গল্প : আলো আঁধার

পর্ব : ০২+৩+৪

লেখা : ইনশিয়া আহমেদ হায়াত

-------------------

শাওনদের বাড়ির পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে সবাই। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে।আলোও করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে।আলোর শাশুড়ী সবাইকে বলছে,


- শাশুড়ী: 'দেখছো শাওনের বাপ আমার পোলার কষ্টের টাকা কেমনে নষ্ট করে। আলো এতো গুলো ভাত বাড়ির পিছে কেন ফালাইলা।' (চিল্লিয়ে)


আশেপাশের মানুষ এসে তামাশা দেখছে।

- আলো: 'আমি ফেলিনি মা।'


- রুপা: 'তুমি ফেলোনি তোহ কি উড়ে এসেছে ভাত গুলো।'


- আলো: 'মা সত্যি আমি ফেলিনি।আমি কেনো ফেলবো।'


- শশুর: 'আচ্ছা এতো গুলো ভাত এখানে। অন্য কারোরও তোহ হতে পারে।'


- শাশুড়ী: 'অন্য কারো হইবো না। পাতিলে গিয়ে দেখেন। পুরো পাতিল খালি।তুই এতো গুলো ভাত এনে ফালাইলি কেন। প্রতিদিন বেশি বেশি করে ভাত রান্না করস তারপরও ভাত পাই না।'


- আলো: হ্যা মা আমিও বুঝতে পারছি না। প্রতিদিন ভাত শর্ট পড়ে। রাতে ওনি (শাওন) খাওয়ার পর আর ভাত থাকে না।হয়তো অল্প করে খেয়ে নেই নয়তো না খেয়ে থাকি। তাই তোহ প্রতিদিন একটু বেশি করে রান্না করি তারপরও কম পড়ে আজ বুঝলাম কেনো কম পড়ে। কিন্ত সত্যি আমি ফেলিনি বিশ্বাস করেন আমি ফেলে দেইনি। কেন আমি ফেলে দিবো। (মনে মনে বলছে,কারন তার কথা শোনার যে কেউ নেই। নিজের দুঃক্ষ গুলো মা, ভাই এর কাছে বলার স্বাধীনতা নেই)


শাওন এতোক্ষন চুপ করে ছিলো। কিছু না বলে চলে যায়। শাশুড়ী আর রুপা মিলে আলোকে আরো অনেক কথা শুনিয়ে এক সময় তারাও চলে যায়।শ্বশুর আলোর দিকে চেয়ে চলে গেলো।


আলো সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। পাশের বাসার চাচাতো ভাবি আলো কাছে এলো।


- ভাবি: 'আলো আর কতো অপমান সহ্য করবা।তুমি কিছু বলোনা কেনো।'


আলো মুচকি হেসে বললো,

- আলো: 'প্রতিবাদ করা যে কেউ শিখায়নি। মানুষের কথা হজম করাটা ঠিকই শিখিয়েছে।'


.

এভাবে কিছুদিন কেটে গেলো। একদিন আলো সকালে রান্না করছে, উঠানে বসে আছে শাশুড়ী।হঠাৎ পাশের বাসার চাচী এসে বসলো। দুজনে মিলে গল্প করছে।আলো রান্না ঘর থেকে স্পষ্ট সব শুনতে পাচ্ছে।কথার মাঝে চাচী তার পুত্র বধুর কথা বললো, আসলে ইনিয়ে বিনিয়ে শাশুড়ীকে খোঁচা দিচ্ছে,


- চাচী: 'ভাবি জানেননি ৮০ হাজার টাকা দিয়া বউ এর বাপে খাট বানায় পাঠায়ছে যাতে তাগো মাইয়া ভালো ভাবে থাকতে পারে।'


- শাশুড়ী: 'কউ কি এতো দাম দিয়া।'


- চাচী: 'হও বুঝেন না এইগুলো হলো সামাজিকতা। সাথে ফ্রিজও দিছে। আপনে কই পোলাডারে বিয়া করাইলেন। ভালো জাগায় করাইতে পারলেন না। আমগো বউ এর কিন্তু বাচ্চা হইবো।'


- শাশুড়ী: 'ভালা তোহ'


- চাচী: 'হো আর আপনে না কি বিয়া করাইলেন।এতদিনে নাতীর মুখও দেখতে পারলেন না।কবিরাজ দেখান ভালা দেইখা।'


- শাশুড়ী: 'অনেক দেখাইছি কোনো কাম হয় না'


- চাচী: 'আইচ্ছা বাদ দে মাইয়ারই কোনো দোষ আছে। আইচ্ছা এইবার ঈদে আমগো বউ এর বাড়ি থেকে বাজার পাঠাইছে। আপনের বউ এর বাড়ি থেকে কি কি পাঠাইছে।'


.


শাশুড়ী চুপচাপ কথা গুলো শুনছিলো। কোনো মতে কথা কাটিয়ে ঘরে চলে গেলো। এইদিকে আলো হালকা হাসলো। একটা মেয়েকে তার শশুরবাড়িতে নিচু করার জন্য পাশের বাড়ি চাচী আর সমাজই দায়ি। আমার শাশুড়ীর এইসবে লোভ নেই কিন্তু যখন শুনে ওমুকের বউয়ের বাড়ি থেকে এটা দিছে সেটা দিছে।সেখানে যে কেউর মাথা নষ্ট হবে।রাগ উঠবে লোভ জাগবে। তারা যৌতুক নিবেও ঢোল পিটিয়ে মানুষকে জানাবে আবার যারা নিবে না তাদের কানে বিষও ঢেলে দিবে। 


জানি না চাচীর এইসবের কথার ফল কি হবে। কি আর হবে আস্তে আস্তে এইসবের প্রভাব আমার উপর পড়বে।আমার ভাই এতো দামের খাট দেওয়ার সামর্থ্য নেই।ছোট মানুষ পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করছে সাথে সংসারের হাল ধরেছে। আমি কিভাবে স্বার্থপরের মতো বাবার বাড়ি থেকে কিছু চাইবো। তার উপর আমি যে বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি সেই খোঁজই তোহ কেউ নেয় না। আবার তাদের কাছ থেকে কি আশা করবো। 


আমার ভাই এর সাথে আমার কখনো মিল ছিলো না।ও আমার সাথে কথা কম বলতো এখনো বলে না।আমি নিজে থেকেই ওকে কল দিয়ে থাকি। শুনলাম ওর বউ এর নাকি বাচ্চা হবে। শুনে খুবই খুশি হলাম আবার দুঃখ লাগছে যদি মেয়ে হয় তাহলে কি সেই মেয়ের সাথেও আমার মতো আচরণ করবে। ভয় হয় খুবই ভয় হয়।আল্লাহ যেনো তাকে পুত্র সন্তানই দান করে।


যাইহোক আমার শাশুড়ী পরিবর্তন এর জন্য এইসব চাচীরাই দায়ি। শুরুতে কিছুই বলতো শাশুড়ী কিন্তু এইসব শুনতে শুনতে উনি আমার সাথে এমন ব্যবহার করে। 


.


একদিন বিকালে শাওন বাসায় আসে, আলো তখন কাজ করছিলো।


-- আলো, আলো


-- জিই আসছি।


আলো রুমে আসার পর আলোর হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলে,

-- "তোমার জন্য উপহার"


আলো খুশি হলো।এই দেড় বছরে প্রথম শাওন তাকে কিছু কিনে দিলো। প্যাকেট খুলে দেখলো একটা ছোট ডায়মন্ড এর নাক ফুল।আলো এতোদিন পাথরের নাক ফুল পড়তো।শাওন বললো পরতে আলো বললো পরে পরবে। এরপর শাওন দোকানে চলে গেলো। আলোর অনেক খুশি লাগছে। প্রায় ৫ মিনিট ধরে নাক ফুলের দিকে চেয়ে আছে।

---

.

