#সীমান্তহীন_ভালোবাসা
#পর্ব_৩+৪
#মায়িশা_নুরাইন
(কপি করা নিষেধ)
( নোট:- ডিফেন্স রিলেটেড ঘটনাগুলোর সব কাল্পনিক হবে। এসবকে বাস্তবের সাথে মিলাতে যাবেন নাহ।)
মাঝে পেরিয়ে যায় কয়েকদিন। বাসায় আবহাওয়া এখন অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা হয়ে আছে। রিদা এমন ঠান্ডা আবহাওয়া দেখে আরও ভয়ে আছে। মা তো ইতোমধ্যে সুরাইয়া আন্টির সাথে কথা বলেছেন। বিয়েটা বোধহয় ভেঙেও গিয়েছে। নয়তো এর মধ্যে আরও কাহিনী হওয়ার বাকী ছিলো।
এমনিও রিদা ইতোমধ্যে আরও একটা ভুল করে ফেলেছে। সারওয়ারের নাম সার্চ করে ফেইসবুক আইডি পেয়ে অনেকগুলো মেসেজ দিয়েছে। একটাও সোজা মেসেজ নাহ, সব উল্টাপাল্টা মেসেজ পাঠিয়েছে। তবে সবচেয়ে রা'গের কাহিনীটা তখন ঘটেছে, যখন সারওয়ার মেসেজ সীন করে একটাই উত্তর দিয়েছে।
-- " স্টুপিড গার্ল। "
তারপর আর কিছু না বলে সোজা ব্লক করে ফেলে রেখেছে৷
ইগনোর জিনিসটা বরাবরই রিদার অপছন্দের। এমনকি, তুবার সাথে ঝগড়া লাগলেও সে আগেই গিয়ে খোঁচাতে থাকে কথা বলানর জন্য। কেউ তাকে ইগনোর করুক, সেটা সে সহ্য করতেই পারে নাহ। আর সেই অসহ্যকর কাজটাই সারওয়ার তার সাথে করেছে। মেজাজটা এত্ত খারাপ তার,,মনে হচ্ছে সারওয়ারকে সামনে পেলে কতগুলো কথা শুনাতে পারলে তর ভালো লাগতো।
সেদিনের পর এক সপ্তাহ পার হয়ে গিয়েছে। রিদা এখনো ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ পায় নি। কারণ তার পড়াশোনা। সে বর্তমানে জাতীয় ভার্সিটির আন্ডারে একটা কলেজে অনার্স করছে। প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে। হটাৎই ইনকোর্সের ডেট পড়ায় তার ঘুরতে যাওয়া আটকে যায়। তাই সপ্তাহখানেকের মাঝে পড়াশোনায় ডুবে যেতে হয়েছিলো। শুনেছে জাতীয় ভার্সিটিতে পড়লে তেমন পড়াশোনা করতে হয় নাহ। শুধু পরীক্ষার আগে একটু পড়লেই হয়। সেই পদ্ধতি অবলম্বন করতে গিয়ে প্রথম বর্ষে একটা বড়সড় বাঁশ উপহার পেয়েছে। তাই এবার একটু মন দিয়েই পড়ে ইনকোর্স দিলো।
ততদিনে সারওয়ারের কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিলো। হটাৎ ঘুরতে যাওয়ার কারণ মনে পরতেই সারওয়ারের কথা মনে পড়লো। কি ভেবে মেসেনজার চেক করতেই নিজেকে এখনো ব্লক লিস্টে পড়ে থাকতে দেখে মেজাজ খারাপ হয়।
মায়ের সাথে একটু আধটু কথাবার্তা হয়। তিনি এখনো কেমন ঠান্ডা হয়ে আছে। মা ঠান্ডা থাকা মানে, সামনে বড় কোন বাঁশ তৈরি আছে। সেখান থেকে বাঁচতে হলে আগেভাগে বাসা থেকে পালাতে হবে।
তাই তাড়াতাড়ি করে তুবাকে বলে সব গোছগাছ করে নিতে। বাবা ইতোমধ্যে গাড়ির টিকেট কেটে রেখেছেন। ওনার সময় হলে নিজেই দিয়ে আসতেন। তবে সেই সুযোগ না থাকায় দুটো মেয়েকে একাকীই পাঠাতে হচ্ছে।
গাড়ি যেখানে থামবে, সেখান থেকেই রিদার মামা এসে তাদের নিতে চলে আসবে। এ নিয়ে আর কোন সমস্যা নেই।
রিদা তার পছন্দের স্হান বান্দরবান যাবে। এই নিয়ে তার খুশির সীমা নেই। তবে তুবার মধ্যে তেমন কোন রিয়েকশন নেই। বড় বোনের শখ হয়েছে ঘুরতে, তাই ছোট বোন হয়ে পাহারাদারের মতো যাচ্ছে।
***********************
সারওয়ার তৈরি হচ্ছে, তার ছুটি শেষ। তাকে চলে যেতে হবে। ইমন-ইরিন দুজনে ভাইয়ের রুমেই বসে আছে। বসে বসে জগতের যত বকবক করছে। সহজে তারা বড় ভাইয়ের সামনে আসে নাহ। একটু ভয়ই পায়। দূর থেকে আগে ভাইয়ের চোখ মুখের অবস্হা খেয়াল করবে। যদি দেখে সব ঠিকঠাক, তবে আসবে ভাইয়ের সাথে কথা বলতে৷ যেমন, এখন ভাইয়ের মুড স্বাভাবিক আছে। তাই দু ভাই-বোন এসেছে ভাইয়ের সাথে গল্প করতে।
সারওয়ার কমই কথা বলছে। যা বলার তারা দুজনই বলছে। সারওয়ার তৈরি হতে হতে সব শুনছে শুধু। কখনো মুচকি হাসছে, কখনো বা টুকটাক উত্তর দিচ্ছে।
হটাৎ ইমন বলে উঠে,,
--- " ভাইয়া, আম্মু যে একটা মেয়ের কথা বলছিলো। দেখা করেছিলে তার সাথে? "
হটাৎ রিদার প্রসঙ্গ উঠতেই সারওয়ারের মুড চেন্জ হয়ে যায়। চোখে মুখে বিরক্তি প্রকাশ পায়। ইমন বুঝতে পারে কোন ঘাপলা তো আছেই। আপাতত সে ব'কা খেতে যাচ্ছে। তাই নিজে বাঁচতে পাশে বসা ইরিনকে খোঁচা দেয়, যাতে ইরিন কথার প্রসঙ্গ পাল্টায়।
তাই ইরিন তাড়াতাড়ি করে বলে উঠে,,
--- " ভাইয়া, তোমাদের সেনানিবাসে কবে নিয়ে যাবে? আমার খুব শখ সেখানে যাওয়ার। "
সারওয়ার নিজেকে সামলে বলে,,
--- " কখনো সুযোগ হলে সবাইকে নিয়ে যাবো। এখন দুটোই রুম থেকে বের হো। ইমন, লাগেজটা নিয়ে বের হ। আমি তৈরি হয়ে আসছি। "
ইমা তাড়াতাড়ি করে লাগেজ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পরে। পেছন পেছন ইরিনও বের হয়। তারা বেরুতেই সারওয়ার চুপচাপ বিছানায় বসে পরে৷ রিদার প্রসঙ্গ উঠার পর থেকেই মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। নিজে দোষ করে তার উপরই দোষ দিয়ে দেয়। কেমন মেয়ে এটা! সেদিন মেসেজ করে বলছে, কেন সে বাসায় এসে রিদার নামে খারাপ কথা বললো! এজন্য নাকি তার মা রা'গ দেখিয়েছে তাকে।
অথচ সারওয়ার এসব নিয়ে কিছুই বলে নি মা'কে। উল্টো মেয়ের বয়স কম দোহাই দিয়ে বিয়ে আটকালো। তারপরও মেয়েটা তাকেই ভুল বুঝে উল্টোপাল্টা কথা শুনিয়ে দিলো!!
