#সেদিন_ছিল_পূর্ণিমা 

#পর্ব:- দুই (০২)


আমি বললাম, 

" আপনারা কারা? আমাকে কেন নিয়ে যাবেন? "


" সাদা রঙের প্যাকেটটা কোথায়? " 


" কিসের প্যাকেট? আমি তো কোনো প্যাকেট সম্পর্কে কিছু জানি না। " 


এমন সময় টগর ভাইয়ের কণ্ঠ শোনা গেল। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লোকগুলোর পিছন থেকে বললো, 


" কি ব্যাপার এখানে এতো মানুষ কেন? " 


সবাই পিছনে ফিরে তাকালো। যে লোকটা আমার সঙ্গে কথা বলছিল সে বললো, 


" টগর তুই? " 


" আপনারা এখানে কি করেন? " 


" এই মেয়েকে নিতে এসেছি। " 


" কেন? " 


" অনেক কাহিনি। পরে সবকিছু বুঝিয়ে বলবো। তুই এখানে কেন তাই বল। " 


" এই মেয়ে আমার পরিচিত, আমিই তাকে এখানে ভর্তি করেছি। সুতরাং তার বিষয় যা বলার সবটা আমার সঙ্গে বলেন। " 


" বলিস কি? তোর কিরকম পরিচিত? " 


" যেভাবেই হোক সেটা বড় কথা নয় , এখন বলেন ঘটনা কি? " 


লোকটা কিছু না বলে মোবাইল বের করলো। তারপর কাকে যেন কল দিল। তারপর বললো, 


" ভাই এখানে টগর আছে, আর এই মেয়ে তো টগরের পরিচিত। " 


তারপর ওপাশ থেকে কিছু শুনলো। মোবাইল রেখে দিয়ে টগরকে বললো, 


" হাসপাতালের মধ্যে কোনো ঝামেলা করলাম না টগর। রাতের মধ্যে ওই প্যাকেট সিরাজ ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিবি। নাহলে কিন্তু ভাই নিজে কিছু একটা করে ফেলবে। " 


টগরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তারা সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেল। টগর ভাই আমার কাছে চলে এলেন। 


এতক্ষণে বুকের ভেতর জমানো ভয় খানিকটা কমেছে কিন্তু তারা কিসের প্যাকেটের কথা জিজ্ঞেস করছে সত্যিই জানি না। 


আমি বললাম, 

" আমি বাসায় যাবো। " 


টগর ভাই অবাক হয়ে বললেন, 

" এই অসুস্থ শরীরে বাসায় কেন? " 


" আমি ঠিক আছি। আপনি যে অফিসে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সেখানে কি আজ যাওয়া যাবে নাকি আগামীকাল? " 


" কালকে গেলে হবে। "


" তাহলে বাসায় চলেন। " 


" ঠিক আছে ব্যবস্থা করি। " 


" একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি? "


" করেন। " 


" ওই খারাপ লোকগুলো আপনার পরিচিত ছিল তাই না? এদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি? " 


" কোনো সম্পর্ক নেই, এলাকার এক নেতার সঙ্গে চলাচল করে। কিন্তু আপনি বলেন তো ওরা কিসের প্যাকেটের খোঁজ করছে? "


" আমি জানি না। " 


" মনে হয় কোথাও একটা গন্ডগোল আছে। ঠিক আছে চিন্তা করবেন না, আমি রাতে সিরাজ ভাইর সঙ্গে দেখা করে সবকিছু বলবো। " 


" আপনার সঙ্গে এইসব মানুষের খুব খাতির তাই না টগর ভাই? " 


" আছে কিছুটা। " 


" আমার চাকরির ব্যবস্থা হয়ে গেলে আপনার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখবো না। " 


" ঠিক আছে রাখতে হবে না। এমনিতেই কেউ যোগাযোগ রাখে না, এতে আমি কিছু মনে করি না। খুব স্বাভাবিক বিষয়। " 


" আপনার পরিবারে কে কে আছে? " 


" এক বোন আছে, আর কেউ নেই। " 


" সে কোথায়? " 


" রংপুর, ওর স্বামীর সাথে থাকে। " 


" সেও মনে হয় আপনার সঙ্গে কথা বলে না, তাই না? " 


টগর ভাই এই প্রশ্নের জবাব দিল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে, তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে গেল। আশ্চর্য এক মানুষ। তবে আমি এখনো ওই ভয়ঙ্কর লোকগুলোর কথা চিন্তা করে যাচ্ছি। কিসের প্যাকেট, কি ছিল সেখানে? যার কারণে এরা আমাকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছে। মাদকদ্রব্য নাকি? হায় আল্লাহ!


