আঁধারি_অমানিশা
পর্ব ৮+৯
নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
রুমঝুমকে বাসায় নিয়ে আসা হলো। দু’দিন ধরে রুমঝুম কারো সাথে কোন কথা বলছে না। আগে যে কথা বলতো তাও না। রুমঝুম আগে থেকে চুপচাপ ছিলো। তবে নীলাশার সাথে হঠাৎ করে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিলো। এখন নীলাশার সাথেও কথা বলে না।
মুন এবং মেঘ রুমঝুমের সাথে দেখা করতে আসলো। মুন প্রথমে শিরিন বেগমের সাথে কথা বললো।
“আন্টি এখন রুমঝুম কেমন আছে?”
“জানি না। কারো সাথে কথা বলছে না। ওর বাবা বিদেশ থেকে আসতে পারছে না, কথা বলার জন্য ফোন দিচ্ছে কিন্তু মেয়েটা কথা বলছে না।”
“আচ্ছা। আমরা একটু ভিতরে গিয়ে কথা বলি?”
“হ্যাঁ যাও।”
মুন এবং মেঘ রুমের কাছে গেলো। রুমঝুম নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো। দু’দিন ধরে এভাবেই আছে। কারো সাথে কোন কথা বলছে না, এমনকি কান্নাও করছে না।
মুন গিয়ে রুমের পাশে বসলো। শান্ত কন্ঠে বললো,“কেমন আছো? তুমি নিশ্চয় আমাকে চিনো? আমি নীলাশার বোন।”
“জানি।”
সংক্ষেপে রুম বললো। মেঘ মুনকে বলার জন্য ইশারা করলো। মুন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। মুন বললো,“আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।”
রুমঝুম কিছু বললো না। চুপ করে রইলো। মুন পুনরায় বললো,“দেখো তোমার সাথে যা হয়েছে অন্যায় হয়েছে। আমরা চাই অপরাধীদের শাস্তি দিতে। এজন্য তোমার সহযোগিতা লাগবে।”
মেঘ বললো,“দেখুন আপু আমি আপনাকে শুধু একটা কথাই বলবো ভয় পাবেন না। আপনি যদি আজ এগিয়ে না আসেন তবে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আপনার নিশ্চয় সেটা ভালো লাগবে না।”
রুমঝুম কিছু বলার পূর্বে শিরিন বেগম বললেন,“আমি এসব ঝামেলা চাই না। এমনিতে আমার মেয়ের অনেক বদনাম হয়ে গেছে। এখন পুলিশি ঝামেলা করলে আরো ঝামেলা বাড়বে। দিনশেষে দোষটা আমার মেয়েকেই দেওয়া হবে।
আমাদের যথেষ্ট মান-সম্মান গিয়েছে, আর চাই না। তাই আমরা ঠিক করেছি আমরা এখান থেকে চলে যাবো।”
মুন বললো,“পালিয়ে গেলে বুঝি কলঙ্কের দাগ মুছে যাবে? যাবে না আন্টি। আপনি কোথায় পালাবেন? আপনি যত দূরে যান না কেন, আপনার শত্রু ঠিক সেখানে পৌঁছে যাবে আপনার মেয়ের বদনামির ঘটনা রটনার জন্য। আজ যদি আপনারা ভয় পেয়ে পালিয়ে যান তবে দেখা যাবে ঐ শ/য়/তা/ন গুলো আরো অনেকের সাথে এরূপ ঘটনা ঘটাবে। কারণ ওরা মনে করবে ওদের তো কেউ কিছু বলছে না। এসব পাপ করে যখন মুক্ত বাতাসে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারছে, তখন আরো অপকর্ম করবে।”
শিরিন বেগম বলেন,“দেখো তোমার শাস্তি দেওয়ার হলে নিজের সাথে যে অপরাধ করছে তাকে শাস্তি দাও। আমার মেয়ের জীবনে নাক গলিয়ে না।”
মেঘ বললো,“আপনি আপনার মেয়েকে দোষারোপের দহনে পুড়তে দেখতে চান?”
