#নিয়তির_পরিহাস [০২]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
[কার্টেসী ছাড়া লেখা কপি করা নিষেধ ❌]
সায়মন আর প্রতিবেশী নারীটি আবারও সিরাতকে ধরে দাঁড় করায়, কিন্তু সিরাতের শরীর ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষণে। হাত-পা সহ তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। একপর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে গেলে নাহিয়ান আর কারো তোয়াক্কা না করেই নিজেই তাকে কোলে তুলে নেয়। তার গায়ে থাকা পুলিশের পোষাকটি রঞ্জিত হয়ে যায় সিরাতের রক্তে।
নাহিয়ান তাড়াতাড়ি করে তাকে নিজের জিপে বসিয়ে দেয় যেটায় করে একটু আগে তারা সিরাতদের ফ্ল্যাটে এসেছিল। সায়মন বোনের পাশে বসে তার মাথাটা নিজের কোলের উপর তুলে নেয়। একুশ বছর বয়সী একজন ছেলে হয়েও গলা ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে ডাকতে থাকে বোনকে–
—আপু, এই আপু, আপু রে উঠ না! নাহিয়ান ভাই, দেখো না আপু চোখ খুলছে না কেন?
নাহিয়ান একটা পানির বোতল সায়মনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে–
—এটা উনার চোখে মুখে ছিটা সায়মন।
কথাটা শেষ করে সে বোতলটা সায়মনের হাতে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে। আর অন্যহাত দিয়ে নিজের বাম চোখের কোণে জমা হওয়া পানিটুকু মুছে নেয়। রাত অনেক হওয়ায় ব্যস্ততম নগরী ঢাকা প্রায়ই ফাঁকাই এখন। সারাদিনের ব্যস্ততা ভুলে গিয়ে এই শহরে বসবাস করা মানুষদের একটা বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছে নিদ্রা দেবীর কোলে।
বিশ মিনিটের মাথায় সিরাতকে হসপিটালে নিয়ে আসা হয়। রাস্তায় সিরাতের জ্ঞান ফিরে এসেছে, কিন্তু সেটাও না ফেরারই নামান্তর। নাহিয়ান নিজে আগে নামে তারপর সিরাতকে কোলে করে নামায়। সেই অবস্থাতেই দৌড়ে চলে হসপিটালের ভেতরে। চিৎকার করে ডাকতে থাকে কর্তব্যরত নার্স-ডাক্তারদের।
একজন নার্স তাদের দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি করে একটা স্ট্রেচার এনে দিলে নাহিয়ান সেটাতে সিরাতকে শুয়ে দেয়। আরেকজন নার্স গিয়ে একজন ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসে। সে সিরাতের কয় মাস চলছে জেনে তাকে তাড়াতাড়ি ওটিতে নিয়ে যেতে বলে।
সিরাতকে ওটিতে নিতে গেলে সিরাত নার্সদের থামিয়ে দেয়। তারপর চোখটা কোনমতে খুলে নাহিয়ানকে ডাক দেয়। নাহিয়ান দৌড়ে তার কাছে আসলে সিরাত নিজেই তার ডান হাতটা চেপে ধরে। তারপর খুবই ক্ষীণ গলায় বলে–
—যাওয়ার আগে আপনাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি নাহিয়ান। আমার কিছু হয়ে গেলে আমার বাচ্চাটাকে দেখেন প্লিজ। আমার মন বলছে, আমি আর ফিরব না। আমার এই একটা কথা রাখিয়েন প্লিজ, হ্যাঁ? আর শুনুন, একটা লাল টুকটুকে পরী দেখে বিয়ে করে নিজের জীবনটাকে সুন্দর করে সাজিয়েন। যেমনটা সাজিয়েছিলেন ডায়রীর ভাঁজে।
ডায়েরীর কথা শুনে নাহিয়ানের চোখজোড়া বড় বড় হয়ে যায়। তাকে এমন করতে দেখে সিরাড এত কষ্টের মাঝেও হেঁসে দেয়। তারপর বলে–