অন্যদিকে,

আঁধার এলাকায় একটা দোকান দিলো ঔষধ এর দোকান।সে খেয়াল করলো এলাকায় সব আছে কিন্তু ঔষধ এর জন্য অনেক দূরে যেতে হয় তাই সে এই দোকান দিলো।আজ থেকে দোকানে মালামাল এনে সব ঠিকঠাক করবে।আঁধার নিজের রুমে বসে হিসাব করছে। এমন সময় তার দরজায় কড়া নাড়লো।আঁধার দরজায় তাকিয়ে দেখলো তার ভাবি দাঁড়িয়ে আছে।


- আঁধার: ভাবি আপনি?


- ভাবি: আসতে পারি।


- আঁধার: হ্যা হ্যা আসুন।কোনো দরকার।


ভাবি এসে বসল।

- ভাবি: আঁধার ভাইয়া আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো।


- আঁধার: হ্যা বলুন কি হয়েছে।ভাইয়ার সাথে কি ঝগড়া হয়েছে নাকি?


- ভাবি: না তেমন কিছুই না।আসলে আমার বিয়ের ৫ বছর হলো। আপনাকে দেখছি আপনি খুব চুপচাপ থাকেন। হঠাৎ করে একদিন বললেন বিদেশ যাবেন।পড়াশোনা করবেন না।তোহ আপনার ভাই আপনাকে তার কাছে নিয়ে গেল।সেখানে ৪ বছর থাকলেন।অনেক ছুটি থাকার পর দেশে আসেননি। একটাই কথা টাকা কামাতে হবে। এরপর ১ বছর আগে আসলেন। আর হুট করে সিদ্ধান্ত নিলেন বিয়ে করবেন না। ঠিক বুঝতে পারছি না। কি হয়েছে খুলে বলুন।আমাকে ভাবি নয়। বড় বোন বা বন্ধু মনে করুন।


আঁধার চুপচাপ তার ভাবির কথা শুনছিলো।একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলা শুরু করলো। এতোদিনের মনের চাপা কষ্ট গুলো আজ বলতে যাচ্ছে কাউকে।


- আঁধার: 'আমি একজনকে ভালোবাসি। এখন থেকে নয়। যখন আমার বয়স ৭ বছর তখন থেকে। আমরা একই ক্লাসে পড়তাম।সমবয়সী আমরা সে আমার ২ মাসের বড় হাহাহা। ছোট বেলায় এই কথা বার বার মনে করিয়ে দিতো।হালকা চাপা স্বভাবের ছিলো কিন্তু আমার সাথে কথার ঝুড়ি ফুটতো। আমাকে সব সময় বকা দিতো কারন সে আমার বড় ছিলো তাও দুই মাসে এই কথা দিনে ১৫ বার আমাকে শোনাতো।হাহাহা...


বলেই আঁধার হাসছে। ভাবি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। এই প্রথম আঁধারকে হাসতে দেখলো। শাশুড়ীর কথায় আজ দেবরের সাথে খোলাখুলি কথা বলতে এসে অবাক হচ্ছে।


- ভাবি: ওম বেশ তোহ সে কোথায়, নাম কি, কোথায় থাকে?


ভাবির এমন প্রশ্ন আঁধারের চেহারায় হতাশ ছেয়ে গেলো।নিজের মনের চাপা কষ্ট গুলো বের হয়ে চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠছে।


- আঁধার: আলো তার নাম আলো। বর্তমানে সে শ্বশুরবাড়িতে।১৪ বছর হয়ে গেছে তার সাথে দেখা হয় না কথা হয় না।আচ্ছা ভাবি আমি আসি আমার কাজ আছে।


কোনো মতে কথা কাটিয়ে চলে গেলো আঁধার।ভাবি যাওয়ার পথে চেয়ে আছে। আঁধারের মা এসে বসলো।


- আঁধারের মা: বউমা কি বলেছে আঁধার আর এইভবে তারাহুরো করে যে চলে গেলো। 


- আঁধারের ভাবি: আলো নামের এক মেয়েকে ভালোবাসে।আলো নামে কাউকে চিনেন কি মা?


আঁধারের মা চিন্তায় পড়ে গেলো। নামটা বেশ শোনা শোনা লাগছে।


- আঁধারের মা: নাম শুনেছি কিন্তু মনে পড়ছে না।


- আঁধারের ভাবি: ওরা একই ক্লাসে একই স্কুলে পড়তো। একটু মনে করার চেষ্টা করুন।


- আঁধারের মা: আচ্ছা আমি ভেবে দেখছি


---

--


পরেরদিন বিকালে সব কাজ শেষ করে। নিজের ভাই এর ফোনে কল দিলো। 

অনেক কষ্টে করে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কিনেছি এটাই ব্যবহার করি।তাও বাবার বাড়ি থাকতে স্টুডেন্ট এর বেতনের টাকা জমিয়ে কেনা ফোন। খুব যত্ন করেই রাখছি। আমি সব কিছুই যত্ন করে রাখার চেষ্টা করি তারপরও আমার যত্নে গড়া জিনিস হারিয়ে যায়।


পরপর দু বার কল দিলাম ব্যস্ত বলছে।জানিনা যতবার কল দেই ততবারই ব্যস্ত বলে থাকে।তাই ভাই এর বউ ফাতেমাকে কল দিলাম। মেয়েটা গর্ভবতী কেমন আছে খোঁজ খবর নেই।দু'বার রিং হওয়ার পর রিসিভ করলো,


- আলো: আসসালামু আলাইকুম ফাতেমা।


- আমি ফাতেমার মা বলছি। কেন কল দিয়েছো আর কি চাই। ভাই এর কাছ থেকে খালি নেওয়ার মধ্যে আছো দেওয়ার মধ্যে নাই। জামাই কতো কষ্ট করে কাজ করে। টাকা জমাচ্ছে ফাতেমার ডেলিভারির জন্য আর তুমি লোভী মেয়ে আমার মেয়ের সুখ দেখতে পারোনা তাই না।


আন্টির কথার আগামাথা বুঝতে না পেরে ওনাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,


- আন্টি কি বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাকে বুঝিয়ে বলুন।


- ফাতেমার মা: কি বলবো।তোমার জামাইকে যে পাঠিয়েছো টাকার জন্য। তোমার জামাই এসে বলেছে তোমার নাকি কিছু টাকা লাগবে চিকিৎসার জন্য। নিজে তোহ বাচ্চা জন্ম দিতে পারোনি আবার আমার মেয়ের বাচ্চা হবে তাই হিংসা হচ্ছে তাই না। লোভী মেয়ে হিংসুটে,অলক্ষি কোথাকার। 


আরো অনেক কথা শুনিয়ে ফোন কেটে দিলো।আলোর চোখের কোণে নোনা জল জমে গেলো। তা গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছে ফেললো। বাবার মৃত্যুর জন্য আমাকে যখন দায়ি করেছিলো প্রচুর কেঁদেছিলাম। এরপর যখন স্কুলের যেতে পারবো না তখনও কেঁদেও কারো মন গলাতে পারিনি। মানুষ আমাকে সব অলক্ষি বলতো। এইসব আস্তে আস্তে সহে গিয়েছিলো।পৃথিবীতে দুইজন আমায় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে এক আমার বাবা আরেকজন সে। যে আমার থেকে ১৪ বছর আগেই অনেক দূরে চলে গেছে। তার দেখা আর মেলেনি। 


বাবার মারা যাওয়ার পর নিজেকে এতোটাই গুটিয়ে নিয়েছিলাম যে প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যেতাম না। মানুষ তোহ বাদই দিলাম আমার মা ও দাদীর কথা শুনতে শুনতে তিক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে বাবা থাকলে হয়তো আজ আমি অনেক সুখি থাকতাম। বাবাকে আমার অবস্থার কথা বললে দৌড়ে আমায় নিতে চলে আসতো। 


