#নিলুফার_সংসার
#পর্ব_৩
#ইলোরা_ফারদিন
রাত প্রায় তিনটা, কিন্তু করিম শেখের চোখে নেই কোনো ঘুম। বার বার বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে। নিলুফার নিষ্পাপ মুখটা চোখের সামনে ভাসছে, বাচ্চাদের কথা মনে পরছে।
করিম শেখের বয়স যখন ১৪, তখন তার বাবা মারা যায়। একদিকে ছোট ছোট তিন বোন, অন্যদিকে বিধবা মা। তার উপরে আবার দাদি বাবার মৃত্যুর জন্য আমার মা কেই দায়ী করতে লাগলো, কারণ বাবা সেদিন মায়ের ওষুধ নিতেই বাজারে গিয়েছিলেন, কিন্তু আসার পথে এক নির্মাণাধীন বিল্ডিং থেকে ইট মাথায় পরে সেখানে বাবার । চাচারা সেই সুযোগে জায়গা জমি নিজেদের নামে লিখে নিয়ে তাদেরকে এক কাপড়েই বের করে দেয়।
এরপর মা তাদের নিয়ে নানা বাসায় গেলে সেখানেও তাদের ঠাই দেয়া হয় না। তারপর তারা আবার শহরে ফিরে আসে। তার মা মানুষের বাসায় ছুটা কাজ করা শুরু করে। আর এদিকে করিম শেখ একটা দোকানের কর্মচারী হিসেবে ঢুকে। এভাবেই চলতে থাকে তাদের জীবন।
পরবর্তীতে স্বল্প লোনে করিম শেখ ব্যবসা শুরু করে আর এখানে দ্রুত সাফল্য পায়। ভাগ্য ফেরে তাদের।
একদিন ব্যবসার কাজে মতিগঞ্জে যায় সে, চোখ পরে স্কুল ড্রেস পরা কিশোরী নিলুফাকে। মন দিয়ে বসে সেখানেই। বাসায় এসে তার মাকে নিলুফার কথা জানাতেই তার মা মানা করে দেয়। তার মায়ের কথা আগে তার তিন বোনের বিয়ে হবে, তার সে বিয়ে করতে পারবে। রোকেনা বানুর ভয় ছিল করিম একবার বিয়ে করলে সে বউয়ের কথায় উঠবস করবে, মা-বোনদের আর দায়িত্ব নিবে।
কিন্তু এদিকে নিলুফাকে হারানোর ভয়ও মনে জেকে ধরেছিল মনে, কারণ লোকের মুখে সে জেনেছিল নিলুফার বিয়ে দেওয়ার জন্য নাকি পাত্র খোজা হচ্ছে।
তাই তো সে জেদ ধরে বসলো নিলুফাকে বিয়ে করবে। খাওয়া দাওয়া, দোকান যাওয়া সব বন্ধ করে দিল। অবশেষে ছেলের জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হল রোকেয়া বানু। কিন্তু তার আগে ছেলেকে কসম দিল যে পরিস্থিতি যেমনই হোক সে কোনোদিন তার মা আর বোনদের অবহেলা করবে না, আর সব সময় তার মায়ের কথা চলবে, নাহলে সে মায়ের মরা মুখ দেখবে। সেদিন মায়ের মাথা ছুয়ে কসম কাটে করিম।
এরপর চৌদ্দ বছর কিশোরী মেয়েটাকে ঘরের বউ করে তুলে পুরো সংসারের দায়িত্ব তুলে দেয় ওই মেয়েটার কাধে। বিয়ের পরের দিনই নিলুফাকে পাঠানো হয় রান্নাঘরে। তার বোনেরা নিলুফার চেয়ে বয়সে বড় হলেও, তারা কখনোই রান্না বান্নায় নিলুফাকে সাহায্য করতো না। রিনু,বিনু,ইনুর কাপড় চোপড়ও তাকে ধুতে হতো। শুধু কি তখন? না... বোনেরা বিয়ের পরেও ছুটির দিন ব্যাগ ভোরে নোংরা কাপড় নিয়ে আসতো, সেগুলো ধোয়ার ভার পরতো নিলুফারের উপর। এতোজনের রান্না বান্না করার পর আবার ওসব ধোয়া, তারপর আবার কলপাড় ভর্তি