মূলত এখানে তাদের একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়। রিদার মা তার সাথে রা'গ দেখানোয় সে ভেবেছে সারওয়ার হয়তো কিছু বলেছে। নয়তো সাধারণ একটা বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে নওশীন বেগমের রা'গ দেখানোর কোন মানেই ছিলো নাহ।
সামান্য বিষয় নিয়ে দুজন অপরিচিত মানুষের মধ্যে এক মারাত্মক ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হলো। সেই ভুল বুঝাবুঝি দুটো অপরিচিত মানুষকে আরও দূরত্বে ঠেলে দিলো।
***************
বান্দরবান আর্মি ক্যাম্প,,
পাহাড়ের গা ঘেষে তৈরি করা সেনা ক্যাম্পটা বরাবরের মতোই ব্যস্ত। চারপাশের সবুজের সমারোহ স্হানটাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে। চারপাশে ঘন সবুজ জঙ্গল, উঁচু-নিচু পাহাড় আর আঁকাবাকা রাস্তা, সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন প্রকৃতির আড়ালেই লুকিয়ে আছে।
ভোরের কুয়াশায় দূরের পাহাড়গুলো অস্পষ্ট ছাড়ার মতো দেখায়। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, সাথে গাছের পাতার সুবাস। এখানকার প্রকৃতি প্রতিটি ঋতুতে একেক সময় একেক রুপে ধরা দেয়।
ক্যাম্পের পাশেই একটা সরু, ছোট্ট ঝরনার ধারা বয়ে গেছে। বর্ষাকালে ঝরনাটা ফুলে ফেঁপে উঠে। পাথরের গায়ে আছড়ে পড়া পানির শব্দে চারপাশ মুখরিত হয়ে থাকে।
বান্দরবান এরিয়ায়, বেশ কয়েকটি টুরিস্ট স্পট রয়েছে। তাই এখানটায় টুরিস্টদের আনাগোনা রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কঠোর ব্যবস্হা। প্রতিটি টুরিস্ট স্পটেই সেনাদের অবস্হান রয়েছে। যেকোন অনাকাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত যেন তৈরি নাহ হয়, তার জন্য তারা সর্বদা সতর্ক থাকে।
বান্দরবান এরিয়াটা যেমন সুন্দর, তেমনি ভয়াবহও। কাছাকাছি বর্ডার এরিয়া বলে নানা রকম অবৈধ ব্যবসাও চলে। সেসব রোধে কড়া ব্যবস্হাও নেওয়া হচ্ছে। তবুও অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে নিজেদের কার্য হাসিল করার চেষ্টায় সর্বদা সুযোগ খুঁজে।
কিছুদিন ধরে এখানকার আশেপাশের এলাকায় কিছু মিসিং রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোন পাচারকারী সংগঠনের কাজ এটা। ফোর্সের লোকেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
বর্ডার এলাকায় বিজিবি ফোর্স কড়াকড়ি করা হয়েছে। কারণ এখানকার চোরা কারবারির একটাই পথ, সেটা বর্ডার সংলগ্ন স্হান।
ক্যাম্পাসের বাহিরটা যতটা শান্ত দেখায়, ভেতরটা ততটাই ব্যস্ত। প্যারেড গ্রাউন্ডে সেনাদের কোলাহল, কোথাও ফিজিক্যাল ট্রেনিং, কোথাও অস্ত্র চেক, কোথাও বা টহল দলের প্রস্তুতি।
সারওয়ার ক্যাম্পে ঢুকেই নিজের ইউনিটের দিকে হাটছিলো। চোখে মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে। টানা দশদিনের ছুটির রেশ বুঝি এখনো কাটে নি। তবে দায়িত্বে ঢুকলেই সব আবার ঠিক হয়ে যাবে। তখন সব ক্লান্তি দূর হয়ে চেহারায় কঠোরতা, দৃঢ়তা চলে আসে।
ক্যাম্পের একপাশে অপারেশন রুম রয়েছে। এখানেই সকল প্রকার অপারেশনের পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ভেতরে দেয়ালের গায়ে ঝোলানো কিছু ম্যাপ দেখা যায়। সেখানে বিভিন্ন জায়গায় লাল দাগে বৃত্ত আকা, মানে এ জায়গাগুলো সীমান্তঘেষী পাহাড়ি এলাকা। এ স্হানগুলোই অবৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার প্রধান পথ। যত অবৈধ কাজকর্ম, সব এসব রাস্তা দিয়েই পরিচালিত হয়।
