গল্পঃ অপবাদ
পর্বঃ_০২+শেষ পর্ব
লেখাঃ অনন্য শফিক
---------------------------
খালারা মাকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন। বললেন,
- 'ওরা হয়তো কারো থেকে ভুল তথ্য পেয়েছিল।শুনে বিশ্বাস করেছিল। তারপর কোনভাবে যাচাই বাছাই করে হয়তো দেখেছে তারা যা শুনেছে তা মিথ্যে। অপবাদ। এই বিয়ে ভাঙতেই কেউ এই অপবাদ ছড়িয়েছে!'
মা এক রকম বিলাপ করে উঠলেন। বললেন,'
- কে আমার অতো বড় ক্ষতি করতে চায়! ওরা তো বললো যে এই তথ্য দিয়েছে সে দূরের কেউ না। আমাদের নিজেদেরই লোক। এই লোকটা কে? কে এই কাল সাপ?'
ছোট খালা মায়ের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেন। তারপর ধমকের গলায় বললেন,
- 'আপা তুই থামবি? তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?বাড়ি ভর্তি লোক।খুব তো মান সম্মান নিয়ে ভাবছিস। কিন্তু তোর এমন ভাব যেন নিজের মান সম্মান নিজেই নষ্ট করতে খুব শখ হয়েছে তোর!'
মা থামলেন। সবকিছু আগের মতোই হতে লাগলো।সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো যার যার কাজে ।খালারা বাচ্চাদের খাওয়াতে লাগলেন।মামীরা সুপুরি কাটতে লাগলো। চাচীদের মধ্যে কেউ এখানে নেই।বড় চাচী অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। ছোট চাচী আসেননি।তার মাথা ব্যথা প্রচন্ড। বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না!
এর আরো খানিক পর আমার কাছে এলো অ্যানি। ছোট চাচার মেয়ে।এ বছর এইচএসসি দিয়েছে।এডমিশন নিবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোচিং করছে। ময়মনসিংহে থাকে। বিয়ে উপলক্ষেই বাড়িতে এসেছে।
অ্যানি এসে বললো,
- 'তোমার দু' হাত দেখি আপু।'
আমি হাত তুলে দেখালাম। সে চোখ কপালে তুলে বললো,
- 'ওমা একি কাণ্ড! রাত পাড় হতেই বিয়ে আর তুমি এখনও মেহেদি দেওনি হাতে! কারোর মাথায় কি নাই নাকি বিষয়টা? সবাই কি করছে? নিজেদের নিয়ে সবাই ব্যস্ত।যার বিয়ে তার খবর নেয়ার মতো একটা মানুষ নাই এই বাড়িতে।'
আমি হাসলাম অ্যানির কথা শুনে।অ্যানি আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। আগে কেমন লাজুক স্বভাবের ছিল সে। কম কথা বলতো।মিশতো না তেমন কারোর সাথে। এমনকি আমার সঙ্গেও না। সারাক্ষণ ঘরে শুয়ে বসে থাকতো। পড়াশোনা করতো। কিন্তু এখন ও অনেক বদলেছে। এখন সে সহজেই মিশতে পারে মানুষের সঙ্গে।গল্প শুরু করলে আর শেষ নাই।কথাও বলে গুছিয়ে। সুন্দর করে।
আমি বললাম,
- 'কে বললো খবর নেয়ার কেউ নেই, এই তো তুই আছিস। তুই দিয়ে দে দেখি মেহেদি।'
অ্যানি মেহেদী খুঁজে বের করে এনে আমার হাতে দিয়ে দিতে লাগলো। দেবার সময় নানান কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে বললো,
- 'উনার সঙ্গে ফ্রি হয়েছো নাকি?'
আমি বললাম,
- 'কার সঙ্গে?'
অ্যানি হাসলো।বললো,
- 'তোমার উনির সঙ্গে।'
আমি মজা করে বললাম,
- 'আমার উনিটা কে আবার?'
