গল্প : আলো আঁধার

পর্ব : (০৫)+৬+৭+ শেষ পর্ব

লেখা : ইনশিয়া আহমেদ হায়াত

--------

শাওনের দুই বোনের চিল্লাচিল্লিতে পুরোবাড়ি মাথায় উঠে গেছে পাশের বাসার চাচীরাও চলে এসেছে। শাওনের বড় বোন সাথী রুপার চুল ধরে কয়েকটা চড় বসিয়ে দিয়েছে। সূচি শাওনের অপেক্ষা করছে।শাওনকে ৫ মিনিটের মধ্যে বাসায় আসতে বলছে। শাওনের মা তার দুই মেয়ে কান্ড দেখে বুঝতে পারছে না কি করবে।


- সাথীঃ তোকে এইবাড়ি থাকতে দিয়েছি খেতে দিয়েছি কি অন্যের সংসার ভাঙ্গার জন্য। (বলেই হাত মুষ্টি বদ্ধ করে রুপার পিঠে দুটো কিল মেরে দিলো)


- সূচিঃ এতোদিন ধরে মায়ের জন্য চুপ করে আছি। কারন মায়ের বোনের মেয়ে বলে কিন্তু অনেক সহ্য করেছি। আমাদের বাসায় থেকে খেয়ে আমাদেরই ক্ষতি করতে চলে এসেছিস।ডাইনি তোকে তোহ (আরো দুইটা চড় বসিয়ে দিলো)


শাওনের মা দুই বোনের কাছ থেকে রুপা ছাড়িয়ে নিলো।


- শাওনের মাঃ কি হয়েছে এমনে আমার বোনঝি টারে মারতাছোস কেনো।


- সূচিঃ মা তুমি আজ আমাদের মাঝে এসো না তোমার কোনো কথা আমরা শোনবো না। আজ তুমি শোনবা অপেক্ষা করো শাওন আসুক। (এই প্রথম নিজের বড় ভাইকে নাম ধরে ডাকায় সবাই অবাক। বুঝতে আর বাকি রইলো না কতোটা রেগে আছে)


রুপা রীতিমতো কান্না শুরু করে দিয়েছে। শাওনের বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে। আজ দুই বোন প্রচুর রেগে আছে রাগের কারন কেউ জানে না। কিছুক্ষন পর শাওন এসে হাজির। শাওন বাসায় ডুকার সাথে সাথে সাথী নিজের ছোট ভাইকে দুই গালে চড় বসিয়ে দিলো। নিজের বোনের এমন কান্ডে স্তব্ধ হয়ে আছে শাওন। ঘটনাটা আচমকা হওয়ায় বুঝে উঠতে পারছে না আসলে হলো টা কি।


- শাওনঃ আপা! কি হয়েছে। (অবাক হয়ে)


শাওনের কথার উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলো।

- সাথীঃ আলো কোথায় (জোরে)


- শাওনঃ আলো ওর বাবার বাড়ি গিয়েছে।


- সূচিঃ আচ্ছা বাবার বাড়ি গিয়েছে। যদি বাবার বাড়ি যায় তাহলে আকরাম এসে তোকে শাসিয়ে গেলো কেন।


- শাওনের মাঃ সূচি আমরা কেমনে কমু আলো কই গেছে আমগো তোহ আর কইয়া যায় নাই। আর আমার পোলারে এমনে তোরা মারতাছোস কেন।


- সাথীঃ হ্যা আপনার পোলা এই পোলা পোলা করে পোলাকে জুয়াখোর, জানোয়ার বানিয়েছেন।কখনো পোলাকে কিছু বলেন নাই। চুপ থেকে ঠান্ডা মাথায় কিভাবে অত্যাচার করা যায় সেটা ঠিকই শিখিয়েছেন।


- সূচিঃ একটা মেয়েকে আপনারা এতো অত্যাচার করেছেন যে সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। কতোটা খারাপ মানুষ আপনারা। আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছে যে আমাদের কপালে আপনাদের মতো শশুর বাড়ি পরেনি।


- সাথীঃ আর তুই(রুপা) এখনি এই বাড়ি থেকে বের হো।নইলে আজ তোকে এমন মার মারবো আজীবন বিছানায় পড়ে থাকবি।


সূচি তেড়ে গিয়ে রুপার চুলের মুঠি ধরে চড় বসিয়ে দিলো ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিলো। রাগে গা কাঁপছে দুবোনের। এদের শায়েস্তা করার জন্য সকালে রওনা দিয়ে চলে আসছে আজ চুপ থাকলে চলবে না।


- শাওনের মাঃ আরে মাইয়াডারে এমনে মারতাছোস কেন? কি করছে রুপায়?


- সূচিঃ কি করছে জানতে চান। কিছুদিন আগে তোহ বড় গলায় আলোকে ভাতের জন্য কথা শুনিয়েছিলেন এইযে এই আপনার বোনঝি ভাত ফেলে দিতো যাতে করে আলো খেতে না পারে। আর তার প্রমান আমার কাছে আছে। কতোটা খারাপ হলে আরেকজনের খাবার দেখতে পারে না। রোজ রোজ ভাত নিয়ে বাড়ির পেছনের পুকুরে ফেলে দিতো। ওইদিন পুকুরে না পড়ায় আপনি দেখে আলোকে কথা শুনিয়েছেন যা নয় তাই বলেছেন। আর রুপায়ে ভাত গুলো ফেলে দিতো তার প্রমান আছে দিবো নে প্রাণ ভরে নিজের বোনঝির কার্যকলাপ দেইখেন।


শাওনের মা সহ সবাই অবাক, রুপা কেঁদে বাসিয়ে ফেলছে। এভাবে ধরা খাবে ভাবতে পারেনি। শাওন অবাকের শেষ পর্যায় চলে গেছে। বলে কি এরমানে এতোদিন যা শাস্তি দিয়েছে তার জন্য আলো নির্দোষ ছিলো। বিনা দোষে শাস্তি পেয়েছে।


- সাথীঃ ওইযে গরুর মাংসে লবন বেশি হওয়ার জন্য যে আলোকে কথা শুনিয়েছিলেন সেটাও আপনার বোনঝি করেছে যাতে করে আমরা খেতে না পারি। কতোবার বলেছি একে এইবাড়িতে রাখবেন না কিন্তু কথা শুনেনি।আর তুই শাওন তোরে কি বলবো। জুয়াখোর, নির্দয়,পাষাণ তোর কারনে একটা মেয়ে রাত ১,২ টা পর্যন্ত জেগে থাকে কখনো কি একবার জিজ্ঞেস করেছিস যে আলো তুমি কি খেয়েছো। আরে কখনো কি একটা সুতাও কিনে দিয়েছিস বা জিজ্ঞেস করেছিস আলো তোমার কিছু লাগবে। বিয়ে করেছিস ব্যস দায়িত্ব শেষ। কোনো দায়িত্ববোধ নামক জিনিস আছে নাকি নাই।


- সূচিঃ আরে নিজে গামলা ভরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তা। তুমি দেরি করে আসছো নিজে বেড়ে খেতে পারোনা। আর কোনখানের নিয়ম রাখছেন মা যে জুয়াখোর ছেলে জুয়া খেলে রাত ১,২টা পর্যন্ত তারপর বাসায় আসবে আর তার জন্য না খেয়ে বসে থাকবে তার স্ত্রী। আলো কি মানুষ না আপনাদের কি বিবেক বলতে কিছুই নাই। 


- শাওনের মাঃ এইখানে ভুলের কি সংসার তোহ আমিও করছি। আলো একলা করে নাই। আর ওই মাইয়ার লিগা এতো ঝগড়া করতাছোস কেন।


- সাথীঃ ঝগড়া করবো না কেন। নিজে তোহ ছেলেকে শিক্ষা দেননাই। আমরা ভালো করার জন্য একজন সাংসারিক মেয়েকে বিয়ে করাইছি। ভাবলাম ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কে জানতো যে শাওন অমানুষ হয়ে গেছে রাত ১ টা বাজে মাছ কিনে আনে আবার সকালে খাবে তাই সারারাত মাছ কাটতে দিয়ে নিজে আরামে ঘুমাই। কেন আলোর ঘুম পায় না নাকি সে মানুষ না সে রোবট।


শাওন মাথা নিচু করে আছে। নিজের বোনদের কাছে অপরাধী মনে হচ্ছে।


- সূচিঃ আচ্ছা ভাই আজ যদি তোর মতো আমাদের বরও এমন আচরন করতো তখন কেমন হতো বল। তোমরা সবাই যে একটা মানুষকে এতো অত্যাচার করলা এটা কি ঠিক করলা। আরে রোজ রোজ ভাত কম পড়ায় কতোদিন না খেয়ে ছিলো কে জানে৷ এই রুপা এতো কিছু করলো তোমাদের কি চোখে পড়ে নাই। নাকি চোখে ছানি পড়েছে। 


শাওনের মা, শাওন কি বলবে বুঝতে পারছে না।


- শাওনের মাঃ তোরা এতো কথা কিভাবে জানোস।


- সাথীঃ এখনো আপনার এটা নিয়ে মাথাব্যথা যে আমরা কিভাবে জানি এতো কথা। একটুও অনুতপ্ত নাই। ছি ছি ছি কেমন ঘরে আমাদের জন্ম হলো। 


- সূচিঃ মা আলোর বাচ্চা হয় না একবারও কি ডাক্তার দেখাইছেন। মানুষের কথা শুনে শুনে এই কবিরাজ সেই কবিরাজের কাছে নিয়ে গেছেন। পোলা আর পোলার বউরে নিয়ে ডাক্তার দেখাইতেন কিন্তু তা করেন নাই। আমাদের পাশের বাসার চাচী বিয়ের ২২ বছর হয়ে গেছে নিঃসন্তান কই তারা তো সুখে সংসার করছে।তোদের যদি কখনো ফোনে কল দেই তখনো আলোর দোষের লিস্টে আমাদের শোনাতি।কখনো কি তার গুনের কথা বলেছিস তোরা। 


শাওনের মা মুখ কালো হয়ে গেলো। কিছু কিছু মানুষকে শত বুঝালেও তারা বুঝবে না।তেমনি শাওনের মা। 


- শাওনঃ আমি কেন ডাক্তার দেখাবো সমস্যা আমার না আলোর।


- সূচিঃ তুই ডাক্তার হ্যা.. তুই কি ডাক্তার নাকি। আরে ডাক্তারও তোহ বলতে পারবে না যে সমস্যা তার নাকি তার বউ এর। একবার চ্যাকাপ করাতি। আর সমস্যা কি খালি মেয়েদেরই থাকে ছেলেদের থাকেনা। তোরে বলে লাভ নাই। 


- সাথীঃ এই রুপা এই মহূর্তে এই বাড়ি ছেড়ে তুই চলে যাবি।আর তুই এইবাড়িতে থাকলে আমরা এই বাড়িতে কখনো আসবো না।


- সুচিঃ আর শাওন তোরে কয়েকদিনের সময় দিচ্ছি আলোর কাছে মাফ চেয়ে সসম্মানে আলোকে এই বাড়িতে নিয়ে আসবি। আলো যদি না থাকে তাহলে মনে রাখ তোর বোনেরা মরে গেছে।


- শাওনের মাঃ হায়হায় আল্লাহ দেখছো কালসাপিনী গেলো তোহ গেলো আমার সংসারটারে ভেঙে দিয়ে গেলো (বলে কান্না করছে)


- শাওনের বাবাঃ চুপ একদম চুপ তোর কান্না আজ আমার সহ্য হচ্ছে না। কখনো তোকে কিছু বলি নাই। কিন্তু আজ চুপ থাকতে পারলাম না। আমি মুখ বুঝে তোদের কাহিনি দেখতাম কিছু বলার সাহস থাকতো না। নিজেকে দোষ দিতাম কেন একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করলাম। আলোরে পছন্দ করে বউ বানিয়ে এই বাড়িতে আনছি। মাইয়াটা এতো ভালো। আর তারে কালসাপিনী বলস। আরে বল তোহ কখনো কি আলো তোর সাথে উঁচু গলায় কথা বলছে। শাওন তুই বল কখনো ও তোর কথার অমান্য করছে। তোদের কাছে কি কখনো কিছু চেয়েছে। তোরা যা বলতি তাই করতো। কিন্তু তার বিনিময়ে তোরা কি দিলি চিন্তা কর। সুযোগ পেলেই তোর এই বোনঝি কাজের অর্ডার দিয়ে বসতো। রাত বিরাতে শাওনের ঘরে গিয়ে এইখাবে সেই খাবে বলে আলোর ঘুম হারাম করে দিছে। এইগুলো কি তোর(শাওনের মার) চোখে পড়তো না। শাওনের মারে কতো বড় ভুল করলি। সংসার আলো না তোরাই ভেঙে দিলি। সোনার হরিনকে চিনতে পারলি না। এখনো সময় আছে আলোর কাছে মাফ চেয়ে নিয়ে আয় এই বাড়িতে।


শাওন চুপ করে মাথা নিচু করে আছে। কথা গুলো তীরের মতো লাগছে। সত্যি তোহ কি না করেনি আলোর সাথে। মানুষিক ভাবে অত্যাচার করেছে। কতো রাত না খেয়ে নির্ঘুমে থেকেছে। আজ সত্যি নিজের মাঝে অপরাধবোদ কাজ করছে।


- সাথীঃ আর একটা কথা কি জানিস তুই না সত্যি আলোর যোগ্য না। তুই থাক তোর মতো। আর তুই রুপা তুইও থাক। আজ আমি এই বাড়ি একেবারের জন্য ছেড়ে দিলাম। অমানুষরা আমার আপনজন হতে পারে না।


- সূচিঃ রুপারে কি করলি তুই এইগুলো কেন করলি। একটা মানুষকে তিলে তিলে এইভাবে মারলি ছি ছি ছি। আপা চল এইবাড়িতে থাকলে আমাদের উপরও এমন প্রভাব ফেলবে। আব্বা আপনিও আইসা পড়েন আমাদের সাথে। এরা থাকুক।


সুচি আর সাথী বের হয়ে গেলো। পেছন পেছন শাওন ও শাওনের মাও বেরিয়ে এলো। সাথী আর সূচিকে ধরে রাখছে।


- শাওনঃ আপারে আমাকে মাফ করে দে আমি অনেক বড় ভুল করেছি। সূচি আমাকে মাফ করে দে।আমি আলোকে খুজে নিয়ে আসবো। তোরা এইভাবে চলে যাবি না প্লিজ।


বলেই দুইবোনের পায়ের কাছে বসে পড়লো।


- শাওনের মাঃ মাগো যাইয়ো না আমারে রাইখা। আমার ভুল হইয়া গেছে। রুপারে আর রাখমুনা আমার পোলার বউরে বাড়ি আনমু আর কষ্ট দিমু না। সত্যি বলতাছি মাগো যাইয়ো না (কাঁদছে আর বলছে)


শাওনের বাবার চোখও ছলছল করছে। এভাবে সংসারটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো।


রুপাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হলো। শাওন আলোর ভাইয়ের বাড়িতে গেলো। সেখানে আকরাম ও ফাতেমা তাকে অপমান করে বাড়িতে ডুকতে দেয়নি। অনেক জায়গায় খুঁজেও আলোর কোনো খোঁজ পেলো না শাওন। 

.


