#এক_রাত্রি

#৪র্থ_এবং_শেষ_পর্ব

#অনন্য_শফিক

'

'

'


এতো দিন ধরে সুন্দর সাবলীল নিয়মে চলতে থাকা বাড়িটা চট করে পরিবর্তন হয়ে গেল।আশ পাশের দু' চার ঘরের মানুষ জেনে গেল তৃষ্ণার সাথে তার দেবর ইশতিয়াকের পরকিয়ার সম্পর্ক আছে। কিন্তু এই কথার আরো ডালপালা ছড়ালো।কেউ কেউ এটাকে বাড়িয়ে বললো,ইন্দ্রার বাবা নিখোঁজ হওয়ার একমাত্র কারণ স্ত্রীর সাথে আপন ভাইয়ের পরকিয়ার সম্পর্ক।কেউ আবার বলছে,ইন্দ্রার বাবা আর কেউ না। ইশতিয়াক।

কিন্তু ইশতিয়াক তা স্বীকার করে না। গতকাল শেষ রাতে বউয়ের চ৷ ড় খেয়ে সে মন খারাপ করে বাড়ির বাইরে রাস্তার ধারে চলে গিয়েছিল। ওখানে গিয়ে দেখে নীলয় বসে আছে। বসে থেকে গুনগুন করে গান করছে।সে নীলয়ের সাথেই বসে গল্প করছিলো।

ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর নীলয়ের মনেও সন্দেহ জেগেছে। ঘটনা যদি সত্যি না হবে তবে তার মামা বাসর রেখে অত রাতে রাস্তায় নেমেছিল কেন?

'

কমল হাসান রাজনীতি সচেতন ব্যাক্তি। সবকিছু শোনার পর লজ্জায় তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন। রাতের বেলা গোপনে বাড়ি ছেড়ে গিয়ে উঠেছেন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়ি।আপাতত ওখানেই থাকবেন। বাড়িতে থাকলে ঝামেলা পোহাতে হবে। নানান জনের নানান প্রশ্ন উদয় হবে। সেইসব প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারবেন না কিছুতেই!

'

বিকেল বেলা নীলয়ের সাথে সন্ধির দেখা হলো।ওরা ছাদে উঠেছিল।

নীলয় বললো,'সন্ধি,তোর কী এসব বিশ্বাস হয়?'

সন্ধি বললো,'একটু একটু। তোমার?'

'আমারও একটু একটু।'

মোটকথা বাড়ির সবারই বিশ্বাস হয় ইশতিয়াক আর তৃষ্ণা রোজ রাতে নিষিদ্ধ কাজে মগ্ন হয়।বাড়ির সব কজনের চোখে ওরা দুজন পাপিষ্ঠ। মিতু সিদ্ধান্ত নিলো আজ সূর্য ঢুবার আগে আগেই সে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু এর আগে ইশতিয়াকের সাথে তার কিছু কথা আছে।

কিন্তু ইশতিয়াক মুখ খুলছে না। একেবারেই চুপচাপ।তার চোখ লাল এবং ফোলা ফোলা।দেখেই বোঝা যায় খুব কেঁদেছে। কিন্তু এসব দেখে বাড়ির মানুষের সন্দেহ আরো বেড়েছে।ওরা ভাবছে ঘটনা মিথ্যে প্রমাণ করবার জন্য ইশতিয়াক বাহানা করছে।

'

তৃষ্ণার বাবাকে খবর দেয়া হয়েছে। তৃষ্ণাকেও এ বাড়িতে রাখা যাবে না। এমন পাপিষ্ঠ মেয়েকে এ বাড়িতে রাখলে খুব পাপ হবে। অমঙ্গল হবে বাড়ির।ওর বাবা ইতিমধ্যে গাড়ি করে রওনা দিয়েছেন।

'

ইন্দ্রা এরমধ্যে কয়েকবার কেঁদেছে। বারবার বলছে,আমি ছোট চাচ্চুর কাছে যাবো।আমি ছোট চাচ্চুর কাছে যাবো।

তৃষ্ণার তখন যা রাগ উঠেছে।সে মেয়ের গালে তার হাতের সবটুকু জোর দিয়ে চ ড় বসিয়ে দিয়েছে। ছোট মেয়ে তো!চ ড় খেয়ে গলগল করে র৷ ক্ত বেরুনো শুরু করেছে মেয়ের নাকমুখ দিয়ে।

এরপর যা হলো তা বলার বাহিরে। জাহানারা বেগম দৌড়ে এলেন তৃষ্ণার ঘরে। এসে বললেন,'এখন মেয়ের উপর শোধ নেয়া হচ্ছে!'

