#আটত্রিশ_বছর। দ্বিতীয় পর্ব
1 Minute With Mitu
আবেদের মৃত্যুর পর দিনগুলো আমার কাছে অদ্ভুত রকম ফাঁকা লাগতে লাগলো। ফাঁকা মানে শুধু একা থাকা না—বরং এমন এক শূন্যতা, যেখানে শব্দ নেই, অথচ প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয় কেউ যেন ভিতর থেকে ডাকছে।
জানাজা থেকে ফিরে এসে আমি দীর্ঘ সময় বারান্দায় বসে ছিলাম। আকাশটা সেদিন অস্বাভাবিক পরিষ্কার ছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে কোনো অশান্তি নেই। অথচ আমার ভিতরে যেন একটা ঝড় থামতেই চাইছিল না।
শশুর আবদুল করিম সাহেবের কথাটা বারবার মাথার মধ্যে ঘুরছিল—
“ও তোমার জন্য কী করেছে… জানলে তুমি কখনো চলে যেতে না।”
কী করেছে আবেদ?কার জন্য করেছে?আর কেন আমি জানতাম না?
আটত্রিশটা বছর একসঙ্গে থাকার পর একজন মানুষের জীবনে এমন কী থাকতে পারে, যা আমি জানতেই পারলাম না?
আটত্রিশ বছরের সংসার ভেঙে যাওয়ার কষ্ট আমি আগেই পেরিয়েছি। কিন্তু এবার অন্যরকম একটা যন্ত্রণা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা অসমাপ্ত বইয়ের মাঝখানে আটকে আছি—যার শুরুটা আমি জানি, শেষটা দেখেছি, কিন্তু মাঝের পাতাগুলো কেউ ছিঁড়ে ফেলেছে।
সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি।
আবেদের সঙ্গে শেষ দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল। তার সেই অদ্ভুত শান্ত মুখ। কোনো কাজের ব্যাখ্যা না দেওয়া। হুট করে ডিভোর্স চাওয়া। তখন মনে হয়েছিল সে আমাকে ঠকিয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছিল—সে কি সত্যিই শুধু ঠকিয়েছিল?নাকি আরও কিছু ছিল?
পরদিন সকালে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি সত্যটা জানব।
কারণ এই প্রশ্নগুলো নিয়ে বাকি জীবন শান্তিতে কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব না।
আমি প্রথমে গেলাম আমার পুরোনো বাসায়। যে বাসায় আমি আর আবেদ একসাথে ছিলাম। ডিভোর্সের পর আমি অন্য বাসায় উঠে গিয়েছিলাম। বাসাটায় এখন তালা ঝুলছে। বাচ্চারা দেশের বাহিরে থাকে, এই বাসায় আর কেউ থাকে না।আমার শশুর আমার গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে।
বাসার চাবিটা এখনো আমার কাছেই ছিল। দরজা খুলতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠছিল। মনে হচ্ছিল—আমি শুধু একটা ঘরে ঢুকছি না, বরং একটা অতীতে ঢুকছি।
ভেতরে ঢুকে দেখি সব কিছু প্রায় আগের মতোই আছে। সোফার কাভারটা পর্যন্ত বদলায়নি। টেবিলের ওপর পুরোনো ফুলদানি। বুকশেলফে আবেদের বইগুলো। সব কিছুর পর ময়লার আস্তরণ স্পষ্ট...যেনো অনেকদিন এই বাসায় কেউ আসেই না।
ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত গন্ধ ছিল—পুরোনো স্মৃতির গন্ধ।
আমি ধীরে ধীরে আবেদের রুমে ঢুকলাম।
এই রুমটা সবসময় তার নিজের ছিল। আমি কোনোদিন তেমন ঢুকতাম না। সংসারের এত কাজ, বাচ্চাদের দেখাশোনা, অফিস—সব মিলিয়ে তার ব্যক্তিগত জায়গা নিয়ে ভাবার সময়ই পাইনি।
আজ প্রথমবার মনে হলো—আমি ইচ্ছে করলেই হয়তো অনেক কিছু জানতে পারতাম।
আমি আবার সেই টেবিলের সামনে দাঁড়ালাম। যে টেবিলের ড্রয়ার খুলে আমার জীবন বদলে গিয়েছিল।
ড্রয়ার টা খুললাম।
পুরোনো ফাইলগুলো আগের মতোই আছে। কিন্তু এবার আমি ধৈর্য নিয়ে সব দেখতে শুরু করলাম।
হঠাৎ একটা ছোট খাম চোখে পড়ল। খুব সাধারণ সাদা খাম। উপরে শুধু একটা শব্দ লেখা—
“নাজমা”
আমার বুক ধক করে উঠল।
খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। মনে হচ্ছিল—এই খামের ভিতরে হয়তো এমন কিছু আছে, যা আমার পুরো জীবনটাই বদলে দেবে।
ধীরে ধীরে খাম খুললাম।
ভেতরে একটা চিঠি।
আবেদের হাতের লেখা। আমি এই লেখাটা হাজার বার দেখেছি—বাজারের লিস্টে, ছেলের স্কুলের নোটে, ঈদের কেনাকাটার হিসাবের খাতায়।
কিন্তু এই প্রথম মনে হলো—এই লেখাটা আমি চিনলেও মানুষটাকে চিনিনি।
চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম।
“নাজমা,
এই চিঠিটা তুমি কবে পড়বে জানি না। হয়তো কোনোদিনই পড়বে না। তবুও লিখছি।
আমাদের জীবনটা বাইরে থেকে খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু একটা কথা আমি কোনোদিন তোমাকে বলতে পারিনি।
তুমি আমাকে সবসময় শক্ত মানুষ মনে করতে। কিন্তু আমি ভীষণ দুর্বল ছিলাম।
অনেক বছর আগে আমি একটা ভুল করেছিলাম। এমন একটা ভুল, যে ভুলের মাশুল আমি সারাজীবন দিয়ে গেছি।”
এখানে এসে আমার হাত কেঁপে উঠল... বাকিটা পড়ার সাহস হচ্ছে না...
আমাদের সমাজে অনেক নারী আছে, যারা স্বামীর পাশে সারাজীবন দাঁড়িয়ে থাকে। তারা সংসার ধরে রাখে, সন্তান বড় করে, নিজের স্বপ্ন গুলো গুছিয়ে রাখে কাপড়ের মতো আলমারির ভেতরে।
কিন্তু সেই নারীদের জীবনেও কত প্রশ্ন থাকে, কত অজানা গল্প থাকে—যেগুলো কেউ শোনে না।
যারা ভালোবাসে, বিশ্বাস করে, ভেঙে যায়—তারপর আবার বাঁচতে শেখে।
-চলবে......।
লেখিকা: Ummey Salma Khan Mitu
পরের পর্বগুলা এখানেই দেওয়া হবে তাই এখানেই চোখ রাখুন ধন্যবাদ।
#গল্প #post #1minutewithmitu #foryou #folklore #Holidays #story #ভাইরাল #পোস্ট #Ebook #tradition