ডিউটি অফিসার সংক্ষিপ্তভাবে জানায়,-- গত তিনদিনে আশেপাশের এলাকায় তিনটি মিসিং রিপোর্ট পাওয়া গেছে। তিনজনই পর্যটক নারী ছিলেন। যার ফলে বিষয়টা মারাত্মক হয়ে দাড়িয়েছে। পুলিশ ফোর্সরা এ বিষয়ে তদন্ত করছে। প্রথমিকভাবে কোন নারী পাচারকারীর সংগঠনের কাজই মনে হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আজকে রাতের মধ্যে বড়সড় কোন চালান দেওয়ার চেষ্টা করবে তারা।
সারওয়ার ম্যাপের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এ ধরণের রিপোর্ট নতুন নাহ। তবে সংখ্যাটা অস্বাভাবিক, তার উপর পর্যটক ছিলেন ওরা। বিজিবির কড়া পাহাড়া ভেতরেও কেউ খুব সুক্ষ্ণভাবে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
সারওয়ার নিজের ডিউটির কথা জেনে নিয়ে নিজ কোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে যায়৷ এখন গিয়ে ফ্রেস হয়ে একটু রেস্ট নিবে। তারপর সময়মতো নিজের ডিউটিতে মনোনিবেশ করতে হবে।
*******************
রিদা, তুবা দুইবোন তৈরি হয়ে বসে আছে। বাবা একটু বাহিরে গিয়েছেন। বাবা আসলেই তাদের নিয়ে বেরিয়ে পরবে। এই প্রথমবারের মতো দুই বোন একাকী একটু দূরবর্তী কোন স্হানে যাচ্ছে। দুজনের মাঝে বেশ এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে। এসব নিয়েই দু বোন গুজুরগুজুর করছে।
নওশীন বেগম নিজের ভাই-ভাবীর জন্য কিছু খাবার তৈরি করে দিচ্ছেন। সেলিম ইসলাম ওনার ছোট ভাই। ভাইটা ওনার হাতের খাবার বেশ পছন্দ করে। মেয়ে দুটোকে যখন পাঠাচ্ছেই, তাই যতটুকু পারছে, কিছু সাথে দিয়ে দিচ্ছে।
তাছাড়া সেলিম সাহেবের বউও অনেক ভালো মানুষ। রিদা, তুবাকে অনেক আদর করে। সেখানে থাকলে মেয়ে দুটো ভালোই থাকবে। তাই তিনি কোন আপত্তি করে নি।
রিদা মায়ের কাছে এগিয়ে আসে। পেছন থেকে মা'কে জড়িয়ে ধরে বলে,,
--- " রাগ কমেছে আপনার, মাতাজান? "
নওশীব বেগম মনে মনে হাসলেও উপরে কোন জবাব দেন নাহ। রিদা মুখ ফুলিয়ে বলে,,
--- " ও আম্মাজান, একটু কথা বলেন মেয়েটার সাথে। মেয়েটা যে আপনার ব'কা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। "
নওশীন বেগম পেছন ঘুরে মেয়ের কান টেনে বলেন,,
--- " ব'কা খাওয়ার মতো কাজ করিস বলেই তো ব'কা খাস। ধি'ঙ্গি মেয়ে হয়ে আবার ছোটটার সাথে তুলনা করিস নিজেকে। "
রিদা ফিসফিসিয়ে বলে,
--- " আস্তে বলো। তুবা শুনলে ঝামেলা শুরু করবে। আমি তো তোমাদের বেশী আদরের। তাই একটু বেশীই দুষ্টুমি করি। "
--- " যাচ্ছিস ভালো কথা। ভদ্র মেয়ের মতো থাকবি। মামীর সাথে সাথে থাকবি। আর ছোটটাকে দেখে রাখবি। এখন কিন্তু তুবা তোর দায়িত্বে থাকবে। সাবধানে থাকবি দুজনেই। "
রিদা মিষ্টি হেসে বলে,,
--- " ওক্কে আম্মাজান। যেভাবে যাচ্ছি, সেভাবেই ফেরত আসবো। নো টেনশন। আর সেখানকার ছবি তুলে আনবো, পরে তোমাকে দেখাবো। পাহাড়ি এলাকাগুলো অনেক সুন্দর হয়। "
--- " পাহাড়ে যাস নাহ একা একা। মামার কাছে থাকিস। বড় হয়েছিস তো। লাফালাফি করিস না। পারলে ছোটটাকে দেখে শিখ কিভাবে শান্ত থাকতে হয়। "
তখনই পেছন থেকে তুবা একটু গলা খাঁকারি দেয়। রিদা চোখ কুঁচকে পেছনে তাকাতেই তুবা নিজেকে নিয়ে একটু ভাব দেখায়। কারণ মা তার প্রসংসা করেছে।
মূলত তুবা যতই শান্ত থাকুক নাহ কেন, রুমে গেলেই তার রুপ প্রকাশ পায়। রিদার সাথে যত দুষ্টুমি তার। দুজনে মারামারি শুরু করলে, মা লাঠি নিয়ে আসলেই তুবা অসহায় ভঙিতে বসে পরবে। তারপর যা যাওয়ার রিদার উপর দিয়ে যাবে।
তাদের দু বোনের বয়সের ডিফারেন্ট বেশী নাহ। মাত্র দু বছরের মতো ব্যবধান। তাই তাদের মধ্যে মিল যেমন, তেমন মা'রামারিও বেশী চলে। পাশাপাশি চলে তুলনা, কে কার থেকে বেশী কি করতে পারে!!