★★★


ভদ্রমহিলার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। হলুদ রঙের শাড়ি পরে বসে আছে। মুখভর্তি পান, তার এক হাতে চুড়ি ভর্তি আর অন্যহাত খালি। 

আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 


" রাত দশটার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে। কারণ দশটার পরে আর কাউকে দারোয়ান ঢুকতে দেবে না বাসায়। " 


টগর ভাই বললেন, 

" অফিসে চাকরি করবে। রাস্তায় মাঝে মাঝে তো জ্যাম থাকে। গেইট খোলা হবে না কেন? ভাড়া দিয়ে তো থাকব তাই না? " 


" আমার বিল্ডিংয়ের মধ্যে কেউ রাত দশটার পরে বের হতে পারে না। " 


" তবুও মাথায় রাখবেন বিষয়টা। তার চাকরি হবে বনানী, আর বনানী থেকে উত্তরা আসতে মাঝে মাঝে দেরি হতে পারে। দেখা গেল রাত আটটার দিকে ছুটি হয়েছে.... "


" ঠিক আছে বুঝতে পারছি টগর, সমস্যা নেই যদি দু একদিন বিপদে পরে সেটা দেখা যাবে। " 


আমি সন্ধ্যার পরে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে মেসে চলে এলাম। একটা তিন রুমের ফ্ল্যাটের মধ্যে আমিসহ মোট সাতজন থাকবো। তিনজন পড়াশোনা করে, বাকি তিনজনই জব করে। আমি যার সঙ্গে এক রুমে থাকবো সেই মেয়েটার নাম তাযকিয়া তামান্না। 


ফ্লোরে বিছানা করে ঘুমাতে হবে। তামান্না নামের মেয়েটাও ফ্লোরে বিছানা করে বসে আছে। সে বললো, 


" তুমি চাইলে খাট কিনে পেতে নিতে পারো। আমার দরকার হয় না তাই কেনা হয় না। " 


" না না সমস্যা নেই। " 


" তোমার নামটা যেন কি? " 


" অবন্তী "


" আমার নাম তাযকিয়া তামান্না, নামের অর্থ হচ্ছে পবিত্র ইচ্ছে। " 


বয়স আনুমানিক আমার চেয়ে বেশি হবে। কাছেই একটা গার্মেন্টসে চাকরি করে, সুপারভাইজার। 


" রেললাইনের ওপারে সেক্টরের মধ্যে তোমার বান্ধবীর বাসা তাই না? " 


" হ্যাঁ। " 


" খুব বড়লোক নাকি? "


" জানি না, মোটামুটি! "


" সেক্টরের মধ্যে তো বাসাভাড়া অনেক বেশি। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ সেখানে থাকতে পারে না। "


শরীর ক্লান্ত ছিল, এক্সিডেন্ট আমার পায়ের মধ্যে হালকা ছিলে গেছিল। খুব বেশি ক্ষতি হয়নি, তবে টগর ভাইয়ের হাতে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। 


রাত এগারোটার দিকে টগর ভাই আমাকে কল দিলেন। তার কাছে আমার নাম্বার নেই। নিশ্চয়ই রাবুর কাছ থেকে নিয়েছে। রাবুর ভালো নাম রাবেয়া, আমরা সবসময় তাকে রাবু বলে ডাকি। 


" হ্যালো, আমি টগর বলছি। " 


" বলেন। " 


" আপনি সেদিন গ্রাম থেকে আসার সময় বাসের মধ্যে আপনার পাশের সিটে কি একজন মহিলা বসেছিল? " 


আমি খানিকটা অবাক হয়ে গেলাম। তারপর নিজের কৌতূহল লুকিয়ে বললাম, 


" হ্যাঁ। " 


