#আলো_আঁধার [২]

#জেরিন_আক্তার_নিপা 


আলো এখনও চোখে হাত দিয়ে রেখেছে। তীব্র আলোয় চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে তার। সে ভেবে পাচ্ছে না, এই রাতের বেলা একটা গাড়ি তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কেন? হঠাৎ তার মনে একটা ভয় ঢুকে গেল। গাড়িতে যারা আছে তাদের মনে খারাপ কোন উদেশ্য নেই তো? আলো নিজের পেটের দিকে তাকাল। এই অবস্থায় আল্লাহ যেন তাকে কোন বাজে পরিস্থিতিতে না ফেলে। এই মুহূর্তে কোন বাজে লোকের পাল্লায় পড়লে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। মনে মনে দোয়া দরূদ পড়তে শুরু করল আলো। তখনই সশব্দে গাড়ির দরজা খুলে একটা লোক নেমে এলো। অন্ধকার থাকায় লোকটাকে চিনতে পারল না সে। কয়েক পা হেঁটে এসে লোকটা আলোর সামনে দাঁড়ালে আলো তাকে ভালো করে দেখে চেনার চেষ্টা করল। স্মৃতিতে একটু চাপ দেওয়ার পর আলো লোকটাকে চিনে ফেলল। আলো ভেবে পাচ্ছে না, এই লোক এখানে কী করছে? 

দীপ্ত পলকহীন দৃষ্টিতে আলোকে দেখছে। আলোর মুখের উপর থেকে চোখ সরে সবার আগে ওর উঁচু পেটটার দিকে দীপ্তর চোখ গেল। আলো সেটা বুঝতে পেরে শাড়ির আঁচল দিয়ে ভালোভাবে পেট ঢেকে নিল। দীপ্ত সেটা দেখে হাসল। দীপ্তই আগে কথা বলল,


-"কেমন আছো, আলো?"


-"আপনি এখানে কোত্থেকে এলেন?"


দীপ্ত আবারও হেসে বলল,


-"এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। দেখলাম কেউ একজন ব্রিজের নিচে উঁকি দিয়ে দেখছে। ভাবলাম সুইসাইড করতে যাচ্ছে হয়তো। মানুষটাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে এলাম। কাছে এসে দেখলাম মানুষটা একজন নারী।

আর এখন সামনে দাঁড়িয়ে দেখছি সেই নারী আর কেউ না তুমি।"


আলো দীপ্তকে দেখছে। মানুষটাকে সে দুই বছর আগে থেকে চিনে। তেমন বিশেষ কোনো চেনা না। তবুও মানুষটাকে সে মনে রেখেছে একটা বিশেষ কারণে। দীপ্তকে এতটা সহজ হতে দেখে আলো মনে মনে ভাবল, এই মানুষটা কি সেই মানুষ! যে দুই বছর আগে তার জন্য কেমন একটা পাগলামি কাণ্ড করেছিল! এখনও ভাবলে বিশ্বাস হতে চায়না তার। দীপ্ত কি এই দুই বছরে সবকিছু ভুলে গেছে? নইলে আলোর সামনে এতটা স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারছে কীভাবে? আলো নিজের পরিস্থিতির উপরই মনে মনে হাসল। দীপ্ত তার আজকের এই অবস্থার কথা জানতে পারলে নিশ্চয়ই একচোট হাসবে। তার সামনে প্রকাশ্যে না হাসলেও মনে মনে তো অবশ্যই হাসবে। হাসারই কথা। আলো তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বাবা মা'র পছন্দে ওই লোকটাকে বিয়ে করেছিল সেদিন। আলোর ভাবনায় ছেদ ফেলে দীপ্ত বলল,


-"তুমি এত রাতে এই ব্রিজের উপর কী করছো?"


আলো কোন উত্তর দিল না। দীপ্ত তার উত্তরের অপেক্ষা করে আবার বলল,


-"উঁকি দিয়ে যে দেখছিলে, তুমি জানো নিচে কত গভীর খাদ। বাই চান্স মাথা ঘুরে যদি নিচে পড়ে যেতে! তখন তোমার কী অবস্থা হতো ভেবে দেখেছ একবার?"