কবির ইসলাম বাহির থেকে কিছু হালকা পাতলা খাবার কিনে এনেছেন। মেয়ে দুটো যাতে চলার পথে কিছু খেতে পারেন। মেয়ে দুটোকে একাকী পাঠাতে মন সায় দিচ্ছে না তাদের দুজনের কাররই। তবে বড় মেয়েটা এমনিতেই একটু প্রেসারে আছে, আবার ছোটটার পরীক্ষা আসছে সামনে। এর আগে একটু মাইন্ড ফ্রেস করে আসা ভালো হবে৷ সেসব ভেবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া।
রিদা, তুবা দুজনেই মা'কে বিদায় জানিয়ে বাবার সাথে বেরিয়ে পরে। যেহেতু চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবানের দূরত্ব বেশী নয়। তাই বাসে করেই তারা চলে যেতে পারবে। তারপর বাসস্ট্যান্ড থেকে মামা তাদের রিসিভ করে নিয়ে যাবে।
বাসে উঠে তারা হাত নেড়ে বাবাকে বিদায় জানায়৷ বাস ছাড়তেই দুবোন কত রকমের কথাবার্তা বলতে থাকে। দুজনের মাঝেই খুশির ঝিলির দেখা যাচ্ছে। তারা কি পরিমাণে খুশি, সেটা তাদের চোখ-মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশী খুশি বোধহয় রিদা নিজেই। সেখানে গিয়ে কখন কি করবে, কোথায় কোথায় যাবে, সব কিছুর প্ল্যান আগে থেকেই করে রাখছে।
মোটামুটি দীর্ঘ সময়ের যাত্রা শেষে তারা বান্দরবানে পৌছে যায়। বাস থেকে নামতেই কিছু দূরে মামাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে। দুবোনই দৌড়ে মামার কাছে চলে যায়। তাদের দুজনকে দেখে সেলিম সাহেবও খুশি হন। মেয়ে দুটোকে তিনি নিজের মেয়ের থেকে কোন অংশে কম দেখেন নাহ৷ ওনার ছোট ছেলেটাও তাদের জন্য পা'গল। তুবা মামাকে বলে,,
--- " ও মামু, রাজনকে আনলে নাহ কেন? "
--- " বাসায়াই তো যাচ্ছিস। বি'চ্ছু টাকে সাথে আনলে সামলানো কষ্টকর হয়ে পরতো রে। "
মামার সাথে তারা কথা বলতে বলতে এগুতে থাকে। বাসস্ট্যান্ড থেকে স্হানীয় গাড়ি করে তারা মামার বাসার দিকে যেতে থাকে। পথিমধ্যে রিদা মুগ্ধ হয়ে আশেপাশের প্রকৃতি দেখতে থাকে। আঁকাবাকা সরু পাহাড়ি রাস্তার চারপাশে সবুজ ঘাসের সমারোহ তাকে মুগ্ধ করছে। এতক্ষণ আসার পথে সে বকবক করলেও, এখন সে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত।
তখনই তাদের গাড়ির পাশ দিয়ে একটা সেনাবাহিনীর গাড়ি যেতে দেখে রিদার হটাৎই সারওয়ারের কথা মনে পরে। সেই লোকটাও তো আর্মির মেজর পদে আছেন। ওনার পোস্টিং কেথায় হয়েছে! এসব তো রিদার জানাই হয় নি। আগেই ওনার পরিচয় পেয়েই রিদা যা-তা কাহিনী করে বিয়েটা ভাঙলো। অথচ লোকটার পরিচয় সম্পর্কে সে কিছুই জানে নাহ।
মায়ের কথা মনে পরলো। মা তো বলেছিলো, সবাই তো খারাপ হয় নাহ। রিদাও এটা বিশ্বাস করে। সে জীবনে একটা সেনা সদস্যর খারাপ হওয়ার কথা শুনেই তো বাকীদের জাজ করতে পারে নাহ৷ হয়তো সারওয়ার সাহেব বাকীদের মতো নাহ। ওনি হয়তো ভালো মনের একজন মানুষ।
কিন্তু একজন মানুষকে দেখলেই তো তার চরিত্র সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় নাহ। তেমন হলে কেউ বিয়ের পরেও ঠকে যেতো নাহ।
রিদা বিয়ের পরবর্তী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাকে অনেক সম্মান করে। বিয়ের পরবর্তী মুহুর্তের কোন খারাপ ঘটনা শুনলে তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। রিদা চায় বিয়ের পরে সর্বদা স্বামীর পাশে থেকে স্বামী সেবা করবে।
কিন্তু আর্মিতে থাকা মানুষগুলো দেশ সেবা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে নিজেদের পরিবারকেই ভুলে যায়৷ তেমন হলে রিদা তো টেনশনে জীবন কাটাতে পারবে নাহ৷ তার ভয় হয় খুব। যেখানে সে একটা সুখী সংসারের চিন্তা করে। সেখানে স্বামীকে নিয়ে টেনশনে থাকা তার জন্য খুবই কষ্টের।
বিকাল পেরুতেই তারা মামার বাসায় পৌছে যায়। মামার বাসাটা খুব সুন্দর একটা জায়গায়। বাসার বাড়ান্দায় দাড়ালের অনেক দূর পর্যন্ত প্রকৃতির সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ করা যায়। রিদার মনে হচ্ছে, এখানে বসে সে এক কাপ কফি হাতে নিয়ে সারাদিন বাহিরের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিতে পারবে।
এমন একটা জায়গা তার স্হায়ী বাসস্হান হতে পারলে ভালো হতো। তার বিয়েটা এখানকার কারও সাথে হলেই বোধহয় ভালো হবে। সে তার স্বামীকে নিয়ে এখানে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। মামাকে বলতে হবে, এখানকার কাউকে তার পাত্র হিসেব নির্বাচন করতে। ধ্যাত! এসব তো লজ্জার কথা। নিজের বিয়ের কথা কি কাউকে বলা যায় নাকি!
আর্মি পেশা তার পছন্দ নাহ। তবে সে যদি এখানকার কেন আর্মি পার্সনকেও পেয়ে যায়, তবে কোন সমস্যা নেই। আর্মি পেশার মানুষগুলো নাকি আনরোমান্টিক হয়। সেটা ব্যপার নাহ। এমন একটা জায়গা হলে, তেমন আনরোমান্টিক স্বামী নিয়েই সে সারাজীবন পার করে দিতেও দ্বিধা করবে নাহ।
চলবে...........
