#আলো_আঁধারে 

#জান্নাত

২.


সায়ন্তন ফোনে কথা শেষ করে পিছনে ফিরতেই অবনীকে দেখে চমকে উঠলো। পরপর মুখটা কঠিন করে রাগী গলায় বললো,

_ তুমি এখানে? আমার কাছে কী? আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না। চলে যাও এখান থেকে।' 


অবনী কিছু না বলে সায়ন্তনের পথ থেকে সরে দাঁড়ালো। সায়ন্তন একটু ভড়কালো। কিন্তু পর মূহূর্তেই নিজেকে আবার সামলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। অবনী দৃষ্টিভর চেয়ে র‌ইলো তার যাওয়ার পানে। মুখটা তার অদ্ভুত রকমের শান্ত। কি চলছে তার মাথায়? 


হসপিটাল থেকে বাড়িতে ফিরতেই মনোয়ারা খানম তেড়ে এলেন অবনীর দিকে। হাত তুললেন তাকে মা*রার জন্য। কিন্তু অবনীর মা কুসুম বেগম তাকে সরিয়ে নিলেন। দাঁত কটমট করে মনোয়ারা বেগম বললেন,

_ এই রাক্ষুসি! পা রাখবি না আমার ঘরে। এখানে কেন ঢুকছিস। বেরিয়ে যা। এ বাড়িতে তোর কোনো জায়গা হবে নে।' 


_ মা! কি বলছেন এসব। আমি কোথায় যাবো?' 


_ তুই কোথায় যাবি তার আমি কি জানি। তোর যাওয়ার জায়গার আবার অভাব আছে নাকি? যে নাগরের সাথে ফষ্টিনষ্টি করেছিস সেখেনে যা! দূর হ এখান থেকে।' 


অবনী ছুটে রহমান সাহেবের কাছে গেলো। 

_ বাবা! বাবা আপনি অন্তত বিশ্বাস করুন! আমি এমন কিচ্ছু করিনি। আমাকে তাড়িয়ে দিবেন না বাবা।' 


রহমান সাহেব কিছু বললেন না। চুপ করে র‌ইলেন। অবনী আবার কাতর স্বরে বলল,

_ বাবা! আপনি চুপ করে আছেন কেন? আপনিও কি বিশ্বাস করেন আমি এমন কিছু করেছি?' 


_ বিশ্বাস না করার কি আছে? আমরা ভুল বললেও ডাক্তারি রি*পোর্ট তো ভুল বলবে না।' 


মাঝখান থেকে ফোড়ন কেটে উঠলো সায়ন্তন। রহমান সাহেব তার কথার ও প্রতি উত্তর করলেন না। অবনী নিরাশ হয়ে পড়লো। চট করে কিছু একটা মনে পড়তেই তার মুখের ভাবভঙ্গি পাল্টে গেলো। সে বলে উঠলো,

_ ঠিক আছে। আমি বেরিয়ে যাবো এ বাড়ি ছেড়ে।' 


কুসুম বেগম চমকে উঠলো! মেয়ের হাত ধরে বলে উঠলেন,

_ কি বলছিস এসব মা? মাথা - টাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?' 


_ একদম ঠিক সিদ্ধান্ত ই নিয়েচো! এবার নাও তো, নাও! ঝটপট নিজের তল্পিতল্পা গুটিয়ে বের হ‌ও এ বাড়ি ছেড়ে।' 


রহমান সাহেব এখন‌ও চুপ হয়ে র‌ইলেন। কিন্তু অবনীর এই সিদ্ধান্তে তিনি অমত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মুখে কিছু বললেন না। 


কুসুম বেগম আবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। অবনী তাকে ইশারায় শান্ত হতে বলে আবার বলে উঠলো,

_ যাবো তো বটেই। তবে তার আগে সায়ন্তনের সাথে আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে।' 


_ ও মা! সে কি কথা। আমার ছেলের লগে তোমার আবার কিসের কথা?' 