হুহ্, যার কপালে দুঃখ লেখা আছে, সে দুঃখ গুলো ভোগ না করে অত সহজে মরবে কী করে? আলোর উপর দিয়ে যে ঝড় যাচ্ছে তার থেকে মৃত্যুই তার কাছে সহজ মনে হয়। বেঁচে থেকে আলো প্রতিটা মুহূর্তে আর এই যুদ্ধ করতে পারছে না। তার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে এসেছে। তাচ্ছিল্যের সুরে আলো বলল,


-"আমার কিছু হবে না। আমি এত সহজে দুনিয়া থেকে বিদায় নেব না।"


দীপ্ত কপাল কোঁচকাল। বলল,


-"ধরো যদি কিছু হয়ে যায়। নিজের জন্য না ভাবো' দীপ্ত আলোর পেটের দিকে ইশারা করে বলল, ওর কথা তো ভাবতে পারো।"


আলো মনে মনে বলল,


-"ওর কপাল আর আমার থেকে ভালো কোন দিক দিয়ে! জন্মের আগেই নিজের বাপ তাকে অন্যের 'পাপ' বলেছে। নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করছে না। দুনিয়াতে এলে তার কপাল ভালো হয়ে যাবে না। তাকেও আমার মতই সারাজীবন দুঃখ, কষ্ট সহ্য করতে হবে।"


দীপ্ত হঠাৎ তাড়া দেওয়া গলায় বলল,


-"এত রাতে কোথায় যাচ্ছিলে বলো তো। আমি তোমাকে নামিয়ে দিই।"


-"তাহলে আর বাকি থাকবে না কিছু। কলঙ্কের ষোল কলা পূর্ণ হবে।"


-"কিছু বললে? আমি ঠিক শুনতে পাইনি।"


-"না। আপনাকে কিছু বলিনি।"


-"তাহলে চলো। তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। এই সময় একা যাওয়া তোমার জন্য সেফ হবে না।"


-"আপনাকে শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না। আপনি যেখানে যাচ্ছিলেন, যেতে পারেন। আমি একা একাই যেতে পারব। আমার কোন সমস্যা হবে না।"


-"জেদ কোরো না তো। বলছি নামিয়ে দিয়ে আসি। চলো, গাড়িতে আসো।"


এত বলার পরও যখন দীপ্ত ওর কথা শুনছে না, তখন আলোর রাগ উঠে গেল। লোকটা কেন তার সমস্যা বুঝতে চাইছে না? কেন জেদ করছে? এখন উনার সাথে কোথাও গেলে বদনাম তারই হবে। এমনিতেই তো কত বদনামের ভাগিদার হয়েছে সে। লোকের চোখে তার কলঙ্কের শেষ নেই। নতুন করে আর কোন কলঙ্ক সহ্য করতে পারবে না সে। তাই আলো রেগে গিয়ে বলল,


-"আমি বলছি তো, আমি একা যেতে পারব। শুধু শুধু আপনি কেন জেদ করছেন? নিজের কাজে যান না আপনি। আমাকে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। নিজের ভালো আমি নিজেই বুঝে নেব।"


দীপ্ত থতমত খেয়ে গেলেও কিছু বলল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে আবার বলল,


-"আলো, কিছু হয়েছে তোমার? এনিথিং রং? তুমি এমন বিহেইভ করছো কেন?"


আলোর মাথা ফেটে যাচ্ছে। সে আর সহ্য করতে পারছে না। এমনিতেই ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। চোখ ভরে ঘুম আসছে। এদিকে এই ছেলে তার পিছুই ছাড়তে চাইছে না। তার জীবনে যা ইচ্ছা তা হোক, ধ্বংস হয়ে যাক সব। তাতে ওই ছেলের কী? সে কেন আলোর জন্য এত চিন্তা করছে! নাকি দুই বছর আগে তার সেই সিদ্ধান্তের জন্য এখন ওর বর্তমান অবস্থার উপর হাসছে! মজা নিতে এসেছে। আলো চেঁচিয়ে বলল,


-"আপনাকে বলেছি না, আমাকে নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। আমার জন্য কেন অত দরদ দেখাচ্ছেন? আমি আপনার কে হই? যেখানে নিজের আপনজনেরা আমাকে নিয়ে ভাবে না। সেখানে আপনি কে? কেন আমার জন্য ব্যস্ত হচ্ছেন?"


