#নুপুর_মজুমদার_জবা
কতক্ষণে হাসপাতালের প্রতিটি জায়গা নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। একজন মহিলা ডাক্তার মুখের মাস্ক খুলে ওটি এবং অপারেশন রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন বাইরে। চৈতির পরিবারের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে এগিয়ে দিলেন তোয়ালে মোড়ানো একটি সন্তানকে। যন্ত্র মানবের মত বলে উঠলেন তিনি,
__আমরা বাচ্চাকে বাঁচাতে পারিনি। ওনার পেটে দুটো ফিটাস ছিল, অপরিণত হওয়ার কারণে একটি কে বাঁচানো গেলে অপরটি পেটের ভেতরে থাকা অবস্থায় মারা গেছে।
অবাকতায় যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল সবাই। চৈতির মা কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের নাতিকে ছুঁয়ে দিলেন, আস্তে করে নিজের কোলে উষ্ণতায় ঢাকলেন তিনি। ছোট বাবুর হাত পা চোখ দুটো কতটা স্নিগ্ধ ছোট ছোট। আঙুল না দিয়ে ইশারা করছে, চোখ দুটো বোধহয় খুলতে পারছেনা।চামড়াগুলো একেবারেই নরম এবং লালচে রঙের। ধরলেই নরম হয়ে যাচ্ছে তুলোর মত একেবারে। নাতির কপালে চুমু খেলেন আস্তে করে।
মহিলা ডাক্তার টি এগিয়ে এসে কিছু কাগজপত্র দিয়ে গেলেন ফর্মালিটির জন্য।
__আমার মেয়ে কেমন আছে ডাক্তার ? ও সুস্থ আছে তো?
__জ্বি না ওনার অবস্থা এখনো স্বাভাবিক নয়। বরং আগের থেকেও বেশি খারাপ অবস্থা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে তবু আমরা ব্লাড ব্যাংক থেকে ২ ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে এনেছি। ওনার বেবি ও তেমন সুস্থ নয় আমরা এক্ষুনি ওকে বেবিদের ইউনিটে নিয়ে যাব।
__কি বলছেন এসব আমার মেয়ে এখনো ঠিক হয়নি?
__না উনি এখনো সুস্থ হয়নি ওনার ধাক্কাটা খুব জোরালো ভাবে লাগার কারণে পেটের বাঁ পাশে আঘাত লাগে। যার কারনে বাঁ পাশে থাকা বেবির পজিশন উল্টে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়।আর বাচ্চাটা সেই সময়ই নিজের প্রাণ ত্যাগ করে।
চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো মিলন শেখের, নিজের একমাত্র মেয়ের সন্তানকে নিজ হাতে ছোঁয়ার আগেই সে দুনিয়া ত্যাগ করল। এটা যখন চৈতি জানতে পারবে তখন বোধ হয় বাঁচতেই পারবে না। এই অবস্থায় চৈতির মাথায় কত বড় প্রেসার পড়বে? কাগজপত্র স্বাক্ষর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিলা ডাক্তার টি কাগজপত্র আর বাচ্চাটিকে নিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে অবশ্য বারবার সাবধান করলেন কেউ যেন এই মুহূর্তে চৈতিকে দেখতে না যায় কারণ তাকে বেডে দেওয়া হয়েছে রেস্ট করার জন্য, আর বাচ্চাটা মারা গেছে এটা যদি জানতে পারে তাহলে অনেক বড় একটা ধাক্কা লাগবে। সুতরাং মায়ের সুস্থতার জন্য এবং যে বাচ্চাটা এখন বেঁচে আছে তার জন্য হলেও চৈতিকে সুস্থ থাকতে হবে।
ডাক্তারটি চলে যেতেই হাফ ছেড়ে বাঁচলেন মিলন শেখ ও তার বউ। মিলন শেখ নিজের বউকে ডেকে আনলেন পাশে,
__শোনো তুমি চৈতিকে এসব বলো না বুঝলে? মেয়েটা এমনিতেই গভীর শোকে রয়েছে তার পর যদি নিজের বাচ্চাটা মারা গেছে জানতে পারে তাহলে বোধহয় বাঁচবেই না। এর থেকে ভালো তুমি কিংবা আমরা কেউ ওকে জানাবো না যে ওর আরেকটা বাচ্চা হয়েছিল। তুমি কিন্তু ভুলে ওর সামনে এ ধরনের কথাবার্তা বলে ফেলো না? ঠিক আছে?
শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখদুটো ভালো করে মুছে নিলেন চৈতির মা। তিনি নিজেও বোঝেন মা হয়ে সদ্য সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কতটা ভয়ানক, নিজে একজন মা তো এই কারণে বুঝতে পারছেন ভালো করে যে চৈতির অবস্থা কেমন হবে। চৈতিকে ঐরকম রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তার নিজেরই আত্মা কেঁপে উঠেছিল সেইখানে নিজের সন্তানের মারা যাওয়ার খবর শুনলে চৈতি পাগল পাগল হয়ে যাবে এতটুকু নিশ্চিত। এমনিতেই মেয়েটা বেশি আবেগী এবং আবেগের বসে একটা ভুল করে ফেলেছিল এখন তার জন্যই পস্তাতে হচ্ছে।
অফিসার মেহমুদ এগিয়ে আসলেন তাদের ভেতর, অনেকটা সময়ই হাসপাতালে তিনি কাটিয়েছেন এই চৈতির কেসটা নিয়ে।
__মিলন সাহেব, দেখুন আমাদের নিজেদেরও একটা চাকরি আছে আমরা চাইলেই তো আর থাকতে পারিনা। এই কারণে আমি বলছিলাম কি আমরা এখন সবাই চলে যাচ্ছি, যেকোনো সমস্যা হলে আপনি আমাদের জানাবেন।
চোখ তুলে তাকালেন মিলন শেখ,
__চলে যাচ্ছেন? তাহলে ওই দুইজন জানোয়ারের কি হবে যারা আমার মেয়েটাকে ঠকালো এইভাবে ভেঙেচুরে দিল?
__দেখুন আপনার মেয়ে যতক্ষণ না জ্ঞান ফিরছে ততক্ষণ আমরা বুঝতে পারবো না প্রকৃত ঘটনা কি। এভাবে সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে তো আটকে রাখা যায় না? আর আপনি যাকে সন্দেহের বশে আটকে রাখতে বলছেন অর্থাৎ আপনার মেয়ে জামাই, সে নিজেও একজন সরকারি চাকরিজীবী। আমরা যদি তাকে অহেতুক ভিত্তিতে এভাবে করে বিরক্ত করি তাহলে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারেন। উনি নিজের সন্তান এবং স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। আমি আশা করব আপনি অন্তত এই দিকটা বিবেচনা করবেন। সুতরাং আজকের মত আমাদেরকে যেতে হবে, আসসালামু আলাইকুম ভালো থাকবেন।
___জি বুঝতে পেরেছি তাহলে আজকের মত আপনি যান স্যার।
__চলে যাচ্ছি বলে ভাববেন না একেবারে সব শেষ করে যাচ্ছি আবারও আপনার কোন সমস্যা হলে একবার কল করে জানাবেন। আমি না থাকলেও আমার জায়গায় দায়িত্বরত অফিসার অবশ্যই সাহায্য করবে।
__জ্বি ধন্যবাদ স্যার।আমার জন্য এতোটুকু করার কারণে আপনার যতবার শুকরিয়া আদায় করব ততবারই কম।
স্মিত হাসলেন মেহমুদ,
__আরে আপনি আমার বাবার বয়সী মানুষ এইভাবে ধন্যবাদ দেবেন না। আমার নিজের কাছেই তাহলে নিজেকে ছোট মনে হবে, আমি শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেছি।
মেহমুদসহ বাকি তিনজন পুলিশ সদস্য নিজেদের মতো করে বেরিয়ে গেলেন।
____________________
ওয়েটিং রুমে রাফাত এবং ইমাকে এতক্ষণ যাবত বসিয়ে রাখা হয়েছিল। যখন রাফাতের কানে গেল তার একটা ছেলে হয়েছে সেই সময় এসে মনে মনে কবুল বলল এবং দোয়া চাইলো উপরওয়ালার কাছে। ইমাকেও খবরটা জানালো সে, কথাটা ইমা শুনতেই বলে উঠলো,
__যাক বাচ্চাটা যে সুস্থ আছে এই অনেক। এবার দেখো বাচ্চাটার কাস্টরি কোনমতে তুমি নিতে পারো কিনা?
ভ্রু কুচকে ইমার দিকে তাকালো রাফাত,
__কাস্টড়ি আমি নেব মানে? বাচ্চাটা তো আমারই আমাদের সাথেই থাকবে।
__কেন তুমি চৈতিকে ডিভোর্স দেবে না?
__আমি চৈতিকে ডিভোর্স কেন দিতে যাব? ও আমার বউ এবং ওর পেটে যে সন্তানটা জন্ম নিয়েছে সেটাও আমার। তাহলে এখানে ওকে ছাড়ার প্রশ্নটা আসে কোথা থেকে? ও সুস্থ হলে ওকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে যাব।
__তার মানে তুমি চৈতির সাথে সংসার করবে তাহলে আমি কে?
এমন অসময়ে এই প্রশ্নটাই বড্ড রাগ হলো রাফাতের বিরক্তির সঙ্গে এবার ইমার দিকে তাকালো,
__তুমিও আমার বউ কিন্তু চৈতি আমাার বাচ্চার মা।আর তুমি এতো অবাক হচ্ছো কেন?তুমি তো শুরু থেকেই জানতে যে আমি বিবাহিত তাহলে সতীর নিয়ে সংসার করতে তোমার সমস্যা হওয়ার কথা না তো?