শিরিন বেগম বললেন,“যখন বদনামি নিজে বয়ে আনে তখন তো কিছু করার থাকে না। ওকে কে বলছিলো ওত রাতে বাহিরে যেতে, ভুল ও করেছে। তার শাস্তিও পেয়েছে।”
মেঘ বললো,“মানে কি? অন্যায় করলো ওরা, জ/ঘ/ন্য অপরাধ করলো। আর রাতে বাহিরে গিয়েছে বলে দোষটা রুমঝুমের হয়ে গেলো। আপনি মা হয়ে কিভাবে সন্তানকে দোষারোপ করতে পারেন?”
শিরিন বেগম চুপ করে রইলেন। মুন বললো,“আপনি জানেন আমার সাথে যখন এরকম ঘটনা ঘটেছিলো, তখন আমার মনের অবস্থা কেমন ছিলো? ইচ্ছে করছিলো নিজেকে শেষ করে দেই। কিন্তু দিতে পারিনি। কেন জানেন? কারণ আমার বাবা-মা, তারা আমাকে ঐসময় এত সাপোর্ট দিয়েছিলো যে মৃ/ত্যু আমার কাছাকাছি আসতে ভয় পেয়েছে। তখন আমি বুঝেছি ঐসময়ে একজন সন্তানের তার বাবা-মায়ের সাপোর্টটা ঠিক কতটা প্রয়োজন। তাই আমি বলবো, নিজেই নিজের মেয়েকে দোষারোপ না করে বরং তাকে সাপোর্ট করুন। তার অপরাধীদের শাস্তি দিতে সাহায্য করুন।”
শিরিন বেগম বললেন,“তোমার বাবা-মা তো তোমাকে এত সাপোর্ট দিয়েছিলো তাহলে তোমার অপরাধী শাস্তি পাইনি কেন?”
মুন নিশ্চুপ। মেঘ বললো,“কারণ আপনাদের চিন্তা-ধারা। আপনাদের ধারণা এসব ঘটনা পুলিশে জানলে সারা দুনিয়া জেনে যাবে, মেয়ের জীবন শেষ। অথচ আপনারা বুঝেন না এসব ঘটনা আড়াল করলে মেয়ের জীবন শেষ হয়ে যায়। কারণ আড়ালে পাপীরা লুকিয়ে থাকে, তাই দোষারোপের আগুনটা নির্দোষকেই বয়ে বেড়াতে হয়।
আর হ্যাঁ মুনের সময় পাপী পার পেয়ে গেছিলো বলেই আমরা এগিয়ে এসেছি। কারণ আমরা চাই না পুনরায় কোন অপরাধী অন্যায় করে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াক। মুনের জীবনের অমাবস্যা তো পালিয়ে গেছে, তার শাস্তিটা আমরা সময়ের হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু রুমঝুমের অন্যায়কারী পালিয়ে যাক আমরা সেটা চাই না। আমরা চাই তাদের এমন শাস্তি হোক যাতে দ্বিতীয়বার একই ভুল করার দুঃসাহস কেউ না করে।”
মুন বললো,“আপনি অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে নিজে পালিয়ে যেতে চাইছেন। কিন্তু কেন? পালিয়ে গিয়ে কি প্রমাণ করতে চাইছেন, যে রুমঝুম অপরাধী? রুমঝুমের বাহিরে যাওয়াটা আপনার এতবড় অপরাধ মনে হলো? যে কলঙ্কের দ্বায় থেকে বাঁচতে পালাতে চাইছেন, তা থেকে কি সত্যি পালাতে পারবেন আপনি?”
মেঘ বললো,“আপনি যতই পালাতে চান, এই সমাজ আপনাকে পালাতে দিবে না।
আপনি পালিয়ে গেলে কি হবে? আজ রুমঝুম কলঙ্কিত, কাল হয়তো অন্যকেউ। অথবা যে নীলাশাকে রুমঝুম শেষ অব্দি বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো, দেখা গেলো সেই নীলাশাই কাল কলঙ্কিত।”
রুমঝুম অনেকক্ষণ পর মুখ খুললো,“আমি এত দূর্বল নই। তাছাড়া সারাজীবন যে বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না, আজ একদিনে তাদের সিদ্ধান্ত আমার জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে সেটা কতটা যুক্তিযত।”
শিরিন বেগম অবাক হয়ে বললেন,“রুমঝুম? আজও তোমার আমাদের উপর এত অভিমান? এই অভিমানের জন্যই নিয়মহীন জীবন কাটিয়েছো, রাত নেই দিন নেই যখন খুশি বাহিরে গেছে। তার ফল তো পেলে?”