বলতে বলতে আলো মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে নিলে দীপ্ত এসে ওকে ধরে ফেলে। বেশি উত্তেজিত হওয়ার কারণে আলো জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সকাল থেকে খাওয়া হয়নি। পেটে একটা দানাপানি পড়েনি। সে তো এখন একা না। এই শরীরে এত ধকল সহ্য হয় এখন! সকাল থেকে না খাওয়া, তার উপর শরীরের উপর এত অত্যাচার। মারের জায়গায় গুলো এখন নীলচে হয়ে শক্ত জমাট বেঁধে গেছে। মা'র ওখান থেকে বেরিয়ে এই অবস্থায় দুই কিলোমিটার হেঁটেছে। যার ফলস্বরূপ আলো এখন জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যেতে নিচ্ছিল। দীপ্ত না থাকলে আলো পড়েই যেত। দীপ্ত আলোকে ধরার পর বুঝতে পারল আলোর গা গরম। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। দীপ্ত আর দেরি করল না। আলোকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসিয়ে দিল। দীপ্ত নিজে ড্রাইভিং সিটে ওঠে বসে আলোর মাথা ওর কাঁধে রেখে গাড়ি স্টার্ট করল। আলো তার পাশে,তার কাঁধে মাথা রেখে, তার বাড়িতে যাচ্ছে ভাবতেই মনটা নেচে উঠছে দীপ্তর। এই মেয়েটাকে এক সময় সে ভালোবেসে ছিল। এখনও বাসে। আলোকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিল এক সময়। সেটা সত্যি নাহলেও এখন তো আলো তার পাশে আছে। ইশশ, এই সময়টা যদি এখানেই থেমে যেত।


দীপ্ত অচেতন আলোকে কোলে নিয়ে মেইন ডোর দিয়ে ঢোকার সময় মেজ চাচীর চোখে পড়ে গেল। মেজ চাচী ডাইনিংয়ে পানি খাচ্ছিলেন। দীপ্তকে দেখে হাত থেকে গ্লাস রেখে গলা ফাটিয়ে সবাইকে ডাকতে লাগল,


-"বাবা! বাবা, ভাইজান! ও ছোট কোথায় তোরা? জলদি এদিকে আয়। এসে দেখে যা দীপ্ত কাকে নিয়ে এসেছে। বড় ভাবী এলেন না, আপনার ছেলে কী কাণ্ড করেছে এসে দেখে যান একবার।"


দীপ্ত মেজ চাচীর কথায় কান না দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মেজ চাচীর স্বভাবই ছোট একটা বিষয় নিয়ে চিৎকার চেচাঁমেচি করে তাকে হাতির রূপ দেওয়া। কিন্তু ততক্ষণে মেজ চাচীর ডাকে সবাই হলরুমে এসে গেছে। দীপ্তর দাদা আব্দুর রহমান খান সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে গমগমে গলায় বললেন, 


-"কী হয়েছে এখানে? বাড়িতে ডাকাত পড়েছে নাকি? এত চিৎকার চেচাঁমেচি কিসের? সবাই কি ভুলে গেছ এটা ভদ্র লোকের বাড়ি। রাত বিরাতে হৈচৈ আমি একদম সহ্য করব না।"


মেজ চাচী সাথে সাথেই বলে উঠলেন, 


-"চিৎকার চেচাঁমেচি কি এমনি করছি বাবা? দেখুন আপনার নাতি রাত বিরাতে কাকে যেন বাড়িতে নিয়ে এসেছে। ওর দিকেই তাকিয়ে দেখুন না। মেয়েটা ওর কোলে ঘুমিয়ে আছে।"


