চাঁপাবনে_অলির_সনে_লুকোচুরি-----(২)


' তোমার বর কাল সন্ধ্যায় তোমাকে ওভাবে মা'রলো কেনো? '


ডায়নিং টেবিল ভর্তি বসা সকল মেহমানের সামনে ছোটো একটা বাচ্চার মুখে এমন প্রশ্ন শুনে মুহুর্তেই ল'জ্জায় , বিব্রত হয়ে ওঠে ভোর। উপস্থিত সকলের চোখ - মুখে কৌতুহল দেখা দিয়েছে। আদ্র তার বউকে মে'রেছে? যে মেয়ের জন্য পরিবার - মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে একা বিয়ে করলো সেই মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে? এটা বিশ্বাস করার মতো কথা !!


তারা কিছু বলবে বা জিজ্ঞেস করবে তার আগেই মুমতাহিনা এসে নাতনীকে ধ'মকে বললো,


' মামির সাথে এসব কি ধরনের কথা - বার্তা বলছো নানু ভাই? যাও গিয়ে খেলা করো। '


বাচ্চাটার মুখ ভার হলো । মন খারাপ করে বাইরের দিকে ছুটলো। তারপর থম মে'রে দাঁড়িয়ে থাকা ভোরকে বললো,


' তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস ? তোকে না বলেছি রুমে গিয়ে রেস্ট নিতে। '


ভোরের ও আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করলোনা। ইতিমধ্যে পরিস্থিতি বেশ গোজমিল হয়েগেছে। এখানে থাকলে আরও বিদঘুটে হয়ে উঠবে পরিস্থিতি। তাই রুমে চলে গেলো। বিছানায় উঠে দুই হাটু ভাজ করে তাতে থুতনি ঠেকিয়ে বসলো। ভাবতে বসলো নিজের জীবনের সব চেয়ে সুন্দর মুহুর্ত গুলোর কথা। 


-----------

ইমরান রহমানের এক মাত্র মেয়ে ইনায়া রহমান ভোর।বাবার অতি আদরের দুলালী মেয়ে ভোর। মা ছিলোনা বিধায় বাবা যেনো একটু বেশিই ভালোবাসতো ভোরকে। এতোটাই আদর , স্নেহ ও ভালোবাসায় মাখিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে যে , মায়ের কোনো কমতি তিনি বুঝতেই দেননি মেয়েকে। মেয়ে যখন যা চেয়েছে সব , সব এনে দিয়েছে চোখের সামনে। হোক সেটা সম্ভব বা অসম্ভব কোনো বস্তু। বাড়ি ভর্তি কাজের মানুষজন থাকা সত্ত্বেও মেয়েকে গোসল ব্যাতিত খাওয়ানো, ঘুম আনানো , ঘুরতে নিয়ে যাওয়া কোনো খাবার খেতে চাইলে নিজ হাতে বানিয়ে দেওয়া সব করতো। এক গ্লাস পানি অব্দি বাবার হাতেই খেতো ভোর অথচ এখন ..... কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও বাড়ির রান্না থেকে শুরু করে বাসন মাজা সব করতে হয় ভোরকে। এটা আদিবার আদেশ । এখন দিনের পর দিন অসুস্থ থাকলেও ভোরের মাথায় হাত রেখে আদর করার কেউ নেই। এতটা অবহেলা পেতে হবে ভোর কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। এ বাড়িতে শুধু ওই মুমতাহিনাই যা একটু খোঁজ - খবর নেয় ভোরের । অথচ ভোর এক বুক স্বপ্ন আর ভালোবাসা নিয়ে এ বাড়িতে এসেছিলো আদ্রের হাতটা ধরে। সব কেমন এক লহমায় বদলে গেলো । কি থেকে কি হলো সব স্বপ্ন বালে মাটির ন্যায় ঝরঝর করে ঝরে গেলো। যার সাথে পুরো একটা জীবন কাটাবে বলে বাবাকে ছেড়ে এখানে এলো সেই মানুষটা বদলে গেলো ওকে ভুলে গেলো। ওর ভালোবাসা ফিরিয়ে দিলো ওকে দূরে ঠেলে দিলো নিজের জীবন থেকে। এখন শুধুই একটা অবহেলিত ফার্নিচারের ন্যায় এ বাড়িতে থাকতে দিয়েছে ভোরকে। অবশ্য আদ্র ওকে চলে যেতেও বলেছিলো এখান থেকে কিন্তু ভোরই যায়নি। এখন আর এই বি'ধ্বস্ত মন নিয়ে বাবার সামনে যেতেই মন সায় দেয়না। এক মাত্র মেয়ের এহেন দশা সেই বাবা যে কিছুতেই মেনে নিতে পারবেনা। যার সাথে ভালো থাকবে বলে বাবার ভালোবাসা ফেলে এসেছিলো তার সাথে ভালো নেই এই কথাটা বাবার সামনে গিয়ে বলার সাহস কখনোই হবেনা ভোরের। ওই বাবা নামক প্রিয় মানুষটা জানুক, ভোর যার সাথে চলে এসেছে তার সাথে খুব , খুব ভালো আছে । 