রুমঝুম বললো,“সমাজে তো আরো ধ*র্ষি*তা আছে। সবাই তো আমার মতো নিয়মহীন জীবন কাটায়নি, তবে তারা কেন কলঙ্কিত হয়।কারণ বারবার অপরাধ করে তারা পার পেয়ে যায়। কিন্তু এবার পার পাবে না। জীবন তো আমার তোমাদের অবহেলায় এমনিতে শেষ হয়ে গিয়েছিলো, আজ আর নতুন করে কি শেষ হবে? তবে তাদের শাস্তি পেতে হবে।”
রুমঝুম সময় নিয়ে পুনরায় বললো,“তোমার কি মনে হয় আমি কান্না করছি না মানে ভিতর থেকে জর্জরিত? একদম না। ভুল ভাবছো। আমি কাঁদছি না কারণ আমি কোন অন্যায় করেনি। আমার সাথে অন্যায় হয়েছে। তাই তাদের কাঁদতে হবে। যারা আমার সাথে অন্যায় করেছে।”
মুন এবং মেঘ উভয়ই অবাক চোখে রুমঝুমের দিকে তাকিয়ে রইলো। মুন মনেমনে বললো,“আমি ভুল ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম মুনের মতো ভয়ে জর্জরিত হয়ে রুম পিছিয়ে যাবে বাবা-মায়ের কথা শুনে। কিন্তু না। রুমঝুম সত্যি আলাদা, নীলাশা ঠিক বলেছিলো৷”
মেঘ মনেমনে বললো,“নিজেকে না বাঁচিয়ে নীলাশাকে বাঁচিয়ে রুমঝুম প্রমাণ করে দিয়েছে সে কতটা ভালো মানুষ। তবে এতটা সাহসী হবে তা বুঝতে পারিনি।”
*
মেঘ জামাল সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসলো। রুমঝুম তৈরি হলো থানায় যাওয়ার জন্য। প্রথমে তারা হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করবে, তারপর থানায় যাবে। হাসপাতাল থেকে সেদিনই পুলিশ কেস হতো কিন্তু শিরিন বেগম হতে দেননি। সে মেয়ের সুস্থতার পর সবকিছু ঠিক করবেন জানিয়েছিলেন।
জামাল সাহেব আসতে মেঘ বললো,“আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে। আপনি তো সেদিন রিফাতকে দেখেছেন, আপনি তার পরিচয় জানেন। আপনি সাক্ষী দিলে ব্যপারটা আরো সহজ হবে।”
জামাল সাহেব ভয় পেয়ে গিয়ে বললেন,“দেখো আমি সাধারণ মানুষ, আমি এসব পুলিশি ঝামেলায় যেতে চাই না।”
মেঘ বললো,“আপনারা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলে কিভাবে হবে? এভাবে পিছিয়ে কেন যাচ্ছেন? আপনারা এমন করলে তো তারা সুযোগ পাবেই অপরাধ করার।”
জামাল সাহেব কিছু বলতে চাইছিলেন তার পূর্বে শিরিন বেগম বললেন,“আপনার মেয়েটা না জব করে? তাকেও তো মাঝে মাঝে রাত করে বাসায় আসতে হয়, তার সাথে যদি এরূপ ঘটনা ঘটে তবে কি আপনি চুপ থাকবেন? যদি চুপ থাকেন তাহলে বলবো আমাদের সাথে আপনাকে যেতে হবে না।”
মুন শিরিন বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো,“আন্টি আপনি?”