" সেই মহিলা আপনার ব্যাগের ভেতর একটা সাদা প্যাকেট রেখেছিল। ওরা সেই প্যাকেট চাইছে, ওটা আপনি কোথায় রেখেছেন? " 


এবার আরো অবাক হলাম। আমি তো এসবের কিছু জানতাম না, তাছাড়া কিছুক্ষণ আগে সব বের করে গুছিয়ে রেখেছি। সেখানে কোনো সাদা প্যাকেট ছিল না। 

বললাম, 

" টগর ভাই আমি জানি না সেটা কোথায়। " 


" দয়া করে আমার কাছে সত্যিটা বলেন। নাহলে খুব বিপদ হতে পারে। " 


" আশ্চর্য, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না কেন টগর ভাই? আমি ওটা দিয়ে কি করবো? " 


" ঠিক আছে সমস্যা নেই। আমি দেখি কি করা যায়। আমি না বলা পর্যন্ত আপনি বাসা থেকে বের হবেন না। টাকাপয়সা লাগলে রাবেয়ার কাছে বলবেন, আপাতত বাসায় থাকেন। "


" চাকরি? " 


" বিষয়টা একটু সমাধান করি তারপর আপনার চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত বাসায় বসে থাকেন, ঘুমান যা ইচ্ছে করেন। " 


কল কেটে গেল। আমি সেদিন গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার কথা ভাবতে লাগলাম। আমার পাশে এক মহিলা ছিল। আমি প্রায় সারাক্ষণ ঘুমিয়েই ছিলাম। আমার ব্যাগটা ছিল পায়ের কাছে। বেশি কাপড়চোপড় ছিল তাই মাথার উপরের বক্সে রাখতে পারিনি। মহিলা কখন বাস থেকে নেমেছে সেটাও জানি না আমি। 


মোবাইলে মা কল দিয়েছে। এতো রাতে মা কল দিবে ভাবিনি। তাহলে বাবার শরীর আবার অসুস্থ হয়ে গেল নাকি? 


" কেমন আছো মা? " 


" আমরা ভালো আছি, তুই কেমন আছিস মা? চাকরি হয়েছে? " 


" না চাকরির জন্য যেতে পারিনি। পথে সামান্য এক্সিডেন্ট করেছি তাই হাসপাতাল থেকে আবার বাসায় এসেছি। " 


" বলিস কি? সাবধানে থাকতে পারিস না? বেশি কিছু হয়নি তো? " 


" না মা। " 


" একটা কথা বলতে কল দিলাম। " 


" কি কথা? বলো! " 


" জামাই এসেছিল একটু আগে। " 


" মানে? কার জামাই? " 


" সোহাগ এসেছিল। " 


আমার হাসবেন্ডের নাম ছিল সোহাগ। কিন্তু সে আমাদের বাড়িতে এসেছে, আশ্চর্য। 


" কেন এসেছে? " 


" সে নাকি ইচ্ছে করে ডিভোর্স দেয়নি, এসবের পিছনে অনেক ঝামেলা ছিল। বাধ্য হয়ে নাকি কাজটা করেছে। " 


" এসব কি ধরনের কথা? সে এসে তোমাকে বলে গেল আর তুমি বিশ্বাস করে নিলে? " 


" সে ঢাকায় গিয়ে তোর সাথে দেখা করতে চায়। আমার কাছে ঠিকানা চায়। " 


" পাগল নাকি? তার সঙ্গে দেখা করবো কেন? " 


" জানি না, আমি তো নিজেই তোর ঠিকানা জানি না। দেবো কীভাবে? সে বলে গেল, যেভাবেই হোক তোর ঠিকানা নাকি যোগাড় করবে। " 


" কিছুই বুঝতে পারছি না মা। " 


" তুই সাবধানে থাকিস অবন্তী, তোর বাবা এসব কিছু জানে না। টেনশন করবে তাই কিছু বলিনি। "


" ভালো করছো। " 


★★★


দুদিন পেরিয়ে গেল। সেই রাত থেকে টগর ভাইর নাম্বার বন্ধ। যে নাম্বার দিয়ে কল করেছিল সেই নাম্বার বন্ধ পাচ্ছি। রাবুর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, রাবুও কিছু জানাতে পারেনি। 


