অনুড়া
পর্ব___০২+০৩+০৪
নুপুর_মজুমদার_জবা
চৈতি নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে সেই যে বসে আছে তারপর তার কোন হেলদোল নেই একই জায়গায় রয়েছে বসে।ও কখনো ভাবতে পারেনি যে নিজের সব থেকে কাছের ভালোবাসার মানুষ যার জন্য তার পরিবারের হাত ছেড়ে এসেছিল সে তাকে এত জঘন্য ভাবে ঠকাবে।তাও আবার তার প্রেগনেন্সির সময়, বাচ্চাটার কথাও কি একবার ভাবলো না রাফাত?পরকীয়া সম্পর্কে কি এতই মত্ত হয়ে গিয়েছিল যে নিজের সংসার সন্তান পরিবারের কথা ভাবলো না? দেখতে ওকে পাগলের মত লাগছে যে কেউ সামনে থাকলে হয়তো পাগল বলেই আখ্যা দিত। চুলগুলো খোলা চোখের পানি শুকিয়ে মুখের দু গালের উপর রয়েছে। মাথায় কিছু একটা আসতেই চোখ গুলো বুজে আঁচল ঠিক করে নিলো।
বিছানার পাশের টেবিল থেকে ফোন হাতে নিলো,অনেক খোঁজার পর কল লিস্ট থেকে বাবা নামের সেভ করা নাম্বারটা দিকে চোখ তুলে তাকালো। ওখানে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে আজ থেকে তিন বছর আগেই শেষ কথা হয়েছে, তারপর আর এই নাম্বার থেকে কখনো ফোন আসেনি কিংবা দেওয়া হয়নি। বিষাদেরা আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরল চৈতিকে, এই মানুষটাকে আজ থেকে কতগুলো বছর আগে শেষ দেখেছে তার ইয়াত্তা নেই। এই রাফাতের জন্য নিজের পরিবার বাবা-মা ভাই সবাইকে ছেড়ে সবার সম্মান শেষ করে দিয়ে এসেছিল সে। কাপা কাঁপা হাতে ফোন লাগালো নিজের বাবাকে, ওপাশ থেকে স্পষ্ট রিং এর আওয়াজ হচ্ছে। একবার দুবার করে তৃতীয়বারের সময় অপর প্রান্তের মানুষটা ফোন তুলল, কাঁপা কাঁপা গলায় চৈতি কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারল।
__ আ..আব.. আব্বু, আসসালামু আলাইকুম আব্বু।শুনতে পারছো আমার কথা?
ওপাশ থেকে খানিকটা নীরবতার পরে জবাব এলো,
__জ্বি কে বলছেন?
__আমি তোমার মেয়ে আব্বু,আমি চৈতি।
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মিলন শেখের রুঢ় কন্ঠ ভেসে এলো,
__এক্ষুনি ফোন রাখো তুমি, আর আমার কোন মেয়ে নেই। আমার মেয়ে আজ থেকে কয়েক বছর আগে মারা গেছে। যখন আমার সম্মান নিয়ে খেলে অন্য আরেক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল।
__প্লিজ আব্বু এমন বলো না একবার একটু কথা বলো। বিশ্বাস করো আমি ভালো নেই, তোমার অভিশাপ লেগেছে বলেছিলে না কখনো আমি সুখী হতে পারব না। তোমার আর আম্মুর অভিশাপে আজ আমার সংসারটা শেষ হয়ে গেছে।
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে থমকে গেলেন মিলন শেখ। মেয়ের সাথে যতই রাগারাগি করুক না কেন তিনি কখনোই অভিশাপ দেননি নিজের মেয়েকে, কখনো নিজের রক্তকে কেউ শেষ করে ফেলতে পারে? না পারে না, যত যাই মুখে বলুক না কেন প্রতিটি বাবাই নিজের মেয়েকে সবসময় আগলে রাখে সবকিছু থেকে।দুনিয়ার সব সুখ মেয়ের পায়ের কাছে এনে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে সব বাবারাই।মিলন শেখ আজকে পারলেন না নিজের মেয়ের এমন করুণ আর্তনাদ শুনে কঠোর হয়ে থাকতে। মেয়ের কান্নাতে অস্থির হয়ে পড়লেন,
__চৈতি কি হয়েছে? আমাদের একটু খুলে বলতো। আর মনে রেখো আমি তোমাকে কখনোই অভিশাপ দেইনি যা বলেছি সবটাই নিজের কষ্টে।বাবা মা আর যাই হোক সন্তানের খারাপ চায়না কখনো এতটুকু মনে রেখো।
বাবার এতটুকু আদরে যেন আরো অস্থির হয়ে উঠলো চৈতির মন।গলা ভেঙে আসছে কান্নার তোপে,ফোনের ওপাশ থেকে মিলন যেন আরো একটি স্তম্ভিত হয়ে গেল। মেয়েটাকে কখনোই এতটা ভেঙে পড়তে দেখেনি সে,
__চৈতি তুমি কাঁদব ? না বলবে যে কি হয়েছে ? তোমার শরীর খারাপ? আজ এত বছর পর এসে নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ছে?
