সুরূপা || পর্ব.২ || 

আল আমিন হোসাইন


জীবন রায়ের বাসার লম্বা বিল্ডিংয়ের ভেতরে চারটা কামরা। প্রত্যেকটা কামরার সঙ্গে ওয়াশরুম রয়েছে।

জীবন রায় উত্তর দিকের একটা কামরায় নিরবকে থাকার জন্য ব্যবস্হা করে দিলেন। নিজের লুঙ্গি-গামছা দিয়ে গোসল করতে বলে গেলেন।


নিরব গোসলখানায় ঢুকল। জীবন রায় রান্নাঘরে স্ত্রীর নিকট এসে উপস্থিত হলেন। তার নাম গঙ্গা ঘোষ। জীবন রায় গত রাতে বাসায় ছিলেন না—শত্রুদের তল্লাশিতেই রাত কেটেছে। ভোরবেলায় ধরা পড়ে ধাওয়া খেয়ে বাজারে এসে শত্রুদের হস্তগত হন। এমন সময় যদি নিরব এসে উপস্থিত না হতো এবং অমন অস্বাভাবিক অঘটন না ঘটাতো, তাহলে হয়তো জীবন রায় আর কোনো দিনই বাড়িতে ফিরতে পারতেন না—আজীবনের জন্য বিদায় হয়ে যেতেন।


গঙ্গা ঘোষ পাকঘরে রান্না করছিলেন। গতকাল স্বামী ঘরে না ফেরায় রাতটা তার কেটেছে আতঙ্কে। আজ ভোরে স্বামীর মুখখানা দেখে সেই দুশ্চিন্তা মুহূর্তেই রূপ নিয়েছে অভিমানে। জীবন রায় স্ত্রীর নিকটবর্তী হয়ে খুব কাছে ঘেঁষে বললেন, “কি গো! কিছু সাহায্য করব?”


গঙ্গা ঘোষ দৃষ্টি নত রেখে অভিমানী কণ্ঠে বললেন,


“রাতে যার সঙ্গে ছিলেন, তার কাজেই সাহায্য করেন গিয়ে। যান।”


জীবন রায়ের চোখে জল চলে এলো। স্ত্রী খোঁচা দিলেও, সে যদি আজ আর প্রাণ নিয়ে না ফিরত—তাহলে তাদের অবস্থা কী হতো! জীবন রায় পেছন থেকে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলেন। স্ত্রীর কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বললেন,


“যার সঙ্গে ছিলাম, সে নিয়ে গেলে আর ফেরত দিত না। সে শুধু নিতে জানে, দিতে জানে না। সে হলো যম।”


জীবন রায় ভোরের সব ঘটনা খুলে বললেন। তাঁর বারবার মনে হচ্ছিল—নিরব ছেলেটা যেন তাকে বাঁচানোর জন্যই দূর শহর থেকে এই শহরে এসেছে।

গঙ্গা ঘোষের চোখ জোড়া জলে টইটুম্বুর হয়ে উঠল। তিনি চামচটা তরকারির ওপর রেখে স্বামীকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। তারপর পা থেকে মাথা অবধি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বললেন,


“কিছু হয়নি তো তোমার? চাকরিটা ছেড়ে দাও। আমরা ইন্ডিয়ায় চলে যাই। সেখানে যা পারি করে খাব। 

তবুও এমন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচতে চাই না।”


জীবন রায় পতনির চেহারাখানা তুলে দু'হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা স্ত্রীর চোখের জলরাশি মুছে বললেন,


“স্রষ্টা কপালে মৃত্যু লিখে রাখলে ভিক্ষা করে খেলেও মৃত্যু হবে। ফকিররা বুঝি চিরজীবী হয়? তাদেরও তো মৃত্যু ঘটে। ভয় পেয়ো না—আমার কিচ্ছু হবে না। মানুষের ভালোর জন্য লড়ছে তোমার পতি। এখানে ভয় নয়, বুকভরা সাহস আর মুখভরা গর্বের হাসি রাখতে হয়।”


‎গঙ্গা ঘোষ ঘুরে রান্নায় মন দিলেন। মরলে তো কাঁদতে হবে তাকে। তার কি! সে তো স্বর্গে ঘুরে বেড়াবে। আর এদিকে পতি ছাড়াই নিজের জীবন পার করতে হবে। সে কি বুঝে! স্বামী ছাড়া রাজপ্রাসাদে জীবন পার করার চেয়ে স্বামীর সঙ্গে কুঁড়েঘরে জীবন পার করা অনেক ভালো। পুরুষ মানুষ যে কোনো কাজ করেই সংসার সামলাতে পারবে। অযথা কেন এতো ঝুঁকির পেশায় থাকতে হবে। জীবন রায় জিগ্যেস করলেন,


"আমার পরান দুইডা কি এখনও ঘুমে?" 