কিন্তু নেই কেও নেই আমার। একটা ভাই যার সাথে আমার কথাই হয়না। মানুষ ঈদে বাবার বাড়ি যায়। বিয়ে হওয়ার ২ বছর হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ৫ বারও বাবার বাড়ি যেতে পারিনি। এক তোহ শশুরবাড়ি থেকে আমি চলে গেলে কাজ করবে কে আরেক হলো বাবার বাড়িতে আমি গেলে আমাকে খাওয়াতে তাদের খরচ হবে। মা আমায় কিছু বলতো না কিন্তু দাদী আর তার সাথে যোগ দেওয়া নতুন মানুষ আমার ভাই এর শাশুড়ী।আমি জানি আমার মা কখনোই সুখ পায়নি। পাবে কিভাবে প্রথমেই যে আমার জন্ম হলো কন্যা সন্তানের। সুখের আবেশ পেয়েছে আমার ভাই হওয়ার পর আমার মাকে মাথায় তুলে দিলো। এখনো হয়তো আমার জন্য মা কষ্ট পায়। 


রুপা আপু আমার বরকে পছন্দ করতো তা আমি আগেই বুঝে গিয়েছি তারপরও কিছু বলিনি কারন আমার বরের মেয়ের নেশার চেয়ে টাকা ও জুয়ার নেশা আছে। জুয়া খুবই ভয়ংকর নেশা মানুষকে তচনচ করে দেয়। রুপাকে আমার বর পছন্দ করে না কারন তার বোনেদের সাথে কখনোই ভালো ব্যবহার করেনি।তাই উনি আমায় বিয়ে করে যাতে তার বোনেরা ভালোভাবে থাকতে পারে বাবার বাড়ি আসার পর। উনি নিজের বোনদের অনেক ভালোবাসে। আমায় কখনো অসম্মান করেনি কিন্তু ওইযে জুয়ার নেশা যার ফলে আজ উনি আমায় না বলে ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে আসছে। নিশ্চয়ই জুয়ায় হেড়েছে।


.


রাতে শাওন বাসায় আসে। তাকে পানি দিয়ে তার কাছে বসেছি।


- আমার ভাই এর কাছ থেকে কত টাকা নিয়ে এসেছেন আপনি? (শান্ত গলায়)


- শাওন: ওহ তাহলে তোমার ভাই বলেই দিয়েছে।হ্যা নিয়েছি টাকা আর তোমার জন্যই তোহ নিয়েছি। ওইযে তোমাকে উপহার দিলাম নাক ফুলটা। মনে করো তোমার ভাই এর দেওয়া উপহার। যাও গিয়ে খাবার নিয়ে আসো প্রচুর ক্ষিদে পেয়েছে। 


বলেই বাথরুমে চলে গেলো শাওন। আলো চুপ হয়ে আছে। কেমন মানুষ ইনি ছিহ্।


পরেরদিন,

- শাশুড়ী: বউ আমার ব্লাউজটা সেলায় হয়েছে। 


আলো কিছু না বলে ব্লাউজ তার হাতে দিয়ে দিলো। বাবার বাড়ি থেকে নিজের সেলাই মেশিনটা নিয়ে এসেছিলো। কারন ওখানে দুটো সেলাই মেশিন একটা মায়ের জন্য আরেকটা নিজের জন্য। 


.


কয়েকঘন্টা পর শাওন বাসায় এসে তার মায়ের রুমে গেলো।


- মা কি হয়েছে। ফোন করে আসতে বললা কেনো?


- তোর বউ কি করছে জানোস। 


- আবার কি করেছে


- রহমান চাচার বউ এর কাছে তোর বউ তার সেলাই মেশিন বিক্রি করে। বাবার বাড়ি গেছে। 


- মানে কি কেনো।আর বিক্রি করার সময় তোমরা কোথায় ছিলা।


- আমার ব্লাউজটা দিয়াই নিজেই বেচে গেছে গা একবারও বলে যায় নাই। এখন তোর বউওরে তুই কিছু বলবি।আমার তোহ দাম নাই।


- রুপা: হ্যা অনেক হয়েছে শাওন ভাই এবার কিছু করো। বিক্রি করছে যাতে আমাদের জামা কাপর বানায় দেওয়া না লাগে।


শাওন প্রচুর রেগে আলোকে কল দিচ্ছে।কিন্ত ফোন বন্ধ।


১ ঘন্টা পর আলো এসে হাজির।এখান থেকে বাবার বাড়ি যেতে ৪০ মিনিট লাগে।আলো কিছু না বলে নিজের রূমে পা বাড়ায়।


(চলবে)...গল্প : আলো আঁধার

পর্ব : (০৩)

লেখা : ইনশিয়া আহমেদ হায়াত

---------

আলো বাসায় এসে নিজের রুমে চলে গেলো। রুমে গিয়ে সে অবাক শাওন বসে আছে। হয়তো তার অপেক্ষা করছে। আলো রুমের দিকে খেয়াল করে দেখলো মেঝেতে পড়ে আছে তার সব জামা কাপড়।সব এলোমেলো হয়ে আছে। শাওনের দিকে একবার চেয়ে দেখলাম সে তার দিকেই চেয়ে আছে।সে একটা হাসি দিয়ে বললো,


-- তুমি তোহ সেলাই ভালো পারো তাই ভাবলাম।জামা গুলো কেটে দেই তুমি না হয় সেলাই করে নতুন ডিজাইন করে নিবা। ওম তোমার সেলায় মেশিন টা যে দেখছি না।


মানুষ কতোটা খারাপ হলে এমন করতে পারে। আলোর সব জামা বের করে মাঝ দিয়ে এলোমেলো ভাবে কেটে দিয়েছে। এমনভাবেই কেটেছে যে কিভাবে জোড়া লাগাবে তাই ভাবছে।


-- আলো: আমার ভাই কাছ থেকে কতো টাকা নিয়ে এসেছেন।


-- শাওন: কেন টাকা তো দিয়েই আসলা। আর কি দরকার। কেমন ভাই তোমার বোনকে সামান্য টাকা দিতে পারে না। যাইহোক আমার কাজ আছে আমি দোকানে গেলাম।


বলে শাওন চলে গেলো। আলো জামা গুলোর দিকে চেয়ে আছে।এই জামাগুলো তার নিজের বানানো। নিজের টাকা দিয়ে বানিয়েছে৷ আর সাথে ননদ ও ননাসের দেওয়া উপহার ছিলো।বিয়ে পর এক সুতাও কিনে দেয়নি অথচ আমার সব গুলো জামা এইভাবে নষ্ট করে দিলো। আসলে জুয়াখোরদের কাছে কিছু আশা করাই বোকামি।  


সুই সুতা নিয়ে কাচি দিয়ে হালকা ঠিক করার চেষ্টা করছি।


রাতে শাওন বাসায় আসলো।শীতের সময় বছরের শেষ।এই শীতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় ১,২ টা পর্যন্ত।সারারাত জুয়া খেলে এরপর দোকান বন্ধ করে বাসায় আসে। কেউ কিছু বলেও না।শাওনের হাতে বাজারের ব্যাগ দেখে মনে মনে বললো,‘আজও নতুন শাস্তির ব্যবস্থা করেছে হয়তো’


-- 'শোনো চালে গুড়া গুলো দিয়ে পিঠা বানাতে বসো কালকে আমার বোন আর ভাগিনাদের জন্য পিঠা নিয়ে যাবো।'


আলো চুপচাপ শাওনের দিকে চেয়ে আছে। এরপর খাবার দিলো। খেয়ে শুয়ে পড়েছিল।আজকে ভাত নেই। রোজ রোজ ভাতের ঝামেলা ভালো লাগে না। দেখে গিয়েছিলাম ভাত আছে কিছুক্ষন আগেই রুপা এক প্লেট ভাত নিজের জন্য নিয়ে গেলো।এই মেয়ে রাত ৮ টায় একবার খেয়েছে আর ১২ টায় একবার খেয়েছে জানি না কেন এমন করলো। অন্য কেউ খাবে কি না সেদিকে খেয়াল নেই।এরপর চালে গুড়ো দিয়ে দুটি রুটি বানিয়ে খেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।আমিও মানুষ কাজের লোকের মতো এতো কাজ করতে পারবো না। রাতে মাছ নিয়ে আসবে, চালে গুড়ো নিয়ে আসবে। আমার দিকে কোনো খেয়াল নেই কারো, শুধু হুকুমের উপর চলে।

.


