#অপেক্ষার_বসন্ত

ফাহমিদা তানিশা 

পর্ব ০২+৩


আরাফদের গাড়ি চলে গেলো আর অর্নি সেদিকে তাকিয়ে আছে এখনো।কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে সে চা ওয়ালার কাছে গেলো। তাকে চায়ের কাপটা আর টাকাটা দিয়ে হাঁটা শুরু করলো। রাস্তার মোড়ে এসে একটা রিকশা নিলো। গন্তব্য তার অফিসের উদ্দেশ্যে।


আরাফকে ভুলতে সে সবসময় নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। তবু যেন হেরে যায় সে। তবে এতে করে একটা উপকার হয়।তার কাজটা সে ভালোভাবে করতে পারে।ফলে প্রোমোশনটা তাড়াতাড়ি হবে।


সকাল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অর্নি এখনো ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে অফিসে। নতুন একটা কেসের তদন্ত তার হাতে পড়েছে। তাই অনেকটা প্রেসারের মধ্যে আছে সে।হঠাৎ টেবিলে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠলে সে সেদিকে তাকালো।আরাফ ফোন করেছে তাকে। ফোনের স্ক্রিনে আরাফের নামটা দেখে খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর রিসিভ করলো।আরাফ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো: কোথায় তুই?

_আমি অফিসে।

_বাসায় আয় তাড়াতাড়ি।তোর সাথে কথা আছে।

_কোনো সমস্যা হয়েছে?

_না। দ্রুত আয়।

_ওকে।

আরাফ সাথে সাথে ফোনটা কেটে দিলো। অর্নি ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো। আবার কি হয়েছে?এতো তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে বলছে কেন আরাফ?তার ভালোর জন্যই তো সে এতো কিছু করছে। তাহলে নতুন করে আর কিসের ঝামেলা হবে?সেই তো সব ঝামেলার মূল আপাতত।তার সহকর্মী নন্দিনীকে কয়েকটা কাজ দিয়ে সে দ্রুত পায়ে বের হলো।নিচে গাড়িটা রাখা ছিল।তাই আর গাড়ি খোঁজাখুঁজি করে এক্সট্রা প্যারা নিতে হয়নি তাকে। গাড়িতে উঠেই ড্রাইভারকে বললো: আংকেল,বাসায় যাবো। চলুন।

ড্রাইভার‌ও "আচ্ছা মা"বলে গাড়ি স্টার্ট দিলো।


অর্নির মনের মধ্যে শুধু একটাই কষ্ট। আশেপাশের সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। কাছের মানুষ হোক, দূরের মানুষ হোক। আবার এলাকাবাসী হোক।সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। শুধু আরাফ তাকে ভালোবাসতে পারলো না। আচ্ছা,সে কি এতোই খারাপ?সবাই যদি ভালোবাসতে পারে তাহলে আরাফ কেন তাকে বুঝতে চাইছে না। 


গাড়ি আরাফদের বাসার সামনে এসে থামলো।সে নেমে গেইটে ঢুকতে যাবে তখনি দেখে আরাফের চাচাতো ভাই রকি দাঁড়িয়ে আছে।তাকে দেখে সে রাগী চোখে তাকালো। অর্নি তাকে দেখে একটা শুকনো হাসি দিলো।সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসলো:অর্নি,তুমি কি পাগল হয়ে গেছো?

_কেন ভাইয়া?কি হয়েছে?

