#আসক্তিময়_আকাঙ্খা
#পুলকিতা_পোড়েল
#পর্ব_2_3
বিয়েটা অবশেষে হয়েই গেছে...বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষ হতেই বিভোর রীতিকে নিয়ে কাঞ্জিলাল বাড়িতে চলে এসেছে আর সৌজন্যও বিনীতা কে নিয়ে লাহিড়ী বাড়ি ফিরে গেছে ... ফুলসজ্জার ব্যবস্থাটা নিজেদের বাড়িতেই করা হয়েছে...
অনেকক্ষণ ধরে মাথায় ঘোমটা টেনে বিছানার মাঝখানে বসে আছে রীতি...প্রচন্ড পরিমাণে বিরক্ত সে...বিভোর এর ওপর রাগে চোখমুখ লাল করে বসে আছে... ফোনে ম্যাসেজের নোটিফিকেশন ঢুকতেই আরও বিরক্ত হয় রীতি...ফোন টা হাতে নিতেই দেখে ম্যাসেঞ্জার নোটিফিকেশন...ক্লিক করতেই ভেসে ওঠে একটা ম্যাসেজ...
“Tumi ki bojho na tomar daktar saheb tomake koto ta bhalobase?? Ki hoyeche tomar?? Duto soptaho chole gelo ,tomar sathe kono kotha hoyni..Ami bhitore bhitore sesh hoye jacchi sondha..tomar nistobdota amar hridoy ta puriye dicche.... Erokomvabe tile tile marar theke ekebare mere felo Tumi amay...”
ম্যাসেজ টা মাত্রই ডেলিভার হয়েছে রীতির ফোনে, বিভোর এর থেকে সকালেও একটা ম্যাসেজ পেয়েছে সে...কিন্তু সে এত তাড়াতাড়ি ধরা দিতে চায়না তার ভোরের কাছে... ও চায় বিভোর নিজে তাকে খুঁজে বের করুক...কিন্তু বিভোর এর লাস্ট ম্যাসেজে গলা শুকিয়ে আসে রীতির...তাই কোনোকিছু না ভেবেই টাইপিং শুরু করে...
“আপনি আমায় আদৌ ভালোবাসেন তো ডাক্তারসাহেব??”
ম্যাসেজ টা সেন্ড করতেই সঙ্গে সঙ্গে সিন হয়...যেনো অপরপ্রান্তের মানুষটা এই মাসেজেরই অপেক্ষায় বসে ছিলো...সঙ্গে সঙ্গে অপরপ্রান্ত থেকে টাইপিং শুরু হয়...
“দুবছরের সম্পর্কে আমাকে একটুও বিশ্বাস করা গেলো না সন্ধ্যা?? তোমার সন্দেহ আছে নাকি আমার ভালোবাসা নিয়ে??”
ম্যাসেজ টা পেতেই রীতির মুখে হাসি ফুটে উঠলো...আর কোনো রিপ্লাই দিলো না...ওই আইডি টা লগআউট করে নিজের রিয়েল আইডিতে লগইন করলো...তারপর ডাটা অফ করে বিভোর এর নম্বরে ফোন লাগালো... দশ সেকেন্ডের ব্যবধানে ফোন রিসিভ হলো...
-- “আপনি কখন রুমে আসবেন?? আমি আর আপনার জন্য অপেক্ষা করতে পারছিনা...”
-- “কে অপেক্ষা করতে বলেছে তোমাকে আমার জন্য?? যদি ভেবে থাকো আমি আজ তোমার সাথে ফুলশয্যা করবো তাহলে সেই আশা ভুলে যাও...আমি ওই রুমে যাবো না...”
কথাটা বলেই ফোন কেটে দিলো বিভোর... সৈরীতি মুখ গোমড়া করে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে দেয়... সেও এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়...শরীর থেকে সমস্ত ফুলের সাজ খুলে রুম থেকে পা বাড়ালো বিভোর এর উদ্দেশ্যে...সে জানে বিভোর এখন কোথায় থাকতে পারে...কেনো না বিভোরের সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় যে তার সন্ধ্যা জানে...এই ভেবে বাঁকা হাসলো সৈরীতি...বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজন থাকায় সে অতি সাবধানে পা টিপে টিপে বিভোর এর মৃত মা বাবার রুমের দরজা খুললো...অন্ধকার রুমের মধ্যে বিভোরের ফোঁপানোর শব্দ শুনে বুক টা কেঁপে উঠলো রীতির...রুমের লাইট টা জ্বেলে বিছানার পাশে বসে থাকা বিভোর কে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো সে...কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্তও নিয়ে নেয় যে সবটা জানিয়ে দেবে সে বিভোর কে...কারণ বিভোর কে সে প্রচন্ড ভালোবাসে তাই ভালোবাসার মানুষের কান্না সে দেখতে পারবে না....
