প্রাপ্তির_হাসি

পর্ব_০৮

DI YA 


হসপিটালে অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনছি আমি। অপারেশন শুরু হওয়ার ২ ঘন্টা হতে চললো। এখনো কিছু জানা যায়নি। অন্য দিকে আন্টি ও অজ্ঞান হয়ে পাশের কেভিনে রয়েছে। ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করেছে আর বলেছে জ্ঞান ফিরতে ৫ ঘন্টা সময় লাগবে।তখন আন্টির ফোনে একটা লোক কল করে বলেছিল, 


যার ফোন থেকে উনি কল করেছে। তার এক্সিডেন্ট হয়েছে। প্রচুর কারাপ অবস্থা তার - লোকটি


আন্টি তো এটা শোনার সাথে সাথে চিৎকার করে উঠে।আমি আন্টির কাছে থেকে ফোন নিয়ে লোকটার সাথে কথা বলে সব জানতে পারি। তখন আমি বলি,


আপনি প্লিজ দয়া করে উনাকে আশেপাশের কোনো হসপিটালে নিয়ে যান।আর আমাদের তার ঠিকানা টা দেন।আমরা এখনি আসছি - আমি

(লেখিকা দিয়া রোজা)


আচ্ছা ঠিক আছে। আমি উনাকে ********** এই হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা জলদি আসেন - লোকটি


আমরা এখনি আসছি - আমি


তারপর আমি গাড়ির চাবি নিয়ে এসে বের হতে যাবো।তখনি আন্টি বলে, 


আমিও যাব মা।আমাকে ও নিয়ে চলো। এই আমার শেষ ভরসা।ও না থাকলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো - লিমা আহমেদ


আচ্ছা চলেন - আমি


তারপর আমরা জলদি হসপিটালে চলে আসি।হসপিটালে এসে রিয়ানের এই রকম অবস্থা দেখে আন্টি জ্ঞান হারায়।সত্যি প্রচুর খারাপ অবস্থা রিয়ানের। পুরো শরীর রক্তে মাখামাখি। আকাশি কালারে টিশার্ট ও লাল হয়ে গেছে পুরো। বুঝতে পারছি না কি হবে। কি করবো আমি উপায়ন্তর না পেয়ে আমি বাবাইকে কল করি। তারপর সবকিছু খুলে বলি। তারপর বাবাই বলে, 


আচ্ছা ঠিক আছে। তুই টেনশন করিস না মা আমি এখনি আসছি - বাবাই


আচ্ছা - আমি


অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে আসেন।আমি এগিয়ে যাই উনার দিকে,


উনি এখন কেমন আছে ডাক্তার ? - আমি


হি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার।কিন্তু মিনিমাম এক মাস উনার বেড রেস্টে থাকতে হবে।কোনোরকম চাপ নিতে পারবেন না। আর পায়ের জখম টা সারতে ও ১ মাসের মত সময় লাগবে। ততদিন উনি একা একা হাটতে পারবে না । এছাড়া নিয়মিত ঔষধ নিলে উনি জলদি সেড়ে উঠবেন - ডাক্তার 


থ্যাংক্স ডাক্তার - আমি


তারপর উনারা চলে যায়।রিয়ানকে ও কেবিন রুমে শিফট করা হয়।রিয়ানের কেবিনে ঢুকে আমি তার পাশে গিয়ে বসে তার মাথায় হাত বুলাতে থাকি। জানিনা কেনো আজকে যখন শুনেছি উনার এক্সিডেন্ট হয়েছে তখন বুকের বা পাশে চিনচিন ব্যাথা অনুভব হয়।প্রচুর ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি।মনে হচ্ছিল নিজের খুব কাছের কিছু আমার কাছে থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। হারিয়ে ফেলছি খুব মূল্যবান কিছু একটা।বুঝতে পারছি না কিছু আমি।কেনো হচ্ছে এসব কিছু । মন আর মস্তিষ্ক দুটো দুই কথা বলছে। ইচ্ছে করছে মনের কথা টা মেনে নেই। কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে না। আমি ডিভোর্সী। আর ডিভোর্সিদের সাথে কারো নাম জড়াতে নেই।শুধু শুধু নিজের জন্য সেই মানুষ টার জীবন আমি পারিনা নষ্ট করতে।উহু নেই তো তার কোনো কমতি। তাহলে শুধু শুধু কেনো নিজের জীবনের সাথে তার জীবনটা জড়িয়ে ফেলছি আমি।এর ফল যে খুব একটা সুখকর হবেনা আমার জন্য তা ঠিকই বুঝতে পারছি।কিন্তু কি করবো মনের উপর কি আর কারোর নিয়ন্ত্রণ চলে ? 

(গল্পের লেখিকা দিয়া রোজা)