—দুঃখিত আপনার পারমিশন না নিয়েই, আপনার ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ে নিয়েছি। আজ বিকালে যখন আন্টি আমায় আপনাদের বাসায় গিয়েছিল, তখন ফুলি (নাহিয়ানদের বাসার কাজের মেয়ে) আপনার রুম থেকে কিছু অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র এনে ড্রয়িংরুমে রাখছিল। সেখানেই আপনার ডায়েরিখানা আমি পাই। কৌতূহল বসত ডায়েরিটা নিজের সাথে নিয়ে এসে পড়ি। ভাগ্যিস পড়েছিলাম, নাহলে এত সুন্দর আর পবিত্র অনুভূতির কথা না জেনেই চলে যেতাম হয়ত।
"চলে যেতাম" কথাটা শুনে নাহিয়ান আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। সে হাঁটু গেড়ে সিরাতের সামনে বসে পড়ে। তারপর সিরাতের ধরে রাখা হাতটা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—কই যাবে তুমি? কোথাও যাবে না। একবার হারিয়েছি তোমায়, তখন অন্তত তোমায় বছরে একবার চোখে দেখতে পেতাম। আমার মন এটা জেনে স্বস্তি পেতো, তুমি যেখানেই আছো যার সাথেই আছো ভালো আছো। সুখে আছো।
কিন্তু আবার হারাতে পারব না। তুমি কোথাও যাবে না। বেবি হয়ে যাওয়ার পর আমি তোমাকে তাশফিনের সাথে ডিভোর্সের ব্যবস্থা করাবো। তারপর আমরা বিয়ে করে আমার ডায়েরিতে সাজানো সংসারের মতো করে স্বপ্নের সংসার করবো। প্লিজ রাতপাখি আর হারিয়ে যেও না, আমি এবার বেঁচে থেকেও মরে যাবো।
—মরবেন না । আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমার অংশকে আপনাকে দিয়ে যাচ্ছি তো। কি দেখে রাখবেন তো আমার অংশকে? নাকি তাশফিনের সন্তান ভেবে তাকে অবহেলার পাত্র করে দিবেন?
—না না, তোমার অংশ আমার কাছে আমার সন্তান হয়ে বড় হবে। কিন্তু ওকে বড় করার জন্য, ওকে সুন্দর একটা জীবন দেওয়ার জন্য আমার তোমাকেও প্রয়োজন। প্লিজ ফিরে এসো আমার কাছে। আমার অনেক দিনের ইচ্ছে তোমার, আমার আর আমাদের পুঁচকিকে নিয়ে সুন্দর একটা সংসার তৈরি করার।
সিরাত হালকা একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে–
—সকলের সব ইচ্ছে কি পূরণ হয় দারোগা মশাই? নিয়তির পরিহাসে আমাদের সকলকেই কোন না কোন অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়েই মৃত্যকে আলিঙ্গন করে নিতে হয়।
সিরাত আর কিছু বলতে পারে না, তার আবারও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। ডাক্তার তাকে নার্সদের নির্দেশ দেয় সিরাতকে তাড়াতাড়ি করে ওটিতে নিয়ে যেতে, আর সিরাতকে অপারেশনের জন্য তৈরি করতে।
সিরাতকে নিয়ে যেতেই নাহিয়ান আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। সায়মন তার পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখতে নাহিয়ান সায়মনের দিকে ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরেই কাঁদতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পর তার নজরে আসে হসপিটালের করিডরের এক কর্ণারে দাঁড়িয়ে তাশফিনও কাঁদছে। সিরাতরা হসপিটালে আসার মিনিট পাঁচেক পরই তাশফিনও সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। সে সিরাতের বলা সব কথা শুনেছে।
নাহিয়ান রাগে অন্ধ হয়ে গিয়ে সায়মনকে ছেড়ে তাশফিনের কাছে যায়, তারপর তাকে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। তাশফিন নিজেকে বাঁচাতে নিজেও নাহিয়ানকে কয়েকটা দেয়, কিন্তু পুলিশের কঠোর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নাহিয়ানের শরীরে এগুলো নিতান্তই সুড়সুড়িয় ন্যায় লাগে।