দীপ্ত আগুন চোখে চাচীর দিকে তাকাল। চাচী আজ দীপ্তর চাওয়ায় ভয় পেল না।

দীপ্তর বাবা গলা চড়িয়ে এগিয়ে এলেন। 


-"দীপ্ত, এসব কী হ্যাঁ? কাকে নিয়ে এসেছ তুমি? তুমি এভাবে যাকে তাকে যখন তখন এই বাড়িতে নিয়ে আসতে পারো না। এই বাড়ির কিছু নিয়ম আছে। তুমি সেসব নিয়ম অমান্য করতে পারো না।"


দীপ্ত শক্ত অথচ শান্ত গলায় বলল,


-"আমি যাকে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসিনি বাবা। আর এ বাড়ির কোন নিয়মও ভাঙিনি।"


মেজ চাচী আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। দীপ্ত চোখ পাকিয়ে উনার দিকে তাকালে উনি দমে গেলেন। তবুও মিনমিনিয়ে বললেন, 


-"যাকে তাকে নিয়ে না আসলে এই মেয়েটা কে? মেয়েটা তো নিজের পায়েও হেঁটে আসছে না। সোজা কোলে ওঠে আসছে! বাবা!"


দীপ্তর মা এবার কথা না বলে থাকতে পারলেন না।


-"মেজ তুই চুপ করবি? আমার ছেলেকে নিয়ে তোর মাথা ঘামাতে হবে না। তুই তোর ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভাব। আমার ছেলের ব্যাপার আমিই ঠিক দেখে নেব।"


-"ভা-ভাবী ও...


দাদা ওদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, 


-"আহ্, থামবে তোমরা? দীপ্তর সাথে আমাকে কথা বলতে দেবে? দীপ্ত, কে এই মেয়ে? ওকে এভাবে কেন বাড়িতে নিয়ে এসেছ?"


-"দাদু ওর আপাতত যাবার কোন জায়গা নেই। তাই ও কিছুদিন আমাদের বাড়িতে থাকবে।"


দীপ্তর বাবা অবাক হয়ে বললেন, 


-"থাকবে মানে? ওর যাবার জায়গা নেই তাতে আমাদের কি? পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষেরই থাকার জায়গা নেই। তাই বলে কি সবাইকে তুমি আমাদের বাড়িতে এনে তুলবে! অচেনা একটা মেয়েকে আমাদের বাড়িতে কেন থাকতে দেব?"


-"সবার কথা জানি না বাবা। ওকে এই বাড়িতে থাকতে দেবে কারণ আমি ওকে বিয়ে করব। পৃথিবীর সব আশ্রয়হীন মেয়েকে যদি বিয়ে করতাম তাহলে হয়তো তাদের সবাইকেই এই বাড়িতে জায়গা দিতে হতো। সবাইকে যেহেতু করতে পারছি না। তাই আপাতত আলোকেই বাড়ির বউমা মেনে নাও।"


দীপ্তর এসব কথা শুনে সবার মুখ থেকে সমস্বরে একটা কথাই উচ্চারণ হল,


-"বিয়ে!"


-"হ্যাঁ, দুই বছর আগে আমি ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। তখন পারিনি। কিন্তু এবার আমি কারো বাধা মানব না।"


বাবা রেগে গিয়ে বললেন, 


-"দুই বছর আগে কেউ তোমাকে বাধা দেয়নি। ওই মেয়ে নিজেই তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।"


-"মানুষ মাত্রই ভুল বাবা। তখন সে যে ভুল করেছে তা এখন শুধরে নিবে।"


এতক্ষণে বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নিয়ে মা বললেন, 


-"তুই কি ওকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিস দীপ্ত! মেয়েটা জেগে নেই কেন? অজ্ঞান করে তুলে এনেছিস! বিয়েতে এই মেয়ের মত আছে!"


দীপ্ত মা'র মুখের দিকে তাকিয়ে 'সব ঠিক আছে' হাসি দিল। ছেলের মুখে এই হাসি দেখলে উনার আর কোন চিন্তা থাকে না। কিন্তু মেজ চাচী বলে উঠলেন, 


-"কিন্তু এই মেয়ের তো বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তুমি একটা বিবাহিতা মেয়েকে বিয়ে করবে দীপ্ত! ওর স্বামী কি ওকে ডিভোর্স দিয়েছে? নাকি তুমি ভয় দেখিয়ে... 


