#অনুড়া__৮+৯+ শেষ পর্ব
#নুপুর_মজুমদার_জবা
আজ চার মাস হয়েছে নাতি আর মেয়েকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরেছেন চৈতির মা বাবা।বাড়িতে ফিরলেও চৈতির মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই,আগেও যা ছিলো এখনো তাই আছে।সারাটা দিন চোখের পানি ফেলে,বাচ্চাটাকেও তেমন সামলায় না।সবটাই আফরোজা বেগমকে করতে হয় আর হ্যাঁ হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জের সময়ই ওকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে মারা যাওয়া বাচ্চার কথা। তখন সে কি কান্না, সেই কান্না করার সময় তার আহাজারিতে বুঝি হাসপাতালে আশেপাশে থাকা মানুষগুলো করুণ চোখে তাকিয়ে ছিল।
এখন অবশ্য স্বাভাবিক তেমন কারো সঙ্গে কথাবার্তা নেই বাচ্চাটার যতটুকু মাকে প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই সে কাছে থাকে। বাকি সময়টা আলাদা বন্ধ ঘরে নিজেকে নিয়ে কাটায়।
মা-বাবা অব্দি বুঝতে পারে না মেয়ের হাবভাব,উনারা মনে প্রানে চাচ্ছেন যেন মেয়েটা আবার আগের জীবনে ফিরতে পারে আগের মতো হাসি খুশি থাকে। নিজেকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায় এটাই ওনারা চান।
এই চারপাশে একবারও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি রাফাত,চৈতির নিজেকে কখনো বেহায়া বানিয়ে রাফাতের সামনে গিয়ে আর দাঁড়ায়নি।
সময়টা এখন বিকেলের ঘরে, এমন সময় মিলন শেখ হাতে একটা কাগজের খাম নিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন। বাবাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখেই এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে আনলো চৈতি, বাচ্চাটাকে নিয়ে তার মা একটু বাইরে গিয়েছে। সব সময় কাঁদতে থাকে সামলাতে পারে না এইভাবে চৈতি।
মেয়েকে গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজে এগিয়ে এসে হাতের থেকে পানিটুকু নিয়ে খেলেন মিলন শেখ।
ঘামটুকু পাশে থাকা গামছায় মুছলেন,চৈতি চলেই যাচ্ছিল পেছন থেকে নিজের মেয়েকে ডেকে আনলেন,
__ একটু এদিকে এসো চৈতি।কিছু কথা আছে তোমার সাথে।
হাতে থাকা গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে নিজের বাবার পাশে এসে দাঁড়ালো।
__ জ্বি আব্বু বলো।
__নানু ভাই কোথায়? আসার পর থেকেই কোন আওয়াজ পাচ্ছি না বাইরে গিয়েছে নাকি?
__না আম্মুর সাথে এমনি বাড়ির পেছনের থেকে জঙ্গলের কাছে রয়েছে।
__ছোট বাচ্চা না আবার ওই ওইদিকে কেন নিয়ে গিয়েছে?
__কোন সমস্যা হবে না আব্বু আম্মুর সাথেই তো আছে মনি।
__নজর বলতে একটা জিনিস আছে। এক্ষুনি ওকে নিয়ে বাড়িতে ফিরতে বল।
__হুম বলছি।
__আচ্ছা তাহলে কি আমার একটা কথা শুনে যাও।
__হু বলো।
হাতে থাকা কাগজের খাম থেকে আস্তে করে খুলে ভেতর থেকে একটা শুরু কাগজ বের করলেন তিনি। সেখানে স্পষ্ট করে সরকারি সিলমোহর মারা , টাইপিং করা প্রতিটা অক্ষর যেন কোন কিছুর এক নীরব সাক্ষী দিচ্ছে।