অ্যানি বিরক্তি নিয়ে বললো,
- 'তোমার উনিটা কে এটা তুমি জানো তবুও আমার সঙ্গে শুধু শুধু মজা নিচ্ছো। আচ্ছা আমিই বলি তবে।উনিটা তোমার জামাই। জামাইয়ের সঙ্গে ফ্রি হয়েছো তুমি?'
আমি খানিক সময় চুপ করে রইলাম। সে আমায় চুপ করে থাকতে দেখে বললো,
- 'চুপ হয়ে গেলে যে? ঘটনা কি? লজ্জা করছে নাকি তোমার? '
আমি বললাম,
- 'আরে উনি কল টল কিছুই দেয় না। একদিন একটু কথা হলো শুধু। তারপর ব্যস্ততা দেখিয়ে কেটে দিলো।'
অ্যানি অবাক হবার গলায় বললো,
- 'এসব কি বলো? রোজ কথা বলো না তোমরা?'
আমি বললাম,
- 'না। শুধু একদিন ওই একটু কথাই হয়েছিল। এরপর আর কোন কথা হয়নি।উনি কল দেয়নি। আমিও দেইনি।উনি না দিলে আমি কেন দিবো? আমি কি নির্লজ্জ নাকি!'
অ্যানি হি হি করে হেসে উঠলো। শব্দ করে।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
- 'হাসছিস কেন তুই এরকম করে?'
অ্যানি হাসি থামিয়ে বললো,
- 'একটা ঘটনা মনে পড়েছে তাই হাসছি।'
আমি বললাম,
- 'কিসের ঘটনা?'
অ্যানি বললো,
- 'আগে হাসতে দেও।হাসি শেষ হলে বলবো।'
আমি কিছু বললাম না।শক্ত হয়ে বসে রইলাম।
সে এবার হাসি থামিয়ে বললো,
- 'আমার এক বান্ধবীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল গত রোজার ঈদের সময়।দিন তারিখ সব ঠিক।আর পনেরো দিন পর বিয়ে। বিয়ের পর স্বাভাবিক ভাবেই হবু স্বামী- স্ত্রী কথা বলে।দেখাও করে। কিন্তু ছেলে তো আমার বান্ধবীকে ফোন দেয় না। একবারও না। বান্ধবী ফোন দিলেও কথা বলে না। কেটে দেয় কল।পরে এক পর্যায়ে এসে এই বিয়ে ভেঙে গেল। কেন বিয়ে ভেঙেছে জানো?'
আমি বললাম,
- 'কেন?'
অ্যানি আবার হাসতে লাগলো। হেসে গড়িয়ে পড়ছে আমার উপর। আমার রাগ লাগছে এবার ভীষণ! রাগ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
- 'হাসাহাসি পরে করিস। আগে কথা শেষ কর।'
অ্যানি কষ্ট করে হাসি থামালো। তারপর বললো,
- 'আরে, ওই ছেলের সমস্যা ছিল।'
বলে থেমে গেল আবার। আমি বললাম,
- 'কিসের সমস্যা ছিল?'
অ্যানি আবার বলতে শুরু করলো।বললো,
- 'ছেলের নাকি মেয়েদের প্রতি কোন আকর্ষন নাই। তার আকর্ষণ ছেলেদের প্রতি। ছেলে হয়ে ছেলের প্রতি আকর্ষণ বুঝলা? তাকে জোর জবরদস্তি করে তার মা বিয়ে করাতে চেয়েছিল। কিন্তু বিয়ের আগের দিন ছেলে বেঁকে বসলো। বললো এই বিয়ে সে কোনভাবেই করবে না। এরপরেও যদি তাকে জোরজবরদস্তি করে এই বিয়ে করাতে চায় তবে সে বিষ খাবে। মরবে।'
অ্যানি আবার হাসতে শুরু করলো কথাগুলো বলে।ওর কথাগুলো শুনে আমারও হাসার কথা। কিন্তু আমি হাসতে পারছি না।ওর হাসি শুনে খালারা, মা এমনকি আরো আত্মীয় স্বজন যারা ছিল ঘরে সবাই এসে উঁকি দিয়ে গেল। ওরা গেলে অ্যানির দিকে গরম চোখে তাকিয়ে আমি বললাম,
- 'তোর ধারনা যে লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে সেও এমন?'