আলো নিজে বিয়ের কাবিননামার একটা ফটোকপি নিয়ে গিয়েছিলো। আর প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র নিয়ে গিয়েছে।একজন কাজির সাথে কথা বলে ডিভোর্স পেপার তৈরি করে পাঠিয়ে দিলো শাওনের কাছে। আলো নিজের সোনার চেইন ও আংটিটা মনিরার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে যা তার বাবার দেওয়া ছিলো। আর মনিরার কাছে বিক্রি করার কারন হলো নিজের কাছে টাকা হলে যেনো আবার কিনে নিতে পারে। মনিরা টাকা দিতে চেয়েছে কিন্তু আলো নেয়নি একটা মানুষের কাছ থেকে আর কতো কি নিবে। কাবিননামার টাকা নেওয়ারও ইচ্ছা নেই আলোর। সে আর পেছন ফিরে তাকাতে চায় না। 


.


শাওনের বোনরা সত্যি এইবাড়িতে আসবে না সাফ সাফ জানিয়ে। এরচেয়ে বড় শাস্তি আর কিছুই না।শাওনের বাবা অনেক কষ্টে জমি বিক্রি করে মুদির দোকান দিয়েছিলো।যাতে শাওন কোনো কাজ করে কিন্তু কাজ কম জুয়া খেলায় সব শেষ তাই দোকান তিনি ফেরত নিয়ে নিজেই দোকানদারি করছে।শাওনকে উনি আলাদা করে দিয়েছে।বলেছে শাওন এখানে থাকলে তার মেয়েরা আসবে না তাই শাওন যেনো অন্য কোথাও চলে যায়। শাওন আজ শূন্য।শত অনুতপ্ত হলে পূরনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না।শাওনের মা তার এমন ভাঙা সংসার দেখে আফসোস করছে।কি হয়ে গেলো। 


.


আলো চলে যাওয়ার ২ মাস হয়ে গেলো। আলো নিজের জন্য একটা রুম ভাড়া নিয়েছে। সেখানে সে কিস্তিতে একটা সেলাই মেশিন কিনেছে।আপাতত ঘরে কিছু নেই।সামান্য টাকা ছিলো তা দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেছে। একটা ঘরে কি না লাগে সেগুলো আস্তে আস্তে কিনবে প্রথমে অল্প করে শুরু করতে চায়। মনিরা অনেকবার বলেছে তার সাথে থাকতে আলো কারো উপর বোঝা হতে চায় না।কিন্তু মনিরা তাকে একটা ভালো ঘর নিয়ে দিয়েছে। মনিরার পরিচিত হওয়ায় ঘর ভাড়া কমিয়েছে। 


মানুষ বড়ই অদ্ভুত চেনা নাই জানা নাই একজনকে সাহায্য করছে। মনিরার এই ঋণ কোনোদিন পূরন করতে পারবে না আলো। অষ্টম শ্রেনি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছে তাই আশেপাশের ছোট ছোট প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের পড়ায়। মনিরা বাচ্চাগুলোকে জোগাড় করে দিয়েছে। আশেপাশের দর্জি তেমন না থাকায় আলোর জন্য সুবিধা হয়েছে। নিজের এই কাজ দিয়েই নতুন জীবন শুরু করছে আলো। 


প্রথম জামা প্রথম কাস্টমার মনিরাই ছিলো। সে অনেক গুলো জামা বানায় কিন্তু বিনিময়ে আলো তার কাছ থেকে টাকা নেয় না। নিতে চায় না থাকনা বড় বোনের কাছ থেকে কি টাকা নেওয়া যায়। তারপরও মনিরা জোড় করে আলোকে কয়েকটা থ্রিপিস উপহার দেয়। টাকা না দিয়ে উপহার দিয়ে টাকাটা যেমন শোধ করলো তেমনি আলোর প্রয়োজনও মিটলো।

--

----

আলোর দিনকাল ভালোই যাচ্ছে। নতুন কিছু শুরু করেছে একটু কষ্ট হবে।আস্তে আস্তে নিজের ঘরকে সুন্দর করে নিজের মতো সাজাবে আলো। নিজের কষ্টের টাকায় সাজানো নতুন জীবন নতুন সংসার। 


---

ওইদিকে আঁধারকে খোঁজে বের করে আকরাম।সব জানায় আঁধারকে।নিজের প্রিয়তমার এমন নির্মম কষ্টের কথা সহ্য হচ্ছে না আঁধারের।কোথায় খুঁজবে আঁধার আলোকে। আকরাম যাওয়ার আগে আলোর একটা ছবি দিয়ে যায় বয়স তখন ২৪ ছবিটা আলোর বিয়ের দিনে তোলা। আকরাম তুলে নিজের কাছে রেখেছে। যে করেই হোক তার বোনকে সুখ এনে দিবে আর সেই সুখ আঁধারের সাথে থাকলেই পাবে।আসলে এমনিতে হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া বড়ই কষ্টকর ব্যাপার। 


আঁধার নিজের হাতে প্রিয়তমার ছবিটি নিয়ে রেখেছে। ছবিটি দেখতে হাত কাঁপছে ঠিক কতো বছর পর দেখতে যাচ্ছে তার আলোকে। অনেক চেষ্টা করেছিলো আলোকে দেখার কিন্তু পারেনি। আলোর বাড়িতে ডুকতে দিতো না তার দাদী। আলোকে বাহিরে বের হতে দিতো না।প্রয়োজনে বের হলে ওর মা সাথে করে বের হতো। এখান থেকে যেতে আমার অনেক সময় লাগতো। অনেক অপেক্ষা করতাম এক নজর দেখার জন্য। অবশেষে দেখতে পারবো আঁধারের আলোকে সরাসরি না হোক ছবিই দেখি। নতুন করে আশার আলো যখন পেয়েছি তখন আর হাতছাড়া করবো না। চেষ্টা করে যাবো তোমাকে আমার জীবনের সাথে নিয়ে চলতে। 


অবশেষে আধার তার প্রিয়োতমার ছবিটি দেখেই ফেললো। ভালোবাসার মানুষ যেমনই হোক তার কাছে সবচেয়ে সুন্দরী রমনী লাগে। মন ভরে ছবিটা দেখছে। সাথে চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। বাসায় গিয়ে সবাইকে আলোর ছবি দেখালো। সবাই অনেকটা চিন্তিত কিন্তু আঁধার খুব খুশি। এবার আলোকে খোঁজার পালা। আলোকে যে করেই হোক খুঁজতে হবে।


-------

এভাবে ৬ মাস কেটে গেলো, 

আলো এখন ভালোই আছে। সে সেলাইয়ের পাশাপাশি থ্রি-পিস বিক্রি করে। নিজের ঘরের সামনেই রমজান মাসে ইফতার বানিয়ে বিক্রি করেছে। চিন্তা করে রেখেছে পিঠাও বিক্রি করবে। এলাকাটা শহর হওয়ায় বাজার একটু দূরে হওয়ায় কেনাবেচা ভালোই চলে আলোর। সাথে বাচ্চাদের পড়ানো এই নিয়েই তার জীবন চলছে। এখন আর খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। না খেয়ে ঘুমাতে হয় না।নির্ঘুমে থাকতে হয় না। আলো নিজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা গার্লস গ্রুপে শেয়ার করে।সবাই খুশি হয়েছে। অনেকে আবার বলছে মনিরার মতো কাউকে পেলে চলে যাবে। আলো সেখানে বলেছে সবাই মনিরা আপুর মতো ভালো হয় না অনেক প্রতারক ধোঁকাবাজও আছে। তাই যা করার ভেবে চিনতে করতে হবে। নিজেকে চিনতে হবে তুমি কি পারো তা দিয়েই শুরু করো বাকিটা না নয় আল্লাহ ঠিক করে দিবে। কেউ পাশে থাকুক আর না থাকুক সৃষ্টিকর্তা সব সময় আমাদের পাশে থাকে।


--

ওইদিকে আকরাম আলোর চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছে চিঠিতে কি আছে ফাতেমা জানে না একদিন ফাতেমা চিঠিটা চুরি করলো। চিঠি পড়ে তার চোখ বেয়ে আপনা আপনি জণ গড়িয়ে পড়লো,


চিঠিতে লেখা ছিলো - 


'প্রিয় ছোট ভাই'

আশা করি ভালো আছিস আর ভালো থাকবি। আজকে কথা গুলো লিখছি হয়তো আমার প্রথম ও শেষ কথা মনোযোগ দিয়ে পড়বি। যখন তোর জন্ম হয়েছিলো সারা বাড়ির সবাই অনেক খুশি ছিলো আমিও অনেক খুশি ছিলাম আমি তোকে দেখার জন্য কোলে নেওয়ার জন্য ব্যকুল ছিলাম কিন্তু তখনো দাদী তোর আর আমার মাঝের তফাৎ বুঝিয়ে দিয়ে আমাকে একটা রুমে আটকে দিয়েছিল। তখন বাবা সবে মাত্র বিদেশে গিয়েছে। আমি সারাদিন ওই রুমে ছিলাম। এরপর পাশের বাসার ছোট দাদী এসে আমায় নিয়ে গিয়েছিলো। 


জানিস তোকে না আমার কোলে নিতে অনেক ইচ্ছে করতো কিন্তু কখনো হয়ে উঠেনি। ভাবছিস এতো ছোট বেলার কাহিনি কিভাবে মনে আছে আসলে আমরা সুখের চেয়ে দুঃখের কথা খুব বেশি মনে রাখি। আস্তে আস্তে আমরা বড় হচ্ছিলাম তুই ছোট থেকেই কম কথা বলতি। কিন্তু সারাদিন আমার পিছু পিছু ঘুরতি আর আমার জামা পড়ে ফেলতি। সেই জামা আমি ছোট করে নতুন করে বানিয়ে দিয়েছি জামাটা তোর পছন্দের ছিলো তাই নিজের কাছে রেখে দিতাম। তোর যদি মেয়ে হয় আমার পক্ষ থেকে দিয়ে দিস। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি কিন্তু প্রকাশ করিনি।  


মনে আছে আমার রিং কানের দুল দাদী খুলে নিয়ে গিয়েছিলো আর তুই দাদীর সাথে ঝগড়া করে আমায় এনে দিয়েছিলি সেটা আমি তোকে দিয়ে দিলাম এটা তোর মেয়েকে দিয়ে দিস। এর চেয়ে বেশি কিছু দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেইরে ভাই।


যাক অনেক কথা বললাম বলার কারনও আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর তুই একদম চুপচাপ ছিলি তুই আমার কাছে কম আসতি কিন্তু দূরে থেকেও আমায় সাহায্য করতি।সবাই যখন আমায় দোষারোপ করছিলো বাবার মৃত্যুর কারনে তুই তখন এক কোনায় চুপ করে ছিলি অসহায়ের মতো আমার দিকে চেয়ে ছিলি। আমার জন্য তুই এটা সেটা নিয়ে আসতি। অবশেষে ফাতেমাকে নিয়ে এলি যাতে আমার কষ্ট কম হয়।ফাতেমাকে পারলে আগেই নিয়ে আসতি কিন্তু তোদের বয়স কম হওয়ার পারিসনি। 


ফাতেমা মেয়েটা খুবই ভালো আমার বেশ পছন্দ হয়েছেরে ওর খেয়াল রাখিস। আমার জন্য কিছু আনলে ফাতেমাকে দিয়ে পাঠাতে প্রথমে বলতি ফাতেমার জন্য এনেছিস পছন্দ হয় নাই তাই আমাকে দিয়ে দিলি। এতে দাদীও কিছু বলতো না আমাকে সাহায্য করতে পারলে। আমার বিয়ে করতে করতে ২৪ বছর হয়ে যায় দাদী আমাকে যার তার সাথেই বিয়ে দিয়ে দিতো কিন্তু তুই তার মাঝে থাকায় দিতে পারেনি। তুই নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ নিয়েছিলি যাতে করে আমার কষ্ট কম হয়। 


