#নিয়তির_পরিহাস [শেষ]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
[কার্টেসি ছাড়া কপি করা নিষেধ ❌]
ফজরের আজানের সুমিষ্ট আওয়াজের মাধ্যমে যখন দুনিয়ায় আগমন করে একটি নতুন জানের, ঠিক তখনই বিদায় নেয় আরেকটি জান। বহু কষ্টে ডাক্তাররা সিরাতের মেয়েকে বাঁচাতে পারলেও সিরাতকে বাঁচাতে পারেনি। হসপিটালে নিয়ে আসার পথে একবার এবং হসপিটালে নিয়ে আসার পর একবার কার্ডিয়া অ্যাটাক হয় তার।
ডাক্তার নিলুফার সুলতানা সদ্য জন্মানো বাচ্চাটিকে নাহিয়ানের কোলে তুলে দিয়ে কথাগুলো বলে। একমাত্র মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সিরাতের মা জয়নব বেগম অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সিরাতের বাবা সিরাজুল ইসলাম সাহেবও ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন। সায়মনও বাবার পাশে বসে পড়ে।
তাশফিন নিচ বসে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে আর মাটিতে নিজের মাথা নিজেই বারি দিতে থাকে। আর নাহিয়ান? সে যেনো এক অন্য জগতে চলে গিয়েছে। না কাঁদছে, না কিছু বলছে। এমনকি একটা চোখের পলক পর্যন্ত ফেলছে না। সে একধ্যানে তাকিয়ে আছে সিরাতের মেয়ের দিকে, তার না হওয়া প্রেয়সীর সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া ছোট হুরের দিকে।
_______________________________
একুশে পা দেওয়া সদ্য পরিস্ফুটিত ফুলের ন্যায় এক রমণী কালো রঙের একটা মোটা ডায়েরি পড়তে পড়তে নিজের মূল্যবান অশ্রু বির্সজন দিচ্ছে। ডায়েরিটা পড়া শেষ করে সে যখন ঐটা বন্ধ করে, তখন ওপরের মলটে স্বর্ণালি অক্ষরে লেখা "নিয়তির পরিহাস" লেখাটির দেখা মেলে।
—সুনয়না, এই নয়ন। কই গেলি রে মা? বর যাত্রীরা এসে পরেছে। তোর বাবা তোকে নিচে নিয়ে যেতে বলেছে।
মাঝবয়সী এক নারী তার মাথার আধপাকা চুল গুলোর উপর শাড়ির আঁচলখানা আরেকটু মেলে দিতে দিতে রুমের দরজায় নক করতে থাকে। সুনয়না তাড়াতাড়ি করে চোখ মুছে নিয়ে ডাইরিটা আগের জায়গায় রেখে দেয়। বাবার রুমে এসেছিল মায়ের থেকে বিদায় নিতে ঘন্টা খানিক আগেই, সেই তার নজর এই কালো ডায়েরিতে আটকে যায়। আর সে জেনে যায় একুশ বছরের অজানা কিছু সত্য।
হ্যাঁ, সুনয়না সিরাতের মেয়ে। আজ তার বিয়ে। এতদিন নাহিয়ানই তাকে পিতার পরিচয়ে বড় করে তুলেছে। বাবা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, মামা-মামী আর মামাতো ভাইবোন এদের নিয়েই তার জীবন।কিছুদিন আগে সুনয়নার জন্য এক যোগ্য ছেলে পাওয়ায় আজ সেই ছেলের সাথে তার বিয়ে হতে চলেছে। সুনয়না এতদিন জানতই না যে, সে নাহিয়ান মাশরুকের কেউ হয় না। নাহিয়ান তাকে এত ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে যে, কখনো মায়ের অভাব বুঝতেই দেয়নি।