_কি হয়েছে তা আমার চেয়ে তুমি ভালো জানো।এসব কি করছো?আরাফ না আবেগ দিয়ে চলছে তাই বলে তুমিও আবেগ দিয়ে চলবে? তোমার তো এটলিস্ট বোঝা উচিত।

_আমি কি করবো ভাইয়া? আমার তো মাথায় কিছু কাজ করছে না।

_তুমি ঠান্ডা মাথায় সব ভেবে দেখো। তুমি নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিলে তো হবে না। যেহেতু তোমাদের বিয়েটা পারিবারিকভাবে হয়েছে তাহলে পরিবারের সদস্যরা সব সমস্যার সমাধান করবে।

_আমি নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিলাম কখন ভাইয়া? আমিও তো চাই আরাফ ভাইকে। কিন্তু আমি তার চেয়েও বেশি চাই উনি ভালো থাকুক। উনি ভালো থাকলে আমি অনায়াসে ভালো থাকতে পারবো। আমি না হয় দূর থেকে দেখবো উনার ভালো থাকাটা।

_জুঁইকে বিয়ে করে কি আরাফ ভালো থাকতে পারবে? তোমার মনে হয় এমন?

_সেটা আমি তো বলতে পারবো না।আরাফ ভাইয়ের মতে উনি জুঁইকে পেলে ভালো থাকবে। তাহলে আমরা বলার কে?

তখনি উপর থেকে আরাফ ডাক দিলো।আরাফের রুম দু'তলায়।সে বেলকনিতে এসেছিল তখনি অর্নিকে দেখে তার কাছে যাওয়ার জন্য ডাকলো।


অর্নি আরাফের ডাক পেয়ে এক প্রকার দৌড়ে উপরে গেলো। লম্বা গলি হ‌ওয়ায় তাকে অনেকটা দৌড়াতে হয়েছে।তার মধ্যে দৌড়ে সিঁড়িতে ওঠার কারণে সে অনেকটা হাঁপিয়ে গেছে। এক দৌড়ে আরাফের সামনে গিয়ে হাঁপাতে লাগলো অর্নি।আরাফ তার অবস্থা দেখে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলো। অর্নি এক চুমুকে পুরো গ্লাসটা শেষ করলো।আরাফ এক পলক তার দিকে তাকালো।দেখলো অর্নি এখনো হাঁপাচ্ছে।সে তা দেখে গম্ভীর গলায় বললো: বিছানায় গিয়ে বস। এতে একটু ভালো লাগবে।

অর্নি "আচ্ছা" বলে বিছানায় গিয়ে বসলো।আরাফ তার পেছন পেছন গেলো। কি ভেবে বললো:চাইলে শুতে পারিস।

আরাফের কথায় অর্নি বেশ অবাক হলো। চোখগুলো বড়ো বড়ো করে জিজ্ঞেস করলো: আপনার বিছানায় আমাকে শুতে বলছেন?

_এখন কিছুক্ষণ রেস্ট নেওয়ার জন্য শুতে বললাম। ‌আমি আসলে উঠে যাবি আবার।বাই দ্যা ওয়ে, এভাবে দৌড়ে দৌড়ে আসলি কেন? জানিস তো শরীরে দৌড়ানোর মতো শক্তি নেই।

_আপনি ডেকেছেন তাই দৌড়ে আসলাম।

_আমি কি দৌড়ে আসতে বলেছি তোকে? ধীরে ধীরে হেঁটে আসবি। জানিস?তোর একটাই সমস্যা।না বুঝে, না শুনে সব কাছে ছাগলের বাচ্চার মতো লাফাতে শুরু করিস। বুদ্ধিসুদ্ধি একটু রাখিস মাথায়। তাহলে আর বিপদে পড়বি না।


অর্নি চুপ করে আছে। আসলেই তা বুদ্ধি নেই। বুদ্ধি থাকলে কী আর আরাফের মতো ছেলের প্রেমে পড়ে?সে পাগল বলেই এভাবে পাগলামি করছে।আরাফ এখনো এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অর্নি একটু চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলো: আমাকে ডেকেছিলেন কেন?

_তুই বাসায় আমাদের ডিভোর্সের কথা বলেছিস?