_____


সাত দিন পর,


রিয়ানের জ্ঞান ফেরার দুদিন পর তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়।এ সবকিছুতে বাবাই আমাকে হেল্প করেছিল। রিয়ানের বিজনেস টা ও এখন বাবাই দেখাশোনা করছে। আমিই বাবাইকে বলেছি এক মাসের জন্য এই দায়িত্ব টা নিতে।ভাবতে ও অবাক লাগে এই মানুষটির সাথে আমার কোনো রক্তের সম্পর্কই নেই।তবুও কত করে চলেছে তিনি আমার জন্য। সত্যি হয়তো এখনো দুনিয়ায় ভাল মানুষ বেঁচে আছে।রিশাদের বাসা থেকে চলে আসার পর রাস্তায় আমি আনমনে হাটছিলাম। তখনি দেখি এক ভদ্রলোক অজ্ঞান হয়ে পরে আছে রাস্তার এক পাশে।যেহেতু চলতি রাস্তা সেহেতু প্রচুর মানুষ জমে গিয়েছিল সেখানে।কিন্তু কেউ উনাকে হসপিটালে নিয়ে যায়নি। পরে আমি কিছু লোকের সাহায্যে উনাকে হসপিটালে নিয়ে যাই।তারপর উনি ঠিক হওয়ার পর আমি উনার সম্পর্কে জানতে পারি দুনিয়ায় আপন বলতে কেউই নেই উনার একাই থাকেন। সেদিন ড্রাইভার আসতে লেট করেছিল। আর জরুরি মিটিং থাকায় রাস্তায় আসেন অন্য গাড়ির খোঁজে। সেখানেই বিপি লো হয়ে সেন্সলেস হয়ে যান। তারপর আমার সম্পর্কে জানতে চান। আমিও আমার বিষয়ে সব খুলে বলি উনাকে। তারপর উনি আমাকে প্রস্তাব দেয় উনার সাথে উনার মেয়ে হয়ে থাকার জন্য। যেহেতু আমি একা, আপন বলতে কেউই ছিল না সেই সময় পাশে দাঁড়ানোর। তাই আমি রাজি হয়ে যাই উনার প্রস্তাবে।বাসা থেকে যাওয়ার সময় নিজের পরীক্ষার রেজাল্ট গুলো নিয়ে এসেছিলাম। সাথে বাকি আরো জরুরি কাগজপত্র। তা দিয়ে বাবাই আমাকে ওখানে এক মেডিকেলে ভর্তি করে দেন।বাবাইয়ের কারণেই তখন চান্স পেয়েছিলাম আমি সময় চলে যাওয়ার পর ও।সত্যিই রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও অনেক মানুষ আপন হয়ে যায়।আর অনেকের সাথে যত আপনই সম্পর্ক থাক না কেন , প্রয়োজনের সময় কাউকেই পাশে পাওয়া যায়না। এটাই হচ্ছে চরম বাস্তবতা মানুষের জীবনের।

~~~~~~~

 মাত্র ডিভোর্সের সব কাজ শেষ করে বাসায় আসলো রিশাদ।একটা সাইনের মধ্যে দিয়ে এতবছরের সম্পর্ক এত স্মৃতি এত মূহুর্ত সব এক পলকেই শেষ হয়ে গেলো। একসময় প্রাপ্তির সাথে যা যা করেছিল। এখন সেসব ঘটনা পুনরায় ঘটছে।পার্থক্য শুধু এখন প্রাপ্তির জায়গায় রিশাদ নিজে রয়েছে। কি যে হবে এরপরে সে বুঝতে পারছেনা। নিয়তি এখন তাকে এমন একটা জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে। না পারছে এসবকিছু সহ্য করতে। আর না পারছে কিছু করতে।রিশাদ বুঝতে পারছে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছে এখন।চাইলেও আর কিছু করা সম্ভব নয়।ভাগ্য এখন তাকে যেভাবে চালাবে তাকে সেভাবেই চলতে হবে।


`````````````


 মিস্টার রিয়ান সমস্যা কি আপনার ? খাচ্ছেন না কেনো এখনো? স্যুপটা তো ঠান্ডাই হয়ে যাবে। তখন খেয়ে কি হবে বলেন দেখি ? - আমি


আমার হাত ব্যাথা আমি খেতে পারবনা। - রিয়ান


ভাল আন্টি পাপার তো হাত ব্যাথা তুমি যেভাবে আমাকে খাইয়ে দেও পাপাকে ও সেই ভাবে একটু খাইয়ে দাও না প্লিজ - রিয়ানা


রিয়ানার কথা শুনে আমি নিশ্চুপ। 


তোমার ভাল আন্টি হয়তো চায়না আমি জলদি সুস্থ হই৷তাই তো খাইয়ে দিতে চাচ্ছে না। যাকগে ছাড়ো আমি এভাবেই থাকি - রিয়ান


দেখি মুখ খুলুন। আমি খাইয়ে দিচ্ছি - আমি


সত্যি - রিয়ান


হুম - আমি


 তারপর ধীরেধীরে পুরো স্যুপটা রিয়ানকে খাইয়ে দিলাম।হঠাৎই নিচে থেকেে চেচামেচির আওয়াচ শুনে নিচে যেতেই দেখি সিমা এসেছে সাথে কিছু পুলিশ।আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না কেনো এসেছে সে। 


অফিসার রোজ রোজ একজন ভদ্র মানুষের বাসায় পুলিশ আসা কেমন কথা বলেন দেখি ? - আমি


কিসের ভদ্রলোক আমি রিয়ানার মা আমি ওকে নিয়ে যেতে চাই - সিমা


রিয়ানা তুমি কি ওই আন্টির সাথে যাবা নাকি আমাদের সাথে তোমার পাপার সাথে থাকবা ? - আমি।।


আমি ভাল আন্টি আর পাপার সাথে থাকবো। ওই পচা আন্টির কাছে আমি যাবনা- রিয়ানা


দেখেছেন অফিসার। দ্বিতীয় বার আর এখানে আসলে কিন্তু আমি আপনাদের নামে মামলা করতে পিছপা হবনা - আমি।


সরি ম্যাম - বলে অফিসার রা বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।