এতক্ষণে ইমার মাথায় পুরো ব্যাপারটা একেবারে পরিষ্কার হলো, মানে রাফাত ওকে রাখবে সাথে আবার চৈতিকেও রাখবে? মানে এত সস্তা একসঙ্গে দুটো মেয়ের সঙ্গে থাকবে? দুজনকেই ব্যবহার করবে, যেন তারা কাজের লোক। পুরুষ মানুষ বলে কত সস্তায় না এমন নিদারুণ কাজ করতে পারছে, আদৌ কি ওর কোন অধিকার আছে এইভাবে দুটো মেয়ের জীবন নষ্ট করার। লাগে শরীর টগবগ করে উঠলো ইমার। কিছু করা কথা শুনিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই যাচ্ছিল এমন সময় পুলিশ অফিসার মেহমুদ ভেতরে আসলো।
__আসসালামু আলাইকুম রাফাত সাহেব। আশা করি ভালো আছেন ?
মাথা উঁচিয়ে উপরের দিকে তাকালো রাফাত,পুলিশ অফিসার কে দেখে ইমা চুপ হয়ে গেছে। পুলিশ সম্ভবত ওদের বিয়ে করার ঘটনাটা জানে না, জানলে এতক্ষণে রাফাত আর সে নিশ্চিন্তে বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারত না এভাবে। যদিও অবশ্য চৈতির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনার পর থেকে বাইরের ঘোরাঘুরিও মানা শুধু এই ওয়েটিং রুমে বসে কাটাতে হয়েছে।যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়েছে তাহলে কাউকে বললেই পানি কিংবা হালকা নাস্তা এনে দিয়েছে, শুধু ভয়ে গলা দিয়ে নামেনি সে খাবার। রাফাত মুখে একটু আলগা হাসি আনলো,,
__জি স্যার বলুন।
__যেহেতু আপনার স্ত্রী সুস্থ হয়নি আর তার পরিবার অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী আপনার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা।আপনার স্ত্রীর থেকে জগৎ মধ্যে না নেওয়া উক্তি আমরা কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছি না। সেও তো আপনাকে আমরা অব্যাহতি দিলাম , বিনা নোটিশে কিন্তু আপনি এবং ইমা ইসলাম দুজনের একজনও এ শহরের বাইরে যেতে পারবেন না দরকারই কোন কাজ ছাড়া। আর যদি বাইরে যেতেও হয় তবু আমাদেরকে সেটা জানিয়ে যাবেন প্রমাণসহকারে।
__জ্বি অবশ্যই।যেহেতু আমি সরকারি চাকরিজীবী মানুষ এই কারণে আমাকে প্রতি মাসে বাইরে যেতেই হয় কোন না কোন কাজের সূত্রে,সেহেতু আপনাদের আমার জন্য একটু হলেও কনসিডার করা উচিত।
__আপনি চাকরিজীবী এটা জেনেই আমি আপনাকে সরাসরি আটকে রাখিনি। কিন্তু আপনারা অভিযুক্তের তালিকা থেকে কিন্তু বাদ যাননি। সুতরাং নিজেরা প্রচন্ড সাবধানে থাকবেন যদি সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় তাহলেই কিন্তু আমরা আপনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।
__জি বুঝতে পেরেছি। আমার ওয়াইফ কেমন আছে এই মুহূর্তে?
__ও হ্যাঁ তিনি অবশ্য সুস্থ আছেন কিন্তু ভালো আছেন কিনা সেটা বলতে পারি না। আর আপনার দুটো সন্তান হয়েছে, একজন মারা গেছে পেটে থাকা অবস্থায়। আর আর একজন রয়েছে বেবিদের কর্নারে, ওর সম্ভবত শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকায় অক্সিজেন দেওয়া লাগছে।
__সুবহানাল্লাহ, উপরওয়ালার কাছে শত শত শুকরিয়া। ধন্যবাদ স্যার আমাকে এত সুন্দর একটা খবর দেওয়ার জন্য।
অফিসার মেহমুদ ততক্ষণে নিজের সহকর্মীদের নিয়ে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। ইমা এগিয়ে এসে রাকাতের কাঁধে হাত রাখলো,
__এখন তুমি কি করবে? আমি বলি কি তুমি চৈতিকে ডিভোর্স দিয়ে দাও।
__নিজের অবান্তর কথা গুলো বন্ধ কর।
__মানে এখন তোমার মনে হচ্ছে আমার সব কথাগুলো অবান্তর, এখন আমার কোন দাম নেই তোমার কাছে?
__তুমি প্রতিটা কথাকে কেন নিজের দিকে ঘুরিয়ে নাও ইমা?বিয়ের আগে তো এমন ছিলে না, তোমার সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে এই ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টার মধ্যেই তুমি যেন কেমন করে অপরিচিত হয়ে গেলে। বিয়ের আগে তো সবসময় ভালোবাসি ভালোবাসি বলে মুখে ফেনা তুলতে।
__তো তুমিও তো বিয়ের আগে সবসময় আমার প্রতিটা কথা শুনেই চলতে বিয়ের পর থেকেই দেখছি নিজের মত এবং প্রথম বউ নিয়ে বেশি মাথাব্যথা। এতটা যত্ন তো আমার প্রতি দেখিনি কখনো। নাকি নতুন নতুন মেয়ে দেখলেই তোমার ভেতরের এইসব জেগে উঠে?