-- “আপনাকে আমার কিছু বলার আছে...”
মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে সৈরীতির বুক থেকে ছিটকে সরে যায় বিভোর...এতক্ষন ওর খেয়ালই ছিলো না ও কাকে জড়িয়ে ধরেছিল....
-- “তুমি এখানে কি করছো?? রুমে যাও..”
বলেই উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দায় চলে যায় বিভোর... সৈরীতিও যায় বিভোরের পিছন পিছন...গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বিভোর কে...
-- “ডাক্তার সাহেব আমিই আপনার স...”
কথাটা আর শেষ করতে পারেনা সৈরীতি...প্রচন্ড রাগের বসে সজোরে ধাক্কা দেয় বিভোর সৈরীতিকে... সৈরীতি টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় বারান্দার এক কোনে...লোহার রেলিংয়ে মাথা লেগে কপালের বেশ খানিকটা অংশ কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে সৈরীতির গাল দিয়ে... সেদিকে কোনো খেয়াল নেই বিভরের..
-- “তোমাকে আমি বলেছি না ভালোবাসার আশা করবে না...তার সত্ত্বেও তুমি আমার অ্যাটেনশন পাওয়ার চেষ্টা করছো?? আর please don't call me daktar saheb next time... বেরিয়ে যাও এই ঘর থেকে...আমার ধারের কাছে আসারও চেষ্টা করবেন না কখনো...নাহলে এর ফল খুব খারাপ হবে...”
পকেট থেকে সিগারেট বার করে সিগারেট ধরায় বিভোর... সৈরীতি কোনরকমে হাত দিয়ে কপাল টা চেপে ধরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বেরিয়ে যায় রুম থেকে...ফুলসজ্জার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় সাজানো সব ফুল ছিঁড়ে ফেলে সৈরীতি...তারপর বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশটাকে চেপে ধরে কাঁদতে থাকে....
*
“বৌদি,বৌদি দরজা খোলো...”
বড়ো ননদ বিপাশার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে সৈরীতির... জানালা দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করেছে রুমের মধ্যে..চোখের জল শুকিয়ে যাওয়ায় চোখে টান লাগতে সামনে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় সৈরীতি...নিজের মুখমণ্ডলের অবস্থা দেখে আঁতকে ওঠে সে...মুখের বাঁ সাইড টা শুকনো রক্তের দাগ জ্বলজ্বল করছে এখনও...
-- “বৌদি?? উঠেছ?? আমরা বাড়ি যাচ্ছি...একবার বাইরে এসো...”
নাহ এই অবস্থায় বাইরে যেতে পারবেনা সৈরীতি...সবাই জিজ্ঞাসা করলে কি উত্তর দেবে সে...
-- “দিদিভাই, আমি চেঞ্জ করে নিচে আসছি...মিনিট পনেরো একটু অপেক্ষা করো প্লীজ...”
-- “ঠিকাছে তাড়াতাড়ি এসো...”
সৈরীতি ব্যাগ থেকে টাওয়েল টা বের করে ওয়াশরুমে যায়...টাওয়েলের একটা কোন ভিজিয়ে সযত্নে রক্ত টা পরিষ্কার করে নেয়...তারপর ব্রাশ করে রুমে আসে...ডাক্তার মানুষের ঘরে একটু খুঁজতেই ফার্স্ট এইড বক্স টা পেয়ে যায় সৈরীতি...আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে নিজে নিজেই ব্যান্ডেজ করে নেয়....তারপর একটা নতুন শাড়ি বের করে পড়ে ঘোমটা দিয়ে রুমের বাইরে বেরোয় সৈরীতি...ড্রয়িং রুমে যেতেই দেখে বিপাশা ওর মেয়ে মনীষা কে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে... সৈরীতি গিয়ে ওদের সামনে দাঁড়ায়...