_না,আমি তো বলিনি।

অর্নির কথায় আরাফ বেশ অবাক হলো।সে অর্নিকে খুব ভালো করে চিনে। অর্নি কখনো মিথ্যা বলার মেয়ে নয়। যেহেতু অর্নি বলেনি বলেছে তাহলে সে কখনো বলবে না।অর্নির উপর এতটুকু বিশ্বাস আরাফের আছে। তাহলে তাদের ডিভোর্সের কথা বাসায় জানলো কি করে? ডিভোর্সের ব্যাপারটা আরাফ,অর্নি আর জুঁই ছাড়া আর কেউ জানে না। তাহলে কি জুঁই কাউকে বলেছে? একটু ভেবে সে আবার প্রশ্ন করলো।"তোর কোনো ফ্রেন্ডকে বলেছিস?বা কলিগকে?"

_না ভাইয়া। আমি কাউকে বলিনি।

_তাহলে আমাদের ডিভোর্সের ব্যাপারটা বাসায় জানলো কি করে বল তো?

আরাফ ভ্রু কুঁচকে অর্নির দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো তার কাছ থেকে কোনো উত্তর আশা করছে সে। কিন্তু অর্নিও বুঝতে পারছে না বিষয়টি জানাজানি হলো কি করে।কারণ অর্নি তার পক্ষের উকিল মিসেস শাহানাকেও বারণ করে দিয়েছিল বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য। তাহলে কথাটা বাড়িতে জানলো কি করে? মনে মনে তার‌ও জুঁইয়ের উপর সন্দেহের তীরটা পড়লো। কিন্তু আরাফকে জুঁইয়ের নামে কিছু বলার সাহস অর্নি পেলো না।তাই চুপ করে থাকলো। কিন্তু আরাফ আচমকা অর্নিকে অবাক করে দিয়ে বলে বসলো:তোর কি মনে হয় জুঁই কাউকে বলেছে?

অর্নি এবার খুব ভালো সুযোগ পেলো।তাই সেও জবাব দিলো: আমাদের ডিভোর্সের ব্যাপারটা আমি, আপনি আর জুঁই ভাবি ছাড়া কেউ তো জানে না।যদি আমি আর আপনি কাউকে কিছু না বলি তাহলে বাকি থাকে জুঁই ভাবি।তাই না?

আরাফ এবার কপাল কুঁচকে অর্নির দিকে তাকালো।বড় গলায় বললো:এক থাপ্পড় দিয়ে দাঁত সব ফেলে দিবো বেয়াদব মেয়ে।

অর্নি বুঝতে পারছে না হঠাৎ আরাফের কি কারণে এতো রেগে গেলো।সে নিজেই তো জুঁইকে সন্দেহ করছে তাহলে অর্নির কী দোষ?তাই সে ছোট গলায় বললো: আমি আবার কি করলাম?

_তুই ওকে ভাবি বলতে যাচ্ছিস কেনো? জুঁই কি এখনো তোর ভাবি হয়েছে? তাহলে বারবার এতো ভাবি ভাবি বলে আদিখ্যেতা দেখানোর কি আছে?কোর্টেও ভাবি ভাবি বলে নিজ থেকে কথা বলতে গেলি আর অপমান হয়ে আসলি।এখানেও ভাবি ভাবি করছিস। নেক্সট টাইম যদি ভাবি বলেছিস তাহলে আর চড় দেবো বলবো না। সোজা চড়টা বসিয়ে দিবো।


অর্নি এবার অবাকের চরম লেভেলে গিয়ে পৌঁছালো। তাই কিছু বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করলো: আমাদের ডিভোর্সটা হয়ে গেলে তো আপনারা বিয়ে করবেন।তাই না? তখন তো উনি আমার ভাবি হবে। তাহলে এখন থেকে ভাবি ডাকলে সমস্যা কোথায়?

_যেদিন বিয়েটা হবে সেদিন থেকে ভাবি ডাকবি।এর আগে মাষ্টারি কম করবি। ঠিক আছে?