বলে বসা থেকে ধা ক্কা মে৷ রে তৃষ্ণাকে মেঝেতে ফেলে দিলো। তারপর ওর নাকে মুখে থুথু ছিটিয়ে ইন্দ্রাকে কোলে নিয়ে তার ঘরের দিকে চলে গেলো।ইন্দ্রা কাঁদতে লাগলো গলা ছেড়ে।

মা মা মা বলে।

'

তখনও সন্ধ্যা নামেনি।নীলয় এবং সন্ধির ভেতর ভালোবাসা বাসি হয়ে গেছে এতোক্ষণে।ওরা দুজন দুজনকে চুমু খেয়েছে। জড়িয়ে ধরেছে একে অপরকে। তারপর হাত ধরাধরি করে খুব সঙ্গোপনে ওরা ছাদ থেকে নেমে এসেছে।

ওরা নামার পর পরই ছাদে উঠলো তৃষ্ণা। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে সে গেল ছাদের একেবারে কিনারে। তারপর কেঁদে উঠলো হাউমাউ করে। কাঁদতে কাঁদতে মনে করলো বাবা মা 'র মুখ।মনে করলো হারিয়ে যাওয়া মানুষটার মুখ। তারপর ইন্দ্রাকে নিয়ে ভাবলো।সে জানে ইন্দ্রা একটু পর থেকেই এতিম হয়ে যাবে। হয়তোবা তার সম্পর্কে একটা ভুল জেনে বড় হবে।জানুক।এই পৃথিবীতে আসল ঘটনার চেয়ে ভুলটা জেনেই মানুষ বেশি বড় হয়, অগ্রসর হয়।এসব ভাবতে ভাবতেই উঠোন থেকে একটা আওয়াজ এলো তার কানে।তার বাবা এসে গেছেন। এই মুখ নিয়ে সে কিছুতেই বাবার সামনে যেতে পারবে না।

তৃষ্ণা লাফালো।এক লাফে পড়ে গেল সে তিনতলা থেকে নীচে জমা করে রাখা ইট সুড়কির উপর। ওখানে পড়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই তার মৃ৷ ত্যু হলো!

'

একটু আগের বাড়িটাই এই মুহূর্তে কান্নাবাড়ি হয়ে গেল। ইশতিয়াক এতোক্ষণে মুখ খুলেছে।সে চিৎকার করে বলছে,'তোমাদের জন্য। শুধু তোমাদের জন্য ভাবীর এমন হলো।তোমরা তো কোনদিন পিতৃহারা একটা মেয়ের দিন রাত কিভাবে কাটে তা জেনেও দেখোনি। তোমরা জানতে না ইন্দ্রা তার বাবার হাত বুলানো ছাড়া ঘুমোতে পারে না। এই মেয়েটা এতো জেদি যে তাকে রোজদিন নতুন নতুন গল্প না বললে সে ঘুমোবেই না। খাটের উপর বসে থাকবে।গলা ছেড়ে কাঁদবে।রাতে হঠাৎ ইন্দ্রা কাঁদলে তোমরা কী উঁকি দেখেছো,মেয়েটা কাঁদছে কেন?

দেখোনি। প্রয়োজন অনুভব করো নি দেখার।আর যে দেখতে গেলো। মেয়েকে গল্প বলে,হাত বুলিয়ে, রোজ দিন ঘুম পাড়ালো। কোনদিন ঘুমোতে না চাইলে আবছা আলোয় ভাবীর সাথে ভূত সেজে ওকে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ালো।এসব দেখেই তোমরা ঠাহর করে ফেললে আমরা পাপী?'

মিতু খানিক কেঁপে উঠলো। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,'তাহলে ইন্দ্রাদের ঘর থেকে এসেই তুমি গোসল করেছিলে কেন?'

ইশতিয়াক তখন সরাসরি বললো,'কারণ ইন্দ্রা‌ সেদিন কিছুতেই ঘুমাচ্ছিলো না। কেন জানি কাঁদছিলো। বারবার ওর বাবাকে ডাকছিলো।এর একটু পরেই ইন্দ্রা বললো তার পেটে ব্যথা। ভীষণ ব্যথা।এতো রাতে ডাক্তার এখানে আসবে না।তাই তাকে নিয়ে যেতে হলো হাসপাতালে। ওখানে যাওয়ার সময় বমি করে সে আমার কাপড় চোপড় নষ্ট করে ফেলেছিলো।এই জন্য গোসল করতে হয়েছিলো।এসব কী বলার সুযোগ দিয়েছিলে তোমরা?'

কেউ কোন উত্তর দিতে পারেনি।আসলে ওদের আর কিছু বলার ছিল না তখন!

'

মিতু এ বাড়িতে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু ইশতিয়াক নিজেই তাকে ডিভোর্স দিয়েছে। তারপর ইশতিয়াক বাড়ি ছেড়ে মেজো ভাইয়ের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কদিন পর নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে কমল হাসানও।এর আরো পরে হুট করে একরাতে সন্ধি নীলয়ের সাথে পালিয়ে গিয়েছে। সাথে নিয়ে গেছে ইন্দ্রাকে।এ বাড়িতে তাদের নাকি ভয় করে।মনে হয় তারা জাহান্নামে আছে।

'

হ্যা জাহানারা বেগমের মনের আশা এখন পূর্ণ হয়েছে। সে এ বাড়ির সবকিছুর হর্তাকর্তা এখন।সব সম্পত্তির মালিক সে একাই। কিন্তু এই মুহূর্তে এসে সবকিছু লাভ করেও সে বুঝতে পারছে আসলে অগাধ ধন- সম্পত্তির মালিক হয়ে গেলেই সুখি মানুষ হওয়া যায় না।কেউ কেউ আ৷ ত্ম হ৷ ত্যা করেও সুখি হয়।(আ৷ ত্ম৷ হ৷ ত্যা করা মহাপাপ। তবে জাহানারা যে পাপ করেছে তার চেয়ে বেশি নয় কিছুতেই!)

  '

                         ---সমাপ্ত---




Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url