শিরিন বেগম বললেন,“হ্যাঁ আমি। আমি জানি আমি কোনদিন তোমার বাবা-মায়ের মতো হতে পারবো না। তবে আমি চেষ্টা করবো এতটা কাল মেয়েকে যে সময়টা দেইনি সেটা এখন দেওয়ার। আমি আমার মেয়ের পাশে আছি।
তবে একদিক দিয়ে ছোটবেলায় দায়িত্ব পালণে অবহেলা করে কিন্তু ঠিকই করেছি। দেখেছো মেয়েটা আমার কতটা সাহসী তৈরি হয়েছে।
সব খারাপের মধ্যে একটা ভালো দিক থাকে। দেখলে কেমন প্রকাশ পেলো।”
রুমঝুম কিছু বললো না। চুপ করে রইলো। জামাল সাহেব কিছুক্ষণ নিরব থেকে বললেন,“আচ্ছা চলো। তবে আমি জানো কোন বিপদে না পড়ি।”
মেঘ বললো,“সেই দায়িত্বটা আমি নিলাম। আমি আপনার কোন বিপদ হতে দিবো না।”
সবাই মিলে বের হলো। বাহিরে আসতে দু’জন প্রতিবেশি বলাবলি করছিলো।
“এরা কি-করে বাহিরে বের হয় আমি বুঝি না। আমরা হলে তো লাজেই ম/রে যেতাম।”
“যা বলেছো। এদের লাজ তো তারা ভেঙে দিয়েছে। এদের কি আর লাজ আছে?”
রুমঝুম কঠিনচোখে তাদের দিকে তাকালো। মেঘ জবাব দিতে চাইছিলো তার পূর্বে রুমঝুম বললো,“নীলাশা বলছিলো আপনার মেয়ে নাকি ম/দ/খোর এক ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছে। শুনেছি সেখান থেকে মা/র খেয়ে শেষে ডিভোর্স দিয়ে আসলো। এখানে আমার যতটা মনে হয় আপনার মেয়ে জেনেবুঝে আগুনে ঝাপ দিয়েছিলো। কিন্তু আমি ঝাপ দেইনি বরং আগুন আমাকে আকড়ে ধরেছে, তাই এখন পানি দিয়ে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করছি।”
দু’জনে চুপ হয়ে গেলো। রুমঝুম পুনরায় বললো,“আমি মুন নই যে আপনার কথা শুনে গিয়ে ঘরে দরজা বন্ধ করে কাঁদবো।পরেরবার কানা-ঘুষা শুনলে হাত চালাবো।”
মুন রুমঝুমকে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে। শিরিন বেগম তাদের চুপ করে যেতে দেখে বুঝলেন এদের থামাতে হলে এদের ভাষাতেই জবাব দিতে হবে। শিরিন বেগম মনেমনে খুব অপরাধভোগে ভুগলেন,একদিন এদের সাথে তাল মিলিয়ে মুনের সম্পর্কে বাজে কথা শুনেছেন এবং বলেছেন। ঠিক করেননি কাজটা। আজ বুঝতে পারলেন।
রুমঝুম এগিয়ে গেলো। তবে ফাঁকে নীলাশাকে খুঁজছিলো। আশেপাশে দেখতে পায়নি। দু’দিনে একবারও দেখেনি। মেয়েটা বোধহয় বেশি ভয় পেয়েছে। রুমঝুম যে ভয় পাইনি তা নয়। সেদিন রাতে খুব ভয় পেয়েছিলো। তবে দু’দিন ধরে অনেক ভেবেছে,ভয় পেলেই ভয়। যা ঘটার তা ঘটে গেছে, সেটা নিয়ে বসে থাকলে, কান্না করলে কিছু হবে না। উল্টো নিজের শরীর খারাপ হবে। জীবনের কঠিন সময় পার করতে অনেক আগে থেকে শিখে গিয়েছিলো রুমঝুম। হ্যাঁ তবে সেই কঠিন সময়টা আজকের মতো ছিলো না। আজকেরটা পুরোপুরি ভিন্ন। তাই বলে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে তেমন মেয়ে রুমঝুম নয়।
'
'#আঁধারি_অমানিশা
#পর্ব ৯
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
থানার বাহিরে এসে রুমঝুম নিরবে বসে পড়লো। তার এখন কান্না পাচ্ছে, খুব কান্না পাচ্ছে। মুন সবাইকে চলে যেতে বললো, মুন গিয়ে রুমঝুমের পাশে বসলো।
মুন রুমঝুমের কাঁধে হাত রাখলো। রুমঝুম কোন ভাবভঙ্গি দেখালো না। মুন শান্তকন্ঠে বললো,“তুমি না খুব সাহসী মেয়ে, এতটুকুতে ভেঙে পড়লে চলবে?”