ছোট হয়ে বড় ভাইয়ের মতো দায়িত্ব পালন করেছিস। শাওন যখন টাকার জন্য আসে তুই কেন টাকা দিয়ে দিলি আরে বোকা আমায় জিজ্ঞেস করতি। তুই যেদিন টাকা দিয়েছিস তার পরের দিন আমি এসেছিলাম তোর শাশুড়ী আমায় তোর বাড়িতে যেতে মানা করে।সে আমায় বলেছে আমি যদি এইবাড়িতে আসি তাহলে ফাতেমাকে নিয়ে যাবে আর দিবে না তাই।আমি আসিনি।


তুই ওনাকে কিছু বলিস না। সব মাই চায় তার মেয়ে ভালো থাকুক। এখানে উনি চেয়েছে উনার মেয়ে যেনো ভালো থাকে উনি তোর কথাও ভেবেছে তুমি কতো কষ্ট করে কাজ করছো তার উপর এতো গুলো টাকা দিয়ে দিলে।আমি কখনো আর আসবো না। হ্যা ঠিকই আসবো না ওনার কথার জন্য না নিজের জন্য চলে যাচ্ছি বহুদূর। এক অচেনা শহরে যেখানে কষ্ট দেওয়ার মতো কেউ থাকবেনা।  


অনেক কথা বললাম এবার শেষ কথা শোন তোর মেয়ে হলে মেয়ের জন্য কিছু করে যাবি নয়তো তারও অবস্থা আমার মতো হবে।আর বিয়ে দেওয়ার আগে দেখেশোনে বিয়ে দিস। বিয়ে দিয়ে খোঁজ খবর নিবি।বাবা হওয়ার সব দায়িত্ব পালন করবি ভালো মতো আর একটা কথা শাওনের সাথে আমি সুখি ছিলাম না তাদের নানান অত্যাচারে আমি দিন দিন শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। না ঠিক মতো খেতে পেরেছি না ঘুমাতে কিন্তু শাওনের দুইবোন খুব ভালো আমায় অনেক ভালোবাসে।  


শাওন আজকে আমায় বলেছে তোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে যেতাম। টাকা না নিলে যেনো আমার মুখ না দেখাই শাওনের এই কথাটা আমি রাখলাম সত্যি আমার মুখ আর দেখাবো না শাওনকে।শেষ বারের মতো তোকে সব বলে দিলাম কারন তোর জানার দরকার আমি কেন চলে গিয়েছি। আমাকে খোঁজে লাভ নেই পাবি না আমায় তার চেয়ে ভালো নিজের খেয়াল রেখে ভালোভাবে সংসার করো।ফাতেমার খেয়াল রেখো মায়ের যত্ন নিও। আর দাদীরও খেয়াল রেখো।ভালো থেকো।


তোকে দেখার অনেক ইচ্ছে ছিলো কিন্তু তোর সাথে দেখা হলে তুই আমাকে দেখলে যেতে দিবি না তাই আমি তোর আড়ালেই চলে যাচ্ছি ভাই।


ইতি 

'তোমার বড় বোন আলো'


❝❝❝


ফাতেমা চিঠিটা পড়ে তার মায়ের সাথে অনেক রাগারাগি চিল্লাচিল্লি করছে। চিঠি পড়ে সে খুব করে কাঁদছে। এখন বুঝলো আকরামের কেমন লেগেছে সে কেনো এতো কেঁদেছে আর কেনো কাঁদে। ৮ মাসের শেষের দিকে পড়েছে ফাতেমা এভাবে চিল্লাচিল্লির ফলে পেটে অনেক ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে।


ফাতেমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। অবশেষে আকরাম ও ফাতেমার কোল জুড়ে এলো ছোট একটি পরী একটি মেয়ে বাবু জন্ম হলো। এটাই আকরাম চেয়েছে। পরম আদরে নিজের মেয়েকে ভালোবাসছে আদর করছে। নিজের মাকে সবাইকে বলছে তার মেয়ে হয়েছে।নিজের দাদীকে ৫০ বার জানিয়েছে তার মেয়ে হয়েছে। 


মিষ্টি নিয়ে সবার প্রথম দাদীকে খাইয়ে বলেছে,

- "আমার মেয়ে হয়েছে ছেলের জন্য অনেক দোয়া করছিলেন আপনার দোয়া কবুল হয় নাই দাদী। আমার মেয়ের সাথে যদি উলটা পালটা কিছু করেননা খবর আছে আপনার"


মেয়ের নাম রাখা হয় আফরা ইসলাম ফারজানা।

আলোর দাদী নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে তিনি নিজের নাতনির কাছে ক্ষমা চাইবে।অনেক বড় ভুল করেছে উনি। আকরামকে বলেছে আলোকে নিয়ে আসতে।অনেক খোঁজাখুঁজি করছে।

----


একদিন আলো বাজার করে বাসায় ফিরছিলো তো সামনেই কিছু স্কুল কলেজের ২,৩ জন ছেলে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে।আলোর থেকে বয়সে অনেক ছোট। আলো হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলো হঠাৎ ছেলেগুলো আলোকে দেখে বাজে মন্তব্য করছিলো।আলো এক নজর ছেলেদের দেখে চলে গেলো।একটু সামনে গিয়ে আশেপাশের কয়েকটা দোকানদারদের জিজ্ঞেস করলো ছেলেদের ব্যাপারে। দোকানি বললো,এলাকার স্থানীয় ছেলে গুলো। ভদ্র পরিবারের ছেলে এখানেই বসে থাকে।আলো তাদের নাম জিজ্ঞেস করলো।একজন রিফাত,অনিক,সাগর। তাদের ঠিকানা নিয়ে নিলো। এরপর বাসায় চলে গেলো। 


পরের দিন সকালে রিফাত ঘুম থেকে উঠে নিজেদের ড্রইং রুমে এসে অবাক। মূহুর্তেই ঘা ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। কারন তার মায়ের সামনে বসে আছে গতকালকের সেই মেয়ে।দুজনে কথা বলছে। রিফাত তার মাকে খুব ভয় পায়। রিফাত জলদি ঘুরে নিজের ঘরে পা বাড়ালো আর ওমনি তার মায়ের ডাক।


(চলবে)...গল্প : আলো আঁধার

পর্ব : (০৬)

লেখা : ইনশিয়া আহমেদ হায়াত

-----------

রিফাতের মায়ের সামনে বসে আছে আলো। আর তাকিয়ে আছে রিফাতের দিকে। রিফাত এক যায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে এই মেয়ে তার বাসা চিনলো কিভাবে নিশ্চয়ই তার মায়ের কাছে নালিশ করে দিয়েছে। কিভাবে নিজেক বাঁচাবে তাই ভাবছে। তার ভাবনায় পানি ঢেলে দিলো আলো।


- রিফাতের মাঃ রিফাত এদিকে এসো।


রিফাতের মা হাসি মুখে রিফাতকে ডাক দিলো। রিফাতের গা শিউরে উঠলো তার মা হাসি মুখে ডাকছে কেনো নিশ্চয়ই আজ তার খবর আছে।


রিফাত তাদের সামনে গিয়ে আমতা আমতা করছে। আলো রিফাতকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বললো,


- আলোঃ আন্টি আপনার ছেলে এতো ভদ্র।এতো ভালো কি যে বলবো। সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে।আর ওইদিন আমায় সাহায্য করেছে তার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ।আপনি ভালো শিক্ষা দিয়েছেন তাই আজ এতো ভালো ভালো কাজ করছে রিফাত।


- রিফাতের মাঃ আমি আমার ছেলেকে সব সময় বলি মানুষ বিপদে পড়লে সাহায্য করতে। আজ আমি স্বার্থক। সত্যি খুব ভালো লেগেছে তুমি যে এসেছে আমি খুশি হলাম। এভাবে আসা যাওয়া করো। রিফাত যখন তোমাকে বড় বোন বলেছে এই বাড়ি নিজের মনে করো। 


রিফাত অবাকের শেষ পর্যায়ে চলে গিয়েছে তার মায়ের আর আলোর কথপোকথন শুনে আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। তাই সাত পাঁচ না ভেবে প্রশ্ন ছুড়লো আলোর দিকে,


- রিফাতঃ আব আপনি কিসের কথা বলছেন আপু আমি বুঝতে পারছি না?(জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে) 


- আলোঃ এমা ভুলে গেছো কালকের কথা।


রিফাতের কালকের কথা শুনেই গলাটা শুকিয়ে গেলো। আলো রিফাতের অবস্থা দেখে হালকা হেসে বললো,


- আলোঃ আরে কালকে না আমাকে কিছু বখাটে ছেলে উত্যক্ত করছিলো আর তুমি আর তোমার বন্ধুরা আমায় বাঁচালে।আমাকে সুন্দর করে সাবধানে বাসায় পৌঁছে দিয়েছো মনে নেই।


রিফাত আলোর কথা শুনে টাস্কি খেয়ে আছে।


- আলোঃ জানেন আন্টি রিফাত যাওয়ার আগে বললো "আপনি আমার বড় বোনের মতো কোনো সমস্যা হলে আমাদের বলবেন আমরা সাহায্য করবো। আপনার ছোট ভাইগুলো আছে চিন্তা করবেন না।" কথা গুলো বলে চলে গেলো। এমন ছেলে কয়জন পায় আন্টি আপনি খুবই ভাগ্যবতী যে এমন একটা ছেলে পেয়েছেন। নয়তো আজকালকার ছেলেরা যেই পরিমান ফাজিল আর লম্পট হচ্ছে মেয়ে দেখলে বাজে কথা বলতে মনে চায়। মেয়ে বড় হোক বা ছোট তাদের যায় আসেনা।তাই না রিফাত।


আলো রিফাতের দিকে তাকালো। রিফাতের মা রিফাতের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে আছে এই প্রথম তার ছেলে প্রশংসা শোনে বেশ ভালো লাগছে।রিফাতের মাঝে কেমন জানি অপরাধবোদ কাজ করছে সে নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে।


- রিফাতের মাঃ ঠিক বলেছো আলো আজকাল ভালো ছেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল আমার ছেলের জন্য অনেক চিন্তা হতো ভাবতাম বাজে ছেলেদের সাথে মিশে যদি খারাপ হয়ে যায় কিন্তু আজ তোমার কথা শুনে আমার গর্ব হচ্ছে। আমার ছেলে আমার বিশ্বাস রেখেছে।আমি সব সময় বলি মেয়েদের সম্মান করবা। আজ তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে সে সত্যি আমার কথা রেখেছে।


- আলোঃ আরে আন্টি শুধু আমি না এমন আরো কতো মেয়েদের সাথে এই ব্যবহার করে থাকে৷ তাই না রিফাত। 


এবার রিফাত করুন চোখে তাকিয়ে আছে। অনুশোচনা বোদ কাজ করছে।


- আলোঃ আচ্ছা আন্টি আমি এবার আসি। আসসালামু আলাইকুম। 


- রিফাতের মাঃ কি বলো মা খেয়ে দেয়ে যাও।


- আলোঃ না আন্টি অন্য একদিন।


- রিফাতের মাঃ তুমি একদম আমার বড় মেয়ের মতো আজ আমার মেয়েটা বেঁচে থাকলে তোমার মতো থাকতো। ৫ বছর বয়সে মারা যায় আমার মেয়েটা। এরপর অনেক পরে গিয়ে রিফাত হয়। এখানে আসার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।

বলে হালকা জড়িয়ে ধরলো।


- আলোঃ আন্টি আমাকে নিজের মেয়ে ভাবতে পারেন। আর রিফাত ভালো কাজ করছে তাই ভাবলাম আপনার সাথেও দেখা করে যায়। একজন মা'ই তোহ পারে তার সন্তানকে সুশিক্ষা দিতে। আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো।


- রিফাতের মাঃ আলো দাঁড়াও রিফাত তোমায় দিয়ে আসুক।


আলো রিফাতের দিকে তাকালো রিফাত চুপ করে আছে।

আলো মুচকি হেসে বললো,

- আলোঃ না আন্টি রিফাত অনেক করেছে আর দরকার নেই আমি যেতে পারবো। আসি আন্টি। 


- রিফাতের মাঃ আচ্ছা যাও মা।


আলো বেরিয়ে গেলো। রিফাত তারাহুরো করে নিজের রুমে গিয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখলো সাগর আর অনিক ওকে কল দিয়েছে কিন্তু ফোন সাইলেন্ট থাকায় টের পায়নি। রিফাত সাথে সাথে ওদের কল দিলো। কল দিয়ে জানতে পারলো সাগর আর অনিকের বাড়িতেও আলো নামের মেয়েটি একই কান্ড করেছে। ওদের মা তোহ খুশিতে সবাইকে বলে বেড়াচ্ছা। আজ পরিবার থেকে খুব ভালোবাসা পাচ্ছে।


রিফাত খাটের উপর বসলো। আলো বাসায় এসে ওদের নামে নালিশ না করে প্রশংসা করে চলে গেলো। তার এমন ব্যবহারে চিন্তায় পড়ে গেলো মাথায় নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। রিফাতের ভাবনার মাঝেই ওর মা এসে ওর পাশে বসলো।


- রিফাতের মাঃ রিফাত আজ আমি অনেক খুশি। এই প্রথম কেউ তোমার প্রশংসা করলো। আমি তোমায় নিয়ে অনেক চিন্তিত থাকতাম। তুমি আমার কথা শুনেছো আজ আমি খুবই খুশি রিফাত। আমি জানতাম তুমি কখনো মেয়েদের অসম্মান করবে না।তোমায় সুশিক্ষা দিতে পেরে আমি আদর্শ মা হতে পারলাম।কেউ তোমার দিকে আংগুল তুলে বলতে পারবে না আমি তোমায় শিক্ষা দেই নি। আচ্ছা তোমার বাবাকে কল করে বলে আসি। আজ তোমার পছন্দের খাবার রান্না করবো ভালো কাজ যে করেছো তার জন্য। 


রিফাতের মা চলে গেলো। রিফাতের কেন যেনো অনেক লজ্জা লাগছে যেটা সে করেনি সেটার প্রশংসা পেয়েও মনে শান্তি পাচ্ছে না। মাথা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে।  


.