কালকে রাতে একটা গার্লস গ্রুপে নিজের মনের না বলা দুঃখের কথা গুলো শেয়ার করেছিলাম ফেক আইডি দিয়ে সেখানে দেখলাম আমার মতো অনেক বোন এমন অবস্থায় মুখ বুঝে সহ্য করছে। অনেকে আমায় অনেক সাহস দিয়েছে যা বাবা মারা যাওয়ার পর কেউ দেয়নি।


এইভাবে এতো কাজ করতে করতে একদিন মরেই যাবো। তাই আজ সাহস করে নিজের জন্য কিছু করতে হবে। বাচ্চা হচ্ছে না এতে আমার কেন দোষ হবে কতো মানুষের দশ, বারো বছর ধরে বাচ্চা হয় না কই তারাও তোহ সংসার করছে। অনেকে বললো, তাদের কারো ৬ বছর, ৮ বছর ধরে বাচ্চা হচ্ছে না কিন্তু বর সাপোর্ট দিচ্ছে। আল্লাহ না দিলে কি করার। দোয়া ছাড়া তোহ আর কোনো পথ নেই।

--


এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম। আজ মেঝেতে ঘুমাচ্ছি।শাওনের পাশে ঘুমাতেও কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করছে।


সকালে শাওনের আগেই ঘুম থেকে উঠে কাজে লেগে গেলাম। 


ঘুম থেকে উঠে শাওন চিল্লাচিল্লি করছে। আলো সেইদিকে কান না দিয়ে তার নিজের কাজ করছে। কাজ শেষ করে পিঠা বানাবে।


- শাওনঃ তোমাকে না বলেছি রাতে পিঠা বানাতে। বানাওনি কেন।


- আলোঃ কাজ সেরে বানাতো বসবো। (আর আমি মানুষ রোবট নই।আমারও ঘুমের প্রয়োজন আছে। নির্ঘুমে থেকে থেকে আমি এতো কাজ কেন করবো,মনে মনে বললাম)


শাওন আর কিছু বলল না চলে গেলো।এই সময় সে মুখ খারাপ করতে চাচ্ছে না।আর আজ আলোকে কেমন যে অন্যরকম লাগছে।


কাজ শেষ করে আলো রুপাকে ডাকছে।


- আলোঃ রুপা ও রুপা এদিকে আসো। 


- রুপাঃ কি হয়েছে এতো ডাকাডাকি করছেন কেন?


- আলোঃ বড় আপু আর ছোট আপুর বাড়িতে পিঠা পাঠাবো তাই আমার সাথে পিঠা বানাতে বসো। 


- রুপাঃ আমি পিঠা বানাবো কেন। আপনার ননাস, ননদ আপনি বানান। আমি পিঠা বানাতে পারিনা। 


- " তোহ কি পারেন বসে বসে অন্যের ঘরে খেতে পারেন। আর মানুষকে অর্ডার দিতে পারেন আর কূটনামি করতে পারেন তাই না।" (কেউ একজন বললো)


- আলোঃ সূচি আপু আপনি।এমা বললেন না যে আসবেন।ওনি(শাওন) গিয়ে নিয়ে আসতো।আসতে কি কোনো অসুবিধা হয়নি তো।


- সূচিঃ না ভাবি। বড় আপাও আসছে ভাবি। ওইদিন তোহ চলে গিয়েছিলাম তাই আজ আসলাম শীতে বাচ্চারা নানী বাড়িতে আসবে বায়না ধরলো। 


- আলোঃ মা দেখে যান ছোট আপু এসেছে। (জোরগলায় বললো)


আলো খুশি হয়ে সূচির মালামাল ঘরে নিয়ে গেলো। রুপা মুখ বাকা করে ঘরে চলে গেল। এই সূচি আর সাথীর সাথে সে কথায় পারবে না তাই কথা বাড়ায় না।


- শাওনের মাঃ কিগো মা আইসো তুমি। আসো। দেও আমার নাতীটারে দেও।


সূচি আপুর ১ বছরের ছেলেকে কোলে নিলো আর ৫ বছরের মেয়েকে সাথে নিয়ে ভেতরে গেলো।


- শাওনের মাঃ আলো সূচিরে সরবত দেও। কতো দূর থেকে আইসে।কিরে মা জামাই বাবা আসলো না। আর না কইয়া যে আইসো। আমারে ফোন দিলা না। কত কষ্ট কইরা আইসো শাওনের বাপেরে পাঠাইতাম হেয় নিয়া আইতো। তো বিয়ান সাব আর বিহাই সাব ভালো আছেনি।


- সূচিঃ উনি(বর) ব্যস্ত মা তাই আসে নাই। আর সবাই ভালো। আচ্ছা বড় ভাই কোথায়।


আলো সরবত দিতে দিতে বললো,

- আলোঃ উনি আসতেছে দোকান বন্ধ করে। আর আপনি একা আসছেন কিভাবে। কখন রওনা দিয়েছেন।


- সূচিঃ আমার ভাসুর আর শ্বশুর মিলে আমাকে আর ভাবিকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েছে।আমার জাও তার বাবার বাড়ি গিয়েছে আমিও আসলাম।যাক আমার বড় ব্যাগ টা দেও তোহ ভাবি।


সূচি তার ব্যাগ থেকে অনেক কিছু বের করলো। এরমাঝে শাওন এসে হাজির। 

রুপাও কান পেতে ওদের সবার কথা শুনছে।


- শাওনঃ তুই আসবি বললি না কেন। আমি গিয়ে নিয়ে আসতাম তাহলে।


- সূচিঃ তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে চলে আসছি।আচ্ছা সবার জন্য শীতে পিঠা নিয়ে এসেছি।সব ধরনের পিঠা বানিয়েছি কালকে।


- শাওনের মাঃ সব গুলা তুই একলা বানাইছোত।এতো কষ্ট করলি কেন। তোর ভাই কালকে চালের গুড়া নিয়ে আসছে। বউরে কইছে রাতে বানাইতে বানায় নাই। (চোখ রাঙিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে)


আলো চুপ করে আছে। সূচি সেই দিকে কান না দিয়ে। আলোকে বললো,


- সূচিঃ আলো ভাবি আমার জা আপনার জন্য পাটিসাপটা পিঠা বানিয়েছে।আপনার খুব পছন্দ তাই। গতবার আপনি তার পছন্দের আর আমার ননদের পছন্দের চিতই পিঠা ও দুধ চিতই পিঠা বানিয়ে পাঠিয়েছেন না৷ তারা যে কি খুশি তাই এইবার ননদ আর আমরা দুই জা মিলে পিঠা বানালাম।শাশুড়ী তোহ আমাদের জোড় দিয়ে বললো,আপনার জন্য এইবার নিয়ে যেতেই হবে। খেয়ে দেখুন তোহ। এই সব পাটিসাপটা পিঠা আপনার।


বলেই হাতে পিঠা বক্সটা এগিয়ে দিলো। সবাই যেনো হালকা রাগী ভাব নিয়েই আছে। আলো হাসি মুখে বক্স নিয়ে নিলো। খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু সবাই চেহারা দেখে খেলো না।


- আলোঃ পরে খাবো আপু। আপনি এখন রেস্ট নিন।


আলো সব কিছু গুছিয়ে রান্না ঘরে গেলো কিছুক্ষন পর বড় আপু চলে আসবে। আজ তাদের জন্য গরুর মাংস রান্না করবে আলো। গতবার তোহ খেতে পারলো না এভার ভালো করে রান্না করবে।


.