#সীমান্তহীন_ভালোবাসা
#পর্ব_৪
#মায়িশা_নুরাইন
(কপি করা নিষেধ)
( নোট:- ডিফেন্স রিলেটেড ঘটনাগুলোর সব কাল্পনিক হবে। এসবকে বাস্তবের সাথে মিলাতে যাবেন নাহ।)
রিদা, তুবা মামার বাসায় এসেছে আজ দ্বিতীয় দিন হলো। আজ বিকাল হতেই রিদা মামীর পেছন পেছন ঘুরছে। মামীকে কনভিন্স করার চেষ্টা করছে, তারা ঘুরতে যাবে।
একটা দিন তো ঘরেই বসেই কাটালো। আর ঘরে মন টিকছে নাহ। তার ঘুরতে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু রিদার মামা সেই সকালে অফিসে চলে গিয়েছেন। আর মামীও এ জায়গাটা তেমন চেনে নাহ। নতুন নতুন এসেছে বলে এখনও বাহিরে ঘুরতে যাওয়াও হয় নি।
এখন রিদার দেখাদেখি তাদের মামাতো ভাই রাজনও বায়না ধরেছে। এখন মামী মসিবতে পরে যায়৷ না নিয়ে গেলে সারাদিন ক্যা'চাল করতেই থাকবে। এক মুহুর্তও শান্তি দিবে নাহ। রাজনকে মামীর পেছনে লাগিয়ে দিয়ে রিদা দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। এভাবেই বাচ্চাদের দিয়ে কাজ হাসিল করতে হয়।
তুবা বোনকে হাসতে দেখে বুঝে ফেলে এটা তার বোনেরই কাজ। সে এসে রিদাকে ধাক্কা দিয়ে বলে,,
--- " তুই রাজনকে ক্ষে'পিয়ে দিয়েছিস নাহ? যাহ, তোর পাপের পাল্লায় একটা লিখা হয়ে গেলো। নোট করতেছি, বাসায় গিয়ে সব মা'কে বলবো। "
রিদা তুবার মাথায় একটা চা'টি মেরে বলে,,
--- " আসিস পরে আমার কাছে, এটা সেটা দরকারে৷ কচু দিবো তোমায় তখন। কাজের সময় আমাকে দরকার, আর কাজ শেষে আমাকে চিনিসই নাহ। বে'য়াদব মেয়ে একটা। "
দুই বোনের চুলা'চুলির মাঝে মামী ত্যক্ত'বিরক্ত হয়ে এগিয়ে আসে। বলেন,,
--- " এই যাও যাও। তৈরি হও দুজনে। বে'য়াদবটা পেছনে পরেছে। না নিয়ে গেলে শান্তি দিবে নাহ। "
পিচ্চি রাজন এখন খুশিতে নাচ শুরু করেছে। তুবা, রিদা তা দেখে হেসে ফেলে। তারা তাড়াতাড়ি করে তৈরি হয়ে চলে আসে। কিছুক্ষণের মাঝে মামীও রাজনকে তৈরি করে চলে আসেন। সেলিম সাহেবকে ফোন করে অনুমতি নেওয়ার জন্য। তিনি প্রথমে মানা করলেও পরবর্তীতে সাবধানে থাকার কথা বলে রাজি হন। তারপরই সবাই মিলে বেরিয়ে পরে আশেপাশের প্রকৃতি উপভোগ করার জন্য।
রিদার মামার বাসাটা পড়েছে শহর এড়িয়ার এক পাশে। সেখান থেকে কিছুদূর এগুলেই সব পাহাড়ের সমারোহ। বান্দরবানে বেশ কয়েকটি ট্যুরিস্ট স্পট রয়েছে। তাই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বেশী। সেই সাথে রয়েছে ট্যুরিস্ট গাইড।
তারা গাড়ি করে কাছাকাছি একটা স্পটে ঘুরতে যায়৷ সেখানকার সৌন্দর্য দেখে রিদা মুগ্ধ হয়ে যায়৷ আঁকাবাকা রাস্তার দু'ধারে সবুজের সমারোহ। সাথে আছে ছোট ঝরনার পানি পড়ার শব্দ। আশেপাশে বেশ মানুষদের দেখা যায়। তারাও এখানটায় ঘুরতে এসেছে। রিদা তো মুগ্ধ হয়ে দেখার পাশাপাশি ফোনে ছবিও তুলতে থাকে।
এতক্ষণ তুবা তার সাথে থাকলেও, রিদার এত ছবি তোলা দেখে তার ভালো লাগে নাহ। তাই সে গিয়ে রাজনকে সাথে নিয়ে আশপাশ ঘুরতে থাকে। তাদের সাথে মামীও একসাথেই ছিলো। তবে মাঝখান থেকে রিদা আলাদা হয়ে পরে।
রিদা ছবি তোলাতে এতটাই মগ্ন ছিলো, সে খেয়ালও করে নি কখন সে বাকীদের থেকে আলাদা হয়ে পরেছে৷
সে আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতেই ছবি তুলছিলো। হটাৎ সেখানে একটা সুন্দর ভিন্ন প্রজাতির গাছ দেখে পাশে তুবাকে ডাকে,,
--- " এই তুবু, দেখ দেখ গাছটা.......তুবু? ...এই তুবা? "
আশেপাশে তাকিয়ে দেখে তুবা তার পাশে নেই। এমনকি এই জায়গাটায় মানুষের সমাগমও কম। দূরে কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণে রিদা খেয়াল করে, সে বর্তমানে যেখানটায় আছে, সেখানে আশেপাশে শুধু গাছগাছালির সমারোহ৷
রিদা তখনই ভয়ে আঁতকে উঠে, যখন সে খেয়াল করে সে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। কোন রাস্তা দিয়ে কোনদিকে সে এসেছে, তার কিছুই মনে নেই। মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। একেতে সে নতুন এ জায়গায়, তার উপর সে সম্পূর্ণ সময়টাই ফোনে মগ্ন ছিলো। ফোন হাতে নিয়ে মামীর ফোনে কল লাগাতে গেলে দেখে এখানটায় নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে নাহ৷
রিদা অল্প অল্প করে আন্দাজে পেছনের দিকে যেতে তাকে। তার ধারণা, সে সামনে এগিয়েছে। তার মানে পেছনের দিকে গেলেই সে রাস্তা খুঁজে পাবে। পাশাপাশি ক্রমাগত ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। এতক্ষণ ছবি, ভিডিও করায় তার ফোনের ব্যাটারিও প্রায় শেষ। যখন তখন ফোন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
রিদা কিছুদূর এগুতেই সে সামনে একটা সরু রাস্তা দেখতে পায়। সে ভাবে, এই রাস্তা ধরে আগালেই হয়তে সে আসল জায়গাটা খুঁজে পাবে। এতক্ষণে চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে। প্রকৃতির মৃদু আলোয় সে পথ ধরে আগাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে সে ভয়ে শেষ। এমনিতেই জঙ্গলের এরিয়া, জ'ন্তু-জা'নোয়ার থাকতেও পারে। তার কোন গ্যারান্টি নেই।