তৃতীয় দিন একটা অপরিচিত নাম্বার দিয়ে কল এলো। আমি রিসিভ করে কথা বললাম, 


" কে বলছেন? " 


" আমাকে আপনি চিনবেন না। আপনার ব্যাগ থেকে একটা সাদা প্যাকেট আমি বাসের ভিতরে বসে নিয়েছিলাম। ওটা আমার কাছেই আছে। " 


[ গঠনমূলক মন্তব্য করলে লেখার প্রতি আগ্রহ আসে। আশা করি সবাই মতামত জানাবেন! ]


চলবে... 


লেখা:- 

এম.ডি. সাইফুল ইসলাম।

#সেদিন_ছিল_পূর্ণিমা 

#পর্ব:- তিন (০৩) 


" কে আপনি? তাছাড়া আপনি আমার ব্যাগের ভেতর থেকে কেন নিয়েছেন? আপনি কি জানেন ওই প্যাকেটের জন্য আমি কতটা বিপদে আছি? "


" হ্যাঁ জানি। ২০ লাখ টাকার মতো জিনিস যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তখন সেই জিনিসের মালিক সেটার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। এটা স্বাভাবিক। " 


" কতো টাকা? "


" ২০ লাখের বেশি হবে। এটা নিষিদ্ধ একটা ড্রাগস এর প্যাকেট। যে মহিলা আপনার পাশে বসেছিল তিনিই ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিল। "


" তিনি আমার ব্যাগে কেন রাখলেন? " 


" আপনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন তখন মাঝপথে বাস পুলিশ চেকিং করে। পুলিশ দেখে আপনার পাশে বসা সেই মহিলা এগুলো আপনার ব্যাগে রেখেছিল। আপনার সিট ছিল D4 আর আপনার পাশের মহিলা D3, আমি ছিলাম D2 সিটে। সত্যি বলতে আপনাকে আমি কাউন্টার থেকে ফলো করছিলাম। যখন কাউন্টারে বসে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তখন আপনাকে দেখে ভালো লেগেছিল। বাসে উঠে যখন দেখলাম আপনার পাশাপাশি সিট পড়েছে তখন বেশ খুশি হলাম। কিন্তু আফসোস হলো কারণ আরেকটু কাছে যদি বসতে পারতাম। " 


" তারপর কি হলো? " 


" আপনি ঘুমাচ্ছেন, আমি প্রায় সারাক্ষণ আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পুলিশ বাসে ওঠার পরে হঠাৎ দেখি মহিলা ঘাবড়ে গেলেন। তারপর তার নিজের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বাহির করেন। সেই প্যাকেট আপনার ব্যাগে রেখে দিয়ে সে চুপ করে বসে থাকে। " 


" কি বলছেন এসব? " 


" ঠিকই বলছি! পুলিশ কিন্তু আপনার ব্যাগ চেক করেনি, চেক করলে আপনি ফেঁসে যেতেন। তবে আমার একটা ভুল হয়ে গেছে, তখন যদি পুলিশের কাছে বলতাম তাহলে মহিলা ধরা পড়তো। " 


" করলেন না কেন? " 


" আসলে মানুষের মাথায় সবসময় সব ধরনের বুদ্ধি কাজ করে না। সেজন্যই প্রচলিত প্রবাদ আছে ' চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে!' "


" আপনি কীভাবে নিলেন ব্যাগটা? " 


" একটা পেট্রোল পাম্পে গাড়ি দাঁড় করানো হয়েছিল মনে আছে? আপনিসহ সেই মহিলা এবং আরও অনেকে বাস থেকে নেমেছেন। " 


" হ্যাঁ ওয়াশরুমে গেছিলাম। পাশের সেই মহিলা আমাকে ডেকে নিয়ে গেছিল। " 


" আমিও নেমেছিলাম, কিন্তু যখন দেখলাম যে আপনারা নামছেন তখন চট করে বাসে উঠি। খুব সাবধানে আর কৌশলে ব্যাগটা খুলে প্যাকেটটা নিজের কাছে নিয়ে যাই। তারপর সেটা একদম পিছনে নিয়ে রাখি। " 


