#প্রেম_বিয়োগের_সমীকরণ 

#লুৎফুন্নাহার_আজমীন

।।পর্ব২।।

(কপি নিষেধ)


বাড়ি ফিরে কাওকে কিছু না বলেই দিশান ছাদে চলে যায়।একেরপর এক সিগারেট নিঃশেষ করে পায়ে মাড়াতে লাগে। এতক্ষণ মনে হলো শশী সত্যি ই প্রেগন্যান্ট কিন্তু এখন আবার মনে হচ্ছে শশী মিথ্যে বলছে।যে পরিমাণ ধূর্ত ওই মেয়ে,এমন মিথ্যে বলা ওর কাছে পান্তাভাত।


দিশানের ঘরটা দোতলায় হলেও ছাদের চিলেকোঠার ঘরটায় ই দিনের বেশিরভাগ সময় কাটায় দিশান।এইঘরটায় খুব একটা কেউ আসে না।বদঅভ্যাস বলতে ওর জীবনে এই সিগারেটটাই আছে।চিলেকোঠার ঘরটায় আরামসে সিগারেট টানা যায়।একটা টেবিল,চেয়ারও আছে ঘরটায়।যখন পড়ার খুব চাপ যায় তখন দিশান এই ঘরটায় পড়ে আর সিগারেট খায়।সিগারেট খেলে কোডিং আর ক্যালকুলাসের প্যাচ গুলো একটু সহজ লাগে।


নিচ থেকে দিশানি দিশানকে ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে সিগারেট টানতে দেখে।দিশানি অবাক হয়,সাধারণত এইসময় দিশান বাড়িতে খুব একটা থাকে না।ব্যাগটা নিজের ঘরে রেখেই দিশানি ছাদে চলে যায়।


“ভাইয়া?”


দিশান পিছন ফিরে তাকায়।সে কিছু বলার আগে দিশানি ই প্রশ্ন করে বসে,— "তুমি?এইসময়?”


“কেন?তোর অসুবিধা হচ্ছে?”


“অস্বাভাবিক লাগলো তাই জিজ্ঞেস করা।”


“আমি স্বাভাবিক ছিলাম কবে?”


দিশানি বুঝতে পারে দিশানের মেজাজ খারাপ। এখন কথা বাড়ালে দিশান কষিয়ে একটা ধমক দিবে।প্রস্থান করা এই মুহুর্তে বুদ্ধিমানের কাজ, তাই দিশানি চলে যায়।


————————


বাসায় ফিরে নৈরিতা থেকে তার মা ঘর গুছাতে শুরু করেছে।আজকে মাসের শেষ কাল থেকে তারা নতুন ভাড়া বাড়িতে উঠবে।নৈরিতাকে দেখে নীলা বলে,— “টেবিলে খাবার আছে। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে আমায় সাহায্য কর।”


নৈরিতা কিছু বলে না।ব্যাগটা হ্যাঙারে ঝুলিয়ে কলেজ ইউনিফর্মের ক্রস বেল্ট খুলতেই নীলা পরীক্ষার কথা জিজ্ঞেস করে,— “তোর এইবার অংকে পাস আসবে তো?”


নৈরিতা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে,— “হ...হ্যাঁ আসবে।”


“তুই আদোও খাতায় লিখিস তো?”


“তিনটা ঘন্টা কি আমি হলে ঘাস কাটি?”


“ঘাস তো আর কাটিস না কিন্তু বোকার মতো অন্যদের দিকে তাকিয়ে থাকিস।মানুষের পোলাপান লেখে, আর আমার পোলাপান হলে তামাশা দেখে।”


নৈরিতা কিছু না বলে গোসল করতে চলে যায়।এখন শুধু শুধু কথা বলে এনার্জি নষ্ট করার মানে হয় না।তাছাড়া তার খিদেও পেয়েছে প্রচুর। 


মিনিট পনেরোর মধ্যে নৈরিতা গোসল সেরে খেতে বসে।খাবার খুব ই সাধারণ কিন্তু নৈরিতার পছন্দের।সাদা ভাত,ডাল আর আলু ভর্তা। ভাত নেওয়ার আগে নৈরিতা বয়াম থেকে আমের মোরব্বা নিয়ে নেয়। ডাল,আলুভর্তার সাথে আমের আচার নৈরিতার খুব পছন্দের।পাশের ঘর থেকে নীলা বললেন,— “বেশি আচার খাস না।কাল নতুন বাসায় উঠবো। গ্যাস্ট্রিক বাড়িয়ে ঝামেলা বাড়াস না।”