ওহ্হ, আরেকটা কথা, নাহিয়ান আজও বিয়ে করেনি কিন্তু। সকলে তাকে হাজার বলে কয়েও বিয়ে করাতে পারেনি। সিরাতের শেষ ইচ্ছের দোহাই দিয়েও তাকে বিয়ে করানো যায় নি। সে উল্টো সবাইকে বুঝ দিয়ে বলেছে–
—আমি যতই বলি সিরাত আমার মনে থাকবে, কিন্তু সত্যি এটাই যে বিয়ের মতো একটা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর আমি সেই নারীর প্রতি আসক্ত হতে বাধ্য। আমি এই দুনিয়ায় আমার রাত পাখিকে পাইনি, কিন্তু ঐ দুনিয়ায় আমি তার দাবী ছাড়বো না। দুনিয়ায় যে আমার স্ত্রী হবে সে যদি ঐ দুনিয়ায় মার দাবী করে তখন তো আমার রাতপাখি আবারও একা হয়ে যাবে। আমি তাকে আবারও একা, নিঃসঙ্গ অবস্থায় দেখতে পারব না। তাই আমি এই দুনিয়ায় কোন নারীকে আমার সঙ্গিনী হওয়ার অধিকার দিবো না, আমার প্রথম এবং শেষ সঙ্গিনী হবে আমার রাতপাখি।
তার এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আর কেউ কোন কথা বলতে পারে না। কারণ সকলেই জানে নাহিয়ান কেমন জেদি। সিরাতের মেয়েকে বুকে আগলে নিয়ে আজ একুশটি বছর সে পাড় করে দিলো। যাকে অবলম্বন করে বেঁচে ছিলো সেও আজ সমাজের নিয়মে চলে যাবে অন্যের বাড়িতে। নাহিয়ান হয়ে যাবে নিঃসঙ্গ, একা। একদম কবরে ঘুমিয়ে থাকা সিরাতের মতোই।
সুনয়না টিস্যু দিয়ে চেপে চেপে চোখের পানি মুছে নেয়। তারপর তার মামী অর্থাৎ মোহনার সাথে চলে আসে নিচে। শেষ সিঁড়িতে এসে দেখা মিলে নাহিয়ানের সাথে। সে নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে তাকে ডেকে ওঠে–
—বাবা।
নাহিয়ান মেয়ের ডাক শুনে গেস্টদের সাথে কথা বলা বাদ দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসল। নাহিয়ান এগিয়ে আসতেই সুনয়না হুমড়ি খেয়ে বাবার বুকে পড়ে কাঁদতে থাকে। নাহিয়ান মেয়ের কান্না দেখে বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে মা? কাঁদছো কেনো? কোথাও খারাপ লাগছে কি? বলো বাবার জান, কি হয়েছে?
সুনয়না কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—আমি বিয়ে করবো না বাবা, আমি বিয়ে করে চলে গেলে তুমি আবারও একা হয়ে যাবে। আমি করবো না বিয়ে, আমি সারাজীবন তোমার কাছে থাকবো।
নাহিয়ান মেয়ের কথা শুনো চিন্তা মুক্ত হয়। সে হেঁসে দিয়ে বলে–
—বিয়ে তো করতে হবেই আম্মাজান। এটা তো নিয়ম, মেয়ে বড় হলে এক বাবার ঘর খালি করে আরেক বাবার ঘরে যায় তার ঘরে আলো করতে। আর আমি একা কই? তোমার দাদাভাই, দাদীমনি, মামু, মামীমা, সবাই তো আছে আমার কাছে। আমি একদম একা থাকব না মা।
নাহিয়ানের অনেক বুঝানোর সিরাত বিয়ের পীড়িতে বসে। তিন কবুল বলার মাধ্যমে সুনয়না এক পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে যায়, হয়ে যায় তার জীবনের একাংশ। খাওয়াদাওয়া শেষ করে বিদায়ের পালা আসলে সুনয়না আবারও কাঁদতে থাকে। দাদা, দাদী, নানা, নানী, মামা, মামীমা সবাইকে ধরে ধরে বলছে–