বাবার খোঁচাটা গায়ে মাখলো না সে,
__আব্বু।
__হু, বলো কি হয়েছে? আগে কান্না থামাও তারপরে কথা বল।
__একটু ভালোভাবে কথা বলবে আব্বু।
__ভালোভাবেই তো বলছি। এখন বল কি হয়েছে তোমার সাথে?
__ রাফাত আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ইমাকে বিয়ে করে ফেলেছে। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না এই শহরে এখন একা আমি পরিচিত কেউ নেই।
মেয়ের এরকম ভাঙা গলা এবং কান্নার সুরে বিচলিত হয়ে পড়লেন মিলন সাহেব। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কি শান্তনা দেবেন বুঝতে পারলেন না,
__এভাবে না করে একটু খোলাখুলি ভাবে সব বলো। ওই ছেলে কি সত্যিই তোমাকে রেখে আরেক বিয়ে করেছে? আমি প্রথমেই বলেছিলাম ছেলেটা ভালো না আমার কথা তো শোনোনি আমার পছন্দ করা ছেলে কি বিয়ের আসরে রেখে, ভুলে গিয়ে ওই ছেলেকে বিয়ে করলে।আচ্ছা এগুলো বাদ দাও তুমি এখন কোথায় আছো সেটা বল? মানে কোন জেলায় আছো?
__মাগুরা আছি আব্বু ইছাখাদা জায়গার নাম।
__আচ্ছা তুমি চিন্তা করো না এক্ষুনি না আসতে পারলেও কালকের মধ্যেই আসছি তুমি যে আমাকে বললে তাহলে রেডি হয়ে থেকো। ওই জানোয়ারকে আমি কালকে দেখবো সরাসরি পুলিশ নিয়ে আসছি।
আঁতকে উঠল চৈতি,
__এসব ঝামেলার কোন দরকার নেই আব্বু। তুমি শুধু এসো আর আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।আমার আর কিচ্ছু লাগবে না।আমি কোন ধরনের ঝামেলা চাই না আব্বু আমি চাইনা এই ধরনের কোন প্রভাব আমার শারীরিক অবস্থার উপর পড়ুক।
__এরকম লায় দিয়ে এক সময় এই ছেলেটাকে মাথায় তুলে ছিলে তুমি । আজকে এর পরিণাম দেখো তোমার সামনেই তোমার সাথে প্রতারণা করলো।
ফোন কেটে দিলো চৈতি, বিষাদের যন্ত্রণায় সারা শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগলো।চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরলো,সেদিন যদি রাফাতের কথায় ওর সাথে পালিয়ে না আসতো আজকে ওর জীবনটাও কতটা ভালো হতো। হয়ত পরিবার থেকে এমনভাবে কথা শুনতে হতো না এতটা অবহেলিত হতে হতো না। শুধু একটা কথাই মাথায় এলো কার জন্য এতদিন নিজের পরিবারকে দূরে সরিয়ে রাখলো?
