#প্রতিশোধ
#হুমায়রা_হিমি
#পর্ব_৩
সেদিন নাহিদা'কে বেশ মনে পড়ছিল।আলমারি ঘাটতে গিয়ে একটা রাবার বেন্ট ফেলাম। হুট করে অতীতের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো,একদিন মজা করে নাহিদার বাঁধা চুল গুলো খুঁলে দিয়ে সেই রাবার বেন্টটি পকেটে ঢুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। অতীতের কিছু সুন্দর মুহুর্ত হঠাৎ চোখের সামনে দৃশ্যমান হতেই ঠোঁটের কোনে কিঞ্চিৎ হাসি এবং চোখের কোনে কয়েক ফোঁটা অশ্রুকণা এসে জমাট বাঁধল। বুক'টা মুহুর্তেই মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। মেয়েটার সেই কষ্ট সেই কান্না সেই আহাজারি সব সব মনে পড়তে লাগলো। এরপর অনেক করে খুঁজতে লাগলাম নাহিদা'কে। একবার ক্ষ*মা চাইতে হবে তার কাছে।জানি না মেয়টা এখন কোথায় আছে কেমন আছে। একটা বার সুযোগ চাইবো সেই আশায় খুঁজতে লাগলাম । কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারলো না তার।
দিন'কে দিন বাসা থেকে অপমান অবহেলা পেতে শুরু করেছিলাম। চাকরির জন্য এদিক সেদিক ছুটছিলাম তবে কোনো ফয়সালা করতে পারছিলাম না৷ এরপর শুরু হলো আমার পতনের আসল অধ্যায়।
চাকরি নেই, সম্মান নেই, সংসার নেই—আমি যেন ভাসমান এক মানুষ। সকালে বের হতাম কাজের খোঁজে, রাতে ফিরতাম ব্যর্থ হয়ে। যাদের সাথে একসময় চায়ের আড্ডা জমতো, সেই বন্ধু-বান্ধবরাও ধীরে ধীরে ফোন ধরা বন্ধ করে দিল। দেখা হলে এড়িয়ে যেত। কেউ কেউ সহানুভূতির ভান করত, কিন্তু চোখের কোণে অবহেলার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য একদিন শ্বশুরবাড়ি গেলাম। ভেবেছিলাম সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নেব। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়াতেই শ্বশুর কড়া গলায় বললেন,
“আমার মেয়ের জীবনে আর পা দিও না। যে মানুষ নিজের স্ত্রীকে মা**রতে পারে, তার সাথে আমার মেয়ের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।”
আরও অনেক অপমান শুনে মাথা নিচু করে ফিরে এলাম। কিন্তু একটা বারের জন্য ও কেউ আমার স্ত্রীর সেই অপ*রাধটি দেখলো না। কিছুদিনের মধ্যেই কাগজপত্র এলো ডি**ভোর্সের। সই করে দিলাম। যেন জীবনের শেষটুকু সম্পর্কও শেষ হয়ে গেল।
দিনকে দিন আমি ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে লাগলাম। নাহিদার মুখটা বারবার ভেসে উঠত। ওর কান্না, ওর অনুনয়, ওর অপ*মানিত কণ্ঠ—সব যেন আমার কানে বাজত। মনে হতো, আজ আমি যা ভুগছি, সবই আমার প্রাপ্য। অনুতাপের ভারে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো।
মা-বাবা থেকে শুরু করে সবার থেকে অবহেলা পেতে শুরু করি।
টাকার টানাটানিতে একসময় বাধ্য হয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের কাজ নিলাম। ওয়েটারের ইউনিফর্ম পরে ট্রে হাতে টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতাম। কেউ বকাঝকা করত, কেউ টিপস দিত। মাথা নিচু করে সব সহ্য করতাম। ভাবতাম, এই কি সেই আমি, যে একদিন টাকার গরম দেখিয়ে চলতো!