দীপ্তর আগুন চোখের দিকে তাকিয়ে চাচী এর বেশি কিছু বলার সাহস পেলেন না।

#আলো_আঁধার [৩]

#জেরিন_আক্তার_নিপা 


-"আমি আলোকেই বিয়ে করব। ও-ই আমার বউ হবে। এতে যদি কারো কোনো আপত্তি থাকে তাহলে আমাকে বলো। আমি আলোকে নিয়ে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।"


ছেলের কথা শুনে ইয়াসির খান রাগ সামলাতে না পেরে কাঁপা গলায় বললেন, 


-"দীপ্ত তুমি কিন্তু অসভ্যতা করছো।"


-"করলে করছি বাবা। কোনোকালেই তো আমি তোমাদের চোখে সভ্য ছিলাম না।"


-"দীপ্ত! "


বাবা ছেলের মাঝে গুরুতর ঝগড়া লেগে যাবার আগে আব্দুর রহমান খান ওদের দু'জনকেই থামিয়ে দিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, 


-"বিয়ে তোমার যাকে খুশি তুমি তাকেই করতে পারো। এতে আমাদের আপত্তি থাকার কিছু নেই। দুই বছর আগেও আমি তোমাকে বাধা দেইনি। এবারো দেব না। কিন্তু যে মেয়ে তোমাকে দুই বছর আগে ফিরিয়ে দিয়েছে। এবার কি সে তোমাকে গ্রহণ করবে? এবারো যে এই মেয়ে নিজের বাবা মা'র কথা শুনে তোমার হাত ছেড়ে দিবে না, তার কী নিশ্চয়তা আছে তোমার কাছে।"


দাদুর কথা শুনে দীপ্তর ঠোঁটের কোণে মুহূর্তের জন্য হাসির রেখা ফুটে ওঠে মিলিয়ে গেল।


-"এবার আলো পিছিয়ে যাবে না দাদু। সেই নিশ্চয়তা এবার আমার হাতেই।"


-"না গেলেই ভালো। তবে আর একটা কথা। তুমি আমার নাতি। তোমার সুখের কথা ভেবে তোমার সব আবদার, সব পাগলামি, সব জেদ মেনে নিলেও যদি কখনও এমন সময় আসে যে, তোমার জেদের জন্য আমার বংশের মাথা নিচু হয়েছে। তাহলে তুমি আমার যত আদরেরই হও না কেন? আমি তোমাকেও ছেড়ে কথা বলব না।"


-"তেমন কিছুই হবে না দাদু। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।"


সব ঝামেলা এত সহজে মিটে যাচ্ছে দেখে মাঝখান থেকে মেজ চাচী বলে উঠলেন, 


-"কিন্তু বাবা, এই মেয়ের স্ট্যাস্টাস আর আমাদের স্টাস্টাসে রাত-দিন, আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই মেয়ে কীভাবে এই বংশের বউ হবে বাবা! তার উপর ওর আগেও একবার বিয়ে হয়েছে।"


দাদু কিছু বলার আগেই দীপ্ত হুংকার ছেড়ে বলল,


-" অহ! স্ট্যাস্টাসের কথা তুমি বলছো মেজো মা!' হাসছে দীপ্ত, তোমার মুখে না এসব কথা ঠিক মানায় না। তোমার বাবা তার দুই নাম্বারি কাজের দায়ে মাসে কয়বার জেলে যায় হিসেবে আছে তো তোমার কাছে? নাকি আমি আবার একবার বলে মনে করিয়ে দেব? আচ্ছা, এইতো তিনদিন আগের একটা ঘটনা মনে করিয়ে দেই। তোমার বাবা নাকি মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করে, এমন একটা গুজব বেরিয়েছিল। আমার কাছে গুজব বলে মন হয়না অবশ্য। তুমিও ভালো করেই জানো সত্যিই তোমার বাবা এই কাণ্ড করেছে। সেজন্য উনাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করে। খবরটা নিতান্তই গুজব। এতে সত্যতা নেই প্রমাণ করিয়ে উনি রাতারাতিই বেরিয়েও আসেন।"


সবার সামনে দীপ্তর করা এই অপমানে মেজো চাচী থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। চোখ আগুন করে ফোঁপাতে ফোপাঁতে বললেন, 


-" তোমার এতবড় সাহস। তুমি আমার বাবাকে...