গঙ্গা ঘোষ মুখ ভার করে 'জ্বি' বললেন। ‎জীবন রায় মৃদু হেঁসে পতনির অভিমান মাখা চেহারায় চুমু এঁকে সন্তানদের কামরার দিকে পা বাড়ালেন। জীবন রায়ের দুই সন্তান, ছেলে-মেয়ে। মেয়ে অঞ্জনা, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলের নাম সঞ্জয়। প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ভাই-বোন এক সঙ্গে একই কামরায় ঘুমায়। 

নিরব গোসল সেরে বিছানায় বসল। পরনে লুঙ্গি, গায়ে টি-শার্ট। এর বাইরে তার গায়ে পরার মতো জীবন রায়ের বাড়িতে আর কোনো পোশাক নেই। যেদিন ঝড়ের রাতে নিরবকে পথ থেকে কুড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেদিনও ঠিক এমনটাই হয়েছিল। সেই বিশাল বাড়িতে ছোট ছেলেদের কোনো পোশাক ছিল না।

ভদ্র মহিলার একটা মেয়ে ছিল নিরবের সমবয়সী—সেই ছোট্ট মেয়েটাই মূলত তার মাকে ইশারায় নিরবের খোঁজ দিয়েছিল। নিরব সেদিন ঝড়ের মধ্যে একটা ভাঙা ঘরে বসে কাঁপছিল। ভদ্রমহিলা নিরবকে বাড়িতে এনে গোসল করিয়ে মেয়ের পোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট্ট মেয়েটা তার পোশাক নিরবের গায়ে দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। দেখতে নিরবকে আপন বোনের মতো লাগছিল।


গঙ্গা ঘোষ টেবিলে সবার জন্য খাবার দিলেন। সঞ্জয় ও অঞ্জনা এসে বসে পড়ল। জীবন রায় নিরবকে ডেকে আনলেন। নতুন মানুষ দেখে দুই ভাই-বোন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। জীবন রায় ছেলে-মেয়ের প্রশ্নবোধক চাহনির উত্তরে পরিচয়সরূপ বললেন,


"তার নাম নিরব চৌধুরী। তোমাদের আঙ্কেল হয়।

আজ থেকে সে আমাদের সাথে এ বাড়িতেই থাকবে।"


গঙ্গা ঘোষ সবার থালায় ভাত-তরকারি বেড়ে এগিয়ে দিয়েছেন। সবাই খাওয়া শুরু করেছে। সঞ্জয় কয়েক লোকমা ভাত খেয়ে নিরকে জিগ্যেস করে বসল, 


"আঙ্কেল আপনার বাড়ি নাই?" 


নিরব মৃদু হেসে বলল,


"জি আঙ্কেল, আছে।"


"আপনার মা-বাবা নাই?"


"বাবা নাই মা আছে।"


"তাহলে আমাদের বাড়িতে কেনো থাকবেন? আপনার মা কি আপনাকে বাড়ি থেকে তাড়াই দিছে?"


সঞ্জয়ের এমন খাপছাড়া প্রশ্ন শুনে গঙ্গা ঘোষ ছেলেকে দিলেন এক ধমক। মৃদু শাসিত কন্ঠে বললেন, 


"সঞ্জয়! এসব কেমন কথা? সে তোমার বাবার সাথে কাজ করবে। তাই এ বাড়িতে থাকবে। পরে সময় হলে চলে যাবে।"