" কেন করেছেন? " 


" আমার সন্দেহ ছিল এটা নিষিদ্ধ কিছু হতে পারে। কারণ আপনি আসার আগেই সেই মহিলা দ্রুত বাসে আসে। তারপর আপনার ব্যাগ খুলে ওটা নিজের রাখা প্যাকেট খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু তাকে হতাশ হতে হয়েছে কারণ সেটা অলরেডি আমি সরিয়ে ফেলি। " 


" কি দরকার ছিল ভাই বলেন? ওরা যদি সেটা নিয়ে যেত তাহলে আমি এমন বিপদে পড়তাম না। এভাবে বাসায় লুকিয়ে থাকতে হতো না। সব দোষ আপনার। " 


" আমি জানি। বাস থেকে নেমে আপনাকে আমি হারিয়ে ফেলি। প্যাকেটের ভেতরের ড্রাগস গুলো দেখে আর সেগুলোর দাম শুনে আমি রিতীমত অবাক হলাম। তখনই বুঝতে পারি যে আপনার উপর বিপদ আসবে। " 


" আপনি আমার নাম্বার পেলেন কীভাবে? " 


" কাউন্টার থেকে। আমরা যেই বাস কাউন্টার থেকে উঠেছি সেখানে আমার এক পরিচিত লোক আছে। তাকে বললাম D4 সিটের যাত্রীর নাম্বার যোগাড় করতে হবে। আমাদের ভ্রমণের তারিখ ও বাসের কোচ নাম্বার বললাম। আমার সেই পরিচিত ভাই আপনার নাম্বার ম্যানেজ করে দিয়েছে। " 


" আপনি দয়া করে ওদের জিনিস ফিরিয়ে দেন তাহলে ওরা আমার পথ থেকে সরে যাবে। ওদের জন্য আমি চাকরি করতে পারি না। " 


" কি বলেন এসব? আমি তো তাদের পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিতে চাই। আর সেজন্য সবচেয়ে বেশি সহোযোগিতা করবেন আপনি। " 


" আমি...? কীভাবে! "


" ওরা আপনার উপর নজর রাখবে। আর সেই সুযোগটা আমরা কাজে লাগাবো, তাদের ধরিয়ে দেবার সুযোগ পাবো। "


" কিন্তু....! "


" দেখুন, এরা খুব খারাপ একটা চক্র। এরকম অনেক ভালো মানুষ তারা ড্রাগসের মাধ্যমে শেষ করে দিচ্ছে। মারাত্মক বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে সমাজে। এদের আইনের হাতে তুলে দেওয়া আপনার আমার কর্তব্য। " 


" আপনি নিজে তো সবকিছু করতে পারেন। " 


" আমি তো তাদের চিনি না। তারা তো আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে কারণ তারা ভেবেছে আপনি সেগুলো সরিয়ে ফেলেছেন। " 


" এখন আমাকে কি করতে হবে? "


" আপনি আপনার ঠিকানা দিন, আমি আপনার সঙ্গে দেখা করবো। তারপর আমরা দুজন মিলে পুলিশের কাছে গিয়ে সবকিছু তাদের বলবো৷ তারপর তাঁরাই বলে দিবে আমাদের কি করতে হবে। " 


" আপনাকে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে, আপনি কি ওদের দলের কেউ? ঠিকানা বের করার জন্য বা আমাকে....... 


টুট টুট টুট। শব্দ করে কলটা কেটে গেল। আমি মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলাম, তারপর নিজ থেকে কলব্যাক করলাম কিন্তু নাম্বার বন্ধ। 

আশ্চর্য! 