রাগে কাঁপতে কাঁপতে কথা শেষ করতে পারলেন না উনি। দীপ্ত চাচীর এই বেহাল অবস্থা দেখে ভীষণ মজা পাচ্ছে। ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে সে বলল,


-"এ বাবা! না,না। তোমার বাবা আমার নানা হন। নানার সম্পর্কে এই কঠিন সত্য আমি কোনো অবস্থাতেই উচ্চারণ করতে পারি না।"

জিভে কামড় দিয়ে মাথা এপাশ ওপাশ দুলিয়ে বলতে থাকল, "উনি মদ,গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, মেয়ে নিয়ে... যা খুশি তা করুন। আমি কিছু বলতে পারব না। কারণ উনি আমাদের আত্মীয়। তার থেকে বড় কথা, সমাজে তোমাদের স্ট্যাস্টাস কত উপরে দেখতে হবে না!"


দাঁতে দাঁত চেপে মেজ চাচী বললেন,


-"দীপ্ত! আমি তোমার বাড়াবাড়ি একদম সহ্য করব না। এক্ষুনি আমি তোমার চাচ্চুকে বলছি দাঁড়াও।"


দীপ্ত যেন চাচার কাছে বিচার দেওয়ার চাচীর এই হুমকিতে ভীষণ ভয় পেয়েছে এমন মুখ ভঙ্গি করে বলল,


-"আমি ভীষণ ভয় পেলাম।"


দীপ্তর বাবাও মেজ বউয়ের বাবা লোকটাকে বিশেষ পছন্দ করেন না। কারণ উনারা আলাদা পার্টির লোক। তাই তিনি ছেলেকে বাধা দেওয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করলেন না। বরং তিনি এই মুহূর্তে ছেলের করা প্রতিটা আচরণে মজা পাচ্ছেন। তার ছেলে মেজ ভাইয়ের অতি আধুনিক এই বউটিকে ঘোলের পর ঘোল খাইয়ে যাচ্ছে দেখে আনন্দ অনুভব করছেন। দীপ্তিটা যা অ্যাক্টিং করতে পারে! মনে মনে উনি বললেন, 


-" বাপকা ব্যাটা! আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ মাই সান। এগিয়ে যাও। ওই মুখোশধারী সাপের সব বিষ বের করে দাও।"


আব্দুর রহমান খান এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সবটা দেখে যাচ্ছিলেন। উনার মেজ ছেলের বউ দীপ্তকে মনে মনে হিংসে করে এটা উনি জানতেন। কিন্তু দীপ্ত কবে থেকে এতটা অভদ্র হয়ে গেল ভেবে উনি স্তম্ভিত। দীপ্ত তো আগে এমন ছিল না। হ্যাঁ, একটু রাগী ছিল এটা তিনি অস্বীকার করবেন না। বাইরের মানুষের সাথে যা-ই করুক। কিন্তু পরিবারের কেউ তাকে একটা চড় মারলেও চুপ করে থাকার স্বভাব ছিল তার। আজ সেই স্বভাবের দীপ্তর সাথে উনার সামনে দাঁড়ানো দীপ্তর কোন মিল খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। দীপ্ত কবে উনার অজান্তে এভাবে পুরোপুরি পাল্টে গেল!


-"অনেক হয়েছে। আমি যে এখানে আছি তা হয়তো কারো মনে নেই। তোমরা থামো এবার। নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে অমন লেগে পড়লে তোমরা?"


-"বাবা দীপ্ত আমার বাবাকে...