অর্নি এবার হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।সে বুঝতে পারে না আরাফের মাথায় কখন কি চলে। একবার বলে আমাকে কেন বিয়ে করলি? আমি তো জুঁইকে ভালোবাসি। আমি ওকে চাই শুধু। তোকে ডিভোর্স দিয়ে ওকে বিয়ে করবো।আবার বলে যখন বিয়ে করবো তখন ভাবি ডাকিস।আরাফের তো অর্নির সেক্রিফাইস দেখে খুশি হ‌ওয়ার কথা।তার মধ্যে সে উল্টো তেজ দেখায়। কখনো কখনো অর্নি নিজেই বোঝে না সে কি করবে?তার ভাবনাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে আরাফ বললো: শোন, এখন আম্মু-আব্বুকে কিভাবে বোঝাতে হবে তা আমি জানি না। বাড়িসুদ্ধ সবাই আমার উপর রেগে আগুন। আমি আর ওদের সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।এমনেও আমি ওদের কারো সাথে কথা বলে লাভ নেই।


তখনি তাদের রুমে প্রবেশ করলো রকি,আরাবি আর অবনি।আরাবি আরাফের ছোট বোন আর অবনি তার চাচাতো বোন। অবনি আবার আরাফের সমবয়সী। তাদের দুজনের মাঝে খুব সখ্যতা রয়েছে। তাদের দেখে অর্নি উঠে দাঁড়ালো। অবনি জিজ্ঞেস করলো:তোরা কি করছিস? আমরা কি আসতে পারি?

অর্নি হেসে জবাব দিলো: কিছু করছি না আপু।আসতে পারেন।

আরাফ আরেকটু আগ বাড়িয়ে বললো: রুমের মাঝখানে এসে রুমে ঢোকার পারমিশন নিচ্ছিস?এই তোদের ম্যানার্স?

বেচারার কথা শেষ করার আগেই তিনজনে একসাথে বলে বসলো: আমাদের ম্যানার্স নিয়ে কথা বলার মতো যোগ্যতা তোর এখনো হয়নি।

অবনি এটুকু বলে থামলো না।তারা তো আরাফকে কাবু করার সুযোগ খুঁজছিল।তার মধ্যে আরাফ নিজেই সুযোগটা করে দিলো।সেই সুযোগ অবনি কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। গমগমে গলায় বললো: তুই আগে ম্যানার্স শিখে আসবি তোর এক্স গার্লফ্রেন্ড জুঁই থেকে। তারপর আমাদের ম্যানার্স নিয়ে কথা বলতে আসবি।

অবনির কথায় রকি তাচ্ছিল্যের সাথে বললো:আরে অবনি,কার কাছ থেকে ম্যানার্স শিখতে বলছিস তুই?এই জুঁই থেকে ম্যানার্স শিখতে গিয়ে আরাফ নিজেই তো কাউয়ার্ড হয়ে আসবে।

অবনি তার মুখের হাসিটা প্রশস্ত করে বললো: ভাইয়া, কি বলছো তুমি?আরাফ তো এখন কাউয়ার্ডের লাস্ট স্টেজে পৌঁছে গেছে। আমার তো মনে হয় না আমাদের গুষ্টিতে ওর মতো কাউয়ার্ড আরেকটা আছে।

অবনির কথায় আরাফ কপাল কুঁচকে ফেললো।রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে।তার মতো ছেলেকে কাপুরুষ বলছে।তা কি কখনো মানা যায়? তবু তাকে আজ মানতে হবে। প্রতিবাদ করলে সব উল্টা হয়ে যাবে।এমনেও পরিস্থিতি এখন স্রোতে প্রতিকূলে আছে ‌।তাই চুপচাপ সে বেরিয়ে যেতে যাচ্ছিল। তখনি আরাবি থামিয়ে দিলো তাকে।"আরে ভাইয়া, কোথায় যাচ্ছো? আমরা তো তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি।"

আরাফ গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো: আমার এখন সময় নেই ‌। একটা ইমারজেন্সি প্যাশেন্ট এসেছে।