মারতে গিয়েও হাত নামিয়ে ফেলল রাফাত, ওয়েটিং রুমের মধ্যে তখন এই দুজন ব্যক্তি প্রবেশ করছিল হয়তো কোন রোগীর পরিবারের কেউ হবে? কিন্তু ওই দুজনকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই রাফাত রেগে বাইরে বেরিয়ে গেল, ইমা বোধহয় ততক্ষণের আগে ফুঁসছে। এবার পরিকল্পনায় আট ঘাট বেঁধে টানতে হবে এই রাফাতকে ও নিজের অবস্থান দেখেই ছাড়বে, একজন সাধারণ সরকারি চাকরিজীবী হয়ে ও কিভাবে এত ভাব করতে পারে? আবার ওর গায়ে হাত দিতে এসেছিল, কত বড় সাহস? এবার এই ছেলেকে বোঝাবে কতগুলো থাকে কত চাল হয়। কিমাতো ভেবেছিল হয়তো রাফাতকে বিয়ের পর ওকে নিয়ে রাফাত আলাদা থাকবে আর চৈতিকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে। পরে কিছু কিছু করে হলেও বাচ্চাটার কাস্টরি নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেবে। কারণ ইমা কখনোই মা হতে পারবেনা, তাই একটা বাচ্চাকে অনাথ আশ্রম থেকে আনার চেয়ে রাফাতের প্রথম বউয়ের সন্তানকেই নিজের বাচ্চার পরিচয় বড় করাটা শ্রেয়।
#চলবে#অনুড়া___০৬
#নুপুর_মজুমদার_জবা
ইমার পাশে রাফাত এসে বসলো,এক কাপ চা এগিয়ে দিলো সে।খানিকক্ষণ আগেই বাড়িতে এসেছে দুজন,এসেই গোসল সেরেছে। হাসপাতালে থাকতে থাকতে সেইখানকার ওষুধ এবং ফিনাইলের বিশ্রী ঘ্রাণে সারা শরীর যেমন অলস হয়ে আসছিল, ঠিক তেমনই বমি পাচ্ছিলো।
__চা টা খেয়ে নাও তারপর রান্না বসাও।
__মানে? আমি কেন রান্না করবো? আর তাছাড়াও আমার শরীর ভালো না, আমি পারবো না।
__তাহলে অফিসে যাবো কীভাবে? না খেয়ে?
__আগে কিভাবে যেতে? ঠিক এভাবেই এখনো যাবে।
__আগে তো সবসময় চৈতি রান্না করে দিতো তখন আর আমায় চিন্তা করতে হতো না।এখন তো আর চৈতি নেই যে সব কিছু গুছিয়ে হাতের কাছে রেখে দেবে।
__কেন তোমার আফসোস হচ্ছে?
__তা হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়? তোমার থেকে হাজারগুণ বেটার ছিলো চৈতি,আমার কাজগুলো অন্তত করে রাখতে পারতো।
রাগে ইমার মেজাজ সপ্তম আকাশে উঠে গেল এই সময়,আজকাল রাফাতের মুখে চৈতির কথা শুনলেই রাগে কিলবিল করে ওঠে ওর।
__তাহলে আমায় বিয়ে করলে কেন?
__তা তুমি খুব ভালো করেই জানো।রোজ রোজ ফোর্স করতে আমায় তুমি বিয়ে করার জন্য,রোজ আত্মহত্যার ভয় দেখাতে।
__তো কি করতাম চৈতিকে রেখে যেমন আমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলে তেমন আরেকজনের সাথে জড়াবে তাই দেখতাম নিজের চোখে? তোমার মতো পরকীয়া করা মানুষের থেকে এর বেশি কি আর আশা করা যায়?