-- “এখনই কেনো চলে যাচ্ছো দিদিভাই?? আর কটা দিন থেকে গেলে হতো না??”
-- “না গো বৌদি, আমাদের কালই দিল্লি ফিরতে হবে...তোমাদের বিয়ে উপলক্ষে তোমাদের জামাই পাঁচ দিনের ছুটি ম্যানেজ করে এসেছে...তাই আর থাকতে পারবো না...”
-- “তোমরা একটু বসো,আমি ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছি...”
-- “বৌদি আজকে আর নয়,নেক্সট টাইম এসে তোমার হাতের রান্না খেয়ে যাবো..”
-- “কিন্তু...”
-- “তোমার কপাল কি করে কাটলো গো??”
-- “ওহ কিছু না,অচেনা জায়গায় অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে দেওয়ালে মাথা ঠুকে গেছে...চিন্তা করো না,তোমার দাদাভাই তো ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে...”
-- “বৌদি, আমার দাদাভাই এর খেয়াল রেখো...মা বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের খেয়াল রাখারই সময় পায়নি দাদাভাই...তুমি একটু ওকে দেখে রেখো...যত্নে রেখো..”
-- “হুম”
বিপাশা মেয়ে আর বর কে নিয়ে চলে যায়...সকাল হতে না হতেই সব আত্মীয়স্বজনরা চলে যাওয়ায় বাড়ি এখন পুরো ফাঁকা... সৈরীতি আর বিভোর ছাড়া কেউ নেই বাড়িতে... সৈরীতি রান্নাঘরে ঢোকে... বিভোর এর প্রিয় ব্লাক কফি বানাবে বলে...অনেক খোঁজাখুঁজির পর সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসও পেয়ে যায়...কফি বানিয়ে বিভোর কাল রাত থেকে যেই রুমে আছে সেই রুমের সামনে যায়...
-- “ভিতরে আসবো মিস্টার কাঞ্জিলাল??”
ভিতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে ভেজানো দরজা টা হালকা হাতে ঠেলে সৈরীতি...ভিতরে ঢুকে দেখে ভোর পুরো বিছানা জুড়ে উপুড় হয়ে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে...কফির কাপ টা টেবিলে রেখে বিভোর এর কাছে যায়...
-- “বিভোর বাবু, আপনার জন্য কফি এনেছি...বিভোর বাবু!!!”
-- “উমমম নিতু,ঘুমাতে দে তো..আজ হসপিটাল যাবো না, অফ নিয়েছি ...”
-- “বিভোর বাবু আমি রীতি, সৈরীতি...”
সৈরীতি নামটা শুনে ধরপড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে বিভোর...চোখ দুটো হাতের উলটো পিঠ দিয়ে রগরে তাকায় রীতির দিকে...
-- “তুমি এই ঘরে এসেছো কেনো?? আমার পারমিশন ছাড়া এই ঘরে কেউ ঢোকেনা....এক্ষুনি বেরিয়ে যাও...আর নেক্সট টাইম যেনো এই ঘরের আশেপাশেও তোমাকে না দেখি....”
#পর্ব_3
চন্দ্রের অবস্থান খোলা আকাশের কোনো এক প্রান্তে...পূর্ণিমায় চাঁদের আলো অবহেলিত ভাবে প্রবেশ করেছে সৈরীতির রুমের বারান্দায়...সেখানে যে চন্দ্রবিলাস করার মতো কোনো ভালোবাসার মানুষ নেই...রুমের মধ্যে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ টা একবার অন আর একবার অফ করছে সৈরীতি...বছর দুয়েক আগের ম্যাসেঞ্জার কলের কিছু কথোপকথন ভেসে আসছে সৈরীতির চোখে...
-- “আপনি আমাকে না দেখেই কিভাবে ভালোবাসার কথাগুলো বলছেন ডাক্তার সাহেব??”
-- “ভালোবাসতে গেলে কি আগে তাকে দেখতে হয়??”
-- “অবশ্যই হয়, আমি যদি কুৎসিত দেখতে হই..আপনার পাশে তো আমাকে মানাবে না...”
-- “মানুষের রূপ কখনো কুৎসিত হয়না, কুৎসিত হয় মানুষের মন...আর তোমাকে না দেখেই তোমার সুন্দর মনের পরিচয় আমি পেয়েছি...”
-- “আমাকে সত্যিই আপনার পাশে মানাবে না ডাক্তার সাহেব..”