তার উপর অচেনা জায়গা বলে রিদার কাছে প্রচন্ড ভয় লাগছে। হার্টবিট এমন ভাবে লাফাচ্ছে, মনে হচ্ছে যখন তখন তার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে। সে ক্রমাগত আল্লাহর কাছে দোয়া করছে, যাতে এবারের মতো ভালোয় ভালোয় ফিরতে পারে। তারপর আর কখনো কারও অবাধ্য হবে নাহ। তাকে বসতে বলে বসে থাকবে, দাঁড়াতে বললে দাঁড়িয়েই থাকবে। সব কথা শুনবে। শুধু এবারের মতো বেঁচে ফিরলেই হলো।
*****************
অপরদিকে তুবা ক্রমাগত কান্না করছে। বড় বোনকে খুঁজে না পেয়ে সে ভয়ে, আতংকে দিশেহারা। স্হানীয় গাইডদের থেকে রিদার খবর নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারছে নাহ। এ জায়গাটায় অনেক মানুষের সমাগম রয়েছে। তাই নিজেরা নিজেদের খেয়াল না রাখলে, অন্য কেউ তাকিয়েও দেখে নাহ।
অন্যদিকে মামীর অবস্হাও খারাপ। সে তো গার্ডিয়ান হয়ে এসেছিলো৷ মেয়ে দুটোকে নিজের সাথে এনেছিলো। এখন সে সামলে রাখতে পারলো নাহ৷ সেলিম সাহেব জানতে পারলে ওনাকে আস্ত রাখবেন নাহ। ভয়ে তিনি এখনো স্বামীকে কিছুই জানান নি। নিজেরাই খোঁজাখুজি করতে থাকে।
এরই মাঝে হটাৎ মাইকে জরুরি অবস্হা ঘোষনা করা হয়। কোথায় নাকি কিসের গন্ডগোল হয়েছে, তাই সবাইকে নিরাপদ আস্তানায় চলে যেতে বলে। এবার বিষয়টা মারাত্মক হয়ে যায়৷ সবাই তাড়াতাড়ি করে যার যার আবাসস্থলের দিকে রওনা হয়। পর্যটকরা স্হানীয় হোটেলে আশ্রয় নেয়। বর্ডার এরিয়া বলে এসব জায়গায় প্রায়ই অবৈধ কাজে ঠেকাতে অপারেশন চালানো হয়৷ আজও বোধহয় তেমন কোন জরুরি অবস্হা জারি হয়েছে।
যদিও এ স্হান হতে গন্ডগোলের অবস্হান অনেক দূরে। তবুও সকলকে নিরাপদে থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এবার না পেরে মামী সেলিম সাহেবকে ফোন করে রিদার হারিয়ে যাওয়ার কথা জানান৷ তিনি মামীকে ফোনেই কতগুলো বকাবকি করে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে আসেন।
আন্যদিকে তুবা ক্রমাগত বোনের ফোনে কল দিতে থাকে। তবে একটা কলও রিসিভ হয় নাহ। নেটওয়ার্ক সমস্যার জন্য কল ডুকতে গিয়েও বারবার কেটে যাচ্ছে। বোনের কথা চিন্তা করে তুবার অবস্হা খারাপ হয়ে যায়। বড় বোনের সাথে সে যতই শত্রুতামি করুক নাহ কেন, দিন শেষে বড় বোনই তার নিরাপদ আশ্রয়। সেই বোনকে না পেয়ে তার অবস্হা খারাপ হয়ে যায়। ছোট্ট রাজনও এতক্ষণে শান্ত হয়ে গেছে। একটু আগের আনন্দ-উল্লাসের কোন ছায়াও তার মাঝে অবশিষ্ট নেই। মায়ের কোলে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চুপটি করে বসে আছে সে।
কতক্ষণ সময় লাগিয়ে সেলিম সাহেব সেখানে উপস্হিত হন। তুবা তো মামাকে দেখেই দৌড়ে মামার কাছে যায়৷ কান্নারত স্বরে বলে,,
--- " ও মামা, আপুকে খুঁজে দাও নাহ প্লিজ৷ আমার ভয় হচ্ছে খুব। আপু কিভাবে হারিয়ে গেলো টেরই পেলাম নাহ৷ প্লিজ খুঁজে দাও আপুকে। "
কাছাকাছি বয়স বলে তুবা কখনো রিদাকে আপু বলে নাহ৷ তবে কখনো কোন কিছুর প্রয়োজন পরলে তখন আপু বলে ডাকে। তবে এখন এমন পরিস্হিতিতে তার মাথা কাজ করছে নাহ। বারবার নিজেকেই দোষারোপ করছে। তখন সে রিদার সাথে থাকলে আপু এভাবে হারিয়ে যেতো নাহ৷ রিদা তো বারবার বলেছিলো তার সাথে সাথে থাকার জন্য। দরকার পরলে হারালে দুজনই হারাতো, অন্তত দুবোন একসাথে তো থাকতে পারতো।
****************
অপরদিকে রিদা যেদিকেই যাচ্ছে, সব যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। তাই ফোনের লাইটও ইউস করতে পারছে নাহ। ভয়ে তার জ্ঞান হারানোর মতো অবস্হা। তবুও চেষ্টা করছে নিজেকে শান্ত রাখার। আপাতত রাতটা কাটানোর মতো জায়গা পেলে ভালো হতো। এভাবে তো বাহিরে থাকা যায় নাহ। জ'ন্তুজানোয়ারেরও ভয় আছে। সকাল হওয়া পর্যন্ত তাকে এই অচেনা জায়গায় টিকে থাকতে হবে।
হটাৎ সে রাস্তা ধরে গাড়ির আওয়াজ পেয়ে রিদা একটু আশাবাদী হয়। নিশ্চয়ই তার মামা খুজতে এসেছে তাকে। এই ভেবে খুশিতে অপেক্ষা করতে থাকে। তবে দূর থেকে গাড়ি দেখে তার কেমন লাগে। সে দ্রুত একটা বড় গাছের আড়ালে লুকিয়ে পরে। পরপর দুটো গাড়ি সে রাস্তা ধরে এগিয়ে যায়। গাড়ির পেছন পেছন কয়েকটা বাইকও যেতে দেখে সে। হটাৎই রিদার মনে হয়, এরা নিশ্চয়ই ভালো মানুষ নয়। এদিকটায় তো বর্ডার এলাকা। এদিকে এত বড় গাড়ি থাকা মানে, অবৈধ কোন কাজের গাড়ি!! ভয়ে রিদার অবস্হা আরও খারাপ হয়ে যায়। নিজেকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
পুরুষ মানুষ যত ভালোই হোক নাহ কেন। একাকী একটা মেয়ে মানুষ সামনে পেলে কেউ ভালো থাকে নাহ। এসব ভেবে রিদার ভয়ের মাত্রা বেড়ে যায়। এই মুহুর্তে এসে রিদা কান্না করে ফেলে। এতক্ষণ পশুর ভয় ছিলো,,এখন ভয়টা মানুষের ভয়ে পরিণত হয়েছে। এটা যে বড় মারাত্মক বিষয়।