নীলা জানেন নৈরিতা মানবে না তার কথা।তবুও বললেন কিন্তু কেন আর কোন আশায় বললেন তা তিনি নিজেও জানেন না। খাওয়া শেষে নৈরিতা নিজের জিনিসপত্র গুছানো শুরু করে।নৈরিতা একটা মানসিক রোগ আছে।তা হলো

অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা ওসিডি।।খুব সাধারণ ভাষায় বললে নৈরিতা শুচিবায়ু আর খুঁতখুঁত স্বভাবের। তাই নৈরিতার জিনিসপত্র অন্য কেউ খুব একটা ধরে না।কোনো কিছুর উনিশ-বিশ হলেই নৈরিতা প্রচণ্ড রেগে যায়।হয় চিৎকার চেঁচামেচি করে তা না হলে রাগ পুষিয়ে রাখে।এইজন্য নীলা কিংবা আহসান কেউ নৈরিতার জিনিসপত্র ধরে না।


———————

একে তো সামনে সিটি তারওপর শশীর প্যারা।মাথায় পড়া ঢোকানোর জন্য এইবার দিশানের সিগারেট না গাঁজা টানতে হবে মনে হচ্ছে। ছাদে গিয়ে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বসে দিশান আবিরকে ফোন দেয়।আনাদার কল দেখাচ্ছে।দিশান বিরক্ত হয়ে বলে,—“সামনে সিটি আর বোক্সোদ প্রেম মা"রাচ্ছে।”


মিনিট দশেক পরে আবির নিজেই ফোন করে।


“হ্যাঁ বল।”


“এই শা লা তোর পড়াশোনা নাই?মেয়ে মানুষের জন্য ক্যারিয়ার ভাসাচ্ছিস নাকি?”


“বাংলাদেশে এম্নিতেও সিএসসির ভাত দেখতেছি না।ঘরে ঘরে সিএসসি ইঞ্জিনিয়ার।ইঁদুরের রেসে যাচ্ছি না।শেষ মেশ কারোয়ান বাজারে দেখতেছি কলা বেচা লাগবে।”


“তোর বেচাবেচি বাদ দে।শশী কি পরে কিছু করছিলো?”


“ওর মতো মেয়ে পেছন দিয়ে মে রে দেয়।যেমন তোর মা রলো।সামনে কিছু করে না।”


দিশান কোনো উত্তর দেয় না।লম্বা করে সিগারেটের টান দেয়।ফোনের বিপরীতে পাশ থেকে আবির বলে,— “এই শা লা সত্যি করে বল।তোরা প্র*টেকশন নিছিলি?”


“বেলুনও নিছি।গুলিও নিছি।তোর কসম।”


“আমি এখনো বিয়ে করি নাই।খবরদার আমার কসম কাটবি না।আর শশী যে মেয়ে!দেখ গে অন্য ব্যা ডার সাথে পু ন্দাপু ন্দি করে তোকে ফাঁসাচ্ছে।”


দিশান কণ্ঠে ক্ষোভ মিশিয়ে বলে,— “প্রস্টিটিউগিরি ওর ই পেছন দিয়ে দেবো।ওর ফাঁদে ওকেই যদি না ফাঁসিয়েছি আমার নাম দিশান না।”


“খোঁজ লাগাইছি।তুই চিল নিয়া সিটির প্রিপারেশন নে।”


——————


বিছানায় শুয়ে কংক্রিটের তৈরি ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে শশী। মা তাকে বেশ কয়েকবার খেতে ডেকেছে।সে যায় নি।এমন সময় তার বান্ধবী নুড়ি আসে।বরাবরের মতো ভদ্রতাকে উপেক্ষা করে ই সে শশীর রুমে ঢুকে পরেছে।


“তুই সত্যি ই প্রেগন্যান্ট?”— ভালো মন্দের খবর না নিয়েই নুড়ি এই প্রশ্ন করে ফেলে।শশী মোটেও অপ্রস্তুত ছিলো না,কারণ সে তার জীবনে ঘটা প্রতিটা ঘটনা নুড়িকে জানায়।


“গত দুইমাস পিরিয়ড হয় নি।”


“কিন্তু তুই তো দিশানের সাথে রুমডেট করলি গত মাসে!”