অ্যানি হাসি থামিয়ে বললো,
- 'ধারণা করে লাভ নাই।কারোর সম্পর্কে না জেনে ধারণা করা ঠিক না। তুমি এক কাজ করো।উনার সঙ্গে কল ধরিয়ে দেও।আমি বরং সরাসরি জিজ্ঞেস করি তার এরকম কোন রোগ আছে কি না!'
অ্যানির সঙ্গে আমার হাসাহাসি করার প্রয়োজন ছিল। সে মজা করছে। আনন্দ করছে।করতেই পারে। আমার হবু বর তার বোন জামাই। বোন জামাইকে নিয়ে মানুষ ঠাট্টা করেই। কিন্তু আমি হঠাৎ করেই একেবারে চুপচাপ হয়ে গেলাম।
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, যার সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে তার মধ্যে বড় কোন সমস্যা আছে। একটু আগে যে ওখান থেকে ফোন করে ছেলের মামা বললো আমাদের বাড়ি থেকে কেউ অপবাদ দিয়েছে, এটা মিথ্যে।ওরা বানিয়ে বলেছে এটা। নিজেদের দোষ ঢাকতেই একটা ছল চাতুরি খুঁজে বের করেছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এখানে বিরাট একটা ঝামেলা আছে। এই যে ছেলের মা আবার ফোন দিলো।বললো কাল ওরা আসবে। আমাকে বউ করে নিয়ে যাবে।
আমার মনে হচ্ছে ছেলে বর সেজে আসবে না। আসবে তার মা।মা এসে আমায় নিয়ে যাবে।ছেলের কোন একটা সমস্যা তো আছেই। সে হয়তো চায় না এই বিয়ে হোক। তার মা জোরজবরদস্তি করে এই বিয়ে করাচ্ছে।যদি সে চায়তো তবে বিয়ে ঠিক হবার পর পঁচিশ দিন পাডর হয়ে গেল। এরমধ্যে শুধু একদিন কথা বললো।তাও এখান থেকে কল দেয়ার পর।নিজ থেকে কোনদিন কল দেয়নি কেন সে?
অ্যানি আমার দিকে হা করে তাকালো। তারপর বললো,'
- 'তুমি দেখি সত্যি সত্যি চিন্তায় পড়ে গেছো আপু।আরে এসব কিছুই না। উনি সম্ভবত লাজুক স্বভাবের।দেও তোমার ফোন দেও।কল দেই। তুমি হয়ে কথা বলবো। তোমার কন্ঠ তো আর উনি চিনেন না। বুঝবে না আমি কথা বলছি।'
আমি বললাম,
- 'উঁহু।বাদ দে। এসবের দরকার নাই । ভাববে বেহায়া আমি।'
অ্যানি জোর করে ফোন টেনে নিলো। তারপর সেইভ করা নম্বর দেখে কল করলো। কল দেয়ার পর রিং হলো। কিন্তু ওপাশ থেকে রিসিভ করলো না। একবার না। পরপর কয়েক বার কল দেয়ার পরেও রিসিভ করলো না!
অ্যানি আমার দিকে তাকালো।তার মুখ শুকনো। আমি ভয়ে তটস্থ হয়ে গেলাম।সত্যি বলতে এর আগে আমি ভেবেছিলাম আমার হবু বর সম্ভবত কিছুটা লাজুক স্বভাবের। এছাড়া ভাবতাম উনি সম্ভবত কাজে ব্যস্ত থাকে।এর আগে আমার মনে একটুও দুশ্চিন্তা জায়গা করে নিতে পারেনি। কিন্তু অ্যানি এসে এসব বলার পর কেন জানি মনের ভেতর নানান দুশ্চিন্তা জায়গা করে নিলো।
নিজেকে কিছুতেই আর চিন্তামুক্ত করতে পারছি না। এই যে অ্যানি হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিচ্ছে, এসবে আর আমার আনন্দ হচ্ছে না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এইসব আয়োজন মিছে মিছি হচ্ছে। আমার এই বিয়েটা হবে একটা পুতুল বিয়ের মতোই।এর বেশি কিছু না!