সরাসরি কাগজটা না দেখলেও যদি আন্দাজ করতে পারল যে এইটা ওর আর রাফাতের বিচ্ছেদের শেষ চিহ্ন। মনে মনে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিল, যাক এবার অন্তত শান্তি শ্বাস ফেলতে পারবে এই মিথ্যা নোংরা সম্পর্ক থেকে এক মুহূর্তে বের হয়ে আসাটাই যেন স্বস্তির। মেয়ে মানুষ সবকিছু মেনে সংসার করতে পারে কিন্তু নিজের সংসার অন্য কারো ভাগ কখনোই মানতে পারে না, তা আবার নিজের স্বামী নিজেরই চোখের সামনে অন্য আর একটা মেয়ের সঙ্গে থাকবে।
এই কারণে এই সব মেনে নেওয়ার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়াটাই সবথেকে উত্তম বলে ভেবেছে। আর যেখানে রাফাত ওকে রেখে আর একটা বিয়ে করেই ফেলেছে সেইখানে জোরজবরদস্তি করে থাকার তো কোন মানেই হয় না।
এর থেকে আলাদা হয়ে সংসার করাটাই বেটার। এই কারণেই পারিবারিকভাবে আলাদা হয়ে গিয়েছে এখন শুধু সামাজিক ও আইনগতভাবে ডিভোর্স হয়ে গেলেই ওদের সব সম্পর্ক এইখানেই শেষ। বাচ্চাটার দাবি অবশ্যই রাফাত করেছিল কিন্তু পুলিশের ভয় এবং দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য যখন হুমকি দেয় যে ওরা রাফাতের নামে কেস করবে সেই সময় আর কোন কথা বলেনি। কথা বলেনি সেটা না আসলে রাফাত ভয় পেয়ে গিয়েছিল মানুষ যখন বেআইনি কিংবা সমাজের বাইরে গিয়ে কোন কাজ করে তখন তাকে সব দিক দিয়ে খেয়াল রাখতে হয়।চৈতির অবশ্যই এখন দুঃখ হয় না, প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগত ভাবতো নিজের মতোই হয়তো কোন কমতি আছে, কিন্তু বর্তমানে বুঝে গেছে যে যে পুরুষের বাইরে টান থাকে তাকে কখনোই ঘরে আটকানো যায় না।
__রাফাত ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি জানি না তোমার কি মতামত কিন্তু আমি আশা করব তুমি দ্বিতীয়বার ওই ছেলের কাছে ফিরে যেতে চাইবে না। যে ছেলে তোমায় দেখে অনেকটা বিয়ে করতে পারে সেই ছেলে কখনোই চরিত্রবান নয় কিংবা ভবিষ্যতে তোমাকে ভালোবাসবে না।
___ধন্যবাদ বাবা। আমার জন্য এতোটুকু ভেবেছো এই জন্য আমার অনেক ভালো লাগছে।
দুচোখ দিয়ে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল চৈতির মিলন শেখ অবাক হলেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে এই মেয়ের গত তিন মাসে একবারের জন্য হলেও চোখ দিয়ে পানি পড়েনি।তাহলে এই শেষ মুহূর্তে এসে এতটা ভেঙ্গে কেন পড়ছে?
__চোখের পানি মুছে ফেলো চৈতি। একটা বেইমানের জন্য কেঁদে কেঁদে চোখ ভাসানোর কোন মানে হয় না। আমি কখনোই তোমার ওপর নিজের মত চাপিয়ে দিইনি এবং এখনো দেবোনা তোমার যা ভাল মনে হয় তাই করো।
বাবার দিকে সন্তুষ্টির নজরে তাকালো সে, পাশে থাকা কলমটা উঠিয়ে খসখসে মসৃণ কাগজের সই করে দিলো।শুধু এই জন্ম না পরজনমের অধিকারটুকুর দাবিটাও নিসন্দেহে ছেড়ে দিলো।
মেয়েকে কাগজে স্বাক্ষর করতে দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। মেয়েটা শেষ অব্দি জীবন একটু সুখ করতে পারল না, তবু তিনি বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে ফেলে দেন না। হয়তো ভুল করেছে কম বয়সে সবাই একটু একটু ভুল করেই থাকে, তাই বলে সেই ভুলের মাশুল আজীবন দেবে এটা তো কোন কথা না।
