#সন্তান
#জান্নাত
পর্বঃ- ০৪ ( শেষ পর্ব )
মেয়েটা সবে ঘুমিয়েছে। আমি ওর বিছানা ঠিক করে উঠতেই রুমে আকাশ এলো। আমাকে তাকে দেখেও না দেখার ভান করলাম। নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আকাশ এসে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো। তারপর বললো,
_ মিষ্টি কি ঘুমিয়ে পড়েছে?'
_ কেনো? তা দিয়ে তোমার কি কাজ!'
_ আমার মেয়ে ও! ওর খোঁজ খবর আমি নিতেই পারি।'
_ না পারো না। কিসের মেয়ে তোমার! ও আমার একার মেয়ে! ওর বাবা নেই!'
_ দেখো মায়া! তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ভাঙছে তার মানে তো এটা মিথ্যা হয়ে যায় না যে ওর আমায় মেয়ে নয়। ওর শরীরে আমার র'ক্ত বইছে!'
_ এটা আমার মেয়ের জন্য চরম দুর্ভাগ্য যে ওর শরীরে তোমার মতো কাপুরুষের র'ক্ত বইছে। কিন্তু কি করবো! এটাই আমার ভাগ্যে ছিলো!'
_ মায়া! আমি তোমায় একটা কথা পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি, ডিভোর্সের পর আমার মেয়ে আমার আর মিথিলার সাথে থাকবে।'
_ কেনো বলো তো!'
_ কারণ ও আমার মেয়ে! আর তুমি ওর খেয়াল কীভাবে রাখবে। আমি ভালো করে ওকে দেখেশুনে রাখতে পারবো, তাই!'
_ ওও তাই বুঝি! পিতৃ প্রেম জেগে উঠেছে?'
_ সেটাই ধরে নাও!'
_ আচ্ছা তোমার কি আমাকে বোকা মনে হয়? তুমি আমার মেয়ে হবে বলে আমায় ছেড়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে। এখন আমায় ডিভোর্স দিতে চাচ্ছো। আবার সেই তুমি, মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে চাইছো? বাহ্ বাহ্! আর কত রুপ দেখাবে তুমি! আসলে কি বলতো, তোমার পিতৃ প্রেম জেগে ওঠেনি। লোভ জেগে উঠেছে। শুধু তোমার নয়, মা আর, তোমার নতুন বউয়ের ও। তাদের বুদ্ধিতেই যে এসব করছো সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। যেই শুনছো বাবা সব সম্পত্তি মিষ্টির নামে করে দিয়েছে, ওমনি ও এখন তোমার মেয়ে হয়ে গেলো তাই না? নির্লজ্জ জা'নোয়ার একটা!'
_ মুখ সামলে কথা বলো মায়া!'
_ আমি মুখ সামলেই কথা বলছি। আমার এখন কি মনে হয় জানো তো, তুমি না, আমার মেয়ে হবে বলে দ্বিতীয় বিয়ে করোনি। তুমি বিয়ে করেছো কারণ আমার উপর থেকে তোমার মন উঠে গেছে। তুমি কখনোই আমায় ভালোবাসো নি। ভালোবাসবে কীভাবে, ভালোবাসা কি তুমি তো সেটাই জানো না। তুমি আসলে কারোর ভালোবাসা ডিজার্ভ করো না।'
_ আমি এতো কথা শুনতে চাই না। আমার মেয়ে আমার সাথেই থাকবে। ব্যাস!'
_ না থাকবে না। ( দাঁতে দাঁত চেপে বললাম আমি )'
_ এটা যদি না হয় তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে মায়া।'
_ আর কি খারাপ হবে আমার সাথে? কি হতে বাকি রেখেছো তুমি? বাবার বাড়ি থেকে তোমার হাত ধরে এসেছিলাম তোমায় ভরসা করে, ভালোবেসে, বিশ্বাস করে। কিন্তু তুমি আমাকে যেভাবে ঠকালে! বুঝিয়ে দিলে আমায় যে কাউকে অন্ধের মতো ভালোবাসতে নেই, বিশ্বাস করতে নেই। এখন আর আমি কোনো কিছুতে ভয় পাই না। যাও আমার চোখের সামনে থেকে! তোমার মুখ দেখতে ইচ্ছা করে না!'