—আমার বাবার খেয়াল রেখো তোমরা, আমার বাবাকে সময় মতো ঔষধ খাওয়া কথা মনে করিয়ে দিও। আমার বাবাকে কেউ একা রাখবে না।
আরো কত কথা মেয়ের! কাঁদতে কাঁদতে প্রেশার লো করে ফেলে শেষে। নাহিয়ান মেয়ের হাত তার জামাতা তৌসিফের হাতে তুলে দিয়ে বলে–
—আমার জীবনের সবচাইতে বড় সম্পদকে তোমার হাতে তুলে দিলাম, কষ্ট দিও না বাবা। যদি ও' কোনদিন কষ্ট বা বিরক্তির কারণ হয় তোমার, বেশিকিছু না আমায় জাস্ট একটা কল করো। আমি আমার সম্পদকে ফিরিয়ে আনবো আমার কাছে।
আর কোনদিন ধোকা দিও না বাবা। ও' সইতে পারলেও আমি হয়ত পারবো না।
তৌসিফ আস্বস্ত করে নাহিয়ানকে, তারপর নাহিয়ানের জীবনের মূল্যবান সম্পদ টিকে নিজের সাথে করে নিয়ে যায় নিজের রাজ্যে। সুনয়নাদের গাড়ি দৃষ্টি সীমার বাহিরে চলে না যাওয়া পর্যন্ত নাহিয়ান সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। গাড়ি একসময় মিলিয়ে গেলে সেও আস্তেধীরে হাঁটা দেয় তার গাড়ির উদ্দেশ্যে। নিজের গাড়িতে বসে রওনা হয় তার না হওয়া প্রেয়সীর কাছে যাওয়ার জন্য।
আধাঘন্টা ড্রাইভিংয়ের পর নাহিয়ানের গাড়ি এসে থামে তাদের পারি বাক কবরস্থানের সামনে। নাহিয়ানের পাগলামিতে বাধ্য হয়ে সিরাতকে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে কবর দেওয়া হয়েছিল। নাহিয়ান হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হয় একটা বাগান বিলাস গাছের নিচে। এই গাছটির নিচেই শুয়ে আছে তার হৃদয়ের রাণী, তার না হওয়া প্রেয়সী।
নাহিয়ান কবরটির সামনে বসে পড়ে। আশেপাশের ছড়ানো ছিটানো পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো নিজ হাতে সরিয়ে দেয়। তারপর কবরটির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। এমনটা সে সবসময়ই করে। সে যখন কবরটির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, তখন তার মনে হয় কবরে ভেতরে শুয়ে থাকা মানুষটিও তার দিকে একই ভাবে তাকিয়ে আছে।
বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নাহিয়ান মুখ খুলে। সে বলতে শুরু করে আজকের সকল ঘটনা। ঘটনাগুলো বলতে বলতে কখনো সে হেঁসে দিচ্ছে, কখনো বা হুহু করে কেঁদে দিচ্ছে। একসময় সে কবরটির পাশে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে–
—তুমি এই দুনিয়ায় আমার হওনি, কিন্তু ঐ দুনিয়ায় আমি তোমার দাবী ছাড়বো না। আমি আল্লাহর কাছে তোমায় চেয়ে নিবো এবার। তারপর তুমি, আমি আর আমাদের ময়না পাখি (সুনয়না) মিলে অনেক সুখে থাকবো। জান্নাতে নাকি কোন দুঃখ নেই, শুধু সুখ আর সুখ।
তারপর কাত হয়ে শুয়ে কবরটির দিকে তাকিয়ে বলে–
—কি হবে তো আমার ঐ দুনিয়ায়? নাকি এবারও আমায় খালি হাতে ফিরিয়ে দিবে?