রাগে দিশেহারা হয় হিসহিসিয়ে ইমার চিবুক চেপে ধরলো রাফাত,এতোটাই জোড়ে চেপে ধরেছে যে এক্ষুণি ভেঙে যাবে মুখের চোয়ালটা।শক্তপোক্ত পুরুষালী হাতের এমন আঘাতে ব্যাথায় ছিড়ে আসতে চাইলো ইমার চোয়াল।ইমা যখন ঠিক পেল যে এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই, ঠিক এমন সময় একটা অদ্ভুত কান্ড করে বসলো।
রাতে দুই পায়ের ফাঁকায় অণ্ডকোষে লাথি বসিয়ে দিলো।ব্যাথায় হুরমুর করে সরে গেলো রাফাত,ইমার চোয়াল থেকে হাত সরিয়ে ছিটকে পড়লো সাদা ফকফকা টাইলসের ওপর।
ইমা নিজেও ছাড়া পেয়ে শ্বাস টানতে লাগল, রাফাতের মুখ ব্যথায় নীল হয়ে এসেছে। ইমা সেদিক তাকিয়ে অন্যরুমে যাওয়ার জন্য দৌড় দিলেই, চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে ফেলে এলোপাথারি মারতে লাগলো রাফাত।
__ নোংরা বস্তির মেয়ে, তুই কি ভাবলি যে এতো সহজেই তোকে ছেড়ে দেবো? এতো সস্তা,তোকে এই জাহান্নামে তিলে তিলে মারবো।খুব শখ না তোর বউ হবি আমার? আমার বউ আছে জানা সত্বেও আমাকে বিয়ে করলি? নিজের চরিত্র খারাপ আবার আমাকে বলিস আমি পরকীয়া করেছি তোর সাথে ? তুই যেহেতু এতো ভালোবাসা এতো সাধু পরিবারের মেয়ে তাহলে আমার মত বিবাহিত এক বাচ্চার বাবাকে ভালবাসলি কেন?
চুলের মুঠি চেপে ধরার কারনে নিঃশ্বাস আটকে আসছে ইমার, শ্বাস টানতেও বোধহয় কষ্ট হচ্ছে। এদিকে রাফাতের মধ্যে দানব ভর করে আছে, সে থানছে না তো থামছি না। যত রাগ রয়েছে সবটাই আজকে উপড়ে দিয়েছে।যখন দেখা গেল যে এইমাত্র চোখ বুজে এসেছে সেই সময় রাফাত তাকে ছেড়ে দিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল অফিসে যাওয়ার সময় হয়েছে, তখনই বাথরুমে গিয়ে নিজের জামা কাপড় পাল্টে নিল।
_______________
হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে চৈতি, ডাক্তার তাকে একেবারে রেস্ট নিতে বলেছে। আগে থেকে আপাতত সুস্থ অনেকটা রক্ত দেওয়ার কারণে শরীর এখনো দুর্বল রয়েছে। বাচ্চাটাকে চৈতির কোলে দেওয়া হয়েছে পাশেই তো রাতে বেবিটাকে দেখে রেখে গিয়েছে ডাক্তার। ফুটফুটে ছোট ছোট সুন্দর হাতগুলো দিয়ে মাঝে মাঝেই স্পর্শ করছে চৈতির গলা। মাতৃত্বের স্বাদ সম্পূর্ণরূপে অনুভব করছে সে।এতোটুকু শান্তি বোধ হয় সে চেয়েছিল, এখনো অবধি তাকে জানানো হয়নি যে তার দুটো বাচ্চা হয়েছিল। এবং তার মধ্যে একটা বাচ্চা মারা গিয়েছে, ডাক্তার প্রথমে রাজি হয়নি কিন্তু পরে চৈতির বাবার অনুরোধ এবং চোখের পানি দেখে তিনি আশ্বস্ত করেছে চৈতি সুস্থ হলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানাবে যে তার একটা বাচ্চা মারা গেছে। এতে খুশি হয়েছেন মিলন সাহেব ও তার স্ত্রী। অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তাদের মেয়েটা সুখেয থাকবে, আনন্দে থাকবে। বাবা মাকে হসপিটালের রুমে আসতে দেখে উঠে বসার চেষ্টা করলো সে, মিলন সাহেব এগিয়ে আসলেন।
__আরে আস্তে আস্তে, এখনই তোমাকে উঠতে হবে না। আপাতত কিছুদিন বেড রেস্টে থাকো সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হও তারপরে উঠো।
__বাবা,প্লিজ বাবা এদিকে তাকাও।
মুখ ঘুরিয়ে রইলেন মিলন সাহেব মেয়ের দিকে একবার তাকানোর প্রয়োজন বোধটা করলেন না। চৈতির বোধহয় অনুতপ্ততায় মরে যেতে ইচ্ছে করলো, একটা কাপুরুষের জন্য নিজের পরিবারকে কতটা কষ্ট দিয়েছিল ভাবলেও নিজের প্রতি ঘৃণা হয়। তবুও উপরওয়ালার কাছে এতটাই শুকরিয়া আদায় করে সে যে যখনই তার প্রয়োজন হয়েছে সেই সময় তার বাবা মা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।নিজের মায়ের দিকে অসহায় চোখে তাকালো সে,
__প্লিজ মা, বাবাকে বল আমার সঙ্গে একবার হলেও একটু কথা বলতে। আমি সত্যিই খুব অনুতপ্ত, বাবা যদি আমায় ক্ষমা না করে তাহলে আমি বেঁচে থেকেও সুখ পাব না।
__চৈতির মা তাকে বলে দাও তার ওপর আমার কোন রাগ নেই। বরং সেই যেটা করেছে সেটা সরাসরি অন্যায় অন্যায়ের কোন ক্ষমা হয় না।
__প্লিজ বাবা মায়ের সঙ্গে কথা না বলে আমার সঙ্গে বলো। আমি নিজের সব ভুল স্বীকার করছি,আমাকে মারো কাটো তবু আমার সঙ্গে একটু কথা বলো।
__দেখো যদি তোমার সঙ্গে আমার কোন কথা নেই। হারাবে তো কথা বলতেও চাইনা তুমি সুস্থ হও বাড়িতে চলো তারপরে যা বলার বলব।
নিজের কথাটুকু শেষ করেই মিলন শেখ হসপিটালের রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন, চৈতি এবং তার মা অসহায় চোখের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। বাচ্চাটা কেঁদে উঠতেই চৈতির নিজের বুকে মায়ের পরশে তুলে নিল।