আকাশকে বাইরে বার করে দিয়ে মুখের উপর দরজা আটকে দিলাম। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে দেখলাম ও অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। হয়তো বুঝতে পারছে না, সেই ভোলা ভালা মায়া এমন প্রতিবাদি হয়ে উঠলো কবে! কবে এতো পরিবর্তন হলো আমার।
_ তুমি নিজেই দায়ী আমার এই অবস্থার জন্য। তুমি বাধ্য করেছো আমায় এমন হতে।"
•••••
পরদিন সকালে উকিল এলো ডিভোর্স পেপার নিয়ে। মিথিলার বাবা ই ব্যবস্থা করেছে সব। যাতে দ্রুত ডিভোর্স টা হয়ে যায়।
আমি তখন ঘরে কাজ করছিলাম। মিথিলার কাজের মেয়েটা এলো আমায় ডাকতে। ডিভোর্সের কথা শুনে বুকটা ঢিপঢিপ করতে শুরু করলো। একটা সময় তো এই মানুষটাকে ভালোবেসে ছিলাম। হাত ধরে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমার তো চাওয়া পাওয়া বেশি ছিলো না! তবুও আমার সাথে কেনো এমন হলো! এর কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না।
নিজেকে শক্ত করে ধীর পায়ে হেঁটে নিচে গেলাম। বাবা সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। বাবাকে দেখে ভয় টা দুর হলো। এই মানুষটার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সবসময় সব পরিস্থিতিতেই তিনি আমার সাথে ছিলেন। সাহস জুগিয়েছেন আমায়।
আমাকে দেখে বাবা তার পাশে বসতে ইশারা করলো। আমি বসতেই উকিল ডিভোর্সের কাগজ গুলো আমার দিকে এগিয়ে দিলো। আমি বাবার দিকে চাইলাম। বাবা আমায় ভরসা দিলো। আর কিছু না ভেবে সাইন করে দিলাম তাতে। পরপর আকাশ ও সাইন করলো। ব্যস! হয়ে গেলো ডিভোর্স! তার সাথে আমার সম্পর্ক শেষ হলো।
পাশে বসা শাশুড়ি মা আর মিথিলার চোখ খুশিতে চকচক করে উঠলো। বাবা এবার উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
_ ডিভোর্স তো হয়ে গেলো। সম্পর্ক টাও এখানেই শেষ। তাহলে আর এ বাড়িতে থাকার মানে হয় না।'
শাশুড়ি মা খুশিতে চটপট করে বলে উঠলেন,
_ হ্যাঁ হ্যাঁ! আমি ও তো এটাই বলছি। আর এ বাড়িতে থাকার কোনো মানে হয় না। বের করে দাও এই মেয়েকে। ভেবেছিলো তোমার সব সম্পত্তি বাগিয়ে নিয়ে রাজ করবে এ বাড়িতে। তা তো হতে দেয়া যায় না। তুমি বুঝলে অবশেষে! বার করে দাও ওকে।'
বাবা মুচকি হেসে বললেন,
_ বার তো করতেই হবে। তবে ওকে না, তোমাকে!'
হঠাৎ ই ওনার হাসিখুশি মুখটা একদম চুপসে গেলো। উনি তোতলাতে তোতলাতে বললেন,
_ এসব তুমি কি বলছো আকাশের বাবা! আমায় বার করে দেবে মানে!'
_ ঠিক ই শুনেছো! তুমি, তোমার ছেলে আর ছেলের বউকে নিয়ে এক্ষুনি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। আর যেনো কখনোও তোমায় এখানে না দেখি।'
_ আকাশের বাবা!'
_ এতো অবাক হচ্ছো কেনো! আমি তো আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম!'
_ তার মানে তুমি সত্যি সত্যি তোমার সব সম্পত্তি ওদের নামে লিখে দিয়েছো?'
_ কেনো! তুমি কি ভেবেছিলে! আমি তোমায় ভয় দেখাতে মিথ্যে বলেছিলাম! এতোটা বোকা নাকি তুমি!'
মিথিলা বলে উঠলো,
_ মানে? মানে এ সম্পত্তি এখন সব এই ছোটলোকের? তুমি আর এর অংশীদার নও আকাশ?'
আকাশ বাবার দিকে চেয়ে অসহায় দৃষ্টিতে বললো,
_ বাবা, বাবা তুমি কি বলছো এসব! আমি তোমার ছেলে! নিজের ছেলের চেয়ে এরা তোমার কাছে বেশি আপন হয়ে গেলো বাবা?'
_ হ্যাঁ হলো! আর কি বললে, ছেলে? তোমায় ছেলে বলতে ঘৃণা করে আমার! দুর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে। আজ থেকে তোমরা আমার কেউ নও। আমার শুধু এই একটাই মেয়ে, আর এক নাতনি। আর কাউকে চিনি না আমি।'
মিথিলা তড়িঘড়ি বলে উঠলো,
_ ওয়েট ওয়েট! তুমি তাহলে এখন এ বাড়ির কেউ নও আকাশ! মানে এসব সম্পত্তি আর তোমার নয়? তোমাকে যদি বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তাহলে কোথায় যাবে! আমাকে কি খাওয়াবে? দেখো, আমি কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে পারবো না! আমি এখন যেভাবে আছি, এভাবেই থাকতে চাই। আমার সব চাহিদা তোমায় মেটাতে হবে!'
_ মা, তুমি এসব কি বলছো? আমাদের নিজেদের ই এখন কিছু নেই। তোমার চাহিদা কীভাবে মেটাবে আমার ছেলে?'