প্রাপ্তির_হাসি

পর্ব_০৯

DI YA 


১ মাস পর,,


পাত্র পক্ষের সামনে বসে আছি। আজকে সকালে বাবাই জরুরি কাজে বাসায় ডেকে এনেছে। তারপর বলে এসব কথা। বাবাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি রাজি হয়ে যাই। অন্য দিকে রিয়ানার জন্য প্রচুর মন খারাপ আর রিয়ান। না না সে আমার কেউ না। বার বার কেনো তার ভাবনা চলে আসছে। জানিনা আমি। এরপরে যে কি হতে চলেছে আমি বুঝতে পারছি না। সবকিছুই পরিস্থিতির উপর ছেড়ে দিয়েছি। ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি বাস্তবতার সাথে লড়াই করতে করতে। পাত্রপক্ষ আমার আগের বিয়ে সম্পর্কে সবই জানে তবুও তারা রাজি এ বিয়েতে। সব কথা মোটামুটি ঠিক হওয়ার পরে আমাকে আর পাত্রকে পাঠানো হয় একা কথা বলতে। বাবাই আমাকে বলে তাকে নিয়ে নিজের রুমে যেতে। আমি তাই করি। রুমে এসে আমি চুপচাপ সোফায় বসে পরি। উনিও চুপচাপ সোফার অন্য কিনারে বসে পরে। 


 হ্যালো মিস প্রাপ্তি।আমি আদনান শেখ।- আদনান


হুম। - আমি


তো বিয়ের ব্যাপারে আপনার মতাতমত কি ? আপনি কি রাজি আমাকে বিয়ে করতে নাকি আপনার কোনো আপত্তি আছে ? - আদনান


আমি নিশ্চুপ

৷ 

দেখুন আমি সোজাসুজি ভাবে কথা বলতে পছন্দ করি।আমার বাবা যখন বিয়ের জন্য আপনার ছবি দেখায় তখনি আমার আপনাকে ভালো লেগে যায়।আপনার সব অতীতই আঙ্কেল আমাদের খুলে বলেছে।আপনার অতীত নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। এখন আপনার ইচ্ছে টা জানতে চাই - আদনান


আমি আবারো নিশ্চুপ।


নিরবতাকে কি তাহলে আমি সম্মতির লক্ষণ ধরে নিব - আদনান


আমার কিছুটা সময় চাই।আমি এত দ্রুত সবকিছুর জন্য প্রস্তুত নই।আশা করি আপনি আমার দিকটা ও বুঝবেন - আমি


জি অবশ্যই। আপনার যত সময় দরকার আপনি নেন।ভেবেচিন্তে আপনি সিদ্ধান্ত নিবেন।সিদ্ধান্ত টা কিন্তু আমি হ্যাবোধক আশা করছি - আদনান


আমি কিছু বললাম না।


তারপর আরো কিছু সময় কথা বলে উনি চলে গেলেন।তারপর উনারা সবাই ও বাবাইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেলেন। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি আননোন নম্বর থেকে একটা কল এসেছে । আমি প্রথম দিকে রিসিভ করিনি।দুই বার কল আসার পর জরুরি কল ভেবে রিসিভ করলাম,,


আসসালামু আলাইকুম মেম - আদনান


ওয়ালাইকুম আসসালাম । কে আপনি ? - আমি


এত জলদি ভুলে গেলেন । কিছুক্ষণ আগেই তো আপনার বাসা থেকে আসলাম - আদনান 


ও আচ্ছা আদনান আপনি। জি বলেন কি বলবেন ? - আমি


তারপর আমরা কিছু সময় কথা বললাম।কলটা কেটে আমি লিমা আন্টিকে কল দিলাম। 


কেমন আছো মা ? - লিমা আহমেদ 


ভাল আন্টি। তুমি কেমন আছো? - আমি


ভাল - লিমা আহমেদ 


রিয়ু পাখি কেমন আছে ? আর মিস্টার রিয়ানের অবস্থা কেমন ? - আমি


হুম রিয়ু তোমার সাথে বলবে মা - লিমা আহমেদ 


দাও আন্টি - আমি


হ্যালো ভাল আন্টি কেমন আছো তুমি ? - রিয়ানা


ভাল মা তুমি কেমন আছো ? - আমি


আমিও ভাল। তুমি কখন আসবে? - রিয়ানা


আমি কালকে সকালে আসে তোমার সাথে দেখা করে যাব - আমি


আচ্ছা ঠিক আছে ভাল আন্টি - রিয়ানা


তোমার পাপা কেমন আছে? - আমি


পাপা ও ভাল আছে। সকালে পাপা ও তোমাকে খুঁজে ছিলো । পরে যখন আমি বলেছি তুমি চলে গেছো তখন আর কিছু বলেনি - রিয়ানা