রুমঝুম কিছু বললো না। মুন পুনরায় বললো,“পুলিশ তো এভাবেই প্রশ্ন করবে। এরপর অপরাধীদের ধরা হবে, কেস কোর্টে উঠবে। তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, সেখানেও তোমাকে নানা ধরনের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। ভয় পেলে চলবে?”
রুমঝুম বললো,“তাই বলে এভাবে প্রশ্ন করবে?”
মুন বললো,“রুমঝুম আমি তোমাকে এতক্ষণ অব্দি যত দেখেছি তত মুগ্ধ হয়েছি। তুমি সত্যি খুব সাহসী মেয়ে।
পুলিশ তোমাকে কত প্রশ্ন করলো, ভিতরে ভিতরে তুমি ঘাবড়ে গিয়েছো ঠিকই কিন্তু বুঝতে দাওনি। কত সুন্দর করে জবাব দিলে।
এখন এসে ভেঙে পড়লে চলবে? সব ধরনের প্রশ্নের জন্য তো তোমাকে নিজেকে মানাতে হবে। তাই না?”
রুমঝুম বললো,“আমি সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো। সমস্যা নাই। রুমঝুম নিজের দূর্বলতা অন্যদের সামনে প্রকাশ করে না।”
“এই তো ভালো মেয়ে। তো এখানে এভাবে না বসে চলো আমরা যাই।”
“হুম। জানো আমি ছোটবেলা থেকে কতটা একা বড় হয়েছি। বাবা-মা চলে যেতো অফিসে, সেই রাত ৯ টা, ১০টার দিকে আসতো। সন্ধ্যাবেলা ভয়ে ঘুমড়ে ম/রে যেতাম। মা মা বলে কত চিৎকার করেছি। কিন্তু মা আসেনি। সে ব্যস্ত ছিলো অফিসে ওভার টাইম করে একটু বেশি টাকা ইনকাম করতে।
এদিকে আমার মনে হতো আমার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, সে আমাকে মা/র/বে। এভাবে কতদিন অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। শেষে যখন দেখলাম আমার বিপদে কেউ আসবে না তখন নিজেই সেই ছায়ার সাথে লড়াই করলাম। ভয় কাটিয়ে যখন নিজেকে রাতের সাথে মানিয়ে নিয়েছিলাম তখন বুঝেছি ওসব ছায়া টায়া কিছু না। ওটা আমার মনের ভয় ছিলো।
আমাকে যে পড়াতে আসতো বাড়ি, তার চোখের দৃষ্টি আমার ভালো লাগতো না। আমার মাকে কতবার বলেছি, মা বলতো আমি ভুল ভাবছি। পড়ালেখা করতে চাই না বলে এমন বলছি।
যেদিন টিচার আমার গায়ে হাত দিলো সেদিনও বলেছিলাম, মা মানেনি। তার ব্যস্ততার ভিড়ে আমি আমার জন্য সময় পাইনি।
পরে যেদিন বাড়াবাড়ি রকমের নোংরামি করার চেষ্টা করেছে সেদিন হাতের পাশে পাওয়া ফুলদানি দিয়ে দিয়েছি মাথা ফা/টি/য়ে। সেদিন মা বুঝলো।
নিজের জন্য নিজেকেই লড়াই করতে হয়, সেটা আমি খুব ছোটবেলা থেকে বুঝে গেছি।”
মুন এতক্ষণ রুমঝুমের কথা শুনছিলো। কিছু বললো না। রুমঝুম বললো,“চলো যাই।”
মুন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
*
থানায় এসে কেস করা হয়েছে, রুমঝুম সবার বর্ননাও দিয়েছে। সেখানে কিছু অসঙ্গতিপূর্ন প্রশ্ন করা হয়েছে তাকে, তবুও রুমঝুম ঘাবড়ায়নি। খুব সহজে উত্তর দিয়ে দিয়েছে। ভিতরে ভিতরে ঠিকই ভেঙে পড়েছিলো তাও নিজেকে শক্ত করে জবাব দিয়েছে রুমঝু।