________________________
ইতিমধ্যে রাফাত আর চৈতির ডিভোর্সের প্রায় ৮-৯ মাস পার হয়ে গেছে। দুজন এখন আলাদা হয়ে থাকে এমন কিছু একটি বাইরের একটা বাচ্চাদের কেজি স্কুলে চাকরি করে। ইন্টার পাশ করার কারণে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়নি চাকরি পেতে, এই পুরো নয় মাসের সম্পূর্ণভাবে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। আজকাল আর কারো কথা মনে পড়ে না সময় পেলেই নিজের বাবা-মার সঙ্গে একটু ফোনে কথা বলে। নিজেদের বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরেই একটা বাসা ভাড়া করেছে থাকার জন্য।
গত মাসে ওর ছেলেটার জন্মদিন ছিল। দারুন একটা নাম রেখেছে সবাই মিলে স্পর্শ। আজকাল স্পর্শকে নিয়ে অনেকগুলো সময় কেটে যায় ওর, কারো কথা তেমন মনে পড়ে না। সময় পেলে দুই মা ছেলে মিলে বাড়িতে ঘুরতে বেরিয়ে যায়, ভেবেছে সামনের মাসের সিলেট যাবে। একটু বাইরের আমেজে ঘোরাফেরা করলে মনের ভেতর থেকে আগেই ভালো লাগা কাজ করতে শুরু করে দেয়।
এমনিতেও বাইরে এখন শীত শীত জানুয়ারি মাসটার শেষের পথে তবুও যেন ঠান্ডা একটুও কমেনি।
#চলবে#অনুড়া__৯
#নুপুর_মজুমদার_জবা
এ মাসের বেতন পেয়েই তিন হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া বাবদ আলাদা করে রেখে দিয়েছে চৈতি।এভাবে করে কখনোই পরিবার থেকে আলাদা থাকা হয়নি তার, শুধুমাত্র নিজের মনের খোরাক পূরণ করতে এই মুহূর্তে একটু আলাদা নিজেকে রেখেছে সবার থেকে। সব সময় তো আর সাথে পরিবার থাকবে না এই কারণেই তার আলাদা থাকা, তাছাড়া প্রতি মাসে বাবার একটা নিজস্ব হাত খরচ তার একাউন্টে পাঠিয়ে দেয় আবার মাঝে মাঝে বিকাশে আলাদা করেও টাকা পাঠায়।
ও জানে এই টাকাটা ওর দরকার তবু নিজে কাজ করে কিছুটা সাহায্য করাটাই ওর কাছে আনন্দের সবচেয়ে বেশি।
এই নয় মাসে তেমন কারো সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি এমনকি শ্বশুর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কথা বলার রুচি আসেনি। রাফাত আর ইমার ব্যাপারেও তেমন এখন শোনা যায় না। আর এসবের মাথা ঘামায় না সে যা চলে গেছে জীবন থেকে তা নিয়ে আক্ষেপ করলেও তো আর ফেরত আসবে না।
বাচ্চা তো সকাল থেকে কাঁদছে সে ভেবেছে যাওয়ার সময় মায়ের বাড়িতে রেখে যাবে, মাঝে মাঝে উপরওয়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করে যে এইরকম মা-বাবা না পেলে জীবনে কিভাবে এগোতো সে? কিছু কিছু সময় উপরওয়ালা যা করে তা হয়তো ভালোর জন্যই করে।
সকালের নাস্তা তৈরি করে কোন মতে বাচ্চাকে নিয়ে বের হল সে।
আজ একটু সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হয়েছে, পেটের ঘা তেমন এখনো শুকায়নি,মোটামুটি শুকিয়ে গেলেও চিনচিনে ব্যথা করে মাঝে মাঝে। স্পর্শ ততক্ষণে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে রীতিমতো, পুরো আধা ঘন্টা সময় কাটিয়ে নিজের বাড়ির সামনে এসে থামল সে। বাড়ির সামনে মা-বাবা দুজনকে বসে থাকতে দেখলো,তাড়াতাড়ি চপল পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে তার মায়ের কোলে ধরিয়ে দিল।
__আম্মু তুমি আপাতত ওকে রাখো আমি যাওয়ার পথে নিয়ে যাব। আজকে একটু মিটিং আছে স্কুলে, আমি রাস্তায় অটো দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি।