_ ওসব আমি কিছু জানি না! যদি আমার চাহিদা না মেটাতে পারে তবে বিয়ে কেনো করেছে! কোনো মুরোদ নেই। এতো বড়ো বড়ো কথা বলে এলেন আমার বাবাকে, আর এখন সব হাওয়া ফুস! এমনিতেই আমি আর তোমার সাথে থাকবো না। এমন ভিখিরি বরকে নিয়ে আমি সোসাইটি তে মুখ দেখাবো কি করে! আমার তো একটা মান সম্মান আছে। এই ফুলি, আমার জিনিস পত্র গুলো নিয়ে আয় তো। এক্ষুনি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো আমি।'
_ জে ম্যাডাম।'
শাশুড়ি মা এবার কাতর স্বরে বললেন,
_ এমন কোরো না মা! আমাদের এভাবে একা ছেড়ে দিচ্ছো! কোথায় যাবো আমরা!'
_ গোল্লায় যান! আপনাদের দায়িত্ব আমি নিয়ে বসে আছি নাকি! যেখানে ইচ্ছা যান তাতে আমার কি! নিজেদের রাস্তা নিজেরা দেখুন। আমি গেলাম। ফুলি, চল।'
ফুলিকে নিয়ে মিথিলা চলে গেলো। বাবা মায়ের দিকে চেয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
_ কি ব্যাপার? তোমার বড়লোকি বউমা তো নিজের আখের গুছিয়ে নিলো। আর তোমাদের এভাবে ছেড়ে দিলো! খুব অহংকার ছিলো না তোমার!'
শাশুড়ি মা ছুটে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
_ ওগো ভুল হয়ে গেছে আমাদের। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমাদের তুমি ক্ষমা করে দাও। এমন কোরো না আমার সাথে।'
আকাশ ও কাকুতি মিনতি করতে লাগলো। কিন্তু বাবার মন গেলো না। সে তার সিদ্ধান্তে অটল রইলো।
_ বাবা...!'
_ না! তুই আজ কিছু বলবি না। এদের ক্ষমা করার কথা তো একেবারেই না। ভুলে যাস না কি কি করেছে এরা তোর সাথে। এতো নরম মনের হোস না।'
আমি আর কিছু বললাম না। সত্যিই সবসময় ক্ষমা নয়, মাঝে মাঝে শাস্তি পাওয়ার ও দরকার আছে। নাহলে মানুষ ঠিক ভুলের বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
শেষমেষ তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন বাবা। আর আমাকে সব দায়িত্ব দিলেন যতদিন না মিষ্টি বড় হচ্ছে। আমি সামলাতে লাগলাম সব। সারাদিন অফিস সেরে বাড়ি এসে দেখতাম বাবা মিষ্টি খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে।
নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হতো। আমি হয়তো অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু যা পেয়েছি, তা অমূল্য। আমার বাবা মাকে বারবার বলতেন বাবা, এ বাড়িতে এসে থাকতে। তারা রাজি হয়নি। মাঝে মাঝে এসে মিষ্টি কে দেখে যেতো।
এভাবেই কেটে গেলো ২২ টা বছর!
এখন আমি বয়সের ভারে কাবু প্রায়। বাড়িতেই থাকি সবসময়। মিষ্টি এখন অনেক বড় হয়েছে। দাদু অন্ত প্রাণ। চোখের মনি তার। ব্যবসা এখন সেই সামলায়। দেখতে দেখতে মেয়েটা কত বড় হয়ে গেলো।
তবে, মিষ্টি কিন্তু তার দাদি আর বাবাকে ফেলে দেয়নি। শুনেছিলাম পাশের বস্তিতে থাকে এখন তারা। মিষ্টি মাঝে মাঝে গিয়ে দেখা করে আসে তাদের সাথে। আমি কিছু বলিনি তাকে। সবাইকেই তো ভুল শুধরানোর সুযোগ দেওয়া উচিত। এটাই ওদের সেই সুযোগ। ভুল করলে ক্ষমা করা যায়, তবে, অন্যায়ের কোনো ক্ষমা নেই।
—— সমাপ্ত ——
( আসসালামুয়ালাইকুম! গল্প তো শেষ হলো। আজকে একটা গঠনমূলক মন্তব্য আশা করছি। কেমন হলো অবশ্যই জানাবেন কিন্তু 💚🌸 )
{ লেখকের কিছু কথাঃ- আসসালামুয়ালাইকুম! কেমন আছেন সবাই! আমি টুকটাক শখের বশে লেখালেখি শুরু করেছিলাম। এই গল্পটায় এতো ভালোবাসা পাবো কখনো ভাবিনি। অনেক সা'পোর্ট করেছেন আমায়। আশা করছি ভবিষ্যতেও এভাবেই আপনাদের পাশে পাবো! আমার লেখা গল্প গুলো পড়বেন। ভালো খারাপ সবটাই বলবেন। তবেই তো শিখবো আমি। ভুল হবে, শুধরে নিবো। আমার অন্য রানিং গল্প, #তোকে_ঘিরে_সন্ধ্যাতারা আর #শুধু_তুই গল্প দুটো পড়বেন। জানাবেন কেমন হলো! ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন! 🌸}
হ্যাপি রিডিং......!!! 🌸🌸