______________
তখন বোধহয় দুপুরের সময়, রাফাত ফ্ল্যাট এর বাইরে থেকে তালা দিয়ে চাবি নিজের সঙ্গে নিয়ে গেছে এমনকি ইমার ফোন অবধি নিজের সাথে নিয়েছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ইমা, স্পষ্ট সেখানে দেখলো রুক্ষ সুক্ষ চুল,মুখে লাল লাল দাগ, গলার কাছে মারের চিহ্ন গুলো খুবই নিখুঁতভাবে খুঁজে পেলো।কান্নায় গলা ভেঙে আসতে চাইলে তার, বড্ড চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পারল না, গলার কাছে কাটার মত আটকে রইল সবটা। চোখের পাতা বন্ধ করে ভাবতে লাগলো গত পরশুদিনের কথা, যখন তার আর রাফাতের বিয়ে হল।
***
গত পরশুদিন রাফাতকে নিজের বাড়িতে ডেকেছিল ইমা। ওর শুরু থেকেই জানত যে রাফাত আর যাই হোক এমন নিজের গর্ভবতী বউকে ছেড়ে বউকে বিয়ে করবে না। এ কারণে আগে থেকেই সেদিন নিজের বান্ধবী রুমিকে কল করে বাড়িতে রেখেছিলো ইমা।রাফাতকে নানাভাবে সিডইউজ করে নিজের বাড়িতে ডেকে আনে। যখন রাফাত আসে তখন গিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়। এমন সময় আমাকে লাল শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাফাত অবাক হয়।
রাফাতের দিকে তাকিয়ে ইমা প্রশ্ন করে,
__আমায় কেমন লাগছে?
মোহনীয় দৃষ্টিতে রাফাত ইমার দিকে তাকায়,অশ্লীল হেসে বলে,
__একদম পরী,একটু কাছে আসো।
__উহু আগে ভেতরে আসুন সাহেব।
__ চলো।
ভেতরে ঢুকে গলার টাই ঢিল করে ইমাকে জড়িয়ে ধরে এসে, আলাদা রুমে নিয়ে যায়। ঠিক এমন সময় দরজা বন্ধ করতে যাবে রুমি বাড়িতে ঢোকে কয়েকজন মানুষকে নিয়ে।ইমা আর রাফাতের দরজায় ধাক্কা দিলেই ভেতর থেকে খুলে যায় দরজা। দুজনকে এত কাছাকাছি দেখে কয়েকজন ছি ছি করতে থাকে। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয় ওদের দুজনকে পুলিশে দেবেন তাহলে বিয়ে পরিয়ে দেবে। নিজের সম্মান হারানোর ভয়ে সেই সময়ই রাফাত রাজী হয়ে যায় এই প্রস্তাবে। তখন চালাকি করে, ইমা কাবিন রাখে ১০ লক্ষ টাকা আর রাফাত ওর জ্বালে ফেঁসে যায় পুরোপুরি।
কিন্তু সব থেকে বড় সত্যি জানতে পারে যখন যে ইমা কখনো মা হতে পারবে না। তারপরে দুজনে মিলে প্ল্যান করে, যে সন্তান যেহেতু ভবিষ্যতে এ্যাডপ্ট করতেই হবে তার থেকে চৈতির কাছ থেকে কাস্টডি নিয়ে নিলেই হয়।
#চলবে
শব্দসংখ্যা ১১০০+#অনুড়া__৭
#নুপুর_মজুমদার_জবা
রাফাত যখন হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছালো ততক্ষণে বোধহয় বাচ্চাটাকে চৈতি থেকে আলাদা করে আলাদা বেবি কর্নারে হয়েছে। সর্বোচ্চ আধা ঘন্টার জন্য বাচ্চাকে মায়ের কাছে দেওয়া হয়েছিল, যেহেতু প্রিম্যাচুয়ার ছিল বাচ্চা সেহেতু বেশিক্ষণ কাছে রাখার সম্ভব হয়নি। চৈতি নিজেও বাচ্চা সুরক্ষার কথা ভেবে কোন কথা বাড়ায়নি। একজন নার্স এসে বাচ্চাটাকে সাথে নিয়ে চলে গেছে। চৈতি নিজের চোখ বন্ধ করেই ছিল স্যালাইন আর ওষুধের প্রভাবে যেন ঘুমের নেতিয়ে আসছে শরীর।
রাফাতকে দেখেই ক্ষেপে গিয়েছেন চৈতির বাবা।এগিয়ে এসে শার্টের কলার চেপে ধরলেন তিনি।হুট করেই এমন হওয়ায় চমকে উঠলো রাফাত,পেছনে মুখ ঘোরাতেই ওকে টানতে টানতে আলাদা জায়গায় নিয়ে গেলেন তিনি।কলার ছেড়ে মুখোমুখি প্রশ্ন করলেন,
___ কোন সাহসে এখানে এসেছো তুমি? আমার মেয়ের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই আর তোমার।
__আপনি ভুলবেন না আংকেল আপনার মেয়ে আজও আমার বিবাহিত স্ত্রী,আপনি না চাইলেও ওর প্রতি আমার আলাদা অধিকার রয়েছে।
ক্ষেপে গেলেন মিলন শেখ,চৈতিকে রেখে আরেক বিয়ে করেছে এই লম্পট তার ওপর আবার বলে যে ওর নাকি অধিকার রয়েছে। একটু গলাও কাঁপছে না ওর এমন ধরনের কথা বলতে?
__যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আরেক মেয়েকে বিয়ে না করে ঘরে তুলেছিলে ততক্ষণ অব্দিই আমার মেয়ের ওপর তোমার অধিকার ছিল। কিন্তু তুমি নিজেই নিজের সব অধিকার হারিয়েছো নিজের হাতে,তোোমার একটা সিদ্ধান্তে।
__আপনি ভুলে যাবেন না আংকেল আমি একটা সামর্থ্যবান পুরুষ দু'টো বিয়ে করার আমার ততটা পরিমাণ অর্থ-সম্পদ আছে।আর ইসলামেও দুই বিয়ে জায়েজ আছে।
__ইসলাম শেখাও তুমি আমায়? প্রথম বউয়ের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে কখনোই জায়েজ না বরং অবৈধ। আর আইনমতেও এটা অন্যায়,একজন স্ত্রীকে ডিভোর্স না দিয়ে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করা। আমার মেয়ে চাইলে তোমায় জেলে দিতে পারে নেহাত তোমার ভাগ্য ভালো যে সে এখন অব্ধি তোমার বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি।
__আমাকে আমার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দিন। আমি ওকে দেখতে এসেছি চৈতি সুস্থ হলে ওকেও বাড়িতে নিয়ে যাবো।আপাতত হাসপাতালে থাকলে দুজনের প্রোপার ট্রিটমেন্ট হবে এই কারণে এখানেই থাকুক।
__আমার মেয়েকে আবারো তোমার কাছে দিয়ে ভুল করবো? এতোই কি ফেলনা আমার মেয়ে? যে তোমার মতো কাপুরুষ, কীটের কাছে ওকে দেবো? ও সুস্থ হলেই তোমাদের ডিভোর্স হবে।
মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়লো রাফাতের।আহত প্রাণীর মতো হুঙ্কার দিলো,,
__এতোই সস্তা নাকি? আমি ওকে না ডিভোর্স দিলে ও কীভাবে ছাড়া পায় আমিও দেখবো।আর তার থেকেও বড় কথা ও যেখানে যাওয়ার যাক আমার বাচ্চাকে আমার হাতে তুলে দিক।
রাগের বশে মিলন শেখ কলার চেপে নিচে ফেলে দিলেন রাফাতকে।হটকারিতায় কি হলো তা বোঝার আগেই রাফাতের মুখে আর বুকে কতগুলো মার পড়ে গেছে তার হিসাব নেই।উন্মাদের মতো মারছেন তিনি,যতটা রাগ ক্ষোভ ছিল সব মেটাতেই বোধহয় এ ধরনের আক্রমণ ওনার।ততক্ষণে রাফাতের চোখের নিচে কেটে রক্ত ঝড়ছে,মিলন শেখের হাতে বোধহয় ঘড়ি ছিল তার আঘাত লেগেও গলার কাছটা ছুলে গিয়েছে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অন্য আরেকজনকে মারছে তা দেখেই কয়েকজন ওপাশে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিলো।এরইমধ্যে গাসপাতালের গেটে থাকা দুইকর্মীর নজরে তা চলে এলো।
দৃশ্যটা তাদের চোখে পড়ার সাথে সাথেই তারা এগিয়ে এসে দুজনকে ছাড়ালো একে অপরের থেকে। যতটা মার রাফাত খেয়েছে তার থেকে বেশি আঘাত পেয়েছে মিলন শেখ। উনার হাতের একটা নখ উপড়ে গিয়েছে।
হাসপাতালে একজন কর্মী খ্যাক খ্যাক করে চিল্লিয়ে উঠলো, পান খাওয়া লাল দাত গুলো দিয়ে পানির পিক বাইরে ফেলে এগিয়ে আসলো ওদের দুজনের দিকে।
__আরে মিয়া, আপনাগো এত বয়স হওয়ার পরও এমনে ঝগড়া করেন ক্যান? নিজেদের বয়সের দিকে একটু তাকান, মাঝ রাস্তায় এমন ভেজাল করেন লোকে দেখলে কি কইবে?