__আরে খেয়ে যা একটু কিছু। এতটা দূর থেকে আসলে আর সকাল সকাল না খেয়ে চলে যাচ্ছিস?
__আমি সকালে রান্না করে খাবার খেয়ে একেবারে বেরিয়েছি। তুমি চিন্তা করো না আমার এখন খিদে নেই।
__টিফিন নিয়েছিস সাথে করে?
__হ্যাঁ হ্যাঁ সবকিছু সাথে নিয়েছি আমি। তুমি চিন্তা করো না তুমি শুধু বাচ্চাটাকে একটু দেখে রেখো আমি যাওয়ার পথে নিয়ে যাব।
চৈতি চলে যেতেই যাচ্ছিল এমন সময় পেছন থেকে ডাকলেন আফরোজা বেগম। এগিয়ে এসে মেয়ের হাতে একশ টাকার একটা নোট গুজে দিলেন। চৈতি পেছনে তাকালো দেখতে পেল মায়ের পাশেই তার বাবা দাঁড়ানো এই টাকাটা যে উনি নিজে দিয়েছেন তা বুঝতে তার বেগ পেতে হলো না। আলতো করে হাসলো সে।
__দাদুভাইকে কি সকালবেলা কোন খাবার খাইয়েছিলি নাকি এরকমই খালি পেটে রেখে যাচ্ছিস?
__হ্যাঁ সকালে সেরেলেক্স খাইয়ে ছিলাম। আর তুমি আরেকটু পর করে গরুর দুধ গরম করে দিও। যদি বেশি কান্নাকাটি করে তাহলে ঘুম পাড়িয়ে রেখে যাও।
__আচ্ছা হয়েছে তোকে আর কোন পাকনামি করতে হবে না আমি তো বড় করেছি বাচ্চা না? তোদেরকেও তো আমি নিজ হাতেই মানুষ করেছি।
__আচ্ছা আচ্ছা আমার মা জননী বুঝতে পেরেছি।এইটা আমি আর কোন কথা বললাম না আমি এখন চুপ।আচ্ছা মা দেরী হয়ে যাচ্ছে আমি তাহলে এক্ষুনি রওনা দেই।
__আচ্ছা যা তবু সাবধানে যাস।
__________________
তখন কেবলই স্কুলের ঘন্টা দিয়ে দিয়েছে। ছুটি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে বাচ্চারা বের হচ্ছে গেট দিয়ে। শিক্ষকরুম থেকে নিজের ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে চৈতি। আশেপাশের ভিড় এখন একটু কম কারণ বাচ্চাদের মা-বাবা এসে তাদেরকে সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে চৈতি একটা অটো কিংবা রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
চৈতি রাস্তা পার হতেই যাবে এমন সময় পেছন থেকে হাতে টান লাগল তার। পেছনে ফিরে তাকাতেই উষ্কখুষ্কো চুলের রাফাতকে দেখা গেল, এক মুহূর্তের জন্য চৈতির হৃদয় থমকে গেল রাফাতকে দেখে। এই মুহূর্তে তো ওর এইখানে আসার কোন কথা না এবং ওর এই রাস্তাতে কোন কাজ আছে বলে মনে পড়ে না চৈতি। তাহলে চেহারার বা এই অবস্থা কেন দেখে মনে হচ্ছে কতগুলো দিন ঠিকমত ঘুমায় না? নিজের হাতের দিক তাকানোর সাথে সাথে ঝাড়া দিয়ে উঠলো সে,কিছু কঠোর কথা শোনানোর জন্য উদ্যম হলো,
__কোন সাহসে তুমি আমার হাত ধরেছ? এবং মাঝ রাস্তায় এসে এরকম তামাশা করতে চাইছো?
রাফাত কোথায় থমকে গেল চৈতির এরকম আচরণে, সব সময় নিজের দিকে শান্ত হিসেবেই দেখে আসছে সেই সংসার জীবনের শুরু থেকে এবং প্রেমের সময়টাতেও। কখনো চৈতি ওর সঙ্গে গলা উঁচু করে কথা বলেনি, এই কারণেই কোথায় ওর প্রেমটা একেবারে নরম-সরম হয়ে জমে ছিল।
__আমি তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছি চৈতি আমার সঙ্গে একটু কথা বলো।
__এই তোমার লজ্জা করে না করে বউ রেখে এসে আর এক মহিলার সঙ্গে এই রকম লুতুপুতু করছো? ইমা যদি জানতে পারে তাহলে তোমার কি করবে ভাবতে পারছো? সবাই কিন্তু আমি না যে তোমাকে ছেড়ে দিয়ে দেবে।
রাফাতের মুখে যেন কালো মেঘের ছায়া আসলো, উদাস বিষন্ন মুখে বলল,
__ইমা নেই।
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল চৈতি, পুরো ঘটনাটা বুঝতে পারল না। রাফাত কি বলতে চাইছে তা তার বোধগম্যের বাইরে গেল,