#অনুড়া____০৩
#নুপুর_মজুমদার_জবা
স্বামীর দ্বিতীয় বউয়ের ভেজা চুল দেখে সকাল সকাল রাগ উগ্রে বেড়িয়ে আসলো চৈতির,কালকের পর থেকে ইমাকে দেখলেই ঘেন্নায় গা গুলিয়ে আসে ওর।ইমা ওর নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে কীভাবে পারলো ওর স্বামীর সাথে বিয়ে করার।এখন আর আফসোস হয় না যা হয় সেটা হলো দীর্ঘশ্বাস,যা প্রতিমুহূর্তে বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়।মনে হয় এখনই সবকিছু শেষ করে দিক,ইমাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে মন চায়।ইমা বোধহয় সকালে নাস্তা তৈরি করছিল রান্নাঘরে,চৈতিকে দেখে গা জ্বালানো হাসি দিলো।সেই সময়ই দেখা গেলো রাফাত আসছে লুঙ্গি আর হাফ হাতার একটা গেঞ্জি পড়ে,গলার কাছটায় লাল হয়ে গেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এগুলো কীসের চিহ্ন, আরেকদফা বমি পেলো ওর ঘৃণায়।আস্তে করে সোফা থেকে উঠে বেসিনে গিয়ে বমি করলো।একবার, দুবার করে পরপর চারবার বমি করে পড়ে দম নিলো।রান্নাঘর থেকে সবটাই খেয়াল করলো ইমা,হলরুম থেকে এগিয়ে চৈতির পাশে দাঁড়ালো রাফাত।ততক্ষণে চৈতির অবস্থা অবশ্য নাজেহাল,কাঁধে হাত রাখতেই এক ঝটকায় সেই হাত সরিয়ে দিলো চৈতি।
__কি হয়েছে চৈতি? এতোবার বমি করছো,ডাক্তারকে খবর দেবো? বেশি খারাপ লাগছে?
__তুমি আমার থেকে দূরে থাকো রাফাত।আমার তোমাকে একটুও ভালো লাগছে না,আরো বেশি বমি পাচ্ছে।
__এদিকে এসো, আগে তোমায় নিয়ে সোফায় বসাই নইলে বাচ্চা আর তোমার দুজনেরই ক্ষতি হবে।
__খবরদার রাফাত আমায় একদম স্পর্শ করবে না।আমার ওপরওয়ালার কসম তুমি আমায় স্পর্শ করলে একবারের জন্যও তোমায় ছাড়বো না আমি।
__আমার কথাটা অন্তত শোনো।এদিকে এসো.........
রাফাত এগিয়ে আসতেই দূর্বল শরীরে পেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা চৈতি একদলা থুথু ছুড়ে দিলো ওর দিকে।সরাসরি রাফাতের মুখের ওপর গিয়ে পড়ল সেই থুতুটুকু।রাগে হিতাহিত বিবেকবোধ হারিয়ে বসলো সে।এগিয়ে এসে চৈতি ধাক্কা দিয়ে বসলো,মুখের বাম গালে থাপ্পর বসাতেই ছিটকে দু হাত দূরে টেবিলের কোণায় গিয়ে পড়লো সে।উপুর হয়ে পড়ায় গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলো চৈতি,ততক্ষণে ভারী পেটটা আগলে রেখেছে সে।রক্তে পুরো টাইলস ভেসে যাচ্ছে, রাফাত কিছু বুঝে উঠতে পারলো না।এরই মধ্যে উপস্থিত হলো ইমা, চৈতিকে এমন কাতরাতে দেখে এগিয়ে গিয়ে পানি আনলো সে।রাফাতের দিকে ঘুরে তীক্ষ্ণস্বরে বলল,
__এগুলো কি করলে রাফাত ?
আমতা আমতা করলো রাফাত,
__দেখো ইমা আমি ইচ্ছে করে করিনি।নিজের রাগ না সামলাতে পেরে এমন হয়ে গেছে।
__এখন যদি বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়? চৈতির যা খুশি তাই হোক কিন্তু বাচ্চাটা তো আমাদের দরকার।তুমিতো জানো এই বাচ্চাটার জন্য কতগুলো মাস আমি অপেক্ষা করেছি?