নিরব অল্প কয়েক লোকমা ভাত খেয়েছে সবে মাত্র। অমনি সঞ্জয়ের কথায় স্ত্রীর কথা মনে পড়ে গেল। তার স্ত্রীর নাম নুসাইবা চৌধুরী। নিরব খেতে পারছে না। মেয়েটা এখন কেমন আছে? কতুটু সেরে উঠেছে? সে পাশে থাকলে এক পলক দেখতে তো পারতো। তারা কি নিরাপদে সিঙ্গাপুর পৌঁছাতে পেরেছে? নাকি সাব্বিরের দলবল হাসপাতালে গিয়েও তাদের ক্ষতি করে ফেলেছে। নিরবের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোটা অশ্রু টপ করে প্লেটে পড়ল। জীবন রায় খেয়াল করলেন। তিনি বুঝলেন, ছেলেটার পরিবারের সাথে খুব খারাপ কিছু হয়েছে। এখনও কিছু জিজ্ঞেস করেনি জীবন রায়। সময় হলে এমনিই জানা যাবে। নিরব সঞ্জয়ের জন্য খাবার রেখে আর উঠল না। সে উঠে গেলে হয়তো গঙ্গা ঘোষ ছেলেটাকে বকবে। সে যতটুকু সম্ভব জোর করে খাওয়ায় মনোযোগ দিল।


খাবার শেষে জীবন রায় নিরবকে বিশ্রাম করতে বললেন। নিরব ঘরে এসে বিছানায় বসল। জানালার ফাঁক দিয়ে উঠানের দু'ধার ভর্তি ফুল গাছ দেখা যাচ্ছে। গত রাতে স্ত্রীর ঝলসে যাওয়া দেহখানা বারবার চোখের পাতায় ভেসে উঠছে। ভিতরখানা হু হু করে কেপে উঠছে। হঠাৎ জীবন এমন হলো কেন! যা হবার তার সাথে হতো সব। কেন তার স্ত্রীর সাথে হলো? পুরুষরা এমন দেহলোভী হয় কেন? কেন তাদের সুরূপা মেয়েই লাগে? কেন তারা জোর করে হলেও সুন্দর মেয়েদের সৌন্দর্য ভোগ করে? নারীজাতির বুঝি কোনো জীবনস্বাধীনতা নেই? তাদের বুঝি শখ নেই? তাদের বুঝি পছন্দ-অপছন্দ নেই? কেন অপছন্দের পুরুষের কাছে নিজেকে ক্ষয় হতে হবে? কেমন পুরুষ তারা, নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের ইচ্ছা পূরণ করে। 


নিরব এ যাবৎকাল, নুসাইবার সাথে স্কুল যেত। আর স্কুল থেকে বাসায় আসতো। এ ছাড়া তার কাছে পৃথিবীর বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা নেই। সে ভাবে পুরুষ সুন্দর। পুরুষ আদর্শবান জাতি। তারা নারীর সুরক্ষা করে। তারা নারীর জন্য পরিশ্রম করে। তারা সংসারের জন্য নিজের জীবন-যৌবন কুরবান করে। এর বাহিরে তার কোনো ধারণা ছিল না পুরুষ জাতি সম্পর্কে। সে শুধু এতটুকুতে প্রত্যক্ষ সাক্ষী যে, কিছু বখাটে ছেলে নুসাইবা এবং আরো সুরূপা মেয়েদেরকে বিরক্ত করতো, কিন্তুু সে এ পর্যন্তই দেখেছে এর বাহিরে কিছু দেখেনি। যা দেখেছে তা হলো সে নিজ চোখে নিজ স্ত্রীর অর্ধনগ্ন দেহে এসিড ছুড়ে মারতে দেখেছে। অতপর সে তার সরলতা হারাচ্ছে, ভয় দূর হচ্ছে, ক্রমশ পাথরে পরিণত হচ্ছে। প্রতিশোধের ক্ষুধায় পশু হয়ে উঠছে। 


নিরব এবার এস এস সি শিক্ষার্থী। নুসাইবাও তার সাথে পড়তো। কিন্তুু পাড়ার বখাটে ছেলেদের উত্তাপে নিরবের সঙ্গে নুসাইবার বিয়ে দেওয়া হয়, যাতে নুসাইবা তাদের কবল থেকে বেঁচে যায়। পরে এর প্রতিক্রিয়া স্বরুপ নুসাইবাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখা ছেলেটা নুসাইবার ঘরে গিয়ে জামা ছিঁড়ে গায়ে এসিড ছুড়ে মারে।