__মানে? ইমা কোথায় গেছে? আর তুমি মাগুরা থেকে এখানে আসলে কিভাবে?
___পালিয়ে গেছে।
__ম.ম.মানে? ইমা তোমার বিয়ে হলোই তো কিছু মাস আগে আর এর মধ্যে ওর সঙ্গে ওর সংসার করতে পারলে না?
নিজের কথাটুকু শেষ করে তাচ্ছ্যিলের হাসি হাসলো চৈতি। শেষ অব্দি প্রকৃতির সবার প্রতি প্রতিশোধ নেয় উপরওয়ালা ছাড় দেয় কিন্তু ছেড়ে দেয় না। নিজের কৌতুহল লুকিয়ে রাফাতকে প্রশ্ন করল,
__ কার সাথে পালালো?
__আমার সঙ্গে সংসার করার পর থেকেই ওর শুধুমাত্র চাহিদা বেড়ে যাচ্ছিল। প্রতি মাসে মাসে নিজের পছন্দ অনুযায়ী শপিং করা টাকা পয়সা ওড়ানো সবকিছু যেন ওর নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। তারপর আর কি রোজকার ঝামেলা, আমার চাকরির টাকায় তার সংসার চলছিলই না। বলা চলে সে তার বিলাসিতা নিয়েই থাকতে পছন্দ করছিল। যখন আমার থেকে বেশি টাকা ওয়ালা একজনকে পেল সেই দিনে পালিয়ে চলে গেছে সেই লোকের সঙ্গে। আমাদের ফ্ল্যাটের নতুন এক চাকরি ওয়ালা এসেছিল তার সঙ্গে ওর সম্পর্ক হয়েছিল। আর যখন ও জানতে পারলো আমার এইডস হয়েছে তখন আমাকে ছেড়ে সেই রাতেই পালিয়ে গেল।
কথাগুলো বলতে বলতে রাফাত দু চোখের জল ছেড়ে দিল গলা ভেঙ্গে আসলো ওর। হঠাৎ করেই মাটিতে বসে চৈতির পা জড়িয়ে ধরল। হু হু করে কেঁদে উঠলো সে, আশেপাশে ভালো করে তাকালো চরিত্রে দেখতে পেল কেউ তাকিয়ে আছে কিনা? আর যাই হোক এটা ওর পেশাগত জায়গায় এখানে অন্তত কোন ধরনের সিনক্রিয়েট সে চায় না।
#চলবে#অনুড়া___১০ [ অন্তিম পাতা ]
#নুপুর_মজুমদার_জবা
চৈতি নিজের সাথে রাফাতকে নিয়ে অন্যদিকে এসে দাঁড়ালো ঐ দিকটা বেশ লোকসমাগম ছিল।কেউ যদি আবার প্রশ্ন করতো দুজনের মধ্যে কি সম্পর্ক তখন কি জবাব দিতো? আদৌ এ প্রশ্নের কোনো জবাব হয়? উহু হয় না, যেখান থেকে একবার ফিরে এসেছে ঠিক সেই একই জায়গায় আর ফেরা সম্ভবই না।
রাফাতের কথায় চৈতির মাথায় বাজ পড়ার মতো হয়েছে,ইমার ব্যাপারে ও অতটা চমকায়নি।স্কুল লাইফ থেকেই সে দেখেছে ইমার একাধিক প্রেম।ওসবের সাক্ষীও নিজে ছিল,শুধু সবচেয়ে কাছের বান্ধবী বলে কাউকে কিছু জানায়নি কখনো।তবুও বিয়ের পরও যে চরিত্রে পরিবর্তন আসবে না সেটা অবশ্য ও ভাবেনি।দীর্ঘশ্বাস ফেললো ও জানে চরিত্রের দোষওয়ালারা কখনোই ভালো হয় না তবুও শুধু শুরু তাদের থেকে আশা করাটা বোকামি।
ও সবচেয়ে বেশি চমকেছে রাফাতের এইডস হয়েছে শুনে।রাফাত যে অসুস্থ তা ওর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো বড় বড় হয়ে গেছে।অনেকদিন বোধহয় নিজের যত্ন নেয় না,চেহারাও দশাও বেশ কাহিল।মুখের আদলে বেশ পরিবর্তন এসেছে, চোখ কোটরে ঢুকে গিয়েছে, নিচে বেশ কালি জমেছে।
ঠোঁটগুলোও একেবারে কালো হয়ে গেছে মনে হয় এখন সিগারেটও ধরেছে,আগে খেত না কখনো অবশ্য কিন্তু অতিরিক্ত টেনশনে থাকলেই রাতভর সিগারেট খাওয়া চলতো তার।একসময় ঝগড়া ঝগড়া করে ঐ সিগারেট খাওয়া বন্ধ করেছিল চৈতি।ওর পর আর কখনো রাফাতকে সিগারেট খেতে দেখেনি সে আজ এতগুলো দিন পর সামনাসামনি আবারো দুজন।রীতিমতো জোড়াজুড়ি করে পা ধরেছে রাফাত।