-"দাদু আমি রুমে যাচ্ছি। ওকে নিয়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। ওর জ্ঞান ফেরাতে হবে।"


বলেই দীপ্ত কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে, কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল। আব্দুর রহমান খান সবার উদেশ্যে বললেন, 


-"তোমরা সবাই নিজেদের ঘরে যাও। আজকের পর যেন এই বিষয় নিয়ে কারো মুখে আর একটা কথা না শুনি। এটা আমার হুকুম।"

_________________________________________


দীপ্ত আলোকে ওর রুমে নিয়ে গেল। এখনও আলোর জ্ঞান ফিরেনি। সে এখনো দীপ্তর বুকে মিশে আছে। দীপ্তর ইচ্ছে করছে না আলোকে নিজের থেকে দূর করতে। এভাবেই যুগের পর যুগ পার করে দিতে চায় সে। কিন্তু এখন আলোর জ্ঞান ফেরানো সবথেকে বেশি জরুরি। দীপ্ত আলোকে নিয়ে ওর বেডে শুইয়ে দিল। আলোর মুখের দিকে কতক্ষণ একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। পাশের টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে আলোর চোখে মুখে পানির ছিটা দিল। আলো একটু নড়ে উঠল।

জ্ঞান ফিরছে আলোর। দীপ্তর মুখে হাসি ফুটে উঠল। আলোর চোখ পিটপিট করতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। 

চোখের পাতা যেন ভারী পাথরে পরিনত হয়েছে। আলো চেষ্টা করেও চোখ মেলতে পারছে না। কোথায় এখন সে? তার বাচ্চাটা! সে কি বেঁচে আছে? নাকি ওরা দু'জন মৃত্যুর পরের জগতে এসে পড়েছে? 

অনেক কষ্টে আলো চোখ মেলল। এত আলো! এত আলো কিসের? সে কোথায় আছে এখন। চোখ মেলেই সবার আগে দীপ্তকে দেখতে পেল সে। দীপ্ত আলোকে তাকাতে দেখে মৃদু হেসে বলল,


-"ঠিক আছো তুমি? এখন কেমন লাগছে? "


-"কোথায় আছি আমি? আপনি... 


-" আমার বাড়িতে আছো তুমি। তখন রাস্তায় তুমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে। আমি তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি।"


আঁতকে উঠল আলো। এই পাগল লোক তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে কেন? আলোকে অপমান করা, লজ্জা দেয়াই কি এই লোকের আসল উদেশ্য? আলোকে লোকটা বুঝাতে চাইছে, সেদিন আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে তুমি ঠিক কাজ করোনি। আমাকে বিয়ে করলে আজ তোমার এই অবস্থা হত না। আমাকে বিয়ে করলে তুমি খুশি থাকতে পারতে। এত বড় বাড়ি,ব্যাংক ব্যালেন্স, গাড়ি, সম্মান মর্যাদা সব পেতে তুমি। তোমার একটা সিদ্ধান্তে এই সবকিছু তোমার হতে পারত। তোমার নিজের ভুলের জন্য আজ তোমাকে আশ্রয়হীন হয়ে রাস্তায় ঘুরতে হচ্ছে। সব ভুল তোমার আলো...

আলো নিজের অজান্তেই বলে উঠল।


-"না।"


ভ্রু কুঁচকে দীপ্ত বলল,


-"কী না আলো?"


-"আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন কেন? আমাকে এখানে নিয়ে আসতে আপনাকে কে বলেছে। আমি এখানে আসতে চেয়েছি? তাহলে কেন আপনি... 


কথাগুলো বলতে বলতে আলো উঠতে যাচ্ছিল। দীপ্ত তাকে বাধা দিল।


-" এই আলো, তুমি এত আনইজি হচ্ছ কেন বলো তো। আমি একজন বন্ধু হয়ে তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি। এর বেশি কিছু না। তোমাকে উত্তেজিত হতে হবে না। তোমার শরীর মনে হয় অনেকটাই দুর্বল।"


আলো কোন বাধা মানল না। সে একা একাই উঠে বসল। দীপ্ত তাকে সাহায্য করতে চাইলে হাত দেখিয়ে ওকে থামাল।


-"আমার শরীর অনেক ভালো আছে। আমাকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। আমি আপনার সাহায্য চাইনি। আমার রাস্তায় আমি একা।"