আচ্ছা পাখি তাহলে কালকে দেখা হবে। টাটা - আমি


টাটা ভাল আন্টি - রিয়ানা


~~~~~~~


আপনার নাকি বিয়ে ঠিক মিস প্রাপ্তি - রিয়ান


কিভাবে জানলেন এই কথা? - আমি


একভাবে না একভাবে ঠিকই জেনেছি। তা আপনি রাজি নাকি বিয়েতে ? - রিয়ান


আমি কিছুই বললাম না।


আপনি কি কিছু বুঝেন না ? নাকি বুঝে ও না বোঝার ভান করে থাকেন ? - রিয়ান


কিছু কিছু বিষয় না বোঝাই ভাল - আমি


রিয়ান হঠাৎই আমার হাত চেপে ধরে বলতে লাগলো,


আমাকে এভাবে শেষ করে দিচ্ছো তুমি - রিয়ান


আমার কিছু করার নেই। - আমি


আচ্ছা ঠিক আছে - রিয়ান


এভাবে সময় চলতে লাগলো। আমি প্রতিদিনের ব্যস্ততায় জীবন পাড় করতে থাকলাম।কিন্তু রোজ একবার হলেও রিয়ানার সাথে দেখা করতে যেতাম।সময় হয়তো সত্যি অনেক দ্রুত চলে যায়।আদনানের সঙ্গে এর মধ্যে আমার পাঁচ থেকে ছয়বার কথা হয়েছিল। এরপরে আমি বাবাইকে জানিয়ে ছিলাম।আমার সময় লাগবে কিছুটা। এখনো এত কিছু মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।আমার অবস্থা টা বুঝে বাবাই ও আর আমাকে জোড় করেনি। আদনানকে সিদ্ধান্ত জানানোর পর সে শুধু বলেছিল বন্ধু হয়ে যেমন চিরকাল পাশে রাখি। এতে আর আমি দ্বিমত করিনি।তার সাথে ও আমার ভাল একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। 


আজকে আমার জন্মদিন। সন্ধ্যায় বাবাই বিরাট এক পার্টির আয়োজন করেছে।আমি সেখানে রিয়ানাদের ও ইনভাইট করি। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাত ১০ টার ভিতরে বার্থডে পার্টি শেষ হয়ে যায়।এর মধ্যে অবশ্য আমি লক্ষ করেছিলাম বাবাই মিস্টার রিয়ানের সাথে অনেক ক্ষণ সময় নিয়ে আলোচনা করছে।এত মানুষের ভীড়ে আর তাদের কথা জানা হয়নি।আন্টিকে রিকোয়েস্ট করে রিয়ু পাখিকে আমার কাছে রেখে দেই। মেয়েটা ভারি মিষ্টি। আসলে সত্যি কেউ সন্তান পেয়ে ও মূল্য দেয়না।আর অন্য দিকে কত সম্পর্ক নষ্ট হয় একটা সন্তানের জন্য। ফ্রেশ হয়ে রিয়ুকে ও ফ্রেশ করিয়ে দেই।আমার বাসায় ওর জামাকাপড় তো ছিলনা। তাই বাসার একজন মেইডকে বাইরে পাঠিয়েছিলাম ওর জন্য কিছু ড্রেস নিয়ে আসতে। রিয়ানা বলতে শুরু করলো,


ভাল আন্টি ও ভাল আন্টি - রিয়ানা


হ্যা পাখি বলো - আমি


আমি আইসক্রিম খাবো - রিয়ানা


এত রাতে আইসক্রিম খেলে তো জ্বর হবে তোমার - আমি


কিছু হবেনা তুমি আমি আর নানাভাই গল্প করতে করতে অল্প একটু আইসক্রিম খাবে - রিয়ানা


আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি তোমার নানাভাইকে ড্রইং রুমে ডেকে নিয়ে আসো।আমি আইসক্রিম নিয়ে আসছি - আমি


ওকে ভাল আন্টি - বলে রিয়ানা দৌড়ে বাবাইয়ের ঘরের দিকে চলে গেলো 


ড্রইংরুমে বসে আমি বাবাই আর রিয়ানা কথা বলছিলাম।রিয়ানা তখন আমার বাবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,


জানো নানাভাই একটা কথা - রিয়ানা


কি কথা গো নানাভাই - বাবাই


ভাল আন্টি এখন পচা হয়ে গেছে। কবে থেকে আমার সাথে থাকেনা।আমাকে খাইয়ে দেয়না।গল্প শোনায় না।ইয়াম্মি ইয়াম্মি রান্না করে দেয়না - মুখ ফুলিয়ে রাগী ভঙ্গিতে বললো রিয়ানা


এ তো দেখি ভারি অন্যায় করে ফেলেছে তোমার ভাল আন্টি।এখন বলো তো নানাভাই তোমার ভাল আন্টিকে কি শাস্তি দেওয়া যায় ? - বাবাই


কালকে সারাদিন ভাল আন্টি আমাকে টাইম দিবে। আমার সাথে ঘুরবে।আমাকে ইয়াম্মি রান্না করে নিজে খাইয়ে দিবে - রিয়ানা


আচ্ছা ঠিক আছে। এসবই করবে তোমার ভাল আন্টি।আর যদি না করে তাহলে আমাকে বলবে তুমি। আমি তোমার ভাল আন্টিকে খুব করে বকে দিব - বাবাই


না না ভাল আন্টিকে বকা দিলে তো ভাল আন্টির খারাপ লাগবে পরে আমারো কষ্ট হবে। ভাল আন্টি আমার সব কথা শুনে তাই এটা ও শুনবে তাই না ভাল আন্টি ? - রিয়ানা


হ্যা পাখি - আমি


তারপর আরো কিছু সময় হাসি মজার গল্প করে আমরা সবাই ঘুমাতে চলে গেলাম।


___


অন্য দিকে,


তুমি ভাইসাহেবের সাথে কথা বলেছো রিয়ান ? - লিমা আহমেদ 


হ্যা আম্মু - রিয়ান


উনি কি বলেন এই বিষয়ে ? - লিমা আহমেদ 


উনি বলেছেন উনার কোনো সমস্যা নেই। উনি রাজি। কিন্তু

প্রাপ্তির_হাসি

পর্ব_১০

DI YA 


তুমি ভাইসাহেবের সাথে কথা বলেছো রিয়ান ? - লিমা আহমেদ 


হ্যা আম্মু - রিয়ান


উনি কি বলেন এই বিষয়ে ? - লিমা আহমেদ 


উনি বলেছেন উনার কোনো সমস্যা নেই। উনি রাজি। কিন্তু - রিয়ান


কিন্তু কি রিয়ান ? - লিমা আহমেদ 


কিন্তু এখনো প্রাপ্তির সিদ্ধান্তের উপর সবকিছু নির্ভর করে।ও রাজি না হলে আর কিছু করার নেই - রিয়ান


মেয়েটা কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পায় রিয়ান। একবার বিশ্বাস করে ঠকেছে।যার উপর এত বিশ্বাস ভরসা করেছিল সে ওর ভরসা বিশ্বাস সবকিছু ভেঙে দিয়েছে।বিশ্বাস জিনিসটা এখন ওর মন থেকে উঠে গিয়েছে - লিমা আহমেদ 


আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবে আম্মু - বিছানায় শুয়ে বললো রিয়ান


হুম।- রিয়ানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো লিমা আহমেদ 


বলো তো আমার কি দোষ আম্মু। আমি ভালোবেসেছি এটাই কি আমার দোষ। ভালোবাসা তো অন্যায় না আম্মু। প্রথম দিন দেখেই ভালো লেগে গিয়েছিল ওকে।তাই ওর থেকে দূরত্ব রেখে চলার চেষ্টা করতে থাকি।কিন্তু আমি পারিনি আম্মু নিজেকে সামলাতে।সারাক্ষণ আমার ভাবনা কল্পনায় এসে আমাকে জ্বালাতে শুরু করে ও। তাও আমি অনেক চেষ্টা করেছি আম্মু। বিশ্বাস কর আমাকে। কিন্তু ওর অতীত টা যখন জানলাম তখন মনে হয় ও আমার মনে আরো বেশি জায়গা দখল করে নিল।কত কষ্ট করেছে মেয়েটা জীবনে। সেদিন যখন শুনলাম ওর বিয়ের কথা বার্তা চলছে।তখন নিজেকে পুরো পাগল পাগল মনে হচ্ছিল। খুব কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে ছিলাম।তারপর যখন ও বিয়েটা ভেঙে দিল তখন একটু আশার আলো পেয়েছিলাম মনে।কম তো চেষ্টা করছি না আম্মু।কিন্তু ও বুঝে ও অবুঝের মতো আচরণ করছে।বলো তো আম্মু কেনো ও আমার সাথে এমন করছে ? - রিয়ান


বললাম না বাবা বিশ্বাস জিনিসটা হচ্ছে কাঁচের মতো।একবার ভেঙে গেলে হয়তো জোড়া ঠিকই লাগানো যায়। কিন্তু দাগ কিন্তু মেটে না। সেই দাগটা থেকেই যায়।তোর এখন ওর বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। তাহলে দেখবি তুই যতোটা ওকে ভালোবাসিস তার থেকে অনেকগুণ বেশি ভালোবাসা তুই ওর কাছে থেকে পাবি। বুঝলি - লিমা আহমেদ 


কি করে আম্মু ? কি করে আমি কি করব এটাই বুঝছি না।চেষ্টা করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। তবুও তার মন গলছেনা। কি করবো আমি আম্মু বলো ? - রিয়ান


ওকে সময় দে। ওর পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে জেনে নে।ওর মতো করে ওকে চিনতে চেষ্টা কর। নিজের সর্বোচ্চ ভালোবাসাটা ওকে দে৷ আমি জানি তুই সত্যি পারবি - লিমা আহমেদ 


জানিনা আম্মু।কিছু জানিনা আমি।আদৌ ও কি আমি পারবো প্রাপ্তির মুখে #প্রাপ্তির_হাসি ফুটাতে ? - রিয়ান


পারবি বাবা। ভালোবাসা যদি সত্যি হয় তাহলে অবশ্যই তুই তাকে পাবি।আল্লাহর কাছে নিজের চাওয়াগুলো বল উনি কখনো ও নিজের বান্দাকে নিরাস করেনা - লিমা আহমেদ 


তাই যেন হয় আম্মু - রিয়ান


এই রকম এক কথায় দুই কথায় রিয়ান ঘুমিয়ে যায়।রিয়ানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে আসে লিমা আহমেদের ভিতরে থেকে।ছেলেকে তো বললেন সে পারবে।সত্যিই কি পারবে রিয়ানন প্রাপ্তির মনে নিজের জন্য অনুভূতি জন্মাতে।নাকি অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে তার ছেলেটার জীবনের কাহিনী।


উনি একা একাই বলতে লাগলেন,


আল্লাহ তুমি সবই জানো। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল এটা ও তুমি জানো। আমার ছেলেটা জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছে। এভাবে ওর থেকে ওর ভালোবাসাকে তুমি আলাদা করে দিও না।- লিমা আহমেদ 