__এই পা ছাড়ো কি করছো রাফাত? আমার থেকে দূরে সরে যাও বলছি।
__প্লিজ চৈতি আমার কাছে আবার ফিরে চলো তুমি।
তাচ্ছিল্য করে হাসলো চৈতি,
__ হ্যাঁ তোমার কাছে আবার ফিরি আর তুমি নতুন করে আরেকজন নিয়ে বাড়িতে ওঠো আমার প্রতি নতুন করে অত্যাচার করতে পারো তাই না? যেভাবে আমাকে তুমি আঘাত করেছিলে আমি আজও ভুলিনি,আমার পেটে থাকা সন্তানটার কথাও তুমি চিন্তা করোনি একবার।
বলতে গিয়ে গলা ধরে এলো চৈতির,আজও সেই সময়টার কথা মনে পড়লে চিৎকার করে কান্না আসে।সেই সময়টা মনে করিয়ে দেয়য় যে কীভাবে ও কষ্ট পেয়েছিলো নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করতো। ও কীভাবে সহ্য করেছিলো ইমা আর রাফাতকে পাশাপাশি? আজও ঘেন্না হয় নিজের পছন্দের ওপর,কীভাবে নিজের মা বাবার মতো ভালো মানুষের বিরুদ্ধে গিয়েছিলো। আর সেই মানুষটাই ওকে এত নোংরাভাবে ভেঙে দিয়েছিলো।
রাফাত কেঁদে দেওয়ার উপক্রম ততক্ষণে। হু হু করে গলা ভেঙে কাদার আওয়াজ আসছে,
__একবার চৈতি শুধু একটাবার আমাকে সুযোগ দিয়েও দেখো।মানুষ মাত্রই তো ভুল করে আমিও তো একটা মানুষ আমি ভুল করেছি,তার বদলে৷ প্রতিনিয়ত শাস্তি পাচ্ছি নিজের সন্তান থেকে দূরে আছি।আমার বাচ্চা তো জানেই না, চিনেই না নিজের বাবাকে।প্লিজ চৈতি একবার হলেও ফিরে এসো আমার সংসারে আগের মতো করে দিবো আমি সবকিছু। আগে যেমন আমি আর তুমি একসাথে থাকতাম ঠিক তেমনই থাকবো।
ঠাস করে থাপ্পর মেরে দিলো চৈতি। রাফাতের বা গালে থাপ্পর পড়তেই হতভম্ব হয়ে গেলো সে।চৈতি আবারো চৈতি ওকে মারলো? যে মেয়েটা আজীবন ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়েছে সেই মেয়েটাই এভাবে মারতে পারলো।
__তোমার মত একটা নোংরা জঘন্য মানুষের কাছে আর একবারও ফিরতে চায় না আমি তোমাকে দেখলেই আবার ঘেন্না আসে। কোন সাহসে তুমি এইখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ আবার?
__প্লিজ চৈতি আমি আজ তোমার গোলাম হয়ে থাকবো তারপরও আবার সন্তানকে আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে দাও।
__চলে যাও রাফাত বিশ্বাস করো তোমায় দেখলে আমার ভেতরের রাগ গুলো মাথাচারা দিয়ে ওঠে।
তুমি যদি আমার সামনে থেকে চলে যাও এতে আমাদের দুজনেরই ভালো হবে। আমি চাইনা ভবিষ্যতে কেউ কারো মুখ দেখাদেখি হোক আমাদের।
__চৈতি আমি বারবার একটা সুযোগ চাইছি, মানুষ হিসেবে আমি ভুল করেছি কিন্তু তাই বলে আমাকে শোধরানোর সুযোগটা এত অন্তত দিতে হবে।
কষ্ট হচ্ছে চৈতির এই কষ্টের মাথাচাড়া দিয়ে উঠে শ্বাসকষ্ট সমস্যা বেড়ে যাবে মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত টেনশন থাকলে এইভাবে শ্বাসকষ্ট টা তার শুরু হয়, যেমন এই মুহূর্তে নিঃশ্বাস নিতে প্রচুর কষ্ট লাগছে। অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছে ও চায়না এই মুহূর্তে রাফাত ওর সামনে আসুক।
__তুমি আমার সামনে থেকে যাবে নাকি আমি পুলিশ ডাকব? দেখো আমি চাইনা আর কোন কাহিনী হোক যা শেষ হওয়ার সব শেষ আমি তোমার মত একটা চরিত্রহীন এর কাছে ফিরব কিংবা আমার সন্তানকে তোমার হাতে তুলে দেবো এটা তুমি ভাবো কোন সাহসে?
