টগর— ২

®️দিজা মজুমদার ‘কথা’


“আস্তে আস্তে।” দুই হাত নাড়িয়ে ‘আস্তে আস্তে’ করা এই আগন্তুক ভিন্ন কেউ নয়। এতক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলা টগর তালুকদার; ছিমছাম পাতলা গড়নের সুন্দর এক পুরুষ। চকচকে রোদ উঠা দুপুরের জন্য তার চা'প দাড়িওয়ালা মুখে লা'লচে ভাব... আমি মাথায় হাত দিয়ে জোরেশোরে নিশ্বাস ফেলার ফাঁকে তাকে খুব ভালো করে দেখতে লাগলাম। সে আমার স্থির হওয়ার অপেক্ষা করলো‚ কিন্তু আমি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই তার উপর চড়াও হলাম‚ “অ্যাই‚ শা'লা ভূ'তের চামচা। রাস্তাঘাটে মেয়েমানুষের গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে তোকে‚ হ্যাঁ?”


“সিনক্রিয়েট করো না কিশমিশ। আমি হাত দিয়ে নয়‚ ফোন দিয়ে ছুঁয়েছি তোমায়।” শুনে ভেতরে ভেতরে একটু ধা'ক্কা খেলাম‚ কিন্তু আমি তো হে'রে যাওয়ার মতো মেয়ে নই। তাই দ্বিগুণ মিথ্যা রাগে বলে উঠলাম‚ “তোর ফোনের আমি গুষ্টি কি'লাই। বললাম না আমি কারো সাথে কথা বলতে চাই না। তাহলে কেন...” এতটুকু বলতেই সে আচমকা দূরত্ব কমিয়ে ফেললো; আমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। স্বভাবতই আমি হকচকিয়ে উঠলাম। আশেপাশের সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে কেবল নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পেলাম।


“কিশমিশ‚ তুমি আমাকে চেনো না। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে চিনতেও হয়তো চাইবে না। চুপচাপ আমার সাথে চলো নয়তো...” তার গলার স্বর স্বাভাবিক; চোখেমুখে শান্ত একটা ভাব‚ কিন্তু শব্দের ব্যবহার নিপুণতায় ভরপুর। ভ'য় করছে আমার; শুকনো ঢোক গিলে শুধালাম‚ “নয়তো কী করবেন?” একটু আগে করা তুইতো'কারি ভুলে গিয়ে এবার সম্মান দিতে লাগলাম। আমার নাজে'হাল অবস্থা হয়তো সে স্পষ্টত বুঝতে পারলো। সামান্য ঝুঁ'কে এসে বললো‚ “রাস্তা ভর্তি লোকের সামনে তোমায় জড়িয়ে ধরে...” এরপর তার মুখে কথা এলো না। অসম্ভব শান্ত বদনে তার চোখ জোড়া নেমে গেল আমার নিকাব আড়াল করা অধর বরাবর। পুরো চার সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে নিশীথ-শীতল কণ্ঠে শুধালো‚ “বুঝতে পারছো নাকি আমি খোলাসা করবো?”


“এত খারাপ আপনি! ছিঃ!” রাগে ঘে'ন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিলাম। সে একটু সরে গিয়ে বললো‚ “আমার টাইম ওয়েস্ট করো না কিশমিশ। প্লিজ কাম।”


“আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না।” আমি গো ধরলাম‚ কিন্তু সে কানে তুললো না। আচমকা আমার ডান হাত ধরে টা'নতে লাগলো। হাঁটতে শুরু করে বললো‚ “ত'র্ক করা আমি পছন্দ করি না। আর... আমাকে উল্টোপাল্টা কিছু করতে বাধ্যও করো না।”


“ছাড়ুন আমাকে। বললাম না আপনার সাথে কোথাও যাবো না। লুই'চ্চা বেডা‚ বুইড়া খা'টাশ বেডা... ব'দদোয়া দিলাম আমি‚ বউ দিয়ে কোনোদিনও সুখ পাবি না।” এই শুনে থামলো সে। আমার দিকে পূর্ণ চোখে তাকিয়ে রহ'স্য করে হাসলো। এরপর আবার টা'নতে টা'নতে বাইকের কাছে এনে দাঁড়ালো।