-- “মানাতে হবে না...পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা টা থাকলে মানাচ্ছে কি মানাচ্ছে না এই নিয়ে ভাবার দরকার নেই...তুমি আমার,একান্তই আমার ব্যক্তিগত নারী...ভোরের আকাশের সন্ধ্যাতারা তুমি...”
এইসব ভাবনার মধ্যেই সৈরীতির মনে হলো একবার “সন্ধ্যাতারা” নামক আইডিতে লগইন করতে...যেমন ভাবা তেমন কাজ...লগইন করতেই পরপর কয়েকটা ম্যাসেজ ঢুকলো সৈরীতির ম্যাসেঞ্জারে...
“ছোটোবেলা থেকে বোনদের বড়ো করার জন্য আমার নিজের ভালো লাগা,ভালোবাসা সব বিসর্জন দিয়েছিলাম...তখন বোনদের মানুষের মত মানুষ করাই ছিলো আমার জীবনের প্রথম লক্ষ... অন্যকিছু নিয়ে ভাবার সময় ছিলো না...”
“কিন্তু তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার পর আমার রোজকার সিডিউল বদলাতে শুরু করলো... ধীরে ধীরে ভোরের জীবনে সন্ধার আগমন ঘটলো.. ভোর নিজেকে চিনলো.. সন্ধার প্রতি তার একটা আসক্তি তৈরি হলো...”
“তোমার দিক থেকে পজিটিভ কিছুর আন্দাজ পেয়েই আমি সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম .. ভেবেছিলাম তোমার মনেও আমার জন্য একটা #আসক্তিময়_আকাঙ্খা আছে ...কিন্তু সেই তুমিই আজ আমার ভালোবাসার পাশে প্রশ্ন চিন্হ এঁকে দিলে??”
ম্যাসেজ গুলো পড়েই সৈরীতির কোমল হৃদয় কেঁদে উঠলো...এখন তার মনে হচ্ছে এই বিয়েটা না করলেই ভালো হতো...কিন্তু সে তো ভাবেনি এত কিছু হবে...ভেবেছিলো বিয়ের সপ্তাহখানেকের মধ্যে বিভোর কে সারপ্রাইজ দেবে...কয়েক সপ্তাহের দূরত্বের পর যখন বিভোর আসল সত্যি টা জানবে তখন বিভোর এর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেটা দেখার একটা লোভ ছিলো সৈরীতির মনে...কিন্তু সবটা যে এরকমভাবে উল্টো হয়ে যাবে...তার ডাক্তার সাহেব যে এতটা ভেঙে পড়বে সেটা ভাবেনি সৈরীতি...অজান্তেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো রীতি...
-- “আমি এমনটা চাইনি ডাক্তার সাহেব..আমি সত্যিই এমনটা চাইনি...আপনি কি সব সত্যিটা জানার পরও আমাকে ভালোবাসবেন নাকি আমাকে শুধুই ঘৃনা করবেন তখন আপনি?? আমি আপনার ঘৃনা নিয়ে বাঁচতে পারবো না ডাক্তার সাহেব...পারবো না আমি...”
কিছু একটা ভেবে চোখের জল মুছে বিছানায় উঠে বসলো সৈরীতি...ফোনটা হাতে নিলো...ফোনের ওয়ালপেপারে তখন বারোটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট দেখাচ্ছে...সে তার সিদ্ধান্তে অটল....
-- “আপনি সৈরীতির কথা কোনোদিনও শুনবেন না... সৈরীতি তাই বরাবরই আপনাকে সত্যিটা জানাতে ব্যর্থ হবে... তাই সন্ধাকেই যা করার করতে হবে...আপনি আজই জানবেন সৈরীতি বলেও কেউ নেই আর না আছে সন্ধ্যা নামের কেউ....আছে শুধুই সৈরীতিসন্ধ্যা লাহিড়ী... উফস লাহিড়ী না সৈরীতিসন্ধ্যা কাঞ্জিলাল...”
ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেঞ্জারে ঢুকলো...এখনও বিভোর এর নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলছে....মনকে শক্ত করে ম্যাসেজ পাঠালো বিভোর কে...
“আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে ডাক্তার সাহেব...”
কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ফিরতি বার্তা পেলো সৈরীতি...
“বলো, তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্যই তো আমি অস্থির হয়ে আছি সন্ধ্যাতারা...”
