#আলো_আঁধারে 

#জান্নাত

৩.


সায়ন্তন নিচে নামলো গম্ভীর মুখে। তাকে দেখেই মনোয়ারা খানম বললেন,

_ কি রে বাপ! ঐ নষ্টা মেয়েটা তোরে কি ক‌ইতাছিলো? কি কুবুদ্ধি ঢুকাইতাছিলো তোর মাথায়?' 


রহমান সাহেব ধমকে উঠলেন স্ত্রী কে!

_ আহ! মনোয়ারা। তোমাকে না বলেছি, এসব আজেবাজে কথাবার্তা বলবে না তুমি।' 


_ তুমি চুপ থাহো দেখি। তোমার কথা অনেক শুনছি। আর শুনতে পারতেছি না। তুমিই আমার ছেলেডার জীবন খান ধ্বংস করছো। কি প্রয়োজন আছিলো এই ভিখারি মাইয়ার লগে আমার এমন চাঁদ পানা ছেলেডার বিয়া দেওন? জোর ক‌ইরা ওরে আমার ছেলের গলায় ঝুলাইছো।' 


রহমান সাহেব কিছু বলার আগে সায়ন্তন মা কে ইশারায় চুপ করতে বললো। রহমান সাহেব সায়ন্তনের দিকে চেয়ে বললেন,

_ কি কথা হলো তোমাদের মাঝে আমি জানতে চাই না। তোমার সিদ্ধান্ত কি সেটা আমাকে বলো।' 


_ বাবা অবনী এ বাড়িতেই থাকবে। যতদিন না বাচ্চা টা দুনিয়ার মুখ দেখছে। ওর পরিবারের সামর্থ্য নেই ওর আর বাচ্চা, দুজনের ভরণ পোষণ করার। হাজার হোক মেয়েটাকে আমি বিয়ে করেছি, সারাজীবন ওর দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছি। এখন এভাবে ওকে ছেড়ে দিতে পারি না।' 


মনোয়ারা খানম আহাজারি করে উঠলেন! 

_ দেখছো দেখছো, আমি তো ক‌ইছিলাম ই। ঐ রাক্ষুসী টা আমার ছেলেরে আবার কি মন্তর পড়াইছে, ছেলেডা আমার ওই মায়াবিনীর কথায় ভুইলা গেছে। তাই তো হেরে আবার ঘরে রাখতে চাইতাছে।' 


কুসুম বেগমের সায়ন্তনের কথা ভালো লাগলো না। তিনি চেয়েছিলেন যাতে মেয়ের সংসার না ভাঙ্গে, সে এ বাড়িতেই থাকতে পারে। কিন্তু এভাবে আশ্রিতা হয়ে নয়। সম্মানের সাথে। তিনি জোর গলায় বলে উঠলেন,

_ তার কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো প্রয়োজন নেই আমার মেয়ের উপর করুণা করার, ওর উপর দয়া করে এ বাড়িতে থাকতে দেওয়ার। আমি গরীব হতে পারি কিন্তু এতোটাও ভিখারি ন‌ই যে আমার মেয়ের মুখে দু মুঠো খাবার তুলে দিতে পারবো না।' 


কুসুম বেগমের কথা শুনে মনোয়ারা খানম মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠলেন,

_ মুরোদ নেই ভালোমন্দ খাওয়ার আবার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শোনো। এতো কথা আসে কেমন করে মুখে?' 


অবনী মায়ের কাছে গেলো। মার হাত ধরে তাকে আস্বস্ত করে বললো, 

_ তুমি চিন্তা কোরো না মা। আমি এ বাড়িতে সারাজীবন থাকবো না। যতদিন না বাচ্চা টা আসছে! সাথে ডিভোর্স টা ও।' 


_ মানে? তুই কি বলছিস এসব মা।' 


_ ঠিক ই বলছি মা। এতো কিছুর পরেও ওর সাথে থাকার তো কোনো মানে হয় না। যতদিন আমি এ বাড়িতে আছি ততদিনে ডিভোর্স টাও করা যাবে।' 


মনোয়ারা খানমের মুখে হাসি ফুটলো! 

