#প্রেম_বিয়োগের_সমীকরণ 

#লুৎফুন্নাহার_আজমীন

।।পর্ব৩।।

(কপি নিষেধ)


বেলা বারোটার দিকে নৈরিতারা নতুন বাসায় আসে।শহরের মধ্যে এক ছিমছাম ছোট্ট কলোনি।অধিকাংশ বাসিন্দাই শিক্ষকতার সাথে জড়িত,কলেজের প্রফেসর। তাই কলোনিটার নাম দেওয়া হয়েছে প্রফেসর পাড়া।অধিকাংশ বাড়ির নকশা ই এক রকম,দ্বিতল ভবন।আর প্রত্যেকটা বাড়ির ই আলাদা সুন্দর সুন্দর নাম দেওয়া।যেমন—নৈরিতাদের বাড়ির নাম ❝কুহুতান❞। খুঁতখুঁত স্বভাবের মেয়েটার মন কিঞ্চিৎ কোমল হলো।কৌতুহল বশত সে মাথা ঘুরিয়ে বিপরীত পাশের বাড়িরটার দিকে তাকালো।একই নকশার শুধু নাম ভিন্ন—❝কুশিয়ারা❞


মালামাল নামানো শেষে মাহমুদ সাহেব নৈরিতার ঘরের খাট লাগানো দিয়ে জিনিস পত্র গুছানো শুরু করলেন। যেহেতু গরমকাল,তাই ফ্যান, লাইটও লাগিয়ে দিলেন।খাট,ফ্যান,লাইট লাগাতে লাগাতে নৈরিতা নিজের তার জিনিসপত্রের কার্টনগুলো ঘরে নিয়ে আসে।মাহমুদ সাহেব লোক নিয়ে চলে যাওয়ার পর নৈরিতা নিজেই টুকটুক করে কাজ শুরু করে দেয়।কাঠের আসবাব গুলো রুমে এনে রাখা হয়েছে শুধু,গোছানো হয় নি।নৈরিতা পড়ার টেবিল গুছানোর মধ্য দিয়ে ঘর গুছানো শুরু করে।প্রত্যেক সপ্তাহেই সে রুম গুছায়। কাজ করতে করতে হাত চালু হয়ে গিয়েছে, তাই খুব একটা সময় লাগলো না।তারপর নৈরিতা আরশিমঞ্চটা গুছিয়ে ফেলে।আরশিতে কিছু দাগ পরেছে।সেগুলো ভেজা নরম কাপড় দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে।


কিন্তু কাপড় গুছাতে গিয়ে নৈরিতার মেজাজ বিগড়ে যায়।অধিকাংশ কাপড়ের ই ভাঁজ নষ্ট হয়ে কুচকে গেছে।এগুলো আয়রন না করে ওয়্যারড্রবে তুললে নৈরিতার মনে ভীষণ অশান্তি হবে, এখনকার থেকেও বেশি।তাছাড়া শরীরেও আর কুলোচ্ছে না।এদিকে বেলা বাজে চারটা।খিদেও পেয়েছে বড্ড।কি করবে বুঝছে না সে।রান্নাঘরে গিয়ে দেখে নীলা চাল ফুটোতে দিয়েছে।নৈরিতা জিজ্ঞেস করে,—“সঙ্গে কি খাবো?”


“আলু ভর্তা আর ডিমভাজি।চলবে?”—খানিক গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলেন নীলা।


নৈরিতা হেসে দিয়ে বলে,—“দৌড়োবে।গোসল করে আসছি খেতে।”


গোসল শেষে খাবার খেয়ে নৈরিতা খানিকক্ষণ বিশ্রামের জন্য বিছানায় শোয়।কিন্তু ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে যায়।ঘুম ভাঙে রাত ন'টায়।নীলা আর মাহমুদ বেশ জিনিস পত্র গুছিয়ে নিয়েছে।নৈরিতার ঘুম ভেঙেছে ঠিক ই কিন্তু চোখ থেকে ঘুমটা যাচ্ছে না। রান্নাঘরে গিয়ে নিজেই চা বানায় নৈরিতা।সাথে একটা টোস্ট নিয়ে ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় আসে।বারান্দায় গ্রিল নেই।রেলিংয়ে চায়ের মগটা খুব সাবধানে রেখে আলতো করে টোস্ট ডুবোয় নৈরিতা।বারান্দার মুখোমুখো আরেকটা বারান্দা।সেই বারান্দার মালিকের ঘরের লাইটটা হঠাৎ করেই জ্বলে উঠলে।এক সুঠাম দেহের পুরুষের ছায়া দেখতে পেলো নৈরিতা।ঘরে ঢুকেই ছেলেটা আগে গায়ের শার্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেললো।হয়তো বিছানায়।নৈরিতার নিজের ই লজ্জা লাগলো।দ্রুত বারান্দা থেকে এসে পরে সে।তবুও,কোনো এক অজানা কারণে আবার জানালা দিয়ে সামনের বিল্ডিংয়ে তাকায় সে।জানালা আর বারান্দা একসাথে থাকায় দেখতে খুব একটা অসুবিধা হয় না।হঠাৎ নৈরিতার মনে পরে জানালাটায় পর্দা লাগানো জরুরি। জরুরি মানে অতি জরুরী। নাহলে নৈরিতাকেও ছেলেটা ঠিক এইভাবেই দেখবে যেমনটা করে নৈরিতা তাকে দেখছিলো।