কথাটা শুনে অবনি আবারো তাচ্ছিল্য করে বললো:ইমার্জেন্সি প্যাশেন্টকে সামলানোর জন্য হাসপাতালে তোর চেয়ে অনেক বেটার ডক্টর আছে। তুই আপাতত বাসায় থাকবি আর আমাদের সাথে কথা বলবি।তা না হলে আমরা ছোট চাচ্চুকে তোর পেছনে লেলিয়ে দিবো।


আরাফ এবার একটা ঢোক গিললো। পৃথিবীর কোনো কিছুতে দূর্বলতা না থাকলেও আরাফের দূর্বলতা অবনির ছোট চাচ্চু মানে তার বাবা। মানুষটাকে সে জমের মতো ভয় পায়।তাই তো তার এক কথায় অর্নির মতো হাঁটুর বয়সি এক মেয়েকে সে বিয়ে করে ফেললো। যাকে সে সারাজীবন বোনের চোখে দেখলো তাকে সে তার ব‌উ বানাতে রাজি হলো। যদিও কাগজে কলমে তারা স্বামী-স্ত্রী। তবুও তো "বিয়েটা করবো না" বলতে পারলো না। এখনো তার বাবা জানে না মতো করেই সে ডিভোর্সটা করতে চায়। কিন্তু কিভাবে কিভাবে সবাই সবটা জেনে গেলো। বেচারা অবনির হুমকি পেয়ে দাড়িয়ে থাকলো।রাগে আর কষ্টে তার ইচ্ছা করছে অবনির মাথাটা ফাটিয়ে দিতে।


আরাবি অর্নিকে উদ্দেশ্য করে বললো: তুমি একটু বাইরে যাও। আমরা ভাইয়ার সাথে কিছু পার্সোনাল কথা বলবো।

অর্নি আরাবির কথায় রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। মনে মনে ভাবলো: এমন কি পার্সোনাল কথা যা তার সামনে বলা যাচ্ছে না?সে কি এতোই পর যে তাকে রুম থেকে চলে যেতে বললো?আরাবির তো আগে অনেক সুন্দর করে কথা বলতো। দুজনেই সমবয়সী হ‌ওয়ায় একসাথে থাকতো। সুখ-দুঃখের কথা বলতো।কিন্তু আজ আরাবি কেন এভাবে কথা বলছে?সেও কি তার ভাইয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে?


চলবে...#অপেক্ষার_বসন্ত

ফাহমিদা তানিশা 

পর্ব ০৩


আরাবির তো আগে অনেক সুন্দর করে কথা বলতো। দুজনেই সমবয়সী হ‌ওয়ায় একসাথে থাকতো। সুখ-দুঃখের কথা বলতো।কিন্তু আজ আরাবি কেন এভাবে কথা বলছে?সেও কি তার ভাইয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে?এসব ভাবতে অর্নির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।একা একা দাঁড়িয়ে থেকে তো কোনো লাভ নেই।তাই সে ছাদের দিকে পা বাড়ালো।ধীর পায়ে ছাদে গেলো।


সকালে আরাফের পাশে জুঁইকে দেখে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। তখন থেকে খুব কষ্ট লাগছে। ভালোবাসার মানুষটাকে অন্যের পাশে ক'জন মেয়ে দেখতে পারে?তার মধ্যে হাসবেন্ড হলে তো একদমি কথায় নেই। অর্নি না পারছে কাউকে বোঝাতে,না পারছে নিজে সহ্য করতে। কাছের কোনো মানুষকে মনের কথাগুলো বোঝালে হৃদয়টা একটু শান্ত হয়। এখন তো তার বোঝানোর মতো কেউ নেই।যদি বাবা-মাকে এসব বলতে যায় তাহলে তার মা ভীষণ কষ্ট পাবে।তার মায়ের কোনো ছেলে না থাকায় একমাত্র বোনের একমাত্র ছেলে বলে আরাফকে তিনি খুব আদর করেন। এখন যদি জানতে পারে তার চোখের মণি আরাফ স্বেচ্ছায় তার মেয়ের জীবনটা শেষ করছে তাহলে তার কষ্টটা অর্নির চেয়ে দ্বিগুণ হবে।এমনেও বাবা-মা সন্তানের খারাপ দেখতে পারেন না। তাই অর্নি সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাউকে কিছু বলবে না।নিজেই সব সহ্য করবে। ‌যেদিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাবে সেদিন বাকিটা ভেবে দেখবে সে।


বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হ‌তে চলছে।আবছা আলোয় অস্পষ্ট হয়ে আছে পৃথিবীটা।তার মধ্যে আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। নীল আকাশটা ধূসর হয়ে থাকায় অর্নির বেশ ভালো লাগছে। তার মনটাও তো এমন অন্ধকার আর ধুলোয় ভরা হয়ে আছে। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনের কথাগুলো বলছে। চোখ দুটি বন্ধ হলেও অঝোর চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। হঠাৎ ভারি বর্ষণ শুরু হলো।বৃষ্টির অঝোর ধারা এসে তাকে ছুঁয়ে দিলো। প্রকৃতির সাথে সেও ভিজে একাকার হয়ে গেলো।আকাশটা এখন স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে।তার মনটাও কি এভাবে আচমকা স্বচ্ছ হয়ে যেতে পারে না?সব তো সৃষ্টিকর্তার মর্জি। হঠাৎ কারো ডাক পেয়ে সে পেছনে তাকালো।আরাফ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তাকে জোর গলায় ডাকছে আর হাতের ইশারা করছে। অর্নি তাকে দেখে ছুটে আসলো। মনে মনে ভাবছে, তার মনের আকাশটাও কি স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে? কিন্তু সে তো জানে না তার নিজস্ব আকাশটা স্বচ্ছ করতে তাকে অনেক সাধনা করতে হবে।


আরাফের সামনে দাঁড়াতেই সে একবার অর্নিকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলো। তারপর রাগী গলায় বললো:এই সন্ধ্যায় এভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে আসলি কেন? মাথায় কি বুদ্ধি নেই তোর? যদি জ্বর আসে তো কি করবি?

_কি আর করবো! ঔষুধ খাবো। তাছাড়া আপনি আছেন না?ফ্রিতে কয়েকটা ঔষুধ লিখে দিবেন তাতেই হয়ে যাবে।

আরাফ ভ্রু কুঁচকে বললো: তুই ইচ্ছাকৃত অসুখ বাঁধাবি আর আমি তোকে ফ্রিতে ঔষুধ লিখে দিবো? 

_তাহলে জুঁই ভাবির কাছে যাবো? উনি তো ননদ হিসেবে লিখে দিতে পারেন।

_বাহ্!শখ কতো মহারানীর। জুঁই তোকে ফ্রিতে তো দূরের কথা ফি দিলেও ট্রিটমেন্ট করবে না।

_কেন?আমি উনাকে কি করলাম?আমি যদি স্ত্রী হয়ে আমার একমাত্র জামাইকে উনার জন্য ছেড়ে দিতে পারি, উনি আমাকে ফি নিয়েও ট্রিটমেন্ট করতে পারবে না? সে কি খুব বেশি স্বার্থপর নাকি হাতুড়ে ডাক্তার?


আরাফ অর্নির কথায় মাথা তুলে তার দিকে তাকালো।জীবনে প্রথমবারের মতো আরাফ এভাবে তাকিয়েছে অর্নির দিকে। চোখ দুটো দেখে মনের কথা বোঝা বেশ মুশকিল অর্নির পক্ষে।তাই সে এখনো তাকিয়ে আছে আরাফের চোখ দুটোর দিকে। অর্নি তার চোখের ভাষা পড়তে না পারলেও সে তো চাইলে অর্নির চোখের ভাষাটা বুঝতে পারে।এটা কি এতোই কঠিন কাজ? একটু পর আরাফ চোখ নামিয়ে বললো: জুঁই স্বার্থপর কিনা আমি জানি না তবে তোর মতো মহৎ হৃদয়ের মানুষ নয় সে তা আমি জানি।

_আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছেন?