পরেরদিন -

রিফাত, সাগর, অনিক ওই একই জায়গায় বসে বসে একজনের জন্য অপেক্ষা করছে।যার জন্য অপেক্ষা করছে তাকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়ালো সে ওদের সামনে আসলো।


- রিফাতঃ আলো আপু আমাদের মাফ করেদিন আমরা ওইদিনের আচরণ এর জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃক্ষিত। 


- অনিকঃ কালকের আপনার প্রশংসার জন্য আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে।


- সাগরঃ না ঠিক মতো খেতে পারছিলাম আর না ঘুমাতে পারছিলাম।মাথায় একটাই প্রশ্ন আপনি এমনটা কেনো করলেন।


আলো মুচকি হাসলো। তারপর বললো,

- আলোঃ তোমাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। নালিশ করে কি হতো তোমাদের মা লজ্জিত হতো এরপর বাবাকে বলতো বাবার হাতে মার খেতে। এরপর এক সময় ভুলে যেতে কিন্তু এতে কি হতো কালকের মতো কি লজ্জাবোধ কাজ করতো। নিজেকে অপরাধী মনে হতো। না হতো না। আসলে তোমাদের প্রশংসাই বড় শাস্তি। জানো কালকের কান্ডে বুঝতেই পেরেছো তোমাদের বাবা মা তোমাদের উপর কতো বিশ্বাস করে কতো ভালোবাসে। চিন্তা করে দেখো সামান্য মিথ্যা প্রশংসায় তারা কতো খুশি হয়েছে। তোমরা যদি সত্যি সত্যি ভালো কাজ করো তাহলে তারা কতই না খুশি হবে।


তিনজন আলোর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো।সত্যিই তোহ বাবা মা কতো বিশ্বাস করে আর তারা কি না।


আলো আবার বলা শুরু করলো।

- আলোঃ সন্তান কোনো দোষ করলে আমরা তাদের নানান কথা বলে ফেলি প্রথমে বলে থাকি পরিবার থেকে শিক্ষা দেয়নি। মা বাবাই মনে হয় এমন।ভদ্র পরিবারের সন্তান হলে এমন করতো না এমনকি আমরা জন্ম নিয়েও কথা তুলে ফেলি। কেন জানো তোমাদের কার্যকলাপের কারনে। আচ্ছা তোমাদের কি পরিবার থেকে সুশিক্ষা দেয়নি বলতে পারবা যে তোমাদের পরিবার তোমাদেরকে ভালো কাজ করার কথা বলেনি। না পারবা না, কারন অবশ্যই বলেছে কিন্তু তোমরা সেই শিক্ষা নেওনি। পরিবার থেকে শিক্ষা ঠিকই দিয়ে থাকে কিন্তু কয়জন সন্তান সেই শিক্ষা নিয়ে থাকে। 


তারপরও সব কিছুর মাঝে বাবা মাকে দোষারোপ করা হয়।বাবা মা অপমানিত হয়। বাবা মা গালি খায় শুধু মাত্র ওই সব সন্তানদের জন্য যারা সুশিক্ষা পেয়েও তা গ্রহন করেনি। পরিবার থেকে শিক্ষা ঠিকই দেওয়া হয় কিন্তু সেই শিক্ষা গ্রহন করে কাজ করা অনেক বড় ব্যাপার। অনেকেই আছে সেই শিক্ষা গ্রহন করে না ফলে তাদের কার্যকলাপে কথা শুনতে হয় পরিবারকে।আমি তোমাদের থেকে বয়সে অনেক বড়। আমি এটাও জানি যে আরো অনেকের সাথে তোমরা এইধরনের ব্যবহার করেছো। আচ্ছা কেন শুধু শুধু বাবা মাকে অপমানিত হতে দিতে চাচ্ছো,কেন বাবা মাকে গালি খাওয়াতে চাচ্ছো। তাদের বিশ্বাসকে কি ধরে রাখতে পারবে না। 


বলেই দম নিলো ওরা মাথা নিচু করে আছে।


- আলোঃ আমি তোমাদের অনুশোচনাবোধ জাগ্রত করতে চেয়েছি। তোমাদের ভুল গুলো ধরিয়ে দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। আশা করি আমার কথা গুলো বুঝতে পেড়েছো। আমি আসি আল্লাহ হাফেজ।


আলো চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াচ্ছিলো।


- রিফাতঃ আপু 


- আলোঃ জিই কিছু বলবা


রিফাত, অনিক,সাগর আলোকে স্যালুট দিলো।


- রিফাতঃ অসংখ্যা ধন্যবাদ আপু এতো সুন্দর করে আমাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। 


- অনিকঃ এতো দিন আমরা যা করেছি তা আর করবো না। আপনার কথা গুলো অবশ্যই মান্য করবো। আর আমরা ওয়াদা করছি আমাদের বাবা মায়ের বিশ্বাস কখনো ভাঙবো না।


- সাগরঃ এই পর্যন্ত যাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি তাদের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিবো। ধন্যবাদ আপু আমাদের ভুল গুলোকে শুধরে দেওয়ার জন্য। 


- আলোঃ আমাকে তোমাদের বড় বোন মনে করতে পারো। আর ভালো থেকো তোমরা। এক সময় তোমরাই বাবা মায়ের নাম উজ্জ্বল করবে তাদের গর্বের কারন হবে। শুভ কামনা রইলো।


হাসি মুখে আলো চলে গেলো।

রিফাতরাও চলে গেলো আজ ওদের মন হালকা লাগছে অনেক।


-----

-----------

আকরাম তার মেয়েকে নিয়ে খুব খুশি। আলোর দাদী যতবার আকরামের মেয়েকে দেখে আর কাঁদে একদম আলোর মতো দেখতে। মেয়ে হয়েছে বলে ছুঁয়েও দেখেনি উনি আলোকে। আজ তার আদরের নাতীর ঘরে কন্যা সন্তান হয়েছে।আকরামকে সে অনেক ভালোবাসে আকরাম রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দেওয়ায় খুব খারাপ লেগেছিলো তার। আকরাম প্রতিদিন নতুন করে তার দাদীকে আলো উপর করা জুলুমের কথা মনে করিয়ে দিতো।


---

---

এভাবে একটা বছর কেটে গেলো। আঁধার আলোকে কতো শত জায়গায় খুঁজেছে। শেষ ফলে হার মেনে নিয়েছে। সে ধরে নিয়েছে তার আর আলোর হয়তো মিল হবে না। আর কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছে না৷ সব দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দম নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। নিয়তিতে হয়তো তাদের আলাদা থাকাই লেখা আছে।


.


দুইদিন পর শীতের সময় একটু দেরি করে দোকানের গেলো আঁধার।চুপচাপ বসে বসে পেপার পড়ছে। আর তার কর্মচারী কাজ করছে। হঠাৎ একজন নারী এসে বললো,


- "নাপা দেন তোহ" (ভাঙা গলায় বললো বুঝা যাচ্ছে ঠান্ডা লেগেছে তার)


আঁধার তখনো পেপারে মুখ গুঁজে আছে।কর্মচারী ছেলেটা এক পাতা নাপা বের করে দিলো।


তখন সেই নারী বললো,

- "পুরো পাতা লাগবে না আমাকে দুইটা দেন"


আঁধার মহিলার কথা শুনে পেপার থেকে মুখ তুলে পাশে তাকালো। কে ২ টা নাপা টেবলেট নিতে এসেছে।আঁধার মহিলার দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো।হাত থেকে পেপার পড়ে গেলো মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। তার বুক ধরফর করছে। গা ঘেমে যাচ্ছে এই শীতের মাঝেও।


কর্মচারী ছেলেটি বলছে,

- "আপা ২ টা বেচি না"


মহিলাটি হালকা চিন্তা করে বললো,

- "ঠিক আছে পুরো পাতা দিয়ে দিন।এখানে যেই ঠান্ডা আবার দরকার পড়তে পারে হাহাহা"


- কর্মচারী ছেলেঃ আপা আপনি এখানে নতুন নাকি আগে দেখিনি।


- মহিলাটিঃ ১ বছর ধরে আছি এখানে আসিনি তোহ তাই দেখেননি।


আঁধার এখনো চুপ করে আছে।সে তার চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছে না তাহলে কি ভাগ্যে তাদের এক হওয়া লেখা আছে। সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন দরজা খুলে আলোকে দেখতে পেলো।হ্যা আলো এই সেই আলো। এযে আঁধারের আলো।


.


আঁধার উঠে দাঁড়ালো। আলো একবার আঁধারের দিকে চেয়ে ঔষধ নিয়ে হাঁঁটা ধরলো। হয়তো চিনতে পারেনি তার ভালোবাসার আঁধারকে। আঁধার সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কর্মচারীর ডাকে হুস আসলো।আর কিছু না বলে আলো পেছনে দৌড় দিলো। 


আঁধার আলোর পেছন পেছন হাঁটছে।কেন যে সামনে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। খুব ইচ্ছে করছে সামনে গিয়ে বলতে যে আলো আমি তোমার আঁধার। কিন্তু সব শেষ এ একট প্রশ্ন থেকে যায় আলো কি আঁধারকে মেনে নিবে।আপন করে নতুন সম্পর্কে জড়াবে। এই কিন্তুর কারনে সামনে যেতে পারছে না আঁধার। আঁধার আলোর পেছন পেছন ওর বাড়ি পর্যন্ত এসে থেমে গেলো। বাড়িটা চিনে উলটো পথে হাঁটা ধরলো আর নিজের বুকের বাম পাশে হাত রেখে বললো,


- আঁধারঃ আঁধারের আলো তুমি আমার এতো কাছে থেকেও আমি তোমায় সারা দেশের আনাচে কানাচে খুঁজেছি এখন যখন পেয়ে গিয়েছি। তখন আর দূরে যেতে দিবো না। 


আঁধার নিজের বাসায় গেল যাওয়ার আগে মিষ্টি কিনে নিয়ে গেলো। খুশির খবর মিষ্টি ছাড়া কি হয়। সবাইকে সুসংবাদ শুনিয়ে দিলো৷ আঁধারের বড় ভাই দেশে আসার ব্যবস্থা করছে। দেশে এসে নিজের ভাইকে বিয়ে করাবে।


আঁধার আকরামকে খুশির খবর জানাতে চাচ্ছিলো কিন্তু তার আগে সে একটা জিনিস জানতে চায়। সেটা যে করেই হোক জানবেই।


.


আঁধার আলোর ব্যাপারে সব খোঁজ নিয়েছে আলো কি করে না করে সব।

শীতের সময় আলো পিঠা বিক্রি করে নিজের ঘরের সামনে। আঁধার রোজ সকালে আলোকে দেখার জন্য পিঠা কেনার বাহানায় চলে যায়। দুই একবার কথা বলার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু আলো তেমন কথা বলে না।আঁধারের বড্ড ইচ্ছে করে নিজের পরিচয়টা দিয়ে দিতে কিন্তু তা যে সে পারছে না। নিজের চোখের সামনে প্রিয়তমাকে দেখছে। এই অনুভূতি কেমন তা বলে বুঝানো যাবে না।


একদিন আলো পিঠা বানাচ্ছিলো ওই দিন প্রচুর কুয়াশা আশেপাশে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না, আঁধার এসে পিঠা কিনে। আলো কখনো টাকা হাতে নেয় না।


পাশে একটা ঝুড়ি রেখেছে সেখানে টাকা আর একটা প্যাকেট রেখে দ্রুত পায়ে হাঁটা দেয় আঁধার।আলো টাকা নিয়ে প্যাকেট এর দিকে চেয়ে আশেপাশে চোখ ভুলায় হয়তো কেউ ভুলে রেখে গিয়েছে। আলো দুটানায় পড়ে যায় প্যাকেটটা নিবে কি না। অনেক ভেবে চিনতে প্যাকেট টা হাতে নিলো। 


খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো যা দেখে বেশ অবাক হয় আলো।কারন আলো সব সময় মানুষকে উপরহার দিতে গেলে খবরের কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে দেয়। এটা তোহ তার কাছের মানুষ ছাড়া কেউ জানে না। আলো হালকা ঘাবড়ে যায় জলদি প্যাকেট খুলে ফেলে। 


হতবম্ভ হয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষন চেয়ে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটু সামনে গেলো। চারপাশে কাউকে খুঁজছে কুয়াশার কারনে দেখা যাচ্ছে না কিছু। কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে চলে এলো। আজ আর পিঠা বানাতে ইচ্ছে করছে না সব কিছু গুছিয়ে নিজের ঘরে মেঝেতে বসলো। আলো গা থরথর করে কাঁপছে। 


আলো প্যাকেট এর দিকে তাকালো। তার মধ্যে একটু বিস্কুট এর প্যাকেট আছে যেটা ১৫ বছর আগে একজনকে উপহার দিয়েছিলো। হালকা ঘোলাটে হয়ে আছে প্যাকেট এর উপরের লেখা গুলো।ভেতরে বিস্কুট গুলো হালকা গুড়ো হয়ে আছে। এই জিনিসটা এতো বছর ধরে কেউ যত্ন সহকারে রাখবে ভাবতে পারেনি আলো। 


প্যাকেটটা দেখে মনে করার চেষ্টা করলো। যাকে দিয়েছে তার সেই ১৫ বছর আগের চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। বিস্কুটের প্যাকেট এর সাথে একটা চিরকুট পেলো। 


চিরকুটটা খুললো তাতে লেখা -


– "মনে আছে কি নিজের শেষ বলা কথাগুলো?"