~~~~~~~~~~


পরদিন সকালে,,


পাখি ও রিয়ু পাখি জলদি উঠো।১০ টা বাজতে চললো বেলা তুমি এখনো শুয়ে আছো। আজকে না তুমি এতকিছু করবে। তাহলে কখনই বা উঠবে ? আর কখনই বা এতসব কিছু করবে ? সে চিন্তা কি আছে।রাতে কতবার বলেছিলাম জলদি ঘুমাও জলদি ঘুমাও। সকালে উঠতে পারবেনা।না আমার কথা কে শুনবে? - আমি


ভাল আন্টি আর একটু প্লিজ।আর একটু শুয়ে নেই।তারপর সবকিছু করবো - ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো রিয়ানা


না আর একটু ও না।জলদি উঠো। তুমি জানো আমি তোমার জন্য পাস্তা রান্না করেছি।তুমি এখন উঠে পরো পাখি - আমি


আচ্ছা ঠিক আছে ভাল আন্টি - রিয়ানা


তারপর রিয়ানা ফ্রেশ হয়ে বের হওয়ার পর আমি ওকে রেডি করিয়ে দিলাম।সুন্দর কিউট একটা পিংক কালারের মিনি ফ্রক পরিয়ে দিলাম।ওর সাথে মিলিয়ে আমি ও একটা পিংক কালারের লং ড্রেস পরে নিলাম।সাথে দুজনে চুলগুলো একই রকম ভাবে পোনিটেল করে নিয়ে রুমে থেকে বেরিয়ে আসলাম।আমাদের দেখেই বাবাই বলে উঠলো,


মাশাল্লাহ আমার মা আর নানুভাইকে তো অসাধারণ লাগছে।আজকে রাস্তায় যে তোমাদের দেখবে সেই জ্ঞান হারাবে - বাবাই