ওর ভাবনার মাঝেই রুমে এলো আদ্রের বড় বোন আদৃতা। ভোরকে বিছানায় চুপচাপ বসে থাকতে দেখেই বিরক্ত হলো । তার কোলে দু-বছরের ছেলে বাচ্চা। বাচ্চাটাকে বিছানার ওপর নামিয়ে দিয়ে ভোরকে বললো,


' ওকে একটু দেখে রেখো। মা ব্যাস্ত আছে আমি গিয়ে হেল্প করি। '


ভোর আচ্ছা বলে বাবুকে নিজের দিকে আনলো। আদৃতা ছেলেকে দিয়ে চলে যেতে নিয়ে ফের ফিরে চেয়ে বললো,


' দেখো, আবার আমার বাচ্চাকে একা পেয়ে গলা চেপে মে'রে দিওনা। তোমাদের বংশ তো আবার খু'নী বংশ। '


কথাটা শোনা মাত্র ভোরের বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো। বাচ্চাটাকে দূরে ঠেলে দিলো। আদৃতা তা দেখেও না দেখার মতো করে রুম থেকে চলে গেলো। সে জানে তার বাচ্চাটা এখানে নিরাপদেই থাকবে। 

--------------------------


আদৃতার দুবছরের ছেলেটা পুরো রুম ময় হেঁটে বেড়াচ্ছে। একটু পর মুমতাহিনার বড় মেয়ের বাচ্চা মনিসাও চলে এলো ওর সাথে খেলতে। দুজনে মিলে বিছানার চাদর,সোফার কাভার,ড্রেসিংটেবিলের ওপর থাকা তৈজসপত্র সব এলোমেলো করে ফেললো খেলতে , খেলতে। মনিসা একটু পরে চলে যেতেই আদৃতার ছেলেটা আবার শান্ত হয়ে বসে বসে খেলনা দিয়ে খেলতে লাগলো। পুরো রুমে নজর ঘুরিয়ে হতাশ হলো ভোর। যেই খেলার সাথী পেয়েছিলো ছেলেটা ওমনেই খেলতে, খেলতে চঞ্চল হয়ে উঠেছিলো এখন আবার শান্ত বাচ্চার রূপ নিয়েছে। মানুষ মুলত ছোটো থেকেই একাকিত্বতে ঘরকুনো আর দুর্বল হতে শিখে। ঠিক যেমন বর্তমান অবস্থা ভোরের। রুমটা গোছ-গাছ করতে লাগলো ভোর তার মাঝেই আদিব কেঁদে উঠলো। পেছন ঘুরে দেখলো কেবলই আদ্র রুমে প্রবেশ করেছে আর ওকে আসতে দেখেই বাচ্চা ছেলেটা ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। আদ্র ভাগ্নেকে কাঁদতে দেখে বিচলিত হলো এগিয়ে এসে কোলে তুলে নিলো । এতে কাঁন্না তো বন্ধ হলোই না উল্টো আদিবের কাঁন্না বেড়ে গেলো। আদ্র কিছু বুঝতে পারলো না। আদিব তো এমন করে কাঁদেনা। নানুর বাসায় এসেই মামার কোলে চড়ে বসে থাকে সেই ছেলে আজ মামাকে দেখেই ভয় পেতে শুরু করে দিয়েছে!! কেন? 