আলো চিরকুট টা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো চোখ দিয়ে আপনা আপনি নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট একটি শব্দ বের হলো।


- আলোঃ আঁ..আঁধার...


আলো এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। এই কান্না কারো কানে পৌছাবে না। কিছুক্ষন কেঁদে নিজেকে শান্ত করলো। দুই হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে বললো,


- আলোঃ হ্যা মনে আছে ১৫ বছর আগে আমার বলা শেষ কথা গুলো মনে আছে কিন্তু আমি যে আমার কথা গুলো রাখতে পারিনি আঁধার। এতো বছর পর তুমি যে আমায় খুঁজে বের করবে তারও আশা ছিলো না। তুমি আমার আশেপাশেই ছিলো আমি বুঝতে পারিনি। আমি তোমার জীবনে আসতে পারিনি। নিজের শেষ কথা গুলো রাখতে পারিনি আঁধার।পারলে ক্ষমা করে দিও।


.


আলো বসে বসে বিস্কুটের প্যাকেট এর দিকে তাকিয়ে আছে। মনে পড়ে গেলো ১৫ বছর আগের কথা -


তখন সবে মাত্র প্রাইমারির গন্ডি পার করে হাইস্কুলে উঠেছে দুজন। দিনকাল ভালো যাচ্ছিলো একই স্কুলে পড়তো আলো ও আঁধার।হঠাৎ শুনলো আঁধাররা চলে যাবে একেবারের জন্য। কথাটা শুনে খুবই মন খারাপ হলো।নিজেকে গুটিয়ে নিলো। আঁধার আলোর সাথে দেখা করতে এসেছিলো শেষ বারের মতো কিন্তু আলো করেনি।


.


পরেরদিন যখন আঁধার চলে যাবে তখন আলো দৌড়ে আঁধারের কাছে গিয়ে খবরের কাগজে মুড়ানো একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয় আর বলে,


– "আমি আঁধারের আলো হয়ে থাকবো চিরজীবন। ভুলে যেয়ো না আমায় স্মৃতি হিসেবে আর কিছু দিতে পারিনি তোমায়। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। আশা করি তুমিও আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি যে এই আঁধারের আলো। আমি তোমারি আছি তোমারি থাকবো।"


বলে ওইদিন ওইসময় পেপারে মুড়ানো প্যাকেট আঁধারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে যায় আলো একবারও পিছু ফিরে তাকায় না। এতোদিন একসাথে থেকে আজ চলে যাচ্ছিলো বহুদূরে আজীবনের জন্য।যেটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো।

--

------

আলো ভাবনা জগত থেকে বেরিয়ে আসে দরজার কড়া নাড়ার শব্দে। দরজা খুলে দেখলো মনিরা আপু হাতে বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এইমানুষ টা এতো ভালো কেন রোজ কিছু না কিছু নিয়ে আসবে আমার জন্য।তাকে ঘরে ডুকালাম। দুজনে মেঝেতে বসলাম। সে আমার দিকে বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললো,


- আলোঃ গরুর মাংস রান্না করেছি। গরুর মাংসের ঝোল দিয়ে চিতই পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা। এই নেও খেয়ে নিও আমি অফিসে যাবো দেরি হচ্ছে। 


আলো মনিরাকে কয়েকটা পিঠা দিয়ে দিলো।খাবারের প্লেট সাইডে রেখে ভাবছে,‘এর মানে কি আঁধার তার জন্য অপেক্ষা করেছে বা এখনো করছে না এটা কিভাবে সম্ভব আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে তা শুনে তোহ বিয়ে করে ফেলা উচিত।সেটা কি সে করেনি। তার উপর দাদী বলেছে আঁধার আর আসবে না। নাকি সত্যি আমার শেষ বলা কথা গুলো রেখেছে।’


কথাগুলো ভাবতেই বুকটা ধুক করে উঠলো। প্রচন্ড শীতেও আলো ঘেমে যাচ্ছে। আলো কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এতো বছর পর আঁধার তার সামনে এসে প্রশ্ন করলে কি জবাব দিবো। নিজের বলা কথা গুলো রাখতে পারিনি। সে কি বুঝবে আমি পরিস্থিতির শিকার। হয়তো বুঝবে সেতো এসেছিলো আমাকে নিজের করে নিতে কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। কিন্তু আজ সে এসেও এলো না। প্রচুর ভাবাচ্ছে আলোকে। 


যেদিন সে এসেছিলো দাদী আমাকে ঘরে বন্দী করে দিয়েছিলো। এক নজর দেখার ইচ্ছে ছিলো এই বড় আঁধার দেখতে কেমন। তা আর হলো কোথায় জানিনা দাদী কি এমন বলেছে বা করেছে যে আঁধারে চলে গিয়েছে। আমাদের ভাগ্য এক হওয়া লেখা ছিলো না তাই হইনি। কিন্তু আঁধারের চিরকুট দিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছে আমি যে আমার কথা রাখিনি তা নাকি সে আমার কথা রেখে আমার জন্য আজও অপেক্ষা করছে। 


প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছে আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না, এখন তার ঘুমের প্রয়োজন আলো দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।


.


আজ সারাদিন ঘরে বন্দি করে রেখেছে নিজেকে আলো।সন্ধ্যায় দরজায় কড়া পড়লো আলো তোহ ভয় পেয়ে গেল কে হতে পারে। দরজা খুলতে ভয় করছে। ভেতর থেকে ২/৩ বার জিজ্ঞেস করলো কে কোনো উত্তর পেলো না। কিন্তু দরজার কড়া বার বার নরছে বাধ্য হয়ে দরজা খুলে কিছু বলবে। 


দরজা খুলে বাহিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি পড়ছে আলোর।দরজার বাহিরে আর কেউ নয় তারই আপনজন দাঁড়িয়ে আছে। 


(চলবে)...


(আগামী পর্বে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করবো।সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করুন ধন্যবাদ)


(গল্পের কোন ভুল ত্রুটির হলে আমার লেখায় ভুল হলে আশা করি আমার ভুল ধরিয়ে দিবেন। ভুল থেকেই শিক্ষা গ্রহন করা যায়।কার্টেসি ছাড়া কেউ গল্প কপি করবেন না।ভালো থাকুন সুস্থা থাকুন)


গল্প : #আলো_আঁধার

#শেষপর্বঃ_০৭ (প্রথম অংশ)

লেখা : ইনশিয়া আহমেদ হায়াত

-------

আলো দরজা খুলে হতভম্ব হয়ে গেলো।চোখ পেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। দরজার সামনে আর কেউ নয় তারই আপনজন। তার আদরের ছোট ভাই আকরাম।দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে আলোর ভাই, ভাইয়ের বউ ও তাদের মেয়ে। 


আকরাম নিজের বোনকে দেখে ঝাপটে ধরলো। দুই ভাই বোন কাঁদছে৷ ফাতেমাও কেঁদে দিয়েছে।


- আকরামঃ আপারে আমাকে রেখে তুই কেন চলে এসেছিস। একবার আমাকে বলতে পারতি৷ আমাকে জানাতে পারতি। এভাবে আমাকে একা করে কেন চলে এলি। (কাঁদছে আকরাম।)


আশেপাশের মানুষ কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে ভীড় জমিয়ে ফেলেছে। আলো নিজেকে স্বাভাবিক করে ওদের ঘরে ডুকালো। আলো ফাতেমার কোলের বাচ্চাটির দিকে চেয়ে আছে।


আকরাম নিজের মেয়েকে কোলে নিলো।

- আকরামঃ তোর কথা কিন্তু সত্যি হলো আমাদের মেয়ে হয়েছে আপা। এই নে আমাদের আফরা। তোর বানানো জামা পরিয়ে এনেছি। একদম পরির মতো লাগছে তাই না।


আলো নিজের কাঁপাকাঁপা হাতে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে নিলো। বাচ্চাটা আলো দিকে চেয়ে আছে হাত নাড়াচাড়া করছে। নিজের হাত আলো গালে ছোঁয়াচ্ছে। আলোর চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।একদম নিজের মতো হয়েছে। হবেই না কেন আলো ও আকরামের চেহারাই অনেকটাই মিল।আলো আফরাকে বুকে জড়িয়ে রাখছে। অন্যরকম শান্তি লাগছে।


- আলোঃ আম্মু আমি তোমার ফুপ্পি হই বুঝেছো। তুমি জলদি বড় হয়ে যাও। স্কুলে যাবা খেলা করবা।নিজের মতো করে বাঁচবা। 


আফরা ও মুখ দিয়ে হালকা আওয়াজ করছে হেসে দিচ্ছে। আলোকে এখন বেশ পরিবর্তন লাগছে৷ লাগবেই না কেন মানুষের খাওয়া আর ঘুম বেশ প্রয়োজন। কিন্তু শাওনদের বাড়িতে এই দুটির একটিও হতো না।


আলো ওদের শরবত বানিয়ে দিয়ে রান্না শুরু করবে। আপাতত ঘরে তেমন কিছু নেই। ভাত আর ডিম ভুনা করে দিবে ভাবছে।


ফাতেমা আলোকে উঠিয়ে নিজে বসে গেলো। আর আলোকে তার ভাইয়ের কাছে গিয়ে কথা বলতে বললো। প্রথমে মানা করলেও ফাতেমার জোড়াজুড়িতে উঠলো।


আলো আকরামে সাথে কথা বলছে। খাট কেনা হয়নি তাই মেঝেতেই ঘুমায় কিন্তু তোশক বানিয়েছে তাতে শুয়ে থাকে। একা মানুষ এতো কিছু দিয়ে কি করবে আর সব না হয় আস্তে আস্তে কিনে নিবে।


বাচ্চাটা কোনো মতে বসতে পারে। বসিয়ে দিয়েছে সে তার মতো খেলা করছে। এরপর আলো ওর ভাইকে সব বললো, এখানে কিভাবে এসেছে কি কি হয়েছে। শাওন কি কি করেছে সব। শাওনকে ডিভোর্স এর পেপার তোহ পাঠিয়ে দিয়েছে কিন্তু বাকি অনেক কাজ বাকি। আকরাম বললো বাকিটা সে দেখে নিবে।সে একটা কোম্পানিতে ছোট খাটো কাজ নিয়েছে তাই করছে।


ওদের কথার মাঝে মনিরা এসে হাজির। মনিরা রোজ আলোকে দেখতে আসো। দুইজন গল্প করে। আজকে মানুষ দেখে একটু অবাক।আলো মনিরাকে ওর ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সাথে ফাতেমা ও আফরামনির সাথেও।


মনিরা ফাতেমাকে রান্না করতে মানা করলো। বললো আজকে তার বাসায় খেতে অনেক মানা করেও কাজ হলো না। সাথে ফাতেমারা মনিরার বাসায়ই থাকবে। বাচ্চা নিয়ে এমন ছোট একটা ঘরে কিভাবে থাকবে।


মনিরা চলে গেল। রান্না করতে হবে তাই।


কথার মাঝে আকরাম বলল জরুরি কথা আছে। আলো জানে এখানে আকরাম কিভাবে এসেছে তাই আর জিজ্ঞেস করেনি। আকরাম আলোকে বললো,


- আকরামঃ আপা আমি তোকে আজ নিতে এসেছি।


- আলোঃ এটা সম্ভব নারে। আমি সব ছেড়ে এসেছি। পেছনে ফিরে তাকাতে চাই না।


- আকরামঃ আপা দেখো আমি তোমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে বলছি না। আমি চাচ্ছি তুমি সামনে ফিরো। কিন্তু তা আমার বাড়িতে। তোমার সাথে আমি আছি ফাতেমা আছে। সাথে আফরা মনিও আছ। তোমার যা সিদ্ধান্ত হবে তাই।  


- আলোঃ আকরাম দেখো আমি এখানে নতুন করে শুরু করেছি।তার...


আলোকে থামিয়ে দিয়ে আকরাম বললো,

- আকরামঃ আপা একবার আমার মেয়েটাকেও দেখো। সে তার ফুফু আদর থেকে বঞ্চিত হবে। আর যদি তার দাদীও আমাদের দাদীর মতো আচরন করে। আমাদের তোহ ফুফু ছিলো না কিন্তু আফরার তো ফুফু আছে সেকি আফরাকে আগলে রাখতে পারবে না।


আকরাম আলোকে নানান ভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। অতঃপর অনেক ভেবে আলো যাওয়ার জন্য রাজি হয়।

--

-----

পরেরদিন সকাল সকাল আকরাম ফাতেমাকে নিয়ে যায়।ওরা পরেরদিন আসবে বললো।আলো বাড়ির মালিকের সাথে কথা বলে সব ঠিক ঠাক করলো। মনিরা এসে সব কিছু গুছাতে সাহায্য করছে। মনিরাও খুশি আলো তার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে।


অতঃপর আলো আজ নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মনিরাকে ধরে হালকা কান্না করেছিলো। তার দুঃখের সময় মনিরাই তাকে সাহায্য করেছে যা সহজে মানুষ করে না।


.