মোবাইল বিছানায় রেখে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আকাশে কিছু হালকা মেঘ জমেছে, তার ফাঁকে ফাঁকে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। আমি আমার একটা হাত গ্রিলের সঙ্গে রাখলাম। বিপদ যেন আমার ছায়া সঙ্গী হয়ে গেছে। অথচ বছর খানিক আগে আমার জীবন অন্যরকম ছিল। আমার এই ছোট্ট জীবনে কতো বিচিত্র মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। 


টগর ভাইয়ের নাম্বার এখনো বন্ধ। রাবুর কাছে কল দিলাম, সে নাকি তার শাশুড়ীর সঙ্গে কোথায় যেন গেছে। পরে কথা বলি, বলে কল কেটে দিল। 


★★★ 


বিছানায় শুয়ে ছিলাম। তামান্না আপুর দুপুরের খাবার খেতে বাসায় এলেন। তামান্না আজকে রোজা রাখেনি। গতকাল রাতে আমাকে বলেছিল 'আমি অসুস্থ, কাল থেকে ৪/৫ দিন আর রোজা রাখা হবে না।' একটা মেয়ে হিসেবে এটা আমি জানি। তাই আর কিছু বলিনি। 


আমি দরজা খুলে দিতেই তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 


" কি ব্যাপার কান্না করছো নাকি? " 


" বাড়ির কথা মনে পড়ছে, তাই মন খারাপ। "


" চাকরির কিছু ব্যবস্থা হলো? " 


প্রশ্ন করে তামান্না ওয়াশরুমে চলে গেল। তারপর বের হয়ে এসে খেতে বসে ভাতের থালা হাতে নিয়ে খেতে খেতে বললো, 


" মাত্র এক ঘন্টা সময় পাই অবন্তী। অফিস থেকে বাসায় আসতে বারো তেরো মিনিট হয়ে যায়। আবার বের হতে হবে পনের মিনিট আগে। "


" তোমাদের অফিস থেকে দুপুরের খাবার খেতে দেয় না? " 


" আরে না। ইপিজেডের মধ্যে হলে দেয় কিন্তু আমরা যেখানে চাকরি করি সেখানে দেয় না। তাছাড়া এখন তো রমজান মাস। ছোট কোম্পানি তো, তাই কখনো খেতে দেয় না। কাজের কতো চাপ সারাক্ষণ একটু বসার সুযোগ পাই না। আমি সুপারভাইজার হবার আগে অপারেটর ছিলাম, তখন সারাদিন বসে বসে কাজ করতাম। বিরক্ত হয়ে একটু দাঁড়ানোর সুযোগ খুঁজে বেড়াতাম। আর এখন সারাদিন লাইনের মধ্যে দৌড়াতে হয়, ইচ্ছে থাকলেও বসতে পারি না। " 


" খুব কষ্টের তাই না? " 


" হ্যাঁ। তবে মাস শেষে বেতন পেলে মনটা ভালো হয়ে যায়। গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে আনন্দে আনন্দে সপ্তাহ খানিক কাটে। তারপর আবার সেই মাস শেষ হবার অপেক্ষা। আমাদের জীবন পেরিয়ে যায় মাস শেষ হবার অপেক্ষা করতে করতে। কিন্তু জীবন থেকে যে দিনদিন সময় কমে যাচ্ছে সেই হিসাব করি না। " 


" তোমার বেতন কত? "


" সবমিলিয়ে ১৬/১৭ হাজার পাই। স্টাফ তো। " 


" কতটুকু পড়াশোনা করছো? " 


" এসএসসি পাশ করে এসে গার্মেন্টসে চাকরি নিছিলাম। " 


" আমাকে একটা চাকরি দিতে পারবে? " 


" তুমি গার্মেন্টসে চাকরি করবা? " 


" এছাড়া কি করবো? "


" টগর ভাই কিছু ব্যবস্থা করে নাই? " 


" তার নাম্বার বন্ধ। কোনো যোগাযোগ নেই আমার সঙ্গে, একটা ছোট্ট ঝামেলা হয়ে গেছে। " 


" তাহলে তো চিন্তার বিষয়। ইদের আগে গার্মেন্টসে চাকরি পাওয়া সম্ভব না। তবুও আমি গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখি, যদি হয় তাহলে তোমাকে নিয়ে যাবো কালকে। " 


খাবার শেষ করে তামান্না আয়নার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটে সামান্য লিপস্টিক লাগিয়ে ওড়না বাঁধলো। তারপর রুম থেকে বের হবার সময় আমাকে বললো, 


" একটা লোক তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, ঘটনা কি বুঝতে পারছি না। " 


" কে সে? " 