হঠাৎই এক গা জুড়ানো দমকা হাওয়া এসে নাহিয়ানকে ছুঁয়ে দেয়। নাহিয়ানের মনে হয়, হাওয়ায় ভেসে আসছে কারো খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ আর সেই হাসির মালিক বলছে–
—হবো, এইবার শুধু আপনার হবো দারোগা মশাই।
______________________________________________
❝পরিশিষ্ট❞
জানতে চান সেই দুই বেইমানের কি হয়েছিলো? শুনতে চান তাদের নিষ্ঠুর পরিণতির কাহিনি? তাহলে শুনুন।
সিরাত মারা যাওয়ার পর তাশফিন নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনেক পাগলামি করে। কিন্তু কেউ তাকে সিরাতের কাছে পর্যন্ত ঘেঁষতে দেয় না। এমনকি সিরাতের কবরে মাটি পর্যন্ত দিতে দেওয়া হয় না। নাহিয়ান বাদী হয়ে তাশফিন ও লিজার বিরুদ্ধে মামলা করে। তাশফিন নিজেও ভুল শিকার করায় তাকে শাস্তি দেওয়া আরো সহজ হয়ে যায়। তাদের দুইজনেরই ১০ বছরের জেল হয়।
জেল থেকে বের হওয়ার পর তাদেরকে সবাই সামাজিকভাবে বয়কট করে। তাশফিনের বাবা-মা এই দশবছরে মারা যাওয়ায় তার ভাইবোন কেউই তাকে নিজের কাছে ঠাই দেয় না। লিজার আগের যেই সংসার ছিল সেই স্বামীও তাকে বহু আগে তালাক দেওয়ায় বাবা-মায়ের কাছে উঠে। কিন্তু সেখানেও সে শান্তি পায় না। শেষে তারা দু'জন বিয়ে করে ফেলে।
বিয়ে করার পর তাশফিন অনেক কষ্টে একটা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নেয়। সে যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তার বায়োডাটায় দশ বছরের জেলের ইতিহাস দেখে কোন কোম্পানিই তাকে নেয় না চাকরির জন্য।
সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে যাও সংসার চালাচ্ছিল লিজার এতে পোষায় না। তার লোভ জেগে ওঠে। সে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটা লোকের সাথে পরিচিত হয়। তারপর পরিচয় থেকে প্রণয়। একসময় তাশফিনকে ছেড়ে দেওয়ার কত পায়তারা করতে থাকে, কিন্তু তাশফিন তাকে ছাড়ে না। উপায় না পেয়ে একদিন লিজা তার নতুন বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে তাশফিনের মাথায় বাজেভাবে আহ""ত করে পালিয়ে যায়। তাশফিনের মাথার আঘাত এতটা গভীর ছিল যে, তাশফিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। আর রাস্তায় পাগল হয়ে ঘুরতে থাকল
অন্যদিকে লিজার নতুন বয়ফ্রেন্ড ছিল পতি""তালয়ে মেয়ে পা"চারকারীর একজন সদস্য। সে তাকে পতি*তালয়ে নিয়ে গিয়ে বেঁচে দেয়। লিজা তারপর থেকে সেও মানবেতর জীবনযাপন করতে থাকে। সে প্রতিদিন মরণ যন্ত্রণা ভোগ করে। নিজের শরীর বেঁচে দু'বেলা দুমুঠো খাবারের জোগাড় করে। সে যেই পতি*তালে থাকে সেখানকার সর্দানী অনেক খারাপ। শরীর খারাপ থাকলেও তাকে মুক্তি দেয় না। বরং অন্যসব পতি*তার চেয়ে লিজার একর একটু বেশিই নির্যাতন করে।
সাময়িক সুখে সন্ধানে এতগুলো মানুষের জীবনের সুখ হারিয়ে গিয়েছে। একজন কবরে গিয়ে তার শান্তি খুঁজে নিয়েছে, আরেকজন নিঃসঙ্গতাকে। একজন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ছন্নছাড়া হয়ে রাস্তাশ বসবাস করছে তো আরেকজন নিজের অনিচ্ছায় শরীর বেচছে প্রতিদিন। অথচ তারা সকলেই সুখী হতে পারত।
❝সমাপ্ত❞
[জানি এমন এন্ডি কেউই চান নি, কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে আমি এন্ডিংটা এমনই ভেবে রেখেছিলাম। সব পাওয়াতেই পূর্ণতা থাকে না, কিছু কিছু না পাওয়া পূর্ণতার চাইতেও বেশি সুখ দেয়।
আপনারা চাইলে নাহিয়ান ও সিরাতকে নিয়ে আবার একটা গল্প আমি লিখবো৷ যেখানে সিরাত নিজেই নিজের অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবে এবং নাহিয়ানের ঘরণীও হবে। কি চান কি তাদের আরো একবার?
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🫶]