আলো নিজের বাড়িতে ডুকতে কেমন যেনো লাগছে। কিছুক্ষন পর আলোর মা এসে তার মেয়েকে ঝাপটে ধরে কান্নায় ভেঙে পরে৷ আলোর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই৷ আলোর মা আলোকে নিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। কোথাও তার দাদীকে দেখা যাচ্ছে না হয়তো নিজেকে গুটিয়ে রুমে বন্ধি করে রেখেছে।আলো আকরামকে জিজ্ঞেস করলো দাদী কোথায় আকরাম বললো তার রুমে।আলো আর কিছু বললো না। আলো তার দাদীর সাথে মুখোমুখি হতে চায় না। তাই খাবার দাবার খেয়ে নিজের রুমেই আছে। 


নতুন সেলায় মেশিন তার রুমে রাখা। যা যা নিজের টাকা দিয়ে কিনেছিলো সব নিজের রুমে সাজিয়েছে।আর ওই এলাকাটা ছেড়ে আসার কারন আঁধার।সে আঁধারের জীবনে এখন জড়াতে চায় না।তাই চলে এসেছে।


---

--------

শাওনের কাছে খবর যায় আলো এসেছে।কিন্তু সে আসেনি।আকরাম তার বন্ধুর মামার সাথে কথা বলে যিনি উকিল। উকিল কাগজ পত্র দেখে বাকি কাজটা করে ফেলবে। নতুন করে নোটিশ পাঠানো হয়।

 

-------

শাওন ও আলো আদালতে এসেছে।শাওন আলোর সাথে ৫ মিনিট কথা বলতে চায়।


শাওন আর আলো একটা সাইডে এসে বসলো।শাওন কিছুক্ষন চুপ থেকে বলা শুরু করলো।


- শাওনঃ আলো দেখো আমি মানছি আমার ভুল হয়েছে। আমি তোমাকে শাস্তি দিয়েছি অনেক। কষ্ট দিয়েছি। আজ আমি অনুতপ্ত আমি চাই তুমি ফিরে এসো। আচ্ছা নতুন করে কি আমরা আবার শুরু করতে পারিনা৷ আমরা এক সাথে ছিলাম৷ এবার আমি তোমার সব কথা শুনবো। ডিভোর্স দিয়ে কি হবে বলো।


আলো কিছুক্ষন চুপ থেকে জবাব দিলো,


- আলোঃ আপনি নতুন করে কেনো শুরু করতে চান। কারন আপনি অনুতপ্ত। আচ্ছা একটা কথা বলুন তোহ আমি আপনার কাছে কেন ফিরবো। ফিরে যাওয়ার তোহ কোনো কারন পাচ্ছি না। আপনি তোহ আমায় ভালোবাসেন না। আপনি অনুতপ্ত তাই নতুন করে শুরু করতে চান। 


আপনি আমার জন্য কি করেছেন। না আপনি ভালোবাসেন আর না আপনি আমার কোনো দায়িত্ব পালন করেছেন। বিয়ে করে টিস্যুর মতো ব্যবহার করা ছাড়া আর কিছু কি করেছেন। আপনি যদি আমায় ভালোবাসতেন তাহলে আমি নাহয় আপনার কাছে আসতাম। আপনি আমায় ভালোবাসেন না,সম্মান করেননা, আমার দায়িত্ব নেননা। আমার খোঁজ নেননা। তাহলে কেনো আমি আপনার কাছেই যাবো। 


আলো এবার দম নিলো। 

- শাওনঃ দেখো আলো একটা সম্পর্ক এভাবে হুট করেই শেষ করা যায় না। তুমি আমাদের বাড়িতে ছিলা। থাকা খাওয়া সংসার করা।সবই তোহ করেছো। 


- আলোঃ একটা কাজের লোককেও ফ্রিতে থাকতে দেওয়া হয় খেতে দেওয়া হয়। আর আমাকে তোহ না শান্তিতে খেতে দিয়েছেন না ঘুমাতে।


- শাওনঃ আচ্ছা আমাকে কি মাফ করে দিয়ে নতুন করে শুরু করা যায় না।


- আলোঃ কোন কোন কাজের জন্য আপনাকে মাফ করবো৷ আমাকে অসম্মান এর জন্য,অবহেলার জন্য,নিষ্ঠুর আচরনের জন্য, নাকি ভালো না বাসা আর দায়িত্বহীনের জন্য। আপনি হয়তো ভুলে গিয়েছেন আমার সাথে আপনি কি কি করেছেন দাঁড়ান মনে করিয়ে দিচ্ছি। 


আপনি সেই লোক যে খাবারে লবন বেশি হওয়ায় রাত ১ টায় ৮ কেজি মাছ এনে আমাকে সারারাত নির্ঘুম রেখেছেন, আমার জামা কাপড় কুচি কুচি করে কেটে ফেলেছেন, বাচ্চা না হওয়া জন্য আমাকে দোষারোপ করেছেন, আমাকে না বলে আমার ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা এনে জুয়া খেলায় শেষ করেছেন, আমার বাবার বাড়ি থেকে দেওয়া একটা আংটি বিক্রি করে জুয়াতে সব টাকা শেষ করেছেন, আমাকে নিজে থেকে একটা শ্যাম্পুও কিনে দেননি, আমাকে বাবার বাড়ির খোটা দিয়েছেন। 


আপনারাই সেই লোক যারা আমাকে বাচ্চা না হওয়ায় কবিরাজের কাছে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করেছেন, কখনো আমায় জিজ্ঞেস করেনি আলো তুমি কি খেয়েছো, যার জন্য কিনা রাত ১ টা পর্যন্ত না খেয়ে নির্ঘুম থাকতাম৷


আপনি সেই লোক যার বাড়িতে কতো রাত কতো দিন না খেয়ে থেকেছি, কখনো আমায় কিছু কিনে দেননি বা জিজ্ঞেস করেননি যে আলো তোমার কি কিছু লাগবে। আপনিই সেই লোক যে কখনো আমায় বলেননি যে আমায় ভালোবাসেন। বিয়ে করেছেন তাই আমার সাথে থেকেছেন। আর আপনিই সেই লোক যে আমায় বলেছেন আপনি আমায় বিয়ে না করলেও কেউই এমন মেয়েকে বিয়ে করতো না। আমার বয়স বেশি, রুপ নেই,গুন নেই কিছু নেই৷ আচ্ছা কখনো কি আমার কাজে প্রশংসা করেছেন। আমার রান্না করা খাবারের কোনো প্রশংসা করেছেন৷ আমাকে কখনো কোথাও ঘুরতে নিয়ে গিয়েছেন, আমাকে কখনো কোনো উপহার দিয়েছন। আরে উপহার বাদ ঈদেও তোহ কিছু দেননি। 


(আলো এবার একটু দম নিলো শাওন চুপচাপ আলোর কথা শুনছে।কি বলবে বুঝতে পারছে না।)


- আলোঃ আচ্ছা বললেন না যে মাফ করে নতুন করে শুরু করতে। আপনি কি কখনো আমায় মাফ করে ছাড় দিয়েছেন। খাবারে লবন বেশি হওয়ায় কি আমায় মাফ করা যেতো না৷ আপনি তা করেছেন কি৷ আমি সেলাই মেশিন বিক্রি করে আমার ভাইয়ের টাকা ফেরত দেওয়ায় আমার জামা কাপড় কেটে ফেলেছেন যেখানে আপনার দোষ ছিলো কই তখনও তোহ মাফ করেননি। রাতের বেলা চালের গুড়ো এনে পিঠা বানাতে বলেন কই তখনও তোহ মাফ করেননি। যেখানে নিজে ছোট ছোট কাজের জন্য আমায় মাফ করেননি সেখানে এতো বড় বড় অন্যায়ের মাফ আমি কেন করবো। আমি কেনো মানিয়ে নিবো আপনি কি মানিয়ে নিতে পারতেন না। কিন্তু না আপনি তেমন কিছুই করেন নি। যখন যেটা নিজে পারবেন না সেটা অন্যের কাছে আশা করবেন না। আর আপনাকে মাফ করে দিলাম কিন্তু নতুন করে ঘর বাধার সপ্ন আপনার সাথে দেখার কোনো ইচ্ছা নেই।


আলো উঠে চলে যাচ্ছিলো৷ যাওয়ার আগে শেষ একটা কথা বলে গিয়েছে।


- আলোঃ আর শুরুতেই তোহ আপনি বুঝিয়ে দিলেন আমি আপনার সাথে থাকলে সুখী হবো কি না। আপনি এসেই আমায় নতুন করে ঘর বাধার কথা বলছেন কই একবারও তোহ জিজ্ঞেস করলেন না আমি কেমন আছি।অনুতপ্ত হয়েছেন কিন্তু বদলাননি। যাক শেষ কথা বলি আপনি বলেছিলেন টাকা না নিয়ে এলে মুখ দেখাতে না৷ আমি কিন্তু আপনার কথাটা রেখেছি। আর একটা কথা থুথু ফেলে দিলে সে থুথু আর মুখে নেওয়া যায় না।

--

------

আলো সোজা হেঁটে যাচ্ছে, আত্নসম্মান থাকতে হয়। সব সময় মানিয়ে নেওয়া যায় না। মানুষ এর সাথে সংসার করা যায় কিন্তু এইসব জানোয়ারদের সাথে সংসার না করাই ভালো৷ সব সময় সবাইকে নতুন করে সুযোগ দেওয়া যায় না। তাদের যদি সুযোগ দেই তাহলে নিজের কাছেই হেরে যাবো।নিজের কাছে নিজে নিচু হবো।


অতঃপর আলো ও শাওনের তালাক হয়ে গেলো। আলো পিছু ফিরে আর তাকাতে চায় না।


.


এভাবে কিছুদিন কেটে গেল। আলো একদিন ঘরে বসে সেলাই করছে। এমন সময় আকরাম আসলো এসে আলোকে ঘর থেকে বাহিরে নিয়ে গেলো। বাহিরে গিয়ে আলো দেখলো কয়েকজন মানুষ বসে আছে। তিনজন মহিলা আর একজন পুরুষ।  


আলো ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলো। বুঝার চেষ্টা করছে কারা।লোকটাকে দেখে একটু অবাক হলো ঔষধ এর দোকানি আর পিঠা নিতে এই লোকটাকে দেখেছে অনেকবার৷ তার পাশে একজন বয়স্ক মহিলাকে দেখতে পাচ্ছে তার চেহারাটা চেনা চেনা লাগছে। অনেকক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবছে কারা এরা। লোকটা আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। 


বয়স্ক মহিলাটি আলোকে চুপ দেখে বললো,

- "কেমন আছো আলোমনি"


আলোমনি নামটা শুনে অবাক হয়ে গেলো। মূহুর্তেই মনে পড়ে গেলো।এই নাম তোহ দুইজন ডাকতো এক আলোর বাবার আরেকজন আঁধারের মা।আদর করে আলোমনি ডাকতো।তাহলে কি ইনি...


আলো লোকটার দিকে তাকালো চোখ ছলছল করছে। লোকটারও লোক ছলছল করছে। আলোর কিছু বলার আগেই গলা বসে যাচ্ছে। একটা ঢোক গিলে বললো,


- আলোঃ আ..আঁধার 


- আঁধারঃ আঁধারের আলো।


আলো নিজের দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে।কাউকে কিছু না বলে নিজের রুমে গিয়ে বসলো।এতে কেউ অবাক হয়নি আকরাম, আলোর মা আর আঁধারের মা বললো আঁধারকে আলোর কাছে যেতে।


আলো বিছানায় বসে কাঁদছে আঁধার দরজাটা হালকা চাপিয়ে মেঝেতে এসে বসলো।আলোর বিছানায় ঘুমাচ্ছে আফরা।


আলোকে কাঁদতে দেখে সে নিজেও কাঁদছে। আলোর দিকে নিজের রুমাল এগিয়ে দিয়ে বললো,

- আঁধারঃ কেমন আছো তুমি?


আলো অনেক কষ্টে নিজে সামলাচ্ছে। আঁধারের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বাথরুমে চলে গেলো আঁধার উঠে দাড়িয়ে রুম টা দেখছে। আলো মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছে৷ তিন মিনিট নিজের দিকে চেয়ে বেড়িয়ে এলো। গিয়ে খাটে বসে আঁধারকে বসতে বললো।


- আলোঃ অনেক বছর পর আমাদের দেখা।তুমি কেমন আছো আঁধার।বিয়ে করেছো কি বাচ্চা আছে, ছেলে হয়েছে নাকি মেয়ে?


আলো এইসব প্রশ্নের উত্তর জানে তারপরও প্রশ্ন করছে।আঁধার চুপ করে থেকে এরপর উত্তর দিলো।


- আধারঃ তোমার কথা রেখেছি আলো। তোমারই অপেক্ষা করছি। তোমার বলা শেষ কথা গুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। তুমি কিন্তু তোমার বলা কথা গুলো রাখোনি।


- আলোঃ কোন কথা বলছো। আমার তোহ মনে পড়ছে না।


আঁধার একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো।

- আধারঃ দেখো আলো আমি তোমার জন্য শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবো আমি তোমার সব সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করি। কখনো তোমায় জোর করবো না। আচ্ছা আসল কথা বলি আমার পরিবার আর তোমার পরিবার আমাদের বিয়ে কথা বলতে এসেছে। আমি জানি তুমি ভালো নেই। আমি শুধু তোমার মতামত চাই, তোমার চাওয়া, তোমার ইচ্ছার কথা শুনতে চাচ্ছি।


আলো কিছুক্ষন চুপ থেকে বলা শুরু করলো কথা গুলো বলার মতো কাউকে পাচ্ছে না আঁধারকে নিজের আপন অনেক কাছের মনে হয়। যার কাছে সব কিছু বলা যায়। 


- আলোঃ আঁধার আমি চাইলেই তোমাকে বিয়ে করে নিতে পারি। এতে কি হবে সবাই আমাকে নানান কথাও বলবে। নানান অপবাদ দিবে। তোমার বাড়ির লোকজনও বলতে পারে অনেক কিছু। আঁধার আমি ডিভোর্সি। আমার বাচ্চা হয়নি।সব সময় মেয়েদের দোষ দেওয়া হয়। মানুষ ভাবে বাচ্চা না হওয়ায় আমার তালাক হয়েছে। এমনও হতে পারে তোমাকে বিয়ে করে তোমার জীবনটা নষ্ট হবে। আর সব চেয়ে বড় কথা আমি এমন কিছু করতে চাই যাতে কেউ আমায় অসম্মান না করে। কেউ বলতে না পারে যে আমি নিজের বোঝাটা তোমার ঘাড়ে ফেলেছি। তোমাকে ফাঁসিয়েছি। আমি তোমার যোগ্য নই আঁধার। আমার কাছে কিছুই নেই তোমার জন্য। আমার কাছে তোহ নিজের সম্মান টুকু নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করে বোঝা হয়ে থাকতে চাচ্ছি না। কিছু করতে চাই। পড়াশোনা তোহ করতে পারিনি কিই বা করবো।


আঁধার কিছুক্ষন বসে চলে যায়। যাওয়ার আগে বলে,


- আধারঃ আমি তোমায় সসম্মানে নিয়ে যাবো। কেউ বলতে পারবে না আমি কোনো অযোগ্য মেয়ে বিয়ে করেছি। তোমার কি যোগ্যতা তা সবার সামনে খুব জলদি আসবে। আর আমি তোমার জন্য সব সময়ই অপেক্ষা করবো।


এই বলে ওইদিন আঁধাররা চলে যায়। কেউ আলোকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আলো জানালা দিয়ে আঁধারের যাওয়ার দিকে চেয়ে আছে। ইচ্ছে করছে আটকাতে কিন্ত সে তা চায় না।


দুইদিন পর আকরাম আলোর কাছে এসে বললো। একটা দোকান দিবে তাতে যেনো আলো তাকে সাহায্য করে। 


- আলোঃ দোকান দেওয়ার জন্য টাকা প্রয়োজন তা এতো টাকা কোথায় পাবে।


- আকরামঃ এতো চিন্তা করো না যা হবে ভালোই হবে।


.