শশী কিছু বলে না।নুড়ি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে বলে,—“তোর মতলবটা আসলে কি?”


শশী আমতা আমতা করে বলে,—”মতলব মানে?ভালোবাসায় মতলব থাকে নাকি?আমি দিশানকে ভালোবাসি।”


“দিশানকে ভালোবাসিস তো তোর দ্বিতীয় এক্স রনির সাথে আবার কিসের কথা?”


শশী কিছু বলে না।নুড়ি সন্দিহান কণ্ঠে বলে,— “দিশানের সাথে তোর কিসের শত্রুতা?”


শশী এইবারও নীরব।নুড়ি খানিকটা রাগ দেখিয়েই বলে,—“ভিক্টিম রোল প্লে করে লাভটা কি পাচ্ছিস?দিশানের সাথে তোর কিসের শত্রুতা।”


“কোনো শত্রুতা নেই।আমি শুধু ওকে চাই।”


“দিশানকে চাস তো রনির সাথে আবার ঘুরতে যাস কেন?”


শশী খানিকটা রাগ নিয়েই নুড়ির দিকে তাকায়।কাঁপা কণ্ঠে বলে,—“তুই আমার ফ্রেন্ড নাকি দিশানের দালাল।”


“তোকে আগাগোড়া পুরোটা ই চিনি।দিশানকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজের ই বিপদ ডেকে আনছিস।আজকে পুরো ক্যাফেটেরিয়ায় অপমানিত হয়েও কি পেট ভরলো না?”


শশী রাগে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।নুড়ি খানিকটা নরম হয়ে বলে,—“আর কনসিভ করলেই কি?এ!বরশন করানো তোর কাছে নতুন কিছু না।আর যদি একান্তই বাচ্চা রাখতে চাস তাহলে রনির কাছে যা।”


“রনিকে আমার পছন্দ না।ওকে আমার কখনো ই বিয়ে করার ইচ্ছা ছিলো না।”


“তাহলে দিশানের কথামতো এবরশন করে সম্পর্কের ঝামেলা মিটিয়ে নে।”


শশী শান্ত কণ্ঠে বলে,—“কিন্তু ও যে বললো আমায় বিয়ে করবে না।”


“হয়তো রাগের মাথায় বলেছে।এতগুলো ছেলেকে ফাঁসাতে পারলে,ঝামেলা মিটাতে পারবে না?”


“দিশান আলাদা।অন্য ছেলেদের মতো না।রুমডেটের প্রপোজাল আমি দিয়েছি।দিশান না।আমি জানতাম ছেলেদের শরীর দিলেই ওরা বাঁ্ধা পরে যায়।”


“তাহলে তো দোষ তোর ই।দিশানকে কেন ফাঁসাতে গেলি?”


শশী কোনো উত্তর দেয় না।নুড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,— “দেখ,ক্যাম্পাসে এসব বলা ঠিক না বলেই বাসায় এসে এইসব বলছি।মাফ চেয়ে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা ই বেটার আমার মনে হয়।”


“ইগোতে লাগবে মাফ চাইতে।”


“তাহলে দিশানকে ভুলে যা।ও বেটার ডিজার্ভ করে।”


শশী কথার মোড় ঘুড়িয়ে নিয়ে বলে,— “আয় ডিনার করি।”


নুড়ি,শশী উঠে নিচে ডাইনিং স্পেসে চলে যায়।ডিনার শেষে নুড়ি,শশী দু'জনেই লং ড্রাইভে বের হয়।শশীর যখন মন খারাপ থাকে প্রায়ই সে লং ড্রাইভে যায়।ভাগ্যিস শশীর বাবা-মা টিপিক্যাল বাঙালি বাবা-মায়ের মতো না।তাই শশী নিজের মতো করে বাঁচতে পারছে।অবশ্য তারা নিজেরাই অনেক ব্যস্ত।মেয়ের দিকে তাকানোর খুব কম ই সময় পায় তারা। 


গাড়ির গ্লাস নামিয়ে শশী সিগারেটের ছাই ফেলে।আর নুড়িকে সিগারেট অফার করে।কিন্তু নুড়ির আজকে মুড না থাকায় সে অফার রিজেক্ট করে দেয়।


চলবে,,,,
 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url