(চলবে)...গল্পঃ #অপবাদ
পর্বঃ_০৩ (শেষ)
লেখাঃ #অনন্য_শফিক
---------------------------
বর এলো পরদিন বিকেলে। সঙ্গে তার মা।গোটা কতক আত্মীয় স্বজন। বাইরের কেউ আসেনি।কম সংখ্যক লোক নিয়েই তারা এসেছে। আমরা তখনও ভয়ে তটস্থ।কি হয় না হয় বুঝতে পারছি না কিছু।
আমার হবু শাশুড়ির মুখে রাগের ছাপ। এখানে আসার পর মা, খালারা তার পাশে গিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলে তিনি কিছুই বলেননি।মুখ ভার করে রেখেছেন। তিনি কথা বললেন আরো আধঘন্টা পর। বাবার সাথে।
বাবাকে তিনি ডেকে বললেন,
- 'বেয়াই, এদিকে আসেন।বসেন। আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।'
বাবা তার পাশে বসলেন। বাবার মুখ ভয়ে কাচুমাচু।
শাশুড়ি এবার বাবাকে বললেন,
- 'বিশাল আয়োজন করলেন দেখা যায়! বাড়ি ভর্তি মেহমান। আত্মীয় স্বজন। গোষ্ঠীর লোক!'
বাবা নরম গলায় বললেন,
- 'একটা মেয়ে আমার। এদের ছাড়া বিয়ে দেই কি করে! ওদের কোলে কাঁখে করেই তো মেয়ে বড় হয়েছে। মানুষ হয়েছে।'
আমার হবু শাশুড়ি বাবার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। শব্দ করে।এই হাসিটা মোটেও স্বাভাবিক না।
তারপর হাসি থামিয়ে বাবাকে বললেন,
- 'তাহলে যারা যারা আপনার মেয়ের বিয়ে খেতে এসেছে এদের সবাই আপনার মেয়ের শুভাকাঙ্ক্ষী?'
বাবা এই কথার উত্তর দেবার আগেই মেজো খালা গিয়ে ওখানে উপস্থিত হলেন। তিনি গিয়ে আমার শাশুড়ির হাত টেনে ধরে বললেন
- 'সারা জীবন বেয়াইয়ের সঙ্গে গল্প করতে পারবেন। এখন আসুন।হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। আপনার জন্য লেবুর শরবত করেছি। এই গরমের মধ্যে অতোদূর জার্নি করে এসেছেন!'
আমার হবু শাশুড়ি বললেন,
- 'এখন না। আপনারা আমায় বিরক্ত করবেন না দয়া করে। এখানে আমি খেতে আসিনি।'
উনার কথা শুনে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। তাহলে কি মার কথাই সত্য? ইনি সবার সামনে আমাদের অপমান অপদস্থ করে যেতেই এসেছেন?
খালাকে তখনও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার হবু শাশুড়ি বললেন,
- 'আপনি দয়া করে এখান থেকে যান। আমার সঙ্গে কেউ আলাদাভাবে খাতির দেখানোর প্রয়োজন নাই।'
মেজো খালা মন খারাপ করে ওখান থেকে চলে গেলেন।
আমরা কেউই উনার হাব ভাব কিছুই বুঝতে পারছি না। উনার উদ্দেশ্য কি আসলে? বাবার সঙ্গে খানিক সময় এটা ওটা নিয়ে কথা বলে তিনি আমার কাছে এলেন।
এসে পাশে বসে বললেন,
- 'কেমন আছো?'
আমি ভয়ে জড়িয়ে আসা গলায় বললাম,
- 'জ্বি ভালো। আপনি কেমন আছেন?'