_ হ হ! ডিভোর্স টা তো হ‌ইতেই হ‌ইবো। এই কাল নাগিনীর সাথে আমি আমার পোলারে আর থাকতে দিবো না।' 


রহমান সাহেব হতভম্ব হয়ে এদিক ওদিক দেখছেন। কি হচ্ছে তার সংসারে এসব! তার সুখের সংসার তার‌ই সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অথচ তিনি কিচ্ছু করতে পারছেন না। 


তখনকার মতো যে যার কাজে চলে গেলো। কুসুম বেগম অবনীকে টেনে নিয়ে এলেন রুমে। দরজা আটকে অবনীকে খাটের উপর বসালেন। 


_ কী করছিস এসব? কেন থাকতে চাইছিস এখানে?' 


অবনী তার মায়ের হাত ধরে ভরসা দিলো!

_ শান্ত হ‌ও মা। আমি যা করছি ভেবেচিন্তেই করছি।' 


_ কি ভেবেচিন্তে করছিস? বল আমায়। কি করতে চাইছিস তুই? কি ঘুরছে তোর মাথায়। সবটা খোলসা করে আমায় বল অবনী।' 


অবনী একটু দম নিয়ে বলা শুরু করলো,

_ মা! আর কেউ আমায় চিনুক আর না চিনুক, তুমি তো চেনো আমায়। জানো আমি কি করতে পারি আর কি পারি না। এই বাচ্চা সায়ন্তনের ই।' 


_ তাহলে ও এসব কেন বলছে? কেন বলছে ও আরো তোর কখনোও তেমন সম্পর্ক হয়নি? আর রিপোর্টেই বা কেন ওসব এলো? কি হচ্ছে এসব আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না।' 


_ হয়েছিলো মা। সম্পর্ক হয়েছিলো। সায়ন্তন নেশার ঘোরে ছিলো। রিপোর্টের কথা আমি এখন‌ই কিছু বলতে পারছি না। তবে আমাদের মাঝে যা হয়েছিলো সেটা হয় সায়ন্তনের মনে নেই, নয়তো সে জেনে বুঝেই অস্বীকার করছে।' 


_ জেনে বুঝে? কিন্তু ও কেন জেনেবুঝে অস্বীকার করবে মা? ও তোর স্বামী । ও কেন এসব করবে? এতে ওর লাভ টা কি?' 


_ লাভ আছে। সেসব কথা আমি তোমায় পরে বলবো। তার আগে তোমায় একটা কাজ করতে হবে!' 


_ কি কাজ?' 


_ বাড়ি ফিরে যাও। গিয়ে ভাইকে বলবে আমার সাথে দেখা করতে। উঁহু! এ বাড়িতে নয়। সামনে যে বাচ্চাদের স্কুল টা আছে সেখানে। আর খেয়াল রেখো, সায়ন্তন যেন জানতে না পারে।' 


_ কেন? ও জানলে কি হবে? কি করতে চাইছিস তুই আমায় পরিষ্কার করে বলবি? তোর চিন্তায় চিন্তায় তো আমি পাগল হয়ে যাবো।' 


_ সব পরে বলবো মা। তোমায় শুধু যেটুকু বললাম সেটুকু করো। যাও মা, সময় নষ্ট কোরো না।' 


_ ঠিক আছে যাচ্ছি।' 


কুসুম বেগম উঠে দাঁড়ালেন। অবনী উঠে তাকে জড়িয়ে ধরলো। কুসুম বেগম তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,

_ আমি জানি না তুই কি করতে চাইছিস, কেন করছিস! শুধু বলবো, যা করবি সাবধানে করবি। তোর কিছু হলে আমি বাঁচতে পারবো না মা। তোরা দুজন ছাড়া আমার এ পৃথিবীতে আর কে আছে বলতো!' 


_ কিচ্ছু হবে না মা। তুমি শুধু দোয়া কোরো আমার জন্য।' 


_ আমার দোয়া সবসময় তোর সাথে আছে।' 


কুসুম বেগম বেরিয়ে গেলেন। বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। রহমান সাহেব যদিও তাকে আর‌ও কিছুদিন থাকতে বলেছিলেন। মনোয়ারা খানম কয়েক দফা অপমান করে দিলেন আবার। কুসুম বেগম প্রতিবাদ করেননি। তিনি চান না মেয়ে যতদিন এ বাড়িতে আছে তার জন্য তার মেয়ে সাফার করুক। 


অবনী বাসা থেকে বের হলো বিকেল নাগাদ। সায়ন্তন তখন বাসায় ছিলো না। বের হ‌ওয়ার আগে মনোয়ারা খানম তাকে দেখে ফেললো। তিনি তখন ড্রয়িং রুমেই ছিলেন। 


_ এই মাইয়া! সাজগোজ ক‌ইরা কোমর দুলাইয়া ক‌ই যাইতাছো শুনি? তোমার নাগরের লগে দেখা করতে?' 