_আরে ধুর পাগলি।সত্যিটা বললাম। তুই আমার বোন।আমার মতো হৃদয়বান হবি না?

_আপনার হৃদয় আছে বুঝি?

_হৃদয় ছাড়া মানুষ হয় না মাথামোটা। তুই এসব বুঝবি কি করে? তুই তো আর আমার মতো কার্ডিওলজিস্ট নয়।

_আচ্ছা ওসব বাদ দিলাম। অন্য কথায় আসি।জুঁই ভাবি যদি স্বার্থপর না হয় তাহলে আপনাকে ছেড়ে গিয়েছিল কেন ছয় বছর আগে?

অর্নির কথায় আরাফের এবার রাগ হলো। কিন্তু মনে মনে ভাবলো প্রশ্নটা তো যৌক্তিক। অযৌক্তিক কোনো কথা অর্নি খুব একটা বলে না। অন্যদের সাথে বললেও তার সাথে কখনো বলে না। তবু সে কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বললো: রুমে গিয়ে ভেজা কাপড়গুলো চেঞ্জ করে নে। নয়তো ঠান্ডা লাগবে বা জ্বর আসবে।

অর্নি এবার হেসে বললো: ফ্রি ট্রিটমেন্ট করতে হবে এই ভয়ে টেনশন করতে হবে না আপনাকে। আমি একটা নাপা এক্সট্রা খেয়ে নিবো। তাতেই হয়ে যাবে।

আরাফ একবার তার দিকে তাকিয়ে "যা খুশি তাই কর" বলে চলে যাচ্ছিল। তখনি অর্নি থামালো তাকে।

_একটা রিকোয়েস্ট করি?

_বলে ফেল তাড়াতাড়ি।

_যতোদিন আমাদের ডিভোর্সটা হচ্ছে না ততোদিন অন্তত আমাকে বোন বলে সম্বোধন করবেন না।এতে মানুষজন হাসাহাসি করবে। কাজিন পরিচয় দিতে পারেন কিন্তু বোন কথাটা আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মানানসই নয়। স্ত্রী আর বোনের মাঝে বিশাল তফাৎ আছে। সেটা তো এটলিস্ট আমাদের বুঝতে হবে।

আরাফ আবারো অর্নির দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। এবারো অর্নি তার চোখের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ। তবে এতটুকু বুঝেছে সে।" স্ত্রী " শব্দটা আরাফ মন থেকে ফেলতে পারছে না।তাই যতোবার অর্নির মুখে "স্ত্রী " শব্দটা শুনছে ঠিক ততোবার সে নার্ভাস হয়ে যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কটা পবিত্র সম্পর্ক বলে কথা।তাই স্ত্রী শব্দটা অনেক গুরুত্ব বহন করছে তার মনে।


আরাফ কোনো কথার জবাব না দিয়ে নেমে গেলো।অর্নিও তার পেছন পেছন নামলো।দুজনে রুমে গেলো একসাথে। কিন্তু আরাফ তার ল্যাপটপ আর গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো।সে চলে গেলে অর্নি একেবারে গোসলটা সেরে ফেললো। বৃষ্টির মধ্যে ভিজেছে আবার গোসলও করেছে।তাই তার খুব শীত লাগছে। ভাবলো নিচে রান্নাঘরে গিয়ে একটা চা খেয়ে আসলে মন্দ হবে না।তাই আস্তে আস্তে হেঁটে সে নিচে নামলো। সিঁড়ি বেয়ে কতটুকু যেতে সে বেশ অবাক হলো।অবনি,রকি আর আরাবি সিঁড়িতে বসে আছে। তিনজনের মুখে বিষন্নতার ছাপ। তাদের দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করছে বা প্ল্যান করছে। অর্নি তাদের কাছে গেলো কিন্তু তারা অন্য ঘোরে আছে এখনো।তাই তাকে দেখতে পেলো না। অর্নি অবনির সামনে গিয়ে একটা তুড়ি বাজাতেই তিনজনের ধ্যান ফিরলো। কিন্তু কেউ কোনো কথা বললো না। অর্নি একবার তাদের দিকে তাকিয়ে বললো:হেই গাইস!কি হয়েছে তোমাদের? এভাবে বসে আছো যে?