এইদিকে আকরাম ও ফাতেমা মিলে তাদের বাড়ির সামনেই দোকান বসাচ্ছে। ইটের দেয়াল আর উপরে টিন।কাজ শুরু করে দিয়েছে। ফাতেমা ও ওর শাশুড়ী মিলে এদিকের কাজ দেখছে। 


আকরাম আলোকে নিয়ে একটা রেস্তোরাঁতে গেলো।সেখানে আঁধারের সাথে বসা একটি মেয়েকে দেখলো। আলো সেখানে যাওয়ায় আঁধার মেয়েটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।


- আঁধারঃ আলো ইনি জিনিয়া আমার বন্ধু স্ত্রী। ইনি একটি এনজিওতে কাজ করে। ইনি অসহায় নারীদের নিয়ে কাজ করছে। তাদের হাতের কাজ সেলাই কাজের প্রশিক্ষন দিয়ে থাকে৷


- আলোঃ ওহ আচ্ছা। 


- জিনিয়াঃ শুনলাম আপনি নাকি হাতের কাজ ও সেলাই ভালো পারেন।


- আলোঃ জিইই আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শিখেছি। মোটামুটি অনেক কাজই পারি।


জিনিয়া একটা কাগজ এগিয়ে দিলো,

- আলো আমাদের কাজের জন্য একজনকে দরকার যিনি ভালো করে সেলাই কাজ, হাতের কাজের প্রশিক্ষন দিতে পারবে। আপনি কি রাজি আছেন।আমি আপনাকে সাথে নিয়ে কাজ করতে চাই। 


আলো আঁধারের দিকে তাকালো। আঁধার কি সত্যি তার বলা কথা গুলো পূরণ করতে যাচ্ছে। আকরামের ডাকে হুস এলো। 


- আকরামঃ আপা সাইন করে দে। এমন সুযোগ সব সময় আসে না।


এরপর আলো রাজি হয়ে যায়। আরো কিছুক্ষন কথা বলে তারা চলে যায়।

আলো বাসায় এসে আকরামকে নিজের ঘরে ডাকে।আকরাম আসে।


- আলোঃ আকরাম এতো টাকা তুই কোথায় পেয়েছিস যার জন্য দোকান দিচ্ছিস।


- আকরামঃ দিয়েছে একজন।


- আলোঃ আকরাম কে দিয়েছে।


- আকরামঃ আপা থাক না এতো কিছু দিয়ে কি করবি।


- আলোঃ আকরাম যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দে। তুই কি আঁধারের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিস। (হালকা রাগী ভাবে)


- আকরামঃ টাকা গুলো দাদী দিয়েছে।


আলো অবাক হলো। দাদী টাকা দিয়েছে মানে।


- আকরামঃ দোকানটা তোর জন্য দিচ্ছি।এখানে তুই থ্রিপিস এর দোকান দিতে পারবি সাথে এলাকার কিছু অসহায় নারীদের সেলাই শিখিয়ে তাদের দিয়ে নতুন উদ্যোগ নিতে পারবি। তোর জন্য দাদী টাকা দিয়েছে।


- আলোঃ দাদী আমার জন্য টাকা দিয়েছে।আর এই আইডিয়া তুই কোথায় পেলি। 


- আকরামঃ আইডিয়া আঁধার ভাইয়ের।আর দাদী টাকা কোথায় পেয়েছে তা দাদীকে গিয়ে জিগ্যেস কর, আমার কাজ আছে আমি গেলাম।


আকরাম চলে গেল। আলো আস্তে আস্তে তার দাদীর ঘরে পা বাড়াচ্ছে।এতোদিনে তার দাদী তার সামনে আসেনি। আলোও তার দাদীর কাছে যায়নি। 


দাদীর ঘরে গিয়ে ডুকে পড়লো৷ জানালার পাশে বসে আছে।আলো আস্তে আস্তে দাদী কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলো আলো দাঁড়িয়ে আছে। দাদী আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো।


- আলোঃ দাদী কেমন আছেন।


আলোর মুখে দাদী শুনে কান্না করে আলোকে জড়িয়ে ধরলো। আলোও কান্না করে দিলো


- আলোর দাদীঃ মাগো আমাকে মাফ করে দেও। আমার ভুল হয়ে গেছে।


আলো কিছু বলছে না কিন্তু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। দাদীকে শান্ত করলো। বয়স হয়েছে অনেক। আলো দাদীকে শান্ত ভাবে টাকার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে তার ভাইয়ের ছেলেরা দিয়েছে। বাবার বাড়ি থেকে কোনো কিছুই নেয়নি কিন্তু জায়গায় তার নাম আছে সেটা ভাইয়ের ছেলেদের দিয়ে টাকা নিয়ে নিয়েছে। তার বাবার বাড়ির অনেক জমি জমা আছে।সেখানে তার নামও আছে।এতো বছরে আলোর জন্য কিছু করেনি বা করতে পারেনি। আকরাম ও ফাতেমার কথা শুনে আলোর দাদী টাকা দেয়।


আলো কিছুক্ষন কথা বলে জানতে পারে আকরাম ওর মেয়েকে দাদী ধারে কাছেও আনেনি।এরপর আলো চলে যায়।


---

-----

আলো দোকান চালু করে দিয়েছে। জিনিয়ার সাথেও কাজ শুরু করে দিয়েছে। 

প্রতিদিন জিনিয়ার সাথে গিয়ে তিন ঘন্টা করে বিভিন্ন নারীদের সেলাই কাজ, হাতের কাজ শেখায়।নিজেদের দোকান চালু করেছে।এক পাশে থ্রিপিস বিক্রি করবে। আরেক পাশে সেলাই কাজ ও হাতের কাজ শুরু করবে।


এলাকার কয়েকজন নারীদের খুঁজে বের করেছে। তাদের কাজ শিখিয়ে শুরু করে দিয়েছে। তাদের কাজের জন্য প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে বেতন দেয় যাতে করে তারা চলতে পারে।আলো ওইসব নারীদের নিয়ে কাজ করে যেখানে কেউ কেউ ডিভোর্সি, বিধবা, কেউ স্বামীকে সাহায্য করার জন্য।কারো বাবা নেই সংসারের হাল ধরার জন্য।


আলোকে একটা ল্যাপটপ কিনে দিয়েছে আকরাম। ১৫ দিনে ল্যাপটপ চালানো শিখে নেয় আলো। সব কিছু তারাতারি করে কাজ শুরু করে। সেখানে নতুন ফেসবুক একাউন্ট খুলে একটা পেজ খুলেছে। পেজে নকশি পিঠা,কেক নিয়ে কাজ করছে।অনলাইনে কেক, নকশি পিঠা বিক্রি করে ডেলিভারি দেওয়ার জন্য লোকও রেখেছে।


আঁধার আলোকে বিভিন্ন গ্রুপে এড করিয়ে দেয়। আরো অনেক কিছু শিখিয়ে দেয় কিভাবে কাজ করবে। বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট দেওয়ার জন্য তা নিজে লিখে সাজিয়ে দেয়। এভাবে আস্তে আস্তে আলোর উন্নতি হচ্ছে আলো নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের পরিচয় বানাচ্ছে। মোটামুটি অনেকটা পরিচিত পেয়ে গেছে আলো। 


আঁধারের আরেকটা কথায় সে হাতের কাজের, নিজের বানানো থ্রিপিস,ফ্রোক, আরও অনেক কিছু অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করছে। সব কাজে আঁধার দূরে থেকেও সাহায্য করেছে। আলো এখন অনেক জায়গায় যায়। নিজের হাতে বানানো অনেক কিছুই এখন নিজের এলাকার পাশাপাশি দেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে দিচ্ছে।নিজের এলাকা ছাড়াও আশেপাশের এলাকার মানুষজনও আলোকে চিনে। আলোদের দোকন থেকে থ্রিপিস গুলো কিনে। বানানো থ্রিপিস দামও কম সাথে বিভিন্ন কাজ করাও আছে। আলোর দোকান থেকে বানানো থ্রিপিস গুলো বিভিন্ন শপিং মলের দোকানেও দিয়ে থাকে। 


.


আলো এখন সবার কাছে বেশ পরিচিত।এভাবে কেটে গেল দেড় বছর। আলোর দিনকাল ভালোই যাচ্ছে।একদিন আলোর দাদী তার ঘরে আসে। তখন সে অনলাইনে কাজ করছিলো।


- আলোঃ কিছু বলবেন আপনি।


- দাদীঃ আমার মতে আঁধারকে বিয়ে কইরা ফালানো উচিত তোমার।


দাদীর কথা অবাক হয়ে চেয়ে আছে।


- দাদীঃ হো আজ তুমি যে নাম কামাইছ যে সম্মান পাইছো সব আঁধারের কারনে হইছে। আঁধার কতো জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছে।আকরামকে বলে দোকান দেওয়াইছে।এই টিভিটার(ল্যাপটপ) মধ্যে কাম করার কথা বলছে। তোমার জন্য পোলাটায় অনেক কষ্ট করছে।ওরে আমি কইছিলাম কিছু করলে তোমারে ওর হাতে তুইল্লা দিমু ওয় সেই কথা রাইখা বিদেশ গেছে গা। কিন্তু আমি দেইনি আমার কথা রাখি নাই। আজ সুযোগ আছে কথা রাখনের।আমি চাই তুমি ওর সাথে নতুন কইরা সব শুরু করো। ওয় তোমার জন্য ভালো।গল্প : #আলো_আঁধার

#শেষপর্বঃ_০৭ (শেষ অংশ)

লেখা : ইনশিয়া আহমেদ হায়াত

-----------

দাদী কথা গুলো বলে চলে গেলো। ঠিকই তোহ আঁধার কতো কিছু করলো। আঁধার যে তার বলা কথা গুলো রেখেছে আর রাখে তাহলে আমি কেন আমার বলা কথা গুলো থেকে পালিয়ে যাচ্ছি। 

---

------

আলো আকরাম ও ফাতেমাকে ঢেকে ওদের সাথে কথা বলে।আকরাম বলে আঁধার অনেক কাজ করেছে বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে আলোর কাজের প্রচার করেছে। তার বন্ধু বান্ধুবদের জানিয়ে দিয়েছে।এভাবে অনেক অনেক কষ্ট করেছে। জিনিয়াকে অনেক রিকুয়েষ্ট করে আলোকে কাজে নিতে বলেছে। কাজের জন্য জায়গা না থাকা সত্বেও আলোকে নিয়েছে। আঁধার বলেছে আলো তাদের নিরাশ করবে না। আলো কাজের সফলতার পেছনে আঁধারের অবদান অনেক।


আলো অনেক চিন্তা ভাবনা করে আঁধারকে ডাকে। আকরামকে সাথে নিয়ে একটা রেস্তোরাঁতে যায়।আকরাম একটু দূরে থেকে দুইজনকে কথা বলার সুযোগ দেয়।


৫ মিনিট দুজন নিরবতা পালন করে আলো বলে,


- আলোঃ আমি আঁধারের_আলো হয়ে থাকতে চাই। আমাকে কি নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নতুন সম্পর্কের নাম দিতে পারবে কি?