না না জ্ঞান হারালে আবার আমার আর ভাল আন্টির নামে লোকেরা পুলিশে কেস করবে। তখন পুলিশ আঙ্কেল এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে।না না আমি ওখানে যাবো না নানুভাই - দুই হাত নাড়িয়ে না করতে করতে বললো রিয়ানা।


ওর কথাগুলো সাথে কথা বলার ধরণ দেখে আমি আর বাবাই হাসতে শুরু করে দিলাম।পুরাই বুড়ি একটা বাচ্চা। এই মেয়েটা যেখানেই থাকবে সেখানেই কখনো আনন্দের কমতি হবেনা।


তারপর আমরা সবাই নাস্তা করে নিলাম।নাস্তা করার পর আমি আর রিয়ানা গাড়ি নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম। গাড়িতে বসতে যাবো তখনই কোথাথেকে যেন রিয়ান এসে হাজির হলো। আর বলতে লাগলো,


হেই গার্লস তোমরা কি তোমাদের সাথে আমাকে ও নিয়ে যাবে ঘুরতে ? - রিয়ান


এই আপনি কোথা থেকে আসলেন ? আপনি কি ভাবে জানলেন আমরা ঘুরতে যাবো ? বলুন বলুন - আমি


আরে বাবা এতকিছু বলতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। পরে বলা যাবে সবকিছু। রিয়ু মাম্মা তুমি কি পিছনের সিটে গিয়ে বসবে তাহলে পাপা একটু সামনের সিটে বসতে পারতো - রিয়ান


ওকে পাপা - বলে রিয়ানা গাড়ির পিছনের সিটে গিয়ে বসলো।


সাথে সাথে রিয়ান এসে আমার পাশের সিটে বসে পরলো।আমি আর কিছু না বলে গাড়ি ড্রাইভ করতে শুরু করলাম।প্রথমে আমরা গেলাম শিশুপার্কে।সেখানে গিয়ে রিয়ানা প্রচুর আনন্দ করে। আর মিস্টার রিয়ান তো সারাক্ষণ অসভ্যের মতো আমার পিছনে পরেছিল।একটা মানুষ এত বেহায়া হয় কিভাবে। কেন বুঝেন না উনি আমি আমার এই অভিশপ্ত জীবনের সাথে কারোর নাম জড়াতে চাইনা ?  


তারপর শিশুপার্কে থেকে বেরিয়ে আমরা চলে গেলাম লান্স করতে। রেস্টুরেন্টে বসে আমরা লান্স করছিলাম তখনই কোথা থেকে একটা মেয়ে এসে যেন হঠাৎ করে মিস্টার রিয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে,


হেই দোস্ত কি অবস্থা তোমার ? - মেয়েটি


আরে মিম কি খবর তোমার? আমি ভালোই আছি। তোমার খবর বলো? - রিয়ান


এভাবে অনেকক্ষণ তারা কথা বলে।এরমধ্যে রিয়ান অবশ্য আমার আর রিয়ুর সাথে এই মিমের বাচ্চা ডিমের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।কেন জানি সহ্য হচ্ছিলো না ওই ডিমের বাচ্চাকে আমার।ছেলেদের সাথে এত গায়ে পরে নেকামি করে কথা বলার কি আছে। ভাবখানা দেখলে মন চায় ডিমের বাচ্চাকে ভাজি করে আমি খেয়ে ফেলি।উনি ও বলিহারি আমার সাথে তো কখনো এত হেসে কথা বলেনি। তাহলে মিমের সাথে এত কিসের কথা।মন চাচ্ছিলো ডিমকে আমি পাথরের সাথে মেরে মেরে ভাঙি।


তারপর রেস্টুরেন্টে থেকে বেরিয়ে আমরা একটা শপিংমলে চলে আসি।ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই আমার চোখ পরে একজনন মানুষের উপর।আরে ও এখানে কি করছে ? আর ওর সাথে কে এটা ? 

প্রাপ্তির_হাসি

পর্ব_১১ (সমাপ্তি)

DI YA 


তারপর রেস্টুরেন্টে থেকে বেরিয়ে আমরা একটা শপিংমলে চলে আসি।ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই আমার চোখ পরে একজনন মানুষের উপর।আরে ও এখানে কি করছে ? আর ওর সাথে কে এটা ? আসলে আমার সামনে ছিল লিজা। আজকে আবার তার সাথে ভিন্ন একটা ছেলে।আমি ওর দিকপ এগিয়ে ওর সাথে কথা বলতে যাব তার আগে রিয়ু পাখি আমাকে টেনে অন্য এক শপে নিয়ে গেল।সেখানে নাকি ওর একটা ড্রেস ভাল লাগছে। তারপর সেখানে গিয়ে দেখলাম ওর একটা ব্লু কালার বারবি গাউন পছন্দ করছে। আমি ওকপ সেই ড্রেসটা কিনে দিলাম। তারপর আমরা বেরিয়ে আসলাম।আসার সময় আমি লিজাকে আর ওই ছেলেকে অনেক খুঁজেছিলাম কিন্তু পাইনি।