উনি এই কথার উত্তর দিলেন না। আমার দিকে দীর্ঘ সময় ধরে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আমায় জিজ্ঞেস করলেন,
- 'তোমার চাচা কয়জন?'
আমি বললাম,
- 'এক চাচা। তিনি আব্বার ছোট।'
এরপর বললেন,
- 'তার সন্তানাদি কয়জন?'
আমি বললাম,
- 'এক মেয়ে।'
- 'ছেলে নাই?'
- 'জ্বি না।'
- 'ভালো। তো তোমার চাচী কোথায়? আসার পর থেকে তো উনারে দেখলাম না তোমাদের ঘরে?'
আমি বললাম,
- 'উনার অসুখ। বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না?'
শাশুড়ি আমায় আর কিছু বললেন না। তিনি গলা বাড়িয়ে মাকে ডাকলেন।
- 'বেয়াইন, ও বেয়াইন, এদিকে আসেন।'
মা এলেন সঙ্গে সঙ্গে।মা এলে তিনি রসিকতা করে বললেন,
- 'মেয়ে বললো আপনার জা নাকি বিছানায় পড়ে গেছে। কতোদিন ধরে বিছানায় পড়া উনি?'
আমার এসব রসিকতা মোটেও ভালো লাগছে না।রাগ লাগছে খুব! এই মহিলা এখানে এসেছে সবাইকে অপমান করে যেতে। আমার মন কেমন করছে। ইচ্ছে করছে এই বিয়েটা ভেঙ্গে যাক। অপমান হলে হোক আমার। ওখানে বিয়ে হলে এই মহিলা আমার জীবন এমনিতেও অতিষ্ঠ করে ছাড়বে! এরচেয়ে এই বিয়ে না করে কপালে কলঙ্কের দাগ নিয়ে জীবন পার করে দেয়ায় ভালো।
মা আমার হবু শাশুড়িকে বললেন,
- 'তার মাথা ব্যথা কাল রাত থেকে। উঠতে পারছে না বিছানা থেকে।'
মা এই কথা বলে শেষ করার আগেই অ্যানিদের ঘর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি আর কান্না শোনা গেল।সবাই দৌড়ে গেল ওদিকে। গিয়ে দেখে ছোট চাচী জ্ঞান হারিয়েছেন। তার মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে।
আমার শাশুড়ি এই খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে অ্যানিদের ঘরে চলে গেলেন। আমায় বললেন তার সঙ্গে যেতে।আমরা গিয়ে দেখি ছোট চাচীর মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে।পানি ঢালছেন আমাদের বড় খালা।অ্যানি পাশে বসে কাঁদছে।আম্মা ছোট চাচীর হাতে পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে।
আমার হবু শাশুড়ি গিয়ে ওখানেও অদ্ভুত কান্ড করলেন।
তিনি বললেন,
- 'গায়ে তেল মালিশ আর মাথায় পানি ঢালা বন্ধ করুন। দরকার নাই এসবের।'
শুনে এতো রাগ লাগলো আমার! একটা মানুষ বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে আর তাকে নিয়ে তিনি রসিকতা করছেন! ছিঃ!
তারপর তিনি আবার বললেন,
- 'এখানে শুধু নিজেদের লোকেরা থাকবে। বাইরের সবাই বেরিয়ে যান।'
বাইরের যারা ছিল তারা বিরক্ত মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমার শাশুড়ি এবার ছোট চাচীর মাথার পাশে বসলেন।
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
- 'বেয়াইন, আপনি কি জানেন আপনার মেয়ে সম্পর্কে মন্দ কথাগুলো কে বলেছিল?'