রান্না বান্না শেষ করলো। বড় আপাও চলে আসছে। গরুর মাংস রান্না করে শাশুড়ী আর শাওনকে হালকা টেস্ট করে লবন চেক করালো।সে এবার বললো, 'যদি লবন/মরিচ বেশি হয়ে যায় তাহলে বুঝে নিতে যে অন্য কেউ করেছে।'


.

সাথী আপু ও তার দুই মেয়েও চলে এসেছে। 

সবাই খাবার টেবিলে বসেছে। সাথী আপু রান্না করে নিয়ে এসেছে। উনি কাবাব আর পায়েশ বানিয়ে বাসা থেকে নিয়ে এসেছে। সবাই খাবার খাবে আলোকে তার শ্বশুর আর ননাস আর ননদ জোর করে বসিয়েছে। এতোদিন সবার শেষ এ খেতো কিন্তু আপুরা আসলে এক সাথে খায়। আলোকে নিজের বোনের মতো মনে করেন। ভাগ্য একটু হলেও ভালো তাই এমন বোনের মতো ননদ ননাস পেয়েছে। তারা সব সময় আলোর সাথে ভালো ব্যবহার করে। শুরুতে শাশুড়ীও ভালো ব্যবহার করতো কিন্তু বাচ্চা না হওয়ায় আর পাশের বাড়ির চাচীরা তাদের বউদের কথা বলে বলে এক সময় আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের পাত্রী বানিয়ে দিলো।সাথে রুপা তোহ আছে।বিয়ে পর থেকে এখানেই পড়ে আছে।ঈদের সময় ২ দিন নিজের বাড়ি থাকে শুধু পরে দৌড়ে চলে আসে।আমার বর তাকে পাত্তা দেয় না তারপরও আমাদের পেছনে পড়ে আছে।


আপুরা ১০ দিন থেকে চলে গেলো।


--

------

অন্যদিকে,

আঁধারের রুমে ওর বড় বোন, মা,ভাবি বসে আছে।আঁধার চুপ করে আছে।


- আঁধারের বোনঃ আমি সবাইকে সবটা বলে দিয়েছি আঁধার।আমি তোমাকে আর এভাবে দেখতে পারছি না। ওই মেয়ে তোমাকে ছেড়ে অন্য কারো হয়ে গিয়েছে তুমি কেনো তার জন্য অপেক্ষা করছো।সে তোহ ফিরবে না। সে তার স্বামী সংসার নিয়ে ব্যস্ত। 


- আঁধারঃ আপু ভালোবাসলে যে মিল হবে এমন তো নয়। আমাদের না হয় অমিলই থাক।আমার ওর সাথে আমার শেষ দেখে ১৪ বছর আগে।যেদিন আমরা ওই এলাকা ছেড়ে এইখানে এসেছিলাম।এই ১৪ বছরে তার কথা,হাসি আমি প্রতি মূহুর্তে মনে করি৷ সে আমায় বদলে দিয়েছিলো আমার পাশে ছিলো।কিভাবে আমি তাকে ভুলতে পারি।আমাকে ভুলে যাওয়ার কথা বলো না প্লিজ। ১৪ বছরে অনেক চেষ্টা করেও তার দেখা পাইনি। তারপরও আমি তার জন্য অপেক্ষা করবো।কারন সে বলেছিলো।সে শুধু আঁধারের আলো।  


বলে ছাদে চলে গেলো। 


- আঁধারের মাঃ আয়েশা(আধারের বোন) একবার আমাকে সব বলতা।


- আয়েশাঃ কি বলতাম। আমি নিজেও জানতাম না তোমরা তো জানো আঁধার সহজে কাউকে কিছু বলতে চায় না। আর আমি আলোকে চিনি তাই আমাকে নিয়ে ওদের বাসায় গিয়েছিলো ৭ বছর আগে। অনেক চেষ্টা করেছে আলোর সাথে দেখা করার কথা বলার।কিন্তু আলো প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতো না। তার উপর ওর দাদী দেখা করতে দিতো না। আমি আর আঁধার বিয়ে প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ায় বলেছে আঁধারের চাকরি নাই বয়স কম। দিবে না বিয়ে। 


আঁধার ৩,৪ বছরের সময় চেয়েছিলো সে কিছু না কিছু করবে কিন্ত কে জানতো ওর বিয়ে হয়ে যাবে। আমি অনেক খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। এখান থেকে অনেক দূরে হওয়ায় যেতেও সময় লাগে মা।আর আঁধার বলেছে ও তোমাদেরকে বলবে তাই আমি এতো বছর চুপ ছিলাম ভুলেই গিয়েছিলাম সেদিন আলোর কথা জিজ্ঞেস করায় বুঝতে পারলাম। 


- আঁধারের ভাবিঃ মা আপনারা কি আলো কে চেনেন কেমন দেখতে।


- আঁধারের মাঃ হ্যা বউ মা চিনি, ২০ বছর আগে আমি আর তোমার বাবা আমার তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে ওখানে আলোদের বাড়ি পাশের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। তোমার বাবা কাজ করতো সেখানে। আর সেখানে আঁধারের সাথে পড় এক মেয়ে নাম তার আলো। একই স্কুলে একই ক্লাসে। আলোর সাথে দেখা হওয়ার পর আঁধার সারাদিন আমার সাথে আলোর কথাই বলতো।


একটা কাহিনি এখনো আমার মনে আছে আলো ওকে বাঁচিয়েছে। ও নাকি রাস্তায় সবার সামনে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলো, আশেপাশের বাচ্চারা হাসাহাসিতে আঁধার এর সেকি কান্না পাচ্ছিলো হঠাৎ নাকি একটা মেয়ে তার পাশে মাটিতে বসে পড়ে নিজের ড্রেসে হালকা কাদা মেখে তার দেখে আশেপাশের বাচ্চারা হাসি বন্ধ করে চলে যায়। এরপর আঁধারকে বাসায় দিয়ে নিজের বাসায় চলে যায়। আঁধার তখন থেকেই যখনই আলোকে দেখতো দৌড়ে ওর কাছে চলে যেতো। এই কাহিনি আঁধার আমাকে অনেক বার বলতো।


এইসব বলছে আর আধারের মায়ের চোখ ছলছল করছে। নিজের ছেলের মনের কথা বুঝতে পারেনি।৫ বছর ওখানে থেকে এরপর ওর বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় এলাকা ছেড়ে এখানে আসে ১৪ বছর হয়ে গেলো।আর এই ১৪ বছর আঁধার কতো শত বাহানা করে ওই এলাকায় গিয়েছে।আজ বুঝতে পারলো কেন গিয়েছে। 


-----

----------


এভাবে অনেকদিন কেটে যায়। আলোর ভাই এর বউরে বাচ্চা হওয়ার সময় চলে এলো।


একদিন সকালে শাওন আলোকে বলছে,


- শাওনঃ আলো দোকানের মাল উঠাবো তোমার ভাই এর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা চাও তোহ।


- আলোঃ কি বলেন আমার ভাই কোথা থেকে টাকা দিবে। আর কয়দিন পর ওর বউ এর ডেলিভারি আপনি জানেন না।


- শাওনঃ হ্যা আমি কিছু চাইলেই এই সমস্যা সেই সমস্যা।আর বিয়ের সময়ও তোহ কিছু দেয় নাই। আমি আহামরি কি চেয়েছি যে দিতে পারবে না। আমাকে ধার দিতে বলো আমি ফেরত দিয়ে দিবো।


- আলোঃ দেখুন এটা সম্ভব না এর আগেও আপনি আমায় না বলে ওর কাছ থেকে টাকা নিয়ে এসেছেন।আমি পারবো না।


শাওন হালকা রেগে গেলো,

- শাওনঃ শোনো নিজের কাপর চোপড় রেডি করো আমি তোমায় গাড়িতে উঠিয়ে দিবো। টাকা নিয়ে আসতে পারলে আসবা না পারলে আসার দরকার নেই। এমনিতেও তুমি কোনো কাজেরই না আমি আমাদের বিয়ের এতো দিন হয়ে গেছে বাবা হতে পারলাম না। আমি দোকানে যাচ্ছি এসে যেনো তোমার মুখ না দেখা লাগে। 