_ আছে মা। বললাম তো পার্সোনাল কথা! ব্যাক্তিগত! আপনাকে বলতে পারছি না কি কথা আছে।' 


মনোয়ারা বেগম আরোও কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই রহমান সাহেব তাকে থামিয়ে দিলেন। গম্ভীর মুখে বলে উঠলেন,

_ আহ! চুপ করো মনোয়ারা। ও যখন কথা বলতে চাইছে তখন সমস্যা টা কোথায়? সায়ন্তন, ওকে নিয়ে ঘরে যাও।' 


সায়ন্তনের মনে প্রশ্ন এসে ভিড় করলো। অবনী কেন তার সাথে কথা বলতে চাইছে? আর কি কথা ই বা বলতে চায়? 


রহমান সাহেবের ডাকে ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো সায়ন্তন। 

_ কি হলো। এতো কি ভাবছো? কথা কি বুঝতে পারোনি?'


_ ন.. না বাবা! আমি যাচ্ছি।' 


এবার অবনীর দিকে ফিরে বললো,

_ চলো।' 


সায়ন্তন ঘরে চলে গেলো। অবনী তার পিছু পিছু। ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলো অবনী। সায়ন্তন ভ্রু কুঁচকে বললো,

_ কি হলো? দরজা বন্ধ করলে কেন?' 


_ কারণ এখন যে কথাগুলো তোমায় বলবো, তা যদি বাইরের কেউ জানতে পারে, তবে মুখ লুকানোর জায়গা পাবে না তুমি।' 


_ মানে? কি বলছো এসব আজগুবি কথাবার্তা!' 


_ কি বলছি বুঝতে পারছো না সায়ন্তন?' 


_ না পারছি না। ক্লিয়ার করে বলো।' 


_ আচ্ছা বেশ। বলছি। তার আগে এটা বলো তো, আমার গর্ভে সন্তানের বাবা কে সায়ন্তন? আর ডিএন‌এ রি*পোর্ট টা কি সত্যিই আমার ছিলো?' 


অবনীর কথা শুনে শুকনো ঢোক গিললো সায়ন্তন। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার। 

_ ডিএন‌এ রি*পোর্ট তোমার নয় মানে? অবশ্যই ওটা তোমার। আর তোমার গর্ভে আমার নয় অন্য কারো সন্তান।' 


অবনী মুচকি হাসলো। 

_ আচ্ছা? আচ্ছা আর একটা কথা বলো তো!' 


_ আবার কিসের কথা?' 


_ তখন তুমি ফোনে কার সাথে কথা বলছিলে?' 


সায়ন্তন এবার আরোও ঘাবড়ে গেলো। সে তোতলাতে তোতলাতে বললো,

_ ম...ম...মানে? কিসের ক...থা বলছো তুমি?' 


_ বুঝতে পারছো না বুঝি? এতোটা বোকা তো তুমি ন‌ও সায়ন্তন। শোনো, আমার গর্ভে যে তোমার সন্তান রয়েছে সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। আর আমার রিপোর্ট টাও যে তুমিই চেন্জ করিয়ে দিয়েছো সেটা জেনে গেছি আমি। তাই তুমি তখন এতো নিশ্চিন্তে বসে ছিলে। তোমার মুখ দেখেই সন্দেহ হয়েছিলো আমার। এমন ভাব করেছিলে যেন তুমি আগে থেকেই জানো সব! কি ঘটতে চলেছে। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু এটাও জানি, তোমার অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে! বলবো আমি সবাইকে সেটা?' 


_ অবনী! মুখ সামলে কথা বলো। তুমি যে এসব কথা বলছো, তার কোনো প্রমাণ আছে? কি বলবে তুমি বাবা মা কে? তারা তোমায় বিশ্বাস করবে ভাবছো? বোকা মেয়ে!' 