এটো থালাবাসন। সবি চোখে পরতো করিম শেখের। কিন্তু বউয়ের পক্ষে কিছু বললে যদি মা বোন কষ্ট পায়, এই ভয়ে সে চুপ থাকতো। দীর্ঘ ষোলটা বছর নিলুফা সহ্য করেছে এসব। বিয়ের প্রথম প্রথম নিলুফা অভিযোগ করতো। কিন্তু মা বোনের নামে কটু কথা শুনে করিম শেখ তার উপর নির্যাতন করতো। তার উপরে আবার প্রতিদিন কাজ শেষে যখন বাসায় ফিরতো মা বোনেরা নিলুফার নামে হাজারটা অভিযোগ করতো। রাগের মাথায় করিম শেখও যেয়ে নিলুফার গায়ে হাত তুলতো, কোনোদিন জানার চেষ্টাটাও করতো না যে নিলুফা আসলে দোষী কি না। পরবর্তীতে নিজেকে দোষী মনে হলেও কোনো দিন নিলুফার কাছে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করতো না, ক্ষমা চাইলে তো মা বোন ছোট হবে, আর বাড়ির বউদের একটু আকটু মানিয়ে চলতেই হয়। এই ধারণাতেই ষোলটা বছর পার করেছি করিম শেখ।
আর তার বাচ্চারা? তাদের কি করিম শেখ ভালোবাসতো না? অবশ্যই বাসতো। কিন্তু সে ভালোবাসা দেখানো নিষেধ ছিল তার জন্য। তার বোন বিণুর স্বামী প্রবাসী, রিনুর স্বামী ঢাকায় চাকরি করে আর ইনুর স্বামী বর্ডারে। ফলে তার ভাগিনা ভাগ্নিরা কেউই তার বাবাকে কাছে পায় না। তাই তার বোনের বাচ্চারা যদি দেখে মামা তার সন্তানদের আদর করতেছে, তাহলে তারা কষ্ট পাবে। কিন্তু করিম নিজের বাচ্চাদের থেকে দূরে দূরে থাকলেও নিজের ভাগিনা ভাগ্নিদের ঠিকি বুকে আগলে রাখতো। তার মায়ের নির্দেশ ছিল যে!
সব কিছু ভাবতেই কেমন পেট গুলিয়ে উঠলো করিম শেখের। দৌড়ে যেয়ে বমি করলো...
।।।।।।।।।।।
আজকে সকালে শীলা রান্না ঘরে যায় নি। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে যতদিন নিলুফা এ বাসায় আছে, ততদিন সে আর বাড়ির কোনো কাজ করবে না। নেহালও এবিষয়ে কিছু বলে নি। কারণ সে নিজেকে কথা দিয়েছে স্ত্রী সন্তান ছাড়া আর কাউকে সে নিজের জীবনে প্রাধান্য দিবে না। তার, তার মায়ের, তার বোনের জীবনটা যেভাবে নষ্ট হয়েছে, তার মেয়েটার জীবন সে নষ্ট হতে দিবে না।
বাধ্য হয়ে মালিহা বেগমই সকালে নাস্তা বানাতে গেলেন। অবশ্য প্রতিদিনই শীলাকে সে রান্নায় টুকটাক সাহায্য করেন। শীলার সাথে তার সম্পর্কটা বেশ শীতল। শীলা কোনোদিন তাকে অসম্মান করে নি সত্যি বা কোনো কিছুর অভাব হতেও দেয় নি, কিন্তু তার সাথে বসে কোনো দু একটা ভালো মন্দ গল্পও কোনোদিন করে না। যেন সব সময় এড়িয়ে চলতে চায়।
নাস্তার টেবিলে বসেছে সবাই। নাস্তা করার মাঝেই নেহাল বলে উঠলো," বাবা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে পরের মাসেই আমি ভাড়া বাসায় উঠবো। যেই বাসায় আমার সন্তানের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়, সে বাসায় আমি থাকবো না। তোমার মেয়ে আসতে না আসতেই আমার মেয়ে ঘর ছাড়া হয়েছে। আমি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে দিব না বাবা। তোমার হাত খরচের টাকার চিন্তা করো না। প্রতি মাসেই তা পাঠিয়ে দিব। তবে তোমার মেয়ে আর নাতি নাতনির জন্য এক টাকাও দিতে পারব না।"
"সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না ভাইয়া, আমি বা আমার সন্তানেরা তোমার সন্তানের হক মারব না। আমাদের খরচ আমরাই চালিয়ে নিব। আর বাকি থাকলো আমাদের থাকার জায়গা, যাও আমার রুম আমি তোমার মেয়েকে দিয়ে দিলাম, বাসার পেছনের দিকে টিন দিয়ে দুটো রূম বসিয়ে সেখানেই আমি আমার বাচ্চাদের নিয়ে থাকব। আমরা আলাদাই খাব। শুধু দুটো দিন সহ্য কর।"
মামা তাচ্ছিল্য হেসে বললো," ঘর বানাবি? টাকা পাবি কই? তোর মহান বাপ তো আগেই নিজের সব জমি জমা বেচে তার বোনের বাচ্চাদের মানুষ করছে, নিজের পেনশনের টাকাটাও তার বোন জামাইকে ব্যবসার কাজে লাগাতে দিয়ে দিয়েছে। এক টাকাও তো সঞ্চয় নাই তোর বাপের। ওই দিন শেষে আমার কাছেই ওষুধের টাকার জন্য হাত পাততে হয় তার। তার প্রিয় ভাগিনা ভাগ্নিরা মুখ ফিরেও তাকায় না।
আর তোকে ঘাড় থেকে নামাতে যেই নরকে বিয়ে দিয়েছে, ওখান থেকে যে খালি হাতে এসেছিস, তা আমার বোঝা হয়ে গেছে। তাহলে?"
ছেলের কথা শুনে লজ্জায় মাথা নামিয়ে ফেললো রফিক মিয়া। কি বলবে সে? সবি তার পাপের ফল!
মা বললো, " বললাম তো, আমার ব্যবস্থা আমি করে নিব। দুটোদিন সহ্য কর। আমাদের ঝামেলার জন্য এই বয়সে মাকে অন্তত কষ্ট দিতে চাচ্ছি না। তাই আমিই সরে যাচ্ছি। অন্য কোথাও সস্তায় বাসা নিতে পারতাম, কিন্তু আমার বাচ্চাদের একটা নিরাপদ আশ্রয় প্রয়োজন, তাই এই ভিটাতেই ঘর তুলে থাকব। কিন্তু তোদের উপর বোঝা হব না ভাই।"
নেহাল আর কিছু না বলে নাস্তা রেখে ঘরে চলে গেল। কষ্ট কি তার লাগছে না?? অবশ্যই লাগছে। নিলুফা তার অনেক আদরের বোন। প্রচন্ড ভালোবাসে সে তার বোনকে। কিন্তু তাদের ভয়ংকর অতীতের কারণে সে এখন শুধু নিজের স্ত্রী সন্তান ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবতে চায় না। সে চায় না তার সন্তানও তার আর নিলুফার মতো বিষাক্ত অতীত নিয়ে বড় হোক।
নেহালের আজও মনে আছে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। পড়াশুনার প্রতিও প্রচন্ড মনোযোগ ছিল। কিন্তু ক্লাস টেনে উঠার পর সাইন্সের সাবজেক্টের টিউশনি পড়তে না পারায় তার রেসাল্ট খারাপ হয়। এরপর কলেজে উঠার পর পড়াশুনা আরও কঠিন হয়ে যায়। বাবার পায়ে পর্যন্ত ধরেছিল যাতে টিউশনি পড়ার খরচ দেয়। কিন্তু বাবা দেয় নি। সেই টায় তার ভাগিনা ভাগ্নি নিজেদের শখ মেটাতো। ফলশ্রুতিতে সে ইন্টারে ফেল করে। তার স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে ছন্নছাড়া জীবন শুরু করে সে....
চলবে.....