“আমি কিন্তু যা বলি‚ তাই করি। এখন তুমিই চিন্তা করো‚ আমার সাথে চুপচাপ যাবে নাকি সিনক্রিয়েট করে আমার...” ঠান্ডা গলায় কী সুন্দর করে আমাকে থ্রে'ট দিয়ে চলেছে। না‚ এই বেডার সাথে ভরসা নেই। বেশি তিড়িং বিড়িং করলে হয়তো অনেক কিছুই ঘটিয়ে বসবে। আমি কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে অগত্যা বাইকে চড়ে বসলাম। সে বাইক স্টার্ট দিয়ে আমাকে বললো‚ “ধরে বোসো। সাবধানের মা'র নেই।”


“ভাই তুই বাইক চালা। তোর মতো বেডার গা লেপ্টে না বসার কারণে আমি যদি লু'লা হই‚ রাস্তায় পইড়া গিয়া ম'ইরা যাই তাও আমার আপত্তি নাই। কিন্তু তোর...”


“আমি তোমার বড়ো অন্তত বড়ো হওয়ার ভদ্রতাটা আমাকে দেখিয়ো। আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে তুইতো'কারি করার সাহস পায়নি। আর তুমি এত তাড়াতাড়ি আমাকে...” বাইক চলতে শুরু করলো। আমি মুখ গোমড়া করে বসে রইলাম। হঠাৎ বাইকে প্রচন্ড ঝাঁকু'নি লাগলো আর আমার চিবুকের একপাশে তার শক্ত পিঠের বা'ড়ি লাগলো। তৎক্ষণাৎ কুঁকড়ে উঠলাম আমি‚ “উঃ!”


“বলেছিলাম‚ ধরে বোসো। রাস্তা ভালো না।” এই শুনে ইচ্ছে করছে যা-তা বলি‚ কিন্তু কোনোকিছু বলার সাহস কেন জানি এখন আর হলো না। রাগ কা'মড়ে শুধু জানালাম‚ “আপনি আল্লার ওয়াস্তে নিজের কাজ করেন ভাই। আমার চিন্তা আপনার করতে হবে না।”


“ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন... আমি তোমার ভাই নই কিশমিশ।”


“ঠিক আছে। ‘আঙ্কেল’ চলবে? ‘আঙ্কেল’ ডাকি? দশ বছরের বড়ো একটা দামড়াকে ‘আঙ্কেল’ ডাকাই ভালো হবে‚ তাই না?” আমার মুখ ভে'ঙচিয়ে বলা কথা শুনে সে আর ত'র্কে নামলো না। চুপচাপ বাইক চালিয়ে উত্ত'প্ত হাওয়ায় মন ভাসিয়ে দিলো।


বোধহয় পনেরো কি কুড়ি মিনিট বাইক চললো আর পুরোটা সময় আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম। না‚ রাগ নয়‚ ক্ষো'ভ নয়‚ ছিল না মন আমার অভিমানী। আমি স্রেফ ব্যস্ত ছিলাম তপ্ত দুপুরের প্রকৃতি দেখায় আর সে বাইক চালাতে মশগুল। আমাদের এই নীরবতা ভা'ঙলো যখন টগরের বাইক স্কুল মার্কেট এরিয়ায় থামলো। 


“নামো কিশমিশ।” সে বললো। আমি বিভ্রান্ত ও কৌতুহল পূর্ণ মন নিয়ে নামলাম‚ “এখানে কেন নিয়ে এলেন?” আমার গলার স্বরে সুস্পষ্ট বিস্ময় দেখেও সে পরিহাস করলো‚ “তোমাকে ঠান্ডা করতে আনলাম।” 


“ঠান্ডা করতে মানে! কী বলতে চান কী আপনি? দেখেন‚ আমার সাথে...” 


“খালি পেটে মেয়েদের মাথা একটু বেশিই গরম হয়ে থাকে। তাই খাবে চলো। তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকে আমারও খাওয়া হয়নি। ব্যাপক ক্ষুধার্ত আমি।” বলেই সে বাইক পার্ক করে হাঁটতে লাগলো। আমি এখনো দ্বিধান্বিত। মেজাজের উত্ত'প্ত ভাবও কোথায় জানি হা'রিয়ে গেছে। ফলস্বরূপ শান্ত বদনে তার পিছু নিলাম‚ কিন্তু পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে বললাম‚ “আমি বাইরে খাই না৷ প্লিজ এখান থেকে চলুন।” সে কানেই তুললো না। খুব সুন্দর দেখে একটা রেস্টুরেন্টের দরজা ঠেললো। ভেতরে ঢুকতেই তার বয়সী এক বেডা এসে হ্যান্ডশেক করলো‚ “কীরে টগর‚ এত দেরি করলি কেন?” 