__________অতীত

সবেমাত্র নবম শ্রেণিতে উঠেছে নিরব আর নুসাইবা।

হাইস্কুলের মেয়েদের শরীরে তখন সৌন্দর্য ফুটছে। তাদের চেহারা-শরীরের পরিবর্তন ঘটছে। দেখতে ভারী মিষ্টি লাগছে। হাইস্কুলের সদ্য সুরূপা মেয়েগুলোকে পথের পুরুষজাতি কেমন লোলুপ দৃষ্টে দেখে। কি অদ্ভুত চাহুনি তাদের। দেখতে কেমন বিশ্রী লাগে—ভিতরে ভয় লাগে। নিরব যখন পথে হাঁটে তখন সে পুরুষদের চোখের দিকে তাকায়। অধিকাংশ পুরুষ এক দৃষ্টিতে পথের সুরূপা মেয়েদের দেহের দিকে চেয়ে থাকে। হাইস্কুল ছুটির সময় অনেক ছেলে এসে ভীড় জমায়। কিছু কিছু ছেলে সুন্দরী মেয়েদের পিছু নেয়। মেয়েদের বাড়ি পর্যন্ত পিছে পিছে হেঁটে যায়। 


একদিন নিরব ছুটির পর আগে বের হয়ে দোকানে আইসক্রিম কিনছিল। এমন সময় দলের কিছু ছেলে সরূপা মেয়েদের সৌন্দর্য নিয়ে বিশ্রী ভাষা বলছিল। 

দেহের গঠন নিয়ে, চেহারা নিয়ে, সরূপাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিশ্রী ভাষায় ব্যাখা করছিল। নিরব ছেলেটা এতটাই সরল যে, কাউকে ধমক বা নিষেধ করার মত সাহস তার বুকে ছিল না। সে নুসাইবাকে পেয়ে ডাকতে যাবে এমন সময় দলের কিছু ছেলে নুসাইবার দিকে আঙ্গুল তাক করে বলে, "দোস্ত ওই মা*লডা দেখ। এমন মা*ল কপালে জুটলে জীবনে আর কি লাগে। চান্স নিতে পারস।" নিরব তখন প্রচন্ড রেগে যায়। কিন্তুু কিছু বলার সাহস হয় না। দৌঁড়ে নুসাইবার সঙ্গে বাড়ির পথে হাটা ধরে।


দুইজন ছেলে নুসাইবার পিছু পিছু আসছে। ফাঁকা পথে একটা ছেলে নিরবকে ডাকে, "এই ছেলে একটু শুনো।"

নিরব, নুসাইবা দুজনই দাড়ায়। ছেলেটা আবার বলে,

"এদিকে আসো একটু।" নিরব হেঁটে ছেলেটার কাছে যায়। এতক্ষণে আরেকটা ছেলে নুসাইবার কাছে চলে গেছে। ছেলেটা নুসাইবার নিকটবর্তী হয়ে বলে,

"তোমার বাসা কোথায়?" নুসাইবা বিরক্ত হয়ে বলে,

"মনে নাই।" ছেলেটা মৃদু হাসে। নিরবকে দেখিয়ে বলে, "ওই ছেলেটা তোমার কিছু হয়? প্রেমিক ধরনের কিছু?"

"মনে পড়ছে না।"


ছেলেটা এবার খানিক শব্দ করে হেসে ওঠে। পরে বলে,


“আমার তোমাকে খুব ভালো লাগে! আমাকে কি ভালোবাসা যাবে? ভালো রাখার দায়িত্ব আমার।”


“কত কবি, কত কবিতা লিখে রেখেছে! কই, কোনো কবির চরিত্র তো কবিতার মতো স্বচ্ছ পাওয়া যায় না।

মা বলেন, ‘পুরুষ যে রূপেই নারীর কাছে ঘেঁষুক, উদ্দেশ্য হলো সরূপার সৌন্দর্য ভোগ করা।’

অর্থাৎ পুরুষের সংস্পর্শে থাকা নারীকে ক্ষতিগ্রস্ত হতেই হবে।”


সরল মনা নিরবকে এখন পর্যন্ত ছেলেটা হাবিজাবি বলে যাচ্ছে। নিরব ভদ্রতার ব্যাপারে খুব অনুগত। সে মাথা নেঁড়ে হা হু বলে যাচ্ছে। নুসাইবা তখন জোরে ডাকে,

"ওই নিরব চলে আয়। বলদের মত দাড়াই আছিস কেন?"


#চলবে... পরের পর্বগুলা এখানেই দেওয়া হবে,ধন্যবাদ। 


#প্রিয়_পাঠকগণ! লেখকের লেখনী সম্পর্কে ভালো-মন্দ মন্তব্য করে যাবেন। আর রুচিসম্মত গল্প-কবিতা-উপন্যাস পড়তে পেইজটি ফলো করুন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url