“আমার নাম শুধুই সন্ধ্যা নয়...নামের আগে পিছেও কিছু আছে...”
“নামের শেষে তো পদবী থাকবেই...তুমি কি সেটা বোঝাতে চাইছো??”
“না...আগে আপনি আমাকে বলুন বিয়ে করেছেন আপনি??”
হাত থেকে ফোনটা বিছানায় পড়ে গেলো বিভোর এর... ও চেয়েছিলো সত্যিটা জানাতে কিন্তু সন্ধ্যার সাথে গত দুসপ্তাহ কোনো কথা না হওয়ায় কিছুই জানাতে পারেনি সে...
“তুমি কি এই খবরটা পেয়েই আমার সাথে দূরত্ব তৈরি করেছো সন্ধ্যা??”
“আপনার স্ত্রীর নাম কি ডাক্তার সাহেব??”
“তুমি আমাকে ভুল বুঝনা প্রিয়...আমি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছি...আমার নিতুর সুখের জন্য আমি এই বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছি...আমাকে ক্ষমা করো সন্ধ্যা...”
“কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো ডাক্তার সাহেব যে আপনি বিয়ে করে ফেললেন??”
ম্যাসেজ টা পাঠিয়েই হাজারও প্রশ্নের উঁকি দেয় রীতির মনে... ও তো এইসবের কিছু যাবেনা...কোন পরিস্থিতির কথা বলছে বিভোর...বিভোর এর থেকে ফিরতি বার্তা টা আসতেই গলা শুকিয়ে যায় রীতির...চোখ ঝাপসা হয়ে আসে...ঝাপসা চোখের আবারও ম্যাসেজ টা দেখে...
“আমার বোন একবছর আগে লুকিয়ে বিয়ে করেছিল...এখন সে দুমাসের অন্তঃসত্ত্বা...আমি তাই নিতুর সম্মানের কথা ভেবে ছুটে যাই ছেলের বাড়ি...সবটা খুলে বলি ছেলের বাবাকে...উনি তখন আমাকে একটা কঠিন শর্ত দিয়ে বসেন...উনি নিতুকে নিজের বৌমা হিসাবে তখনই গ্রহণ করবেন যখন আমি ওনার বন্ধা মেয়েকে বিয়ে করবো...ওনার মেয়ে কোনোদিনও মা হতে পারবেনা....আমি আমার ছোটো বোনের কথা ভেবেই এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম শুধু...নাহলে আমার বোন টা যে আত্মঘাতী হতো..”
এরপরেও অনেক ম্যাসেজ এসেছে বিভোর এর থেকে...কিন্তু আর ম্যাসেজ পড়ার কোনো ক্ষমতা নেই সৈরীতির মধ্যে...কোনোদিনও মা হতে পারবেনা এর থেকে দুসংবাদ হয়না কোনো নারীর কাছে...একজন নারীর পূর্ণতা যেখানে সেখানে তো সৈরীতি নিজেই শূন্য....
-- “আমি অজান্তেই আপনার জীবনটা নষ্ট করে দিলাম ডাক্তার সাহেব...আপনার জীবনটা এভাবে নষ্ট হতে দেবো না আমি...কোনোদিনও জানতে দেবো না সৈরীতি আর সন্ধ্যা দুজন একই মানুষ... সৈরীতি চলে যাবে আপনার জীবন থেকে...সে যে কোনোদিনও আপনাকে বাবা হওয়ার সুখ দিতে পারবেনা....তাই সৈরীতি আর সন্ধ্যা দুজনকেই বিদায় জানাতে হবে আপনাকে... সৈরীতি চলে যাওয়ায় যতটা আনন্দ আপনি পাবেন সন্ধ্যা চলে যাওয়ায় ঠিক ততটাই আপনি ভেঙে যাবেন...কিন্তু ডাক্তার মানুষদের এত সহজে ভেঙে পড়লে চলবেনা...আপনাকে বাঁচতে হবে,নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে...”
চোখের জলটা মুছে “সন্ধ্যাতারা ”নামক আইডিটা ডিএকটিভ করে দেয় সারাজীবনের মতো...আর মায়া বাড়াবে না সে...মায়া যত বাড়বে ততই ফেরার পথ টা কঠিন হবে...