বলেই চলে গেলো।আলো সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।


দুপুরে শাওন খাবার খেতে এসে দেখে আলো নেই। সারাবাড়ি খুঁজেও আলোকে পেলো না। দওর মাও বললো, 'আলো নাকি চলে গেছে।' এর মানে সত্যি চলে গেছে। যখন গিয়েছে টাকা নিয়েই আসবে।তাই সে মাথা ঘামালোনা। 


বাবার বাড়ির দরজার দাঁড়িয়ে আছে আলো।আলোকে এভাবে এতো বড় ব্যাগের সাথে দেখে সবাই অবাক হয়ে চেয়ে আছে।আলোর দাদী বিরক্ত নিয়ে বসে আছে। হুট করে আলোর আসায় সবাই অবাক।


(চলবে)...গল্প : আলো আঁধার

পর্ব : (০৪)

লেখা : ইনশিয়া আহমেদ হায়াত

---------

বাবার বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আলো। নিজের সাথে করে আনা ট্রলি ব্যাগ টা বাহিরে রেখে হাতে খবরের কাগজে মোড়ানো একটা বক্স নিয়ে প্রবেশ করলো।আলোকে এখানে দেখে ওর মা ও ভাইয়ের বউ এগিয়ে এলো।

এই সেই আলো যার চোখের নিচে কালি।অনেকটা ফুলে গেছে অনেক।এই ফুলা মোটা নয়।অতিরিক্ত পরিশ্রম এ ফলে এমন অবস্থা হয়ে গেছে। কেমন ফ্যাকাসে লাগছে দেখতে। নিজের মলিন চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আলোকে দেখে ওর মা জিজ্ঞেস করলো,


- মাঃ আলো তুই এই সময় এখানে।আর এতো বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছিস কেন? 


- দাদীঃ কেন আবার আমার নাতীর থিকা টাকা নিয়া পেট ভরে নাই তাই আবার আইসে টাকা নিতো। 


আলো দাদীর দিকে চেয়ে মুচকি হাসলো। সাথে তার ভাইয়ে শাশুড়ী কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আলো তার কাছে গেলো।


- আলোঃ চাচী টাকাটা দিন।


- ভাইয়ের বউঃ কিসের টাকা আপু (অবাক হয়ে)


সবাই অবাক বুঝতে পারছেনা কি হচ্ছে।আলো সেদিকে কান না দিয়ে এবার একটু জোরে বললো,


- আলোঃ টাকা গুলো দিন।


আলোর ভাই এর শাশুড়ী, রুমে গিয়ে টাকা এনে আলোর হাতে দিলো।


- আলোঃ আমি এখানে টাকা নিতে আসিনি। ওইদিন আমি টাকার জন্য পাঠায়নি, যার কাছে বিয়ে দিয়েছেন সে আমায় না বলে টাকা নিতে চলে আসে। যাইহোক টাকা আমি ওইদিনের পরের দিনই ফেরত দিয়ে গিয়েছি। আকরামের(আলোর ভাই) শাশুড়ী আমায় বাসায় যেতে মানা করায় তার কাছেই বাহিরে থেকে টাকা দিয়ে চলে গিয়েছি। ফাতেমা(আকরামের বউ) এই নেও টাকা আকরাম আসলে ওকে দিয়ে দিবা। আর বলবা আমি টাকা চাইনি। আমার টাকার প্রয়োজন নেই।


- ফাতেমাঃ মা, আপু টাকা দিয়েছে বলেননি কেনো। আর আপুকে বাসায় আনেননি কেনো।


ফাতেমার মা আমতা আমতা করে বললো,

- ফাতেমার মাঃআসলে আমার মনে ছিলো না আর


আর কিছু বলার আগেই আলো তাকে থামিয়ে বলা শুরু করলো,


- আলোঃ আমি আজকে এখানে কিছু কথা বলার জন্য এসেছি যা গত ১২ বছরে বাবা মারা যাওয়ার পর বলা হয়নি। 


- দাদীঃ কি বলতে আইসো তুমি। কয়দিন পর পর দৌড় দিয়া আইসা তামাশা করো।


- আলোঃ দাদীমা আমার বিয়ে ২ বছর হয়েছে এই দুই বছরে ৫ বারও আমি এই বাড়িতে আসিনি। তাহলে কিভাবে বলেন যে দুইদিন পর পর এসেছি। আচ্ছা আমায় আপনি দেখতে পারেননা কেন। আমি মেয়ে বলে৷ আপনাকে একটা প্রশ্ন করি।আপনি যখন জন্ম নিয়েছেন তখন কি ছেলে হয়ে জন্ম নিয়েছেন নাকি মেয়ে হয়ে?


বলেই একটু দম নিলো।কান্না পাচ্ছে খুব।এই প্রথম আলো মনে চাপা কথা গুলো বলছে। আর বলতেই হবে।আজ না বললে কখনোই বলা হবে না।


আলোর দাদী চুপ হয়ে আছে।তার চুপ থাকায় আলো আবার বলা শুরু করলো,


- আলোঃ আপনি আগের যুগে মেয়ে হয়ে ভালো ভাবে থেকেছেন খেয়েছেন ভালো জায়গায় বিয়ে করে বাচ্চা জন্ম দিয়ে নাতী নাতনি দেখে। নাতীর ঘরে পতি দেখতে যাচ্ছেন। কই আপনার মা দাদীরা তোহ আপনাকে ঠিকই ভালো লালন পালন করেছে।তাহলে আমি এই যুগে হয়ে শিক্ষিত সমাজে থেকে আমার প্রাপ্য অধিকার ভালোবাসা থেকে কেন বঞ্চিত হবো।কেন ছেলে মেয়েকে আলাদা চোখে দেখতে হবে। আশেপাশে কতো মানুষ দেখলাম কই তারাও তোহ কন্যা সন্তানকে ঠিকই লালন পালন করছে। তারা পার্থক্য করছে না কেন। আছে কি উত্তর কারো কাছে। দাদী আপনিই বলেন আপনি মেয়ে হয়ে সসম্মানে বাঁচতে পারলে আমি মেয়ে হয়ে পারবো না কেন। নাকি আপনি মেয়ে হওয়া আর আমি মেয়ে হওয়ার মাঝেও তফাৎ আছে।


আলোর গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে বার বার মুছে ফেলছে। কথা গুলো গলায় আটকে যাচ্ছে। কিন্তু আজ থামবে না।আজ যে বলতেই হবে।সবাই চুপ হয়ে আছে। আলোর মা ও ভাইয়ের বউ কাঁদছে।


- আলোঃ আমাকে আপনারা সব সময় টিস্যুর মতো ব্যবহার করেছেন। বাবা এক্সিডেন্টে মারা গেছে তা কি আমার দোষ।সব সময় সব কিছুর জন্য আমাকে দোষ দেওয়া হয়েছে। আমাকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজের লোকের মতো খাটানো হয়েছে কারন বংশের ছেলেকে লালন পালন করতে হবে তাই। থাকা খাওয়া পোশাক সব দিক দিয়ে আমি বঞ্চিত ছিলাম। আমার কষ্টে টাকা দিয়ে সংসার চালিয়ে আমাকেই কথা শোনানো হতো। আর একবারও কি আমায় দেখতে চেয়েছেন আমি ওইবাড়িতে বেঁচে আছি নাকি মরে গিয়েছি।


ওই বাড়িতে কেমন আছি একবারও খোঁজ নেননি।আরে একবারো দেখতেও জাননি আর না আমায় কখনো বলেছেন এই বাড়িতে আসতে।কখনো ফোন দিয়ে দুইমিনিট কথা বলে জিজ্ঞেসও করেননি যে আলো কেমন আছো। আমি নিজে থেকে বেহায়ার মতো ফোন দিতাম আর আপনাদের কথা শুনতাম।আচ্ছা বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন ব্যস দায়িত্ব শেষ। আপনাদের মাঝে দায়িত্ববোধ নামক জিনিসটা মরে গিয়েছে। আর সব চেয়ে বড় কথা জীবনে একটা জিনিস চেয়েছিলাম।আঁধারকে বিয়ে করার কথা সেখানেও আমাকে শাস্তি হিসেবে একজন অমানবিক পুরুষ এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।কেন এইবাড়ির ছেলে যদি তার পছন্দের মানুষকে জীবন সঙ্গী বানাতে পারে তাহলে মেয়েটি কেন পারবে না।কেন?