এভাবেই দিন চলছিল কোনোমতে।
একদিন নিউজফিডে চোখে পড়ল একটা চাকরির বিজ্ঞাপন। পোস্টটা আমার আগের অভিজ্ঞতার সাথে মিল আছে। মনে হলো শেষবারের মতো চেষ্টা করে দেখি। সামান্য সঞ্চয় জোগাড় করে চলে গেলাম চট্টগ্রাম। এক পুরনো বন্ধুর সাহায্যে কয়েকটা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিলাম। প্রতিদিন অপেক্ষা—ফোন আসবে কি আসবে না, সেই উৎকণ্ঠা।
অবশেষে এক বিকেলে ফোন এলো। ফোনের অপাশ থেকে কেউ একজন বলল,
“মিস্টার মেহেদী, আপনাকে সিলেক্ট করা হয়েছে।”
ফোন কেটে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। চোখের কোণে জল এসে গিয়েছিল—দুঃখের নয়, যেন নতুন শুরুর। চেনা মানুষগুলো কীভাবে অচেনা হয়ে গেলো বেকারত্বের সময় এখন আবার জীবন নতুন করে একটা সুযোগ দিয়েছে ভাবতেই আনন্দ লাগছে।
চাকরির প্রথম দিনটা আমার কাছে অদ্ভুত রকম আনন্দের ছিল। নতুন শার্ট ইস্ত্রি করে, চুল আঁচড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলেছিলাম—“এবার সব ঠিকঠাক হবে তো?"
সেদিন রিকশায় করে অফিসে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মাঝপথে জ্যামে আটকা পড়লাম। বিরক্ত হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিলাম। ঠিক তখন পাশের একটা গাড়ির ভেতর চোখ আটকে গেল।
ড্রাইভারের পাশে বসে আছে এক মেয়ে।
মাথায় হালকা ওড়না, চুল খোঁপা করা চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখটা পাশ ঘুরানো।
হৃদপিণ্ড যেন থেমে গেল মুহূর্তের জন্য।
নাহিদা?
আমি রিকশা থেকে সামান্য উঠে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ ঘুরাল। চোখ দুটো… সেই গভীরতা, সেই শান্ত দৃঢ়তা।
জ্যাম ছাড়তেই গাড়িটা এগিয়ে গেল। আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা আর ভার মিশে গেল একসাথে।
হয়তো ও-ই ছিল। হয়তো বা না। তবে সেদিন আমি শিওর ছিলাম না। ভাবছিলাম নাহিদা এই শহরে কিভাবে আসবে এখানে তো তার আত্নীয়_স্বজন কেউ'ই নেই।
এরপর জ্যাম ছাড়তেই
রিক্সায় গিয়ে বসলাম। চার চাকার গাড়িটাও চলে গেলো অনেক দূরে আমার রিক্সা পড়ে রইলো বেশ পেছনে। মনে মনে বেশ অসস্তিবোধ হচ্ছিল। ধম বন্ধ লাগছিল।
হুট করে রিকশাওয়ালা বলল, “ভাই, নামবেন না?”
চমকে উঠে দেখি অফিসের সামনে এসে গেছি।
আমি ধীরে ধীরে নেমে দাঁড়ালাম। মাথার ভেতর কেবল একটা কথাই ঘুরছিল—
নাহিদা'কে খুঁজে বের করতেই হবে।যে অন্যায় আমি করেছি সেটার জন্য দরকার পড়লে তার হাতে পায়ে ধরবো। আমাকে একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য বলবো। নতুন করে আবার সবটা শুরু করবো।
কিন্তু অন্যায় করলে তার প্রতিধ্বনি একদিন না একদিন ফিরেই আসে এটা কিভাবে অস্বিকার করি!
এভাবে কেঁটে যায় বেশ কয়েকদিন।
আমি রাতে শুয়ে শুয়ে আমার প্রাক্তন স্ত্রীর ফেসবুক আইডি ভিজিট করছিলাম। সে সময় মায়ের ফোন পেয়ে রিসিভ করে কানে ধরলাম।
মায়ের ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে শুধু কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
“হ্যালো, মা? কী হয়েছে?”