__পৃথিবীর সব থেকে জঘন্য মানুষ তুমি তোমার জন্য আমি এবার একটা সন্তানকে হারিয়েছি জন্ম নিয়ে আবার কোলে আসার আগেই সে মারা গিয়েছে, বোঝো একটা মায়ের কতটা কষ্ট হয় নিজের সন্তানকে নিজ হাতে স্পর্শ করার আগেই তাকে দাফন করে দেয়া হয়েছে। আমার বাচ্চাটা আজ আমার কাছে নেই, তোমার কাছে যদি ফিরিয়ে তুমি পারবে তাকে ফিরিয়ে দিতে? পারবে?
চৈতি চলে যাওয়ার জন্য রাস্তার বাইরে পা বাড়িয়েছিল এমন সময় পেছন থেকে ওর কাধ ঝাকিয়ে উঠল রাফাত।প্রচন্ড ব্যথায় কুঁচকে গেল মুখখানা, আশেপাশে কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক যাচ্ছিল একটা মেয়েকে এরকম রাস্তার মাঝখানে হ্যারাস করতে দেখে এগিয়ে আসলো তারা।
__এই ছেলে তুমি এই মেয়ের সঙ্গে কি করছো? ফাইজলামি করো অর্ধেক রাস্তায়? আপু এই লোকটাকে কি আপনি চেনেন?
এক পলক রাফাতের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকালো চৈতি ধীরসুস্থে বলল,
__জ্বী না আমি এই লোককে চিনি না।
__তার মানে এই কুলাক্কার মাঝ রাস্তায় এমনি এমনি মেয়েদেরকে বিরক্ত করছে। ধর এই ব্যাটাকে ওকে বুঝিয়ে দিই মেয়েদের হ্যারাস করার ফল কি?
__আরে বোঝেন না মেয়ে দেখলে এইরকম ছেলেদের যৌবন জ্বালা বেড়ে যায়। ওদেরকে ধরে আচ্ছা মতো কয়েকটা দিলে ঠান্ডা হয়ে যাবে একেবারে।
হই হই রব করে কয়েকজন লোক এগিয়ে এসে কয়েকটা চড় থাপ্পর মারতে লাগলো রাফাতকে। এমনিতেই দুর্বল শরীর ছিল তারপর আবার এতটা আঘাত সহ্য না করতে পেরে বাড়িতে লুটিয়ে পড়ল সে। ভেবেছিল চৈতি একবার হলে এগিয়ে এসে ওকে বাঁচাবে কিন্তু দেখা গেল চৈতি হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে চলে গেল।
________
হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ এসে গেছে চৈতি, হুট করে ও অনুভব করল খুব নোংরা একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে যেখানে শুধুমাত্র ওর মানসিক অশান্তি বাড়ছিল। অনুভব করতে পারছে যে কিছুটা শান্তি এসে জুড়ে গেছে ওর জীবনে, হুট করেই মনের মধ্যে একটা কথা চলে আসলো,
__আমরা যাদেরকে ভালোবাসি, তারা যদি আমাদেরকে এক টুকরো ভালোবাসা দিত তাহলে বোধহয় পুরো পৃথিবীতে কেউ ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কষ্ট করত না।
পেছনে ফেরার তারা অনুভব করল না, গাছের পাতাগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে এখনো শীত শেষ হয়নি। বোঝাই যাচ্ছে বসন্ত এসে যাচ্ছে, সামনেই বসন্ত আসতে চলেছে।
#সমাপ্ত
বিদ্র; শুনুন অনেকে বলবেন নায়ক নিয়ে আসতে আর একজন। একটা মানুষ কখনো একা চলতে পারে না, তাই বলে সব সময় যে জীবনে দ্বিতীয় মানুষ আসবে তার কোন কথা নেই। ভালো থাকবেন প্রায় ২০ দিনের পথচলা আমার আপনাদের সাথে।