সময় চলতে থাকে। দেখতে দেখতে আবারো আরো ৬ টা মাস পার হয়ে গেলো। এর মধ্যে অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা হচ্ছে আমার আর মিস্টার রিয়ানের বিয়ে ঠিক হয়েছে। হুম আগামী মাসের ১৭ তারিখ আমাদের বিয়ের দিন ঠিক করা হয়েছে। ভেবেছিলাম আর কাউকে জড়াবো না নিজের এই অভিশপ্ত জীবনে সাথে। কিন্তু নিয়তিতে হয়তো অন্য কিছুই লেখা ছিল।তাই তো এত চেষ্টা করে ও পারিনি নিজেকে সামলাতে।এ কিছু মাসে উনি পাগলামি যেন আরো বাড়িয়ে দেয়।উনার পাগলামিতে আমি আরো দূর্বল হয়ে পরি উনার উপর।তারপর একপ্রকার নিজের অজান্তেই মনের কথা স্বীকার করে ফেলি তার কাছে।দেখা যাক না এই বার হয়তো ঠিক মানুষটাই আমার পাশে আছে। আগের বারের মতো সে আমাকে ধোঁকা দিয়ে ভেঙে দিবেনা। 


মানুষ চিন্তা করে একটা আর হয় একটা। আবারো একটা ঝড় এসে আমার জীবনটাকে ভেঙেচুরে গুড়ো করে দিয়ে গেল। 


~~~~~~~~~


 আঁখি জোড়া বন্ধ করে এতক্ষণ অতীতে ডুবে ছিলাম আমি।আদনান ডাক দিতেই আমি বাস্তবে ফিরে আসি।আঁখি জোড়া খুলতেই টপটপ করে এক নাগাড়ে কিছু ফোটা জল চোখে থেকে গড়িয়ে পরলো। কেউ একজন হয়তো সত্যিই বলেছিল। মানুষ বাস্তবতার থেকে কল্পনাতেই বেশি সুখি।কত কিছু ভেবেছিলাম। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম দুজনে মিলে।কিন্তু এক নিমেষেই সব স্বপ্ন ভেঙে গেলো আমাদের। আলাদা হয়ে গেলাম দুজনে।সে চলে গেলো আমাকে একা রেখে।আর আমি পরে রইলাম তাকে দেওয়া কথাগুলো সাথে নিয়ে। আদনানের ডাকে আবারো কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসলাম,


প্রাপ্তি বের হও আমরা এসে পরেছি তো - আদনান


ওর কথা শুনে আমি গাড়ি থেকে নেমে পরলাম।চারিদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম সবকিছু কতটা বদলে গেছে। চারিদিকের রাস্তাঘাট বাড়িঘর সবকিছুতেই অনেকটা বদল এসেছে। আজ কত বছর পর পা রাখলাম সেই চিনা পরিচিত বাসাটাতে।তারপর সোজা আহমেদ বাড়ির দরজায় গিয়ে কলিংবেল চাপলাম।সাথে সাথে একজন মেইড দরজা খুলে দিলো,


কেমন আছেন ম্যাম সাহেব - রহিমা চাচি


ভাল চাচি। আপনারা কেমন আছেেন ? - আমি


আমরা ও ভাল আছি - আহসান চাচা


রিয়ানা আম্মু তুমি কেমন আছো ? - রহিমা চাচি


ভাল আছি আন্টি - রিয়ানা


তোমরা ভিতরে এসো বসো। আমি সবকিছু তৈরি করে রেখেছি তোমাদের জন্য। যাতে তোমাদের কোনো সমস্যা না হয় - রহিমা চাচি


না চাচি আমরা এখানে থাকবো না বেশিক্ষণ। ঘন্টা খানেক এখানে থেকে আমরা ওই বাসায় চলে যাবো।- আদনান


আচ্ছা ঠিক আছে তোমরা বসো আমি তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসি - রহিমা চাচি


আদনান আহসান চাচার সাথে কথা বলতে লাগলো। আমি আর রিয়ানা উঠে পুরো বাসা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।প্রথমে আমরা গেলাম লিমা আন্টির ঘরে। এ ঘরে আসলেই আমার শুধু মনে পরে মানুষটার আদরগুলো। নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতো আমাকে।কত আদর করলো। আর আজকে মানুষটিই নেই।তারপর আমরা আসলাম রিয়ানার ঘরে।রিয়ু পাখি বলতে লাগলো,


মনে আছে মাম্মা প্রথম যেদিন তুমি আমার রুমে আসছিলা আমি অসুস্থ শুনে।সারারাত সেদিন জেগে জেগে আমার যত্ন করেছিলে।কত খুনসুটি করেছিলাম আমরা।কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ঘরে আমার। আমার দাদুমনি আর পাপার সাথে কত সময় কাটিয়েছি আমি এখানে। - রিয়ানা


আমি কিছুই বললাম না। তারপর আমি বেরিয়ে রিয়ানের ঘরে চলে আসলাম।আমার পিছু পিছু সেখানে রিয়ু ও আসলো।এখন আর আমি পারছিলাম না নিজেকে সামলাতে।নতুন করে আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল উনি।কত স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আমাকে।এত পরিকল্পনা ছিল আমাদের এটা করবো সেটা করবো।কিন্তু কিছুই তো হলোনা। মানুষ টা আমাকে একা রেখে চলে গেলেন।একবারো ভাবলেন না যে মেয়েটিকে উনি নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন সেই মেয়েটির কি হবে উনাকে ছাড়া। মেয়েটি যে বেঁচে থেকে ও ভিতরে পুরো মরে যাবে উনাকে ছাড়া। কেন চলে গেলেন উনি।হঠাৎই আমি কান্না করতে শুরু করলাম আর জোরে চিৎকার করতে করতে বলতে লাগলাম,