মা কিছু বলার আগেই ছোট চাচী লাফিয়ে উঠলেন বিছানা থেকে। উঠে বসে বললেন,
- 'আমি কিছু বলিনি। আমি কিচ্ছু বলিনি।'
সবাই অবাক হলো।একে অপরের চেহারার দিকে তাকালো। আমিও ভীষণ অবাক হলাম।চাচী জ্ঞান হারিয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। তার সেরে উঠার জন্য সেবা শুশ্রূষা চলছে। এরিমধ্যে আমার শাশুড়ি আমার মাকে উদ্দেশ্য করে একটা কথা বলছেন, আর এই কথা শুনে ছোট চাচী তার জ্ঞান ফিরে পেয়ে একেবারে বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসলেন। ঘটনা কি?
আমার হবু শাশুড়ি হাসলেন। শব্দ করে। তারপর তিনি আমার ছোট চাচীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
- 'আপনি যে গতকাল ফোন দিয়ে আমায় বললেন আমার ছেলে যে মেয়েকে বিয়ে করছে তার চরিত্র খারাপ। গোপনে বিয়ে করেছিল সে। সংসারও করেছে গোপনে। এইগুলো কি সত্যি আপা?'
আমরা সবাই চমকে উঠলাম এই কথা শুনে। ছোট চাচী এমন কাজ কিভাবে করলেন? কেন করলেন?
ছোট চাচী কিছু বলার আগেই অ্যানি চাচীর দিকে তাকালো রাগী রাগী চোখে। তারপর ধারালো গলায় জিজ্ঞেস করলো,
- 'মা, তুমি কি এসব বলেছো?'
ছোট চাচী কথা বলেন না। তার মুখ ভয়ে থমথমে হয়ে আছে। অ্যানি গিয়ে তার মায়ের হাত টেনে নিয়ে তার মাথায় তুলে ধরলো।
তারপর বললো,
- 'এবার বলো, তুমি এসব বলেছো কি না? আমার কসম করে বলো?'
ছোট চাচী কাঁপতে শুরু করলেন থরথর করে।এক পর্যায়ে তিনি কেঁদে ফেললেন।
তিনি বললেন,
- 'আমি বুঝতে পারিনি। আমার ভুল হয়ে গেছে!আমি ভুলে এসব করেছি।'
অ্যানি সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় তার মায়ের হাতটা সরিয়ে নিলো। তারপর দূরে ছিটকে সরে এসে রাগে দুঃখে কান্নার গলায় বললো,
- 'মা, আজ থেকে তোমাকে মা বলে ডাকতে গিয়েও আমার ঘেন্না হবে। ছিঃ মা! এটা কিভাবে করলে তুমি? কেন করলে?'
ছোট চাচীর মুখ থেকে আর কোন জবাব এলো না।
আমার শাশুড়ি তখন ছোট চাচীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
- 'আপা, অন্য মানুষের ক্ষতি করতে গিয়ে কতো কতো মানুষ যে নিজেদেরই কতো বড় ক্ষতি করে ফেলে! একটা বিষয় সব সময় মনে রাখবেন। ভালো মানুষদের রক্ষা করেন স্বয়ং আল্লাহ নিজেই। আপনি কি ভেবেছিলেন আমি কোন রকম যোগাযোগ না করে, যাচাই বাছাই না করেই আপনার কথা শুনে বিয়ে ভেঙে দিবো?