আদ্র ওকে থামানোর জন্য মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,


' কি হয়েছে মামা! কাঁদছো কেনো? কে কি করেছে !! এই যে মামা..... মামা শান্ত হও , ঘুরতে নিয়ে যাবো তো.... চকোলেট কিনে দেব , চিপ্ স কিনে দেব.... রাইডে চড়াবো ..... মামা..... আদিব ! '


আদিব থামলোনা। আজ যেনো চেনা পরিচিত মামাকে সে চিনতে পারছেনা । হাত ঘুরিয়ে ভোরের কোলে চলে আসার আকুঁতি জানালো। তা দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো আদ্র। ভোর আর দেরি করলো না। এগিয়ে এসে ছেলেটাকে নিজের কোলে তুলে বুকের সাথে মিশিয়ে ধরলো। 

ওর কাছে গিয়ে একটু একটু করে শান্ত হতে লাগলো। আদ্র সেদিকে চেয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো। দুপুর হয়ে এসেছে গোসল নেওয়া দরকার । 

আদৃতা ছেলের কাঁন্নার শব্দ পেয়ে এগিয়ে এসেছে। ভেতরে আসতে আসতে ছেলেকেই বললো,


' কি হয়েছিলো বাবা? মামি মে'রেছে! বকেছে? কাঁদছিলে কেনো তুমি? আম্মুকে জানাও! '


ভোর কিছুই বললোনা। চুপচাপ আদিবকে দিয়ে দিলো আদৃতার কাছে। মায়ের কোল পেয়ে শান্ত হলো পুরোপুরি। আদ্র তখন তোয়ালে নিতে রুমে এসেছে। বোনকে দেখতে পেতেই বললো,


' তোর ছেলেটা কেমন যেনো অদ্ভুদ আচরণ করছে। আমাকে দেখতে পেতেই কাঁ'দছিলো। '


' কাল থেকে তোকে ভয় পেতে শুরু করেছে আদ্র। কাল তুই যখন ভোরকে আঘা'ত করছিলি ও তখন দেখে নিয়েছিলো । তখন থেকেই ভয় পাচ্ছে তোকে। আমাকে বলছে , মামা ভিলেন কেনো!! '


আদ্র আর কিছু বললো না। তোয়ালে নিয়ে ফের ওয়াশরুমে ফিরে গেলো। আদৃতাও ছেলেকে নিয়ে চলে গেলো। ভোর বিছানায় গিয়ে বসলো। একটু বাদে আদ্র গোসল সেরে এসে ওয়্যারড্রোবের পাল্লা খুলে নিজের শার্ট খুঁজছিলো। কিন্তু না পেয়ে ভোরকে জিজ্ঞেস করলো,


' আমার ব্ল্যাক কালারের শার্টটা কোথায় রেখেছো? '


' আমি পরিষ্কার করে গতকাল রাতে ছাঁদে শুকাতে দিয়ে এসেছিলাম। রোদের তেজ কম হওয়ায় এখনো সেটা শুকায়নি। '


আদ্র অন্য একটা শার্ট গায়ে চাপাতে চাপাতে বললো,


' আমার কাপড়ে হাত লাগাবেনা। আমি নিজেই পরিষ্কার করে নেব। '


চলবে

জুঁই_ইসলাম


এই ওয়েবসাইটেই বাকি পর্ব গুলা দেওয়া হবে, ধন্যবাদ। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url