#তুমি_যাকে_ভালোবাসো (২)
লেখায়: নুজহাত মুন
________________
নুপুরের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে আছেন সালমা বেগম। ব্যথার তীব্রতায় মৃদু আর্তনাদ করে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে নুপুর। সাজিয়াও দিশেহারা হয়ে মায়ের হাত থেকে নুপুরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সালমা বেগমের রাগের কাছে সে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের বেগে ঘরে প্রবেশ করল সাজিয়ার বড় ভাই সজীব।
বাইরে থেকে আসা চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনেই সে একপ্রকার দৌঁড়ে ভেতরে এসেছিল। কিন্তু ভেতরে এসে মায়ের এমন রণচণ্ডী মূর্তি দেখে সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের মার্জিত মায়ের এমন উগ্র আচরণ সজীবকে চরমভাবে মর্মাহত করল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে শক্ত হাতে মাকে সরিয়ে দিয়ে নুপুরকে মুক্ত করল।
"এসব কী করছ মা? এভাবে একটা মেয়ের গায়ে হাত তুললে কেন? আর এত চিৎকারই বা কিসের?" সজীবের কণ্ঠে বিস্ময় আর বিরক্তি ঝরে পড়ল।
সালমা বেগম তখনও রাগে ফুঁসছেন। নুপুরের দিকে বিষাক্ত চোখে তাকিয়ে ছেলের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন,
"এই গরিবের বাচ্চা আমার ঘর থেকে দশ হাজার টাকা চুরি করেছে! ওকে বল এখনই টাকা বের করতে, নয়তো আজ এর একদিন কি আমার একদিন!"
সজীব অবাক হয়ে একবার বিধ্বস্ত নুপুরের দিকে তাকাল। অগোছালো চুল আর আর বিধ্বস্ত চেহারায় এক ধরণের তীব্র প্রতিবাদী আভা স্পষ্ট। সজীবের মন বলছিল, এই চেহারার আড়ালে চোর লুকিয়ে থাকতে পারে না। সে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে একপ্রকার সন্দিহান কণ্ঠে মাকে প্রশ্ন করল,
" তুমি টাকা কোথায় রেখেছিলে?"
সালমা বেগম চিৎকার করে জবাবে বললেন,
" আমার বালিশের নিচে রেখেছিলাম। রুমে ওকে একা রেখে বাইরে গিয়েছিলাম, এর মধ্যেই টাকাটা সরিয়ে ফেলেছে। শোন গরিবের বাচ্চা, ভালোয় ভালোয় টাকাটা দিয়ে দে বলছি!"
সালমা বেগম আবার তেড়ে যেতে চাইলে সাজিয়া এবার রুখে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল,
" মা, নিজের নাটক বন্ধ করো! লজ্জা করছে না তোমার? এভাবে কারো ওপর মিথ্যা অপবাদ দিতে তোমার বুক কাঁপল না?"
নুপুর নিজের চুলগুলো গুছিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। অপমানে অন্যদের চোখের কোণে হয়ত জল চলে আসত। তবে তার চোখে জল নেই। যেখানে সে সম্পূর্ণই নির্দোষ সেখানে চোখে জল আসার তো কোনো কারণ নেই! নুপুর বরং তখন সালমা বেগমের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
" আপনি যতবারই আমাকে দোষ দিন না কেন, আমি আমার দিক থেকে হাজার বার নিজেকে নির্দোষ বলতে রাজি।"
সালমা বেগম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সজীব এবার গর্জে উঠল,
" থামো মা! নিজের সম্মানটা অন্তত বজায় রাখো। আজ সকালেই তো আমি তোমার থেকে দশ হাজার টাকা নিলাম। তুমিই তো রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে বললে বালিশের নিচে রাখা আছে, নিয়ে নিতে। সেই টাকা তো এখনও আমার পকেটে মা। এখন কি তবে আমিও চোর? আমারও চুলের মুঠি ধরে টানবে?"