তাদের দু'জনের চিল্লাপাল্লার শব্দে কয়েকজন নার্স, ওয়ার্ডবয় আর সায়মন এসে তাদেরকে একে অপরের থেকে আলাদা করে। নাহিয়ান কিছুতেই নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারছে না দেখে সায়মন তাকে জোর করে ধরে করিডরে রাখা সারি সারি চেয়ার গুলোর থেকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
নাহিয়ান শূন্য দৃষ্টি নিয়ে ওটি রুমের দিকে তাকিয়ে থাকে আর নার্সদের ছুটাছুটি দেখতে থাকে। কতক্ষণ পরপর এক করে নার্স বের হচ্ছে আর ট্রে ভর্তি করে রক্তাক্ত তুলো এনে ফেলছে। কিছুক্ষণ পর একজন ডাক্তার দু'জন নার্সের সাথে চিন্তিত ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে ওটির রুম থেকে বের হয়। তারা বের হতেই নাহিয়ান ও সায়মন দৌড়ে তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তাশফিনও তাদের পেছন পেছন আসে ডাক্তারের কাছে, শুনতে ডাক্তার কি বলে।
ডাক্তার বলে–
—দেখুন আপনাদের মিথ্যে সান্ত্বনা দিতে চাই না। পেশেন্টের আগেই হয়ত হার্টের সমস্যা ছিলো। কোন একটা শক পেয়ে সে হার্ট অ্যাটাক করেছে।
নাহিয়ান হতভম্ব হয়ে বলে–
—হার্ট অ্যাটাক?
—"হ্যাঁ, তাকে এখানে আনার পথে সে হার্ট অ্যাটাক করেছে। সেই সাথে তার প্রেগ্ন্যাসিতেও ভীষণ কমপ্লিকেশন দেখা দিয়েছে। অবস্থা ভীষণই ক্রিটিকাল। এতটাই ক্রিটিকাল যে হয় বাচ্চা নাহয় মা যেকোন একজনকে চুজ করতে হবে আপনাদের।
মায়ের যা অবস্থা দেখছি, তাকে বাঁচানো এতটা সহজ হবে না হয়ত। তাও আমরা আমাদের বেস্টটা দিয়ে চেষ্টা করবো। এই বন্ডপেপারে (একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলেন) সাইন করে দিন। আর হ্যাঁ, উনাকে রক্ত দিতে হবে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডোনারের ব্যবস্থা করুন, আমাদের হসপিটালে এক ব্যাগ রক্ত আছে উনার গ্রুপের, সেটাই দিচ্ছি আপাততঃ কিন্তু ঐ এক ব্যাগ দিয়ে উনার কিছুই হবে না।"
ডাক্তার কথা গুলো বলে নাহিয়ানের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়। নাহিয়ান মৃত দৃষ্টি নিয়ে একবার কাগজটার দিকে আরেকবার ওটি রুমের দিকে তাকায়। সায়মন নাহিয়ানের হাত ধরে ঝাঁকি দিতেই তার ধ্যান ফিরে। সে কাগজটা নিয়ে তাশফিনের কাছে এগিয়ে যায়, তারপর ক্ষুরের ন্যায় ধারালো ও গম্ভীর গলায় বলে–
—"আমার রাতপাখির যদি কিছু হয়, কসম আল্লাহর তোকে এই দুনিয়াতেই জাহান্নামের স্বাদ পাইয়ে দিবো। এখন চুপচাপ এই কাগজে সাইন কর। উঁহু, একটা কথাও না জাস্ট সাইন দিস পেপার্স বাস্টার্ড।"
তাশফিন যেহেতু এখনও সিরাতের হাসবেন্ড তাই এই বন্ডপেপারে তাকেই সাইন করা লাগত। সে সাইন করে দিতেই একজন নার্স এসে কাগজটা নিয়ে যায়, আর সায়মনকে বলে বাকি সব ফর্মালিটিস পুূরণ করে দিতে। সায়মন তাড়াতাড়ি গিয়ে হসপিটালের সব ফর্মালিটিস পূরণ করে দেয় এবং বাসার সকলেও ফোন দিয়ে হসপিটালে আসতে বলে।
~চলবে?
📌পোস্টটি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুমহলের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করুন।
[আমি এই পর্ব লিখতে লিখতে কতবার চোখের পানি ফেলেছি বলার বাহিরে। এবার আপনারাও একটু কাঁদুন।🤭
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