_ সেটাই ভেবে নিন। ( মুখের উপর বলে দিলো অবনী )' 


বলেই বেরিয়ে গেলো সে। পিছন থেকে মনোয়ারা খানম সমানে গা*লি দিয়ে যাচ্ছে তাকে। অবনী সেসব কানে তুললো না। 


অবনী বেরিয়ে বাম দিকে গেলো। ওদের বাসা থেকে কিছু দূরে এখানটায় একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে। অবনী তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সায়ন্তনের অফিস অন্য রাস্তায়। তাই এদিকটায় আসার তেমন সম্ভাবনা নেই। 


অবনী স্কুলের সামনে রাখা একটা বেঞ্চে বসে পড়লো। মিনিট কুড়ি পর তার ভাই অন্তু এলো সেখানে। অন্তু অবনীর থেকে ৩ বছরের ছোট। বোনের খুব বাধ্য ভাই সে। সবে ভার্সিটিতে উঠেছে। 


সে এসে বসে পড়লো অবনীর পাশে।

_ কি হয়েছে আপু? মা কে বলে এমন জরুরী তলব পাঠালি কেন?' 


_ তোর সাহায্য দরকার ভাই!' 


_ সাহায্য? কি সাহায্য? আর কি হয়েছে বলোতো তোর ভাইয়ার সাথে? মা কে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কিছু বললো না।' 


_ সব বলছি।' 


অবনী একে একে সব অন্তু কে খুলে বললো। শুনে তো তার রাগ মাথায় উঠলো। তেজি গলায় বললো,

_ এখনিই চল বাড়িতে। এখানে তোকে আর থাকতে দেবো না আমি। তুই এতো কিছুর পরেও কীভাবে ঐ লোকটার সাথে থাকতে রাজি হলি?' 


_ শান্ত হ অন্তু। এখন উত্তেজিত হয়ে কিছু করার সময় নয়। যা করতে হবে ভেবেচিন্তে। ও আমাকে ঠকিয়েছে। এতো সহজে যদি ওকে ছেড়ে দিই তবে আমি তো নিজের কাছেই আত্মসম্মানহীন হয়ে যাবো। ও তো চাইছেই যাতে আমি ওকে ছেড়ে দিই। আর ও ঐ মেয়েটার সাথে থাকতে পারে। কিন্তু আমি এমনটা কেন করবো! ও আমাকে ঠকিয়েছে। তার শাস্তি না দিয়ে আমি ওকে ছেড়ে চলে যাবো? যাতে ওর পথ আরোও পরিষ্কার হয়ে যায়?' 


_ কি করতে চাইছিস তুই এখন? সেটা বল।' 


_ নজর রাখতে হবে সায়ন্তনের উপর। আমি শুধু সন্দেহ থেকে ঐই কথাগুলো ওকে বলেছিলাম। অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। কিন্তু সেটা যে সঠিক নিশানায় লেগে যাবে তা বুঝতে পারিনি। এখন তোকে ওর উপর নজর রাখতে হবে। কখন কোথায় কার সাথে যাচ্ছে সবকিছু রেকর্ড করতে হবে। পাকাপোক্ত প্রমাণ চাই আমার ভাই। আর, সবথেকে ইম্পর্ট্যান্ট, কোন মেয়ের সাথে ওর সম্পর্ক আছে সেটা জানা ভীষণ জরুরী। আমি জানি না সে কে। ওকে বলেছি আমার কাছে প্রমাণ আছে। সেই ভয়েই ও আমাকে ও বাড়িতে রাখতে রাজি হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণ টা তোকেই জোগাড় করতে হবে ভাই। পারবি তো?' 


_ পারবো আপু! তোর জন্য আমি সবকিছু করতে পারবো।' 


অন্তু জড়িয়ে ধরে অবনীকে। কতকিছু সহ্য করছে তার বোনটা। এবার সেই তার কষ্ট লাঘব করবে। আর কষ্ট পেতে দেবে না সে অবনীকে। 


চলবে.....! 

আসসালামুয়ালাইকুম! জানাবেন কেমন লাগছে। 

হ্যাপি রিডিং.....!!

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url