মুহূর্তেই যেন ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল। সালমা বেগমের উদ্যত হাত নেমে গেল। সকালের কথা মনে পড়তেই তার রাগী চেহারাটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্ল্যাটের সেই প্রতিবেশী মহিলাটিও, যিনি এতক্ষণ নুপুরকে কটু কথা শোনাচ্ছিলেন, লজ্জায় কুঁকড়ে গেলেন। সজীবের চোখেমুখে তখন ঘৃণা, আর সাজিয়ার চোখে জল।
পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে নুপুর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বিষাদমাখা স্বরে সে বলে উঠল,
" আগে ভাবুন আন্টি, তারপর কথা বলুন। আপনার হয়তো অগাধ টাকা পয়সা আছে, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনার মানসিকতা আর মনুষ্যত্বের বড়ই অভাব।"
সাজিয়ার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নুপুর দরজার দিকে পা বাড়াল। সজীব অপরাধবোধে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সাজিয়ারও আর মুখ নেই তাকে আটকানোর। দরজার কাছে গিয়ে নুপুর একবার থামল। তারপর সালমা বেগম আর সেই মহিলার দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল,
"হ্যাঁ, আমি গরিব। দিনে আনি দিনে খাই কিন্তু আমার দারিদ্র্য কেবল পেটের খোরাকে, চরিত্রে নয়। আপনারা বড়লোক হয়েও হৃদয়ের দিক থেকে যে কতটা কাঙাল, তা আজ আমি দেখে গেলাম। দশ হাজার টাকার জন্য আপনারা একজনকে চোর বানাতে পারেন, কিন্তু আপনাদের ভেতরের এই নোংরা মানসিকতা কোটি টাকা দিয়েও ধুয়ে মুছে যাবে না। আপনাদের এই টাকার স্তূপ থাকতে পারে, কিন্তু শান্তি আর সম্মান নেই। বড় মানুষ, মুখের ওপর অনেক কিছুই বলে ফেললাম। তবে কিছু কথা বলতে গিয়েও বললাম না। আত্মসম্মান প্রবল তো, মুখের ওপর কটু কথা শুনিয়ে দিতে পারি না।"
পাশের ফ্লাটের সেই মহিলার মুখ একটুখানি হয়ে এলো। নুপুর আর পেছনে ফিরে তাকাল না। তার চলে যাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে সালমা বেগমের অস্বস্তিকর নীরবতা পুরো ঘরে পাথরের মতো জেঁকে বসল।
সজীব নুপুরের যাওয়া দেখল। অদ্ভুত লাগল তার।
___
বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায় পুরোনো আমলের বাড়ি। মূল ফটকের জং ধরা গেইটটার পাশের দেয়ালে খোদাই করে লেখা 'শান্তনু'। বাড়ির নামের সাথে যে কাজেও মিল আছে তা বলার বাকি থাকে না। আশেপাশে তেমন বাড়ি দেখা যায় না। দূরে কিছু বিল্ডিং দেখা যায়। শান্ত পরিবেশে শান্তনু বাড়িটা বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অদ্ভুত নামের এই বাড়িটা তিনতলা ভবনের। নুপুররা গতমাসেই তিনতলায় উঠেছে। তিনতলায় তারা বাদে আরও এক ভাড়াটিয়া রয়েছে। নুপুরদের প্রতিবেশী। দোতলায় পুরোটা বাড়িওয়ালাদের। আর নিচতলায় আরও দুটো ভাড়াটিয়া আছে। বিল্ডিংটা বেশ পুরোনো আমলের হওয়ায় আর শান্ত পরিবেশে হওয়ায় রুম ভাড়াও অনেক কম। তিনটে রুম তাদের ফ্ল্যাটে। তার ওপর কোনো ঝামেলা নেই। নিরিবিলি এলাকা। ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব রয়েছে।
নুপুর দ্রুত পায়ে গেইটে পেরিয়ে বাসার উদ্দেশ্যেই যাচ্ছিলো। গেইট পেরিয়ে যেই রাস্তাটা বাড়ির পর্যন্ত গেছে সেই রাস্তার দুপাশে কোনো ফুলের গাছ নেই। বরং ঘাসে ভরা। ঘাসফুল ফোঁটে মাঝে মাঝে। কয়েকটা গাছগাছালিও রয়েছে। হাঁটতে বেশ লাগে। নুপুর যখন ভালো মেজাজে থাকে সে খুব মনোযোগ দিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। তবে আজ মন মেজাজ ভালো নেই। সে নিজেই হুশে নেই বোধহয়।
নুপুর তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার সময় কারও সাথে ধাক্কা লাগল তার। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে আসে। এমনিতেই মাথা গরম তাই তেতে উঠে না তাকিয়েই বলে,
" অন্ধ নাকি?"
অপরপক্ষ হতে তৎক্ষনাৎ ব্যঙ্গ স্বরে প্রত্যুত্তর আসে,
" সেম টু ইউ।"
কথাটা শুনেই নুপুর রেগেমেগে তাকালো পেছনে। সে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছিলো। পেছনে ফিরে দেখল ঝাকড়া চুলের এক সাদা ব্রয়লার মুরগির মত যুবক তারই দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। নুপুর চিনল না এই যুবককে। দেখতে তো ভালো ঘরেরই মনে হচ্ছে। হলুদ টি শার্ট আর কালো ট্রাউজার পড়া। নতুন উঠেছে নাকি এ বাসায়? যুবকটাও কেমন হাদারামের মতো তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। মুখ ব্যাকালো নুপুর। এতকিছু না ভেবে নুপুর পুনরায় ঝাঁঝ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠল,
" অসভ্য।"
যুবকও একই ভঙ্গিমায় বলল,
" সেম টু ইউ ঠু।"
বিরক্ত হলো নুপুর,
" যত্তসব।"
" উহু, নীরব।"
নুপুরের মেজাজ এবার সপ্তম আকাশে উঠে গেলো। নিরব হোক আর যে বালই হোক তাতে তার কি? সে ধুপধাপ পায়ে চলে যেতে যেতে আবারও স্পষ্টত বিড়বিড় করে বলল,
" আজাইরা কোথাকার!"
যুবকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো নুপুর,
" ইউ ঠু।"
নুপুরের মন চাইলো মাথাটা ফাঁটিয়ে দিয়ে আসতে। এদিকে নীরব চলে যাওয়ার সময় মিটিমিটি হেসে দিলো। তার মেজাজ খারাপ ছিলো। মেয়েটার সাথে ঝগড়া করে ভালোই লাগল। মেয়েটা বোধহয় এ বাসাতেই থাকে। আবার দেখা হলে নীরব অবশ্যই ঝগড়া করার জন্য ওতপেতে থাকবে বলে সিদ্ধান্তও নিলো।
#চলবে
(অবশ্যই জানাবেন কেমন লাগছে গল্পটা।)