আলো হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে তার মাথা ঘুরে উঠল। কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচলটা পড়ে গেল। দীপ্ত বিস্মিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এতক্ষণ শাড়ির আঁচল দিয়ে আলোর শরীর পেঁচানো ছিল বলে দীপ্ত ওর গায়ে মারের দাগগুলো দেখতে পায়নি। আঁচল সরে যাওয়ায় দীপ্ত আলোর হাতে, পিঠে আঘাতের নীলচে দাগ স্পর্শ দেখতে পাচ্ছে। পিঠের কয়েকটা আঘাতে সুঁইয়ের ফোঁটার মত রক্তের ফোঁটা জমাট বেঁধে আছে। দেখতে দেখতে দীপ্তর চোখ মুখের ভাব কঠিন হয়ে উঠছে। আলো তাড়াতাড়ি করে আঁচল পেঁচিয়ে পিঠ,হাত ঢেকে নিল। দীপ্ত উঠে দাঁড়িয়েছে। দুই হাত মুঠো পাকিয়ে জলন্ত চোখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,


-"এসব কীভাবে হয়েছে আলো? কে তোমাকে মেরেছে? তোমার স্বামী তোমার গায়ে হাত তুলেছে? ওই লোকের জন্য তোমার এই অবস্থা? তোমার গায়ে আঘাতের দাগের কারণ তোমার স্বামী তো?"


আলো দীপ্তর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছে। দীপ্তকে বোঝার চেষ্টা করছে সে। দীপ্তর চোখ মুখের কঠিন ভাব দেখে আলোর ভয় লাগছে। সবটা জানলে দীপ্ত যদি তার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তার স্বামীকে কিছু বলে! নিজের কলঙ্কের সাথে দীপ্তকে জড়াতে চায়না সে। তাই আলো বলল,


-"এসব জেনে আপনার কাজ কী? আর আপনি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এসব প্রশ্ন করছেন কোন অধিকারে? আপনার কোন প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নই আমি। আমাকে যেখান থেকে এনেছেন সেখানে রেখে আসুন। নয়তো আমিই চলে যাচ্ছি। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।"


আলো চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়ালে দীপ্ত পেছন থেকে ডাকল।


-"আলো!"


ওর কন্ঠে এমন কিছু ছিল যে আলো না দাঁড়িয়ে পারল না।


-"তুমি এখন কোথাও যাবে না। যতদিন না পর্যন্ত তুমি সুস্থ হচ্ছ ততদিন এই বাড়িতেই থাকবে। রাত বারোটার পরে কোন প্রেগন্যান্ট মহিলা নিশ্চয়ই মনের সুখে হাওয়া খেতে রাস্তায় বেরোয় না। আর ধরলাম তুমি হাওয়া খেতেই বেরিয়েছ। তাহলে তোমার বাড়ি থেকে এতদূর এসে ব্রিজের নিচে উঁকি দিয়ে নিশ্চয় হাওয়া খাচ্ছিলে না। আমার সামনে তুমি সেন্সলেস হয়েছে। আমি না থাকলে তুমি এই পেট নিয়ে নিচে কীভাবে পড়তে খেয়াল আছে? এতক্ষণে হয়তো তোমার বাচ্চা আর তুমি দু'জনই... তোমার গায়ে জ্বর। মারের দাগ স্পষ্ট। তবুও বলছো তোমার লাইফে সবকিছু ঠিক আছে! কোথাও কোন ঝামেলা নেই! আমাকে এতটা বোকা কেন ভাবছ? তর্ক করো না আলো। আমাকে একজন বন্ধু ভেবে তুমি আমার বাড়িতে থাকতে পারো।"


কথাগুলো বলেই দীপ্ত লম্বা পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে গিয়ে কিড়মিড় করে উচ্চারণ করল,


-"ওই কুত্তার বাচ্চাকে আমি ছাড়ব না। জানে মেরে ফেলব। শুয়োরের বাচ্চাটা আমার আলোর গায়ে হাত তুলেছে! এত বড় সাহস ওর! ওকে আমি কুঁচিকুঁচি করে কেটে কুকুরকে খাওয়াব। তবেই আমার নাম দীপ্ত ইয়াসির খান।"


চলবে___

এখানেই দেওয়া হবে বাকি পর্বগুলা। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url