আঁধার মুচকি হাসলো। সে এই কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলো। অবশেষে পেয়ে গেলো সে তার আঁধারের_আলোকে।


---

----

অতঃপর আঁধার আলোর বিয়েটা হয়ে গেলো সামান্য ঘরোয়া ভাবে বিয়েটা হলেও। তাদের বিয়েতে অনেক মানুষ আসে। মনিরাও আসে যে আলোকে সাহায্য করেছিলো এমনকি গার্লস গ্রুপে মনিরা আঁধার ও আলোর কথা গুলো শেয়ার করে। আলো অনেক মেয়ের অনুপ্রেরণা। 


-------

বাসর ঘরে বসে আছে আলো।অবশেষে সে আঁধারের_আলো হয়েই গেলো। আঁধার তাকে সসম্মানের সাথে তার যোগ্যতা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েই আপন করে নিয়েছে।সে প্রমান করে দিয়েছে আলো কখনো অযোগ্য ছিলো না।


আলো আঁধারের রুমটাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। এরপর সে রুমে আসে দুজন নামাজ আদায় করে এক সাথে বসে গল্প করতেছে। এত বছরে কত কথা জমে আছে। আলো পেপারে মুড়ানো একটি প্যাকেট আঁধারের দিকে এগিয়ে দেয়। আধার হালকা হেসে তা নিয়ে নেয়।


পেপার খুলে দেখে বিস্কুটের প্যাকেট তাও নতুন। প্যাকেটটা ছিড়ে দুজনে বিস্কুট খাচ্ছে।আঁধার আলোকে একটা নাকফুল উপহার দেয়।


- আঁধারঃ তোহ নিজের দেওয়া বিস্কুট এর প্যাকেট এক দেখায় চিনে ফেলেছো।আর এটা কি আগের বিস্কুট আমাকে খাওয়ানো হচ্ছে নাকি নতুন।


আলো ভ্রু কুচকে বললো,

- কালকে রাতে কিনে মুড়িয়ে রেখেছি। আর আমার দেওয়া বিস্কুট আমার স্টাইলে ফেরত দিলে চিনবো না কেন আর ওই বিস্কুট আমি একমাত্র তোমায় দিয়েছি আর কাউকে না।তোমাকে দেওয়ার পর না কখনো ওই বিস্কুট কিনেছে। আর ওই সময়ের বিস্কুট আমার স্টাইলে তুমি ছাড়া কে ফেরত দিবে তার উপর আবার চিরকুটও লিখে দিয়েছো।আর একটা কথা এতোদিন সামনে থেকেও পরিচয় দেওনি কেন। 


বলেই একটা কিল বসিয়ে দিলো আঁধারের পিঠে।


আধার হেসে দিতে বললো,

- আধারঃ এই আমার পিঠে কিল দেওয়ার অভ্যাস গেলো না তোমার।


- আলোঃ সম্মান দিয়ে কথা বলো আমি তোমার দুই মাসের বড়। 


আঁধার হেসে দিলো কতো বছর পর এই কথাটা তার প্রিয়তমার মুখ থেকে শুনছে।


- আধারঃ তা তোহ দিতেই হবে৷ আমার বাচ্চার মা আর আঁধারের আলো বলে কথা। 


বাচ্চার কথা শুনে আলোর মুখটা মলিন হয়ে গেলো। আঁধার বুঝতে পারলো। 


তাই কথা গুড়িয়ে বললো,

- আঁধারঃ তোমাদের এলাকার ঐ মোটু টা কেমন আছে।


- আলোঃ কোন মোটু ওই মোটু যার হাতে ছোট বেলায় পিটুনি খেয়েছো আর আমাকে গিয়ে বাঁচাতে হয়েছে৷ 


- আঁধারঃ এটাও মনে আছে।


- আলোঃ থাকবে না কেন। আমার সব মনে থাকে। আর মোটু বিয়ে করে বাচ্চা কাচ্চা স্কুলে পড়ে। 


এভাবে কত শত কথা বলছে।


কয়দিন পর আলো ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেকাপ করিয়েআসে৷ডাক্তার সব নরমাল বলে৷ 


---

-----

আলোর ভাসুর বিদেশ থেকে আসে। এই বাড়ির সবাই ভালো আলো শ্বশুর নেই। ভাসুর ও জায়ের একটা মেয়ে আছে তারা দুজন আমাকে বোনের মতো দেখে অনেক ভালোবাসে। আগের শাশুড়ীর চেয়ে এই শাশুড়ী অনেক ভালো একদম নিজের মেয়ের আদর করে।ননাসও ভালো।আলোর বাড়ির দোকান ফাতেমা দেখাশোনা করে। আঁধার বলেছে যা টাকা আসবে সব আফরার। ওই দোকান থেকে ভালো ইনকাম হয়। আকরামের চাকরিও ভালো চলছে৷ ঘরে সাথে হওয়ায় আকরামের মাও দোকানে থাকে মাঝে মাঝে দাদীও থাকে। 


যেহেতু আলো তার মায়ের কাছ থেকে কাজ শিখেছে তাই ঝামেলা হলে তার মা দেখিয়ে দেয়। সাথে ইউটিউব তোহ আছেই।নতুন কিছু জানার ও শিখার জন্য ইউটিউব ব্যবহার করে থাকে। আকরামের শাশুড়ী আলোর কাছে মাফ চেয়েছে। আলো মাফ করে দিয়েছে। সাথী ও সূচি আলোর কাজের জন্য খুশি। তারাও দেখা করে গিয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু ধাক্কা থেকে উপরে উঠা যায় যদি উপরে উঠার জন্য কেউ সঙ্গ দেয়। আলো শশুর বাড়ির এখানে দোকান দিয়েছে কয়েকজন মেয়েদের নিয়ে কাজ করছে। সাথে তার কেক ও পিঠার ব্যবসাও চলছে।


আঁধারের ঔষধ এর দোকান ভালোই চলছে। দোকান থেকে ফিরতে দেরি হলে আলোকে ফোন করে জানিয়ে দেয়। এখন আর রাত ১,২ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগে না। এখন আলো আঁধারের জন্য অপেক্ষা করে। কারন আঁধার যত দেরি করেই আসুক। এসেই আলোকে জিজ্ঞেস করবে খেয়েছে কিনা। যখন শোনে খায়নি তখন বকাঝকাও করে। আলো শাওনকে ধন্যবাদ দিয়েছে। সে দুঃখগুলো না দিলে এতো সুখ পেতো না। আর সুখ কি জিনিস তাও বুঝতে পারতো না। আজ আলো আর আঁধার বাকি সব সুখি স্বামী স্ত্রীদের মতো জীবন যাপন করছে।


--

--------

১ বছর পর আলো প্রেগন্যান্ট।অনেক কষ্টে গর্ভবতী হয়েছে অবশেষে।অনেকের অনেক কথা শুনতে হয়েছিলো কিন্তু আলোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন অনেক সাপোর্ট দিয়েছে।


একদিন আলো গোসল করে এসে ফোন হাতে নিয়ে দেখে আঁধার কল দিয়েছিলো।আর একটা মেসেজ।


- "হোয়াটসঅ্যাপ এ যাও একটা জিনিস দেখাবো"


আলো হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে দেখল আঁধার তরমুজের ছবি পাঠিয়েছে। তরমুজ আলোর পছন্দ ছিলো যেদিন বাবা মারা যায় ওইদিন পছন্দের জিনিস অপছন্দে পরিণত হয়। কারন ওইদিন আলো ওর বাবাকে তরমুজ কিনে আনার জন্য বায়না ধরে ছিলো আর তরমুজ তোহ আসেনি এসেছে তার বাবার লাশ। রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গিয়েছিলো ওর বাবার সবাই আলোকে তখন দোষারোপ করেছিলো। আজ আলোর ভয় করছে বাবার মতো যদি আঁধারের কিছু হয়ে যায়। দেশে সড়ক দূর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে।


আলো তারাতারি কল ব্যাক করে। দুইবার রিং হওয়ার পর একজন রিসিভ করে। 


- আলোঃ হ্যালো আঁধার কোথায় তুমি।


অপর পাশ থেকে কেউ বললো,

- " জি আসলে এই ফোনের মালিক বাস চাপায় নিহত হয়েছে তার পকেটে দুইটা ফোন এইটাতে আপনার কল আসায় জানালাম। আপনি তার পরিবারকে জানিয়ে দিয়েন আর তারাতারি এসে পড়েন।আর.. "


ফোনটা কেটে গেলো।আলো যা ভেবছে তাই সত্যি হলো। ভয়ে সারা শরির কাপছে। বাসায় কাজ করা কাজের মহিলা আলোর রুমে এসে খাবার নিয়ে। আলো ঢলে পড়ে....


কাজের মহিলা রতনা খাবার রেখে আলোকে ধরে আর চিৎকার করে সবাইকে ডাকছে,


- রতনাঃ খালাম্মা গো জলদি আয়েনপোয়াতি বউ ফিট খাইছে।খালাম্মা ওই খালাম্মা...


রতনার ডাকে সবাই এসে আলোকে নিচে দেখে ওকে ধরে বিছানায় উঠালো। হাত পা ঢলছে। চোখে পানি দিচ্ছে।


১৫ মিনিট পর আলোর জ্ঞান ফিরে। আলো চোখ মেলে দেখে সে বিছানায় শুয়ে আছে আর তার পাশে আঁধার বসে আছে। আঁধারকে পাশে দেখে উঠে দুটি কিল বসিয়ে দেয়। 


- আলোঃ তোর ফোন কোথায়। আর তুই কাকে দিয়ে ফোন করিয়ে বলেছিস তোর এক্সিডেন্ট হয়েছে। (বলেই কিল ঘুশি দিতে লাগলো।)


আধার আলোকে থামিয়ে বললো,

- আঁধারঃ আরে আমি তোমার জন্য তরমুজ কিনে নিয়ে আসছি। বাসায় এসে দেখি রতনা আপা চিল্লাচ্ছে।এসে দেখি তুমি ফিট খেয়ে বসে আছো। পড়ে শুনলাম ফোন হাতে নিয়ে ফিট খেয়েছো।তোমার ফোন নিয়ে দেখি আমার নাম্বারে কথা বলেছো রেকর্ড শুনে বুঝলাম পকেট মার এক্সিডেন্ট হয়েছে আমি কি জানি নাকি যে আমার ফোন কখন পকেট মারলো।এসে দেখি ফোন নাই।


আলো আঁধারকে জড়িয়ে ধরলো। আলো অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। আঁধারকে হারানোর ভয়টা ঘিরে ধরেছিলো তাকে। আঁধার অনেক কষ্টে আলোকে শান্ত করে।


.

.

অবশেষে আঁধার ও আলোর দুইটি জমজ সন্তান হয় এক মেয়ে এক ছেলে। আঁধার ও আলো ভালোভাবেই জীবনযাপন করছে। 

--

----

শাওন নাকি বিদেশ চলে গিয়েছে।আজ শাওন একা। রুপার বিয়ে হয়েছিলো কিন্তু তার বর তাকে অনেক অত্যাচার করে। মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া কিছু করার নেই। রুপা কোনোদিন মা হতে পারবে না। পর পর দুটো বাচ্চা নষ্ট হয়েছে। এরপর আর বাচ্চা নিতে পারেনি। রুপার বর আরেকটা বিয়ে করে তার সেই স্ত্রীর ঘরে সন্তান হয়ে গিয়েছে। সে এখন কোনো রকম দিন পার করছে। রুপা আজ টের পাচ্ছে নিঃসন্তান থাকা কষ্ট আর অন্যকে কাজের অর্ডার দিলে কেমন লাগে। যারা অন্যের সংসার নষ্ট করতে চায় তাদের কোনো না কোন এক সময় তা নিজের কাছেই ফিরে আসে।আল্লাহ ছাড় দেন ছেড়ে দেন না।


আলোর কাজ ভালোই চলছে। সম্মানের সাথে আজ সে সংসার করছে। যেই বাচ্চার জন্য এক সময় কথা শুনতে হতো আজ সে দুই সন্তানের মা। যেখানে স্বামী ভালোবাসা পায় নি সেখানে আজ আলো আঁধারের কাছ থেকে ভালোবাসার অভাব নেই।ভালোবাসা, সম্মান, অধিকার কোনো কিছুর অভাব নেই আলো কাছে। যেখানে বাবার বাড়ির অবস্থা ভালো না বলে কথা শুনতে হতো আজ সেই বাবার বাড়ির অবস্থা আরো ভালো।সব মিলে শেষটা ভালোই হয়েছে। অবশেষে একটাই কথা আঁধারের_আলো হয়ে বাঁচতে চাই শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত।


  


. . . সমাপ্ত


(গল্পটা টেনে বড় করতে চাইনি। আমি যতটুকু ভেবে রেখেছি ততটুকু লিখেছি। আমি ওত ব্যাখ্যা দিতে পারিনি তাই অল্প কথাই শেষ করি। আমার লেখার ভুল ত্রুটির ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। যারা আমার ভুল গুলো ধরিয়ে দিয়েছেন আর আমার এই গল্পে পাশে ছিলেন তাদের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।আর গল্পটা ওইসব আলোর জন্য যারা অবহেলিত।গল্পে আলোর শেষ ভালো হয়েছে কিন্তু বাস্তবে এমন অনেক আলো আছে যাদের শেষ ভালো হয় না। কেউ কেউ মানিয়ে নেয়। কেউ তোহ মানিয়ে নিতে নিতে হেরে যায়। 


সবার জীবনে আঁধার নামে কেউ থাকে না। গল্প শাওনের চেয়ে অত্যাচারী পুরুষ আছে। আর আলোর মতো দাদীদের কাছে একটা প্রশ্ন তারা যদি কন্যা সন্তান দেখতে না পারে তাহলে তারা যখন জন্ম হয়েছে তখন কি ছেলে হয়ে জন্ম হয়েছিলো। সবাই বলে থাকে নিজের পায়ে দাঁড়াও।আসলে আমার মতে নিজের পায়ে দাঁড়ানো বলাটা অনেক সহজ করা খুবই কঠিন। আমি চাইবো আলোর মতো মেয়েদের তাদের সম্মান, ভালোবাসা,অধিকার সব জেনো পেয়ে থাকে। পুরো গল্পটা কেমন উপভোগ করলেন, সবাই মন্তব্য করবেন,ধন্যবাদ) ওর মতো পোলা তুমি পাইবা না। ওয় তোমারে যতডা বুঝে তা কেউ বুঝবো না।


দাদী কথা গুলো বলে চলে গেলো। ঠিকই তোহ আঁধার কতো কিছু করলো। আঁধার যে তার বলা কথা গুলো রেখেছে আর রাখে তাহলে আমি কেন আমার বলা কথা গুলো থেকে পালিয়ে যাচ্ছি। 


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url