__ছাড়েন আমারে ঐ কুত্তারে মেরে তারপর শ্বাস নেবো আমি।কত বড় সাহস আমার একটা মাত্র মেয়ের সঙ্গে এরকম করে? ওর জন্য আমার একটা নাতি মারা গিয়েছে। আজও বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে সেই সত্যি কথাটা বলতে আমার বুক কেঁপে ওঠে। যখন আমার মেয়ের সামনে সেই সত্যিটা আসবে তখন আমি কিভাবে সামলাবো ওকে?
__আরে মিয়া এটা হাসপাতালে এখানে কাহিনী না করে পুলিশের কাছে যান। এতই যখন সমস্যা তাহলে আপনারা আইনের সাহায্য কেন নেন না?
রাফাত কে বের করে একটা অটোতে উঠিয়ে দিল একজন দারোয়ান আর মিলন সাহেবকে ভেতরের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। মিলন সাহেব যখন নিজের মেয়ের কেবিনের সামনে আসলেন তখন দেখলে যে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে চৈতি।ঘুমের ওষুধের প্রভাব বোধ হয় তখনও কাটেনি। নিজের মেয়ের দিকে তাকালে সত্যিই তার বুকটা হু হু করেও কেঁদে ওঠে, যে মেয়ে কলেজ লাইফে সব সময় বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে থাকতো, প্রতি মাসে নিজের চুল কত শত যত্ন করতো,সময় পেলেই যেকোনো জায়গায় ঘুরতে চলে যেত তার চোখের নিচেই আজ কত কালি। কতগুলো রাত সে ঘুমায় না, তার মেয়েটার দিকে তাকালে অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে ধরে।
নিজের কাঁধে কারোর হাতের অস্তিত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছনে ঘুরলেন তিনি, নিজের স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মলিন হাসলেন।
__তুমি কিছু খাওনি এখনো, খেতে এসো নইলে অসুস্থ হয়ে পড়বে তো।
কেবিনের ভেতরে কাঁচের দরজা দিয়ে তাকালেন মিলন শেখ,
__আমার মেয়েটা ওইখানে রয়েছে চৈতির মা, কতগুলো ঘন্টা হয়ে গেছে ও খায়নি। ওকে ঐ অবস্থায় রেখে কিভাবে আমি খাবার খাবো ?
__তুমি যদি এমন করো তাহলে ও কিভাবে সুস্থ হবে? তুমি নিজেই বলো তোমার এইরকম করা দেখলে তো আমার মেয়েটা আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে।
__আমি ওর এই অবস্থা দেখতে পারছি না চৈতির মা। নিজের মেয়ের এরকম অবস্থা দেখলে কোন বাবার গলা দিয়ে খাবার নামে?
__তাই বললে তো হবে না তুমি নিজেও মানুষ আর কত করবে এই বয়সে? তুমি যতই মুখে মুখে বলো না কেন যে চৈতিকে নিজের মেয়ে মানো না, কিন্তু ঠিকই ভালোবেসে আজ এতটা কষ্ট পাচ্ছ।
__তো? কি করবো চৈতির মা আমার একটাই মেয়ে, যতই ভুল করুক অন্যায় করুক ওর উপর রাগ পুষে রাখলেও ঘেন্না তো করতে পারি না।
শার্টের হাতা দিয়ে নিজের দুচোখ মুছলেন তিনি, স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের বড্ড মায়া হয় আফরোজা বেগমের।লোকটা গত দুই দিন ধরে কিছু খায় না, সময় মতো গোসল করে না এমন কি কোন কাজও ঠিকঠাক করে না শুধু নিজের মেয়ের কেবিনের আশেপাশে ঘুরতে থাকে। মেয়েটাকে বড্ড ভালবাসতো আগে থেকেই কখনো কোন স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু মেয়ে তা বিয়ের আসর থেকে নিজের প্রেমিকের হাত ধরে পালাবে লোকটা কখনোই আন্দাজ করতে পারেনি। সেই সময় বড্ড কষ্ট পেয়েছিলাম এই কারণেই মেয়ের উপর অভিমান আজ অব্দি পুষে রেখেছে। কিন্তু যেই মেয়ের কান্না মাথা বলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছে সেই সময় পাগলের মত কুমিল্লা থেকে ছুটে এসেছে, নিজের স্বামীর দিকে তাকালে নিজেরই বড্ড করুণা আর মায়া আসে ওনার। লোকটা জীবনে কখনো সুখ করতে পারল না।
কথা বাড়লো না আর আফরোজা বেগম স্বামীর দিকে এক পলক তাকিয়ে সরে গেলেন, বাচ্চাটাকে ডাক্তার অনেক আগেই নিয়ে অন্য বেবি কর্নারে রেখেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি,মুখ ঘুরিয়ে হাতে থাকা পানির বোতল টা রাখলেন।
#চলবে
