_ আমি মিথ্যা বলছি না। বড় মা ই আমাকে পাঠিয়েছে কফি টা দিয়ে।'
কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বললো সন্ধ্যা। তৌসিফ কোনো জবাব না দিয়ে কফিটা তুলে নিলো। একটা চুমুক দিয়েই সেটা ফেলে দিলো সন্ধ্যার গায়ের উপর। গরম কফি গিয়ে পড়লো সন্ধ্যার গলার উপর। পরতে না পরতেই সেখানটায় লাল হয়ে ফোস্কা পড়লো। যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে উঠলো সন্ধ্যা। তৌসিফ সেসব খেয়াল না করে সন্ধ্যা কে বলল,
_ ঠান্ডা হয়ে গেছে। আবার বানিয়ে নিয়ে আয়।'
সন্ধ্যা কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে অনুনয়ের সুরে বলল,
_ এমন কেন করছেন তৌসিফ ভাই! কি করেছিস আমি? কিসের শাস্তি দিচ্ছেন আমায়?'
তৌসিফ মুচকি হেসে বলল,
_ বুঝতে পারছিস না তুই? কিসের শাস্তি দিচ্ছি! তোর করা অন্যায়ের শাস্তি তোকে দিচ্ছি। যেটা তুই ৬ বছর আগে করেছিলি। যার জন্য আমায় এতো গুলো বছর এই বাড়ি ছেড়ে, এই দেশ ছেড়ে দুরে থাকতে হয়েছিলো। কতটা ভালোবাসতাম তোকে আমি। এখন মনে পড়লে তো ঘৃণা হয় আমার! নিজের উপর থু থু ফেলতে ইচ্ছা করে। যে তোর মতো একটা মানুষ কে আমি ভালোবাসতাম। ভুলে গেলি নাকি সবকিছু? এতো তাড়াতাড়ি?'
বলেই মুখ ফিরিয়ে নিলো তৌসিফ। সন্ধ্যা চোখের পানি মুছে ট্রে টা নিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম ছেড়ে। ভোলেনি সে কিছুই। মনে আছে তার। ঐ একটা ভুলের জন্য তো আজও পস্তাচ্ছে সন্ধ্যা। এই ৬ বছরে কি সন্ধ্যা শান্তিতে থাকতে পেরেছিলো? পারেনি তো। সেও তো কষ্ট পেয়েছে! কেঁদেছে! ছটফট করেছে! সেটা তো কেউ দেখেনি।
রান্নাঘর পৌঁছে দেখলো কেয়া বেগম রান্নায় ব্যস্ত। সন্ধ্যাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
_ কি রে! তোর গা ভিজলো কি করে? কি পড়েছে ওটা?'
সন্ধ্যা বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। কথা আটকে যাচ্ছে কান্নায়। মাথা নিচু করে বলল,
_ তৌসিফ ভাই আবার কফি বানিয়ে নিয়ে যেতে বলেছে।'
কেয়া বেগমের বুঝতে বাকি রইলো না কি ঘটেছে। তিনি সেসবে পাত্তা না দিয়ে বললেন,
_ ঠিক আছে তুই যা। আমি গিয়ে দিয়ে আসবো। জামা টা পাল্টে ফেল।'
সন্ধ্যা নিজের ঘরে চলে এলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। নজর তার গলায়! জায়গাটা কেমন লাল হয়ে আছে। খুব যন্ত্রণা ও হচ্ছে। ঠোঁটের কোণাটা শুকিয়ে এসেছিলো। আজকে আবার চেপে ধরায় শুকিয়ে যাওয়া ঘা টা আরও তাজা হয়েছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো সন্ধ্যা। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি।
_ কীভাবে পারছেন তৌসিফ ভাই! নিজের সন্ধ্যাতারাকে এতো খানি যন্ত্রণা দিতে? একটুও কি কষ্ট হচ্ছে না আপনার। এখন কী আমি ব্যথা পেলে আপনার বুকের কাছটায় আর যন্ত্রণা করে না? এখন কি আপনার আমাকে না দেখে ঘুমাতে কষ্ট হয় না? একটা ভুল! শুধুমাত্র ঐ একটা ভুলের জন্য সব কেমন ওলট পালট হয়ে গেলো।'
চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া পানি মুছে নিলো সন্ধ্যা। বাইরে থেকে বাড়ির ছোট বউ, ময়না বেগমের গলার আওয়াজ ভেসে এলো।
_ কে কোথায় আছো, বাইরে এসো। দেখো কে এসেছে। আমাদের জেসিকা এসেছে। জলদি এসো।'
চমকে উঠলো আলো। জেসিকা এসেছে? এতো গুলো দিন পর? সে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
বাড়ির সবাই ড্রয়িং রুমে জড়ো হয়েছে। কেয়া বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। জেসিকা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
_ কেমন আছো বড় মা? জানো তোমায় কত্ত মিস করেছি?'