__চলো ওকে এখনই একটা হাসপাতালে নিয়ে যাই নইলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বাচ্চার কোনো ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ।
__হ হু তাড়াতাড়ি করে ওকে কোলে ওঠাও রাফাত।যাই হোক বাচ্চাকে আমার চাইই চাই,এতে চৈতি বাঁচুক কি মরুক আমার কিচ্ছু যায় আসে না।
ততক্ষণে চৈতিকে কোলে করে বিল্ডিংয়ের লিফটে উঠে পড়েছে রাফাত আর ইমা।নিচতলায় এসে থামতেই তড়িঘড়ি করে গেটের সামনে গিয়ে পৌছাঁলো দুজন চৈতিকে নিয়ে।যখনই বের হতে যাবে তখনই সামনে পড়লেন মিলন শেখ সাথে চারজন পুলিশ অফিসারের সাথে।রাফাত প্রথমে না চিনলেও মিলন শেখ চিনে ফেললেন, কিন্তু রাফাতের কোলে রক্তাক্ত চৈতিকে দেখে মাথায় ওপর যেন বাজ পড়লো ওনার।ইমা বুঝতে পারলো বোধহয় কিছু তার জন্যই তাড়াতাড়ি করে একপাশ হয়ে দাঁড়ালো। রাফাত বিরক্তির সাথে বললো,
__আংকেল রাস্তা ছাড়ুন,দেখছেন একটা মানুষ অসুস্থ খারাপ অবস্থা তার ওপর এমন রাস্তা আটকানোর মানেটা কি?
রাগে কাঁপতে কাঁপতে মিলন শেখ চিৎকার দিলেন,
__আমার মেয়ের এ অবস্থা হলো কীভাবে? কি করেছো তোমার দ্বিতীয় বউ আর তুমি আমার মেয়ের সাথে? এই ছেলে জবাব দাও।
রাফাত ততক্ষণে ভয়ে তটস্থ গলা শুকিয়ে আসতে চাইলো ওর।যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয় ওর অবস্থাটাই তা হয়েছে, চৈতির বাবা যে পুলিশ নিয়ে এখানে আসবে তা ওর জানা ছিলো না।এমনকি চৈতির নিজের পরিবার সাথে যোগাযোগ আছে এ কথাও তো কখনো জানায়নি তাকে।আচ্ছা রাফাত আর ইমার বিয়ের কথাই বা কীভাবে জানলো? তাহলে কি কাল রাতেই চৈতি ওর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে? ভাবনার ছেদ হতেই কলারে হাত পড়লো তার,চৈতির বাবা রীতিমতো কাঁধ চেপে ধরেছেন।মিলন শেখ পুলিশ অফিসারের দিকে একনজর তাকিয়ে বললেন,
__অফিসার এ ছেলেকে আর ওর সাথে থাকা মেয়েটিকে এখনই গ্রেফতার করুন।নিশ্চিত আমার মেয়েকে ওরা দুজনই কিছু করেছে।
__বিশ্বাস করুন স্যার আমরা কেউ কিছু করিনি।ও নিজেই পড়ে গেছে,তখনই এমন হয়েছে।
চুপচাপ নিজেদের দোষ ঢাকতে তটস্থ হয়ে পড়লো রাফাত।এতো নিখুঁতভাবে মিথ্যাকে সত্যি বলে চালাচ্ছে যে পুলিশরাও ধরতে পারলো না আসল কাহিনি।রাফাত নিজেও ভয়ে আছে যদি একবারও সুস্থ হয়ে ফিরে চৈতি তাহলেই সব সত্যি সামনে চলে আসবে।তখন কি হবে? তখনতো কেউ আটকাতে পারবে না।