“একটু কাজ ছিল। সব রেডি?”


“হ্যাঁ‚ সোজা গিয়ে হাতের বামের রুমটাই। যেভাবে বলেছিস‚ সেভাবেই ব্যবস্থা করা আছে।” এই শুনে টগর খুশি মনে বলে উঠলো‚ “থ্যাঙ্কস আ লট দোস্ত।” এরপর আরও টুকটাক কথা সেরে আমাকে নিয়ে নির্ধারিত জায়গায় এলো। এতক্ষণ শান্ত বদনে সব দেখে গেলেও এখন... এখন সে ভেতরে ঢুকে কাচের দরজা লক করে যখন পর্দা টেনে দিলো‚ ছোট্ট এই রুমে দাঁড়িয়ে আমার সমস্ত দেহে পা'থর হয়ে গেল।


“আমাকে... আমাকে এখানে কেন নিয়ে এলেন?” ভ'য়ে‚ অজানা আত'ঙ্কে গলা কাঁপ'লো আমার অথচ রাগে আমি চোখ তুলতে পারলাম না। টগর নিরুত্তর মুখে আমাকে পাশ কা'টিয়ে গেল। নিচু চোখে সেদিকে তাকাতেই দেখলাম‚ খাবার ভর্তি একটা টেবিলে সে চেয়ার নিয়ে বসেছে।


“কী হলো? কথা বলছেন না কেন? বিয়ে করেছেন বলে আপনি যদি ভেবে থাকেন‚ কাউকে না জানিয়ে আমাকে এখানে এনে... একলা... একলা আমাকে...” বলতে বলতে আমার গলা কেমন ধরে এলো। না‚ আমি কাঁদছি না। অতিরিক্ত রাগ আর ভ'য় পেলে আমার গলা ভিজে যায়— এই আর কী।


“বিয়ের দিনই আমি তোমার দেনমোহর শোধ করে দিয়েছি কিশমিশ। আইনত তুমি আমার স্ত্রী‚ ধর্মমতেও এখন আর কোনো নিষে'ধাজ্ঞা নেই। কিন্তু আমি পুরুষ হলেও কা'পুরুষ নই। মেয়েদের উপর জোর খাটা'নোর শিক্ষা আমি পাইনি।” এই শুনে একইসাথে স্বস্তি পেলাম আর অপ'দস্ত হলাম। আমি বোধহয় তাকে নিয়ে অনেক বেশি ভেবেছি। ধ্যাৎ! এতটা ভাবাও ঠিক হয়নি। আনমনে যদিও বা অনুশো'চনা হলো‚ কিন্তু বাইরে কঠিনই রইলাম‚ “জোর করেনি! মিথ্যা'বাদী‚ লু'ইচ্চা বেডা... খবরদার আমার সাথে মিথ্যা বলবি না। তুই আমাকে জোর করে এখানে এনেছিস।”


“রুমটা সাউন্ড প্রুফ না কিশমিশ। প্লিজ... আবারও রিকুয়েষ্ট করছি‚ বাড়ির বাইরে সিনক্রিয়েট করো না। বিশ্বাস করতে পারো আমায়‚ তুমি অনুমতি না দিলে টগর তালুকদার তোমাকে ছোঁবে না। এখন বোসো। বসে হিজাবটা খুলে খেয়ে নাও। তুমি না বললেও আমি জানি‚ এখন প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত তুমি।” শুনেও আমি নত মস্তক দাঁড়িয়ে রইলাম। কী ভেবে নিয়ে টগর আবার আশ্বস্ত করতে লাগলো‚ “খাবারে কিছু মেশাতে বলিনি তাও তোমার যখন অবিশ্বাস হচ্ছে‚ আমি আগে টেস্ট করে দেখাচ্ছি। এরপর তুমি খেয়ো। কিশমিশ‚ তোমাকে পাচার করতে বিয়ে করিনি।” শেষ কথায় আমি আনমনে প্রায় লা'ফিয়ে উঠলাম। আশ্চর্য! এই কথা... এই কথা তো পনেরো কি বিশ দিন আগে আমি শারমিনকে বলেছিলাম। টগর এটা জানলো কীভাবে?


...চলবে ইন শা আল্লাহ 


এই ওয়েবসাইটেই বাকি পর্ব গুলা দেওয়া হবে?

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url