অবনী ফিকে হেসে বললো,

_ বোকা আমি ন‌ই সায়ন্তন, তুমি! তোমার কি মনে হয়, আমি প্রমাণ জোগাড় না করেই তোমার সাথে কথা বলছি? তোমাকে এসব জানাচ্ছি?' 


সায়ন্তনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। কি জানে অবনী? কি প্রমাণ আছে তার কাছে? 

_ কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে?' 


অবনী ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,

_ সেটা তো সময় হলেই দেখতে পারবে। শোনো সায়ন্তন, যদি নিজের ভালো চাও, বাবার সম্পত্তি চাও, তবে আমাকে এ বাড়ি থেকে বের কোরো না। আমি এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে কিন্তু তোমার কপালে অশেষ দুঃখ আছে। না পাবে তোমার পছন্দের মেয়েকে, আর না পাবে বাবার সম্পত্তির এক কানাকড়ি। কারণ তুমি খুব ভালো করেই জানো বাবা কেমন মানুষ! এসব জানতে পারলে তোমায় সম্পত্তি তো দূর, নিজের ছেলে বলেই মানবেন না। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিবেন এ বাড়ি থেকে।' 


সায়ন্তন অবনীর দিকে চেয়ে র‌ইলো কিয়ৎক্ষন। তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এ সেই অবনী! সেই সহজ সরল মেয়েটা! যে রা করতো! বুক ফুটতো তবু মুখ ফুটতো না। সায়ন্তনের কথা যার কাছে ছিলো বেদবাক্য। এতোটা চেন্জ হয়ে গেলো সে এক নিমেষে? 


_ তাহলে কি চাইছো এখন তুমি?' 


_ আমি এ বাড়িতে থাকতে চাই। যেভাবেই হোক, বাবা মাকে রাজি করিয়ে এ বাড়িতে রাখবে আমায়।' 


_ তাতে আমার লাভ? তুমি আমার ঘাড়ে বসে থাকলে তো আমি তাকে পাবো না।' 


অবনীর কষ্ট হয়, সায়ন্তনের কথা শুনে। এই নিচ মানুষটার সাথে সে এতগুলো দিন কাটিয়ে এসেছে? ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেলেও মুখে তার আঁচ ও লাগতে দিলো না অবনী। বাইরে থেকে শান্ত র‌ইলো সে। 


_ তোমার লাভ তো আছেই। আমি ৩ মাস থাকবো তোমার সাথে। ৩ মাস পরেই তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে পেয়ে যাবে। আর বাবা ও তোমার কুকীর্তির কথা জানতে পারবে না।' 


সায়ন্তন ভ্রু কুঁচকে বললো,

_ তোমাকে আমি কেন বিশ্বাস করবো?' 


_ বিশ্বাস করা ছাড়া তোমার কাছে কোনো উপায় নেই সায়ন্তন। নিজের ভালো চাইলে তোমাকে এটাই করতে হবে। ভেবে দেখো, কি করবে তুমি!' 


সায়ন্তন ভাবলো কিছুক্ষণ। তারপর মাথা নাড়িয়ে বললো,

_ ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি বাবা মা কে বোঝাতে। কিন্তু ৩ মাসের আর একটা দিন‌ও বেশি নয়।' 


সায়ন্তন ঘরে থেকে বেরিয়ে যেতেই অবনী বসে পড়লো বিছানায়। 

_ ৩ মাস ই যথেষ্ট সায়ন্তন। তোমাকে ধ্বংস করার জন্য। তোমার মুখোশ আমি সবার সামনে খুলবোই। এতো বিচ্ছিরি অবস্থা করবো তোমার তুমি সমাজের সামনে মাথা তুলেও দাঁড়াতে পারবে না।' 


চলবে....! 

( আসসালামুয়ালাইকুম! গল্প টা কেমন লাগছে জানাবেন অবশ্যই। )


হ্যাপি রিডিং...!!

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url