ওদের দুজনকে আটকিয়ে নিজস্ব গাড়িতে করে হাসপাতাল অব্দি নিয়ে পৌঁছালেন পুলিশ অফিসার মেহমুদ। ততক্ষণে চৈতিকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে,বাড়ির লোকদেরও ফোন করে আনা হয়েছে হাসাপাতালে।
চৈতির মা এসেই প্রকট চিৎকার দিয়ে হাসপাতালের করিডোরে এসে উপস্থিত হলেন।কান্নাকাটি, হুলস্থুল লেগে গেলো কিছু মুহুর্তের মধ্যেই।নিশ্চুপ বারান্দা মুহুর্তের মধ্যে পরিণত হলো শোকের গভীর ছায়ায়।
#অনুড়া___৪
#নুপুর_মজুমদার_জবা
হাসপাতালের মধ্যকার পরিস্থিতি তখন উত্তাল,ডাক্তার দুজন ওটিতে ছিল। এরই মধ্যে একজন এগিয়ে বাইরে আসলো,চৈতির মা বাবা দুজনেই অপারেশন রুমের বাইরে ছিল। আশেপাশে গুটি চারেক পুলিশের লোকও ছিল।দুটো চেয়ারে রাফাত আর ইমাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে মূলত ওরা কি করেছে তা ততক্ষণ জানা সম্ভব না যতক্ষণ না চৈতি নিজ মুখে কিছু বলবে বা সরকারি স্বীকারোক্তি দেবে।
মিলন শেখ থম মেরে বসে রইলেন,নিজের মেয়েকে ঐ অবস্থায় রক্তাক্ত দেখে ওনার রুহ অব্ধি কেঁপে উঠেছে।উনি কখনো ভাবেইনি যে নিজের মেয়েকে এ অবস্থায় দেখবেন,বড্ড আদরে মানুষ করেছিলেন তিনি।কিন্তু নিজের মেয়ের এমন পরিণতি মানতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে, আর যাই হোক মেয়ের এমন অবস্থার জন্য তিনি নিজেও শতভাগ দায়ী।চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ওনার, এরইমাঝে এক মহিলা ডাক্তার এগিয়ে আসলেন কিছু কাগজসহ।সাবলীল গলায় ডাকলেন,
__আপনি কি রোগীর কেউ হন আংকেল?
__........
__আংকেল শুনছেন? এই যে...
পুলিশ অফিসারের ইশারায় চুপ হয়ে গেলো মহিলা ডাক্তার।মেহমুদ এগিয়ে এসে মিলন শেখকে আলতো স্বরে ডাকলেন,
__মিলন সাহেব!! মিলন সাহেব, এদিকে তাকান।
দরাজ কন্ঠের ডাক শুনে সম্বিত ফিরলো ওনার,মেহমুদ স্পষ্ট দেখলো ওনার ভেজা চোখদুটো।সেখানে স্পষ্ট এক নিঃস্ব বাবার আর্তনাদ যেন ঐ চোখদুটিই বহিঃপ্রকাশ করছে।এক বুক আশা নিয়ে ঐ অপারেশন রুমে লাল জ্বলে থাকা আলোর দিকে চাহনি নিক্ষেপ করে আছে।ওপরওয়ালার ভরসায় যে তার ময়ে এক্ষুণি ফিরবে আবারো বাবা বলে ডাকবে।
__হ হু বলুন অফিসার।
নিঃশ্বাস ফেলে হাতের কাগজটা এগিয়ে দিলো মেহমুদ।জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি,সামনে থাকা পুলিশটি বোধহয় বুঝলেন।