রুমঝুমের এই সাহসীকতার জন্য অল্প সময়ে সবার তাকে খুব ভালো লেগেছে। পুলিশ অফিসার ঐরূপ প্রশ্ন করলেও, পরে অবশ্য বলে দিয়েছে এসব প্রশ্ন বা এরথেকে বেশি কঠিন প্রশ্ন তাকে করা হবে। তাই তার এভাবে প্রশ্ন করা। রুমঝুম জানো তাকে ভুল না বুঝে, এটা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
----
রুমঝুমরা বাসায় চলে আসলো। রুমঝুম বাসায় এসে নিজের ঘরে চলে গেলো৷ তার মা তার জন্য খাবার নিয়ে তার ঘরে গেলো।
রুমঝুম মায়ের হাতে খাবার দেখে কিছুটা অবাক হলো। ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি যতবার সে তার মায়ের হাতে খাবার খেতে চেয়েছে ততবার তার মা ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে গেছে।
শিরিন বেগম নিজের অপারগতার কথা ভেবে মনেমনে খুব ভেঙে পড়েছেন। তবে নিজেকে সামলে খাবার নিয়ে রুমঝুমের পাশে বসলেন। রুমঝুম কিছু বলতে চাইছিলো, শিরিন বেগম তাকে থামিয়ে দিয়ে খাবারের লোকমা মুখে তুলে দিলো।
রুমঝুমকে খাওয়াতে খাওয়াতে শিরিন বেগম বললেন,“স্যরি। আমরা তোমাকে অবহেলা করে ঠিক করিনি। তবে সেই সময়টা আমরা আর ফিরিয়ে আনতে পারবো না। এজন্য শুধু ক্ষমা চাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই আমাদের। পারলে ক্ষমা করে দিস।”
রুমঝুম তার মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো। শিরিন বেগমও কান্না করে দিলো।
___
পুলিশ রিফাতকে ধরে খুব মার-ধোর করে। রিফাত মার খেয়ে সব বলে দেয় এবং বাকিদের নামও বলে দেয়।
পুলিশ সবাইকে ধরে নিয়ে আসে। ছেলেগুলোর বাবা-মা থানায় এসে বেশ ঝামেলা শুরু করে।
থানা থেকে রুমঝুমকে খবর দেওয়া হয়, ছেলেগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য।
এরমধ্যে একটা ছেলের বাবা-মা পুলিশকে টাকা অফার করে।
পুলিশ অফিসার বাবা-মায়ের সামনে ছেলেকে ইচ্ছেমতো পে/টা/তে বললো। শেষে বাবা-মা ছেলেকে এভাবে মা/র খেতে দেখতে না পেয়ে কান্না করে দিলো। পুলিশকে বারবার অনুরোধ করছিলো। পুলিশ অফিসার বললো,“ছেলে জ/ঘ/ন্য অপরাধ করেছে, কোথায় শাসন করবেন। তা না করে উল্টো ছেলেকে বাঁচাতে চাইছেন।”
*
রুমঝুম ছেলেগুলো সনাক্ত করে। পুলিশ কেস কোর্টে উঠানোর ব্যবস্থা করে।
*
এরমধ্যে ছেলেগুলোর বাবা-মা বেশ কয়েকবার রুমঝুমের সাথে দেখা করার চেষ্টা করে। কিন্তু রুমঝুম তাদের সাথে দেখা করে না।
অবশেষে তারা ব্যর্থ হয়ে জামাল সাহেবের কাছে যান। এই কেসে সাক্ষী না দেওয়ার জন্য টাকা অফার করে। জামাল সাহেব ঘরে বসে ছিলেন, সে ভাবছে কি করবে। টাকা দেখে কিছুটা লোভ হচ্ছে তার। এমন সময় তার মেয়ে তার কাছে এলো,“বাবা আমি কলেজে যাচ্ছি।”