মায়ের গলা কাঁপছিল, শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে আসছিল।তবুও বহু কষ্টে তিনি বললেন,
“তোর বোনরে আজ ঐ বাড়ির লোকেরা খুব অপমান করছে রে… অনেক কথা শুনাইছে। ঝামেলার মধ্যে ওর শাশুড়ি ওর গায়ে হাত তুলছে। শেষে বলে দিয়েছে ঐ বাড়িতে থাকবার দরকার নাই। পাঠাই দিছে আমাদের কাছ এখন তুই কিছু একটা কর।
আমার বুকের ভেতর যেন কেউ পাথর ছুড়ে মা*রল সেদিন। হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আমি কোনো শব্দ করতে পারলাম না। মা ওপাশে কাঁদছিলেন, বলছিলেন
“তুই কিছু কর বাবা… মেয়েটার সংসার বাঁচা।
আমি চুপ কেবল চুপ করে রইলাম।
কথা যেন গলায় আটকে গেছে।
মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্যটা আমি আগেও কোথাও দেখেছি। শুধু চরিত্র বদলেছে।
নাহিদার সেই কাঁদতে কাঁদতে বলা কথা
“আমাকে বাঁচাও আমি তোমার সাথে বাঁচতে চাই। আমার প্রাণ'টা ভিক্ষে দাও আমি তোমাকে ছাড়া ম'রে যাবো। "
ওর সেই অসহায় চোখ, অপমানিত নীরবতা—সব হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল।
আমি ধীরে ধীরে ফোনটা কেটে দিলাম।
মায়ের কান্না তখনও কানে বাজছে। কিন্তু আর একটা শব্দও বললাম না।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলাম বিছানার কিনারায়। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়ে এলো ভারী হয়ে।
আস্তে করে ফিসফিস করে বললাম,
“শুনছো নাহিদা… তোমার রব আছেন। উনি এক এক করে সবাইকে তোমার হয়ে শাস্তি দিচ্ছেন। তোমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে না… তোমার সৃষ্টিকর্তাই তোমার হয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নিচ্ছেন।”
কথাগুলো বলার পরও শান্তি পেলাম না।
বরং বুকের ভেতর আরও অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
এটা কি সত্যিই শাস্তি?
নাকি এটা একটা শিক্ষা?
আমি হঠাৎই বুঝতে পারলাম—প্রতিশোধের কথা বলে আমি যেন নিজের অপরাধের ভার হালকা করতে চাইছি। কিন্তু সত্যিটা হলো, আমি অন্যায় করেছি। আর সেই অন্যায়ের প্রতিধ্বনি ফিরে আসছে আমার চারপাশে।
বোনের কান্না, মায়ের অসহায়তা—সব যেন আমাকে আয়না দেখাচ্ছে।
আমি উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। রাতের আকাশ নিঃশব্দতায় ভরে আছে। শহরের আলো ঝাপসা লাগছে চোখে জমে থাকা পানির জন্য।
নিজেকে নিজে বললাম
“না মেহেদী,এটা কোনো শাস্তি না। এটা অনেক বড় একটা সতর্কবার্তা। অন্যায়ের ফল কেমন তেতো হয়, সেটা আমাকে দেখানো হচ্ছে।”
যদি কখনো নাহিদার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পাই, তবে প্রতিশোধের কথা নয় ক্ষমা চাওয়ার শক্তিটুকুই যেন পাই।
কারণ প্রতিশোধ মানুষ নেয়,
কিন্তু ন্যায়বিচার হয় নীরবে—সময়ের হাতে।
চলবে?
খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্ব পাবেন এই ওয়েবসাইটেই পাবেন পরের পর্ব গুলা।
#viralpost #story #foryou #photooftheday #viral #photochallenge #গল্প