আলো কান্নার ভেঙে পড়লো কতো বছর পর কাঁদছে জানা নেই তার। বিয়ের সময় বিদায়েও কাঁদেনি সে। ফাতেমা আলোর পাশে এসে দাঁড়ালো কি বলে শান্তনা দিবে বুঝতে পারছে না। আলোর মাও কাঁদছে। 


হুট করে আলোর দাদী এমন কিছু বললো যার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলো না।


- দাদীঃ ও এই কথা এবার বুঝছি তোমার নাগর বুঝি আইসা পড়ছে তাই না।তার সাথে যাওয়ার জন্য এত কথা। আমাগো মান সম্মান ডুবানোর জন্য এই রাস্তা।তোরে তোহ জন্মের সময়ই মাইরা ফালানো উচিত ছিলো। 


- আলোর মাঃ মা আপনি এইগুলো কি বলছেন। চুপ করুন দয়া করে। আজ কিছু বলবেন না।


আলো কান্নার মাঝেই হেসে দিলো সবাই অবাক হলো।


- আলোঃ সত্যি দাদী আপনি আর আপনার মানসিকতা কখনোই বদলাবে না। যাক আমি কাউকে কোনো কৈফিয়ত দিতে আসিনি। যেই কাজে এসেছি তাই করি। 


চোখের জল মুছে ফাতেমার হাতে খবরের কাগজে মুড়ানো বক্সটা দিলো।


- আলোঃ তুমি খুব মিষ্টি মেয়ে ফাতেমা। আমার ভাইয়ে খেয়াল রেখো।আর হ্যা তোমার যদি মেয়ে হয় তাহলে দয়া করে এইবাড়িতে এদের কারো ছায়া তোমার মেয়ের উপর পড়তে দিও না। জীবনটা অভিশপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ যেনো তোমায় কন্যা সন্তান না দেয়। আর এই বক্সটা আকরামকে দিয়ে দিও। তোমার উপর আমার বিশ্বাস আছে তুমি এই বক্সটা খুলবে না।কারো কথায়ও খোলবে না প্লিজ(ফাতেমার মায়ের দিকে তাকিয়ে) আমি চাই বক্স আকরাম খুলুক।নিজের খেয়াল রেখো ভালো থেকো। 


আলো কথা শেষ করে বাহিরের দিকে পা বাড়ালো।


- ফাতেমাঃ আপু আপনার ভাই আসার পরই যেতেন। নিজ হাতে দিতেন বক্সটা।


আলো মুচকি হাসলো,

- আলোঃ আমার যে সময় নেই ফাতেমা। তুমিই দিয়ে দিও এটার জন্যই এসেছিলাম।


আলোর মা আলো হাত ধরে ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আলো কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললো,


- আলোঃ আমায় ছাড়ুন।যেতে দিন যেতে হবে। 


- আলোর মাঃ মা গো আমারে মাফ করে দেও। আমি কোনো দিন তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করি নাই।মায়ের (শাশুড়ীর) সাথে থাকতে থাকতে তার মতোই হয়ে গিয়েছি। তুমি আমার মাফ করে দেও।


- আলোঃ মাফ করার কিছুই নেই। আর জন্ম দিলেই কি মা হওয়া যায় নাকি। আপনাকে আমি তুমি থেকে আপনি কেন ডাকি জানেন। কারন আমার কাছে আপনজন যখন পর হয়ে যায় তখন তাকে আপনি বলে ডেকে থাকি। আপনাকে ঠিক মা বলে কবে ডেকেছি বলতে পারবেন। পারবেন না। 


আলোর মা চুপ হয়ে কথা গুলো শুনে ভাবতে লাগলো। 


আলো সবার দিকে চেয়ে বললো,

- আলোঃ আশা করি আমার চেহারা যেনো আপনাদের না দেখা লাগে।


এর মাঝে ফাতেমা আকরামকে মেসেজ করে আসতে বলে। কেন যেনো আজ তার ভয় করছে।


আলো কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বাহিরে চলে এলো। দ্রুত পায়ে একটা অটোতে উঠে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছে।

.


চলে যাচ্ছে দুই পরিবার থেকে বহু দূর। গার্লস গ্রুপ থেকে এক আপুর সাথে তার পরিচয় হয়৷ তার কষ্টের কাহিনি শুনে আপু তার কাছে চলে আসতে বলে। ওই আপু একা থাকে। আলো তার ফোন নাম্বার নিয়ে রাখে সময়ে কাজে লাগবে তাই। আজ সকালে শাওনের বলা কথা গুলোর পর সিদ্ধান্ত নেই চলে যাবে বহু দুর। অনেক আপু তাকে সাহস দেয়। নিজের জন্য লড়াই করার শক্তি দেয় যার ফল আজ।সেই আপু ঠিকানা দিয়ে দিয়েছে।আলো সেই ঠিকানায় রওনা হয়েছে।


.


শাওনদের বাড়িতে শাওনের মা শাওনকে বকছে,

- শাওনের মাঃ তোর বউ স্বর্নের চেইন লইয়া গেছে গা।আমারে জিগায়ও নাই। তুই কিছু কস না তাই মাথায় উঠছে। এমনে এতো কাম ফালাইয়া বাপের বাড়ি গিয়া মরছে। চেইন আমার কাছে রাখছি হারায় যাইবো গা তাই। বিয়ে মধ্যে বাপের বাড়ি থিক্কা সুতার সমান চিকুন চেইন আনছিলো সেইটাও লইয়া গেলো। পোড়া কপাল আমার। 

 

- রুপাঃ থাক খালা শাওন ভাই আপনেরে নতুন দেইখা চেইন আইনা দিবোনে। 


শাওন কিছু না বলে রুমে চলে গেল।আলমারি খুলে দেখলো পুরনো কাপর চোপড় পড়ে আছে। আর শাড়ি(বিয়ে মধ্যে উপহার পেয়েছিলো সেইসব শাড়ি) কিছু নতুন থ্রিপিস যেগুলো কোনো ভালো দিনে পড়তো ওইগুলো নিয়ে বাকি সব রাখা।খালি বিয়ের শাড়ি পড়ে আছে। 


শাওন ভাবছে চেইন নিয়ে গেল। বিয়ে দুই বছরে মা সেই যে চেইন নিয়েছে কত চাওয়ার পরও দেয় নাই। আর আজ নিজে থেকে নিয়ে গেছে।ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে।শাওন তারতারি তার ড্রয়ার দেখলো যেখানে টাকা রাখে। সেটা খুলে দেখলো না টাকা যেখানে ছিলো সেখানেই আছে। কিছুক্ষন গুনে নিলো সব ঠিক।বিয়ের সময় একটা ট্রলি কিনেছিলো ওটা নেই।শাওন এইসব ভেবে কুল পাচ্ছেনা। ভাবলো অনেকদিন পর বাবার বাড়ি থাকতে গিয়েছে তাই এইভাবে গেলো।কখনো তোহ কিছু কিনে দেয় নাই তাই সব নিয়ে গেছে যাতে কেউ বলতে না পারে সে কিছু দেয় না বউকে। যাক বুদ্ধিমতি আছে।শাওন গান গাইতে গাইতে চলে গেলো।


---

---

ওইদিকে,


আঁধার নিজের দোকান চালু করে দিয়েছে। একজন কর্মচারীও রেখেছে। আঁধার দোকানে বসে নিজের মানি ব্যাগে রাখা সাদাকালো ছবির উপরে হাত ভুলাচ্ছে।ছবিতে একটি বাচ্চা মেয়ে গোমড়া মুখ করা ছবি।এই ছবিটি আর কারো নয় আলোর। তখন তারা ক্লাস ফর'এ পড়তো, কোনো কারনে ছবি তুলতে হবে। ছবি তুলে আলো দেখলো তার ছবি সুন্দর হয়নি। মাথায় তেল চুবচুব করছে। ছবিটা বাকা উঠেছে তাই রাগ করে ফেলে দিয়েছিলো। আঁধার সেটা কুড়িয়ে নিজের কাছে সযত্নে রেখে দেয়। এতো বছর ধরে নিজের কাছেই আছে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকে। রাতে ছবির সাথে কথা বলে। আরো কতো কি...