অতোটা বোকা লোক আমি না! আপনি এসব বলার পর আমি সব রকমের খবরাখবর নিয়েছি। খবর নিয়েই এখানে এসেছি আমার ছেলের হবু বউকে বিয়ে করিয়ে নিয়ে যেতে।'
ছোট চাচী তখন আর কিছুই বলতে পারলেন না। অপরাধীর মতো চুপচাপ হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
পরে ছোট চাচা এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা করলেন। চাচীকে রাখবেন না। বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিবেন। এরকম বললেন। কিন্তু বাবার জন্য তিনি এটা করতে পারলেন না।বাবা বোঝালেন। বললেন, ‘মেয়ে বড় হয়েছে। এখন এসবের সময় না।আর তার ভুল সে বুঝতে পেরেছে। ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য হলেও মানুষকে সুযোগ দিতে হয়।’
'
'
'
আমার বিয়ে হয়ে গেল সেদিনই।আমি ভয়ে তটস্থ ছিলাম। ভাবছিলাম শাশুড়ি সুবিধার হবে না। কিন্তু আমার ধারণা ভুল হয়েছে। উনি প্রচন্ড রকম ভালো মানুষ।আর হাসব্যান্ড একটু লাজুক স্বভাবের। এই জন্যই সে আগে ফোন করতো না। কথা বলতে আগ্রহ দেখাতো না। কিন্তু এমনিতে সে অসম্ভব রকমের ভালো মানুষ।
'
ছোট চাচী সুবিধার মানুষ না হলেও অ্যানি প্রচন্ড রকম ভালো মেয়ে। কিন্তু খোদার কি খেয়াল কে জানে! অ্যানিকে বিয়ে দিতে গিয়ে চাচীর বড় কষ্ট হয়েছে।যতোবার বিয়ের আলাপ আসে, ততোবার পাড়ার কেউ না কেউ অপবাদ রটিয়ে দেয়। এরপর প্রায় ঠিক হয়ে যাওয়া বিয়েও পর্যন্ত ভেঙে যায়। এমনকি একবার তিনি তার বাবার বাড়ি থেকে অ্যানিকে বিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু ওখানেও ওই একই ঝামেলা। মানুষ অপবাদ রটিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত চাচী একদিন আমার সঙ্গে কথা বললেন। আমার হাত ধরে কেঁদে কেঁদে তিনি বললেন,
- 'তুই আমারে মাফ করে দে মা।মন থেকে মাফ করে দে।তুই মাফ না করলে আমার কপাল থেকে এই দুর্দশা কোনদিন কাটবে না!'
আমি ছোট চাচীকে বললাম,
- 'চাচী, আপনি আমায় ভুল বুঝছেন।অ্যানি আমার বোন। এই বাড়িতে আমরা দুটি মাত্র মেয়ে। বোনের খারাপ কি কোনদিন তার বোন চাইবে বলুন আপনি?'
ছোট চাচী চুপ হয়ে রইলেন। তিনি কোন কথাই বলতে পারলেন না। আমি কথা বললাম। বললাম,
- 'চাচী, অ্যানিকে আমার সঙ্গে দিয়ে দিন।আমি ওর বিয়ের ব্যবস্থা করবো।'
আমার শশুর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমিই অ্যানির বিয়ের ব্যবস্থা করলাম।পাত্র আমার হাসব্যান্ডের বন্ধু।নিষাদ নাম ওর। খুব ভালো ছেলে। সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। সমাজের অসহায় দুস্থদের জন্যও সে কাজ করে।
তাকে একদিন সব কিছু খুলে বললাম। বললাম, ‘অ্যানির মতো মেয়ে হয় না! ভালো পড়াশোনা করেছে ও। কিন্তু কেন যে মানুষ তার সঙ্গে এমন করে! মিথ্যে কথা রটায়!’
নিষাদ বললো,
- 'আমায় দুদিন সময় দিন।আমি একটু ভাববো।আর অ্যানির সঙ্গেও একটু কথা বলবো।'
পরদিন অ্যানিকে নিয়ে নিষাদ বিকেল বেলা বাইরে ঘুরতে গেল। সন্ধ্যা বেলায় ফিরে এসে সে বললো,
- 'এই বিয়ে সে করতে চায়।'
এর সপ্তাহ খানিক পরেই ধুমধাম করে অ্যানির বিয়ে হয়ে গেল। তাকে তুলে দেয়া হলো বাড়ি থেকেই। এবার আর কোন রকম অপবাদ রটিয়ে কেউ এই বিয়ে আটকাতে পারেনি।
সত্যিই অপবাদ খুব খারাপ একটা জিনিস। অপবাদ যারা রটায় তারা তো খারাপই।আর যারা যাচাই বাছাই না করেই এইসব অপবাদ বিশ্বাস করে নেয় তারা আরো ভয়াবহ রকমের খারাপ!
--- সমাপ্ত --