এবার রিদা আর না এগিয়ে সেখানেই একটা বড় গাছের আড়ালে বসে পরে। সে যে ইতোমধ্যে ঝামেলায় ফেঁসে গেছে, সেটা সে ঠিকই বুঝতে পারছে। এখন কি করবে, সেটাই বুঝতেছে নাহ। এমন একটা পরিস্হিতি তার সাথে ঘটতে পারে, সে কখনোই আন্দাজ করতে পারে নি।
সে বসে থাকতে থাকতে সেখানেই একটু চোখ লেগে এসেছিলো৷ হটাৎই কিছু জোরালো শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়৷ দূর থেকে জোড়ে জোরে কিছুর শব্দ হচ্ছে। হয়তো কোন গন্ডগোল হচ্ছে। এবার রিদা আরও আতঙ্কে পরে যায়। হাতের ফোন বন্ধ থাকায় বুঝতেও পারছে নাহ, কতক্ষণ সময় পার হয়েছে। সকাল হচ্ছে নাহ কেন! কখন সে বাসায় ফিরতে পারবে! কেউ কি তাকে বাঁচাতে আসবে নাহ!! এসব ভেবে সে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে।
**************
সারওয়ার ক্যাম্পে বসে আজকের পেট্রোল ডিউটির জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। গত দুই-তিনদিন ধরে আশেপাশের পরিস্হিতি অস্বাভাবিক হয়ে রয়েছে। তবে বাড়তি কোন সমস্যা হয় নি৷ এটা যেন আরও টেনশনের বিষয়।
তখনই তাদের টীমের একজন এসে জানায়, সামনের বর্ডারে বিজিবি দের উপর অ্যাটাক হয়েছে। যেহেতু এই সময় তাদের টীমের ডিউটি ছিলো, তাই তাদের সেখানে যেতে হবে। এমন জরুরি পরিস্হিতিতে কাছাকাছি থাকা সেনাসদস্যদের পরিস্হিতি মোকাবিলা করতে হয়। তাই সারওয়ার দ্রুত তার টীম নিয়ে সেখানকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরে।
অন্যদিকে রিদা গন্ডগোল যেদিকে হচ্ছে, তার উল্টো পাশে দৌড় দেয়। তার বারবার মনে হচ্ছে, সব যেন তার দিকেই এগিয়ে আসছে। আজই বোধহয় তার শেষ দিন। এত টেনশনে তার মাথা কাজ করছে নাহ। সে রাস্তা ধরে দৌড়ানো অবস্হায় সামনে থেকে পুনরায় গাড়ি আসতে দেখে আঁতকে উঠে। কিছু বুঝে উঠার আগেই গাড়ি তার নিকটে চলে আসে। রিদা কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই মুখ থুবড়ে রাস্তাতেই পরে যায়। তবে তার ভাগ্য ভালো, সঠিক সময়েই গাড়িটা থেমে গিয়েছিলো। তবে প্রচন্ড ভয় থেকে রিদা অজ্ঞান হয়ে পরে।
গাড়ি থেকে একজন নেমে রিদাকে দেখে বলে মেজর সারওয়ারের উদ্দেশ্যে বলে,,
--- " স্যার, সিভিলিয়ান। একটা মেয়ে, অজ্ঞান হয়ে গেছে বোধহয়। "
ভেতর থেকে সারওয়ার বলে,
--- " আপাতত গাড়িতে নিয়ে আসো। পরে বাকিটা দেখা যাবে। "
দুজন সদস্য নেমে এসে রিদাকে তাদের সাথে গাড়িতে তুলে নেয়। আদও সে শত্রুপক্ষ কি না, সেটা ভাবার এখন সময় নেই। বর্তমানে দ্রুত পরিস্হিতি স্বাভাবিক করতে হবে। মেইন ফোকাস তাদের সেদিকেই রয়েছে।
রিদাকে গাড়িতে নিয়েই তারা তাদের মিশনে চলে যায়। তাদের ধারণা অনুযায়ী নারী পাচারেরই কাজ চলছিলো। তবে আগে থেকে ধারণা থাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিলো। তবুও তারা প্ল্যান করে থাকায় পরিস্হিতি খারাপের দিকে চলে গিয়েছিলো। অবশেষে সেনাবাহিনী এসে পরিস্হিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সঠিক সময়ে পৌছানোয় গাড়ি পাচার করা সম্ভব হয় নি। কয়েকজনকে ধরাও হয়েছে। পুলিশ ফোর্স থাকায় তারা এসে শত্রুদের আটক করেছে। আর যেসব মেয়েদের পাচার করার চেষ্টা করা হচ্ছিলো, তাদের মেডিক্যাল চেকাপের পর নিজ নিজ পরিবারে ফেরত দেওয়া হবে।
অবশেষে পরিস্হিতি স্বাভাবিক হলে, তারা নিজ গাড়ির দিকে ফেরত আসে। তখন এক সদস্য বলে,
--- " স্যার, গাড়িতে থাকা মেয়েটার কি করা হবে? "
--- " ওকে বাকী মেয়েদের সাথে পাঠাও নি? "
--- " স্যার, আপনি তো কোন নির্দেশনা দেন নি। তাই,,,"
সারওয়ার ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে বলে,,
--- " আচ্ছা, আমরা যাওয়ার পথে ওকে পাঠিয়ে দিবো। চলো এখন ক্যাম্পের দিকে,,"
এর মাঝে সারওয়ার মেয়েটার দিকে একবারও খেয়াল করে নি। করার কথাও নাহ, সে তো নিজের কাজের দিকে পূর্ণ ফোকাস রেখেছিলো। তারা যাওয়ার পথে মেয়েটিকে পুলিশ স্টেশনে রেখে তারা চলে যাবে।
রিদা তখনও অজ্ঞান অবস্হায় ছিলো। প্রচন্ড স্ট্রেস থেকে সে জ্ঞান হারিয়েছিলো।
তাকেও প্রাথমিকভাবে বাকী মেয়েদের মতো মনে করে। হয়তো কোনভাবে সুযোগ পেয়ে পালিয়ে আসছিলো। তাই তারা তাকে পুলিশে কাছে রেখে আসতে চায়। সেনা সদস্যদের একজন রিদাকে দু'হাতে কোলে তুলে পুলিশ স্টেশনের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। সারওয়ার তখন গাড়ির জানালায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলো। হটাৎই চোখ মেলে অজ্ঞান রিদাকে দেখে একমুহূর্তের জন্য মনে হয় সে ভুল দেখছে। রিদাকে সে এখনো ভুলে নি। রিদা-ই বোধহয় তার দেখা প্রথম মেয়ে, যে সেনাবাহিনীর সদস্য পছন্দ করে নাহ বলে তাকে বিয়েতে রিজেক্ট করেছিলো।
সারওয়ার দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে রিদার দিকে এগোয়। ভালো ভাবে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা রিদা-ই। এই মেয়ে এখানে কি করছে! এখানে কি ঘুরতে এসেছিলো নাকি! কোথায় থাকছে এখন!