চা খাওয়া শেষে নৈরিতা ড্রয়িংরুমে যায়। গিয়ে দেখে তার বাবা-মা চানাচুর মুড়ি খাচ্ছে।নৈরিতা মগ ধুয়ে এসে নীলাকে পর্দার কথা জিজ্ঞেস করে।নীলা বলেন,— “কাল লাগাবো পর্দা।”


“আমার রুমে আজ ই লাগবে।আমি চাই না রুমে আমি কিভাবে থাকি কোনো মানুষ আমায় দেখুক।”


“রাত হয়ে গেছে।একটু পর তো ঘুমিয়েই যাবো সবাই।”


“আম্মু,আমি বাংলায় ই বলছি।অন্য ভাষায় না।বুঝো না কথা?”


নীলার এইবার রাগ উঠে যায়।যে নৈরিতার ওপর উঠা রাগ মাহমুদের ওপর ঝেড়ে বলেন,—“তাকায় আছো যে?যাও জমিদারের বা চ্চাকে পর্দা বের করে দেও।না হলে সারাক্ষণ প্যান প্যান করবে।”


——————


ক্যাম্পাসে গিয়ে শশীকে দেখলেও দিশান ইচ্ছাকৃত ভাবে এড়িয়ে চলে।নুড়িও বিষয়টা খেয়াল করে।সে শশীকে ঠেলে দিশানের কাছে সব মিটমাট করার জন্য।কিন্তু শশীর ইগোতে বাঁ্ধে।যে মেয়ে কখনো তার বাবাকেও সরি বলে নি সে মেয়ে দিশানকে গিয়ে সরি বলবে?প্রশ্নই উঠে না।


পরীক্ষা দিয়ে দিশান সেকেন্ড ফ্লোরের বারান্দায় সিগারেট ধরায়।এমন সময় আবির আসে।দিশানের হাতের সিগারেটটা নিয়ে লম্বা টান দেয়।অতঃপর ধোঁয়া ছেড়ে বলে,— “দেখলাম তোমার চাঁদকে।”


“চাঁদ?”— দিশান ভ্রু কুঁচকে তাকায়।


“হু,চাঁদ,শশী,মুন।”


“তো আমি কি করবো?”


“আগে না দুইজন একই সাথে থাকতা।”


“আমি ওর পিছনে ঘুরতাম না।ও আমার পিছনে ঘুরতো। লেগে থাকতো আমার সাথে।”


“শা লা আর মাল পাইলা না।সিনিয়রের খাওয়া মাল ধরছো।”


“সিনিয়রও খাওয়া মাল ই ধরছিলো।”—কথাটা বলে দিশান আরেকটা সিগারেট ধরায়।


আবির নিকোটিনের ধোঁয়া ছেড়ে বলে,— “তাহলে কি তোদের ব্রেকাপ?”


“আমার তরফ থেকে অবশ্যই।কার না কার বাচ্চা পেটে।বলতেছে বাচ্চার আব্বা আমি।”


“হতেও পারিস।”


“ফাইজলামি করলে শা লা হো গায় মা রবো এক লাথি।”


দিশান সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল। এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,_ “মাওয়া যাচ্ছি যাবি?”


“আজকে?”


“হয়,একটা ট্রিপ দরকার।এক ঘেয়েমিতে মেজাজ আরও বিগড়ে থাকে।তুষার,অরিনদেরও বলে দেখিস যদি যায়।”


“কখন বের হবি?”


“একটা যে ক্লাস আছে ওইটা করেই।”


“আচ্ছা,তোর ভাবীকে বলি।”


“ভাবীকে মানে?”— ভ্রু জোড়া সংকুচিত করে প্রশ্ন করে দিশান।


“পারমিশন নেই ওর থেকে।”


আবিরের কথা শুনে দিশান ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে দিয়ে হেসে দেয়।হেসে বলে,— “শা লা বিয়েই করলা না এখন ই পারমিশন লাগে?”