_ ইশ্! ঢং। এতোই যদি মিস করিস তবে এতো দিন কেন আসিস নি? আজ মনে পড়লো আমার কথা?'
_ না না! তোমার কথা তো আমার সবসময়ই মনে পড়ে। আসতে পারিনি তার কারণ আছে। পড়াশোনায় এতো ব্যস্ত হয়ে পড়লাম! আর সময় ই পাই নি।'
_ থাক হয়েছে। এবার গিয়ে রেস্ট নে যা। অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছিস।'
_ হ্যাঁ যাচ্ছি!'
জেসিকা ঘুরতেই তার নজর পড়লো একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলোর দিকে।
_ সন্ধ্যা? কেমন আছিস তুই!'
জেসিকার কথায় সবাই তাকালো সন্ধ্যার দিকে। জেসিকা গেলো সন্ধ্যার কাছে।
_ কেমন আছিস? কতদিন পর দেখছি তোকে।'
সন্ধ্যা মুচকি হেসে জবাব দিলো,
_ এইতো ভালো। তুমি কেমন আছো আপু?'
_ ভালো। একি! তোর জামা ভিজে কেন?'
_ ও কিছু না। ওয়াশ রুমে ছিলাম। মুখ ধুতে গিয়ে পানি পড়েছে।'
_ ওওহ!'
_ আর ওখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করিস না। যা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।' ( কেয়া বেগম )
_ যাচ্ছি বড় মা। তৌসিফ ভাই কোথায়?'
_ ও তো ওর রুমে আছে। যা গিয়ে কথা বলে আয়।'
হাসিমুখে চলে গেলো জেসিকা। ময়না বেগম বলে উঠলেন,
_ দেখলে বড় আপা, আমাদের জেসিকা কত বড় হয়ে গেছে। কত ফর্সা হয়েছে বাবা!'
_ হ্যাঁ! সেই যে চলে গেলো মামা বাড়ি, আর তো এই ফিরলো।'
_ তা এখন থেকে কি ও আমাদের সাথে থাকবে?'
_ তাই তো শুনলাম। তোর ভাইজান কালকে বলছিলো।'
_ তাহলে তো বেশ ভালোই হবে। আমাদের সংসার টা আবার আগের মতো হয়ে উঠবে।'
_ ঠিক বলেছিস!'
দুজনে যে যার কাজে চলে গেলো। সন্ধ্যা ও নিজের রুমে চলে এলো। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে তার। বেডের উপর বসে পড়লো। রমনা বাইরে থেকে উঁকি দিলো তার রুমে।
_ আসবো আপু?'
সন্ধ্যা চেয়ে দেখলো রমনা দাঁড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে। সে হাসিমুখে বলল,
_ হ্যাঁ আয়। কি ব্যাপার। এই সময় আমার রুমে?'
_ তোমার সাথে কথা বলতে এলাম। এখন মা কাজে ব্যস্ত। তাই তোমার কাছে এসেছি। নইলে আবার দেখে ফেললে তো তোমার কাছে আসতে দেবে না।'
_ তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু আমার কাছে এলি কেন। জেসিকা আপু এসেছে। তার কাছে যেতে পারতি। কতদিন পর এলো। তোর জন্য কতকিছু নিয়ে এসেছে বলতো। কত গল্প করতে পারতি!'
_ তুমি চুপ করো তো। লাগবে না আমার কিছু। যাবো না আমি ঐ মেয়েটার কাছে। ঐ মেয়েটা একটুও ভালো না। খালি তোমার সাথে হিংসে করে।'
_ কে বলেছে তোকে এসব। আপু তো এখানে ছিলোই না। তাহলে হিংসা করলো কীভাবে?'
_ ছিলোনা তো কি হয়েছে। যখন থাকতো তখন তো করতো। সব বলেছে আমাকে সোহান ভাই। কীভাবে ঐ মেয়েটা তোমার সব জিনিস কেড়ে নিতো। তোমাকে সবার কাছে বকা খাওয়াতো।'
_ চুপ! এসব বলতে নেই। ও তোর বড় না?'
_ বড়ো তো কি হয়েছে। বড় তো ও তোমার ও। তোমার তো আপন বোন। তারপরও তোমার সাথে এমন করতো কেন?'
চুপ করে গেলো সন্ধ্যা। উত্তর টা তো তার কাছেও নেই। তখনই দরজার বাইরে থেকে আওয়াজ এলো,
_ কারণ যেগুলো আমার প্রাপ্য, সেগুলো তোর সন্ধ্যা আপু পেয়েছিলো। তাই তো নিজের জিনিসগুলো আবার নিজের করে নিয়েছি।'
চলবে....?