আঁধার হাসছে আর মনে মনে বলছে, ‘আমার দুই মাসের বড় আলো। খুব তোহ জোড় গলায় বলেছিলো তুমি শুধু আঁধারের আলো। কিন্ত আজ কি হলো আঁধারের আলো যে অন্য কারো হয়ে গেলো। তোমার উপর আমার কোনো রাগ নেই। শুধু শেষ একটাই ইচ্ছা এই ২৬ বছরের নারী আলো কেমন দেখতে তাই দেখতে চাই।’

---

-------


আলো বাস থেকে নেমে একজনকে খুঁজছে। কিছুক্ষনপর একজন মেয়ে আসলো আলো তার সাথে কথা বললো এরপর দুজন চলে গেলো। মানুষ বড়োই অদ্ভুত তাই না সামান্য কষ্টের কথা শুনে সাহায্য করার জন্য চলে এলো আপু। আর কাছের মানুষের কাছ থেকে শত কষ্ট পেয়েও একটুখানি সুখের আশায় ছিলাম। আজ কেন যেন মনে হচ্ছে আপনের চেয়ে পর ভালো। সামনের দিন গুলো কিভাবে কাটবে জানি না।


আলো আর মেয়েটি একটি ফ্লাটে আসলো। 


- মেয়েটিঃ আলো তুমি বসো আমি তোমার জন্য শরবত নিয়ে আসি।


আলো চারদিক দেখছে অনেকটা গুছানো ঘর। এতো বড় ফ্ল্যাট এ উনি একা থাকে।


- মেয়েটিঃ কি দেখছো। (শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললো)


- আলোঃ মনিরা আপু এতো বড় বাড়িতে তুমি একা থাকো।


- মনিরাঃ একসময় বর আর আমি থাকতাম এখন শুধু আমি।


- আলোঃ আপু কিছু মনে না করলে একটা কথা।


- মনিরাঃ একটা নয় ১০০ টা বলো। আগে ফ্রেশ হয়ে নেও কিছু তোহ খাওনি সকাল থেকে চলো আমরা খেয়ে সারাদিন গল্প করবো।


আলোর চোখ ছলছল করছে। চিনা নাই জানা নাই একটা মেয়েকে থাকতে দিচ্ছে খেতে দিচ্ছে।


- মনিরাঃ উফফ, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছে ফেলো।এই জল যেনো গড়িয়ে না পড়ে ঠিক আছে। আর চিন্তা করার কোনো কারন নেই আমি তোমার পাশে আছি। আমাকে বড় বোন ভাবতে পারো


.


আলো ও মনিরা বসে বসে কথা বলছে,


- মনিরাঃ ছোট বেলায় আমার বাবা মারা যায় মা কষ্ট করে বড় করে আর লালন পালন করতে থাকে কিন্তু হঠাৎ মাও মারা যায়।আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না এরপর আমার একজনের সাথে পরিচয় বয়সে আমার অনেক বড়। একদিন সে আমায় বিয়ের প্রস্তাব দেয় উপায় না পেয়ে রাজি হয়ে যাই। লোকটা আমায় বড্ড ভালোবাসতো। আমাকে পড়াশোনা করিয়ে এখানে আনার পেছনে তারই অবদান। আজ আমি ভালো জব করি এই ফ্লাটের মালিক আমি ভালোই চলছে দিনকাল।


- আলোঃ উনি কোথায় এখন।


- মনিরাঃ উনিও আমায় ছেড়ে একা করে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে। যাক তুমি চিন্তা করো না তোমার জন্যও আমি কিছু না কিছু করবো।নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তুমি যা সিদ্ধান্ত নিবে আমি তোমার সঙ্গ দিবো। তোহ এখন তুমি কি চাও।


আলো হালকা ভেবে বললো,

- আলোঃ ডিভোর্স 


----

---

অন্যদিকে আকরাম বাসায় এসে সব কিছু শুনে চুপ হয়ে আছ।ওর আসতে দেরি হয়েছে না হয় আজ ওর বোন ওর সাথে থাকতো।বোনের দেওয়া বক্সটা খুলতে বড্ড ভয় করছে। কয়েকবার কল করেছে কিন্ত ফোন বন্ধ।শাওনকেও কল দিয়েছে সেখানেও নেই। তার বোনের কিছু হলো না।সাত পাঁচ না ভেবে বক্সটা খুললো।


বক্সের ভেতরে ছোট ছোট বাচ্চা মেয়ের দুইটা জামা। যা দেখে আকরাম অবাক এটা তোহ তার বোনের ছোট বেলার জামা যেটা। যখন আকরাম ছোট ছিলো হুটহাট করেই আলোর জামা পড়ে ফেলতো। আকরামের এই জামা নাকি খুব পছন্দের অনেক ঝগড়া হতো এরপর আকরামের মা জামাটা আলমারিতে রেখে দেয় বের করেনি আর। 


আকরাম ভেবেছিলো ফেলে দিয়েছে এটা কিভাবে আলোর কাছে ছিলো।জামা গুলো বড় ছিলো এখন দেখে মনে হচ্ছে আলো কেটে হালকা ছোট করে ১ বছরের বাচ্চার সাইজ বানিয়ে একটু ডিজাইন করে দিয়েছে।এরপরও আকরামে চিনতে ভুল হয়নি যে এটা আলোর জামা।


বক্সে জামার সাথে একটা ছোট বক্স আর তার পাশেই সাদা কাগজ হয়তো চিঠি।ছোট বক্সটা খুলে দেখলো বক্সে ছোট ছোট রিং কানের দুল। 


আকরাম চিঠিটা হাতে নিলো পড়তে বেশ ভয় করছে। চিঠিটা সাহস করে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো।সবাইকে চিৎকার করে বলছে,


-- 'আমার বোন চলে গিয়েছে।কোথায় খুঁজবো তাকে।আমার বোনের সাথেই এমন কেনো হলো।'


চিঠিতে কি লেখা কেউ জানে না।ফাতেমাকেও ধরতে দিচ্ছে না চিঠি।


.


আলো চলে যাওয়ার ৭ দিন হয়ে গেলো। 

আকরাম রোজ চিঠিটা পড়ে আর কাঁদে।অনেক জায়গায় খুঁজেছে নিজের বোনকে।আকরাম তার মা, শাশুড়ী আর দাদীর সাথে একেবারেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। ফাতেমার সাথে কথা বলে আর সে চায় তার যেনো মেয়েই হয় এই অবস্থায় ফাতেমার অনেক খেয়াল রাখছে আকরাম। শাওনের বাসায় গিয়েও শাসিয়ে এসেছে সবাইকে। 


.


শাওন চিন্তায় পড়ে গেলো আলো হঠাৎ কোথায় চলে গেলো। 


দুইদিন পর শাওনের দুই বোন এসেছে।শাওনদের বাসায় এসেই রুপাকে রুম থেকে বের করে ৪/৫ টা চড় বসিয়ে দিয়েছে দুই বোন মিলে।ওদের এমন কাজে সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছে।দুই বোন প্রচুর রেগে আছে....


(চলবে)....


(কেমন লাগতেছে গল্পটা? সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করুন।ধন্যবাদ) বাকি পর্ব গুলা এই পেজে দিছি দেখেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url