“না বলে গেলে পরে রাগ করে যে।যদিও আমি জানি ও যেতে না করবে না।”


বলা হয়ে থাকে, সম্পর্কের শিকড় হলো বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাসের উপর ভর করেই একটি সম্পর্ক দিনের পর দিন টিকে থাকে। আবিরের ক্ষেত্রে কথাটা একেবারেই সত্য প্রমাণিত হলো। তার প্রেমিকা তাকে ট্রিপে যাওয়ার অনুমতি দিল—যা তাদের সম্পর্কের পারস্পরিক বোঝাপড়া আর বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।

পুরো সার্কেলে আবিরই একমাত্র যে সিরিয়াসভাবে প্রেম করে। বাকিরা যেখানে সম্পর্ককে শুধু টাইমপাস হিসেবে দেখে, সেখানে আবির ব্যতিক্রম। যতদূর শোনা যায়, আবিরের প্রেমিকাও সম্পর্কটা নিয়ে সমানভাবে সিরিয়াস এবং আবিরের প্রতি যথেষ্ট লয়াল।

মানুষের সত্যিকারের ভালোবাসা দেখতে সত্যিই ভালো লাগে। কিন্তু আফসোস, এই যুগে সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পাওয়াটাই যেন সবচেয়ে কঠিন।এইযুগে সত্যিকারের ভালোবাসা পাওয়া মানুষগুলো নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান।


————————

সকালে নৈরিতা বারান্দায় দোলনাটা লাগিয়েছে। বিকেলে চায়ের কাপ আর একটি উপন্যাস নিয়ে সেই দোলনাতেই বসে পড়ে। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে, অজান্তেই তার চোখ বারবার গিয়ে পড়ে সামনের বিল্ডিংয়ের একটি ঘরের দিকে।

কেন যে বারবার সেই ছেলেটার ঘরের দিকেই তাকিয়ে থাকে নৈরিতা, সে নিজেও ঠিক জানে না। হয়তো বয়সী আবেগের অজানা টান, কিংবা নিছক কৌতূহল। তবুও চোখ ফিরিয়ে আনতে পারে না—মনের ভেতর কোথাও যেন একটা নীরব প্রশ্ন জমে থাকে।


বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায় কিন্তু সামনের ঘরের মালিকের দেখা নেই।পুরুষ মানুষ, হয়তো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে কোথাও কিংবা প্রেমিকাকে নিয়ে ঘুরছে। 

মশা প্যান প্যান শব্দে বিরক্ত হয়ে নৈরিতা বারান্দা থেকে উঠে যায়।বিছানায় মাথার বালিশের কাছে উপন্যাসটা রেখে চুলে হাল্কা একটা বেণী করে পড়ার টেবিলে পড়তে বসে।সাতটা থেকে টানা নয়টা পর্যন্ত পড়ে নৈরিতা।মাঝখানে অবশ্য বেশ কয়েকবার মুঠোফোনখানা খুলে সে রিলসের জগতে হারিয়ে গিয়েছিলো বহুবার।হুশ ফিরলে আবার সে বইয়ের পাতায় মন দিয়েছে।তারপর আনমতে বইয়ের পাতায় ই আঁকিবুঁকি করেছে।চঞ্চল মন কোনো কাজে স্থির না থাকলে যা হয়।রাতের খাওয়া শেষে নৈরিতা আবার পড়তে বসে।আসলে রাতের পড়াটাই ভালো হয়।চারিপাশ নিঃস্তব্ধত থাকায় পড়ায় মন বসে ভালো।


রাত্রির তখন দ্বিতীয় প্রহর।কোমর লেগে যাওয়ায় নৈরিতা উঠে দাঁড়ায় এবং ঘরের মধ্যেই পাইচারি করতে লাগে।হঠাৎ খেয়াল করে সামনের বিল্ডিংয়ের ঘরটায় আলো জ্বলেছে।সুঠাম দেহের সেই পুরুষালী ছায়াটা ঘরেই পাইচারি করছে আর শলাকার ধোঁয়া ছাড়ছে।মনে হচ্ছে কিছু একটা নিয়ে খুব চিন্তায় আছে।থাকলে থাকুক গে,নৈরিতা কি তাতে।চিনে না জানে না একটা পুরুষকে নিয়ে নৈরিতার এত মাথাব্যথা হচ্ছে কেন নৈরিতা নিজেই বুঝতে পারছে না। 


ছেলেটা সিগারেট খেতে খেতে হঠাৎ বারান্দায় চলে আসে।কোণের রেলিংয়ে বসে কাওকে ফোন দেয় কিন্তু বিপরীত পাশ থেকে ফোন কেউ রিসিভ করে না।ছেলেটা রাগ আর বিরক্তির সাথে ফোনটা নামিয়ে ফেলে।কিছুক্ষণ পর কেউ একজন ফোন দেয়।হয়তো যাকে ফোন করেছিলো সে ই কল ব্যাক করেছে।ছেলেটার ছায়ার অঙ্গভঙ্গি দেখে বুঝা গেলো ফোনের বিপরীত পাশের মানুষটার ওপর রাগ ঝাড়ছে সে।হয়তো গা লাগাল করছে কিংবা অপমান। নৈরিতার কৌতুহল কাজ করে না।পর্দা টেনে দিয়ে সে আবার পড়তে বসে।


চলবে,,,,


পরের পর্বগুলা এখানেই দিবো

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url