রুম থেকে বেরিয়ে বিভোর এর রুমের সামনে গেলো সৈরীতি...দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ...দরজায় কান পাতলেই ভিতর থেকে ভাঙচুর করার শব্দ পেলো সৈরীতি...সারা শরীরটা কেঁপে উঠলো তার... বিভোরের কিছু অস্পষ্ট কথা কানে এলো সৈরীতির...
“আমার সাথেই কেনো এরকম হয় সবসময়...কেনো আমার ভালোবাসার মানুষগুলো ছেড়ে চলে যায় আমায়...আমার ভালোবাসায় তো কোনো মিথ্যে ছিলো না..প্রথমে মা তারপর বাবা... নিতু টাও শ্বশুরবাড়ি চলে গেলো...আর এখন তো আমার প্রিয় আকাঙ্খাও আমাকে ভুল বুঝে চলে গেলো...আমাকে কেনো একটুও বিশ্বাস করতে পারলে না সন্ধ্যা..কেনো????”
বিভোর এর কান্নাভেজা কণ্ঠ শুনে সৈরীতির অবাধ্য চোখ দুটো আবার অবাধ্যতা শুরু করলো...দরজার সামনে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সৈরীতি....
-- “আমি আপনাকে বিশ্বাস করি ডাক্তার সাহেব, নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করি আমি আপনাকে...আপনি যে আমার ভরসার একমাত্র জায়গা...আমার নিজের বাবাও তো আমার কাছ থেকে সত্যিটা লুকালো...আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব....কিন্তু আমার এই শূন্য জীবনের সঙ্গে আপনাকে জড়িয়ে আপনার জীবনও আমি শূন্যতায় ভরে দিতে পারবো না....আপনাকে নিজের থেকে মুক্তি যে আমাকে দিতেই হবে....”
*
প্রকৃতির নিয়মে সকাল হয়...বিভোর এর ঘুম ভাঙলে ফ্রেশ হয়ে বিভোর রুমের দরজাটা খোলে...দরজাটা খুলতেই রীতির মাথাটা হেলে পরে রুমের দিকে...বিভোর অবাক হয়...
-- “সৈরীতি...সৈরীতি এখানে কি করছো তুমি?? সৈরীতি...”
অনেক ডাকাডাকির পরও সৈরীতির ঘুম না ভাঙ্গায় খানিকটা ভয় পেলো বিভোর.... রুম থেকে তৎক্ষণাৎ জলের গ্লাস টা এনে সৈরীতীর পাশের বসে ওর মুখে জল ছিটালো বিভোর...মুখের মধ্যে ঠান্ডা অনুভূত হওয়ায় চোখ পিটপিট করে তাকালো সৈরীতি...
-- “এখানে কি করছো তুমি?? আর এভাবে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে কেনো??”
সৈরীতির মনে পড়ে যায় সবকিছু...অন্তরটা আবারও বেহায়াপনা শুরু করে দেয়...
-- “আপনি আমাকে কেনো বিয়ে করলেন বিভোর বাবু??”
-- “মানে সিরিয়াসলি!! তুমি এটা জানার জন্য এখানে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে???”
-- “আমি মা হতে পারবোনা জেনেও কেনো নিজের জীবনটা নষ্ট করলেন এভাবে??”
-- “আমার জীবন নষ্ট হওয়ার কথা বলছো তুমি?? বিয়ের আগে এটা মনে ছিলো না....তাহলে তো আমাদের জীবনে তুমি তৃতীয় ব্যক্তি হতে না...আর না আমার আর আমার ভালোবাসার মানুষের বিচ্ছেদ হতো...”
-- “আমি জানতাম না যে আমি একজন ব্যর্থ নারী... আমি মা হতে পারবোনা...”
-- “তুমি জানতে না??”
-- “জানলে কখনোই এই বিয়েটা আমি হতে দিতাম না...আপনি ডিভোর্স পেপার রেডী করুন ডাক্তার সা...বাবু...ডাক্তার বাবু....আমি সাইন করে দেবো...”
-- “সেটা তো কখনোই হবেনা সৈরীতি... অনিচ্ছা সত্ত্বে হলেও আমাকে তোমার সাথে সংসার করতেই হবে...একটা মিথ্যে,লোক দেখানো সংসার...
#চলবে.....
এখানেই বাকি পর্বগুলা দেওয়া হবে কাল এমন টাইমে সব গুলা দিবো পর্ব।

পরের পর্ব দিন