__মিলন সাহেব কাগজটায় একটা সাইন করে দিন।হাসপাতাল কতৃপক্ষেরা অনুমতি চায়।
__কীসের জন্য?
__আপনার মেয়ে সাত মাসের গর্ভবতী ছিল। সম্ভবত কোনো শক্ত জিনিসের ওপর ধাক্কা খাওয়ায় পেটের বাচ্চাটা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।এই কারণে ওনারা বন্ড পেপারে আপনার স্বাক্ষর চায়,মা কিংবা সন্তানের মধ্যে একজন মারা গেলে এতে কতৃপক্ষের কোনো দায় থাকবে না।
চৈতির বাবার পরিবার থেকে যারা এসেছিলো তারা সবাই অবাকের শীর্ষে পৌছালো,তারা তো জানতোই না যে চৈতির বাচ্চা হবে তা আবার সাতমাস।
চৈতির মায়ের আহাজারি আরো বেড়ে গেলো,মা হয়ে আজকে জানতে পারলেন যে, তার মেয়ে মা হতে যাচ্ছিলো কিন্তু নিয়তির এমন এক পরিহাস যে নিজের মেয়েকে এমন পরিস্থিতিতে দেখতে হচ্ছে। বড্ড অসহায় লাগছে আজকে নিজেকে, যদি মেয়ের প্রতি রাগ অভিমান কমিয়ে নিজের কাছে নিয়ে রাখতেন এই সময় তখন বোধহয় এমন দুর্ঘটনা ঘটতো না। ততক্ষণে স্বাক্ষর করে দিয়েছেন মিলন শেখ, যত যাই হয়ে যাক এই মুহূর্তে একটু সময় দেরি করা মানেই হলো সময়ের অপচয়। আবারো ওটির লাইট জ্বলে উঠলো,নতুন এক সূচনা এবং কিছু পাওয়া না পাওয়ার কথাগুলো আবারো আসবে।
_________________
মাথা নিচু করে এক পাশে বসে আছে রাফাত আর ইমা।এখন এই যে অনুসূচনায় ভুগছে যে সে নিজের সন্তানকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল একটু আগে।আসলেই কেউ এতটা নিকৃষ্ট হয়ে গেছে যে নিজের সন্তানকে মারতেও দুইবার হাত কাঁপলো না? এবার নিজের রাগ আর একটু হলেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, অন্যদিকে ইমা তখন থেকে মূর্তি বনে আছে। ইমা নিজেরই চিন্তা করছে যদি এবার পুলিশের হাতে সব প্রমাণ লেগে যায় তাহলে রাফাতের সাথে ওকে নিজেরও জেলে যেতে হবে। আর যাই হোক একটা ছেলের জন্য সে নিজের জীবনকে এইভাবে নষ্ট করতে পারবেনা। রাফাতকে শুধু তার ভালো লাগতো কিন্তু আস্তে আস্তে সেটা কখন যে জেদে পরিণত হয়ে গিয়েছিল তা কখনোই বুঝতে পারেনি। যখনই সেই রাফাত আর চৈতির সঙ্গে দেখা করতে আসত তখনই দেখতো যে কতটা যত্নশীল ছিল চৈতির প্রতি রাফাত।আর এই একটা জিনিসের জন্যই বারবার ওর হিংসে হতো, ও নিজেও চাইতো জীবনে যা যা চৈতি পেয়েছে সে সব জিনিস যেন ওর কাছেও থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের প্রাণের ভয় ঢুকে গেছে ওর মধ্যে যদি এই মুহূর্তে পালিয়ে না বাঁচে তাহলে হয়তো রাফাতের সঙ্গে জেলে যেতে হবে।রাফাত মাথা নিচু করে সেই তখন থেকেই বসে আছে চেয়ারে।মেহমুদ বোধ হয় তখন দুজন সহকারী পুলিশ কর্মীকে নিয়ে ওদের দুজনের সামনে দাঁড়ালো। মাথা উঠিয়ে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করলো ইমা।জোরালো কন্ঠের আঘাত করল রাফাতের কানে,
__আসসালামু আলাইকুম রাফাত আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে,চলুন এখন।
__বুঝলাম অফিসার কি কারণে আমায় যেতে হবে থানায়?
__কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেসাবাদ করা হবে ফর্মালিটি হিসেবে। সেগুলোর জবাব দিয়েই চলে আসবেন।
__আনার ওয়াইফের অবস্থা ভালো না স্যার। কীভাবে ওকে একা ফেলে যাবো?
ধূর্ত হাসি হাসলো মেহমুদ,ঐ হাসিটা যতটা না প্রাণবন্ত তার থেকেও বেশি ভয়ংকর কিছুর আভাস দিচ্ছিলো।রাফাত সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকালো। মেহমুদ বুঝি কমলো না,সরাসরি হুঙ্কার দিলো,
__আপনায় ভালোভাবে বলছি আমাদের সাথে চলুন।আর কীসের ওয়াইফ? হ্যাঁ,আপনার ওয়াইফ যদি অপারেশন থিয়েটারে থাকা চৈতি শেখ হয় তাহলে উনি কে?