রকি গমগমে গলায় জবাব দিলো: আমাদের কিছু হয়নি। তুমি এখান থেকে যাও এখন।

অর্নি কিছু বলতে যাবে তার আগে আরাবি বললো: প্লিজ যাও এখান থেকে। আমাদের একটু শান্তি মতো থাকতে দাও।এসব আর ভালো লাগছে না।


অর্নি এবার কিছু না বলে নেমে গেলো।সে এমন কি করেছে যার জন্য তারা তার সাথে এভাবে কথা বলছে? কিছুই বুঝতে পারছে না।ধীর পায়ে সে রান্নাঘরে গেলো।এক কাপ চা বানিয়ে রুমের দিকে যাবে তখনি দেখলো আরাফের বড় আম্মু মিসেস রেহানা বসে আছে সোফায়। তিনি বসে বসে টিভি দেখছেন। অর্নিকে দেখে বললো: বাসায় কখন আসলে?

_ঘন্টাখানেক হয়েছে এসেছি।

_তোমার খালামনির রুমে গিয়েছো?

_না এখনো যায়নি। কেন? কি হয়েছে?

_দুপুরের আগ থেকে রুমে ঢুকে বসে আছে। এখনো দরজা খুলছে না।এমনকি দুপুরের খাবার‌ও খায়নি।

_শরীর খারাপ লাগছে নাকি?

_না। 

_তাহলে কি হলো?

_সেটা তুমি নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসো।

_আচ্ছা যাচ্ছি।


অর্নি দ্রুত পায়ে তার খালামনির রুমের দিকে গেলো।তার পেছন পেছন মিসেস রেহানাও গেলেন। ‌তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনিও চিন্তিত। যৌথ ফ্যামিলি হ‌ওয়ায় দুই জা এর একসাথে উঠাবসা। দুজনেই মিলেমিশে থাকেন খুব। চিন্তা হ‌ওয়াটাই স্বাভাবিক। অর্নি তার খালামনির রুমে গিয়ে ডাকছে "খালামনি,খালামনি "। কিন্তু তার খালার কোনো সাড়াশব্দ নেই। আবার ডাক দিলো: "খালামনি দরজা খোলেন।কি হয়েছে খালামনি?"

এবারো তিনি কোনো জবাব দিলেন না। অর্নির সাথে সাথে মিসেস রেহানাও ডাকছেন। কিন্তু কোনো রেসপন্স নাই তার।এবার তারা দুজনে জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলো। অর্নির এখন খুব টেনশন লাগছে। কি হলো তার খালামনির? এভাবে তো কখনো ডাকতে হয়নি তাকে।এক ডাকে সাড়া দেন সবসময় তিনি। কিন্তু আজ এতো ডাকার পরেও সাড়াশব্দ না পেয়ে সে মিসেস রেহানাকে বললো: কোনো কারণ ছাড়া এভাবে রুমের দরজা খুলবে না কেন?

_তোমাদের ডিভোর্সের ব্যাপারটা জানার পর আরাফকে বোঝাতে চেয়েছে। কিন্তু সে রাগারাগি করে।তারপর রুমে চলে গেলো।আর বের হয়নি।

_এখন কি করবো? রুমের দরজা ভাঙবো?

_তাই ভালো হয়।

দু'জনে মিলে দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলো।তার আগে অবনি,রকি আর আরাবিকে ডাকলো।রকি গিয়ে দরজার দারোয়ানকে ডেকে আনলো। দারোয়ান আসলে দুজনে দরজা ভাঙতে শুরু করলো।


চলবে...


[এখানেই বাকি পর্ব গুলা দেওয়া হবে কাল এমন টাইমে সব গুলা এক সাথে দিবো

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url