কেন চলে গেলেন আপনি মিস্টার রিয়ান। যাবারই যখন ছিলেন তাহলে এসেছিলেন কেন মরিচীকা হয়ে আমার জীবনে হারাতে হারাতে আমি আজ ক্লান্ত। কেন আল্লাহ আপনার বদলি আমাকে নিয়ে গেলো না।তাতে ও তো বরং শান্তি পেতাম।কিন্তু এখন তো প্রতি মূহুর্তে আমি ধুঁকে ধুঁকে মরছি রিয়ান।ফিরে আসুন রিয়ান ফিরে আসুন - আমি


আমার কান্না দেখে রিয়ানা ও একইভাবে কান্না করতে শুরু করলো।বয়সটা ওর ১৫ পেরিয়েছে এ বছর।না এ আর আগের রিয়ানা নেই।এই রিয়ানা আর আগের রিয়ানার মধ্যে আকাশ জমিনের পার্থক্য।এ রিয়ানা হচ্ছে চুপচাপ, রাগী আর গম্ভীর রিয়ানা।এই একটা মানুষের চলে যাওয়া এতগুলো মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে।


রিয়ানাকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আহমেদ বাড়ির কবর স্থামে আসলাম।পাশাপাশি দুটো কবর একটাতে লিখা লিমা আহমেদ অন্য টায় লিখা রিয়ান আহমেদ। কান্না করছি হ্যা আজকে অনেকদিন পর আমি মন খুলে কান্না করছি। পেয়ে ও আমি হারিয়ে ফেলেছি মানুষটাকে। এই যন্ত্রণার পরিমাণ যে সহ্যের বাইরে আমার।। 


আদনান কোনোমতে আমাদের সামলিয়ে আমাকে আর রিয়ানাকে বাবাইয়ের বাসায় নিয়ে আসলো।বাসায় এসে ফ্রেশ হয়েছি কিছুক্ষণ আগে। সময় এখন গৌধুলি বেলা।বেলকনিতে দাড়িয়ে ভাবছি সেদিনের কথা। সবকিছু ঠিক মতোই চলছিলো। আমাদের হলুদ সন্ধ্যা ও বেশ আনন্দের মাঝেই কেটে যায়।কিন্তু বিপত্তি ঘটে বিয়ের দিন।বরপক্ষ চলে আসে কিন্তু সেদিন বরের গাড়ি আর আসেনা।সময় চলতে থাকে এভাবে দুই ঘন্টা সময় পেরিয়ে যায়।হঠাৎ একটা আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। তারপর তিনি বলেন রিয়ানের নাকি এক্সিডেন্ট হয়েছে। সে ******* এই হসপিটালে ভর্তি।অবস্থা বেশি ভালো না। আমরা যেন জলদি সেখানে পৌছাই। সে কথা শুনে এক মূহুর্ত ও দেড়ি না করে বেরিয়ে যাই হসপিটালের উদ্দেশ্য। আদনান ছিল আমার সাথে। দৌড়ে কমিউনিটি সেন্টার থেকে বেরিয়ে সামনে গাড়িতে বসে থাকা আদনানের দেখা পাই।তাকে এড্রেস টা বলে বলি জলদি সেখানে নিয়ে যেতে।কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পেরে সে ও আমাকে সেখানে নিয়ে যায়।আরো অনেকে এসেছিল সেদিন আমাদের পিছনে। কিন্তু। হসপিটালে পৌছাতেই দেখি রিয়ানকে।সেদিনের থেকে ভয়াবহ অবস্থা তার। সে আমাকে দেখে মুখে থেকে অক্সিজেন মাক্সটা খুলে বলে উঠে, 


দেখো প্রাপ্তি আমার হাতে খুব বেশি সময় নেই ।আমার মৃত্যুর রহস্যটা খুঁজে বের কর।তাহলে সব জানতে পারবে। আর রিয়ু পাখি আর আম্মুকে দেখে রেখো।পারলে ক্ষমা করে দিও কথা দিয়ে ও পাশে থাকতে পারলাম না। ভেবে নিও আল্লাহ চাইনি আমাদের মিল।আমাদের গল্পটা তাহলে অসমাপ্তই থেকে যাক।- রিয়ান


তারপর আদনানের হাতের উপর আমার হাতটা দিয়ে বলতে লাগলো,


এই পাগলিটাকে দেখে রেখো আদনান।আমি জানি তুমি ওকে যথেষ্ট ভালোবাসো। সাথে আমার মেয়েটার ও খেয়াল রেখো। আর প্রাপ্তি তুমিও আদনানকে বিয়ে করে নিও। নিজেকে আর একা করে রেখো না।রিয়ুর সাথে সবসময় থেকো।মেয়েটা যে বড় একা।কেউ নেই ওর।আজকে আমিও চলে যাচ্ছি। ভালো থেকো -রিয়ান


ব্যস শেষ চারিদিক নীরব।কথা শেষ করেই শেষ নিশ্বাসটা ত্যাগ করে রিয়ান।ছেলে হারানোর কথা শুনে রিয়ানের মা ও হার্ট অ্যাটাক করে সাথে সাথে মারা যান।


রিয়ানের কথা রেখেছি। আদনানকে বিয়ে করেছি৷ রিয়ুকে মা বাবার ভালোবাসা দিচ্ছি।সবসময় আগলে রাখছি।কিন্তু দিনশেষে আমি যে বড় একা। 


একাই একাই বলতে লাগলাম,


আপনাকে ভালোবেসেছিলাম মিস্টার রিয়ান।এখনো বাসি।সবসময়ই ভালোবেসে যাবো। শুধু অভিযোগ একটাই থাকবে কেন গল্পটা অসমাপ্ত থেকে গেলো আমাদের।এর সমাপ্তিটা আসলে কোথায়? - আমি


সমাপ্তি🥰,


( এই পর্বটা লিখতে গিয়ে আমি নিজেই কান্না করে দিয়েছি।কিছু কিছু প্রেমকাহিনী অসমাপ্তই থেকে যায়। হয়তো গল্পটা এভাবেই সুন্দর। এর সিজন ২ লিখবো।বাকি রহস্য নাহয় ওই সিজনের জন্য জমা থাক।)


পুরো গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো জানাবেন 😊


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url