জামাল সাহেব বললেন,“হ্যাঁ যাও।”
মেয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে জামাল সাহেবের সুবুদ্ধি উদায় হলো। তিনি বলেন,“দেখুন আজ আমি আপনাদের ছেলেদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবো না, কাল তারা আমার মেয়ের দিকে হাত বাড়াবে। আমি এটা পারবো না। তারা যেটা করেছে সেটা জ/ঘ/ন্য অপরাধ, তার শাস্তি মৃ/ত্যু/দ/ন্ড খুব কম হয়ে যায়। আপনারা এবার আসুন, টাকা দিয়ে আপনারা একজন জামালকে কি/ন/তে পারেন। কিন্তু একজন বাবাকে কিনতে পারবেন না। এটা সম্ভব নয়।”
***
__
মেঘরাজ এবং মুন একসাথে ফিরছিলো। মেঘরাজ বারবার মুনের দিকে তাকাচ্ছিলো, এমন সময় একটা বাইক মেঘের দিকে এগিয়ে আসলো। মুন সেটা দেখে মেঘকে টেনে অন্যদিকে নিয়ে গেলো।
মুন বললো,“চোখ কোথায় থাকে তোমার? দেখেশুনে চলতে পারো না?এখনই একটা বিপদ হতে পারতো।রাস্তার মাঝ দিয়ে কেন হাটছো?”
“হলে হ’তো। আমি যদি মা/রা যাই তাতে কার কি?”
“চুপ। ম/রা/র কথা বলবে না।”
“আমার মৃ/ত্যু নিয়ে তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন আমি বুঝতে পারলাম না। তাতে তোর সমস্যা কি?”
“এসব কথা বাদ দেই আমরা।”
“কেন বাদ দিবো কেন? যাই আমার যেখান দিয়ে ইচ্ছে সেখান দিয়ে হাঁটবো, যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে।”
মেঘরাজ মাঝ রাস্তায় চলে গেলো। মুন দেখলো ওপর পাশ দিয়ে গাড়ি ছুটে আসছে।
মুন বিরক্ত হয়ে বললো,“এটা কোন ধরনের ছেলে-মানুষি?”
“জানি না৷”
“রাস্তার পাশে আসো প্লীজ।”
“না আসবো না।”
“এরকম কেন করছো মেঘ ভাইয়া?”
মেঘ কিছু বললো না। সামনে দিয়ে একটা গাড়ি খুব দ্রুত গতিতে আসছিলো, সেটা দেখে মুন মেঘের সামনে চলে গেলো। মেঘ মুনকে নিয়ে পাশে চলে গেলো। মেঘ বললো,“তুই আমার সামনে চলে আসলি কেন? যদি ঠিক সময়ে পাশে না আসতে পারতাম? গাড়িটা যদি চলে আসতো?”
“সেই একই কথা আমারও। তুমি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলে কেন, গাড়িটা যদি তোমার উপর দিয়ে যেতো।”
“আমার উপর দিয়ে গেলে কি হতো। কোন ক্ষতি হতো না তো।”
“মানে? তাহলে আমার উপর দিয়ে গেলে কি হ’তো। একই কথা। তুমি আমাকে সরিয়ে আনলে কেন?”
“কারণ আমি তোকে ভালোবাসি। তোর বিপদ হলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারতাম না।”
“আমিও তোমাকে ভালোবাসি। আমিও তোমার বিপদ মানতে পারতাম না।”
“হ্যাঁ কি?”
মুন থেমে গেলো। কথায় কথায় কি বলে ফেললো। মেঘ মুচকি হেঁসে মুনের দিকে তাকিয়ে রইলো। মুন ছুটে পালালো সেখান থেকে, সে যা করেছে একদম ঠিক করেনি। খুব বড় ভুল হয়ে গেছে।
'
'
চলবে,
(ভুলক্রটি ক্ষমা করবেন।)