পাশে থাকা ইমার উদ্দেশ্যে যে কথাগুলো বলা হয়েছে তা বুঝতে আর দেরি হলো না রাফাতের।সে বুঝতে পারল এই মুহূর্তে পরিচিত হাতের বাইরে বের হয়ে যাবে তখন আর কারো কিছু করার থাকবে না। আর যেহেতু সরকারি আইন অনুসারে দ্বিতীয় বিয়ে করা সম্ভব নয় এই কারণে তার শাস্তি হতে পারে। এখানে তার প্রথম স্ত্রী বেঁচে থাকতে তার অনুমতি বিহীন বিয়ে করাতে ইসলামেও জায়েজ না।ইমার দেখে নিস বলক চোখে থাকে সরাসরি অস্বীকার করল রাফাত,
__এ মেয়ে আমার কিচ্ছু না।ও শুধুই আমার ওয়াইফের জাছের বান্ধবী তাছাড়া ওর সাথে আমাদের ব্যক্তিগত কোন ধরনের সম্পর্ক নেই যার দরুন আপনারা আমায় হ্যারাস করতে পারেন।সুতরাং আবার অনুরোধ আপনারা আমায় আর কোনরকম বিরক্ত করবেন না। আমার স্ত্রী সুস্থ হয়ে গেলে আপনারা বুঝতে পারবেন যে আসল সত্যিটা কি।
এই ধরনের সরাসরি প্রত্যাখানে থেকে বিস্মিত হল ইমা,ওর ধারণার বাইরে ছিল যে রাফাত এত নোংরা মানসিকতার এক মুহূর্তের মধ্যে কিভাবে সম্পর্ককে ঘুরিয়ে দিল। কখনো ভাবিনি যে নিজের বিবাহিত বউকে অস্বীকার করবে রাফাত, অন্তত রাফাতের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এই আচরণ যায় না। তাহলে কিছু ভুল মানুষকে ভালোবেসে ছিল? নাকি আস্তে আস্তে চৈতিকে হিংসা করতে করতে আজ তার এ পরিণতি?এই মুহূর্তে যা অবস্থা যদি বাড়ি ফিরে যায় তাহলে ইমাকে কখনোই তার পরিবারব গ্রহণ করবে না,বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে রাফাতের হাত ধরে এই অব্দি এসেছিলো।
তির্যক চাহনি নিক্ষেপ করলো মেহমুদ,
__আপনার ওয়াইফ সুস্থ হলে এমনিতেও সব সত্যি সামনে চলে আসবে তখন বোঝা যাবে কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যা বলছে।
নিজের মধ্যে শতভাগ কনফিডেন্স নিয়ে আসলো রাফাত,এই করতাছে অনেক আগে থেকে আগে থেকে এনেছিল। যদি মানুষ কোনো প্রকার মিথ্যেকে সম্পূর্ণ কনফিডেন্স এর সঙ্গে বলতে পারে তাহলে সেই মিথ্যে তাকেই কেন জানি সত্য বলে মনে হয়। আর সত্যি কথা বলতে আলতাফতা করলে সেটাই আস্তে আস্তে মিথ্যা কথায় পরিণত হয়। এই কারণেই মিথ্যা বলতে হলেও পুরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে হবে তাহলে কখনোই সেই মিথ্যা গ্রহণযোগ্যতা পায় না সমাজের চোখে। রাফাত ভালে মতই জানে যে আর যাই হোক ইমা কখনো ওর বিরুদ্ধে মুখ খুলবে না,কারণ এবার নিজের প্রাণের ভয় আছে।ইমা যে কি বাজে, কতখানি ধূর্ত রাফাত অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু ওকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করে নেবে এই ব্যাপারটা রাফাত ভাবতে পারেনি।ও ভেবেছিল যে হয়তো অন্যান্য সম্পর্কের মত টাইম পাস করেই ইমাকে ছেড়ে দেবে তাহলে আর কোন ধরনের ঝামেলা হবে না।
কিন্তু ইমা আত্মহত্যা করার নাটক করে নিয়ে গিয়েছিল রাফাতকে ওই নিজের বাসাতে। এক সময় কথা কাটাকাটি করে সিডিউজ করে ফেলেছিল নিজের প্রতি ঠিক সেই সময় বাইরের কয়েকজন লোক এসে জোরজবরদস্তি করে বিয়ে করিয়ে দেয় ওদের।
চলবে