এত প্রশ্ন মাথায় আসতেই, সারওয়ার পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলতে যায়। আদও রিদার নামে কোন মিসিং রিপোর্ট আছে নাকি। তবে সেসব কিছুই না পেয়ে একটু হতাশ হয়। তার টীমের বাকী সদস্যরা সারওয়ারকে একটা মেয়ের জন্য টেনশন করতে দেখে অবাক হয়।
এদের মধ্যে একজন সদস্য, রুবেল, এগিয়ে এসে সারওয়ারকে জিজ্ঞাসা করে,,
--- " স্যার, চিনেন মেয়েটাকে? না মানে, আপনি এগিয়ে এসে খোঁজ নিচ্ছেন যে? "
সারওয়ার কি উত্তর দিবে বুঝতে না পেরে শুধু জানায়,
--- " হুম৷ ফ্যামিলি রিলেটিভ। এখানে এসেছে জানতাম নাহ। তাই হটাৎ দেখে অবাক হলাম। "
--- " স্যার, মেয়েটা কি বাকী মেয়েদের সাথে ছিলো নাহ? মানে তাকেও কি পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিলো কি? তাহলে তো মেয়েটারও সম্পূর্ণ চেকাপ লাগবে। "
--- " আগে ওর জ্ঞান ফেরানোর ব্যবস্হা করতে বলো। বাকীটা ওর মুখ থেকেই শোনা যাবে। "
আপাতত সারওয়ার ডিউটি সময়ে নেই। তাই সে ক্যাজুয়ালি পরিস্হিতি হ্যান্ডেল করছে। নয়তো ডিউটি সময়ে থাকলে তাকে রিদাকে বাকীদের মতোই পুলিশের হাতে রেখে চলে যেতে হতো।
কিছুক্ষণের মাঝে রিদার জ্ঞান ফিরতেই সে আশেপাশে তাকিয়ে অবাক হয়। একটু পর বুঝতে পারে সে পুলিশ স্টেশনে আছে। তার মানে সে এখন নিরাপদ। এখন সহজেই মামার কাছে ফেরত যেতে পারবে সে!
--- " আপনি ঠিক আছেন মিস. রিদা? "
আচমকা কোন পুরুষালী গম্ভীর কন্ঠে তার নাম নেওয়ায় সে চমকে উঠে। পেছনে তাকিয়ে সারওয়ারকে আর্মি পোশাকে দেখে চমকে উঠে।
--- " আ-আপনি এখানে? আপনি এখানকার...? "
--- " জ্বি। এখন সব ক্লিয়ার করুন। কি হয়েছিলো আপনার সাথে। সব ইনফরমেশন না পাওয়া অব্দি আমি যেতে পারছি নাহ। আপনার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে আপনাকে। "
এই মুহুর্তে রিদার কাছে সারওয়ারকে সবচেয়ে আপনজন মনে হচ্ছে। যতই হোক, পারিবারিক সম্পর্ক আছে তো। সারওয়ার নিশ্চয়ই তাকে বিপদে পরতে দিবে নাহ।
তাই রিদা একে একে সব জানায় তাকে। প্রথমে তার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, তারপর গন্ডগোলের মাঝে পরে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলা, অবশেষে তাদের গাড়ির সামনে পরে গিয়ে স্ট্রেস থেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।
রিদার ভাষ্যমতে সবকিছুই পুলিশ রেকর্ড করে নেয়। যাতে পরিবারের খোঁজ পেলে তাকে সহজেই হস্তান্তর করা যায়।
সারওয়ার বলে,,
--- " আপনার মামার বাসা কোথায়? জায়গার নাম বলুন। "
--- " আমি জানি নাহ এসব। কিছুই চিনি নাহ এখানকার। আজই প্রথম বের হয়েছিলাম, আর আজই এমন হলো। সবাই আমাকে খুঁজছে নিশ্চয়ই,,"
--- " তবে আপনার মামার খবর পাবো কিভাবে? তিনি কি কাজ করেন? ওনার কর্মক্ষেত্র বা কিছুর ঠিকানা দিতে পারবেন? "
রিদা অসহায় হয়ে দুদিকে মাথা নাড়ায়। সে এটাও জানে নাহ তার মামা এখানে কি কাজ করে। কখনো জানার প্রয়োজনবোধ করে নি। এত বড় মেয়ে হয়ে এসবের খবর না রাখায় প্রচন্ড লজ্জাবোধ করছে এখন।
সারওয়ার যেন এই মুহুর্তে রে'গে যায়। এত বড় মেয়ের কাছ থেকে এমন কথা শোনায় সে বিরক্ত হয়েছে। কিছুটা বিরক্ত মাখানো কন্ঠেই বলে,,
--- " অন্তত ফোন নাম্বারটা তো বলুন। মামা, মামী, বা বোনের? "
--- " নাম্বার? হ্যা... আমার ফোন?...ফোন কোথায়? সব তো ফোনেই সেইভ করা ছিলো। তুবার নতুন সীম, নাম্বার মুখস্ত নেই। "
--- " তো বাবা-মায়ের নাম্বার দিন। তাদের জানাই অন্তত,,,"
--- " নাহ প্লিজ। অ...অন্য কিছু করুন। ওরা টেনশন করবে নয়তো। অন্যভাবে সামলান নাহ প্লিজ, মেজর সাহেব। "
চলবে........?
পরের পর্ব গুলা এই ওয়েবসাইটেই দেওয়া হবে, ধন্যবাদ
(কাল্পনিক গল্পকে বাস্তবের সাথে মিলাতে যাবেন নাহ৷ কল্পনার মিশেলে লিখার চেষ্টা করেছি। ভুলত্রুটি হলে জানাবেন। লেখাতে অতিরঞ্জিত কিছু মনে হলে জানাবেন৷ দরকার পরলে লেখা বন্ধ করে দিবো।
তবে ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন। রেসপন্স অনেক কম। ভালো না লাগলে জানান। এটা লেখা স্টপ করে দিই তবে?)
(ক্যাম্পের বিবরণ আন্দাজি দিয়েছি। এখনো ওসব জায়গায় আমার যাওয়া হয় নি। মনে যা এসেছে, লিখে ফেলেছি। এগুলোকে সিরিয়াসলি নিয়েন নাহ।
গল্পটা কেমন লাগছে সেটাই জানাবেন। ধীরে ধীরে আমরা ক্লাইম্যাক্সের দিকে যাবো। আশাকরি আপনাদের ভালো লাগবে। কোন ভুলত্রুটি হলে জানাবেন। রেসপন্স করবেন সবাই।)