" চিনি না, সকালে আমি বের হতেই একটা লোক আমাকে তোমার একটা ছবি দেখালো। তারপর জিজ্ঞেস করলো ' এই মেয়েটা বিল্ডিংয়ের কত তলায় থাকে জানেন? ' আমি তোমার ছবি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, ' না জানি না। "


" কিরকম ছবি? আমার ছবি তারা পাবে কোই? " 


" তা তো জানি না। তোমার সঙ্গে আরেকটা ছেলে ছিল। তোমার পরনে লাল একটা থ্রি পিছ আর সঙ্গে ছেলেটার পরনে সাদা টিশার্ট। " 


" তাহলে মনে হয় আমার স্বামী আর আমার ছবি ছিল ওটা। " 


" তোমার বিয়ে হয়েছে? " 


" হ্যাঁ। " 


" বলো কি, জানতাম না তো। আচ্ছা দেরি হয়ে যাচ্ছে এখন যাই তাহলে। বাসায় ফিরে সবকিছু শুনবো তুমি বাসা থেকে বের হইও না। আর ওরা মনে হয় দারোয়ানের কাছে কিছু জিজ্ঞেস করে নাই। কারণ দারোয়ান তাহলে সন্দেহ করবে, আর ওরা সবসময় ঘুরঘুর করতে পারবে না। " 


তামান্না চলে গেল। আমাদের পাশের রুমের যে দুটো মেয়ে ছিল তারা বাসায় আছে। এদের নাম জানি কিন্তু ভালো করে পরিচয় হয়নি এখনো। 


আমি তামান্না আপুর কথা ভাবতে লাগলাম। সোহাগের সঙ্গে তোলা আমার ছবি রাস্তার একটা লোক কীভাবে পাবে? তাহলে কি সোহাগ নিজে দিয়েছে সেই ছবি? কিন্তু সোহাগকে পাবে কোথায় এরা? 


সকাল থেকে হালকা পেটে ব্যথা ছিল। দুপুরের পর থেকে সেটা আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো। সাড়ে চারটার দিকে হঠাৎ অনুভব করলাম আমার ব্লাডিং হচ্ছে। সেদিন টগর ভাইয়ের যখন ডাক্তার বলেছিলেন আমি প্রেগন্যান্ট তখন বাসায় ফিরে আমি অনেক ভেবেছিলাম। 


আমার ডিভোর্স হয়েছে মাস খানিক আগে। আর ডিভোর্সের দুমাস আগে থেকে স্বামীর সাথে এক বিছানায় থাকা হয়নি আমার। 


সবমিলিয়ে তিন মাস। তবে আমার স্পষ্ট মনে আছে, শেষ যেবার আমার পিরিয়ড হইছে তারপর থেকে আর সোহাগের সঙ্গে ছিলাম না। তাহলে আমার গর্ভে সন্তান আসবে কীভাবে? 


এইসব জটিলতা খোলাসা করার জন্য আবারও ভালো করে ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হবার কারণে নিজের শারীরিক সমস্যাটা গোপনেই রইল। 


পেটে ব্যথা নিয়ে শুয়ে ছিলাম। একটু পর পর খুব মারাত্মকভাবে ব্যথা অনুভব করছি। রাবুর কাছে আরেকবার কল দিলাম, রিসিভ করে নাই। 


মিনিট দশেক পরে আমার মোবাইলে কল এলো। ভেবেছিলাম রাবু হয়তো কলব্যাক করেছে। কিন্তু মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি সোহাগ কল দিয়েছে। একবার ভাবলাম রিসিভ করবো না। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো ছবিটার কথা জিজ্ঞেস করা দরকার। 


" হ্যালো অবন্তী, আমি সোহাগ! "


" চিনতে পেরেছি, হঠাৎ কি মনে করে? " 


" আমি তো ঢাকা এসেছি। " 


" ঢাকায়? কিন্তু কেন? " 


" তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। তুমি যে বাসায় থাকো আমি সেই বাসার নিচে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। তুমি একটু নিচে আসবে? " 


[ সকলের মতামত আশা করছি। ভালো লাগলে অবশ্যই নিজের উপস্থিতি জানিয়ে যাবেন। ]


চলবে.... 


লেখা:- 

মোঃ সাইফুল ইসলাম।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url